সমাজ এবং সমকামিতা

 

পর্ব ৩

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একদল মিলিটারি ডাক্তার ও গবেষক সমকামী সৈনিকদের ওপর যে গবেষণা করেছিলেন, তা অপ্রকাশিত রয়ে গিয়েছিল। গবেষণালব্ধ সেই ফলগুলিকে জনসমক্ষে হাজির করা হয় ১৯৯০ সালে। এই গবেষণাপত্রগুলি সমকামিতার সঙ্গে মানসিক রোগের যোগাযোগকেই যে শুধুমাত্র চ্যালেঞ্জ জানায় তাই নয়, সমকামী হলে ভালো সৈনিক হওয়া যায় নাএই আপ্ত ধারণার বিরুদ্ধেও জেহাদ ঘোষণা করে।

ডা. ক্লেমেন্টস ফ্রাই ছিলেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ক্লিনিক-এর ডিরেক্টর এবং এডনা রোসতে ছিলেন একজন সমাজকর্মী। তাঁরা দুজনে ১৮৩ জন সৈনিকের সার্ভিস রেকর্ড খুব ভালো করে পরীক্ষা করেছিলেন। সার্ভিস রেকর্ড পরীক্ষা করে এমন কোনো প্রমাণ পাননি, যা সমকামিতা সম্পর্কে সাধারণ বিশ্বাস–সমকামিতা কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানুষের মধ্যে দেখা যায়-কে সমর্থন করে। তাই তাঁদের মতে, সমকামীদের সম্পর্কে এরকম মন্তব্য করা ঠিক নয়। কিছু ক্ষেত্রে, বেশ কিছু সমকামী সৈনিক পাওয়া গেছে যারা নিজেদের সমকামিতা লুকিয়ে রাখেন, কিন্তু তাঁরা তাঁদের অকুতোভয় শৌর্য প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশকে গর্বিত করে তোলেন।

যৌন অভিযোজন (সেক্সুয়্যাল ওরিয়েন্টেশন) এমন এক শব্দযুগল, যা ব্যবহার করা হয় একজন ব্যক্তির অন্য ব্যক্তির প্রতি রোমান্টিকতা, আবেগ অথবা যৌন আকর্ষণের বহিঃপ্রকাশ বোঝাতেযৌন অভিযোজনের ধারণার ব্যাপ্তি যৌন আচরণের থেকে অনেক বেশি। এটি মানুষের অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গে তার পরিচয়কেও অন্তর্ভুক্ত করে। কিছু মানুষ নিজেদেরকে যৌনসংগমে লিপ্ত না করেও গে, লেসবিয়ান অথবা বাইসেক্সুয়াল হিসাবে চিহ্নিত করে থাকেন। মানুষের যৌন অভিযোজন ঠিক কীভাবে নির্ধারিত হয়, তার ওপর বিজ্ঞানীরা এখনও খুব বেশি আলোকপাত করতে পারেননি। বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইনের মতে, আমাদের কাছে এখনও পর্যন্ত যৌন অভিযোজনের সর্বশেষ কারণ অজ্ঞাত। সমস্ত ব্যাপারটাই অন্ধকারের মধ্যে লুকোনো।

১৯৫২ সালে সমকামিতাকে মানসিক সমস্যা হিসাবে শ্রেণিভুক্ত করেছিল আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোস্যিয়েশন (এপিএতাদের জার্নাল ডায়াগনসটিক অ্যান্ড স্টাটিসটিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিসডার্স (ডিএসএম-)-১৯৭৩ সালে এপিএ ডায়াগনসটিক অ্যান্ড স্টাটিসটিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিসডার্স (ডিএসএম-প্রকাশ করে। এই ডিএসএম--তে সমকামিতাকে যৌন চ্যুতি হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল সেখানে এই যৌন চ্যুতি-কে আর স্যোসিয়োপ্যাথিকপার্সোন্যালিটি ডিসডার্স হিসাবে গণ্য করা হয়নি এর দু-দশক পরে, ১৯৯৪ সালে, এপিএ অবশেষে বিবৃতি দিয়ে জানায়,সমকামিতা কোনো মানসিক অসুস্থতা অথবা অনৈতিক কর্ম নয়। মোট জনসংখ্যার একটি অংশ এইভাবে তাদের ভালোবাসা এবং যৌনতার বহিঃপ্রকাশ করে থাকে।

. ডি. এফ. সোয়াব ১৯৯০ সালে সমকামী মানুষের মস্তিষ্কের ওপর একটি যুগান্তকারী পরীক্ষা করেছিলেন এই পরীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রথম একজন সমকামী মানুষের মস্তিষ্কের গঠনের পার্থক্য নথিভুক্ত করা হয় ময়নাতদন্ত পরীক্ষাতে সোয়াব লক্ষ করলেন যে, সমকামী পুরুষদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের একটি অংশ গঠনগত দিক থেকে হেটেরোসেক্সুয়ালদের মস্তিষ্কের থেকে ভিন্ন। হাইপোথ্যালামাস মানুষের মস্তিষ্কের একটি অংশ যেটি যুক্ত থাকে যৌন অঙ্গ এবং তার কাজকর্মের সাথে। যে সমস্ত সমকামীদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করা হয়েছিল, সেখানে দেখা যায় সুপ্রা কিয়্যাজম্যাটিক নুক্লিয়াস (এসসিএন যা হাইপোথ্যালামাসের একটি ছোটো অংশ)-টি হেটেরোসেক্সুয়ালদের তুলনায় দ্বিগুণ বড়ো। ঠিক ওই সময়ে আরও একজন বিজ্ঞানী লারা এস. অ্যালেন মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে প্রায় একই ধরনের জিনিস আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি আবিষ্কার করলেন, সমকামীদের মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র কমিসিওয়র (এসিতাৎপর্যপূর্ণভাবে হেটেরোসেক্সুয়ালদের তুলনায় বড়ো। যেহেতু এসি এবং এসসিএন যৌন আচরণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা গ্রহণ করে না, সেহেতু এটা বলাই যায় যে শুধুমাত্র হাইপোথ্যালামাসের এসি এবং এসসিএন-এর আকৃতির পার্থক্যে যৌন আচরণে পার্থক্য ঘটে না।

সোয়াব এবং অ্যালেনের মতো সাইমন লেভি ১৯৯১ সালে মানুষের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। তিনি এইডস-এর মতো রোগে মৃত ১৯ জন সমকামী রোগীদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করেন। পরীক্ষামূলক ময়নাতদন্তে উঠে আসে সমকামীদের হাইপোথ্যালামাসের মধ্যে অ্যানটেরিয়র হাইপোথ্যালামাসের তৃতীয় ইন্টারস্টিসিয়াল নচ (আইএনএএইচ থ্রি) হেটেরোসেক্সুয়াল পুরুষের তুলনায় সমকামী পুরুষদের মধ্যে দুই থেকে তিনগুণ ছোটো থাকে। মহিলা সমকামীদের মধ্যেও একই পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। লেভির মতে, হোমোসেক্সুয়াল এবং হেটেরোসেক্সুয়াল পুরুষদের যৌন আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্রীয় নিউরোনাল মেকানিজম পৃথক। অ্যালেন, সোয়াবের মতো তিনিও অভিমত পোষণ করেন যে, সমকামীদের মধ্যে এই গঠনের পার্থক্য প্রতিপালন করার অথবা পরিবেশের প্রভাব নয়, বরং পিতামাতার মস্তিষ্কের গঠনের পার্থক্যের ফল।

জে মাইকেল এবং রিচার্ড পিলার্ড মোনোজাইগোটিক ট্যুইন্স (যমজ ভাই যাদের দেখতে প্রায় এক), ডাইজাইগোটিক ট্যুইন্স (যারা ভাই) এবং পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এরকম দত্তক নেওয়া ভাইদের মধ্যে সমকামিতা পরীক্ষা করেছিলেন। তাঁরা দেখেছিলেন, পরীক্ষার জন্য যে সমস্ত টুইন্সদের আনা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ৫২% এমজেড ট্যুইন্স, ২২% ডিজেড ট্যুইন্স এবং শুধুমাত্র ৫% পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় দত্তক পুত্রের মধ্যে সমকামিতা পাওয়া যায়। এই গবেষণা চিকিৎসাশাস্ত্রে এক নতুন দিক খুলে দেয়। এই গবেষণা থেকে পাওয়া যায় যে, জিনগতভাবে যুক্ত যুগলের মধ্যে সমকামিতার লক্ষণ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পরবর্তীকালে পরীক্ষার মাধ্যমে যমজ মহিলাদের মধ্যেও একই জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। ড. ডিন হামের আমেরিকার একজন বিখ্যাত জিনবিদ, লেখক এবং পরিচালক। সমকামিতার সঙ্গে জিনের যোগাযোগের ওপর তিনি গবেষণা আরম্ভ করেছিলেন। তিনি সামাজিকভাবে পরিচিত সমকামীদের বংশতালিকা পরীক্ষা করে সেখানে মায়ের বংশের যোগ খুঁজে পানএই গবেষণাই তাঁকে তাঁর তত্ত্ব এক্স-লিঙ্কেজ নিয়ে আরো গভীর তদন্ত করতে উৎসাহিত করে তিনি সমকামী পুরুষদের থেকে ৪০টি ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেন এবং জিনগতভাবে সেগুলিকে পরীক্ষা করেন গবেষণা করে তিনি দেখেন যে, এক্স ক্রোমোজোমের ওপর এক্সকিউ২৮ মার্কার সমকামিতার সঙ্গে যুক্ত। সমকামী জিনের অস্তিত্বের ওপর তাঁকে প্রশ্ন করা হলে উত্তরে তিনি বলেন যে, অনেকের মতেই সমকামী জিন বলে কিছু হয় না এবং সেটা ঠিকও। যেমন উচ্চতার জিন, চোখের রঙের এবং চুলের রঙের জিন হয় না। বৃহৎ সংখ্যার জিনের একে অপরের সঙ্গে এবং পরিবেশের সঙ্গে সংস্পর্শে আসার ফলে শরীরের বিভিন্ন জিনিস নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই হয়তো বেশ কিছু জিন রয়েছে যেগুলি যৌন অভিযোজনকে (সেক্সুয়্যাল ওরিয়েন্টেশনপ্রভাবিত করে। সেগুলো সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। কীভাবে এই জিনগুলো কাজ করে সে সম্পর্কেও আমরা অজ্ঞাত। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে, যা তাদের অস্তিত্ব দাবি করে।

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, যৌন সংগমের ক্ষেত্রে পুরুষকেই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে হয় অনেকক্ষেত্রেই দেখা গেছে, অনেক পুরুষ নিজের যৌন ক্ষমতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী থাকেন না এবং সঙ্গিনী নারীকে সম্পূর্ণ তৃপ্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থেকে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হন সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হলে এবং তার সঙ্গে যৌনসংগম করলেও সংশ্লিষ্ট পুরুষটির অক্ষমতা বাইরে প্রকাশিত হবে না এভাবে অনেকেই সমকামী হয়ে পড়েন

সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় আর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই সমীক্ষা অনুযায়ী, মহিলাদের মধ্যে সমকামীদের সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি। মনোবিদদের একাংশের মতে, যৌনসংগমের জন্য সঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মহিলারা পুরুষদের থেকে অনেক বেশি উদার। যৌনসঙ্গী বাছাইয়ের ওপর ব্রিটেনে সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। তাতে জানা যায়, মহিলারা যৌনতার ক্ষেত্রে উভয়কামী। মহিলারা তাঁদের যৌনতার পছন্দ পরিবর্তন করতে পারেন প্রয়োজন অনুসারে। ডক্টর এলিজাবেথ ম্যাকক্লিনটক, ইন্ডিয়ানার নোতরদাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট গবেষক, জানিয়েছেন, যে সমস্ত মহিলার মধ্যে আকর্ষণীয় উপাদান রয়েছে, উপযুক্ত পরিস্থিতিতে তাঁদের অনেকেই সমলিঙ্গের যৌনসঙ্গীর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন সামাজিক প্রথা মেনে যে সমস্ত নারী পুরুষ-সঙ্গীর সঙ্গে সফল যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন, সমলিঙ্গের প্রতি তাঁদের আকৃষ্ট হওয়ার প্রবণতা দেখা যায় না তবে যাঁদের সেই সুযোগ হয়নি, তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজ লিঙ্গের সঙ্গী বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন সুন্দরী নারী নিজেকে বহু ক্ষেত্রে উভয়কামী ভাবেন তবে পুরুষ সঙ্গীর অভাব দেখা দিলেই সমলিঙ্গের প্রতি ঝোঁকার প্রবণতা দেখা দেয়

প্রখ্যাত হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি ব্র্যাড পিটের সঙ্গে সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার আগে বেশ কিছুদিন মডেল জেনি শিমিজুর সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন। অ্যাম্বার হার্ড ডেপও দীর্ঘদিন ধরে এক মহিলা আলোকচিত্রীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন জনি ডেপকে বিয়ে করার আগে।

এতক্ষণ এই আলোচনায় সমকামিতার সামাজিক, শারীরবৃত্তীয় ও মানসিক হেতুগুলিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হল। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য, সমকামী হওয়ার পিছনে সঠিক কারণ নির্দেশ করতে আজ অবধি কোনও তত্ত্বই সফল হয়নি। সেদিন হয়তো আর বেশি দূরে নেই, যেদিন আমরা সমকামী জিনের অস্তিত্ব খুঁজে পাব। তবে তা হবে আমাদের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার বিষয়। সমকামিতার কারণ যাই হোক-না কেন, সুন্দর এই পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে, নিজের শর্তে বেঁচে থাকার অধিকার আর সবার মতো সমকামীদেরও সমান। 

 
 
top