বেনিজ ভিডিও

 

বেনিজ ভিডিও

১৯৯২

 

১০৫ মিন

নির্দেশক: মাইকেল হ্যানেকে

 

My films are intended as polemical statements against the American ‘barrel down’ cinema and its dis-empowerment of the spectator. They are an appeal for a cinema of insistent questions instead of false (because too quick) answers, for clarifying distance in place of violating closeness, for provocation and dialogue instead of consumption and consensus.

নবারুণ ভট্টাচার্যের টয় গল্পটা পড়েছেন অনেকেই। সেই যে ছোট্ট শান্ত ছেলেটা অ্যাকোরিয়ামের ভিতর ইমার্শান হিটারের রড ফেলে দিয়েছিল। আর তার এই অদ্ভুত শান্ত খুনের পদ্ধতি দেখার পর তারা বাবা-মা আশ্বস্ত হয়েছিল এটা জেনে যে, এই নির্লিপ্ত খুনের মধ্যে একটা বিজ্ঞানমনস্কতার ব্যাপার আছে।

মাইকেল হ্যানেকের বেনিজ ভিডিও এই মনস্তত্ত্ব নিয়েই টয় গল্পের সঙ্গে তার সাদৃশ্য চোখে পড়ার মতো কিন্ত টয়-কে ছাপিয়েও কোথাও যেন ছবিটা আরো বৃহত্তর সমাজ মানুষ এবং কমার্শিয়াল অ্যাকশান ফ্লিকের জটিল আবর্তে ঘুরে কোথাও যেন এলিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধকে কেন্দ্র করে।

মাইকেল হ্যানেকে পৃথিবীর প্রথম সারির ফিল্মমেকারদের মধ্যে পড়েন তাঁর ছবি দর্শককে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে। যেমন বার্গম্যান করতেন। আর বার্গম্যানের মতোই হ্যানেকের দর্শক পৌঁছে যান অন্য একটা বোধে। একজন প্রকৃত দার্শনিকের মতো তিনি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দেন আমাদের প্রচলিত চিন্তাভাবনাকে। সমাজের তিনি একজন ক্রিটিক। প্রকৃত আর্টিস্টের মত সেইটাই তাঁর কাজ। তাঁর ছবি আমাদের শান্ত করে না, বিধ্বস্ত করে।

বেনিজ ভিডিও হ্যানেকের দ্বিতীয় ছবি। তখনো কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সম্মান পাননি তিনি।

ফিল্মটার শুরু হয় একটা ভিডিও দিয়ে। ভিডিওটায় প্রচণ্ড নয়েজ। চোখের জন্য মোলায়েম নয় মোটেই। অন্ধকার একটা ঘরে আমরা একজনকে দেখি একটা শুয়োরকে টেনে নিয়ে যেতে দরজার দিকে। দরজার বাইরে আলো। ছবিটা অল্প কাঁপে, বোঝা যায় ক্যামেরা হ্যান্ডহেল্ড। বাইরে এসে শুয়োরটার মাথায় একটা বন্দুক ঠেকিয়ে সেটাকে গুলি করে মারা হয়। শুয়োরটা কাতর চিৎকার করতে থাকে, পিছনে দূর থেকে কুকরের ডাক ভেসে আসে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে শুয়োরটা মরে যায়। তার মাথার ক্ষত থেকে কালচে রক্তের দাগ মাটিতে লেগে যায়। ঝিরঝির করে বরফ পড়তে থাকে। এই সময় আবার রিওয়াইন্ড হয় ছবিটা। আবার আমরা দেখি একই দৃশ্য, বন্দুক ঠেকানো থেকে শুয়োর মারা অবধি। এইবার স্লো মোশনে। এই মারার দৃশ্যটা হাইলাইটেড হয়। তারপর ঝিরঝির করতে করতে হারিয়ে যায় ছবি। পরিভাষায় যাকে ভিডিও নয়েজ বলে। আর এই নয়েজের মধ্যেই ফুটে ওঠে ছবির মেইন টাইটেল কার্ড। পরিচালক এই মারার নির্মমতাটাকে প্রকট করেন। কিংবা এটা যেন গোটাটাই একটা সাবজেকটিভ শট। অন্য কারুর দৃষ্টি দিয়ে দেখা – যে একটা মৃত্যুর নির্মমতা রিওয়াইন্ড করে দেখছে। বহুকাল আগে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটা যেন বারংবার স্মৃতির নয়েজ ছাপিয়ে হাইলাইট করতে চাইছে সে।

এরপর মাস্টার শটে আসে একটা দৃশ্য। কয়েকজন ছেলে-মেয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, আর ছবির একদম এক্সট্রিম লেফটে একজন মানুষ (বেনির বাবা) দাঁড়িয়ে আছেন। আবার ভিডিও, এইবারও হ্যান্ডহেল্ড। একটা পার্টির দৃশ্য। সব্বাই একটা খেলা খেলছে, পার্টিতে খাবার ছড়ানো। হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরা বারবার প্যান করে। বোঝা যায় অপটু হাত। যে ভদ্রলোককে আমরা একটু আগে দেখেছি তাকেই আবার দেখা যায় ছবিতে একটু রাগতভাবে জিজ্ঞাসা করছেন কী চলছে তাঁর বাড়িতে। আবার পুরোনো মাস্টার শটে ফিরে আসি আমরা। লিফট আসে। কথোপকথনের মধ্যে আমরা বুঝতে পারি ভদ্রলোকের মেয়ে পার্টিটা দিয়েছিল তার বন্ধুদের জন্য, বাবাকে না-জানিয়েই। লিফটের দরজা বন্ধ হয়। ভদ্রলোক হাত দিয়ে বোতাম টিপে ধরেন। বোঝা যায় মেয়েকে তাড়াতে তিনি ব্যগ্র। পরস্পরের সংলাপ ভীষণ কার্ট। ভদ্রতার মোড়কে ঢাকা। অথচ বোঝা যায়, এই সম্পর্কটা ক্রমশ ফিকে হয়ে এসেছে। এমন এক সমাজ আমরা দেখি যেখানে মেয়েও বাবার স্বাভাবিক জীবনে অনুপ্রবেশকারী।

আবার পার্টির দৃশ্যটা দেখি আমরা। এইবার অন্য ভিজুয়ালসঅনেক টাকা দেখতে পাই আমরা। বুঝতে পারি টাকাটাই ওই পার্টির একটা মূল উদ্দেশ্য। কেউ একজন বলেন বন্ধ করতে। আমরা ছবিতে প্রথমবার বেনিকে (আর্নো ফ্রিশ) দেখতে পাই। নারীকণ্ঠ বলে ওঠে টিভিটা অন করতে। বেনি টিভি ঘুরিয়ে দেয়, আমরা নিউজ চ্যানেলের ছবি ও শব্দের মধ্যে টের পাই কিছু ফুটবল-উন্মত্ত জনতা কোথাও দাঙ্গা করেছে। কিংবা সার্বিয়ান আর্মি সিভিলিয়ান টার্গেটে ফায়ারিং করেছে। ক্লোজ আপে টিভিটাকে ধরে ক্যামেরা। এ সব ছাপিয়ে যায় বেনি এবং তার মায়ের সাধারণ কথাবার্তা। বেনির বাবা (উলরিখ মু:হে), আমাদের আগে দেখা ভদ্রলোকও চলে আসেন। বেনির মাকে (অ্যাঞ্জেলা ইউঙ্কলার) জিজ্ঞাসা করেন কোনো কিছু ঘটেছে কিনা। বেনির মা শান্ত উত্তর দেন, তিনি জানেন না। আমাদের নিজেদের কথা মনে পড়ে। এমন এক সময় যেখানে মৃত্যু কিংবা হিংসায় অভ্যস্ত আমরা। তাকে ছাপিয়ে যায় আমাদের জীবন। বেনির বাবা শুধু অসাধারণ সংলাপে দু-বার বলে ওঠেন ঘরে একটু টাটকা হাওয়া ঢুকতে দাও। কথাটা দ্ব্যর্থবোধক।

এর পর বেনির স্বাভাবিক জীবনের কিছু দৃশ্য তুলে ধরেন পরিচালক। মিড শটে টাইট কম্পোজিশনের ব্যবহারক্যামেরা অনেক সময়েই বেনিকে ধরে খুব কাছ থেকে। পরিচালক যেন বেনিকে বুঝতে চাইছেন, তার কাছে আসতে চাইছেন। এই দৃশ্যগুলোর মধ্যে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন বেনি আসলে হলিউডি অ্যাকশন ফ্লিকের মগ্ন দর্শক। তার জীবনের বেশিরভাগটাই সিনেমাকেন্দ্রিক। এবং প্রায় সব সময়েই তার ঘরের ভিতর টিভি চলে। অথচ বেনি একা। তার বাবা, মা খুব বেশি সময় দেন না তাকে। ব্রেকফাস্ট টেবিলে রাখা চিরকুট, প্রায় স্টিল লাইফের মতো করে ধরা শটগুলো যেন বেনির জীবনের অন্ত:সারশূন্যতাই ধরে রাখে।

স্কুলে যায় বেনি। চ্যাপেলের মধ্যে বাখের মোটেট (motet) Trotz dem alten Drache গাইতে গাইতে দেখা যায় স্কুলের ছাত্রদের হাতবদল হতে থাকে টাকা। সেই টাকা দিয়ে চ্যাপেলের মধ্যেই নেশার ওষুধ কেনে তারা। এই নেশার ওষুধ কেনার দৃশ্যগুলো আবার সাবজেকটিভ শট। যেন দর্শক এই ছেলেগুলোর চোখ দিয়েই দেখবেন তাদের এই গোপন মাদক কেনা। প্রসঙ্গত, বলা যায় যে এই মোটেটটি আসলে জেসাসকে নিয়ে। এবং Trotz dem alten Drachen এই মোটেটটি আসলে শত্রুদের—ওল্ড ড্রাগন, মৃত্যু এবং ভয়ের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার কথা বলে। পরিচালক ক্লাসিকাল মিউজিককে এইখানে ব্যবহার করেন সমাজের বিরুদ্ধে বা অনুশাসনের বিরুদ্ধে কিংবা হয়তো শুভের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার পরিচায়ক হিসাবে। এইখানে তাঁর পটুত্ব বোঝা যায়। বোঝা যায় যে, কেন তিনি ইয়োরোপের প্রথম দু-একজন পরিচালকের মধ্যে পরিগণিত হতে চলেছেন। সিনেমা আসলে শুধু ইমেজারি নয়। কখনও কখনও সাউন্ড সিনেমার ভিজুয়ালকে অন্য মাত্রা দিতে পারে। এইখানেও মিউজিক ইমেজারিকে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে আসে। স্কুলের মধ্যে নেশার দ্রব্য কেনা আবার সমাজের একটা শ্রেণির পরিচায়ক হয়ে যায়। এবং কারেন্সি নোটের বারংবার ব্যবহার, কিংবা তার আগে নামী চেইনের বার্গার সফট ড্রিংক ক্যাপিটালিজমের বা লিবার‍্যাল অর্থনীতির অন্ধকারের কথা বলতে থাকে। টাকার ব্যবহার পরিচালক এই সিকোয়েন্সের পরেও ক্রমান্বয়ে করতে থাকেন। ভিডিও পার্লারে টাকার বিনিময়ে ভিডিও নেয় বেনি অনেকগুলো। এইখানেও ভিজুয়ালে শুধু টাকা আর ভিডিও ক্যাসেটের হাতবদল চলতে থাকে। পরিচালক হয়তো আসলে কটাক্ষ করতে চান মেনস্ট্রিম সেই সব ছবিকে, অর্থ এবং অর্থের বিনিময় ছাড়া যাদের আর কোনো মূল্য নেই। এই ভিডিও পার্লারের বাইরেই মেয়েটিকে দেখতে পায় বেনি। আবার একটা চমৎকার Miseen Sceneমেয়েটিকে দেখানো হয় ভিডিও পার্লারের বাইরে থেকে কাচের মধ্যে দিয়ে তাকিয়ে থাকতে। বোঝা যায়, সে এই অর্থনৈতিক বৃত্তের বাইরে। বেনির আর তার আলাপের দৃশ্যে বাঁদিকে রাখা থাকে একটি হলিউড অ্যাকশন ফ্লিকের ক্যাসেটের খাপ। অসাধারণ সিনট্যাক্সে পরিচালক বলে দেন বেনির এই মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করাও তার অ্যাকশান ফ্লিকের ভায়োলেন্স-অভ্যস্ত মস্তিষ্কের বাইরে নয়। অর্থাৎ একটি ছেলে এবং মেয়ের সাধারণ প্রেমের বাইরে এই আলাপ। এর মধ্যে আছে ভায়োলেন্সের অদৃশ্য উপস্থিতি। এটাই এই ছবির ইনসিসিভ মোমেন্ট।

বেনি এবং মেয়েটিকে এর পর আমরা দেখতে পাই বেনির অ্যাপার্টমেন্টের দিকে হেঁটে যেতে। বার বার পরের পর শটে ক্যামেরা থেকে দূরে সরে যায় তারা। শুধু শেষে বেনির ঘরে ঢোকার দৃশ্যে তারা ক্যামেরার দিকে এগিয়ে আসে। আমরা বুঝতে পারি কোনো একটা পরিণতির দিকে এগিয়ে আসছে তারা। বেনির ঘরের জানলাগুলো বন্ধ। অথচ ক্যামেরায় ধরা জানলার বাইরের ভিউ। বেনি সব কিছুকেই ক্যামেরার মধ্যে দিয়ে দেখতে চায়। ঠিক একজন ফিল্মমেকারের মতোই। কিংবা হয়তো ভিডিওর মতোই এই জীবনের সব কিছুকেই সে দেখে কৃত্রিম ভাবে। সহজ সরল সোজাসাপটা জীবন সে দেখেনি। মেয়েটার কথা থেকে জানা যায়, সে শহর থেকে প্রায় ঘণ্টাখানেকের দূরত্বে থাকে। বেনি আর তার শ্রেণিচরিত্র এক নয়। মেয়েটা আসলে ওয়ার্কিং ক্লাস পরিবারের। মেয়েটা বেনির মতো ভিডিও দেখে না। সে কার্টুন দেখে। সে অনেক নরম। বেনি তাকে শুয়োর মারার দৃশ্যটা দেখায়। ঠিক প্রথমে যেমন আমরা দেখেছি। মৃত্যুর থেকে মেয়েটার চোখে বরফ পড়ার দৃশ্যটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সে বলেও সেটা। কিন্তু মৃত্যুর এই হিমশীতল দৃশ্য তাকে স্পর্শ করে। কিন্তু বেনি বলে যে, অ্যাকশন সিনেমায় সব কিছুই প্লাস্টিক আর কেচ আপ দিয়ে দেখানো হয়। কিন্তু সত্যির মতোই লাগে। বেনি যেন অ্যাকশান সিনেমার কেচ আপ আর সত্যিকারের রক্ত কোথাও গুলিয়ে ফেলেছে। কেচ আপের মতোই আসল মৃত্যু কিংবা রক্ত তার কাছে সহনীয়।

মেয়েটাকে শুয়োর মারা পিস্তলটা দেখায় বেনি। জানায় সে সেটা চুরি করে এনেছে। বুলেট পোরে বেনি। আমরা ভয় পাই। পিস্তলটা মেয়েটার হাতে দেয় বেনি, নিজের পেটে ঠেকিয়ে চালাতে বলে। ক্যামেরা এইখানে দুজনের খুব কাছে। একটু স্পেস দিতে রাজি নন পরিচালক। তিনি আসলে এই ভয়াবহতাকে ধরে ফেলতে চান একদম চোখের সামনে দিয়ে। দর্শককে দেখাতে চান প্যাথোলজিকাল একজন কিলারকে। মেয়েটা চালায় না ট্রিগার। পিস্তলটা রেখে দেয়। বেনি তাকে বলে ভিতু! আবার পিস্তলটা তুলে নেয় সেমেয়েটার পেটে ঠেকায়। চালায় না। মেয়েটা খেলার ছলে বলে ভিতু! বেনি গুলিটা চালিয়ে দেয়। এরপরের বাকি দৃশ্য আমরা দেখি বেনির ঘরে রাখা ক্লোজ সার্কিট টিভির মধ্যে দিয়ে। ভিডিওটাকে মনিটরে ক্লোজ আপে ধরেন পরিচালক। মেয়েটিকে পালাতে দেখা যায়। বেনি তাকে চুপ করাতে চায়। হয়তো মেয়েটাকে মারেও। আবার দৌড়ে এসে বেনি গুলি পোরে, আবার গুলি করে। আবারও। মেয়েটি চুপ করে যায়। বোঝা যায় সে মরে গিয়েছে। এমন একটা খুনের দৃশ্য ক্যামেরা ধরে রাখে ক্লোজ সার্কিট মনিটরের মধ্যে দিয়ে। এই দেখা যেন বেনিরই দেখা। মৃত্যু যেখানে টেলিভিশন সেটের মধ্যে দিয়ে দেখা একটা বিচ্ছিন্ন বাস্তব। মৃত্যু যেন অ্যাকশন ফ্লিকের দেখা মৃত্যুর মতোই। কেচ আপ আর প্লাস্টিক। বেনি অ্যাকশন মুভির ডিরেক্টরের মতো এই খুনের ভিডিও তুলে রাখে।

এই পুরো সিকোয়েন্সটা তুলে ধরার মধ্যে কোথাও কোনো মমত্ববোধ নেই। কোথাও কোনো প্রতীকের, সিনট্যাক্সের ব্যবহার নেই। ক্রূর এবং বীভৎসতার পরিমাপ কমানোর প্রতি নিশ্চেষ্ট নির্দেশক। তিনি একটা হিমশীতল প্যাথোলজিকাল কিলারকে ধরছেন। অথবা ধরছেন নতুন নিও লিবারেল অর্থনীতির উপরের সারির মানুষগুলোকে, যাদের চারপাশের ভায়োলেন্স তাদের কাছে মনোরম থ্রিলারসুলভ।

বেনি এদের মতোই। ঠান্ডা। খুন করার পর তাই তাকে দেখা যায় শান্তভাবে জল খেতে। ফ্রিজ থেকে ইয়োগার্টের টিন খুলে ঠান্ডা ভাবে খেতে। মেয়েটির শব রক্ত মাখা চাদরে ঢেকে দেয় সে। পরিচালক বেনির অ্যাপার্টমেন্টের নানা দৃশ্য ব্যবহার করেন। পিছনে উঁচু স্বরে রক গান বাজতে দেখা যায়। বেনি যেন তার পরিপাটি অ্যাপার্টমেন্টের মতোই ঠান্ডা, গুছানো। মেয়েটার জিনিসপত্র ঘেঁটে দেখে বেনি। কোনো কিছুই নেয় না। নাড়াচাড়া করে রেখে দেয়। এমনকী মেয়েটার টাকার প্রতিও কোনো লোভ নেই তার। ভীষণ নৈর্ব্যক্তিকভাবে এই খুনটা যেন জেনে-বুঝেই করেছে সে, মানুষের মরে যাওয়া কেমন দেখতেইকোন রিঅ্যাকশান নেই তার। খাবার খাওয়ার পর  হোমটাস্ক করে। আমরা বেনিকে দেখতে পাই আবার সেই ভিডিও মনিটরে। বেনি যেন আমাদের কেউ নয়। সে যেন অ্যাকশন ছবির নায়কের মতো একটা বাক্সে বন্দি ছবি। বিছানার চাদরের রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলে বেনি। মেয়েটার রক্ত গায়ে লেগে গিয়েছে বলে পোশাক খুলে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে যায়। মেয়েটার শব উলটে পালটে ভিডিও তোলে। এইখানে ভিজ্যুয়ালগুলো মিলে মিশে যায় - কখনও বেনির তোলা নয়েজ সম্পন্ন ভিডিও, কখনও আবার সিনেমাটিক দক্ষতায় তোলা। নিজের গায়ে লেগে থাকা রক্ত শরীরে ঘষে বেনি চামড়ায় লাগিয়ে নেয়। আমরা নগ্ন বেনিকে দেখি ফোনে বন্ধুর সঙ্গে রাতের পার্টি নিয়ে নির্বিকারভাবে কথা বলতে। এই নগ্ন বেনি যেন সাইকোলজিকাল খুনি বেনির আসল চেহারা। বাইরের মার্জিত মনোভাবের আবরণহীন। এই পুরো জিনিসটাই পরিচালক যেন একেবারে ধরে ফেলেন একটা ফ্রেমে যেখানে দেখা যায় বেনির খাওয়ার ঘরের দেওয়ালে পরিপাটি করে টাঙানো ছবির মধ্যে একটা খোলা বেদানার ছবি

অপটু কম দামি ক্যামেরায় তোলা ভিডিও এবং সিনেম্যাটিক ইমেজারির অদ্ভুত মিশেল দিয়ে পরিচালক যেন পোস্টমডার্ন ইমেজারিকে ধরার চেষ্টা করেন। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা, হ্যান্ডিক্যামের এই দুনিয়ায় দৃশ্যের ক্রম অবনতি কিংবা সুলভ হয়ে যাওয়া বোঝাতে চান। এবং ভিডিও নিয়ে আমাদের অদ্ভুত আদেখলেপনাকে বোঝাতে চান। পার্টির কিংবা বাড়ির সাধারণ জীবনকেও যেমন আমরা যখন তখন ভিডিওতে ধরে ফেলতে পারি, তেমনি ধরে রেখেছে বেনি, তার কাছে খুব স্বাভাবিক একটা খুনকে। যেন নিছকই ভিডিও করে রেখেছে সে, পরে দেখবে বলে। এবং এই ভিডিওর মধ্যে দিয়েই আমরা যেন বেনির আসল চেহারা দেখতে পাই।

আগে তুলে রাখা মেয়েটার শবদেহের ভিডিও চালিয়ে দেখে বেনিতারপর পোশাক পরে তৈরি হয়ে নেয়। বেনিকে আমরা দেখি একটা নাইট ক্লাবে ঢুকতে। ফ্রেমের একদিকে রাখা টাকা আর আরেকদিকে বেনি আর তার বন্ধুর হাতে নাইট ক্লাবের স্ট্যাম্প মারা হয়। আবার সেই টাকার ব্যবহার। কারেন্সি নোট যেন আসলে এই ফিল্মে একটা মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠে অবক্ষয়ের। টাকাই যেন একটা চোদ্দো বছরের বাচ্চা ছেলের জীবনে ন্যায়-অন্যায়ের বোধকে ছাপিয়ে মূল হয়ে ওঠে। নাইট ক্লাবের পর রাত্রে বন্ধুর বাড়িতে শুয়ে বেনি যেন তাকে বলতে চায় কিছু। কিন্তু বলতে পারে না। সে বলে কম্পিউটার ক্লাসের হোমওয়ার্কের কথা। এত কিছুর পর কম্পিউটার ক্লাসের হোমওয়ার্কের কথা বেনির মনে আছে এটা হয়তো তার নির্লিপ্ততাকেই বোঝাতে পারত। কিন্তু এর পরের শটেই আমরা বেনিকে দেখতে পাই খুব লো লাইটে প্রায় অন্ধকারে শুয়ে থাকতে। এই সিকোয়েন্সটা একটা লং টেক। আমরা প্রথমবার বুঝতে পারি বেনির মধ্যেও দ্বন্দ্ব আছে।

সকালের দৃশ্য শুরু হয় ব্রেকফাস্টের প্লেটে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট খাবারের ক্লোজ আপ দিয়ে। এই উচ্ছিষ্ট কেন দেখানো হল? প্রাচুর্য বোঝাতে? বেনির জীবনে কোনো কিছুরই দাম নেই এটা বোঝাতে? নাকি এটাও বেনির ভিতরের দ্বন্দ্বের প্রকাশ? বেনি তার বন্ধুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

বেনির ভিতরের এই দ্বন্দ্ব বা বেনির ভিতরে অন্য বেনির প্রকাশ ঘটে একটু পরেই। বেনিকে দেখা যায় শপ উইন্ডোর বাইরে থেকে তাকিয়ে থাকতে। ফ্রেমের মধ্যে বেনি এবং তার স্পষ্ট প্রতিচ্ছায়া দুইই ফুটে ওঠে। এই ছায়ার সামনে দিয়ে বেনি হেঁটে ক্যামেরার থেকে দূরে চলে যেতে থাকে উদ্দেশ্যহীন ভাবেক্যামেরা তার ছায়াটাকেই ধরে। বেনির দ্বিতীয় সত্ত্বা যেন খুনের পর বাইরে বেরিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। এই সত্ত্বা কী, তা আমরা এখনও জানি না।

বেনি তার দিদির ফ্ল্যাটের সামনে আসে। স্ক্রিনে আমরা শুধু দেখি, ক্লোজ আপে কয়েকটা স্পিকার ফোনের বোতাম। বিদেশে যেমন থাকে অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। কাউকে দেখা যায় না শুধু সংলাপ বলে দেয়, বেনির দিদির বন্ধুরা তাকে জানাচ্ছে যে, তার দিদি সেই মুহূর্তে সেখানে নেই। পরিচালক আবার আক্রমণ করলেন উত্তরাধুনিক জীবনে মানুষে-মানুষের সংযোগকে। সব কিছুই আসলে টেকনোলজির মাধ্যমে। কখনও ভিডিও, কখনও শুধু সাউন্ড। বেনির এই এলিয়েনেশন আরো প্রকট হয় শহরের রাস্তায় তার হেঁটে যাওয়ার একটা দৃশ্যে। যখন আইস স্কেটিং রিঙ্কের সামনে এসে দাঁড়ায় সে। প্রায় জেলখানার মতো লোহার গরাদের সারি। তার ওধারে বাচ্চারা স্কেটিং করছে। বেনি এপাশে। বেনি এর বাইরে। সম্পূর্ণ এলিয়েনেটেড। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

বেনি এর পর সেলুনে গিয়ে সম্পূর্ণ ন্যাড়া হয়ে যায়। এই ন্যাড়া হয়ে যাওয়া আসলে ইয়োরোপিয়া নিও নাৎসি স্কিন হেডদের মতো। বেনি আসলে যেন নিও নাৎসিদের মতো সম্পূর্ণ বীভৎসতার মধ্যে আনন্দ খুঁজছে। বাড়ি ফেরে সে। তার মা অবাক হয়ে যান তার এই নতুন রূপ দেখে। বাথরুমে বেনিকে ন্যাড়া হওয়ার জন্য বকেন তার বাবা। নিয়মতন্ত্রের কথা বলেন। বেনি সম্পূর্ণ ইনডিফারেন্ট থাকে। তার বাবার সঙ্গে বাদানুবাদের দরকার নেই। কিন্তু সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা আছে। তার বাবা চলে যাওয়ার পর বেনি তার চুলহীন মাথায় হাত বোলায়, আয়নার দিকে তাকিয়ে। সে যেন নিজেকে চিনতে পারছে। এই পুরো সিকোয়েন্সটায় বেনির বাবাকে দেখা যায় ফ্রেমের একদিকে পার্শিয়ালি। পুরো ফ্রেম জুড়েই যেন বেনি। আসলে এটা বেনির নিজেকে চিনতে পারা। ব্যাকগ্রাউন্ড আশ্চর্য সাদা। সাদা প্রতিক্রিয়ার রঙ। কাউন্টার রেভলিউশানারি। সাদা স্থিরতার রঙ। আবার সাদা ওয়েস্টার্ন সিম্বলিজমে বিচ্ছিন্নতা, ঠান্ডা এবং ফাঁকা হয়ে যাওয়ারও প্রতীক। পরিচালক আমাদের কাছে বেনির নতুন পরিচয় তুলে ধরলেন। সে ঠান্ডা মাথারআর্থসামাজিক কাঠামোয় উপরে থাকা প্রতিক্রিয়ার অংশ, সমাজের থেকে বিচ্ছিন্ন। বেনি নিও নাৎসি।

নিও নাৎসিজম আরো পরিস্কার  হয় যখন দেখা যায়, বেনি তার ঘরে টিভিতে অ্যামেরিকান ইংলিশে পাপেট শো দেখছে। সেই পাপেট শো-এর বিষয় রিসেশন। রিসেশন হলে যে মানুষ কাজ হারায় তা নিয়ে মজা হচ্ছে পাপেট শোতে। ফার রাইট বা অতিদক্ষিণপন্থী মতবাদ আবার সেই বেনির দেখা টিভির মধ্যে দিয়ে চারিয়ে দেওয়া।

স্কুলের কম্পিটার ক্লাসে বন্ধু রিকির কাছে শিক্ষক হোমওয়ার্ক চাইলে সে বেনিকে দেখিয়ে দেয়। বেনি তার হোমওয়ার্কের খাতা ফেরত দেয়নি। শিক্ষককে বলে দেওয়া বন্ধু রিকিকে ক্লাসের মধ্যেই মারে বেনি। টিচার তাকে ক্লাস থেকে বার করে দেন। বেনি আবারও ইনডিফারেন্ট। কারুর কোনো আচরণে পালটা প্রতিক্রিয়া দিতে সে ভুলে গিয়েছে। সে আসলে মূর্ত বিচ্ছিন্নতা। এই বিচ্ছিন্নতাবোধকেই আরো রিইনফোর্স করেন পরিচালক স্কুলের টানেলের প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন করিডোর দিয়ে বেনির হেঁটে যাওয়া বোঝাতে। বেনির মুখ আমরা দেখতে পাই না। তার পিঠ ধরেন পরিচালক। যেন আসলে বেনি দর্শকের থেকে এলিয়েনেটেড।

বেনি ফিরে আসে। তাকে দেখা যায় গ্লাসে দুধ ঢালতে। এই দুধের খানিকটা চলকে পড়ে টেবিলে। সাদা দুধ বেনি মুছতে যায় ন্যাপকিন দিয়ে। তরল দুধের দাগ লেগে থাকে টেবিলে যেমন আগে আমরা দেখেছি মেঝেতে মেয়েটির তরল রক্তের ছাপ লেগে থাকতে। বেনি খাওয়ার টেবিলে বসে খায়লং ওয়াইড শট। অথচ বেনির মাথার ঠিক কাছে দেখা যাচ্ছে খুলে রাখা বেদানার ছবিটা। বেনি কমিকস পড়ছে। টিভিতে দেখা যায় ক্রোয়েশিয়ার ছবি, ঘোষক বলে চলেন ক্রোয়েশিয়ার সৈন্যরা অনেক আর্মস এবং অ্যামুনিশান খুঁজে পেয়েছে। এবং সার্বিয়ার সৈন্যরা কোনো কারণ না-জানিয়েই চলে গিয়েছে।

এরপর বেনি তার মা আর বাবাকে চালিয়ে দেখায় তার সেই মেয়েটাকে খুনের দৃশ্য। ক্লোজ আপে তার মুখে দেখা যায় সামান্য বিব্রত হওয়ার ভাব। কাবার্ডের মধ্যে থেকে মেয়েটার লাশ বার করে বেনি, ড্রয়ার থেকে খুনের অস্ত্র, ভিডিও প্লেয়ার থেকে খুনের ভিডিও ক্যাসেটসব কিছুই টুকরো টুকরো। ক্লোজ আপ। কোথাও কোনো অভিনয় দেখা যায় না। অভিনেতাদের দেখা যায় না। পরিচালক যেন একটা এমব্লেমের মতো এই জিনিসগুলো দেখান। নৈর্ব্যক্তিক, অভিব্যক্তিহীন।

এরপর বেনি আর তার বাবার কথোপকথন দেখা যায়। দু-জনে কথা বলে, কিন্তু একই ফ্রেমে দুজনকে নিয়ে নয়, আলাদা আলাদা ক্লোজ আপে। সাবজেকটিভ শটে। যেন দু-জন দু-জনকে দেখছে। আবার এলিয়েনেশন। দু-জনে একসঙ্গে নেই। বেনির বাবা তাকে জিজ্ঞাসা করেন মেয়েটিকে তাদের বাড়িতে ঢুকতে কেউ দেখেছিলেন কিনা। কথার মধ্যে বেনির মা-এর ক্লোজ আপ দেখা যায়। কথা বলতে বলতে তাঁর দাঁতে-দাঁতে লেগে ঠক ঠক শব্দ হয়। অদ্ভুত একটা ভয় আসলে দর্শককেও গ্রাস করে। কিন্তু কোথাও কোনো মাস্টার শটে তিনজনকে একসঙ্গে ধরা নেই। এই কথোপকথনে কোথাও বেনির বাবা, মা তাকে এই কাজের জন্য তিরস্কার করেন না। বরং বার বার এই ঘটনা সম্পর্কে কেউ জানতে পেরেছে কিনা, বা বেনি কাউকে নিজে থেকে এই কথা বলেছে কিনা, এটাই জিজ্ঞাসা করতে দেখা যায়। দর্শক এই সিকোয়েন্সে বারবার অবাক হবেন। বারবার ভাববেন এত বীভৎস একটা ব্যাপার নিয়ে শান্তভাবে আলোচনা করছে কী করে বাবা আর ছেলে। সামান্য রিঅ্যাকশন শুধু দেখা যায় বেনির মায়ের মুখে। অথচ বেনি শান্তভাবে তাকে বলে যে, তার খিদে পেয়েছে। কিছুটা অবাক হন তিনি। অস্বস্তিতে কানের দুল দুটো খুলে ফেলে টেবিলের উপর রাখেন। পরিচালকের এই সিকোয়েন্সটাকে ধরা অনবদ্য। পাকা মুনশিয়ানা। এবং নিখুঁত। এইরকম নৈর্ব্যক্তিকভাবে যে এমন একটা দৃশ্য ধরা যায়, এটাই আশ্চর্যের। বাবা মা আর বেনির ক্লোজ আপগুলো দেখতে দেখতে মনে হয় যেন বেনির ক্লোজ আপে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স ব্যবহার হয়েছে। সামান্য ডিসটর্শন আছে ফেসে। যেন তার ব্যাকগ্রাউন্ডের স্পেসটা একটু বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে আরো আইসোলেটেড দেখানোর জন্যই। বেনির বাবা তাকে বলেন খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়তে। তাকে জিজ্ঞাসা করেন তার ভয় লাগবে কিনা। বেনি জানায় যে তার ভয় লাগবে না।

এরপর স্ক্রিন জুড়ে শুধু অন্ধকার। বেনি তার মাকে বলে দরজাটা সামান্য ফাঁক করে রাখতে। সামান্য একটু আলো প্রবেশ করে দরজার ফাঁক দিয়ে। আমরা এরপর বেনির মা আর বাবাকে উত্তেজিতভাবে কথা বলতে দেখি। দু-জনেই আলাদা আলাদা ক্লোজ আপে। কেউ লেন্সের দিকে সোজাসুজি না তাকিয়ে। দু-জনের পিছনেই আশ্চর্য ভাবে সাদা রঙ। বেনিকে ধরিয়ে দিলে কী হতে পারে সেটা নিয়েই দু-জনের কথা। বেনিকে সাইকোলজিক্যাল কোন ইন্সটিটিউটে হয়তো পাঠানো হবে। তার জীবন নষ্ট হবে। তাদের পরিবারের সামাজিক প্রতিপত্তি নষ্ট হবে। আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি যে, খুনি সাইকোপ্যাথ ছেলেকে ধরিয়ে দেওয়ার বা তার কাজের সমালোচনার অভাব। বেনির মা-র রিঅ্যাকশান এইখানে একটু পাগলাটে, কখনো তিনি ফিক করে হেসে ফেলেন। কখনো সামান্য রেগে যান, কখনো খুব স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করেন। অভিনয় এককথায় অসাধারণ। এর মাঝে মাঝে বেনির ঘরের দৃশ্য ধরা পড়ে। প্রায় অন্ধকার ঘরে সে শুয়ে আছে। দরজার বাইরে থেকে অস্পষ্টভাবে তার বাবা-মায়ের কথোপকথন ভেসে আসে।

বেনিকে ধরানোর বদলে তারা ঠিক করেন লাশটাকে গায়েব করে দিতে হবে। টুকরো টুকরো করে লাশটাকে কেটে ড্রেন দিয়ে ভাসিয়ে দিতে হবে। এত ছোটো টুকরো যে ড্রেন দিয়ে সহজেই গলে যেতে পারে। আর হাড়গুলোকে নিজেদের ফার্ম হাউজে গিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু বেনির মা এইগুলো দেখতে পারবেন না। বেনিকে নিয়ে সেই সময় তিনি দূরে কোথাও চলে যাবেন।

শহরের রাস্তার ছবি ধরা পড়ে টপ শটে। অন্ধকার রাত্রের ছবি, সারি সারি গাড়ি চলে যাচ্ছে। একটা কনট্রাস্ট যেন একটা পরিবারের অস্বাভাবিক জীবন বোঝাতে বাইরের রোজকার স্বাভাবিক জীবনের ব্যবহার।

পরিচালক ক্রমশ তাঁর শটের নির্বাচনে মিনিম্যালিস্ট হতে থাকেন। দ্রুত এগোতে থাকেন তিনি। বেনি আর তার মাকে আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখি পরের সকালে। তারপরেই বিভিন্ন বেড়াতে যাওয়ার জায়গার পিকচার পোস্টকার্ড একের পর এক আসে। আমরা সংলাপে বুঝতে পারি তাদের তাড়াহুড়ো। তাড়াতাড়ি প্লেনের টিকিট পাওয়া যাবে এমন জায়গা ইজিপ্টে তারা যাবেন স্থির হয়। পরিচালকের মিনিম্যালিস্ট অথচ অসাধারণ শটের সিলেকশন বোঝা যায় এর পরেই। লং শটে দেখা যায় বেনিকে স্কুলের করিডোরে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে। পিছনে ভেসে আসে তার মা আর শিক্ষকের কথোপকথন। তার মা কোনো এক আত্মীয়ের মৃত্যুর কথা বলে স্কুল থেকে ছুটি চাইছেন। পালটা শটে আমরা দেখতে পাই বেনির প্রোফাইলের ক্লোজ আপ। ফ্রেমের এক দিকে সে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথার পিছনে অফ ফোকাসে নেগেটিভ স্পেসে আমরা দেখতে পাই তার মাকে মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে করমর্দন করতে। তারপরে অফ ফোকাসেই প্রায় সিল্যুয়েট হয়ে তিনি এগিয়ে আসেন বেনির দিকে। তাঁর পায়ের হিলের শব্দ শোনা যায়। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার কম্পোজিশনের নিয়মে সাধারণত কোনো ক্যারেক্টার যে দিকে তাকিয়ে থাকেন, সেই দিকেই ফ্রেমে স্পেস ছাড়া হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে উলটো হল, অর্থাৎ বেনি যে দিকে তাকিয়ে নেই সেই দিকে স্পেস ছাড়া এবং সেইখানেই আমরা অফ ফোকাসে তার মাকে দেখতে পাই – নেগেটিভ স্পেস। এটা আসলে পুরো বিষয়টার নেগেটিভিটির পার্সপেকটিভ থেকে ধরা। আমরা বুঝতে পারি তার মা বেনির পাপকর্মের একজন অংশীদার। টপ শটে দেখা যায় স্কুলের কোর্টইয়ার্ড। বেনির মায়ের হিলের আওয়াজ চলতেই থাকে। আমরা তাদের চলে যাওয়া বুঝতে পারি। এর পরের দৃশ্যই একটি খবরের কাগজের পাতা উলটোনোর। মাস্টার শটে আমরা দেখতে পাই বেনি এবং তার মাকে একটি ক্যাফেতে। তার মা হয়তো সেই খুনের খবরটাই খুঁজছেন। বেনি এই দৃশ্যগুলোয় একটা টুপি পরে থাকে। তার নেড়া হওয়ার বিদ্রোহ এখন নেই। বরং সে যেন বাবা-মায়ের আশ্রয়েই।

এইবার প্রথম আমরা বেনির সঙ্গে তার বাবা-মায়ের দৃশ্যগুলোয় তাদের সম্পর্কের উষ্ণতা খুঁজে পাই। তার বাবা বেনিকে বারবার শাসন করে জিজ্ঞাসা করেন সে সত্যিই আর কাউকে কিছু বলেছিল কিনা। কিংবা তার মাকে দেখা যায় ঘুমন্ত বেনির পাশে এসে বসতে। প্রায় অন্ধকার একটা ঘরে। যেখানে মাতৃত্বের আলোর উজ্জলতা নেই।

ইজিপ্টের দৃশ্যে পরিচালক আবার মিনিম্যালিস্ট। হয়তো ছবির লো বাজেটের জন্যই। কিংবা তাঁর ছবির প্রয়োজন নেই ইজিপ্টের সৌন্দর্য দেখানোরবেশিরভাগটাই র ফুটেজে হ্যান্ড হেল্ড ক্যামেরায় যেন বেনি ছবি তুলছে। মাঝে মাঝেই হোটেলের মধ্যে। হোটেলের টিভিতে চার্চের স্থাপত্য দেখানোর সাথে অর্গান বাজার আওয়াজে বেনিকে দেখা যায় কিছুটা বিরক্ত হতে। নিরাসক্তভাবে সে টিভি থেকে সরে আসে। বাইরে অন্ধকার নদীতে কিছু সাদা বোট ভাসছে। বেনিকে তার অফ স্ক্রিন মা বলে ওঠেন যে তার বাবা তাকে ভালোবাসা পাঠিয়েছেন। অন্ধকারের দৃশ্য আবার ইঙ্গিতবাহী। কিংবা ইঙ্গিতবাহী সেই দৃশ্যটা যেখানে বেনির মাকে দেখা যায় তড়িঘড়ি বাসে উঠতে এবং পিছনে কুকুরে ডাক শোনা যায়। সাউন্ডের ব্যবহার বুঝিয়ে দেয় তাকে ভয় তাড়া করছে। ইজিপ্টের এই সিকোয়েন্সগুলোর মাঝে বেনিকে একবার দেখা যায় নিজের ক্যামেরার ভিডিওতে। সে যেন মোনোলগে বলে যায় যে, এখনও ধরা পড়ার কোনো খবর সে পায়নি। অবশ্য ইয়োরোপের কোনো খবর আসে না এখানে। এবং পরদিন তারা ফিরে যাবে। এইখানে আরো একটা দৃশ্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ, যখন বেনিকে দেখায় যায় টয়লেটে বসা তার মার ছবি তুলতে। বোঝা যায় জীবনের সব কিছুর ভিডিওই সে তুলতে পারে। তার কাছে জীবনটার সবটাই ভিডিওর মতো দূরের।

ফেরার আগের দিন হোটেলের ঘরে শুয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বেনির মা। আবার বোঝা যায় যে, তিনি এখনও কোথাও ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছেন না

বাড়িতে ফিরে আসে বেনি আর তার মা। সব কিছু স্বাভাবিক এখন। পরের শুক্রবার তারা একটা পার্টি দেবে ঠিক হয়। বেনি শুধু সামান্য বিব্রত হয় তার ঘরের খোলা জানলা দেখে, যে জানলা বন্ধ করে রেখে ক্যামেরা দিয়েই দেখতে সে অভ্যস্ত। তার ফ্রেম থেকে সরে যাওয়ার পর কয়েক লহমার জন্য দেখা যায় অফ ফোকাসে ফাঁকা একটা ধূসর ফ্রেম। বেনি একদম স্বাভাবিক এখন। তার মা তাকে শুতে যাওয়ার আগে বলে যান টিভি না দেখতে। বাবা দাঁড়িয়ে থাকেন কয়েক মুহূর্ত, তারপর খাটে বসে তাকে বলেন যে, এখন ভয়ের কিছু নেই। তারপর কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করেন, সে কেন খুনটা করেছিল। বেনি প্রথমে কী করেছিল যেন বুঝতেই পারে না। তারপর বলে, য়তো কেমন লাগে আমি দেখতে চেয়েছিলাম বেনির বাবা জিজ্ঞাসা করেন, কেমন লাগে? বেনি মুখটা সামান্য ভেটকায়। খুব স্বাভাবিক যেন, এর বাইরে কিছু নয়।

বেনিকে আমরা এর পর দেখি একদম স্বাভাবিক। মা তার সাথে ব্রেকফাস্টে বসেন। খাবার খেতে খেতে বেনি তাকায় সেই বেদানার ছবির দিকে। লং শটে দেখা যায় বেনি আর তার মাকে বেনির শরীরে বেদানার ছবিটা ঢেকে গিয়েছে। ইয়োরোপিয়ান ক্রিশ্চান সিম্বলিজমে খোলা বেদানা আসলে জেসাসের যন্ত্রণা এবং তার রেজারেকশানের প্রতীক। পরিচালক এই সিম্বলটাকে অন্য একভাবে ব্যবহার করলেন। এই বেদানার ছবি দেখেই বেনির যেন পুনরুত্থান হল। কী পুনরুত্থান সেটা একটু পরে বোঝা যাবে।

বেনিকে আমরা দেখি তার পুরোনো বন্ধু রিকির সঙ্গে। দুজনের ভাব হয়ে গিয়েছে। ভিডিওতে আমরা দেখতে পাই বেনির বাড়ির পার্টি। একদম শুরুর মতোই। শুরুতে যে খেলাটা খেলতে দেখা গিয়েছিল পার্টিতে সেই একই খেলা আবার দেখা যায়। টাকার ব্যবহার আবার মোটিফের মতো ফিরে আসে। বেনির বাবা, মায়ের স্বাভাবিক কথাবার্তার মাঝে আমরা একটা কয়্যারের গান শুনতে পাই।

Despite the ancient dragon, despite the gaping jaws of death, despite the constant fear, let the world rage and toss. I stand here and sing in perfect calm.

মন্তাজের মতো ভিডিওর মধ্যে পার্টির নানান খুশির মুহূর্তের ছবি ভেসে ওঠে। আমরা বেনির মা আর বাবার ক্লোজ আপ দেখতে পাই। এখন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড রঙিন। সব স্বাভাবিক। আমরা বেনিকে দেখতে পাই স্কুলের কয়্যারে গানটা গাইতে। এরপরেই হঠাৎ কাট করে চলে যায় বেনির ঘরের দৃশ্যে। আমরা একটা দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখি এই ম্যাচ কাটে। অস্পষ্ট গলায় শোনা যায় বেনির মা আর বাবার পরিকল্পনা। এটা সেই রাত যখন বেনির খুনের ভিডিও আবিষ্কার হয়েছিল। এই শটটা বেনির ভিডিওর মতো নয়েজ সম্পন্ন। এবং শটটা সাবজেকটিভ। দর্শক আসলে বেনির চোখ দিয়েই দেখেন গোটা দৃশ্যটা। শুনতে পান তার বাবা, মায়ের আলোচনা। দর্শকের হয়তো অস্বস্তি হতে থাকে, একটা খুন কী সুন্দরভাবে ঢাকা পড়ে গেল! আর ঠিক তক্ষুনি যেন আমরা বেনিকে একজন ভারী গলার পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে শুনতে পাই। দৃশ্যের পরিবর্তন হয় না প্রথমে। আমরা বুঝতে পারি বেনি কাউকে বলছে এই খুনের কথা। দেখা যায় ফিল্মের টেপ বার করে আনার দৃশ্য। ক্লোজ আপে টিভিতে নয়েজ। বেনিকে দেখতে পাই আমরা। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় সে আগে না বললে এখন কেন বলছে? সে মুখ নাচিয়ে বলে বিকজ! বেনি তার বাবা মায়ের অফিসের ঠিকানা বলতে থাকে। তারপর নিষ্পাপভাবে বলে, ‘আমি কি এখন যেতে পারি?’ আমরা বুঝতে পারি সব স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার পর বেনি পুলিশকে সব কথা বলে তার বাবা-মাকে ধরিয়ে দিচ্ছে। ভিডিওতে আবার দেখা যায় ইজিপ্টের দৃশ্য। যেন সেইগুলো বেনিরই তোলা। বেনি বেরিয়ে আসে ঘরের থেকে। পিছনে একজন পুলিশবেনির বাবা আর মাকে আলাদা আলাদা ধরা হয় ক্লোজ আপে। দু-জনেই হতভম্ব। এখন তিনজনেরই ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা। বেনি একটু অপ্রস্তুত হয়। তারপর শান্তভাবে ঘাড় নাচিয়ে বলে, ‘সরি’, যেমন রাস্তায় কাউকে ধাক্কা দিলে আমরা বলে থাকি। এইবার বেনিকে আমরা চলে যেতে দেখি অন্য কয়েকটা মনিটরে, পুলিশ স্টেশনের ক্লোজ সার্কিট টিভির মনিটর যেমন হয়। পিছনে রেডিওর আওয়াজ ভাসতে থাকে। আমরা শুনতে পাই সার্বিয়াতে শান্তি ফেরানোর জন্য ইয়োরোপিয়ান ইউনিয়ানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

হ্যানেকে আসলে নাটকের লোক। সিনেমা করার আগে তিনি নাটকের নির্দেশক ছিলেন। ফলে তার প্রায় সব সিনেমাতেই অভিনয়ের মান অত্যন্ত উঁচু। আর্নো ফ্রিশের নাটকীয়তাবর্জিত অভিনয় ছবির ভয়াবহতাকে আরো প্রকট করে।

গোটা ছবিটাতে সার্বিয়া যেন একটা অল্প-উচ্চারিত মোটিফের মতো এল। সার্বিয়া কারণ সে ইয়োরোপের একটা দেশের টুকরো হয়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে জন্ম নেওয়া। আইসোলেশনের মূর্ত প্রতীক যেন। একইসঙ্গে ইয়োরোপিয়ান তথা বিশ্বের লেফটের কাছে সার্বিয়া আসলে একটা ফ্যাসিস্ট দেশ। ইয়োরোপিয়ান নিও-লিবারেল অর্থনীতি, পুঁজিবাদের বিকট একটা রূপ, নিও-রিচ এবং আইসোলেশন থেকে ফার রাইটের উত্থান, তাই যেন এই ছবির মূল প্রতিপাদ্য। অথচ কাহিনির বুনোটে একটা ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক আখ্যানের সন্ধান পাই আমরা। অ্যামেরিকান অ্যাকশান ফ্লিকের পোকা, ভিডিও ফ্যানাটিক বেনি আসলে যেন নিও নাৎসিই। তার আইসোলেশন এত যে, সে কাউকেই ছাড়বে না। এমনকী নিজের বাবা-মাকেও নয়। মিলোসোভিকের সার্বিয়া যেমন আসলে যুগোস্লাভিয়াকে টুকরো টুকরো করেই জন্ম নিয়েছিল

 
 
top