হম হ্যাঁয় কি হম নেহি

 

হায়দার (২০১৪)

Haider_Poster

 

১৬২ মিনিট

নির্দেশকবিশাল ভরদ্বাজ

মে ১১২০০১। সকালবেলা শফি দু-জন আলাদা আলাদা টিচারের কাছে ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রি পড়তে গিয়েছিল। দু-জন দুটো আলাদা গ্রামে থাকেন। শফির বাবা চেয়েছিল যে, সেইদিন পড়তে না গিয়ে শফি বরং তার অনন্তনাগের স্টলে তাকে সাহায্য করে। শফি কথা শোনেনিসে পড়তে চলে গিয়েছিল। সে বেলা বারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরেছিল। আমি ওকে বললাম খেয়ে নে। ও বলল না আগে কাঠ চেরাই কল থেকে জ্বালানি কাঠগুলো নিয়ে আসি।‘ কুড়ি মিনিট পর গাড়ি ভর্তি কাঠ নিয়ে শফি ফেরে। শামিমা (শফির মাসিঁড়ির কাছে মাটিতে একটা জায়গাযেখানে একটা ছোট্ট বাচ্চা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কলা খাচ্ছিলদেখিয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল, ‘ওইখানেই ও কাঠগুলো রেখেছিল। তারপর যায় মসজিদে নামাজ পড়তে।

আমার সাথে শফির দেখা হয় রাস্তার পাশের মসজিদটায়।‘ পাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠস্বর বলেছিল। ব্রাউন শার্ট আর লুজ টি-শার্ট পরা ছেলেটা বারান্দার এক ধারে বসেছিল। আমি আগে লক্ষই করিনি। আমি পরে জানতে পারি, সে হল শফির বন্ধু মুশতাক। আমরা পাঁচজন ছিলাম। শফির ভাই বিলালও আমাদের সাথে ছিল। এমন সময় শফি এল। আমরা সেইদিন নামাজ পড়তে যাইনি। রাস্তার ধারে একটা চিনার গাছের নীচে বসে আমরা গল্প করছিলাম।‘ সেইদিন উগ্রপন্থী আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধ হচ্ছিল কাবামার্গ গ্রামে। শফির স্কুলের কাছেই। আমরা সেই কথাই বলাবলি করছিলাম। আমাদের মনে হয়েছিল হয়তো স্কুলবাড়িতে আগুন ধরে গিয়েছে। সেই সময় আমরা দেখি কতগুলো আর্মির ট্রাক এগিয়ে আসছে‘ ছেলেগুলো তাড়াতাড়ি করে পাশের রাস্তায় ঢুকে পড়ে। আর্মির ট্রাকগুলো রাস্তার ধারে দাঁড়ায়। এবং তারপর জওয়ানরা নেমে ছেলেগুলোকে তাড়া করে। মুশতাক এবং আরেকটা ছেলে জোরে দৌড়ে পালাতে পারে। বাকি চারজনকে সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা ধরে ফেলে। গ্রামের লোকেরা দেখে, চারটে ছেলেকে ট্রাকে তুলে আর্মির লোকেরা কাবামার্গের দিকে যেতে থাকে।

শমিনা সেইসময় এই বারান্দায় বসে রাত্রের তরকারি ধুচ্ছিল। গ্রামের কয়েকজন লোক এসে তাকে বলে যে, শফি আর বিলালকে আর্মির লোকেরা ধরে নিয়ে গিয়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাকি ছেলেগুলোর মা এবং বোনেরা সেইখানে এসে হাজির হয়। সর্ষেখেতের মধ্যে দিয়ে তারা দৌড়াতে থাকে কাবামার্গের দিকে। সৈন্যরা গ্রামের বাইরে থেকে ঘিরে রেখেছিল। মেয়েদের তারা আটকানোর চেষ্টা করে। মেয়েরা পালটা তাদের ধাক্কা দেয়চিৎকার করতে থাকে। সেই দিন আল্লা আমাকে সাহস দিয়েছিল। সেই দিন আমাকে যে-ই আটকাতে এসেছিলআমি তার সাথেই মারামারি করেছিলাম। সাধারণতআমরা সৈন্য দেখলে ভয় পাইকিন্তু সেই দিন আমি দাঁড়াইনি। সোজা চলে গিয়েছিলাম সেই বাড়িটার সামনে, যেখানে এনকাউন্টার চলছিল।‘ ভারতীয় সেনা আর ইখওয়ানরা (আত্মসমর্পণ করা উগ্রপন্থী, যারা এখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর হয়ে লড়েএকটা একতলা বাড়িকে ঘিরে চারপাশ থেকে গুলি ছুড়ছিল। আমি দূর থেকে বিলালকে দেখতে পাই। কিন্তু শফি ছিল না। আমি বিলালের দিকে দৌড়ে যাইওর হাত ধরে টেনে নিয়ে আসতে থাকি।‘ বিলাল মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, সেনাবাহিনীর লোকেরা শফির হাতে একটা মাইন দিয়ে ওকে ওই বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

একজন জওয়ান শামিমার হাতে বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করে বিলালকে কেড়ে নেয়। শামিমা জওয়ানের দিকে চিৎকার করে আবার বিলালের হাতটা ধরে ফেলে। বিলাল বলে, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, মা। ওরা এতক্ষণে শফিকে মেরে ফেলেছে।‘ জওয়ানটা বিলালের হাত ধরে জোরে টানতে টানতে এগিয়ে যায়। শামিমা ভয়ে স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। জওয়ানটা বিলালের হাতে একটা মাইন গুঁজে দিয়ে তাকে বাড়িটার দরজার দিকে ঠেলে দেয়। তখনো গুলি চলছিল। আমার কিছু একটা হয়েছিল সেইদিন। আমি দেখলাম বিলালের পা কাঁপছে। ও মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। আমি বিলালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।‘ শামিমা বিলালের হাত থেকে মাইনটা কেড়ে নিয়ে তাকে জাপটে ধরেছিল। তিনজন জওয়ান আর একজন অফিসার তাদের ঘিরে ছিল। তারা বিলালকে ছেড়ে দিতে বলছিল। টিফিন বক্সের মতো দেখতে মাইনটা হাতে ধরে শামিমা অফিসারকে বলেছিল বিলালকে ছেড়ে দিতে। বদলে সে ঢুকবে মাইন হাতে। আমি মাইনটা হাতে ধরে রেখে অফিসারকে বলিআমায় উড়িয়ে দাও।‘ অফিসার চুপ করে ছিল। শামিমা আবার চিৎকার করে উঠেছিল। তখন সেই অফিসার জওয়ানদের বলল আমাদের ছেড়ে দিতে। আমি বিলালকে ধরে ছিলাম। আমরা যখন চলে আসছিলাম তখন দেখি ওরা একটা বুড়ো লোকের হাতে মাইন দিয়ে ঠেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে বাড়িটার ভিতর।

এই দৃশ্যটা বিশাল ভরদ্বাজ তাঁর হায়দার  ছবিতে রাখেননি। রেখেছেন বাশারাত পিরতাঁর লেখা কার্ফিউড নাইট১ বইতে। বাশারাত কাশ্মীরের ছেলে। অল্প বয়সে উগ্রপন্থী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে তাঁর পরিবার তাঁকে পাঠিয়ে দেন আলিগড়ে পড়াশুনো করতেঠিক হায়দারেরই মতো। বাশারত পরে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যান। এখন থাকেন নিউ ইয়র্কে। বাশারাত হায়দার  ফিল্মের একজন স্ক্রিপ্ট রাইটার। এমন একজন মানুষ যিনি ফিল্মের স্ক্রিপ্ট লেখেনসেই সিনেমা কাশ্মীরের গ্রাউন্ড রিয়ালিটি দেখাবে এমনটা আশা করাই যায়।

ছবির শুরু হায়দারের বাবা হিলাল মিরকে (নরেন্দ্র ঝাদিয়ে। হিলাল একজন ডাক্তার। জঙ্গি নেতার অপারেশন করতে তিনি তাঁকে বাড়ি নিয়ে আসেন। হিলালের অ্যাম্বুলেন্স যখন তাঁর গ্রামে ঢুকছে তখন দেখা যায়, হায়দারের মা গাজালা মির (টাবুস্কুলে পড়াচ্ছেন। স্কুলের ছোটো ছোটো বাচ্চাদের তিনি একটা রাইম শেখাচ্ছেন। কাশ্মীরি অ্যাকসেন্টে ভরা সেই রাইম হল:

হোয়াট ইজ আ হোম

ইট ইজ ব্রাদারস অ্যান্ড সিস্টারস

অ্যান্ড ফর দেম ফাদারস এন্ড মাদার্স

ইট ইজ আনসেলফিশ অ্যাকটরস

অ্যান্ড কাইন্ডলি শেয়ারিং

অ্যান্ড শোয়িং ইয়োর লাভেড ওয়ানস

ইউ আর অলওয়েস কেয়ারিং

হোয়াট ইজ এ হাউজ?

ঠিক এই সময় জানলা দিয়ে দেখা যায় হিলাল মিরের অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের ভিতর ঢুকছে। ক্যামেরা প্যান করে তাকে ধরে জানলা থেকে জানলায়। এই রাইমটাকেই ছবির প্রধান সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেন পরিচালক বিশাল। ভাইবোনমাবাবাকে নিয়ে স্বার্থহীনভাবে সবার সাথে জীবন ভাগ করে নেওয়া স্নেহময় জীবনের কথা বলা আর প্রায় তার সাথে সাথেই ছবির থিম মিউজিকের প্রয়োগ বলে দেয় এইটাই এই সিনেমার প্রধান থিম। ঘর আর তার বাসিন্দাদের স্বার্থহীন স্নেহময় যাপন অথবা তার অভাব।

ছবির প্রথম অংক বা অ্যাক্ট এই ধারণাটাকেই এগিয়ে নিয়ে যায়। বিশাল পরের পর ইমেজারি এবং সংলাপে এগিয়ে নিয়ে যান এই ঘর-এর সংজ্ঞাকেই। একজন লাইট মেশিনগানধারী আর্মি জওয়ানের পয়েন্ট অব ভিউতেতারের জালের মধ্যে দিয়ে আমরা দেখতে পাই হিলালের অ্যাম্বুলেন্স আর্মির চেকপোস্ট পার হচ্ছে। এই পয়েন্ট অব ভিউ থেকেই ছবিতে এস্ট্যাব্লিশড হয় বন্দুকধারী একটা রাষ্ট্রের কনসেপ্ট। যে রাষ্ট্র তারের বেড়াজালের ভিতর থেকেঅস্ত্র হাতে ঘর‘-কে দেখছে। এর পরের দৃশ্যও খুব শক্তিশালী। হিলাল আর গাজালার কথোপকথন আর পিছনে জল ফোটার আওয়াজ। একটা সম্পর্ক যে আসলে ফুটন্ত জলের মতো অতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর পরের সংলাপ লক্ষ্ করুন, ‘আগ লাগওয়া দেঙ্গে পুরা ঘর মে। ঘর নেহি পুরা গাঁও।‘ বিশাল তার ঘর-এর সংজ্ঞাকে আরো বড়ো করে ফেলেনঘর নেহি পুরা গাঁও। আর একটা সম্পর্কের প্রবল উত্তাপ যেন একটা ঘরকে পুরো জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

গাজালা মিরের রাইম বলার দৃশ্যের ঠিক আগে কাশ্মীরের গন্ডোলা আর চিনার গাছের কিছু সিগনেচার শট আমাদের জানিয়ে দিয়েছে ছবির স্থান কাশ্মীর। কাশ্মীরের একটা ঘরআর্মির বন্দুকপালটা মিলিট্যান্টদের কালাশনিকভএকটা উত্তপ্ত সম্পর্ক – নারী এবং পুরুষের। এর পরেই পরিচালক তাঁর নিজের দৃষ্টিভঙ্গিমাও বলে দেন। গাজালা মির যখন হিলালকে প্রশ্ন করেন, ‘কিসকে তরফ হ্যায় আপ?’ হিলাল উত্তর দেনজিন্দেগি কে।

এর খানিক পরেই ছবির আরো দরকারি একটা দৃশ্যরক্ত ভেজা কাপড় দেখে গাজালা মিরের বাথরুমে আয়নার সামনে মুখে জল দেওয়া। আয়নায় দেখা তার রিফ্লেকশনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর অস্বস্তি। আর তার কিছু পরেই ফোন বেজে উঠতে থাকে। ছবির চিত্রনাট্যের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্লট পয়েন্ট এই ফোন।

এরপরেই দেখা যায় আর্মির ক্র্যাক ডাউন। জিপের ভিতর মুখ-ঢাকা কাপড় পরা কারও হিলাল মিরকে চিনিয়ে দেওয়া। ছবির এই দৃশ্যগুলো ঠিক যেন কার্ফিউড নাইট  বই থেকে তুলে আনা। সেই একই ইমেজারি। আর এর পরেই আর্মি এবং মিলিট্যান্টদের গুলি বিনিময়ের মাঝে ছবির সেই দৃশ্য, যেখানে রকেট লঞ্চারের শেলের আঘাতে আগুনে ঢেকে যাচ্ছে হিলাল মিরের বাড়ি। হিলাল মিরের ঘর কাঁটাতারের মধ্যে দিয়ে দেখা জ্বলতে থাকা এই বাড়িটার শটের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় এই ছবির প্রথম অংক। আর পরিচালক এই ইমেজটার মধ্যে দিয়ে বলে দেন তাঁর ছবির ল্যেইটমোটিফ একটা পুড়তে থাকা ঘর। সেই ঘরের মানুষেরা কি সত্যিই স্বার্থহীনস্নেহময়নাকি তাদের সেই হতে পারা না-হতে পারার মধ্যেই পুড়ে গেল হায়দারের ঘর? কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে দিয়ে দেখা জ্বলতে থাকা কাশ্মীর?

ছবির দ্বিতীয় অংক শুরু হয় হায়দারকে (শাহিদ কাপুরদিয়ে। হায়দারসেই হায়দার যে ফিরে আসছে নিজের ঘরে। প্রায় একই সঙ্গে এস্ট্যাব্লিশড হয় তার প্রেয়সী আরশিয়া (শ্রদ্ধা কাপুর)। হায়দার ফিরে যেতে চায় তার নিজের ঘর‘-যে ঘরের বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই। পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তুপে পরিণত একটা বাড়ি। হায়দারের ঘর পুড়ে গিয়েছে। ইন্ডিয়ান আর্মি ধ্বংস করে দিয়েছে তার ঘরকে। হায়দারকে কাঁদতে বলছে তার প্রেয়সীসে কাঁদতেও পারছে না। ছবির ইনসাইসিভ মোমেন্ট এই দৃশ্যটাই। ঘর পুড়ে যাওয়ার পর কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে হায়দার? কাশ্মীরের পুড়ে যাওয়ার পরে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে একজন আম কাশ্মীরি যুবক? এই হায়দার কবিতা লেখেপ্রেম করেআবার অনন্তনাগকে ইসলামাবাদ বলে ডাকায় তাকে গ্রেফতারও হতে হয়। তার বাবা হারিয়ে গিয়েছেতার ঘর পুড়ে গিয়েছেসে কি আর কবিতা লিখতে পারবেপ্রেম করতে পারবেসাধারণ থাকতে পারবে?

হায়দারের উপর আরো আঘাত নেমে আসে খানিক পরেই। তার মা গাজালা আর কাকা খুররমকে গান গাইতে দেখে সে। পরিচালক এইখানেও একটা খুব সুন্দর দৃশ্যকল্প ব্যবহার করেন। হায়দার তার মাকে দেখে একটা পর্দার ভিতর দিয়ে। ক্লোজ শটেঅর্ধেক হেলানো মাথাটা খোলা জানলার দিকে। যেন অন্য এক মুক্তির দিকে তাকিয়ে একজন নারী। অথচ পর্দার ভিতর দিয়ে ঝাপসাকারণ তার ছেলে মাকে দেখছে প্রেম করার মুহূর্তে। অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে মা। পালটা শটে হায়দারের মুখ অসম্ভব সফট ফোকাসে ধরা। যেমন সাধারণত ধরা হয় বলিউডের নায়িকাদের। হয়তো ইনোসেন্স বোঝাতেই। মুহূর্তে অচেনা হয়ে যাওয়া মাকে বোঝাতে পর্দার ব্যবহার অসম্ভব লালিত। আর মা হায়দারকে দেখে বেরিয়ে আসেন পর্দা সরিয়েআবারও ক্লোজ শটে। যেন মা চান তাঁর ছেলের কাছে পৌঁছাতে। তিনি পর্দা সরিয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু হায়দার এই মাকে চিনতে চায় না। এই মা তার পছন্দের নয়। সে বেরিয়ে যায় কাশ্মীরের রাস্তায়।

হায়দারের দুই বন্ধুকেমূল হ্যামলেট  নাটকের দুই চরিত্র রোসেনক্রাঞ্জ আর গিল্ডেনস্টার্নকে, বলিউডের এক পরিচিত নায়ক সালমানের নাম দেন বিশাল। এইখানে একবার টিনটিনের থমসন আর থম্পসনকে (ফরাসি ডুপঁড এ ডুপঁড মনে পড়ে যায়। এই দুই চরিত্রকে প্রথম দেখা যায় বলিউডের নায়ক সালমান খানের ম্যায়নে পেয়ার কিয়া  ছবির গান মেরে রংগ মেঁ রংগনেওয়ালি‘ গানের সঙ্গে নাচতে। কিছুটা ভাঁড়ামোর মধ্যে। মেরে রংগ মেঁ রংগনেওয়ালি‘ কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই দু-জন আলোচ্য ছবিতে ভারতীয় ব্যবস্থার চর। এদের নাচের মাঝে ফোন আসে এসপি ডাউনটাউনআরশিয়ার বাবা পারভেজ লোন-এর (ললিত পারিমু)। এই দৃশ্যে দু-বার ফোন বাজে সালমান ও সালমানের। এবং দুইবারই ফোন বাজার সময় পিছনে বাজে মেরে সওয়ালোঁ কা জওয়াব দো

এইখানে একটা অসম্ভব শক্তিশালী সিকোয়েন্স তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃতভাবে সালমান নামটা ব্যবহার করার মধ্যে এবং গানের লিরিকের ব্যবহারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পরিচালক এই ধরণের চরিত্রের যে ভাঁড়ামো দেখাতে চেয়েছিলেন, সেটা অতিপ্রবল হয়ে গিয়েছে। আসলে ভারতীয় নিয় নুয়্যা ফিল্মগুলোতেও এই ভাঁড়ামো-আক্রান্ত চরিত্রগুলোর ব্যবহার বড্ড বেশি হয়ে গিয়েছেসেটা অনুরাগ কাশ্যপের ছবিতেই হোক বা বিশাল ভরদ্বাজের। ফলে চরিত্রের প্রয়োজনীয় ভাঁড়ামোটাও অতিমাত্রায় মনে হয়। এবং প্রবল সম্ভাবনা সত্ত্বেও সিকোয়েন্সটা জমে না।

এর পরের বেশ খানিকক্ষণ পরিচালক ব্যবহার করেন কাশ্মীরের রাজনৈতিক অবস্থা বোঝাতে। এবং এই নানাবিধ সিকোয়েন্সে তিনি ব্যবহার করেন ইদ্দিশ থেকে ইংলিশে আসা শব্দ হুৎজপাহযার বাংলা অর্থ হতে পারে দুঃসাহস। তবে তিনি শব্দটাকে ব্যবহার করেন ভারতীয় উচ্চারণেচুৎজ্‌পাহ। আর তার সাথে রাইম করান আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টের সংক্ষিপ্তসার আফস্পা  শব্দটাকে। ভারতীয় কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে এইভাবে ভারতীয় দৃষ্টিকোণ নিয়ে ঠাট্টা করাটা অসম্ভব দুঃসাহস। এই ঠাট্টার মধ্যে অনুচ্চারিত থাকে যে কথাটা তা হলপ্লেবিসাইটের বদলে আফস্পা দেওয়াটা ভারতীয় শাসনতন্ত্রের প্রচণ্ড দুঃসাহস। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও গানের সিকোয়েন্সের মধ্যে দিয়ে বলিউডি কায়দায় মন্তাজ ব্যবহার করে কাশ্মীরের অবস্থা এবং প্রধান চরিত্রের তার বাবাকে খুঁজতে যাওয়ার দৃশ্য তেমন দাগ কাটে না। গোটা পরিস্থিতি বোঝাতে একটা লো অ্যাঙ্গেলে তারকাঁটার মধ্যে দিয়ে লো অ্যাঙ্গেল লং শট আর একবার, আবারও ভারতীয় বন্দুক আগলে থাকা পয়েন্ট অব ভিউ শটে হিরোকে দেখানো—আগেই ব্যবহৃত হওয়ায় তেমনভাবে দাগ কাটে না আর। আর এত সব সিকোয়েন্সের মধ্যে অনেক মৃতদেহের মধ্যে রক্ত মেখে শুয়ে থাকা জীবন্ত মানুষের হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে উল্লাস করতে করতে ছুটে যাওয়াযা আবার বাশারত পিরের কার্ফিউড নাইট  বই থেকে তুলে আনাএকদম জমে না। অথচ একই কথা বইয়ে পড়ে হাড় হিম হয়ে গিয়েছিল। আসলে সমস্যা বোধহয় ওই গান আর বেশ দুর্বল ইমেজারি। আর তার মধ্যে জোর করে ঢোকানো এত শক্তিশালী ঘটনা। একই জিনিস আরো রিয়েলিস্টিকভাবে গল্পের মধ্যে ব্যবহার করলে হয়তো ভারতীয় মেইনস্ট্রিম সিনেমায় একটা উল্লেখযোগ্য দৃশ্যের জন্ম হতে পারত।

এরপর গল্পে আসে ৯০-এর দশকে কাশ্মীরে ব্যবহার করা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কদর্য ইখওয়ানের কথা। সারেন্ডার্ড মিলিট্যান্টদের দিয়ে ভারতীয় বাহিনী তৈরী করে ইখওয়ানকে। মনে পড়ে কাশ্মীরে চাকরি করা এক বাঙালি বন্ধুর কথা, ‘জানো, সাধারণ সময়ে সমস্ত আর্মড ফোর্স বন্দুকের সেফটি ক্ল্যাচ তুলে রাখে। একমাত্র ইখওয়ান ছাড়া। ওরা কোনোসময় বন্দুকের সেফটি ক্ল্যাচ ব্যবহার করে না।‘ ইখওয়ান এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর সেই সময়ের টেকনিক পরিচালক দেখালেন সোজাসাপটাভাবে। প্রায় কোনো বীভৎসতা ছাড়াই। হয়তো ভারতীয় সেন্সারের ভয়েই। কিংবা ভারতীয় দর্শকের সাটল দেশপ্রেমকে খুব বেশি আঘাত না করার জন্য।

হায়দার ফিরে আসে তার মায়ের কাছে। ফ্ল্যাশব্যাকে গল্প পৌঁছায় হায়দারের আলিগড়ে পড়তে যাওয়ার গল্পে। আর এই সময়েই গল্পের মোচড়ে উল্লিখিত হয় গাজালা মির এবং খুররমের লুকোনো প্রেম। ঘর ভেঙে যাওয়ার নেপথ্য কাহিনি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে। এই সময়েই পরিচালক হায়দারের ঠাকুর্দা হুসেন মিরের মুখ দিয়ে আবার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এলেনস্বাধীনতা বন্দুকের হাত ধরে আসে না। আবার পুনরাবৃত্তি তাঁর ভিউ পয়েন্টেরতিনি জীবনের দিকে।

চিনার গাছের সারির মধ্যে ঝরাপাতার স্তুপ। কাশ্মীরের সিগনেচার দৃশ্যের মধ্যে মা আর ছেলের কথোপকথন। বাবাকে সে মায়ের থেকে বেশি ভালোবাসেমায়ের মুখে এমন সংলাপ। আর তারপরেই ইলেকশন। খুররম ভোটে দাঁড়ান। পরিচালক এইখানে প্রায় ডকুমেন্টারির আদল নিয়ে আসেন। মন্তাজে নানা দৃশ্যঅভিযোগ পালটা-অভিযোগমধ্যে মধ্যে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফুটেজের ব্যবহার। ইন্ডিয়ান আর্মির মন্তব্য, ‘উই ট্রেইন আওয়ার অফিসারস টু ইনটারোগেটনট টু টর্চার।‘ এইখানে মন্তাজের মধ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন দৃশ্যের লেংথ এক নয়। অথচ দেখতে দেখতে মনে হয়, সেইটা না করে আইজেনস্টাইনের মেট্রিক মন্তাজের ব্যবহার করলে যেন অনেক বেশি সাযুজ্য থাকত দৃশ্যটায়। এডিটিং যেন অনেক দৃশ্যের নিজস্ব গতির চেয়ে অনেক বেশি সংলাপ-নির্ভর। এই কথাটা ছবির অনেক জায়গাতেই মনে হয়েছে। হয়তো এইটাই এই ছবির অন্যতম দুর্বলতা।

এর পরেই বরফে ঘেরা কাশ্মীরের বিভিন্ন দৃশ্য। কাঁটা গাছ। হঠাৎ ছবির গতি জমজমাট হয়ে যায়। আর তারপরেই এই ছবির অন্যতম শ্রেষ্ঠ দৃশ্য। হ্যামলেট -এর গৌস্টের আদলে এই ছবিতে রুহদার (ইরফান খান)-এর আগমন। ছবির এই দৃশ্যটা শুট করা খুব শ্যালো ফোকাসে। প্রায় অফ ফোকাসে ধরা বরফে মোড়া একটা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রুহদার ক্যামেরার কাছে এসে হঠাৎ ফোকাসে চলে আসেন। অফ ফোকাসকারণ এই রুহদার কেসেটা এই ছবিতে স্পষ্ট নয়। ভোট হওয়ার পর যখন কাশ্মীরের নতুন ভবিষ্যতের একটা সম্ভাবনা ছবিতে, তখনই যেন সব ওলট পালট করে দিতে রুহদারের আবির্ভাব অস্পষ্টতা থেকে। ভারতীয় বয়ানে এই রুহদার পাকিস্তানের চর। আবার ছবির অন্য বয়ানে সে হিলাল মিরের অতৃপ্ত আত্মার ইন্তেকাম বা প্রতিশোধের বার্তাবাহী।

এর পরেই ছবি হঠাৎ একটা গতি পেয়ে ওঠে। কাশ্মীরি লেখক আখতার মহিউদ্দিনের লেখা দ্য নিউ ডিজিজ‘ গল্পটি পরিচালক গুঁজে দেন গল্পের মধ্যে। নিজের বাড়ির দরজার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে একজন মানুষ। কিছুতেই ঢুকবে না। ঢুকল যখন তাকে সার্চ করা হল। জিজ্ঞাসা করা হল আই কার্ড আছে কিনা। ডাক্তারদের মত, এটা একটা নতুন ব্যারাম। মানুষ সার্চ আর আইকার্ড দেখাতে এত অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে যে, নিজের বাড়ির দরজায় এসেও সে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। আখতার মহিউদ্দিনের অসামান্য এই গল্পটাকাশ্মীরের সমাজে আর্মি টেরর এবং প্রতি মুহূর্তে নজরদারি করা রাষ্ট্রব্যবস্থার এই অসাধারণ প্রতিচ্ছবি ঠিক খাপ খেল না ছবির বয়ানে। বরং মনে হল জোর করে গুঁজে দেওয়া হয়েছে। এইখানে পরিচালক যেন কিছুটা ফাঁকিবাজি করলেন। নিয় নুয়্যা ছবির মধ্যে বহু রকমের উত্তরাধুনিক বয়ান গুঁজে দেওয়া তাঁর ছবির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু যে অপরিসীম দক্ষতায় তিনি কামিনে -র মতো ছবিতে সেটা পেরেছেন, এইখানে সেই সাবলীলতার ভীষণ অভাব। এরপর রুহদারের অসামান্য সংলাপ, ‘ম্যাঁয় ডক্টর কা রুহ্‌ হুঁ।‘ কিন্তু এত নাটকীয় একটা কথা আসলে নাটকেই সম্ভব। ফিল্মের বয়ানে এই ধরণের সংলাপ যেন অতি আরোপিত।

রুহদার হায়দারকে বলে তার বাবার কথা। ভারতীয় বাহিনীর ভয়াবহ ক্যাম্প মামা টু- কথা, যা আসলে মূল ক্যাম্প পাপা টু-এর একটা প্রতিধ্বনি। চিত্রনাট্যের এই জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালক এই বীভৎসতার কথা আসলে বলাচ্ছেন একজন মিলিট্যান্টের মুখ দিয়ে। যার দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রের বয়ানে মিথ্যা। আবার গল্পের মোচড়ে তখনও বলে দেওয়া হয়নি যে, এই রুহদার ভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামোর চোখে পাকিস্তানের এজেন্ট। অতএব একটা বিশ্বাসযোগ্যতার অবয়ব তৈরি হয়। কিন্তু এই মামা টু-এর বীভৎসতার দৃশ্যায়ন ভীষণভাবে এড়িয়ে গিয়ে করা হয়েছে। বাশারত তাঁর কার্ফিউড নাইট  বইতে পাপা টু তে বন্দি থাকা মানুষের ইন্টারভিউ নিয়েছেন। পুরুষাঙ্গে তামার তার ঢুকিয়ে শক দেওয়াটা সেইখানকার এক স্বাভাবিক ঘটনা। যার ফলস্বরূপ বহু মানুষ যৌন-অক্ষম হয়ে গিয়েছেন। ছবির বয়ানেও শুধু এইটুকুই। বাশারাত লিখেছিলেন, একটা মইয়ের সাথে মানুষকে জামাকাপড় খুলে নামিয়ে দেওয়া হত একটা কুয়োর মধ্যে। সেই কুয়োর মধ্যে ঢেলে দেওয়া হত কেরোসিন তেল আর লংকার গুঁড়ো। লংকার গুঁড়ো কেরোসিনের বাষ্পে উবে মানুষটার চোখ-নাক-মুখ সমস্ত ত্বকে লেগে যেত বীভৎস জ্বালা হয়ে। আবার কোনও কোনওদিন প্যান্টটা খোলা হত না মানুষটার। বরং পা বেঁধে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হত জ্যান্ত ইঁদুর। বিশাল এই বীভৎসতার মধ্যে যাননি। হয়তো ছবিতে সেন্সরের একচল্লিশটা কাটের মধ্যে সেইগুলো ছিল। অথবা, হয়তো ছিল না। এরপর ছবিতে দেখানো হয় আরেক ক্যাম্পফারাজ সিনেমা। দর্শক অনেক আগেই ছবিতে এই ফারাজ সিনেমার একটা ক্রস রেফারেন্স পেয়েছেনযখন হায়দারআরশিয়াকে নিয়ে তার বাবাকে খুঁজছে ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে। এই ফারাজ সিনেমার দৃশ্যে আবার তিনি নিয়ে আসেন বলিউডের বিতর্কিত নায়ক সালমান খানের ছবি সঙ্গ দিল সনম -এর গান। পিছনে হিরো আর হিরোইনের নাচের দৃশ্য। গান বাজছে:

ম্যাঁয় হুঁ দিওয়ানা তেরে পেয়ার কা

পিছা না ছোড়ুঙ্গা তেরা

লউট যাউঙ্গা দিল জিতকে

ইয়ে ওয়াদা হ্যায় মেরা 

ও মাই ডার্লিং গিভ মি আ কিস

এই গানের লিরিকের মধ্যে দিয়ে পরিচালক একটা দ্বন্দ্ব তৈরি করেন। এই গানের প্রতিটি কলি কেমন খাপে খাপে এঁটে যায় ভারতীয় শাসনতন্ত্রের কাশ্মীর নিয়ে বলা বয়ানের সাথে সাথে। দিল জেতার এবং কিস পাওয়ার প্রক্রিয়া শুধু ভয়াবহ। পর্দায় গানের দৃশ্যের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া সারিবদ্ধ বন্দিদের সিল্যুয়েট আবার একটা অদ্ভুত মজার উত্তরাধুনিক বয়ান তৈরি করে। এবং এইখানেই হিলাল মিরের ভাই খুররমের উপস্থিতি ভাইয়ের সাথে লড়াই করার জন্য ভাইকে ব্যবহার করার রাষ্ট্রের পদ্ধতির সাথে খাপে খাপে এঁটে যায়।

আরো কিছু পরেই ছবির সেই অসাধারণ লং সিকোয়েন্স। প্রায় পাগল হায়দার মিরকাশ্মীরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করে কাশ্মীরের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে। আবার ব্যবহার হয় হুৎজপাহ  শব্দের ক্রস রেফারেন্স। তার সাথে আফস্পা-র রাইম। ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকল ৩৭০জেনেভা কনভেনশন এবং আফস্পা-র উদ্ধৃতি প্রায় পাগল হয়ে যাওয়া হায়দারের মুখে। চিত্রনাট্যের এই বারবার ক্রস রেফারেন্স টানা মনে পড়িয়ে দেয় উত্তরাধুনিক উপন্যাসের পদ্ধতি। আর এও মনে করিয়ে দেয় যে, সিনেমা আসলে একটা বুর্জোয়া আর্টযার গায়ে রাষ্ট্র এবং বাজারের শিকল খুব শক্ত করে বাঁধা আছে। হায়দারের আচরণের পাগলামো আসলে শাসনতন্ত্রকে আঘাত করে খুব বুদ্ধিদীপ্তভাবে। যাকে পাগলের বয়ান বলে উড়িয়েও দেওয়া যায়। আবার সেই বয়ানের মধ্যে নির্যাসটুকু বুকে বেঁধে। এইখানে বিশাল ভরদ্বাজ অসাধারণ। এইখানে তিনি বুঝিয়ে দেন, কেন তিনি বলিউডের বিরাট বাজারে বসেও অন্য রকম ছবি করার সাহস রাখেন। কিন্ত এত সত্ত্বেও বলবএই সিকোয়েন্সটায় বহু শট ব্যবহার না করে একটা লং সিকোয়েন্সে ক্যামেরার মুভমেন্টের মধ্যে ধরলে যেন আরো বেশি নান্দনিক হত। অবশ্য ছবি পরিচালকের। আর অভিযোগ করার অধিকার সমালোচকের ব্যক্তিগত।

এরপর খুররম আসেন। রুহদারকে পাকিস্তানি চর বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। আর চেষ্টা করেন এতক্ষণ ধরে আক্রমণ করে যাওয়া রাষ্ট্রকাঠামোর বয়ানকে একভাবে পালটা বয়ানে এস্টাব্লিশ করার। এর মধ্যে দিয়ে গল্প যেমন অন্য মোচড় আসে, তেমনই উত্তরাধুনিক বহুস্বর ছবির মধ্যে ঢুকে যায়।

খুররম এবং গাজালা পিরের বিবাহের মধ্যে দিয়ে ছবি এক অন্য পরিণতি পায়। এই দৃশ্যের ঠিক আগে হায়দার তার মা গাজালার গলায় চুমু খায়। এবং তার বাবাকে ছেড়ে তার মায়ের তার কাকাকে বিয়ে করা মেনে নিতে না পারার কথা সহজভাবে স্বীকার করে হায়দার। এইখানে ছবিটার ইডিপাস কমপ্লেক্স নিয়ে অনেক কথা বলেছেন অনেক সমালোচক। আবার বিশাল ভরদ্বাজ নিজে অস্বীকার করেছেন। বলেছেন সেটা সার্ফেস লেভেলে ছিল।২ আসলে চলচ্চিত্রের এই জায়গাটাতেই হায়দারের ঘর‘ ভেঙে যাওয়া পরিপূর্ণতা পায়। আসলে হায়দার সাধারণ একজন কাশ্মীরি যুবক। যার ঘর কাশ্মীর। এবং কাশ্মীরের ভেঙে যাওয়াতার স্বাধীনতার দাবিকে অস্বীকার করেপ্রায় তাকে জোর করে অধিকার করা নিয়ে তার রাগ-ক্ষোভ আসলে হায়দারের তথাকথিত ইডিপাস কমপ্লেক্স। কাশ্মীরের স্বাধীনতা-পরাধীনতাসামরিক আইনের ভয়াবহতা এবং তার কাশ্মীরী আইডেন্টিটির থাকা না-থাকাই আসলে এইখানে হায়দারে টু বি অর নট টু বিহম হ্যাঁয় ইয়া হম হ্যাঁয় নেহি।আর সেই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকেই হায়দারদের হ্যামলেট-সুলভ দ্বিচারিতায় ভোগা। করতে পারা অথবা না-করতে পারাকরতে চাওয়া অথবা না-করতে চাওয়ার দ্বিচারিতা।

এত সুন্দর একটা প্লট পয়েন্ট ব্যবহার করার পর আবার পরিচালক যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন। ৭০ দশকের বলিউডি সিনেমার গানের মধ্যে দিয়ে ক্ল্যাইম্যাক্স বা প্লটের মূল কথাটা বলে দেওয়ার ক্লিশে পদ্ধতি পরিচালক ব্যবহার করলেন বিসমিলগানটার মধ্যে। পুরো গল্পের বয়ানটাকেই অনেক সহজ করতে গিয়ে যেন পরিচালক পুরো ফিল্মটাকেই অস্বাভাবিক নীচে নামিয়ে ফেললেনএই গানটাই এই ছবির সব থেকে দুর্বল মুহূর্ত।

ছবির তৃতীয় অংক টানটান। পরিচালক যেন এইখানে তাঁর দক্ষতা পুরোটা ফুটিয়ে তুলতে পারলেন। হায়দারের সমস্যা আসলে একটা পোস্ট ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার। ট্রমাটা হল ঘর ভেঙে যাওয়াবাবা অথবা স্বাধীনতার মৃত্যু। কিন্তু সেই ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা করার বদলে তাকে মেরে ফেলাই শাসনকাঠামোর কাম্য। কারণ শাসনকাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে অসৎ মানুষ বা রাজনীতিক যাদের স্বার্থরক্ষার সাথে স্থিতাবস্থা সম্পৃক্ত। আর সেই স্থিতাবস্থা রাখার জন্য সব ধরণের অন্যায় করতে তারা প্রস্তুত। মিলিট্যান্ট অথবা বিদেশি রাষ্ট্রের চরদের মুখ দিয়ে শোনানো হিলাল মিরের কথাটাও খুব জরুরি, ‘মেরা ইন্তেকাম লেনাউন দো আঁখো মে ফারেব ডালনাযিন আঁখোসে উসনে তুমহারে মা পর ফারেব ডালা থা।আমার প্রতিশোধ নিয়োসেই চোখে গুলি মেরোযে চোখ দিয়ে তোমার মার উপর বিশ্বাসঘাতকতা ফেলা হয়েছে। ফারেব  বা সিডাকশন  শব্দটার অর্থের মধ্যে লুকিয়ে থাকা পলিটিকাল বয়ান কী, সেটা বুঝতে খুব কষ্ট করতে হয় না।

এইখানে পরিচালক আবার ইমেজারির মাধ্যমে চমৎকার একটা ক্রস রেফারেন্স টেনেছেনমেয়ের বোনা উলের লাল স্কার্ফ দিয়েই বাবা বাঁধছেন তাঁর মেয়ের প্রেমিক হায়দারকে। তিনি জানেন যে, হায়দারকে খুন করা হবে। তিনি নিজেই সেই খুনের চক্রান্তের অংশীদার। অর্থাৎ মেয়ের প্রতি বা সন্তানের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছাপিয়ে যায় শাসনকাঠামো এবং তাঁর সাথে জড়িয়ে থাকা কায়েমি স্বার্থসম্পন্ন মানুষেরা। সেইটাই তাঁর কাজ বলে মনে করেন তিনি। শাসনকাঠামোর বিরুদ্ধে যাওয়া স্থিতাবস্থাকে বদলে দিতে চাওয়া মানুষকে মেরে ফেলাই তাঁর দায়িত্ব।

বরফে ঢাকা প্রান্তরে, ‘ঘর‘-এর ধ্বংসস্তুপের মধ্যে দেখা হয় মা ও ছেলের। মার মুখের প্রতিচ্ছবি ভাঙা আয়নায়। দ্বন্দ্ব। কোন মুখটা ঠিক। কোন মুখটা নয়। কোন দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক, কোনটা নয়। হায়দারের হ্যামলেটীয় ডাইলেমা। কাশ্মীরেরও। সত্য অথবা মিথ্যার মধ্যে অগুন্তিবার গুলিয়ে ফেলার মতো বিভিন্ন বয়ান। আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলাদা আলাদা সত্য। উত্তরাধুনিক বয়ান। পালটা বয়ান।

কিংবা বাবার মৃত্যুর পর পাগল হয়ে যাওয়া আরশিয়াকে বলা গাজালার কথা। যদি হায়দার বন্দুক না তুলত, তাহলে তাকেই মেরে দিত ওরা। আবার ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মূল কথাটা বলা। বন্দুক তোলা, না-তোলার অপরিহার্যতার কথা বলা। যা আসলে ভীষণ রাজনৈতিক অথচ ভীষণ ভয়াবহ।

ছবির অসামান্য অংশ হল, ছেলেকে বাঁচাতে গাজালার রুহদারকে ফোন করা। সেই রুহদার যে বিদেশি শক্তি তথা মিলিট্যান্সির অংশ। এই সময় গাজালার কথোপকথন ছাপিয়ে যায় কবর খোঁড়ার শব্দে। যেন এই জোট আসলে মৃত্যুর শব্দই নিয়ে আসে। এই কবর খোঁড়ার শব্দ থেকে লো অ্যাঙ্গেল ক্লোজ শটবেলচা দিয়ে বরফ ফেলে ফেলে কবর খোঁড়া হচ্ছে। এবং তার সাথে অসামান্য একটা গান। হায়দার ছবিটা নিয়ে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় এত লেখালেখি, অথচ এই গানটার কোনো উল্লেখ নেই। এই অনুল্লেখের হেতু বোঝা খুব কঠিন। সত্যিই কি তথাকথিত মেইনস্ট্রিমের ক্রিটিকদের তেমনভাবে পাত্তা দেওয়ার কোনো দরকার নেইতিন জন বৃদ্ধ কবর খুঁড়তে থাকেন বরফে মোড়া এক কবরখানায়। টপ শটে দেখা যায় সারি সারি অনেক কবর আর তাদের ফলক। গানের কথা:

আরে আও না

কি জান গয়ি জাঁহা গয়ি

সো যাও

আরে আও না কি থক গয়ি হ্যায় জিন্দেগি সো যাও

যাঁরা উর্দু বা হিন্দি জানেন না, তাঁদের বলে রাখিজাঁহা  শব্দটার অর্থ হল পৃথিবী। গাজালা মিরের ছেলেকে বাঁচানোর জন্য মিলিট্যান্টদের সাথে যোগাযোগ করা থেকে অপরিহার্য মৃত্যুর অনুষঙ্গ। ভারতবর্ষের মেইনস্ট্রিম সিনেমায় বিশাল ভরদ্বাজ এমন একটা হাড়হিম করা দৃশ্যের জন্ম দিতে পারেন ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। কবর খুঁড়তে থাকা এই তিন বৃদ্ধের মধ্যে রুটি হাতে একটি বালক সেমিটিক মিথ মনে পড়িয়ে দেয়। মনে পড়িয়ে দেয় The burial of Jesus after His crucifixion, who is the Bread of Life’ (John 6:35)। এই রুটির টুকরোই যেন জীবনের প্রতীক। মৃত্যুকে অতিক্রম করে যে জীবন। হায়দার মিরের সংলাপে আবার এই কথার পুনরাবৃত্তি। মরার পর সব্বাই মাটি হয়ে যায়। যা অনুচ্চারিত থাকে তা হল এই মাটির জন্যই এত যুদ্ধ। আবার এই মাটিতে মিশে যাওয়াতেই শেষ সব ইন্তেকাম।

ছবিটা এইখানে ক্রমশ উঁচু তাঁরে বাধা পড়তে থাকে। মিলিট্যান্ট নেতাকে ফোন করে বলে ওঠেন এক বৃদ্ধ, হুজুর আব হম ইধার সে নেহি নিকাল সকতে হ্যাঁয়।‘ সত্যিই তাই। অস্ত্র আর পালটা অস্ত্রের যুদ্ধ শুরু হলে আর বাইরে যাওয়ার কোনো পথ খোলা থাকে না। ইখওয়ান ও খুররম পিরের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে গুলি চালাতে চালাতে আবার এই গান গেয়ে ওঠেন তিন বৃদ্ধ:

আরে আও না

কি জান গয়ি জাঁহা গয়ি

সো যাও

আরে আও না কি থক গয়ি হ্যায় জিন্দেগি সো যাও

তার আগের দৃশ্যে বরফে মোড়া কবরখানায় অসংখ্য শুয়ে থাকা মানুষ ও মানুষের শব। আর এক কলি গান গেয়ে ওঠার পরের দৃশ্য, মাথা তোলা এক শত্রুকে গুলিতে বিদ্ধ করে আবার বরফে মোড়া কবরখানায় শুইয়ে দেওয়া। পরিচালক এইবার স্বচ্ছন্দ। তিনি কথা বলছেন তাঁর ভাষাতেইগানে আর সিনেমার ইমেজারিতে।

আবার কথোপকথন হয় মা আর ছেলের। মায়ের মুখে আবার ছবির সংলাপ, ছবির মূল বক্তব্য, ‘ইন্তেকাম সে সিরফ ইন্তেকাম পয়দা হো সাকতা হ্যায়। কোই আজাদি নেহি মিল সকতা।‘ প্রতিশোধ আর পালটা প্রতিশোধের বাইরে সেই গান্ধিবাদী কথা। পরিচালককে হয়তো এই কথাটা বলতেই হত। ভারতবর্ষেকিংবা গোটা পৃথিবীতে, ভয়াবহ সন্ত্রাস আর পালটা সন্ত্রাসের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে। কিন্তু কথাটা অসম্ভব ক্লিশে লাগে। খুব ক্লিশে। হয়তো কথাটার ক্লিশে হয়ে যাওয়াই আমাদের সব থেকে বড়ো ব্যর্থতা।

ছেলের জন্য অবশেষে বোমায় টুকরো টুকরো হয়ে যান মা। ছেলেকে বাঁচাতেই। অফুরান বরফের হিমের মাঝে আগুনের ঝলকানি। মায়ের পুড়ে যাওয়া। কাশ্মীরের পুড়ে যাওয়া। ক্যামেরা দেখায় একটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন হাত। শরীর থেকে আলাদা অথচ মুঠিতে বদ্ধ বন্দুক। যুদ্ধের শেষ হয় না কোথাও। হায়দার খুররমকে মারতে যায়। কিন্তু মারে না। সরে আসে। আর খুররম চিৎকার করে ওঠে, ‘ভাইয়া!’ যে ভাইকে সে হত্যা করেছিলতার কথা মনে পড়ে তার। তার কাছে পৌঁছানোর আকুতি।

এই ছবির সব থেকে শক্তিশালী জায়গা তার সংলাপ। অসাধারণ সব সংলাপ। যেমন হায়দারের মুখে, ‘দিল কি আগার সুনু তো হ্যায়দিমাগ কি সুনু তো হ্যায় নেহি। জান দুঁ ইয়া জান লুঁম্যায় রহুঁ ইয়া ম্যায় নেহি।‘ কিন্তু এই অসামান্য সংলাপ মাঝে মাঝে ছবির ইমেজকে নষ্ট করে দেয়। দ্বিতীয় অংকের মাঝামাঝি আরিফ শেখের সম্পাদনা খুব মিডিওকার। আরো টানটান বুনোট হতে পারত। বিশেষ করে এই ছবির জ্যঁ যখন নিয় নুয়্যা। পংকজ কুমারের সিনেমাটোগ্রাফি অসামান্য নয়। আবার খুব খারাপও না। বিশাল ভরদ্বাজের দ্য ব্লু আম্ব্রেলা  বা মকবুল -এর সিনেমাটোগ্রাফির পাশে এই ছবি দাঁড়ায় না। শ্রদ্ধা কাপুরের ভীষণ ইনোসেন্ট ফেস অথচ অসম্ভব খারাপ গলা তার অভিনয়কে কোথাও জমাট হতে দেয় না। বাকি চরিত্রদের অভিনয়ও ভালোকিন্তু মনে রাখার মতো অসামান্য ভালো নয়।

টু বি অর নট টু বি…’, এই ক্রাইসিসটাই হায়দার। বাবা তথা কাশ্মীরিয়তের মৃত্যু। মাকে ভোগ করছে বাবার হত্যাকারী। হায়দার তথা আম কাশ্মীরী জনতা এই ক্রাইসিসের শিকার। প্রতিশোধ নেব, না নেব-না? অস্ত্র তুলবনা তুলব-না? অস্ত্রের অর্থ পালটা অস্ত্র। মৃত্যু, আরো মৃত্যু। বরফে মোড়া হিম কবরখানা। আর ক্রাইসিসটুকুই শেক্সপিরিয়ান ট্র্যাজিডি। এটাই ছবির বিষয়। হায়দার হ্যামলেট। কিন্তু হায়দার  ছবিতে শেক্সপিয়রের হ্যামলেট  নাটক শুধু কাহিনির বুনোটের প্রয়োজনেই। আর কিছুতেই না। এই ছবিটা তাই প্রশ্ন তুলে দেয় ভারতবর্ষের নাগরিক সমাজের দিকেও। হম হ্যাঁয় ইয়া হম নেহি?

 

সূত্র

.Curfewed Night: One Kashmiri Journalist’s Frontline Account of Life, Love, and War in His Homeland, Basharat Peer, Scribner, 2010, New York

. ‘If I am not a leftist, I am not an artist.’ Anuj KumarThe Hindu, October 5, 2014

 

 

 
 
top