ধর্মে আছি জিরাফে নেই

 

৫ম পর্ব

 

সায়ন্তন দীপ্তিকে দেখতে এসেছে। সে ওর এল্ডার ব্রাদার সায়ন্তন গোমেজ। পারিবারিক ব্যাবসা না করে চাকরি করছে। দীপ্তি, সায়ন্তন, অর্কদীপ্ত কমন ফ্রেন্ড। এর মধ্যে সায়ন্তন ওদের চেয়ে বয়সে একটু বড়ো।

অর্ককে ফিরিয়ে দিলি? সায়ন্তন কোমল স্বরে বলল বোনকে।

চোখ মুছে দীপ্তি বলল, তুই কী করে জানলি?

সারা রাত ঘুমোসনি। কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছিস।

আমার তো কোনো উপায় নেই।

কেন, বাংলায় কী একটা বলে না… ভাগ্যবানের বউ মরে অভাগার ঘোড়া,  বলেই নিজেই চমকে উঠল সায়ন্তন। এ সব সে কী বলছে!

তুই তবে ধরে নিয়েছিস আমি বাঁচব না?

প্লিজ, সিস্টার! আমি জোক করছিলাম

দীপ্তি বলল, কেমন অবিশ্বাস্য লাগছে! এই যে এতগুলো বছর বাঁচলাম। মনে হয় না এই তো সেদিন…

তুই আরও অনেকদিন বাঁচবি।

আমি মরতে ভয় পাই না, দাদা। ভয় পাই অর্কের ভালোবাসাকে।

কেন?

আমার জন্য ধর্মত্যাগ করতে চাইছে।

তুই ধর্মত্যাগ করতে পারবি না? সায়ন্তন জিগ্যেস করে।

না। কঠোর গলায় বলল দীপ্তি।

কেন? আমাদের ধর্মে কী আছে ?

জেসাস আছেন। মা মেরি আছেন।

তুই দেখেছিস ওঁদের?

বিশ্বাস করতে গেলে কি দেখতে হয়? দীপ্তি বলল।

সারটেইনলি।

আমি যখন থাকব না, আমি যে ছিলাম তুই বিশ্বাস করবি কী করে?

সায়ন্তন চুপ করে রইল। দীপ্তি উত্তর দিল, ভালোবাসা থেকে।

সায়ন্তন জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখছিল। ছাদে উঠলে গঙ্গা দেখা যায়। রোদের সঙ্গে মেঘলা আকাশের রং মিশে রয়েছে। সংকীর্ণ গলি হলেও দুটো কৃষ্ণচুড়ো, রাধাচুড়ো গাছ রয়েছে। বাড়ির ছাদ নিশ্চয় রাধাচুড়োয় ভর্তি হয়ে রয়েছে। গোমেজ সাহেব অর্থাৎ দীপ্তির বাবা ব্যাঙ্গালোরে থাকেন। দীপ্তিকে তিনি ওখানে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ও যায়নি। ওর মা নাকি প্রায় স্বপ্নে আসে। সবুজ শাড়ি—মৃত্যুর সময় যা ওঁর পরনে ছিল। দীপ্তি বলে মাঝরাতে সেতারের শব্দ শুনতে পায়। দেখা যায় না কাউকে, কিন্তু শুনতে পাওয়া যায় রাগ চণ্ডকোষ। মা প্রায় দীপ্তিকে ডাকে, চলে আয়। দীপ্তিও যেতে চায়, কিন্তু তখনই স্বপ্ন ভেঙে যায়। যন্ত্রণা বাড়ে। অর্কদীপ্ত আর না এলে দীপ্তি আরো অসহায় হয়ে যাবে। খোঁজখবর নেওয়ার কেউ থাকবে না। কেমোর সময় বরাবরই অর্কদীপ্ত ছিল। অর্কদীপ্ত খুব একরোখা ছেলে, আবার মুডিও, ভালোবাসা যাবে না কিন্তু নিশ্চয় তীব্র অভিমান হবে। গোমেজ সাহেব বিয়ে করেছেন। দীপ্তির প্রতি তাঁর টান খুব কম। টাকা-পয়সা পাঠান এইটুকু।

সায়ন্তন বলল, ছাদে যাবি, বোন?

দীপ্তি আয়নায় নিজেকে দেখল। সত্যিই চেনা যায় না ওকে। একদম শ্যাওড়া গাছের পেত্নী। প্রায় সব চুল উঠে গেছে। মুখে কালো ছোপ। পাশের বাড়ির মানুষজন দেখলে ভয় পেয়ে যাবে। ভাববে ডাইনি। উইচ। যেতে পারি যদি

কী, যদি?, সায়ন্তন কৌতূহলের সঙ্গে বলল।

তোকে গান গাইতে হবে।

আচ্ছা গাইব।

তারপর তারা দুজনে মিলে ছাদে উঠল। ফাদার দেখে হাত নাড়লেন। গির্জার ঘড়িতে সকাল সাতটার ঘণ্টা বাজল। দীপ্তি বলল, দাদা, বসন্ত বোধ হয় ফুরিয়ে এল, না-রে?

সায়ন্তন গাইতে শুরু করল, মরি হায়, চলে যায় বসন্তের দিন চলে যায়

অর্কদীপ্ত সবার অলক্ষে কখন ছাদের ওপর উঠে এসেছে। দীপ্তি কাঁদছিল। একটা আরামকেদারায় আধশোয়া অবস্থায় চোখ বুজে গাইছিল সায়ন্তন। একসময় গান শেষ হলে দুজনেই দেখল অর্কদীপ্তকে। হাতে সিঙারা আরা জিলিপি, মুখে মৃদু হাসি। চোখের জল মুছে দীপ্তি দৌড়ে গিয়ে অর্ককে জড়িয়ে ধরল। তবে মুহূর্তের জন্য।

সায়ন্তন বলল, আমি দেখিনি, দীপ্তি।

রোদের তাত বাড়ছে দেখে ওরা তিনজনে নীচে নেমে এল।

অর্কদীপ্ত বলল, হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করছি না। এবার তুমি খুশি তো?

দীপ্তির ছলছল ভাব কাটেনি সে বলল, আমার জন্য তুমি সমাজ, ধর্ম না হয় ছাড়লে, কিন্তু মা-বাবা! সমাজ, ধর্ম অনেক অ্যাবস্ট্রাক্ট কনসেপ্ট। তাকে নানাভাবে ডিফাইন করা যায়। কিন্তু মা-বাবা—ওঁদের তো বিকল্প হয় না।

আমরা যদি সকলে মিলে বৈষ্ণব হই, কেমন হয়!

সায়ন্তন হাসিতে ফেটে পড়ল। দীপ্তিও হাসছিল। অনেকদিন পর তারা সকলে মিলে খুব হাসছিল।

এবারের মতো বসন্তের দিনগুলি শেষ হয়ে গেল। দীপ্তি জানে, হয়তো এ তার শেষ বসন্ত দেখা। আর যারা থাকবে দুজনেই খুব প্রিয় দীপ্তির—সায়ন্তন আর অর্কদীপ্ত। তারা যেন অনেক অনেক দিন ধরে, বছর ধরে মধুমাসকে উপভোগ করতে পারে।

 

স্মৃতিলেখা, অনুজ, ক্যাপ্টেন মুরাদ মৌনিবাবার আশ্রম থেকে বেরিয়ে সাগর-দ্বীপের মেলা অফিসের দিকে যাচ্ছিল। পথে ওরা দেখল বাস্তুকার সুব্রতবাবু মাঠের মধ্যে বসে রয়েছেন।

ক্যাপটেন মুরাদই ডাকলেন, সুব্রতবাবু বাড়ি যাননি?

সুব্রতবাবু হঠাৎ হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন।

কী হল!

এবার অনুজ এগিয়ে এলেন।

স্যার, সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে!

কেন?

পা দুটো বাড়িয়ে দিয়ে সুব্রতবাবু দেখালেন তাঁর কোনো জুতো নেই। হাওয়াই চপ্পল ছিঁড়ে শতচ্ছিন্ন দশা।

আমায় একজোড়া জুতো কিনে দেবেন, স্যার?

স্মৃতিলেখা বলল, সে আর এমন কি শক্ত কাজ! আপনি চলুন আমাদের সঙ্গে। কিনে দিচ্ছি।

সুব্রতবাবু জিভ বের করলেন, ছি, ছি! আপনি যে আছেন, একদম খেয়াল করিনি, ম্যাডাম। এখনই আমার জুতো লাগবে না।

ক্যাপটেন মুরাদ বললেন, এই তো সুব্রতদা লজ্জা পেয়ে গেলেন।

অনুজ বলল, এই কারণে আপনার দুঃখ হয়েছে?

না, স্যার, আরও অনেক কারণ রয়েছে।

এখন বেশ লাগছে। দিনের আলো নিভে আসতে কপিলমুনির মন্দিরের আলোগুলি জ্বালানো হয়েছে। মেলায় ভজন বাজছে তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের আয়োজনে। অবিশ্বাসীর মনেও সামান্য ভক্তিরস জাগছে। সাগরের ফুরফুরে দখিনা হাওয়া অনাগত বসন্ত ঋতুকে জানান দিচ্ছে। এখানে এলে সময় বোঝা যায় না। মনে হয় যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটাই ঋতু বারোমাস এখানে খেলা করে । তার নাম বসন্ত ঋতু।

কী কারণ?, স্মৃতিলেখা জিগ্যেস করল।

ম্যাডাম, আমার মা খুব কাঁদছিলেন।

চমকে উঠল স্মৃতিলেখা।

কাল রাতে একটা প্যাঁচাকে আশ্রয় দিয়েছিল মা। মিষ্টি সুন্দর। সাদা ধবধব করছিল করছিল কাক-জ্যোৎস্নায়।

অনুজ চুপ করে রয়েছেন।

স্যার, আপনাকে আমি ফোন করতাম।একটু পরেই।

ইশারায় অনুজ জিগ্যেস করলেন, কারণ?

ভোরবেলা প্যাঁচাটা উড়ে গেছিল। তারপর এক জান্তব দৃশ্য।

তিনজনেই অপেক্ষা করে রয়েছেন সুব্রতবাবুর পরবর্তী অংশ শোনার জন্য।

আকাশ জুড়ে শুধু কালো কালো কাক। গাছে গাছে ঘুঘু, বাদুড়, কোকিলপ্যাঁচাটাকে উদ্ধার করলেন আমার মা। মায়েরও রক্তাক্ত অবস্থা। আমি অবশ্য মাকে ফাস্ট এইড দিয়েছি, কিন্তু প্যাঁচাটাকে রক্ষা করতে পারলাম কিনা জানি না।

অনুজ জিগ্যেস করলেন, সে এখন কোথায়?

মঙ্গলদ্বীপে। ফরেস্ট আর পুলিশ যৌথভাবে তাকে নিয়ে গেছে। জানি না বেঁচে আছে কিনা।

সুব্রতবাবুকে দেখে মনে হল অনুজের মেলা শুধু পুণ্যার্থী বা অভিযাত্রীদের নয়। সরকারি স্তরের আধিকারিকদের কারণেও একটা অহর্নিশ প্রবাহ চলেছে মানুষের জীবনকে ঘিরে আর সকলেই কমবেশি অভিযাত্রী। রেফারির হুইসেল বাজলেই খেলা শেষ। সুব্রতবাবুকে পিছনে রেখে এগিয়ে যেতেই দেখা গেল মেলা অফিসে আড্ডা বেশ জমে গেছে।

 

আমার জন্য মাল আনতে পারবি, কুসুম? দেশি হলেই চলবে। ঘুম থেকে উঠেই বলল গোবিন্দ।

ভাত খাবা তো?

তুই খা-গা। আমারে দু-পাত্তর দেশি আইন্যা দে।

কুসুম কঠোর গলায় বললপারুম না!

গোবিন্দ গর্জে উঠল, খানকি মাগি! তা পারবা ক্যান!

খিস্তি দিবা না কইতাছি! এবার কুসুমও গর্জে ওঠে।

গোবিন্দ আসুরিক শক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। এক হাতে কুসুমের চুলের মুঠি ধরে হিড় হিড় করে কাছে টেনে আনে, আইন্যা দিবি না মাগি? আমি তোর ভাতার কইতাছি!

কুসুম মুখ ভেংচায়বাড়ি বাড়ি কাম কইরা তুমার চিকিৎসা চালাইতেছি। মদ খাইয়া শরীরডারে বিষে জর্জরিত করছ। ভালা হইতাছিলা, এই খানকি মাগি তুমারে খাওইতাছে।

তুর খুবই গুমোর হইছে, মাগি! প্রবল শক্তি অর্জন করে গোবিন্দ কুসুমের পেটে লাথি মারে। ছিটকে যায় কুসুম। গোবিন্দ আবার চুলের মুঠি ধরে। তারপর খোঁচা বেরিয়ে থাকা বাঁশের খুঁটিতে ওর মাথাটা ঠুকে দেয়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয় কুসুমের মাথা থেকে। সে টাল খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। প্রবল আক্রোশে গোবিন্দ তার বুকে, পিঠে লাথি মারতে থাকে। একসময় সংজ্ঞা হারায় কুসুম। খড় বিছানো অস্থায়ী তাঁবুর ভূমি কুসুমের রক্তে লাল হয়ে ওঠে।

গোবিন্দ দাশ কুসুমকে ফেলে রেখে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। তার আগে কুসুমের আঁচলের গিঁট থেকে দশ টাকা খুলে নেয়। অচৈতন্য অবস্থায় কুসুমের বোধ হয় জ্বর এল। সে স্বপ্ন দেখল, গোবিন্দ দাশ মারা গেছে। পরনে তার খয়েরি রঙের জামা। আশ্চর্য, গোবিন্দ মরে গিয়েও চতুর্দোলায় উঠতে চাইছিল না। চারজন ষণ্ডামার্কা লোক ওকে জোর করে খাটিয়াতে শুইয়ে দিল। লোকগুলো একরকম দৌড়োচ্ছিল। বল হরি, হরি বোল! কুসুম খই ছড়াতে ছড়াতে ছুটছিল। গোবিন্দ দাশ মাঝেমধ্যে খাটিয়া থেকে সামান্য উঠে চোখে ওর যাবতীয় অারক্তভাব এনে কুসুমকে দেখে। আর তখনই কুসুমের বুকের রক্ত জল হয়ে যায়। কুসুমের চোখে মুখে জল ছেটানো হচ্ছে। বিশ্বজিৎ বাউল ওকে সাগরদ্বীপের অস্থায়ী হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। কুসুমের একটু একটু করে জ্ঞান ফিরছে। ডক্টর সায়ন দাশ মুখের উপর ঝুঁকে বললেন, মা, আপনার এখনও কষ্ট হচ্ছে?

কুসুম অস্ফুট স্বরে বলে, খুব তেষ্টা, জল খাবো।

ডক্টর সায়ন দাশ নার্স তমালিকাকে জল দিতে বলেন। কোমল হাতে ওর মাথাটা একটু তুলে নিয়ে তমালিকা কুসুমকে জল দিতে থাকে। প্রথমে কষ্ট হয় জল গিলতে, তারপর ধীরে ধীরে সে জলপান করতে থাকে। খুব আরাম হয়। তমালিকা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে কুসুমের চোখে জল চলে আসে। অনেক সময় তার স্বামীও এরকমভাবে মাথায় হাত বুলিয়ে দিত, আরাম হত ওর খুব। ডক্টর সায়ন দাশ তমালিকাকে ফলের রস দিতে বললেন। তমালিকা খাইয়ে দিচ্ছিল কিন্তু কুসুম উঠে বসল। বলল, না দিদি, আমি সুস্থ হয়ে গেছি, নিজেই খেতে পারব।

উঠে বসতে গিয়ে কুসুম টের পেল মাথাটা আবার ঘুরে গেল। সে এখনও হয়তো হাঁটতে পারবে না। জোর করে হাঁটতে গেলে টাল খেয়ে পড়ে যেতে পারে। এবার তার স্বামী গোবিন্দের কথা মনে পড়ল। মদের জন্য সে কুসুমকে বেদম মেরেছিল। সে এখন কোথায়? অসুস্থ মানুষ । সত্যিকারের দেশি মদ খালি পেটে খেয়ে নিলে আর বাঁচবে না।

ডক্টর সায়ন দাশ ইশারায় বিশ্বজিৎ বাউলকে বাইরে যেতে বললেন। তমালিকা ছাড়া কুসুমের বেডের কাছে এখন কেউ নেই। ডক্টর বললেন, মা, তোমার অসম্ভব ক্ষতি হয়ে গেছে।

কুসুম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

তোমার পেটে একটা বাচ্চা ছিল। অবশ্য তিন মাসের বেশি বয়স হয়নি। রক্তক্ষরণে নষ্ট হয়ে গেছে।

কয়েক মাস ধরে মাথায় খুব চক্কর দিচ্ছিল। গা গোলাচ্ছিল, ঋতুস্রাবও হয়নি। সন্দেহটা ছিল কুসুমের। গোবিন্দকে বলেছে কয়েকবার, সে আমল দেয়নি। বরং অন্য সন্দেহ করেছে। সামান্য কাঁদল কুসুম। মাতৃত্ব তো খুব সহজ কথা নয়। যদিও তাদের মতো গরিব পরিবারে তৃতীয় সন্তান খুব কাঙ্ক্ষিত নয়।

(ক্রমশ…)

 
 
top