নতুন আলো

 

পর্ব ২৩

মিশরে থাকাকালীন এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর একান্ত অনুগত ভক্ত ক্যাপটেন সেভিয়ার অতলে তলিয়ে যাচ্ছেন এবং আকুল হয়ে চিৎকার করছেন, বাঁচান স্বামীজি! বাঁচান! সেই রাতেই সম্ভবত মৃদু হার্ট অ্যাটাকও হয়েছিল স্বামীজিরস্ফিংক্স এবং পিরামিডের সংস্পর্শে এসে নশ্বর জীবনের স্থায়িত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে উঠেছিলেন তিনি। গভীরতম বিষাদে ভরে গিয়েছিল মন।

গায়িকা এমা কালভের অতিথি তিনি। বস্তুত মাদাম কালভেই খরচখরচা দিয়ে স্বামীজিকে ইজিপ্টে এনেছেন।

কিন্তু বিবেকানন্দ আর এক দণ্ড থাকতে রাজি নন। তাঁর মুখের এক বুলি—তিনি চলে যাবেন, ফিরে যাবেন নিজের দেশে। দেশের মাটিতে গিয়ে মরবেন তিনি। তাঁর আয়ু শেষ হয়ে গেছে। ক্যাপ্টেন সেভিয়ার ডাকছেন তাঁকে।

অবশেষে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁর বিদেশি অনুরাগিণীরা এক ইটালিয়ান জাহাজ রুবাট্টিনোর টিকিট কেটে পোর্ট তৌফিক থেকে তাঁকে স্বদেশে ফেরার ব্যবস্থা করে দিলেন।

৬ ডিসেম্বর বম্বে বন্দরে ভিড়ল জাহাজ। তারপর ৯ ডিসেম্বর সন্ধেবেলা ট্রেনে কলকাতা পৌঁছোলেন ভগ্নস্বাস্থ্য বিবেকানন্দ।

তিন বছর আগে প্রথমবার যখন বিদেশ থেকে ফিরেছিলেন, সে ছিল এক বিজয়ী বীরের প্রত্যাবর্তন। বজবজ থেকে স্পেশাল ট্রেনে শিয়ালদা স্টেশনে আনা হয়েছিল তাঁকে। সেখানে ভিড় করেছিল হাজার বিশেক মানুষ। তাঁর ল্যান্ডো গাড়ির ঘোড়া খুলে নিয়ে সে গাড়ি টেনেছিল কলকাতার ছাত্রসমাজ।

এবার কেউ নেই। আসলে বিবেকানন্দ এত অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরেছেন যে, কেউ কোনো খবরই পাননি বেলুড় মঠের গেট বন্ধ হয়ে গেছে বহুক্ষণ। সন্ন্যাসীরা নৈশাহারে বসেছেন। খিচুড়ি রান্না হয়েছে। সে সুঘ্রাণ ভেসে আসছে বাতাসে। তার মানে রাখাল, লেটোরা মজাসে খিচুড়ি সাঁটাচ্ছে। দীর্ঘ ট্রেনযাত্রায় বিবেকানন্দর খিদেও পেয়েছে সাংঘাতিক। অথচ হাজার টানাটানিতেও গেটের তালা খুলছে না। এগিয়ে আসছে না কেউ।

কিংকর্তব্যম!

নিজের কৈশোরে ফিরে গেলেন বিবেকানন্দ। একটাই উপায়। পাঁচিল বেয়ে ঢুকতে হবে! বিশ্বজয়ী স্বামী বিবেকানন্দ কোটের হাতা গুটিয়ে, প্যান্ট হাঁটুর ওপর তুলে ডিঙ্গি মেরে এক লাফে বেলুড় মঠের পাঁচিলের মাথায় চড়ে বসলেন।

এমন সময় বাগানের দারোয়ান চিৎকার করে উঠল, ওন হ্যায় রে? ছুপকে ছুপকে ঘুসতা হ্যায়?আভি উতার!তু আভি উতার!

অসহায় বিবেকানন্দ বললেন, মি রে, আমি! চিনিস না আমায়?

সাহেবি পোশাক পরিহিত প্রাচীরারুঢ় বিবেকানন্দকে নতুন দারোয়ান চিনতে পারল না।

 

খইনি ডলতে ডলতে, হাতের লাঠি আস্ফালন করতে করতে দারোয়ান চিৎকার করতে লাগল, য়ে বিলকুল নেহি চলে গাডাকু, চোট্টা, তু ভাগ! তু আভি ভাগ! ছুপকে ছুপকে আন্ধেরা মে ঘুসনে কা মতলব হ্যায় তেরা! রামদিন সিং ইতনা বুরবাক আদমি নেহি হ্যায়

বিবেকানন্দ মহা বিপন্ন বোধ করলেন। বেলুড় মঠের পাঁচিলে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন তিনিপেটে ছুঁচোর ডনবৈঠক চলছে। এদিকে নামতেও পারছেন না। কর্তব্যপরায়ণ দারোয়ান যষ্ঠিহস্তে আস্ফালন করে চলেছে।

অবশেষে দারোয়ানের চিৎকারে আকৃষ্ট হয়ে গুরুভাইরা একে একে হাজির হতে লাগলেন। তাদের দেখে ধরে প্রাণ এল বিবেকানন্দের। সাধু-সন্ন্যাসীরাও প্রথমে সাহেবি পোশাক পরিহিত প্রাচীরারুঢ় এই বিপন্ন ব্যক্তিকে চিনতে পারেননি। অবশ্য অচিরেই ভুল ভাঙল তাঁদের।

এ যে স্বামীজি!

তখন মহা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল, স্বামীজি এসেছেন!স্বামীজি এসেছেন!

ভোজপুরি দারোয়ান রামদিন সিং তো মহা অপ্রস্তুত। আভূমিপ্রণত হয়ে সে ঘন ঘন ডবল সেলাম ঠুকতে লাগল—তার গোস্তাকি হয়ে গিয়েছে! দুনিয়ার মালিক যেন তার গোস্তাকি মাপ করে দেন!

স্বামীজি অবশ্য উদারহাস্যে তাকে ক্ষমা করলেনতুমি তোমার কর্তব্য করেছ, রামদিন। ঠিকই করেছ। সত্যিকারের চোরডাকাতদের সঙ্গেও একই তেজ দেখাবে তারপর স্বামী ব্রহ্মানন্দের দিকে তাকিয়ে বললেন, তভাগা, রাখাল! খিচুড়ি কি সব মেরে দিয়েছিস, শালা!

না, না, আছে কিছুটা

তোদের খাবার ঘণ্টা শুনে ভাবলুম, এই যাঃ এখনি না গেলে হয়তো সব সাবাড় হয়ে যাবেতাই তো পাঁচিল টপকাচ্ছিলাম!

আর দেরি না করে আসন বিছিয়ে খিচুড়ি প্রসাদ দেওয়া হল স্বামীজিকে। কতদিন খিচুড়ি খাননি!পরম তৃপ্তিতে খেতে লাগলেন স্বামীজি। চলতে লাগল গুরুভাইদের সঙ্গে গল্পগুজব। অবশ্য অচিরেই পেলেন সেই প্রত্যাশিত দুঃসংবাদ। কায়রোয় দেখা তাঁর ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন মিথ্যে ছিল না। প্রায় মাসখানেক আগে দেহরক্ষা করেছেন ক্যাপ্টেন সেভিয়ার।

কী করবেন বিবেকানন্দ?

সেভিয়ার-দম্পতির অর্থে ও উৎসাহে দু-বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রথমে আলমোড়ায় ও পরে মায়াবতীতে আশ্রম চলছে। সেটা কি এখন বন্ধ হয়ে যাবে?অবশ্য মিসেস সেভিয়ার অন্য ধাতুর মানুষ। আশা করা যায় যে অবিচলিতই থাকবেন তিনি।

গঙ্গার তীরে মঠে নিজের ঘরে বসে কয়েকদিন সেই চিন্তাই করলেন বিবেকানন্দ। চতুর্দিকে শান্ত নীরবতা। প্রশস্ত নদী দীপ্ত সূর্যালোকে নাচছে। কলকাতায় এখন শীতকাল। কিন্তু প্রতিদিন মধ্যাহ্ন বেশ উষ্ণ ও উজ্জ্বল। যেন দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় আছেন। সর্বত্র সবুজ আর সোনালি রঙের ছড়াছড়ি। ঘাস মখমলের মতো কোমল। বাতাস শীতল ও আরামপ্রদ

পেছনে ফেলে এসেছেন আনন্দমুখর প্যারিস, প্রাচীন কনস্টান্টিনোপল, ক্ষুদ্র এথেন্স, পিরামিডশোভিত কায়রো।

চঞ্চল বিহঙ্গম বিবেকানন্দকে এখন ডাকছে হিমালয়, ডাকছে মায়াবতী। কিন্তু ঘোর ডিসেম্বরের শীতে যাবেন কী করে সেখানে?

অদম্য বিবেকানন্দ ২৭ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে মায়াবতীর উদ্দেশে রওনা হলেন। প্রথমে যাবেন কাঠগোদাম, তারপর সেখান থেকে পঁয়ষট্টি মাইল দূরে মায়াবতী। ওই দুর্গম পার্বত্য পথ কুলি, ডান্ডির সাহায্য ছাড়া যাওয়া অসম্ভব। ৩১ ডিসেম্বর, চট্টগ্রাম মেলে রবীন্দ্রনাথ সপুত্র ফিরছিলেন শিলাইদহে। একই সময় বারো ইঞ্চি বরফের মধ্য দিয়ে পথ করে চলল ডান্ডিওয়ালারা। অপূর্ব শোভা। গাছপালা, পথ পাহাড় সব সাদায় সাদা। তার ওপর ঝক ঝক করছে সূর্যের আলো।

লাঠিতে ভর দিয়ে আর স্বামী বিরজানন্দের কাঁধে হাত রেখে ধীরে ধীরে চলেছেন স্বামীজি। মুখে স্পষ্ট ক্লান্তি ও দুর্বলতার ছাপ। একবার বসে পড়লেন। হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগলেন। বুকটা হাপরের মতো উঠতে নামতে লাগল।

খুব কষ্ট হচ্ছে স্বামীজি?

আস্তে আস্তে দম নিয়ে বললেন বিবেকানন্দ, জানিস, বিরজা, এক সময় বিশ-পঁচিশ মাইল হাঁটা কিছুই ছিল না আমার কাছে। আর এখন কী দুর্বল হয়ে গেছি! আমি আর বেশি দিন নেই রে বিরজা! জীবনের শেষে এসে পৌঁছেছি আমি

চমকে উঠলেন স্বামী বিরজানন্দ। বিবেকানন্দের মুখে স্পষ্ট মৃত্যুর ছায়া।

অবশ্য অল্পক্ষণের মধ্যেই সামলে উঠলেন বিবেকানন্দ। উঠে দাঁড়ালেন তিনি। মুখে ফিরে এল স্বভাবসিদ্ধ প্রসন্নতা। মেতে উঠলেন হাসিঠাট্টায়।মজা করতে লাগলেন কুলি আর ডান্ডিওয়ালাদের সঙ্গে। একজন কুলি বেশ মজার। বহুবার বিয়ে করলেও সব স্ত্রীই গত হয়েছে তার। বিপত্নীক এই ব্যক্তির আবার বিয়ে করার ইচ্ছে প্রবল। স্বামীজি জানতে পেরে বললেন, কী হে, বিয়ে করবে নাকি?

কুলিটির বিয়ের ইচ্ছে খুবই আছে কিন্তু যৌতুকের টাকা কোথায় তার?

বিবেকানন্দ উদার হাসলেন, রো, আমিই তোমায় সে টাকাটা দিলাম?

কুলি আহ্লাদে আটখানা হয়ে ঘন ঘন স্বামীজিকে প্রণাম করতে লাগল।

 

মায়াবতীর পথে ঝড় ঝঞ্ঝা, তুষার, বৃষ্টিপাত কিছুই অবশ্য বাদ রইল না। রাতে বাধ্য হয়ে অভিযাত্রীরা আশ্রয় নিলেন এক দোকানঘরে। চোদ্দ হাত লম্বা , দশ হাত চওড়া এক চালা। তাতেই ঠাসাঠাসি করে রইলেন অভিযাত্রীরা। আগুন জ্বালাতে হয়েছে। এতগুলো লোকের রান্না হবে। প্রচণ্ড শীতে শরীর রাখতে হবে উষ্ণ। ধোঁয়ায় সেই জীর্ণ কুটির ভরে গেল। কাশতে কাশতে নাজেহাল হয়ে উঠলেন স্বামীজি। আজকাল মেজাজ তাঁর অল্পেই গরম হয়ে ওঠে। ছেলেমানুষের মতো দোষারোপ করতে শুরু করলেন সফর-সঙ্গীদের ওপর।

সব ব্যাটা আহাম্মকআমাকে এই বরফের মধ্যে মারবার জন্য নিয়ে এসেছে!

রাগের চোটে বিবেকানন্দর মনে রইল না যে, এই ঘোর ডিসেম্বরের শীতে জেদ করে তিনিই সবাইকে টেনে এনেছেন। অবশ্য কিছু পরে ভুল বুঝে শিশুর মতো শান্ত হয়ে সঙ্গীদের বললেন, ‘আচ্ছা, যা হবার হয়েছে, বকেছি, কিছু মনে করিসনি। বাপও তো ছেলেকে বকে। আর এখন যতটা পারা যায় রাতটা কাটাবার ব্যবস্থা কর। বিরজা ও বিরজা!’

কী স্বামীজি?

পিঠটা একটু টিপে দে বাবা, বড্ড ধরেছে

বিরজানন্দের মালিশে কিঞ্চিৎ আরাম বোধ হল স্বামীজির। আগের তুলনায় একটু প্রফুল্ল হয়ে উঠলেন তিনি।

রাতের খাদ্য আধ ইঞ্চি পুরু চাপাটি এবং তৎসহ ঝাল আলুর তরকারি। চিবোতে চিবোতে চোয়াল ব্যথা হয়ে যায়। বাইরে ক্রমাগত বৃষ্টি আর তুষারপাত হয়ে চলেছে। ঘরের ভেতরে ধোঁয়ায় দম আটকে আসতে চায়। এর মধ্যেই শেষ রাতে ঘুম ভেঙে গেল স্বামী বিবেকানন্দের। গায়ে মোটা ধুসো কম্বল। দম যেন আটকে আসতে চায়।

তাঁর পাশে ফিসফিস করে পাহাড়ি ভাষায় দুজন কথা বলছে, আশ্রয়দাতা দোকানি ও তার সহকারী।

পাহাড়ি ভাষায় অভিজ্ঞ বিবেকানন্দ একাগ্র হয়ে শুনতে লাগলেন সে কথোপকথন

শালা, হারামি লৌন্ডা বাঙ্গালি!

না, না ইয়ে তো সাধুবাবা আছে

ধুধুর! ইসকা জনৌ ভি নাই , জটা ভি নাই। ইয়ে সব বাঙ্গালি সাধু তো বিলকুল জুয়াচোর আছে। শালা মছলিখোরসব পতা হ্যায় মেরা

তোকরেগা কেয়া?

সুবা হোগি তো লাথ মারকে ভাগায়েগা উয়ো হারামি লৌন্ডাকো। বহুত বুরবাকি হুয়া ইস কো রাত্ মে রহনে দেনা

বিবেকানন্দর মনে পড়ল যে গত সন্ধ্যায় এই লোকটাই অতিরিক্ত বিনয় দেখিয়ে বলেছিল, বেশি বরফ যদি পরে তাহলে কালও থাকুন। কোনো অসুবিধা নেই স্বামীজি!

এই তাঁর দেশের লোকএদেরই কল্যাণের কথা ভেবে ভেবে খেটে খেটে আয়ুক্ষয় করে অকালে মরতে চলেছেন তিনিএদেরই চিন্তায় চিন্তায় অক্লান্ত অভিযাত্রায় চষে ফেলেছেন সারাটা দুনিয়াকম্বল মুড়ি দিয়ে বিবেকানন্দ মনকে শান্ত করার চেষ্টা চালাতে লাগলেন। গীতায় তো এই জন্যই তো বলেছে কাজ করে যেতে, ফলের প্রত্যাশা না করতে। সব দুঃখেরই অবসান আছে। সেই দুঃখ রাত্রির অবসানও হল অবশেষে।

বৃষ্টি থেমে গেছে, থেমে গেছে তুষারপাত, ঝলমল করে উঠেছে রোদ। দোকান ছেড়ে বেরোনোর আগে সেই দুর্মুখ দোকানদারকে প্রতিশ্রুত বকশিস দিলেন স্বামীজি। লোকটা স্বপ্নেও অতটা আশা করেনি।

দুপুর নাগাদ সদলে মায়াবতী পৌঁছলেন বিবেকানন্দ। চারদিকে দেওদার, সরল, ওক, রডোডেনড্রন গাছের সমাবেশ। শান্ত, নির্জন, আশ্রম পরিবেশ। ঘণ্টায় বারোটা বাজছে। আশ্রমে স্বামীজিকে অভ্যর্থনা জানাতে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে চারদিক। দরজায় রাখা হয়েছে মঙ্গলঘট।

বসবার ঘরে ইজিচেয়ারে আরামে পা ছড়িয়ে বসলেন বিবেকানন্দ। গরম চা দেওয়া হয়েছে। চা পান করতে করতে বাইরের শোভা দেখতে লাগলেন সবাই। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে দুগ্ধ ধবল ধরমঘর পাহাড়। চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে একের পর এক তুষারমণ্ডিত গিরিশৃঙ্গ দেখে।

মুগ্ধ বিবেকানন্দ বললেন, জানিস, বিরজা, আমার কী মনে হচ্ছে জানিস?

কী, স্বামীজি?

নে হচ্ছে যে এখানেই শেষ জীবনটা কাটিয়ে দিই। বই লিখি। গান করি। হেঁটে বেড়াই এই পাহাড়ি পথঘাটের মধ্য দিয়ে

তাই থাকুন না, স্বামীজি। আমরা মাথায় করে রাখব আপনাকে

কক্ষে প্রবেশ করেছেন মিসেস সেভিয়ার। বয়েসে বিবেকানন্দর থেকে একটু বড়ো, শান্ত, সমাহিত মূর্তি। পরনে বৈধব্যবেশ। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা।

বিবেকানন্দ উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন করলেন, পনি ঠিক আছেন তো?

ম্লান হাসলেন মিসেস সেভিয়ার, ঠিক আছি, একদম ঠিক আছিস্বামীজি

হোয়্যার হ্যাভ ইউ বেরিড হিম?

ডাউন বিলো বাই দ্য মারমারিং ব্রুক দ্যাট হি লাভড সো ওয়েল। হি ইজ সারাউন্ডেড দেয়ার বাই দ্য  বার্ডস অ্যানড দ্য বিজ, বাই দ্য ফ্রুটস অ্যান্ড দ্য ফ্লাওয়ার্স দ্যাট হি অ্যাডোরড। হি ইজ অ্যাট পিস ইন দ্যাট বি লাউড গ্লেড স্বামীজি, আই নো হি ইজ অ্যাট পিস

হাউ ওল্ড ওয়াজ হি?

দিস জানুযারি হি উড হ্যাভ বিন ফিফটি সিক্স। হি ওয়াজ মাচ টু ইয়াং টু ডাই স্বামীজি ,মাচ টু ইয়াং!

এতক্ষণ অবিচলিত থাকা মিসেস সেভিয়ারের চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

 

মাঘোৎসব উপলক্ষে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ মন্দির বাইরে-ভিতরে ফুল আর লতাপাতা দিয়ে সাজানো হয়েছে। ভেতরে গ্যাসের বাতি জ্বলছে। ওপরে সিলিঙে দুটো বড়ো বড়ো গ্যাসের ঝাড়। চলছে খোল-কর্তালসহ কীর্তন।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের আদি ব্রাহ্মসমাজ ভেঙে কেশব সেন করেছিলেন নববিধান ব্রাহ্মসমাজ। পরে সেখানেও ভাঙন লাগল। কুচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে কন্যা সুনীতিদেবীর

বাল্যবিবাহ দিলেন কেশবচন্দ্র, তাও আবার হিন্দু মতে! এদিকে এতদিন গরম গরম বক্তৃতা করেছেন বাল্যবিবাহের বিপক্ষে। লিখেছেন আগুনঝরা প্রবন্ধ। কেশবের এই দ্বিচারিতায় ক্ষেপে গিয়ে নববিধানের বেশ কিছু সদস্য সমাজ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর নেতৃত্বে তাঁরা গঠন করলেন সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ। ব্রাহ্ম আন্দোলন এইভাবে যখন ত্রিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে গতি হারাচ্ছে, তখনই একদিকে অভ্যুদয় ঘটল স্বামী বিবেকানন্দের। অন্যদিকে রাজনীতির ক্ষেত্রে সুরেন্দ্রনাথ ও আনন্দমোহন বসুর বাগ্মিতাও যুবকদের আকর্ষণ করতে লাগল। ব্রাহ্মদের গুরুত্ব বঙ্গীয় সমাজে ক্ষীয়মাণ হতে শুরু করল।

মহেশচন্দ্র আতর্থী অবশ্য সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের প্রতি তাঁর আনুগত্যে অটল আছেন। জানুয়ারির দুঃসহ শীতে অন্ধকার থাকতে থাকতে ভোর চারটেতে তিন ছেলেকে ঘুম থেকে টেনে তুলেছেন তিনি। তারপর চৌবাচ্চার ঠান্ডা জলে স্নান সেরে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে তারা ঘর ছেড়ে বাবার সঙ্গে পথে বেরিয়েছে।

মন্দিরের মধ্যে ঢুকে মহেশচন্দ্র বেদির নীচে কার্পেটপাতা অংশের এক কোণে গিয়ে বসলেন। বাবু, বুড়োরা দেখল যে, কাকভোরে বেরোলেও তারাই মন্দিরে প্রথম নয়। আরও দু-চারজন ব্যাকুলাত্মা আগে ভাগে এসে স্থান সংগ্রহ করেছেন।

কার্পেটের এককোণে কয়েকজন মিলে ভীষণ হুঙ্কারে কীর্তন করছেন:

তীক্ষ্ণ বিষব্যালী সম সতত দংশায় রে!

মহেশচন্দ্র চোখ বুজলেন। দেখাদেখি ছেলেরাও চোখ বুজল। ঈশ্বর অকৃতজ্ঞ নন। কাকভোরে অকারণে ধন্যবাদ দেওয়ার প্রতিফলস্বরূপ ছেলেদের চোখে তিনি ঘুমের প্রলেপ বুলিয়ে দিলেন। বসে বসেই ঘুমে ঢুলতে লাগল তিন ভাই। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর বুড়োর ঘুম চটকে গেল। লালুর মাথাটা ঢুলে এসে তার মাথায় খটাং করে লেগেছে। দুই ভাই ঘুম ভেঙে উঠে সচকিত হয়ে দৃষ্টি বিনিময় করলে—বাবা কী করছে?

মহেশচন্দ্রের ভাবান্তর নেই। নির্বিকল্প প্রস্তরমূর্তির মতো পিঠ সোজা করে বুক চিতিয়ে বসে আছেন তিনি।

কীর্তনিয়ার দল ততক্ষণে শান্ত হয়ে যে যার জায়গায় ধ্যানস্থ। কিছুক্ষণ আগেই তীক্ষ্ণ বিষব্যালীর দংশনের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানাচ্ছিলেন তাঁরা। এখন তাঁরা শান্ত, সমাহিত।

মন্দির ক্রমেই লোকে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। নিবিয়ে দেওয়া হল গ্যাসের আলো। জানালা দিয়ে ভোরের নরম আলো এসে মন্দিরগৃহকে অপূর্ব শ্রীতে মণ্ডিত করে তুলল। ব্রাহ্ম মুহূর্তের সেই আধো আলো, আধো অন্ধকারের বুকে হঠাৎ প্রস্রবণের মতো ভৈরবীর সুরধারা নেমে এল—

হেরি তব বিমল মুখ ভাতি

দূর হল গহন দুখ-রাতি

বুড়োরা দেখল যে, এক প্রিয়দর্শন যুবক কোকিলকণ্ঠে গান শুরু করেছে। তীক্ষ্ণ বিষব্যালীর ওপর বিশল্যকরণীর প্রলেপ দিয়ে ভৈরবীর ভৃঙ্গারে সে নামিয়ে আনছে আশার বাণী। আনন্দ উৎসারিত হচ্ছে অন্তরীক্ষ থেকে।

গান শেষ হতেই আচার্য ঢুকলেন মন্দিরে। পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী। দীর্ঘকায়, শ্যামবর্ণ ব্যক্তি। পরনে ধুতি ও নীল ফ্ল্যানেলের শার্ট। কাঁচাপাকা দাড়ি-শোভিত মুখে অন্যতর দীপ্তি। মহেশচন্দ্র আতর্থীর কুলগুরুমহেশচন্দ্রের ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষা, বিবাহ—সবেতেই পৌরোহিত্য করেছেন তিনি।

শাস্ত্রীমশাই বেদীতে আসনপিঁড়ি হয়ে বসলেন। দু-তিনটি যুবক খাতা-পেন্সিল নিয়ে তাঁর উপদেশ লেখার জন্য বেদিমূলে বসে গেল। শাস্ত্রীমশাই ভাঙা গলায় বললেনসংগীত!

সঙ্গে সঙ্গে ওপর থেকে বাজনার শব্দ ও গান আরম্ভ হয়ে গেল। সংগীতান্তে শিবনাথ শাস্ত্রী ভাষণ শুরু করলেন।

 

ব্রাহ্ম ভ্রাতা ও ভগিনীরা, আজ এই পবিত্র মাঘোৎসবের দিনে ঈশ্বরকে স্মরণ করিয়া আমাদের মন্দিরে আমরা সমবেত হইয়াছি। আজ এই শুভদিনে, পিতার ভবনে, অমৃত সদনে আমরা সবাই উপস্থিত।

আজ এই আনন্দযজ্ঞে আমাদের সবার নিমন্ত্রণ। আমি আজ ঈশ উপনিষদ থেকে কিছু বলিব। উপনিষদ অর্থে জ্ঞান, অত্যন্ত উচ্চকোটির জ্ঞান। ঈশ অর্থে ঈশ্বর, যিনি সবকিছুর অন্তরস্থ আত্মা। এই জ্ঞান আমাদের জীবনে শান্তি ও আনন্দ আনিয়া দেয়।

 

ওঁ ঈশাবাস্যমিদং সর্বং

যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ

তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা

মা গৃধ কস্য সিদ্ধনম্

 

পরিবর্তনশীল এই জগতে সবকিছুরই ক্রমাগত পরিবর্তন হইতেছে। তবু সবকিছু পরমেশ্বরের দ্বারা আবৃত। ত্যাগ অনুশীলন কর। সর্বভূতের চৈতন্যস্বরূপ আত্মায় দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হও। অপরের ধনে লোভ করিয়ো না।

 

অনেজদেকং মনসো জবীয়ো

নৈনদ্দেবা আপ্লুবন্ পূর্বমর্ষৎ

তদ্ধাবাতাহন্যানত্যেত্তি তিষ্ঠত

তস্মিন্নপো মাতরিশ্বা দধাতি

 

ব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয়। ব্রহ্ম একাধারে স্থির ও অপরদিকে চঞ্চল। তিনি মন অপেক্ষাও দ্রুতগামী। তিনি সবসময়ই সবার আগে রহিয়াছেন। ইন্দ্রিয়সমূহও এঁর নাগাল পায় না। নিজে স্থির থেকেও তিনি সকলকে অতিক্রম করিয়া যান। শূন্যের দেবতা হিরণ্যগর্ভ রূপে তিনি এই স্থূল ও দৃশ্যমান জগতের সবকিছুকে ধরিয়া রাখিয়াছেন।

 

তদেজতি তন্নৈজতি তদ্দূরে তদ্বন্তিকে

তদন্তরস্য সর্বস্য তদু সর্বস্যাস্য বাহ্যতঃ

 

তিনি সচল হইয়াও স্থির। তিনি দূরে আছেন আবার কাছেও আছেন। তিনি সবকিছুর ভেতরেও আছেন আবার বাহিরেও আছেন।

 

যস্তু সর্বাণি ভূতানি আত্মন্যেবানুপশ্যতি

সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো না বিজুগুপ্সতে।।

 

যিনি নিজের মধ্যে সকলকে দেখিয়া থাকেন এবং সবার মধ্যে নিজেকে দেখেন, তিনি কোনো  ঘৃণা পোষণ করেন না।

এইরকম নানা ভালো ভালো কথা অলঙ্কারপূর্ণ ভাষায় পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর কণ্ঠ থেকে নির্গত হতে লাগল। বুড়ো, বাবু বা লালুর কাছে তা প্রহেলিকার মতো ঠেকল। লালুর মনে হতে লাগল এও এক ইস্কুল। বেদির ওপর বসে মাস্টারমশাই চেঁচিয়ে পাঠ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। চারদিকের নরনারী হল ছাত্রছাত্রীর দল।

বুড়ো দেখল যে পাশের এক বৃদ্ধ হেঁচকি তুলে কাঁদছেন। বিড়বিড় করে বলছেন কী সব। আশপাশের আরও দু-তিনজন ভদ্রলোক একই রকম হেঁচকি তুলে কাঁদতে শুরু করলেন। অদূরে আসীন ব্রাহ্মসমাজের এক নামজাদা, গম্ভীর ও রাশভারী সদস্যও নীরবে অশ্রুপাত করতে লাগলেন। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুজল তাঁর বিশাল দাড়ির আগায় নোলকের মতো দুলতে লাগল।

লালু দাদার পিঠে এক খোঁচা মারল, দাদাদাদা!

কী ব্যাপার রে?

ই লোকটা কি আমাদের বকছে? সবাই এত কাঁদছে কেন রে দাদা? আমরাও কি কাঁদব?

ইতিমধ্যে শিবনাথ শাস্ত্রী ভগ্নকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন:

ওই যে বিহঙ্গ শূন্যপথে মুক্তপক্ষে প্রয়াণ করিল

বুড়োদের পাশে বসে থাকা বৃদ্ধ ভদ্রলোক যিনি এতক্ষণ হেঁচকি তুলে কাঁদছিলেন, তিনি এবার ডুকরে উঠলেন, জয় দয়াময়, জয় দয়ারাম!

লালু আবার খোঁচা দিল, দাদা, পালাই চল। এবার বোধহয় ওই লোকটা বেদি থেকে নেমে আমাদের মারবে

কিন্তু শাস্ত্রীমশাই বেদি থেকে আর নামলেন না। তাঁর চিৎকারের মধ্যে ধমকের সুরটা কমতে কমতে ক্রমশ করুণ সুরে এসে পৌঁছল। তাঁর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল অশ্রুভারাক্রান্ত।

যখন তিনি তাঁর ভাষণের প্রায় শেষে এসে গেছেন তখনই সহসা এক কাণ্ড ঘটল। ভোরে যে যুবকটি কোকিল-কণ্ঠে গান জুড়েছিল, তাকে এতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। এবার সে হন্তদন্ত হয়ে মন্দিরে প্রবেশ করল। সটান উঠে গেল মঞ্চের ওপর। তার হাবভাব দেখে মনে হয় বিষম কোনো ঘটনা ঘটেছে। শাস্ত্রীমশাইয়ের হাতে একটা কাগজ দিল সে। কানে কানে ফিস ফিস করে কী যেন বলল।

শিবনাথ শাস্ত্রী চমকে উঠলেন। সটান উঠে দাঁড়ালেন তিনি। হাবভাব দেখে মনে হল সত্যিই কেঁদে ফেলবেন। ফেললেনও। দু-চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল পরে তাঁর নীল ফ্ল্যানেলের শার্ট ভিজিয়ে দিতে লাগল। ভগ্নকণ্ঠে সমবেত ভক্তমণ্ডলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ব্রাহ্ম ভ্রাতা ও ভগিনীরা, আজ এই পবিত্র মাঘোৎসবের দিনে অত্যন্ত দুঃখের সংবাদ আছে। সত্য সত্যই ইন্দ্রপতন ঘটিয়াছে। আমাদের পরমারাধ্যা মাতৃস্বরূপা মহারানি ভিক্টোরিয়া আর ইহলোকে নাই। আমাদের, তাঁহার সন্তানদের শোকসাগরে নিমজ্জিত করিয়া তিনি পরমলোকে গমন করিয়াছেন। আজ আমরা সত্য সত্যই মাতৃহারা হইলাম।

শিবনাথ শাস্ত্রীর ঘোষণায় ব্রাহ্মমন্দিরে সমবেত সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন। প্রগাঢ় নৈঃশব্দ্য সভাগৃহে নেমে এল। গত কয়েকদিন ধরেই খবরের কাগজে মহারানির অসুস্থতার কথা প্রচারিত হচ্ছিল। বৃদ্ধা হয়েছেন তিনি। তবু এই মৃত্যুর খবর সবার কাছেই আকস্মিক বজ্রাঘাততুল্য মনে হল। আপামর ভারতবাসীর কাছে রানি ভিক্টোরিয়া তো শুধু সম্রাজ্ঞী নন, তিনি যে ভারতমাতা। কতদিন ধরে যে তিনি সিংহাসনে আসীন, তা কারোই মনে নেই। লোকের ধারণা তিনি অজর, অমর, অক্ষয়।

সে ধারণা শাস্ত্রীমশাইয়ের পরবর্তী বক্তব্যে প্রকট হল। যুবকটি একটি ভাঁজ করা কাগজ তাঁর হাতে তুলে দিয়েছে। সেটা খুললেন তিনি। অভ্যাগতদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আমাদের সুযোগ্য ব্রাহ্মভ্রাতা সুপবিত্র সংবাদ পাইবামাত্র জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি গিয়াছিল। তথায় মহর্ষির সুযোগ্য পুত্র কবিবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত এই ভিক্টোরিয়া-প্রশস্তির কপি সে সংগ্রহ করিয়াছে। রবীন্দ্রনাথ সংবাদ পাইবামাত্র শোকাকুল হইয়া রাত জাগিয়া এই প্রবন্ধ লিখিয়াছেন। ইহা আদি ব্রাহ্মসমাজেও আজ পাঠ হইবে এবং তাহাদের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হইবে। আপনারা জানেন যে, ব্রাহ্মসমাজে সম্প্রদায়গত বিভেদ রহিয়াছে। তাহা থাকিলেও, আজ এই পরম শোকের দিনে আমরা সবাই এক। মাতৃবিয়োগের ব্যথা সব ব্রাহ্মর বুকেই বাজিতেছে। আপনাদের অনুমতিক্রমে ইহা পাঠ করিতেছি

ভারত সাম্রাজ্ঞী মহারাণী ভিক্টোরিয়া—যিনি সুদীর্ঘকাল তাঁহার বিপুল সাম্রাজ্যের জননীপদে অধিষ্ঠিতা ছিলেন, যিনি তাঁহার রাজশক্তিকে মাতৃস্নেহের দ্বারা সুধাসিক্ত করিয়া তাঁহার অগণ্য প্রজাবৃন্দের নত মস্তকের উপর প্রসারিত করিয়া রাখিয়াছিলেন, ক্ষমা, শান্তি ও কল্যাণ যাঁহার অকলঙ্ক রাজদণ্ডকে পরিবেষ্টন করিয়াছিল, সেই ভারতেশ্বরী মহারাণী যে মহান পুরুষের নিয়োগে এই পার্থিব কর্মভার গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং যাহার প্রসাদে সুচিরকাল জীবিত থাকিয়া অনিন্দিতা রাজশ্রীকে দেশে কালে ও প্রকৃতিপুঞ্জের হৃদয়ের মধ্যে সুদৃঢ়তররূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন- অদ্য সমস্ত রাজসম্পদ পরিহার পূর্বক ললাটের মাণিক্যমণ্ডিত মুকুট অবতারণ করিয়া একাকিনী সেই বিশ্বভুবনেশ্বরের নিস্তব্ধ মহাসভায় গমন করিয়াছেন। পরমপিতা তাঁহার মঙ্গল করুন।

 

শাস্ত্রীমশাইয়ের অশ্রুভারাক্রান্ত ভাষণ শেষ হওয়ার পর সভায় শোক উথলে উঠল। প্রবীণ ব্রাহ্মরা হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদতে লাগলেন। চোখের জল অনেকেরই দাড়ি ভিজিয়ে দিল। বুড়ো, বাবু আর লালু অবাক হয়ে দেখল যে, তাদের দোর্দণ্ডপ্রতাপ পিতা মহেশচন্দ্রও শিশুর মতো কাঁদছেন। বিড়বিড় করে বলছেন, মা চলে গেল!মা চলে গেল!আমি এই দ্বিতীয়বার আমার মাকে হারালাম।

লালু অবাক হয়ে বলল, দাদা, সবাই এত কাঁদছে কেন রেকুইন ভিক্টোরিয়া কে ছিল রে?

বাবু মুরুব্বির মত ফিস ফিস করে বলল, বোকা কোথাকার! টাকার নোটে বুড়িটার ছবি দেখিসনিবুড়োগুলোকে কাঁদতে দে। বুড়িটা মরেছে, বেশ হয়েছে! আপদ গেছে! ওটাই তো ছিল আদি শয়তান! আমাদের এতদিন তাঁবে রেখেছে তো ওই! ও গেছে, এবার দেখবি বৃটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যাবে

(ক্রমশ…)

 
 
top