স্বেচ্ছামৃত্যুর হাতছানি

 

আমাকে মেরে ফেল। আর পারছি না। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সার্থকের বাবা পরিবারের লোকজনের কাছে এই কাতর প্রার্থনা করছিলেন। সার্থকের বাবা রমেন মজুমদার আর বেঁচে নেই। গত সপ্তাহে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি বেশ কিছু মাস ধরে দুরারোগ্য ক্যানসার রোগে ভুগছিলেন। মৃত্যুর আগের সপ্তাহ ছিল ভয়ঙ্কর। তাঁকে অসম্ভব যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল। এককথায় সে যন্ত্রণা সহ্যকারী ব্যক্তির করুণ অবস্থা যে কোনো শক্ত মনের মানুষের মনকেও ভারাক্রান্ত করে তুলবে। ডাক্তারবাবু তাঁকে দেখতে আসলেই তিনি ডাক্তারবাবুকে বলতেন, স্যার, আমাকে মেরে ফেলুন। আমাকে মুক্তি দিন। শুধু সার্থকের বাবা নন,ভারতের অসংখ্য মানুষ এইরকম দুরারোগ্য এবং অসহ্য যন্ত্রনাদায়াক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এই মানুষগুলো তো একটু শান্তিতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতেই চেয়েছিল, এইটুকু কি আমরা মৃত্যুপথগামী মানুষগুলিকে দিতে পারতাম বা পারি না? এই প্রশ্ন বহুল চর্চিত স্বেচ্ছামৃত্যুর বিতর্ককেই উস্কে দেয়।

আমাদের দেশে অর্থাৎ ভারতবর্শে বেঁচে থাকার অধিকার আইনত স্বীকৃত হলেও, স্বেচ্ছামৃত্যু কিন্তু এখনও আইনত অপরাধ। হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর সর্বত্রই স্বেচ্ছামৃত্যু অর্থাৎ ইউথানাজিয়া আইনত স্বীকৃত নয়। এখন জেনে নেওয়া যাক ইউথানাজিয়া শব্দটির অর্থ কি? গ্রিক শব্দ ইউথানাজিয়া-র ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল আরামাদায়ক মৃত্যুইউ শব্দের অর্থ হল ভালো এবং থানাটোস শব্দের অর্থ হল মৃত্যুকবির কথায় বললে—জন্মিলেই মরিতে হইবে। মৃত্যু অনিবার্য মৃত্যুর শীতল থাবা এই ব্রম্ভান্ডের সমস্ত জীবিত প্রাণকেই কোনও না কোনও সময় গ্রাস করবে। কিন্তু প্রতিটি জীব শান্তিতে মরতে চায়। এই চাওয়াটা কোনও অপরাধের নয়। এ প্রসঙ্গে ২০০৪ সালে মুক্তি প্রাপ্ত স্প্যানিশ ড্রামা ফিল্ম মার আদেন্ত্র, যার ইংরাজি শিরোনাম হল দ্য সি ইন্সাইড, উল্লেখ করা যেতে পারে। এই ফিল্মটিতে একজন স্প্যানিশ জেলে এবং লেখক রঁমো স্যামপেদ্রোর জীবনের করুণ কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। স্যামপেদ্রো একবার স্নান করতে গিয়ে কিছুটা উঁচু জায়গা থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তিনি সে জায়গায় জলের গভীরতা তিনি বুঝতে পারেননি এবং এই ভুলটাই তাঁর জীবন শেষ করে দিয়েছিলওই স্থানে জলের গভীরতা কম থাকায় তাঁর মাথা সরাসরি আঘাত করে সমুদ্রের তলদেশের শিলাতে। এর ফল সরূপ তিনি মাত্র ২৫ বছর বয়সে (২৩ শে আগস্ট, ১৯৬৮) ভয়ানক কোয়াড্রিফ্লেজিয়া (কোয়াড্রিফ্লেজিয়া একধরনের প্যারালিসিস যার ফলে দেহের অধিকাংশ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অথবা সমস্ত দেহ কার্যহিন হয়ে পড়ে।) রোগের স্বীকার হন। গলা থেকে দেহের বাকি অংশ প্যারালিসিস হয়ে যায়। এরপর তিনি স্বেচ্ছামৃত্যুর জন্য স্পেনের বিভিন্ন নিম্ন আদালত এবং উচ্চ আদালতে আবেদন করতে থাকেন। তাঁর সমস্ত শরীর অক্ষম হওয়ায় তিনি আত্মহত্যা করতেও পারছিলেন না। এই কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি স্বেচ্ছামৃত্যু চেয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ১২ই জানুয়ারি পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনার সাত বছর পর একটি স্প্যানিশ টক শোতে তাঁর এক বান্ধবী রামোনা মেইনরো স্বীকার করেন যে স্যামপেদ্রোকে পানীয়ের সাথে পটাসিয়াম সায়ানাইড খাইয়ে তিনিই তাঁকে মারা যেতে সাহায্য করেছিলেন। স্যামপেদ্রোর এই মৃত্যু স্বেচ্ছামৃত্যুর আইনি মান্যতা নিয়ে পৃথিবীব্যাপী এক বিতর্কের ঝড় ওঠে।

রোমান ঐতিহাসিক সুটনিয়াস তাঁর গ্রন্থ ডি ভিটা সিসারাম—ডিউভাস অগাস্টাস (ইংরাজি হল দ্য লাইভস অব সিজার—দ্য ডেফাইএড অগাস্টাস)–এ সম্রাট অগাস্টাস সিজারের মৃত্যু ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সর্বপ্রথম ইউথানাজিয়া শব্দটি করেন। থমাস মোরে ছিলেন প্রথম ক্রিস্টিয়ান যিনি  ইউথানাজিয়াকে তাঁর বই ইউটোপিয়া-তে সমর্থন করেছিলেন। তাঁর বইয়ের একটি অংশে তিনি লিখছেন, যদি কোনও ব্যক্তি কোন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় এবং সেটা থেকে আরোগ্য লাভ সম্ভব না হয়, তাহলে যাজক এবং অফিসিয়ালসদের সেই রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে এই কঠিন জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মৃত্যুর পথ বেছে নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। যেহেতু ইউটোপিয়া বইটি একটি ব্যাঙ্গধর্মী রচনা তাই এই প্রসঙ্গে এই বইটি উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা কতটা যুক্তিযুক্ত সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। 

 
 
top