হাওয়ার সঙ্গে হাওয়া

 

হাওয়ার মধ্যেও কত গল্প ভেসে বেড়ায়। সেই গল্পগুলো পুরোনো স্মৃতির মতো হালকা ছোঁয়া দিয়েই আবার হাওয়া হয়ে যায়। শুধু নরম অনুভূতিটুকু জেগে থাকে। তখন বাসন্তী বলে একটা মেয়ে আর বসন্তকে আলাদা করতে পারি না। তো, সেবার এক বিশ্রী হাওয়া লেগে গিয়েছিল আমার। সামান্য ব্যাপার। প্রতিদিন যেমন বাজারে যাই সেভাবে সাইকেলে যাচ্ছি স্টেশন রোড বরাবর। হঠাৎ পাশ থেকে আমাকে ওভারটেক করে সামনে একটা ম্যাটাডোর এসে দাঁড়িয়ে গেল। ম্যাটাডোরে করে বাসি মড়া নিয়ে যাচ্ছে শ্মশানে, সম্মিলিত তীব্র হরিবোল, মুঠো মুঠো খই ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তায়। আমার সামনের যানবাহনগুলো এগোচ্ছে না। বোধহয় কিছুক্ষণের জ্যাম হয়েছিল। কিছুই না, ম্যাটাডোরটা একপ্রস্থ কালো ধোঁয়া ছাড়ল। আর একটা হাওয়া সেটা বয়ে এনে আমার সারা গায়ে মাখিয়ে দিয়ে চলে গেল। তারপর থেকে সবসময় এক অদ্ভুত অস্বস্তি। কেবল মনে হয় গায়ে একটা চ্যাটচ্যাটে কিছু একটা লেগে আছে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সাবান মেখে ভালো করে স্নান করলাম। কিছুক্ষণের তৃপ্তি। আবার আধ ঘণ্টা যেতে না-যেতেই সেই ত্বকের ওপর চ্যাটচ্যাটে ভাব। ত্বকে আঙুল দিলে গ্রীষ্মকালে যেমন একটা তেলতেলে ভাব লাগে, তেমন। বারবার বেসিনে গিয়ে হাত ধুই। এক-দেড় ঘণ্টা অন্তর অন্তর। প্রথমে একটা জলবাই টাইপের ব্যামো, ক্রমে ক্রমে আর পাঁচটা আচরণের মতো এর সঙ্গে একটা নিজস্ব দর্শন যোগ হতে থাকল। তখন মনে হত আমার গায়ে সেই জন্মের প্রথম দিন থেকে কতরকমের নোংরা লেগে চলেছে। একবার করে হাত-পা-মুখ ধুতাম আর ভাবতাম এই ধুয়ে ফেললাম এই সংস্কার, এই ধুয়ে ফেললাম এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব, এই ধুয়ে ফেললাম আমাকে জোর করে শেখানো ভালো-মন্দগুলোকে।

এরপর নিজেকে তোয়ালেতে মুছে নিয়ে ফিরে আসার পর মনে হত, যাঃ, আবার লেগে গেল। এই তোয়ালেতেই তো লেগে আছে, তা থেকে আমার গায়ে ফিরে ফিরে লেগে যাচ্ছে। তখন আমি নিজেকে ধুচ্ছি আর পালাতে চাইছি যাতে আমার গায়ে আর ওসব না লাগতে পারে। ফলে কিছু দিয়েই আর মুছতে পারতাম না নিজেকে। জল গায়ে শুকিয়ে, আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে আস্তে আস্তে দাদ, হাজা জন্মাতে লাগল। বাড়ির লোকে মিলে আমাকে এক সাইকায়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেল। তিনি সব শুনে জল বেশি বেশি নষ্ট করার উপায় থাকবে না, এমন কোনো জায়গায় চেঞ্জে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন।

 

সেই বসন্তে আমরা গেলাম সিমলায়। বেশ ঠান্ডা জায়গা। প্লাস জলের প্রাচুর্য নেই। কিছুটা কম করেই জল ব্যবহার করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু মনে একটা খুঁতখুঁত ভাব রয়েই যেত।

এক রোববার দেখে ডালহৌসি গেলাম। পাহাড়ের ধ্যানস্থ ভাব আর নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের মধ্যে আমার আলাপ হল মিস বাসন্তী হুইয়ের সঙ্গে। ধিঙ্গি মেয়ে, একলা স্বাধীনভাবে বেড়াতে এসেছে। প্রাথমিক দূরত্ব পার করে আলাপ থেকে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকে ছুঁয়ে দেখা। একদিন হোটেলে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে মিস হুই আমার ব্যামোর সবটা শুনে বলল, এ তুচ্ছ ব্যাপার! এরপর সে আমার হাতটা মুখের সামনে তুলে ধরে, তাতে ফুঁ দিল। ঠিক যেমনটা আমরা পার্কের বেঞ্চে বসার সময় ফুঁ দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করে নিই। আমি অনুভব করলাম যেন আমার ত্বকের ওপর থেকে একটা আস্তরণ সেভাবেই সরে গিয়ে, বিশুদ্ধ, নগ্ন, কোমল চামড়াটা পরিবেশে খুলে গেল। আমি নিজেকে আরও, আরও মুক্ত করে মেলে ধরলাম। মিস হুই আমার সারা শরীরে শিশুকাল থেকে যা যা লেগে গিয়েছিল, ফুঁ দিয়ে পরিষ্কার করে চলেছিল। পায়ে, হাতে, বুকে, থুতনিতে, চোখের পাতায় ফুঁ দিতে দিতে মিস হুই বলেছিল, তুমি অকারণেই চিটেল ময়লা ভাবছিলে, এ সবই তো সারফেস ডাস্ট।

কেবল ঠোঁটের ওপর সে জিভটা দিয়ে চাটলে আমি আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলাম, ও কী করছ! ময়লাটা বিষাক্ত হবে!

বাসন্তী নিজের ঠোঁটের ওপর জিভ বুলিয়ে চেটে বসন্তের বাতাসের মতো মৃদু হেসে বলেছিল, ভালোবাসায় সব হজম হয়ে যায়।

 
 
top