সমাজ এবং সমকামিতা

 

প্রচলিত সামাজিক ধারণা অনুসারে, প্রকৃত ভালোবাসা সম্ভব একমাত্র দুটি বিপরীত লিঙ্গের মানুষের মধ্যেই। সেই ভালোবাসা শারীরিক সম্পর্কে উত্তরিত হলেও তা সমাজসিদ্ধ। কিন্তু ভালোবাসা কি সত্যিই লিঙ্গ অনুসরণ করে হয়? ভালোবাসা, আমরা জানি, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের নিঃস্বার্থ বন্ধন। সমলিঙ্গের মধ্যে প্রেমকে সমকামিতার ছাপ মেরে দেওয়া হয়। তথাকথিত এই সমকামী প্রেমিক বা প্রেমিকারা কি জন্মসূত্রেই সমকামী নাকি সমকামিতা কোনো শারীরিক বা মানসিক রোগ? নাকি তা সত্যি সত্যিই হৃদয়ের বন্ধন? বর্তমান প্রবন্ধে সমকামিতা সংক্রান্ত এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

মধ্যযুগের মাঝামাঝি সময়ের কিছুটা আগে অবধি সারা ইউরোপ জুড়ে খ্রিস্টান চার্চগুলি হয় সমকামিতাকে সহ্য করেছে অথবা এড়িয়ে গেছে। দ্বাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে সমকামিতার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা হয়েছিল এবং ধীরে ধীরে সেটি ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ সমস্ত প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েউনবিংশ শতাব্দীর বিদায়লগ্নে চিকিৎসাশাস্ত্রে  বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। যৌনতাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে ধর্ম এবং আইনের যুদ্ধ বেধে যায়।

জার্মান উকিল কার্ল হাইনরিক উলরিখসই (১৮২৫-১৮৯৫) হয়তো-বা প্রথম সমাজকর্মী, যিনি সমকামীদের নাগরিক অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। সমকামিতাকে অপরাধ হিসাবে গণ্যকারী প্রুশীয় আইন সে সময় জার্মানি গ্রহণ করেছিল। কার্ল এই আইনের বিরোধিতা করেন। ১৮৪৬ থেকে ১৮৭৯-র মধ্যে প্রকাশিত তাঁর একাধিক গ্রন্থে তিনি দেখান যে, সমকামী ভালোবাসা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত একটি জন্মগত বোধ/অবস্থা এবং সেজন্য একে কখনোই অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। হাঙ্গেরির লেখক এবং সাংবাদিক কার্ল মারিয়া কার্টবেনিও জার্মানির এই সমকামিতাবিরোধী আইনের প্রতিবাদ করেছিলেন। সমকামী আকর্ষণ সম্পূর্ণরূপে জন্মগত এবং সমস্ত সমকামী মানসিকভাবে মহিলাদের বৈশিষ্ট্য বহন করেএমনটা উলরিখস মনে করতেন নাউলরিখের গ্রন্থগুলি বিখ্যাত জার্মান ডাক্তার কার্ল ওয়েস্টফাল্ককে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। ১৮৬৯ সালে তিনি একটি প্রবন্ধ লেখেন। এতে তিনি মহিলাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পুরুষ সমকামী এবং পুরুষের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মহিলা সমকামীদের সম্পর্কে জ্ঞাতব্য কিছু তথ্যের উল্লেখ করেন। এই অবস্থাকে তিনি বিপরীত যৌন সংবেদনশীলতা হিসেবে আখ্যা দেন এবং এও দাবি করেন যে, এই আকর্ষণ জন্মগত।

কয়েকজন জার্মান ফরেনসিক লেখক ওয়েস্টফালের দ্বারা বিশেষ প্রভাবিত হন। এঁদের মধ্যে অন্যতম রিচার্ড ভন ক্রাফট এবিং। ১৮৮৬ সালে তিনি সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস উইদ স্পেশাল রেফারেন্স টু দি অ্যানটিপ্যাথিক সেক্সুয়াল ইন্সটিঙ্কট’: আ মেডিকো-ফরেন্সিক স্টাডি নামে একটি বই প্রকাশ করেন। ক্রাফট এবিং রোগবিদ্যায় বেশ কিছু নতুন শব্দ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেনযেমন, স্যাডিজম অর্থাৎ অন্যকে পীড়ন করে যৌনসুখলাভের মানসিক বিকার ও ম্যাসোকিজম অর্থাৎ নিজেকে যন্ত্রণা দিয়ে, আত্মনিগ্রহ করে বা অন্যের দ্বারা নিপীড়িত হয়ে আনন্দ পাওয়ার মানসিক বিকৃতি। ক্রাফট এবিং প্রথমদিকে সমকামিতাকে একটি বংশানুক্রমিক লক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে কিছু সমকামীদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি সমকামীদের সম্মাননীয় মানুষ হিসেবে স্বীকার করে নেন।

যৌনতত্ত্ববিদ হ্যাভলক এলিস, জন অ্যাডিংটন সাইমন্ডের সহযোগিতায় সেক্সুয়াল ইনভারশন নামে একটি বই লেখেন। এই গ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সেক্সুয়াল ইনভারশন শব্দবন্ধটি ইংরেজিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এলিস নিজে সমকামী না হলেও তাঁর স্ত্রী এডিথ লিস সমকামী ছিলেন। এলিসের মতে, সমকামিতা কোনো রোগ নয় বরং এটি যৌনতার একটি জন্মগত ভিন্ন রূপ।

সিগমুণ্ড ফ্রয়েডকে মনঃসমীক্ষণের জনক বলে মনে করা হয়। সমকামিতা সংক্রান্ত তাঁর মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়। ফ্রয়েডের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ থ্রি এসেজ অন দ্য থিয়োরি অব সেক্সুয়ালিটিএখানে তিনি যৌন তত্ত্বের অবতারণার সাথে সাথে সমকামিতার কারণ ও তাৎপর্য সম্পর্কেও নিজের অভিমত প্রকাশ করেছেন। মনঃসমীক্ষক কেনেথ লিইউস-এর মতে, সমকামিতার ওপর ফ্রয়েডের তত্ত্ব চারটি:

. সমকামিতার উৎপত্তি ইডিপাস কমপ্লেক্স (অর্থাৎ শৈশবে মায়ের প্রতি ছেলের বা বাবার প্রতি মেয়ের অবচেতন যৌন আকর্ষণ এবং তার ফলে বাবার বা মায়ের প্রতি ঈর্ষা) এবং পুত্রের কাছে তার মায়ের জননশক্তিহীনতার তথ্যের উদঘাটনের মধ্যে রয়েছে। এর ফলে ছেলেটি তার জননশক্তিহীন মায়ের থেকে দূরে সরে যায় এবং পুরুষ যৌনাঙ্গের অধিকারী মহিলার অর্থাৎ মহিলার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

. ভবিষ্যৎ সমকামী শিশুর সঙ্গে তার মায়ের অন্তরঙ্গতা এত বেশি থাকে যে, সে নিজেকে এবং মাকে অভিন্ন বলে মনে করে। সে নিজের মতোই ভালোবাসার জিনিস খুঁজতে থাকে যেগুলিকে সে তার মায়ের মতো ভালোবাসাতে পারে

. যদি নেগেটিভ ইডিপাস কমপ্লেক্স ঘটে তাহলে একটি ছেলে তার বাবার ভালোবাসা এবং পুরুষের পরিচয় খোঁজ করে এবং পায়ুকামী যৌনতা উপভোগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।

. অন্তঃক্রিয়ার গঠন থেকেও সমকামিতার প্রতি কেউ কেউ আকর্ষিত হতে পারে। ভাই, দাদা অথবা বাবার নিষ্ঠুরতাপূর্ণ ঈর্ষা একজন পুরুষের মধ্যে অন্যান্য পুরুষের প্রতি ভালোবাসার জন্ম দিতে পারে।

ফ্রয়েড সমকামিতাকে অসুস্থতার লক্ষণ হিসেবে গণ্য করতেন না। তাঁর মতে, সমকামিতা কিছু মানুষের সাধারণ বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। বাহ্যিক লক্ষণ পাওয়া যায় না এবং অন্যান্য মানুষের মতো বিভিন্ন কাজকর্মে পটু এমন মানুষও সমকামী হয়ে থাকেন। তাঁর মতে, সমস্ত মানুষই জন্মসূত্রে বাই-সেক্সুয়াল বা উভকামী। নিজের বাবা-মা ও অন্যান্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে তারা হেটেরোসেক্সুয়াল (বিপরীতকামী) অথবা হোমোসেক্সুয়াল (সমকামী) হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তিনি মনে করতেন, এমনকী প্রাপ্তবয়স্ক বিপরীতকামীরাও নিজেদের মধ্যে সমকামিতার বৈশিষ্ট্য বহন করে।

সমাজে সমকামিতার বৃদ্ধি দেখে পরবর্তী জীবনে ফ্রয়েডও নিজের হতাশার কথা চেপে রাখতে পারেননি। ১৯৩৫ সালে আ লেটার টু অ্যান অ্যামেরিকান মাদার-এ তিনি এক মহিলার চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন। মার্কিন মহিলাটি তাঁর সমকামী পুত্রের সুস্থতার জন্য চিঠি লিখেছিলেন। চিঠির জবাবে ফ্রয়েড লেখেন :

সমকামিতা মোটেও কোনো সুবিধাজনক জিনিস নয়, কিন্তু এতে লজ্জিত হওয়ারও কিছু নেই, এটা কোনো কুকর্ম বা অধঃপতন নয়; এটিকে রোগ হিসেবে শ্রেণিবিভক্ত করা যায় না; আমরা এটিকে যৌনসংগমের একটি ভিন্ন রূপ হিসেবে বিবেচনা করে থাকি। প্রাচীন এবং আধুনিক যুগের বহু বিখ্যাত, সম্মাননীয় মানুষ সমকামী। এঁদের মধ্যে অন্যতম প্লেটো, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি প্রমুখ। আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি - এটা জিজ্ঞেস করে আপনি হয়তো বলতে চেয়েছেন যে, আমি সমকামিতার অবলুপ্তি ঘটিয়ে সমাজে হেটেরোসেক্সুয়ালিটির প্রচলন করতে পারি কিনা। সাধারণভাবে বলতে গেলে বলা যায়, আমরা কখনোই এটি অর্জন করার প্রতিজ্ঞা করতে পারি না। বেশ কিছু ক্ষেত্রে সমকামীদের মধ্যে থাকা হেটেরোসেক্সুয়ালের আদিস্বরূপ উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি অসম্ভব।

মিশেল ফুকো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য হিস্ট্রি অব সেক্সুয়ালিটি (খণ্ড ১)-তে যৌনতা নিয়ে তিনটি বিষয় তুলে ধরেন। তাঁর মতে, যৌনতা হল আদি সত্য এবং এটি আত্মগত অবস্থার ভিত্তি। তিনি আরও জানান, আমরা আমাদের যৌনতা ইচ্ছামতো বেছে নিতে পারি না, বরং উল্টোটাই ঘটে। যৌনতা আমাদের রূপদান করে। আমাদের অবশ্যই যৌনতাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা উচিত। তাঁর মতে, সমকামিতা জন্মগত।

১৯৪০ সালে স্যান্ডর রাডো আ ক্রিটিক্যাল এগজামিনেশন অব দ্য কনসেপ্ট অব বাইসেক্সুয়ালিটি নামে একটি প্রবন্ধে লেখেন যে, ফ্রয়েডের জন্মগত উভকামিতার তত্ত্ব উনবিংশ শতাব্দীর একটি ভ্রান্ত বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই অনুমানটি হল যে, প্রতিটি ভ্রূণের ক্ষমতা রয়েছে পুরুষ অথবা মহিলায় পরিণত হওয়ার। যে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ফ্রয়েড সমকামিতা সংক্রান্ত তাঁর তত্ত্বের অবতারণা করেন সেটিই যেহেতু ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত, সেহেতু রাডো ফ্রয়েডের তত্ত্বকে মান্যতা দেননি। রাডো দাবি করেন, হেটেরোসেক্সুয়ালিটিই মানুষের যৌন বিকাশের একমাত্র রোগহীন বহিঃপ্রকাশ। রাডোর মতে, শৈশব যৌনতার ওপর বাবা-মায়ের চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞার কারণে শৈশব থেকেই অন্য লিঙ্গের প্রতি এই ধরণের শিশুদের ভীতি জন্মায়। কালক্রমে অন্য লিঙ্গকে এড়ানোর জন্যই তারা সমকামী হয়ে ওঠে।

আর যে সকল বিশ্লেষক সমকামিতা সম্পর্কে রাডোর মতোই অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, তাঁরা হলেন আরভিং বাইবার, চার্লস সোকারাইডস, লিয়োনেল ওভিসি, ও লরেন্স হ্যাটারার১৯৬২ সালে বাইবার এবং তাঁর সহকর্মীরা হোমোসেক্সুয়ালিটি আ সাইকোঅ্যানালিটিক স্টাডি নামে একটি গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেন। তাঁরা ১০৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক সমকামীদের ওপর যে পরীক্ষা চালান, তা থেকে জানা যায় যে, পরিবারে বাবার সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক এবং মায়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা ও মায়ের দাপট এঁদের সমকামী হওয়ার পথ প্রশস্ত করেছিলবাইবারের এই গবেষণা ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতির জন্য বিশেষ সমালোচিত হয়। তাছাড়া তাঁরা কোনো সমকামীকে উপস্থিত করে এই তত্ত্ব প্রমাণ করাতে ব্যর্থ হন।

প্রাণীবিশারদ তথা বর্গীকরণ-বিশেষজ্ঞ অ্যালফ্রেড সি কিনসে প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিনিদের যৌন ব্যবহারের ওপর যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান, তাতে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। এই তথ্য অনুযায়ী, তাঁর এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের একটা বড়ো অংশই ১৬ বছরের পর থেকে সমকামী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। (কিনসে, পোমেরয় অ্যান্ড মার্টিন, ১৯৪৮; কিনসে, পোমেরয় অ্যান্ড মার্টিন, গবহার্ড, ১৯৫৩)পরবর্তীকালে কিনসে এবং তার সহকর্মীরা তাঁদের প্রতিবেদনে জানান, তাঁদের গবেষণায় অংশগ্রহণকারী পুরুষের ১০% এবং মহিলাদের ২-% (বিবাহিত না অবিবাহিত তার ওপর নির্ভর করে) ১৬ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে অন্তত ৩ বছর (কম বা বেশি) সমকামিতার রসাস্বাদন করেছিল।

(ক্রমশ…)

 
 
top