নতুন আলো

 

পর্ব ১৮

লেফটেন্যান্ট গভর্নর উডবার্নের আনুকূল্যে অতিকষ্টে সেক্রেটারি অফ স্টেটের মঞ্জুর টেলিগ্রাম হস্তগত হয়েছে অতএব সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র ডেপুটেশনে চলেছেন প্যারিস অভিমুখে সামনে আশা-নিরাশার দোলায়িত ভবিষ্যৎ

মাঝে বম্বেতে একদিন থেমেছিলেন সেখানে জামশেদজি টাটার কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে কিছু শুনলেন জামশেদজি টাটা বম্বের একজন ধনাঢ্য পার্সি ব্যবসায়ী স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ আছে

টাটা ভারতে বিজ্ঞানসাধনা প্রসারের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে ইচ্ছুক। তবে এ ব্যাপারে বাধা পাচ্ছেন যথেষ্ট। ভাইসরয় কার্জনের কাছে এই প্রস্তাব নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন। কার্জন সে প্রস্তাব হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন

মি. টাটা, ইউনিভারসিটি তো খুলবেন, ছাত্র পাবেন কোথায়?

ভারতে জ্ঞানসাধনার ঐতিহ্য আছে, মাই লর্ড । যদি সত্যিকারের ভালো প্রতিষ্ঠান খুলতে পারি তাহলে ছাত্র আসবেই

বেশ তো, ছাত্র না হয় এল, যারা পাশ করে বেরোবে তাদের চাকরি হবে কীভাবে ? দেশে অত চাকরি কোথায়?

কার্জনের নৈরাশ্যজনক উক্তিতে অবশ্য টাটা দমেননি। বারজোরজি পাদশাহ নামধারী এক তরুণ পার্সি অধ্যাপককে তিনি এর আগে ইউরোপ-আমেরিকা চষে বেড়িয়ে এক উপযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের খোঁজ করতে বলেছিলেন, যা ভারতের বিজ্ঞানসাধনার পীঠস্থানের মডেল হিসেবে কাজ করবে। বারজোরজি অনেক খুঁজে বাল্টিমোরের জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটিকে পছন্দ করেছেন। সেই আদলে একটা স্বদেশি বিজ্ঞানের বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির স্বপ্নে এগিয়ে গিয়েছেন টাটা।

কার্জন বা ভারত সরকারের সাহায্যের তোয়াক্কা তিনি করবেন না। নিজেই টাকা তুলবেন, টাকা ঢালবেন।

কার্জনের একটা কথায় গায়ে জ্বালা ধরেছিল জামশেদজির। কার্জন বলেছিলেন,  মি. টাটা, আপনি আত্মপ্রচারের জন্য, নিজের নাম ছড়ানোর জন্য এ সব করছেন

টাটা তাই ঠিক করেছেন যে, কোনোভাবেই এই প্রতিষ্ঠানে নিজের নাম জড়াতে দেবেন না। এটা হবে জাতীয় প্রতিষ্ঠান—ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্সকোথায়, কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা যায় সে ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়ার জন্য ব্রিটেনের বিখ্যাত রসায়নবিদ উইলিয়াম র‍্যামজেকে ভারতে আমন্ত্রণও করেছেন টাটা।

যাক ভারতে তাহলে সায়েন্স নিয়ে কিছু হতে চলেছে !

এস এস অ্যারাবিয়া জাহাজে উঠে ডেকচেয়ারে শয়ান হয়ে সে কথাই ভাবছিলেন জগদীশ। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সফেন সমুদ্রের মধ্য দিয়ে তর তর করে জাহাজ চলছে । চমৎকার নৈসর্গিক দৃশ্য। চায়ের পেয়ালা হাতে জগদীশ ভাবছিলেন, আহা! রবি যদি থাকত! এই দৃশ্য দেখে আরেকটা নিরুদ্দেশ যাত্রা লিখে ফেলত সে

তাঁর সে ভাবনায় অবশ্য অচিরেই ছেদ পড়ল। দু-চুমুক চা খেয়েছেন কি খাননি। পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল অসম্ভব। মাথা ঘুরতে লাগল বন বন করে। ডেকের লাগোয়া টয়লেটের বেসিনে হড় হড় করে এক পেট বমি করে ফেললেন জগদীশচন্দ্র। 

কী হল? অবলা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন।

কে বলে সমুদ্রপীড়া, অবলা—সি সিকনেস ফ্যাকাশে মুখে বললেন জগদীশ। মাথা এত ঘুরছে যে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। অবলার কাঁধে ভর দিয়ে টলতে টলতে নিজের কেবিনে ফিরে শয্যাগত হলেন তিনি।

তারপর দিন পাঁচেক নিরবচ্ছিন্ন নরকযন্ত্রণা চলল। কেবিনে শয্যাগত জগদীশচন্দ্র মাথা তুলতে পারলেন না। যা খাচ্ছেন, তাই বমি হয়ে যাচ্ছে । নীচে তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সমুদ্র গর্জন করে চলেছে।

এত শারীরিক কষ্টেও জগদীশচন্দ্র রসবোধ হারাননি। অবলাকে বললেন, মুদ্র গর্জন করে কী বলছে জান, অবলা?

কী?

বলছে, দা, দাও, আরও দাও ! আর আমিও নিঃশেষে দিয়ে যাচ্ছি! একেই বলে আতিথেয়তা!

অবলাকে সমুদ্রপীড়া ততটা কাবু করতে পারেনি। তিনি যথাসম্ভব স্বামীর শুশ্রূষা করে চললেন। সবসময় প্রতিভাবান, কর্মব্যস্ত স্বামীর সঙ্গ পান না । এই অবকাশে দম্পতির মধ্যে সাংসারিক বাক্যালাপও চলতে লাগল।

অবলা বললেন, হ্যাঁ গো, শিলাইদহের দিনগুলো মনে পড়ছে? তুমি আর রবিবাবু বোটে চড়ে বেরোলে?

ড়বে না? কী অসাধারণ অভিজ্ঞতা!

র আমি তো মৃণালিনীর সঙ্গে গল্প করে কাটালাম। ও তো জানো খুব গপ্পে

কী বলল?

দের খুব খারাপ অবস্থা, জানোখুব দুঃখ করছিল 

কে?

ব্যবসা করতে গিয়ে রবিবাবুর সর্বস্ব ডুবে গেছেমারোয়াড়ি  মহাজনের কাছে চড়া সু্দে টাকা ধার করেছেন। এদিকে নিজের আয় বলে কিছু নেই

তাই নাকি ?

হ্যাঁ, নামেই জমিদারের ছেলে। মহর্ষির কাছ থেকে যে মাসোহারা পান, তাতে অতিকষ্টে টেনেটুনে চালাতে হয়। তার ওপর এই ধার!

র মধ্যেই বেলির বিয়ে দিয়ে দেবে?

সেটাই তো মজা, জানো!    

কে, কীসের মজা?

মৃণালিনী বলছিল যে, ঠাকুর পরিবারে যতদিন মহর্ষি জীবিত আছেন ততদিন এদের যে-কোনো বিয়ের খরচা পুরো মহর্ষি দেবেন - যৌতুক, বরপণ—সব। উনি মারা গেলেই মুশকিল। তখন বিষয়-সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে লাঠালাঠি শুরু হবে। এদিকে মহর্ষির বয়েস হচ্ছে। কবে চলে যান তার ঠিক নেই

জগদীশের মনে পড়ে গেল শিলাইদহবাসের সেই মধুর স্মৃতি। পালিত পুত্র, ভাগ্নে অরবিন্দমোহনের সঙ্গে রঙ্গরসিকতা করে রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠা কন্যা মীরার সম্বন্ধ করেছেন তিনি। কবি পত্নী মৃণালিনীকে বেয়ান বলে ডাকেন ।

রন্ধনপটু মৃণালিনী জলখাবার পরিবেশন করছেন—হিঙের কচুরি, আলুর দম, হালুয়া। জগদীশের পাতে আরও দুটো হিঙের কচুরি তুলে দিয়ে বলেছিলেন, রবিন্দকে নিয়ে এলেন না যে বড়ো?

মুখভর্তি কচুরি-আলুর দম নিয়ে জড়িত কন্ঠে জগদীশ বলেছিলেন, সে তো আসবে বলে লাফাচ্ছিল, ওর মা-ই ছাড়লেন না

যাই বলুন, অরবিন্দর সঙ্গে আমার মীরাকে বেশ মানায়। যদি আনতেন তাহলে দুটিতে বেশ খেলত

অবলাও হাতে হাতে পরিবেশন করছেন। তিনি বললেন, ত্যি, দুজনে যেন রাজযোটক! বিয়েটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে হবে!

রবীন্দ্রনাথ অট্টহাস্য করে উঠেছিলেন, উঠান! শেষে বাল্যবিবাহ দিতে চান?

জগদীশ বলেছিলেন, পাকা কথাটা তো সেরে নেওয়া যেতেই পারে। অরবিন্দ যত পাশ দেবে, বিয়ের বাজারে ততই দর চড়বে ওর! আপনাদের ভালো ভেবেই বলছি!

কী করবেন ওকে? বৈজ্ঞানিক?

মাথাখারাপ রবিবাবু! আর যাই হোক, বৈজ্ঞানিক নয়! বৈজ্ঞানিক হলে না-খেয়ে মরার দাখিল হবে! তখন অরবিন্দের ভরণপোষণের ভার আপনাদের নিতে হবে, বলে রাখলাম! তার থেকে উকিল হোক, ব্যারিস্টার হোক

গদীশবাবু ! আর যাই হোক, অরবিন্দকে উকিল, ব্যারিস্টার করে বার লাইব্রেরির ভূভার বৃদ্ধি করবেন না! কপট ক্রোধে মাথা নেড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

 

সেই রবি বেলির বিয়ে দিচ্ছে? কত বয়েস মেয়েটার? মাত্র চোদ্দো, পনেরো না? দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে জল্পনা করলেন জগদীশ।

কেবিনে কিছু সংবাদপত্র, মাসিকপত্র দিয়ে গেছে। অবলার সঙ্গে বাক্যালাপ সমাপ্ত করে জগদীশচন্দ্র অন্যমনস্কভাবে পাতা উল্টোতে লাগলেন। ভালো খবর কিছু নেইকবেই বা থাকে? যত রাজ্যের খুন, জখম, চুরি, জোচ্চুরির সংবাদে পাতাগুলো পূর্ণ। পৃথিবীর কোনোখানে যেন ভালো কিছুই হচ্ছে না !  

এর মধ্যে জগদীশের চোখ আটকাল এক বিশেষ খবরে। সামনের পাতায় বেশ বড়ো বড়ো করে দিয়েছে

বুয়র যুদ্ধের ফলাফল! লর্ড রবার্টসের অসাধারণ জয়!

নানা কাজের চাপে বুয়র যুদ্ধের ব্যাপারটা নিয়ে তেমন পড়াশোনা করা হয়নি জগদীশের। এখানে বেশ বিশদে লিখেছে। অনেকটা ইতিহাসও তুলে ধরেছে। আগ্রহ নিয়ে জগদীশ পড়তে শুরু করলেন।

হিরে, সোনা প্রভৃতি মূল্যবান খনিজসমৃদ্ধ আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল অনেক দিন ধরেই ইউরোপীয়দের প্রলুব্ধ করে এসেছে। এদের মধ্যে প্রথম এসে সপ্তদশ শতাব্দীতে বসতি স্থাপন করে ওলন্দাজরা। স্থানীয় হটেনটট উপজাতীয় মেয়েদের সঙ্গে এদের বিয়ে হয় কারো,কারো। এদের বংশধরদেরই বলা হয় বুয়র। বুয়ররা তাদের দেশে বেশ সুখেই ছিল। কিন্তু সেখানে এসে থাবা বসাল ইংরেজরা। স্বাধীনতাপ্রিয় বুয়ররা তখন দীর্ঘ পদযাত্রা করে আরও উত্তরে সরে এসে স্থাপন করল তাদের নতুন বসতি—অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট এবং ট্রান্সভাল। ইংরেজরা উপকূলবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকায় স্থাপন করল তাদের নিজস্ব কলোনি—কেপ কলোনি।

বেশ ইন্টারেস্টিং তো! জগদীশ মন দিয়ে পড়ে চললেন।

নতুন রাজ্যে এসেও বুয়ররা যে শান্তিতে থাকতে পারল, তা নয়। অরেঞ্জ নদীর ধারে কিম্বার্লিতে আবিষ্কৃত হল হিরের খনি। ট্রান্সভালে পাওয়া গেল সোনা। ব্যস, ইংরেজদের চোখ পড়ল সেদিকে। কেপ কলোনির তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সেসিল রোডস কলকাঠি নাড়তে শুরু করলেন ।

দীর্ঘ পদযাত্রা বা গ্রেট ট্রেকের পরিচালক পল ক্রুগার তখন বুয়র প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট। সেসিল রোডস এর সঙ্গে তাঁর নিত্য খিটিমিটি বেধে রইল।

সর্বত্রইএক ব্যাপারদীর্ঘশ্বাস ফেললেন জগদীশচন্দ্র সব জায়গাতেই হিরে, সোনা, মাণিক আর জমির দখল নিয়ে নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদী লোভ আর সুসভ্য ব্রিটিশরাই মূল হোতা

এই সেসিল রোডসই চক্রান্ত করে ১৮৯৫ সালে . জেমসনকে ট্রান্সভাল আক্রমণ করতে পাঠান

কিন্তু হেরে গোভূত হয়ে আত্মসমর্পণ করেন তিনি

বাঃ! এই বুয়রগুলোর বেশ তেজ আছে দেখছি !সপ্রশংস মাথা নাড়লেন জগদীশওরা অস্ত্রশস্ত্র পেল কোথায়?

উত্তরটা নিবন্ধেই আছে। জার্মানদের কাছ থেকে। জার্মান সম্রাট কাইজার ওদের সমর্থন করছেন।

এখানেও তাহলে ইংরেজ আর জার্মানরা পরস্পর লড়ে যাচ্ছে?

এরপর আসল যুদ্ধ বাধে ১৮৯৯ সালে এবং প্রথমে বুয়রদের কাছে ইংরেজরা হেরে যায়।

এরপরেই লর্ড রবার্টসের আগমন। কাগজে ব্যাপারটা ফলাও করে দিয়েছে । ইংরেজদের কম্যান্ডার ইন চিফ হিসেবে লর্ড রবার্টস একটা সম্পূর্ণ নতুন টিম গঠন করেছেন। সুদান থেকে চিফ অফ স্টাফ হিসেবে এনেছেন লর্ড কিচেনারকে। ক্লোন্ডিকে থেকে নিয়ে এসেছেন ফ্রেডেরিক রাসেল বার্নহ্যামকেআফগানিস্তান থেকে এসেছেন নেভিল চেম্বারলেন। কলকাতা থেকে গেছেন উইলিয়াম নিকলসন। এর পর বিপুল সমরসজ্জা করে লর্ড রবার্টস ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বুয়রদের ওপর।

সাহেবরা এই ব্যাপারটা ভালো পারেওদের সংগঠনশক্তি তুলনাহীন! জগদীশচন্দ্র পড়তে পড়তেই নিজের মনে বললেন।

একের পর এক জয় পেয়েছেন লর্ড রবার্টস। প্রথমে ব্লমফন্টেইন, তারপর মাফেকিং-এর পতন ঘটেছে। বিজিত হয়েছে অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট। পতন হয়েছে জোহানেসবার্গের এবং প্রিটোরিয়ার।

বুয়র যুদ্ধ আপাতত শেষ। বুয়রদের প্রধান নগরগুলি অধিকৃত। তাদের নেতারা পলাতক। পল ক্রুগার, শোনা যাচ্ছে, পর্টুগিজ ইস্ট আফ্রিকার দিকে পালিয়েছেন ।

কাগজে সহাস্য লর্ড রবার্টসের ছবি ছাপিয়েছে। দৃঢ়তাব্যঞ্জক মুখ। মোটা গোঁফ। গোঁফের তলা শৌখিনভাবে পাকানো। হাসি হাসি মুখে বলছেন মিশন অ্যাকমপ্লিশড!

জগদীশচন্দ্রের চোখ আটকে গেল আরেকটা খবরেও। ভেরা স্টেন্ট নামধারী এক মহিলা সাংবাদিক একটা বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন।

নাটালের প্রবাসী ভারতীয়রা বুয়র যুদ্ধের সময় একটা অ্যাম্বুলেন্স কর্পস তৈরি করে ব্রিটিশদের মদত করছিলেন। স্পিয়ন কফের যুদ্ধে এঁরা অসাধারণ কাজ করেছেনপ্রতিবেদন সেটা নিয়েই।

কঠিন যুদ্ধে প্রাথমিক ভাবে ব্রিটিশদের হার হয়। রণস্থলে পড়ে থাকে বেশ কিছু ব্রিটিশ সৈনিকের লাশ। এই লাশ সরানোর করছিলেন ভারতীয়রা। সারা রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে সবার প্রশংসা অর্জন করে এই ভারতীয় বাহিনী এবং তাদের নেতা মি. এম কে গান্ধি

ভেরা লিখছেন—যে কঠিন কাজে অনেক জোয়ান মরদ অসুস্থ হয়ে পড়ে, সেই ভার অনায়াসে সামলে  ক্ষীণতনু মিগান্ধিকে দেখলাম ভোরবেলা প্রসন্ন মুখে একটা বিস্কুট খাচ্ছেন। চারপাশে সবাই বিষণ্ণ, বিমর্ষ, বিরূপ। যোদ্ধাদের শপথবাক্য শোনা যাচ্ছে। মি. গান্ধিই একলা ব্যতিক্রম। তিনি শান্ত, সমাহিত। তাঁর মুখে মৃদু হাসি। দয়ালু হাতে তিনি সেবা করছেন সকলকে। তাঁকে দেখে মনে ভরসা জাগে। বুকে বল আসে

প্রতিবেদনের সাথে একটা ছবিও ছাপা হয়েছে। তিন সারি ভারতীয়তাদের পরনে সামরিক পোশাক, মাথায় শোলার টুপি। মি. গান্ধি বসে আছেন মাঝের সারিতে। শ্যামবর্ণ, গোবেচারা চেহারা। সরু গোঁফ। আহামরি বীরত্বব্যঞ্জক কিছু নয়। কেরানি হলেই বোধহয় বেশি মানাত

এম কে গান্ধি! এম কে গান্ধি ! নামটা জগদীশচন্দ্রের মনে গুঞ্জরিত হতে লাগল

অবলা ডেকে উঠে গিয়েছিলেনতিনি কেবিনে নেমে এসেছেন।

গো, এখন কেমন বোধ করছ ? ডেকে উঠে আসতে পারবে?

কে? কী ব্যাপার?

ডেন এসে গেছে, এডেন!

 

প্রায় বছর বারো তের সুখী দাম্পত্য জীবনযাপন করছেন কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও পত্নী সুরবালাপরপর দুটি সন্তান হয়েছে তাঁদেরপ্রথমে পুত্র দিলীপ যাকে দ্বিজেন্দ্রলাল আদর করে মন্টু বলে ডাকেনতারপর এসেছে কন্যা মায়া স্ত্রী, পুত্র, কন্যা নিয়ে ভরপুর জমজমাট সংসার দ্বিজেন্দ্রলালেরপ্রখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের কন্যা সুরবালা সুগৃহিনী। বাজে খরচ কমিয়ে এত সুচারুভাবে সংসার তিনি চালাচ্ছেন যে, দ্বিজেন্দ্রলালের  উপার্জিত অর্থ ক্রমেই সঞ্চিত হচ্ছে।

দ্বিজেন্দ্রলাল মজাদার মজলিশি মানুষ। মাঝে মাঝেই নেমন্তন্ন করে লোক খাওয়ান। এবারে বেশ জমকালো আয়োজন করেছেন। নিজের সুকিয়া স্ট্রিটের বাসা ছোটো বলে অনুষ্ঠান হচ্ছে শ্বশুর মহাশয়ের বিডন স্ট্রিটের প্রাসাদে।

এই উপলক্ষে মজার সব আমন্ত্রণলিপি গেছে প্রত্যেকের ঘরে।

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর পেয়েছেন নিম্নলিখিত আমন্ত্রণপত্র :

যাঁহার কুবেরের ন্যায় সম্পত্তি, বৃহস্পতির ন্যায় বুদ্ধি, যমের ন্যায় প্রতাপ—এহেন যে আপনি—আপনার ভবনের নন্দন-কানন ছাড়িয়া আপনার পদ্ম-পলাশ-নয়নাভামিনী সমভিব্যহারে, আপনার স্বর্ণশকটে অধিরূঢ় হইয়া, এই দীন, অকিঞ্চন অধমদের গৃহে, শনিবার মেঘাচ্ছন্ন অপরাহ্নে আসিয়া যদি শ্রীচরণের পবিত্র ধূলি ঝাড়েন—তবে আমাদের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার হয়!—ইতি

রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথও ছাড়বার পাত্র ননতিনি জবাব দিয়েছেন কাব্য করে।

নচসম্পত্তি, নবুদ্ধি বৃহস্পতি, যমঃপ্রতাপচনাহিকমে

নচনন্দন-কানন, স্বর্ণসুবাহন, পদ্ম-বিনিন্দিত পদযুগমে।।

আছে সত্যিপদ-রজরত্তি , তাও পবিত্র কি জানিত নে

চৌদ্দপুরুষ তব ত্রাণ পায় যদি, অবশ্য ঝাড়িব তব ভবনে।।

নির্ধারিত দিনে সমাজের গণ্যমান্যরা একে একে উপস্থিত হতে শুরু করলেনএলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথএলেন দুই ডাকসাইটে সম্পাদক—সমালোচক সুরেশ সমাজপতি ও পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়

দ্বিজেন্দ্রলালদের সাতভাইদের মধ্যে সস্ত্রীক রাজেন্দ্রলাল ও জ্ঞানেন্দ্রলাল উপস্থিতএসেছেন জোড়াসাঁকোর দুই উদীয়মান শিল্পীভ্রাতা—অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরবাড়ির মধ্যে ঢুকে প্রথমেই সশব্দে পায়ের ধুলো ঝেড়েছেনতারপর ফিরেছেন রবীন্দ্রনাথের দিকে।

বি, জগদীশ তাহলে বিলেত চলে গেল?

হ্যাঁ, বড়দাদা

বড়ো ভালো ছেলেটা

হ্যাঁ, একটা সত্যিকারের জিনিয়াস

কটা কাজ করবি, রবি?

কী, বড়দাদা?

মি তো জানিস সারাটা জীবন জ্যামিতি নিয়ে ছেলেখেলা করে গেলামকাজটার নাম দিয়েছি বক্সোমেট্রিএখন এটা কিনে হাতই বালখিল্যের ছেলেখেলা নাকি ভেতরে সারবস্তু কিছু আছে?

তুমি কী চাও?

তুই যদি রেজিস্ট্রি ডাকে জগদীশকে কাজটা পাঠাস আর জগদীশ যদি বিলেতের কোনো ম্যাথেমেটিশিয়ানকে দিয়ে কাজটা যাচাই করায়?

বে, পাঠাব

এর মধ্যে পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিজেন্দ্রলালের দিকে ফিরলেন দ্বিজুভায়া, তুমি কি চিরটা কাল ডেপুটি হয়েই কাটিয়ে দেবে ?

কেন ?

চাকরি তো কমদিন করছ নাকত লোক জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে গেলতোমার কোনো উন্নতি নেই কেন?

দ্বিজেন্দ্রলালের মুখ রাগে রক্তাভ হয়ে উঠলঅবরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বললেন কারণ আমি তেল মারতে পারি না, পাঁচকড়ি আর সাহেবদের তেল মারতে না পারলে, সবসময় জোহুজুরি আর খোশামুদি করতে না পারলে চাকরিতে উন্নতির কোনো আশা নেই

তাই তো বলি ! কত ঘটিরাম শুধু তেল মেরে রায়বাহাদুর হয়ে গেল

আমি তো,পাঁচকড়ি, স্বয়ং ছোটোলাটকে চটিয়েছি !

রবীন্দ্রনাথ বললেন, তাই নাকি, দ্বিজুবাবু ?

 

হ্যাঁ, রবিবাবু আমি তখন বর্ধমানে সুজামুটা পরগণার সেটলমেন্ট অফিসারসেইসময় এক বিশাল ঝামেলা হয়

কী হয়েছিল?

আমার আগে সেটলমেন্ট অফিসাররা কী করত জানেন? মনে করুন আগে যখন প্রজাদের সঙ্গে জমির বন্দোবস্ত হল তখন জমিটা ঠিকভাবে না মেপেই আন্দাজে একধরণের খাজনা চালু হতঠিকঠাক জরিপ হত পরেতখন জরিপে জমি বেশি পেলে খাজনাও বেড়ে যেতবদমাইশের ধাড়ি সব

তা আমি গিয়ে বললাম যে, ব্যাপারটা অন্যায় ও আইনবিরুদ্ধপ্রজার সাথে জমির বন্দোবস্তের সময়ই ব্যাপারটা ঠিকঠাক ফয়সালা হওয়া উচি

তারপর ?

ব্যাপারটা আইনআদালত ঘুরে ছোটোলাটের দরবারে পৌঁছয়সেইসময়কার ছোটোলাট স্যার চার্লস এলিয়টউনি আমায় ডেকে পাঠিয়ে যাচ্ছেতাই গালাগালি দিয়ে বলেন যে, আমি ভুল করেছিউনি নিজে সেটলমেন্ট অফিসার ছিলেনউনি সেটলমেন্টের কাজ নাকি ভালো বোঝেন

রবীন্দ্রনাথ বললেন, আপনি কী বললেন ?

আমি বললাম যে আপনি পাঞ্জাবে সেটলমেন্টের কাজ করেছেনপাঞ্জাব আর বাংলা এক নয়বাংলার ব্যাপার আপনি কিছুই বোঝেন না

ছোটোলাটের মুখের ওপর এত বড়ো কথা বললেন ?

দ্বিজেন্দ্রলালের মুখে গর্ব আর আত্মাভিমানের ছায়াপাত ঘটলবললেন, রবিবাবু, হককথা বলতে আমি কখনো পিছু হটি নাএই মনে করুন আপনি আমার এত বড়ো বন্ধুআপনার মুখের ওপর হককথা বলতেও এই শর্মা কোনোদিন পিছপা হবে না

সুরেশ সমাজপতি বললেন, ছোটোলাটের মুখের ওপর এত বড়ো কথা বললেন, তার পরিণতি কী হল

সুরেশবাবু, সাহেবদের যত দোষই থাক, ওরা রুল অফ লটা মানেএ ব্যাপারে হাইকোর্টে অ্যাপিল হয়সেখানে জজসাহেব ছোটোলাটের খুব সমালোচনা করে আমার মতটাকেই মানলেনসেই রুলিং অনুসারে এখন বাংলাদেশের সর্বত্র সেটলমেন্টের কাজ চলছেরিপে জমি বেশি পেলেই এখন প্রজাদের অসম্মতিতে খাজনা বাড়ানো হয় নাতবে আমার নামটা সরকারের কালোখাতায় উঠে গেল, মশাই।

সুরেশ সমাজপতি বললেন, নিজের পায়ে কুড়ুল মেরে তাহলে দেশের উপকার করেছিলেন বলুন।

তা আর বলতে সুরেশবাবু । সুতরাং জজ-ম্যাজিস্ট্রেট-হাকিম- রায়বাহাদুর হবার আশা আমি করি না । আর এসব পদবিগুলোকে দু-চক্ষে দেখতেও পারি না। 

অতিথি-অভ্যাগতরা শরবৎ আর মিষ্টান্ন দিয়ে জলযোগ সেরেছেন এবার সংবাদ এল মধ্যাহ্নভোজ প্রস্তুত।

পাশাপাশি সিঁড়ি দিয়ে দ্বিতলের ভোজনকক্ষে চললেন রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলাল । দ্বিজেন্দ্রলাল রহস্য করে বললেন –

শুনছি নাকি মশায়ের কাছে

অনেক চাকরি খালি আছে –

দশ-বিশ টাকা মাত্র মাইনে

দু একটা কি আমরা পাইনে ?”

রবীন্দ্রনাথ স্মিত হাস্যে বললেন –

জানতে পারি নাম ধাম

গোত্র, কুল, জেলা, গ্রাম ?” 

দ্বিজেন্দ্রলাল বললেন –

ইন্দুভূষণ সান্যাল নাম।

ভাগ্রাকুন্ডা গ্রাম ধাম ।

চাপড়া গ্রামের অপর পারে ।

এক্কেবারে নদীর ধারে।”

 

 

রবীন্দ্রনাথ বললেন

আত্মীয়, পরিজন ?

লেখা পড়ার বিবরণ ?”

দ্বিজেন্দ্রলাল বলেন

কুলীন ব্রাহ্মণ, মোটা পৈতে,

ইংরেজিটাও পারেন কইতে

পাবনা কোর্টের প্রধান প্লিডার

গণ্যমান্য বারের লিডার -

প্রতাপ রায় হন ইহার শ্বশুর

এতেই মাপ এঁর হাজার কসুর।”

 

রবীন্দ্রনাথ অকৃত্রিম অট্টহাস্যে ফেটে পড়লেন।

দ্বিজুবাবু আপনি পারেন বটে !

শিলাইদহের কাছারিতে কোনো কাজ

দেখি যদি জোটাতে পারি আজ!”

 

চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয় সহযোগে রাজকীয় মধ্যাহ্নভোজ সমাধা করে অতিথিবর্গের নিদ্রাকর্ষণ হল।

প্রতাপ মজুমদারের প্রাসাদের বৈঠকখানায় সবাই ক্ষণেক তন্দ্রাসুখ উপভোগ করলেন। তারপর বোনচায়নার কাপডিশে দার্জিলিংয়ের সুগন্ধী, ধূমায়িত চা সবাইকে সজাগ করে তুলল

পাঁচকড়িবাবু বললেন, দ্বিজুবাবু, এবার গান হয়ে যাক। হাসির গানের রাজা আপনি। আপনি আছেন আর আমরা গান শুনব না তা কি হয়?

দ্বিজেন্দ্রলালকে দু-বার বলতে হল না। কার্পেটের ওপর তাকিয়া টেনে হারমোনিয়াম সহযোগে গান ধরলেন তিনি –

 

আমরা বিলেত-ফের্তা ক ভাই,

আমরা সাহেব সেজেছি সবাই,

তাই, কি করি নাচার, স্বদেশি আচার

করিয়াছি  সব জবাই ।

আমরা সাহেব সঙ্গে পটি

আমরা ‘মিস্টার’ নামে রটি;

যদি ‘সাহেব’ না বলে ‘বাবু’ কেহ বলে-

মনে মনে ভারি চটি।”

অতিথিরা হেসে কুটিপাটি হলেও দ্বিজেন্দ্রলালের ভাবান্তর নেই। তিনি গম্ভীরমুখে গেয়ে চললেন।

গান শেষ হলে সুরেশ সমাজপতি বললেন, ব্রাভো! দ্বিজু, ব্রাভো! তা তুমিই তো এককালে বিরাট সাহেব ছিলে হে সখ করে নিজের নাম লিখতে ডি এল রায়!

দেশে ফিরে সাহেবদের কীর্তিকলাপ দেখে আমার মোহভঙ্গ হয়েছে, সুরেশবাবু । এখন আমি আবার আমিতে ফিরেছি।

ঠিক ! তুমি যেন বিলেত থেকে একটা খোলস, একটা ক্লোক পরে এসেছিলে। সেটা এখন খুলে পড়ে গেছে।

অতিথিরা সমস্বরে এবার দ্বিজেন্দ্রলাল আর রবীন্দ্রনাথকে যৌথকণ্ঠে গানের জন্য ধরলেন । অবনীন্দ্রনাথও উৎসাহ দিলেন, হয়ে যাক, রবিকা , তোমাদের সেই খামখেয়ালি সভার নন্দলালটা হয়ে যাক !

রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলাল সহাস্যে বললেন, হয়ে যাক !

 

 

দ্বিজেন্দ্রলাল গেয়ে উঠলেন –

নন্দলাল তো একদা একটা করিল ভীষণ পণ

স্বদেশের তরে যে করেই হোক রাখিবেই সে জীবন

সকলে বলিল – আহা হা! আহা হা! কর কি! কর কি! নন্দলাল ?”

রবীন্দ্রনাথ মাথা নাড়িয়ে যোগ দিলেন –

বাহা রে নন্দ বাহারে নন্দলাল!

সমবেত অতিথিবর্গ সোৎসাহে গেয়ে উঠলেন – বাহারে নন্দ বাহারে নন্দলাল !

অবনীন্দ্রনাথ কোত্থেকে একটা এস্রাজ যোগাড় করে সঙ্গত করতে লাগলেন। সমবেত হুল্লোড়ের মধ্যমণি দ্বিজেন্দ্রলাল । তাঁর মুখ কখনো বিদ্রুপের হাসিতে ঝলসে উঠছে, কখনো হয়ে উঠছে ব্যঙ্গবঙ্কিম। অতিথিরা কেউ কেউ ধুতিতে মালকোঁচা মেরে কোমর দুলিয়ে নাচতে শুরু করলেন।

এর মধ্যেই গুটিগুটি পায়ে ঘরে ঢুকল নতুন এক অতিথি – দ্বিজেন্দ্রপুত্র দিলীপকুমার ওরফে মন্টু। টলোমলো পায়ে বছর তিনেকের মন্টু সটান বসে পড়ল রবীন্দ্রনাথের কোলে। কবির ঘন কালো দাড়ি ধরে টানতে লাগল সে । রবীন্দ্রনাথও সস্নেহে মন্টুর মাথার চুল এলোমেলো করে দিতে লাগলেন।

 

দ্বিজেন্দ্রলাল ততক্ষণে নতুন গান ধরেছেন –

হোতে পাত্তেম আমি একজন মস্ত বড় বীর…’

রবীন্দ্রনাথ মাথা নাড়িয়ে ধুয়ো দিচ্ছেন-

তা বটেই তো! তা বটেই তো ! তা বটেই তো !

মন্টু শিশুকন্ঠে আধো আধো সুরে গেয়ে উঠল –

তা বতেই তো! তা বতেই তো ! তা বতেই তো!

তা বতেই তো! তা বতেই তো ! তা বতেই তো!

সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলেন । গান শেষ করে দ্বিজেন্দ্রলাল বললেন, রবিবাবু, অতুল যদি আজ থাকত তা হলে আরও জমে যেত।

ঠিক। অতুলকে আমরা খুব মিস করছি ।

অতুল অর্থে তরুণ ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেন । তিনিও উদীয়মান সংগীতকার  তথা সমঝদার।

রবিবাবু, মনে পড়ে অতুলের বাড়িতে আমাদের খামখেয়ালি সভার সেই আসর ?

পড়বে না, দ্বিজুবাবু ! সেবার বাড়ি ফিরেছিলাম রাত বারোটার পর!

আপনি তো গেলেন বারোটায়। নাটোর গেলেন রাত দুটোয় আমি আর অতুল সারা রাত জাগলাম !

সারা রাত !

হ্যাঁ, মশাই, রাতভোর কীর্তন আর হাসির গান চলল । পরদিন অতুল আমায় বাড়ি পৌঁছে দিল। কী সব দিন গেছে, মশাই ! কী সব স্মৃতি!

সুরেশ সমাজপতি বললেন, দ্বিজুভায়া, আমাদের সেই বজরার পার্টিটা মনে পড়ে ? খড়দা না কোথায় যেন যাচ্ছিলাম ?

দ্বিজেন্দ্রলাল বললেন, পড়বে না আবার, সুরেশবাবু! কী নিদারুণ অভিজ্ঞতা ! মহাপ্রাণ যে শরীর থেকে সেদিন বেরিয়ে যায়নি সেই যথেষ্ট! ওটা বোধহয় আমাদের ডাকাতে ক্লাবের পার্টি ছিল।

দ্বিজেন্দ্রলালের শ্বশুর প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রতাপ মজুমদার সংগীতের ব্যাপারে অসুর ব্যক্তি। তিনি এতক্ষণ নীরব ছিলেন। এবার বললেন, তোমাদের ওই ডাকাতে ক্লাবটা কী ছিল, দ্বিজু ?

ওটা আমাদের মেলামেশা,আড্ডা-হুল্লোড়ের ক্লাব ছিল, বাবা। যার ঘাড় ভেঙে খাওয়া হবে, তার বাড়িতে আগাম চিঠি যেত – অমুক দিন আপনার বাড়িতে ডাকাতি হবে !

বল কী হে !

গগনেন্দ্রনাথ বললেন, প্রতাপবাবু , তেমন চিঠি আমার কাছেও একবার গেছিল !

তাই নাকি !

প্রতাপবাবু আমার বাসা তখন মেরামত হচ্ছে।  লিখলাম যে,  চুন, সুরকি আর বাঁশের ভারায় যে অবস্থা হয়ে রয়েছে তাতে ডাকাতেরা এলেও বিশেষ সুবিধা করতে পারবেন না ! পরে অবশ্য সব্বাইকে নেমন্তন্ন করে খাইয়েছিলাম।

দ্বিজেন্দ্রলাল বললেন, খুব জাঁকালো, সাকসেসফুল পার্টি হয়েছিল, গগনবাবু আমরা তো দারুণ আমোদ করেছিলাম আর রবিবাবু, মনে পড়ে আপনি সেই গানটা গেয়েছিলেন ?

কী গান ?

অসাধারণ লেগেছিল গানটা আপনারই লেখা আর সুর দেওয়া কথাগুলো বোধহয় এখনো তারে চোখে দেখিনি, শুধু বাঁশি শুনেছি গানটা গান না, রবিবাবু? খুব শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে

সলজ্জ রবীন্দ্রনাথ বললেন, আমি বোধহয় কথা,সুর ভুলে গেছি ওসব আমার আবার মনে থাকে না

অবনীন্দ্রনাথ বললেন, রবিকা, আমি মনে করিয়ে দেব আমার মনে আছে এসরাজে ঝংকার তুললেন তিনি

সবাই সমস্বরে অনুরোধ করতে লাগলেন, গান, রবিবাবু গান এমনকী জ্যেষ্ঠভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ বললেন, রবি, অনেক হয়েছে এবার শুরু কর তোর গান ছাড়া এসব আসর জমে না

অগত্যা রবীন্দ্রনাথ চোখ বুজে শুরু করলেন

 

এখনো তারে চোখে দেখিনি, শুধু বাঁশি শুনেছি

মনপ্রাণ যাহা ছিল দিয়ে ফেলেছি ।।

শুনেছি তারই মুরতি কালো তারে না দেখা ভালো

সখী ,বলো আমি জল আনিতে যমুনায় যাব কি।।

 

রবীন্দ্রনাথের ভরাট জোরালো সুরেলা গলা বৈঠকখানার আনাচেকানাচে সুরের ইন্দ্রজাল বিস্তার করল

সপ্রশংস দ্বিজেন্দ্রলাল অবনীন্দ্রনাথকে ফিসফিস করে বললেন, কী প্রতিভা রবিবাবুর! রাধাকৃষ্ণের গানকে কী অনায়াসে আধুনিক প্রেমের গানে রূপান্তর করেছেন !

শুধু স্বপনে এসেছিল সে, নয়নকোণে হেসেছিল সে

সে অবধি সই, ভয়ে ভয়ে রই আঁখি মেলিতে ভেবে সারা হই

কাননপথে যে খুশি সে যায় ,কদমতলে যে খুশি সে চায় -

সখী বলো আমি আঁখি তুলে কারো পানে চাব কি ?”

 

গান সাঙ্গ হলে সবাই স্তব্ধ হয়ে ক্ষণিক বসে রইলেন তারপর ওয়ান্ডারফুল, ব্রাভো, অসাধারণ, অনবদ্য প্রভৃতি নানা শব্দে বৈঠকখানা ফেটে পড়ল বাইরে তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে

 

 

 

 

এবার বিদায়ের পালা পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়  ও সুরেশ সমাজপতি পরস্পর গল্প করতে করতে দেউড়ি পেরিয়ে চললেন ক্লাসিক থিয়েটারের মালিক তথা মুখ্যঅভিনেতা অমরেন্দ্রনাথ দত্ত রঙ্গালয় বলে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করার পরিকল্পনা করছেন সম্পাদক হতে অনুরোধ করেছেন পাঁচকড়িকে  সেই ব্যাপারেই কথা হচ্ছিল

কালোর এলেম আছে বললেন পাঁচকড়ি  ছিল বখাটে, কাপ্তেন ছোকরা হেন বদমাইশি নেই যা ও করেনি আর এখন দেখুন, সুরেশবাবু? বাংলা রঙ্গমঞ্চে একেবারে বিপ্লব এনে দিয়েছে! সবার মুখে এখন ক্লাসিক থিয়েটারের নাম

হঠাৎ পত্রিকা বের করছে ?

খ হয়েছে! নাট্যশিল্পের উন্নতি করতে নাকি ও কাজটা করতে চায় আইভরি ফিনিশ কাগজে ছাপবে!

আইভরি ফিনিশ ! সুরেশ সমাজপতি খাবি খাবার উপক্রম করলেন – সে তো অনেক টাকার ধাক্কা!

হুঁ হুঁ বাবা ! দ্বারিক দত্তের ছেলে । বাপের পয়সার ইয়ত্তা নেই । বনেদিয়ানাটা তো আছে ।

দীর্ঘদেহী রবীন্দ্রনাথ পাশেই হাঁটছিলেন। পরনে ঢাকাই ধুতি আর আদ্দির পাঞ্জাবি। তাঁর দিকে ফিরলেন সুরেশ সমাজপতি –

রবিবাবু, আপনারা শুনছি বঙ্গদর্শন কাগজটা নতুন করে বের করবেন?

কে বলল ?

মজুমদার লাইব্রেরির শৈলেশ। আপনিই নাকি সম্পাদক হচ্ছেন ?

বঙ্কিমের বঙ্গদর্শন বহুদিন বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সেটা নবপর্যায়ে বের করার তোড়জোড় করছে দুই ভাই শ্রীশ ও শৈলেশ মজুমদার। তারা আবার বিশাল রবীন্দ্রভক্ত। রবীন্দ্রনাথকে ধরে বসেছে সম্পাদক হবার জন্য। কবির একেবারেই ইচ্ছে নেই। “সাধনা” পত্রিকা সম্পাদনার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে একেবারেই প্রীতিপ্রদ নয়। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোয় কোনই সার্থকতা দেখেন না তিনি। বললেন – সুরেশবাবু , এই হতভাগ্য দেশে প্লেগ যেভাবে বাড়ছে তার ওপর কাগজ বাড়তে দেওয়াটা কি ঠিক ?

না বাড়তে দেওয়াই তো ভালো, রবিবাবু । তাছাড়া বঙ্কিম আর আপনি কি এক হলেন ? কোথায় হরিদ্বার আর কোথায় গুহ্যদ্বার ! বঙ্কিমের ফেলে যাওয়া চটিতে গলানোর মতো পা এখন বাংলাদেশে কারো আছে ?

সুরেশচন্দ্রের কণ্ঠের তীব্র বিদ্রূপ এবং রবীন্দ্রবিদ্বেষ চাপা রইল না।

রবীন্দ্রনাথ নীরব রইলেন। এ ধরণের অরুচিকর বিদূষণ তাঁর নিত্যসঙ্গী এবং গা-সওয়া হয়ে গেছে। উত্তর দিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

 

অতিথিরা একে একে বিদায় নিলে প্রতাপ মজুমদারের বিডন স্ট্রিটের প্রাসাদে নিশীথ নীরবতা ঘনিয়ে এল।

তেতলার শয়নকক্ষে বিশাল মেহগনির পালঙ্কে আধশোয়া হয়ে প্রতীক্ষারত দ্বিজেন্দ্রলাল। এই সময় সারা দিনের কর্মক্লান্ত সুরবালা আসেন তাঁর সান্নিধ্যে। হালকা পদশব্দ হল । ভেসে এল এক আশ্চর্য সুগন্ধ।

স্ত্রীকে দুহাতে বুকে টেনে নিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল – সুরো ! সুরো আমার!

ছাড়ো ! অসভ্যতা কোরো না!

ছাড়তে বোলো না দ্বিজেন্দ্রলাল পত্নীর ঠোঁটে সবলে চুমু খেলেন

তুমি বড়ো অসভ্য !

তোমায় কাছে পেয়ে কী মনে হয় জানো, সুরো ?

কী?

জীবন,

যেন একটা লাগাও ছুটি,

যেন একটা অবিশ্রান্ত গীতি ;

যেন একটা মলয় হাওয়া,

যেন শুদ্ধ ভেসে যাওয়া,

যেন একটা  স্বপ্নরাজ্যে স্থিতি!

 

স্ত্রীর সুন্দর মুখ বার বার উষ্ণ চুম্বনে ভরিয়ে দিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল ।

তুমি খুব ঘেমে গেছ সুরো।

ঘামব না ? তোমরা পুরুষরা আমোদ–আহ্লাদ করবে, গানবাজনা করবে, ভেতরে খেটে মরব তো আমরা মেয়েরা !

বেশ তো কথা বলছ গো ! বিয়ের সময় কারা রটিয়েছিল যে পাত্রী বোবা !

এখন প্রমাণ পাচ্ছ যে আমি কথা কইতে পারি ?

হাড়ে হাড়ে পাচ্ছিমন্টু আজ এক আশ্চর্য কাণ্ড করেছে, জানো ?

কী করেছে?

রবিবাবু আমার সঙ্গে বসে গান গাইছেন, ধুয়ো দিচ্ছেন – তা বটেই তো ! তা বটেই তো !

মন্টু ওনার কোলে বসে অবিকল নকল করে চলল – তা বতেই তো! তা বতেই তো! – নির্ভুল সুর, তাল, লয়ে ! – মাত্র তিন বছর বয়েস ওর !

কার ছেলে দেখতে হবে তো !

আমার মনে হয়, সুরো, মন্টু একদিন বিরাট গায়ক হবে, জিনিয়াস হবে, আমাদের সবার মুখোজ্জ্বল করবে।

ঘরের বাতি নিবে গেল। অভ্যস্ত হাতে স্ত্রীর বসনভূষণ একে একে নির্মোচন করতে লাগলেন দ্বিজেন্দ্রলাল।

 

তারপর সুরবালার সঙ্গে সুরতরঙ্গে রত হলেন তিনিসুরবালার গহন অভ্যন্তর-প্রদেশ ভরিয়ে দিলেন ভালোবাসা ও প্রণয়ের স্বাক্ষরে। এক সময় তাঁদের প্রণয়লীলা শেষ হল।

আমি আরো বাচ্চা চাই, সুরো - আরও । মন্টু-মায়ার মতো আরো ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে ঘরময় ঘুরে বেড়াবে। আমায় বাবা বলবে । আমার কোলে চড়ে খেলবে ।

আমার বড়ো ভয় হয় গো !

কীসের ভয়, সুরো?

তুমি কাব্য করে বলছিলে না – আমাদের জীবন যেন একটা স্বপ্নের মতো, সুখের স্বপ্নের মতো, সে স্বপ্ন যদি হঠাৎ একদিন ভেঙে যায়?

কেন ভাঙবে সুরো ?

যদি সত্যিই ভেঙে যায় গো ! যদি আমি চলে যাই ? যদি আমি তোমাদের ছেড়ে দূরে, বহুদূরে কোথাও চলে যাই ?

দ্বিজেন্দ্রলাল সবলে সুরবালাকে আঁকড়ে ধরলেন । বার বার চুম্বন করতে লাগলেন পত্নীর স্বেদবিন্দুচিহ্নিত সুন্দর মুখ ।

আমাকে ছেড়ে কোথায় যাবে, সুরো ? আমায় ছেড়ে, মায়াকে ছেড়ে, মন্টুকে ছেড়ে ? আমি তোমায় আঁকড়ে ধরে রাখব। কোথাও যেতে দেব না। কোত্থাও না।

 

 

 
 
top