সমাজ এবং সমকামিতা

 

হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের অদৃশ্যমান প্রবল আকর্ষণই দুটি মানুষের মধ্যে প্রেমের বীজ বপন করে আর এই প্রেমের বৃক্ষ মহীরুহে রূপান্তরিত হলে বিবাহের মাধ্যমে তা সামাজিক বৈধতা অর্জন করে। কিন্তু প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি শুধুমাত্র বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে প্রেমকেই সাদর সম্ভাষণ জানায়। সমলিঙ্গের মধ্যে প্রেম ও বিবাহ যেহেতু প্রকৃতিবিরুদ্ধ (ভারতীয় পেনাল কোডের ৩৭৭ নং ধারা অনুযায়ী), কারণ এই সম্পর্ক ধরিত্রীতে নতুন প্রাণ আনতে অসমর্থ,  সমকামিতা ও সমলিঙ্গের মধ্যে বিবাহ তাই সমাজের স্বীকৃতির  বাইরেই থেকে যায়।

মন স্বাধীন। কোনও বাহ্যিক নিয়মকানুন দেহকে কাঁটাতারের জালে আবদ্ধ করতে সমর্থ হলেও মনকে এই জালের বাঁধনে আটকে রাখা অসম্ভব। মন আত্মসমর্থন করে স্বেছায়। তাই কিছু ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে, সমকামিতা আইনি স্বীকৃতিলাভ করলেও সাধারণ মানুষের মন উদারভাবে এই বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে অসমর্থ হয়েছে। অন্তরের অন্তঃস্থলে পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে তথাকথিত ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ’ সম্পর্কের প্রতি চরম ঘৃণা এবং ক্ষোভ। এই সম্পর্ক কতটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ, কতটাই বা – ধর্মগুরুরা যেমন আমাদের বলেন –  উত্তরাধুনিক বিকৃতি, আসুন, একবার যাচাই করে নেওয়া যাক। 

 

ব্যুৎপত্তিগতভাবে হোমোসেক্সুয়্যাল শব্দটি লাতিন এবং গ্রিক শব্দের সংম্রিশন প্রাচীন গ্রিক শব্দ হোমোজ-এর অর্থ হল সেম এবং ল্যাটিন সেক্সাস এর অর্থ সেক্স উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ‘হোমোসেক্সুয়্যাল’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন কারোলি মারিয়া বেনকার্ট নামে এক জার্মান মনোবিদ সমকামিতা হল সম লিঙ্গের দু-জন মানুষের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক এবং তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক গড়ে ওঠা পৃথিবীব্যাপী সমকামীরা এলজিবিটি (লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়্যাল অ্যান্ড ট্রান্সজেন্ডার) গ্রুপ হিসাবে পরিচিতএই এলজিবিটি সম্প্রদায়ের নামের প্রথম অক্ষর এল বলতে লেসবিয়ানদের বোঝানো হয়েছে। লেসবিয়ান বলতে সেই মহিলাকে বোঝানো হয় যিনি তাঁর সমলিঙ্গের কোনো নারীর সঙ্গে যৌনসংগমে আকৃষ্ট হন। দ্বিতীয় অক্ষর জি, গে শব্দটির প্রথম অক্ষর। পুরুষের সঙ্গে যৌনসংসর্গে লিপ্ত হওয়ার বাসনা যে সমস্ত পুরুষ হৃদয়ে লালন করেন, তাঁরাই সমাজে     গে নামে পরিচিত। বি অক্ষরটি  দিয়ে বোঝানো হয় বাইসেক্সুয়্যাল, যাঁরা নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন অথবা জীববিদ্যার ভাষায় বাইসেক্সুয়্যাল হল সেই ব্যক্তি যিনি নারী ও পুরুষ উভয়ের বৈশিষ্ট্য বহন করেন। ট্রান্সজেন্ডার শব্দটির আদ্য অক্ষর টি এই সম্প্রদায়ের নামের শেষ অক্ষর। ট্রান্সজেন্ডার বলতে সেইসমস্ত মানুষদের বোঝানো হয়েছে যাঁরা লিঙ্গের ভিত্তিতে সমাজে তাঁদের পরিচয়ে মর্মাহত এবং তাঁরা লিঙ্গ বৈষম্যের ঊর্দ্ধে যেকোনো লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে যৌনসঙ্গমে বিশ্বাসী।

যে সমকামিতা বর্তমানে নানা তর্ক-বিতর্ক-চর্চার কেন্দ্রবিন্দু, তা কিন্তু প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচলিত ছিলগ্রিসে সমকামিতা বিশেষ সমাদর পেত এই দেশের অধিবাসীরা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক স্বাভাবিক বলে মনে করতেনবয়ঃসন্ধিতে (‘পাবার্টি’) প্রবেশ করার পর ছেলেদের সঙ্গে বয়স্ক পুরুষের সম্পর্ককে গ্রিকরা স্বাভাবিক বলেই মনে করত গ্রিক কবিতা এবং শিল্পে এই সম্পর্ক বার বার প্রতিফলিত হয়েছেপ্রাচীন গ্রিসে সমকামিতা শুধু গ্রহণযোগ্যই ছিল না, এমনকী তা উদযাপনও করা হত  পৃথিবীতে প্রথম গণতন্ত্রের প্রবর্তন করেন গ্রিকরাই এবং যে দুই গ্রিক পুরুষ এই  কৃতিত্বের দাবিদার তাঁরা হলেন হারমোডিয়স এবং অ্যারিসটোগিটন এঁরা দুজনেই সমকামী ছিলেন পুরুষদের মধ্যে পৌরুষ এবং সাহস বৃদ্ধির জন্য গ্রিসে পুরুষ-সমকামিতাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিলপ্রাচীন রোমে  ক্রীতদাস অথবা মুক্ত যুবকের  সঙ্গে বয়স্ক নাগরিকদের যৌনসংগমের প্রথা প্রচলিত ছিলএকমাত্র ক্লডিয়াস ছাড়া  রোমের আর সব সম্রাটের পুরুষসঙ্গী ছিল

নবজাগরণের সময় উত্তর ইতালির সমৃদ্ধ শহরগুলিতে - ফ্লোরেন্স ও ভেনিসে - সমপ্রেমের উদাহরণ মেলেগুয়েন ব্রুড এবং সারা গ্রিন বিভিন্ন জাতির মধ্যে সমকামিতা নিয়ে একটি সমীক্ষা করেন ১৯৭৬ সালে তাঁরা তাদের সমীক্ষার ফল নথিভুক্ত করেন তাঁদের বই, স্টান্ডার্ড ক্রস কালচার স্যাম্পেল -এতাঁরা ৪২টি সম্প্রদায়ের মধ্যে সমীক্ষা করে দেখেন ৯টি সম্প্রদায়ের মধ্যে সমকামিতা হয় গৃহীত ছিল অথবা তারা তাতে আদৌ গুরুত্ব আরোপ করত না; ৫টি সম্প্রদায়ে এইরকম কোনো সম্পর্কের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি; ১১টি সম্প্রদায় এটিকে মান্যতা প্রদান না করলেও এর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি এবং ১৭টি সম্প্রদায় এটিকে নিষিদ্ধ এবং শাস্তিমূলক সম্পর্ক হিসেবে গণ্য করেছিল

সাহিত্য সমাজের দর্পণ। সমাজের ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি সাহিত্যের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। ভারতীয় সাহিত্যও এর ব্যতিক্রম নয়।  প্রাচীন ভারতববর্ষের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল কামসূত্রএই গ্রন্থে লেখক বাৎসায়ন যৌনসংগমের বিভিন্ন কলা ও পদ্ধতিকে তুলে ধরেছিলেন। সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রাচীন এই গ্রন্থে একদল পুরুষের উল্লেখ রয়েছে যাঁরা সমকামী ছিলেন। বর্তমানে ভারতবর্ষে যারা ‘হিজরা’ নামে পরিচিত, তাদের উল্লেখও রয়েছে এই গ্রন্থে। কামসূত্র-য় এদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হিজরারা নিজেদের মহিলা হিসাবে গণ্য করায় তাদের সঙ্গে সম্ভোগে লিপ্ত কোনও পুরুষকে সমকামী হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এ সমকামিতার উল্লেখ রয়েছে। প্লেটো তাঁর গ্রন্থ সিম্পোজিয়াম-সমকামিতাকে গণতন্ত্রের মতো গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরেন রাজস্থানের লোককাহিনিতে তীজা ও বীজার গল্প ভীষণভাবে জনপ্রিয়। তীজা ও বীজা তাদের নিজের নিজের  বাবার অনুমতি নিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বীজাকে ছেলে হিসাবে প্রতিপালন করা হয়েছিল এবং তীজার সঙ্গে তার বিয়ে হয় একজন পুরুষ হিসেবেই। তীজা মেয়েদের পোশাক পড়তে গেলে গ্রামবাসীরা তাদের তাড়া করে তারা উদার ভূতের কাছে প্রার্থনা করে এবং বীজা ভূতের আশিসে বলিষ্ঠ এক পুরুষে রূপান্তরিত হয় কিন্তু তীজা তার নতুন স্বামীর একাধিপত্য অস্বীকার করে এবং পালিয়ে যায় গল্পের শেষে দেখা যায় তীজা ও বীজা গ্রামবাসীদের থেকে অনেক দূরে জঙ্গলে ভূতেদের সঙ্গে বসবাস করতে থাকেলোককাহিনির মোড়কে এই গল্পটি আসলে প্রতিকূল সমাজে দুটি মেয়ের সমপ্রেমের কাহিনিকেই ব্যক্ত করে বিশিষ্ট ভারতীয় সাহিত্যিক বিক্রম শেঠ বেশ কিছু বছর আগে একটি কবিতা রচনা করেছিলেন যার নাম ছিল ডুবিয়াস সেই কবিতার লাইনগুলি -  সাম মেন লাইক জ্যাক/ অ্যান্ড সাম লাইক জিল;/ আই অ্যাম গ্ল্যাড আই লাইক দেম বোথ; বাট স্টিল…/ ইন দিস স্ট্রিক্ট র‍্যাঙ্কস/ অব গে অ্যান্ড স্ট্রেইট/ হোয়াট ইজ মাই স্টেটাস?/ স্ট্রে? অর গ্রেট? - যে পরবর্তীকালের সমকামীদের হৃদয়ের বার্তা বহন করবে, তা হয়তো রচনাকালে কবি উপলব্ধি করতে পারেননি বিজয় তেন্ডুলকরের মারাঠি নাটক মিত্রাচি গোশটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল বিগত শতাব্দীর আটের দশকে এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল একজন লেসবিয়ান হতাশার দ্বারা তাড়িত হয়ে অবশেষে এই কেন্দ্রীয় চরিত্রটি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় বিক্রম শেঠের দ্য গোল্ডেন গেট-এও সমকামিতা স্থান পেয়েছে মহেশ দত্তানির বিখ্যাত নাটক ব্রেভলি ফট দ্য ক্যুইন-এ একজন বিবাহিত পুরুষের সমকামী হওয়ার ঘটনা দেখানো হয়েছে ২০০৩ সালে প্রকাশিত  রাজা রাও-এর উপন্যাস দ্য বয়ফ্রেন্ড ভারতীয় সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলআরও অনেক লেখক যেমন নীল মুখার্জী (অা লাইফ অ্যাপার্ট) এবং রাহুল মেহতা (কোয়ারেনটাইন) সমকামীদের সমস্যা তাঁদের লেখায় তুলে ধরেছেন ২০০৫ সালে বিন্দুমাধব খিরের প্রকাশিত বই পার্টনার-এ পুনের মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে সমকামিতার বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ২০১০ সালে প্রকাশিত লিভিং ইন্ডিয়া : মাই ফ্যামিলিজ জার্নি ফ্রম ফাইভ ভিলেজেস টু ফাইভ কন্টিনেন্টস বইতে লেখক মৃণাল হজরতওয়ালা লিখেছেন: আই হ্যাভ কাম টু আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট ক্যুইয়্যারনেস ইজ অা মাইগ্রেশন অ্যাজ মোমেন্টাস অ্যাজ এনি আদার, অা জার্নি ফ্রম ওয়ান ওয়র্ল্ড টু দ্য নেক্সট,….আই অ্যাম দ্য ওনলি লেসবিয়ান অ্যান্ড ওনলি রাইটার, ইন দ্য রেকর্ডেড হিস্টরি অব আওয়ার ক্ল্যান ফেমিনিস্ট এবং গে লিবারেশন আন্দোলনের বহু আগে বইয়ের প্রছদে উত্তেজক চিত্রের সঙ্গে স্ট্রেঞ্জ অথবা টোয়াইলাইটজাতীয় শব্দ থাকলে মহিলারা অতি সহজেই বুঝে নিতে পারতেন বইটির বিষয়বস্তু হল মহিলাদের মধ্যে সমকামিতা এবং তখন তাঁরা সেই বইটি পড়তে মরিয়া হতেন ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে চাং সাঙ প্রেশাস মিরর ফর রাঙ্কিং ফ্লাওয়ার্স নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন এই উপন্যাসটিকেই চিনের প্রথম সমকামী উপন্যাস হিসেবে ধরা হয় শেক্সপিয়র তাঁর ১৫৪ টি সনেটের মধ্যে ১-১২৬ নং সনেট মিস্টার ডব্লু. এইচ. নামে একজন পুরুষ বন্ধুর উদ্দেশে রচনা করেছিলেন ক্রিস্টোফার মার্লো তাঁর বিখ্যাত নাটক এডোয়ার্ড দ্য সেকেন্ড-এ রাজা দ্বিতীয় এডোয়ার্ডের সঙ্গে গেভস্টনের সমকামী সম্পর্ক দেখিয়েছিলেন

প্রত্নতত্তবিদ . অ্যান্দ্রিয়াস ভ্লাফোপুলস পৃথিবীর প্রাচীনতম দেওয়ালচিত্র (গ্রাফিত্তি) আবিষ্কার করেছিলেন  গ্রিসেআস্তিপালেয়া দ্বীপে সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে এই দেওয়ালচিত্রগুলি আঁকা হয়েছিল বেশ কয়েকটি ছবিতে  সমকামী যৌনমিলনের  বিভিন্ন ভঙ্গি দৃশ্যমান। খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০  অব্দে নির্মিত মিশরের একটি সমাধি আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে এই সমাধিটি ছিল নিয়ঙ্খুনম এবং নুমহোটেপ-এর তাঁরা রাজার রাজসভায় হস্তপ্রসাধন শিল্পী হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন তাঁদের সমাধির ওপর আঁকা শিল্পকর্মে দুজন পুরুষকে দেখা যায় পরস্পরকে আলিঙ্গন ও চুম্বনরত অবস্থায় ২২-৩৭ খ্রিস্টাব্দে রোমে ‘স্পিনত্রিয়া’ নামে এক প্রাচীন মুদ্রা প্রচলিত ছিল এই মুদ্রায় যৌনসংগমে লিপ্ত দুজন পুরুষ সমকামীর চিত্র পাওয়া যায়স্পিনত্রিয়া ছিল ব্রোঞ্জ অথবা পিতলের ছোটো মুদ্রা যাতে কামোত্তেজক ছবি থাকত এবং  যৌনকর্মীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার কাজে এই মুদ্রাকে ব্যবহার করা হত ২০০৫ সালে সোয়েবিয়ান আল্পসের বিখ্যাত হুলে ফেলজ গুহাতে ৮ ইঞ্চির একটি পাথরের বস্তু আবিস্কৃত হয়েছিল বিজ্ঞানীদের মতে, এটি ২৮,০০০ বছরের প্রাচীন এবং এটিকে বরফের যুগে সেক্স এইড হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে ৭৯ খ্রিস্টাব্দে রোমের পম্পেই শহর ভিসুভিয়াসের আকস্মিক অগ্ন্যুৎপাতে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় কিন্তু তার ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও আবিষ্কৃত হয়েছে বিভিন্ন কামোত্তেজক শিল্পকলা যখন এগুলি আবিষ্কৃত হয়, তখন  এগুলিকে অশ্লীল ভেবে  কিয়দংশে নষ্ট করে দেওয়া হয়। যা অক্ষত থাকে তাকে লুকিয়ে রাখা হয় নেপলসের জাতীয় মিউজিয়ামে প্রায় একশো বছর ধরে ২০০০ সালে প্রথম সেই শিল্পকার্যের প্রদর্শনী সর্বসাধারণের  জন্য  উন্মুক্ত করা হয়

মহিলা ও পুরুষের সমলিঙ্গের মধ্যে বিবাহ সমাজের চোখে প্রকৃতিবিরুদ্ধ, তাই অনেকসময় তারা কার্যত বাধ্য হয়েই  এই ফতোয়া মেনে নেন এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, দেবাদিদেব মহাদেব অর্ধনারীশ্বর হিসাবে পরিচত কারণ তিনি অর্ধ নারী এবং অর্ধ পুরুষ কবি কমলা দাস তাঁর কবিতা অ্যান ইন্ট্রোডাকশন-এর (১৯৬৫) মধ্য দিয়ে  সমাজে নারীর সমানাধিকারের প্রশ্ন তোলেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে কীভাবে নারীরা পুরুষদের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে এবং নারীসুলভ পোশাক পরতে ও আচার-আচরণ করতে বাধ্য হন, তা কমলা দাস তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন কোনও নারীর মধ্যে পুরুষসত্তা ও পুরুষের মধ্যে নারীসত্তার বহিঃপ্রকাশকে সমাজ কখনই মান্যতা দেয় না

ঋকবেদ-এ বলা আছে বিকৃতিঃ এবম্ প্রকৃতি অর্থাৎ যেটা অস্বাভাবিক মনে হছে সেটাও স্বাভাবিক  এপ্রিল ২০০১ সালে নেদারল্যান্ডসে সর্বপ্রথম সমকামীদের মধ্যে বিবাহকে আইনানুগ করা হয়েছিল। ২০১৫ সালের ২৬ জুন গোটা পৃথিবী এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সাক্ষী হয়ে রইল যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সমলিঙ্গ বিবাহে সরকারি শিলমোহর দিয়ে আইনি পথে সমকামীদের দীর্ঘদিনের দাবিকে স্বীকৃতি জানাল। উচ্ছ্বসিত রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা টু্ই্যট করে তার অনাবিল আনন্দ প্রকাশ করেন : সাম্যের ক্ষেত্রে আজকের সিদ্ধান্ত এক বিশাল পদক্ষেপ পুরুষ মহিলা সমকামীরা এখন অন্যদের মতোই বিয়ে করার অধিকার অর্জন করলেন জয় হল ভালবাসার 

সত্যি, এই আইনি মান্যতা ভালবাসার নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করল অদূর ভবিষ্যতে, আশা করা যায়, ভারতীয় পেনাল কোডের ৩৭৭ নং ধারার অবলুপ্তি ঘটবে এবং ভারতেও সমকামিতাকে আইনি বৈধতা প্রদান করা হবে কিন্তু ভারতীয় সমাজ এত সহজে তথাকথিত প্রকৃতিবিরুদ্ধ এই সম্পর্ককে মনের ছাড়পত্র দিতে সক্ষম হবে কি?  যেহেতু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, এমনকী ভারতবর্ষেও সু্প্রাচীনকাল থেকে এই সম্পর্কের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, সেহেতু আমরা আমাদের চিন্তনে এবং মননে সমকামীদের সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সমাজে কি ভালোবাসার প্রতিষ্ঠা করতে পারি না?

 
 
top