যে দরজার কোনো দেওয়াল নেই

 

 

ফল: হেমন্ত

হেমন্ত হল পাতা ঝরার সময়। এইসময় সবুজ পাতারা রঙিন হয়ে ওঠে। আমরা দেখতে পাই গুরু বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছেন। একা তিনি নৌকা বেয়ে ফিরে যাচ্ছেন মঠের দিকে। তাঁর পিঠে ঝোলার মধ্যে বাঁধা একটা বিড়াল। বিড়াল হল কনশাসনেস বা চেতনার প্রতীক। বিড়ালটাকে ঝোলা থেকে বার করে তিনি বলেন, খুব ক্লান্তিকর ছিল। এই কথাটা যেন তাঁর নিজেকেই বলা।

ঝোলা থেকে বিড়ালের সঙ্গেই বার হয় আরো অনেক কিছু। তার মধ্যে থাকে খবরের কাগজে মোড়া জমাট ভাত। আর খেতে খেতেই পুরোনো খবরের কাগজের মোড়কে তিনি পান তাঁর শিষ্যের খবর। এখন তাঁর তিরিশ বছর বয়স। স্ত্রীকে খুন করে সে ফেরার হয়েছে। সিদ্ধার্থ ঊনত্রিশ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেছিলেন। শিষ্যের বয়স এখন প্রায় তারই মতো।

বৃদ্ধকে দেখা যায় তাঁর ছেড়া চীবর সেলাই করতে। যেন পরিনির্বাণের আগেও কিছু কাজ এখনও বাকি আছে তাঁর। বিড়ালটাকে দেখা যায় বুদ্ধমূর্তির শূন্য পাত্রের ধারে ঘুরে বেড়াতে। যেন বুদ্ধকেই খুঁজছে সে।

শিষ্য ফিরে আসে। ফিরে আসার শটটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জলের মধ্যে প্রথমে তার ছায়া দেখা যায়। তারপর টিল্ট আপ করে ক্যামেরা ধরে তার শরীর। জল এইখানে কামনা-বাসনার প্রতীক। জলে শিষ্যের ছায়া সেইটাকেই প্রতিভাত করে।

এই শিষ্য প্রচণ্ড অস্থির। গুরুর সঙ্গে কথোপকথনে সে জানায়, যে মেয়েটিকে সে ভালোবেসেছিল, সে অন্য পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। আর সেইটাই সে মেনে নিতে পারেনি। গুরু তাঁকে বলেন, তুমি কি জানতে না মানুষের (কামনা-বাসনার) জগৎ কেমন? এইখানে যেন মনে করিয়ে দেওয়া হয় আগের পর্বে তাঁর সাবধানবাণী। কাম আসলে ভোগের লালসা সৃষ্টি করে, আর এই ভোগদখলের মানসিকতা শেষ পর্যন্ত খুনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শিষ্য তার ব্যাগ খুলে বার করে বুদ্ধমূর্তি। আবার স্থাপিত হন তিনি তাঁর পুরোনো আসনে। এই পর্যায়ের পুরোটাই আসলে যেন বুদ্ধের তথা ধর্মের ফিরে আসার ইঙ্গিত। বুদ্ধমূর্তির সঙ্গেই তার ব্যাগ থেকে বার হয় খুনের রক্ত-মাখা ছুরি। ছুরিটা সে বারবার ঠুকতে থাকে কাঠের মেঝেতে।

জীবনের এই পর্যায় হল যখন আত্মা তার জৈবিক কামনার বস্তুটিকে পাওয়ার অসীম বাসনায় তাকে খুন করেছে, কিন্তু তার ভিতরের বুদ্ধ তাকে অনুশোচনায় বাধ্য করছে। নিজের সঙ্গে এই যুদ্ধে সে আসলে মায়ায় আবৃত জীবনের প্রতি লোভের দরজাগুলো বন্ধ করছে। কিন্তু সে নিজে বুঝছে না যে, সে আসলে দেওয়ালহীন দরজার অন্যপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।

শিষ্য তাই ভোরবেলা মঠের বাইরে বেরিয়ে মঠের দরজা বন্ধ করে দেয়। নৌকা বেয়ে সে চলে যায় অন্যপ্রান্তে। আক্রোশে পাথর ছুড়তে থাকে জলে। সেই জায়গায় যেখানে সে মাছের, ব্যাঙের শরীরে পাথর বেঁধেছিল। এই কামনা-বাসনার পাথর এখনও তার মনের গভীরে। তার মনের গভীরে পাপের ভার। জলের মধ্যে কাঁদতে কাঁদতে তাই সে চিৎকার করে ওঠে গুরুর উদ্দেশে।

মঠে ফিরে আসে সে। আত্মহত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু শরীরের প্রতি, জীবনের প্রতি তার মায়া অবিচ্ছিন্ন। মরতে সে পারে না। গুরু লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করতে থাকেন। ঝুলিয়ে দেন মঠের ভিতর। পাপের দণ্ড স্বরূপ।

আর তারপর পোষা বিড়ালটিকে ধরে তার লেজ কালিতে চুবিয়ে মঠের সামনের কাঠের দেওয়ালে লিখতে থাকেন প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র। তারপর শিষ্যকে বলেন ছুরি দিয়ে সেই কালিতে লেখা সূত্র, খুদে খুদে প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রটা, ফুটিয়ে তুলতে মেঝেতে।

প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র মহাযান বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান সূত্র। এই সূত্র বলে যে, প্রজ্ঞাপারমিতার সঙ্গে মিলিত হতে হতে বুদ্ধ বুঝেছিলেন জীবনের অসারতার কথা আর তারপর তিনি প্রকৃত বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। এইখানেও কামতাড়িত হয়ে খুন করা শিষ্য প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র খোদাই করতে থাকে কাঠের মেঝেয়। যেন এর মধ্যে দিয়েই প্রকৃত বুদ্ধ হয়ে উঠবে সে।

খুনিকে খুঁজতে হাজির হয় দু-জন পুলিশ। শিষ্য ভয় পায় তাদের দেখে। একবার ছুরি তুলে নেয় আত্মরক্ষার্থে। তার হাত কেটে তখন রক্ত পড়ছে। গুরু তাকে লিখে যেতে বলেন। সে আবার লিখতে থাকে। যেন সে ধর্মের কাছে ধীরে ধীরে নিজেকে সমর্পণ করছে। পুলিশ দু-জন খেলার ছলে গুলি ছোড়ে জলে ভাসা ক্যানে। শিষ্য আবার ভয় পায় গুলির শব্দে। কিন্তু সে খোদাই করতেই থাকে। ক্রমশ রাত নেমে আসে। ঘুমিয়ে পড়ে পুলিশেরা। কিন্তু শিষ্য পালায় না। সে তার কাজ করে যেতে থাকে। যেন তার সমর্পণ সম্পন্ন হচ্ছে। সেও যেন ক্রমশ কামনা-বাসনা-ভয় সব ভুলে বুদ্ধ হয়ে উঠছে। সকাল হলে গুরুর আদেশে খোদাই করা প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রের ওপর রং বোলায় দু-জন পুলিশ ও গুরু। যেন সবাই নিজেদের সমর্পণ করে বুদ্ধের কাছে, প্রকৃত জ্ঞানের কাছে। শাস্তিদাতা ও শাস্তিপ্রাপ্ত এক হয়ে যায় কোথাও।

শিষ্যকে দেখা যায় রঙিন প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকতে। সে যেন সমাহিত। শান্ত। ভয়, অনুশোচনা, কামনা, বাসনা মুক্ত। এর পরেই নির্দেশক একটি অসামান্য চিত্রকল্প ব্যবহার করেন। দেখা যায়, শিষ্য একা বসে মঠের সামনে। মঠটা জলের মধ্যে পাক খাচ্ছে চক্রাকারে। আর শিষ্যের পিছনে রাখা ক্যামেরায় ধরা পড়ছে পাড়ের দৃশ্য। শিষ্যই যেন বুদ্ধ হয়ে উঠছে ক্রমে ক্রমে। সেই যেন ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। সে যেন বুঝতে পারছে দরজাহীন দরজার অস্তিত্ব।

শিষ্যকে নিয়ে নৌকায় করে চলে যাওয়ার সময়, কয়েক মুহূর্তের জন্য নৌকা থামিয়ে দেন গুরু মঠের সামনে থেকে। পুলিশ দাঁড় বাইলেও নৌকা এগোয় না এক চুলও। বোঝা যায় গুরু অলৌকিক শক্তির অধিকারী। শিষ্য আর পুলিশের সঙ্গে নৌকায় সওয়ার সচেতনতার ইঙ্গিতবাহী বিড়ালটা। ওপারে পৌঁছানোর পর তারা চলে গেলে, মঠের সামনে দাঁড়ানো গুরু অলৌকিক দক্ষতায় নৌকাটি ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। বোঝা যায় যে, তিনিই ধর্মের ও মায়ার প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি স্বয়ং বোধিসত্ত্ব। শিষ্যকে তিনি সাধারণ জগতে ফেরত পাঠালেন তার পাপের শাস্তি পেতে, লৌকিক জীবনে তার বোধের পরীক্ষা নিতে। জঙ্গলের মধ্যে গাছের ডাল বেয়ে ওঠা বিড়ালটা যেন তারই ইঙ্গিত করে।

এরপর বোধিসত্ত্বের মতোই গুরু আয়োজন করেন তাঁর নিজের পরিনির্বাণের। তাঁর কাজ শেষ হয়েছে। নৌকার ওপর কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালিয়েতিনি নিজে যেন যজ্ঞের আগুনে শেষ হয়ে যান। তাঁর চেতনার ইঙ্গিতবাহী একটা সাপ আগুনের মধ্য থেকে জলের মধ্যে দিয়ে সাঁতার কেটে ভেসে আসে। সাপটাকে দেখা যায় প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রের মধ্যে দিয়ে চলে আসতে।

কুয়াশা ঢাকা লেকের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ফল বা হেমন্তের পর্যায়। গাছ এখন পাতা ঝরিয়ে ফেলেছে। নতুন জীবন আসবে আবার শীতের পরে:

 

বহুং বে সরণং যন্তি পব্‌বতানি বনানি চ।

আরামরুক্‌খচেত্যানি মনুস্‌সা ভয়তজ্জিতা।।

নেতং খো সরণং খেমং নেতং সরণমুত্তমং।

নেতং সরণমাগম সব্‌বদুক্‌খা পমুচ্চতি।।

যো চ বুদ্ধঞ্চ ধম্মঞ্চ সঙ্ঘঞ্চ সরণং গতো।

চত্তারি অরিয়সচ্চানি সম্মপ্পঞ্‌ঞায় পস্‌সতি।।

দুক্‌খং দুক্‌খসমুপ্পাদং দুক্‌খস্‌স চ অতিক্কমং।

অরিয়ঞ্চহট্‌ঠঙ্গিকং মগ্‌গং দুক্‌খুপসমগামিনং।।

এতং খো সরণং খেমং এতং সরণমুত্তমং।

এতং সরণমাগম্ম সব্‌বদুক্‌খা পমুচ্চতি।।

মানুষ ভয় পেয়ে পর্বত, বন, উদ্যান, বৃক্ষ, চৈত্য ইত্যাদির স্মরণ নেয়। কিন্তু এই স্মরণ মঙ্গলদায়ক স্মরণ নয়। এ উত্তম আশ্রয় নয়, কেন না মানুষ এই শরণে গেলেও সব দুঃখ থেকে আশ্রয় পাবে না। যিনি বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘের শরণগ্রহণ করেন, তিনি চার আর্যসত্যকে () দুঃখ, () দুঃখের কারণ, () দুঃখের বিনাশ, () দুঃখের উপশমকারী আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ সম্যক জ্ঞান দ্বারা দেখে ফেলেছেন, তাঁর এটাই কল্যাণদায়ক শরণ, উত্তম শরণ, এই শরণ নিলে তিনি সব দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে যান (ধম্মপদ):

 

ন ক্ষালন্তি মুনরো জলেন পাপং

নৈবাপকর্ষন্তি করেন জগহু খম্‌।

নৈব চ সংক্রমতে

 

জল দিয়ে যেমন ময়লা ধোয়া হয়, তেমনভাবে বুদ্ধ লোকেদের পাপ ধুয়ে দেন না। শরীরে কাঁটা ঢুকলে যেমন হাত দিয়ে টেনে বার করতে হয়, তিনি তেমনভাবে জগতের দুঃখও বার করে নিয়ে আসেন না। তিনি নিজে জ্ঞান অন্য লোকের মধ্যে সঞ্চারিত করেন না। বরং যাকে উদ্ধার করতে চান, তাকে বস্তুর যথার্থতার উপদেশ দেন।

 

উইন্টার: শীত

শীতের শুরুতে ফিরে আসে মধ্যবয়স্ক শিষ্য। এই শিষ্যের ভূমিকায় নির্দেশক নিজে। বোধহয় এই ফিল্মে তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ ফুটে উঠেছে বলেই। দেখা যায় হ্রদটা জমে বরফ হয়ে গিয়েছে। যেন মোহ এবং মায়া সব প্রলোভন, ইহলৌকিক চাওয়া-পাওয়ার সব কিছুই শিষ্যের জীবনে এখন জমাট বাঁধা বরফের মতো। বরফেজমাট মঠের ভিতর ঢোকেন তিনি। দেখা যায় গুরুর চীবর এবং জুতোর মধ্যে শুয়ে রয়েছে সাপটা। এই সাপটা এই শীতেও নিদ্রামগ্ন নয়। এই সাপটাকেই আমরা আগে দেখেছি গুরুর মৃত্যুর পর জলের মধ্য দিয়ে ভেসে আসতে। এই সাপ অলৌকিক। গুরুর চেতনা।

বরফে জমাট-বাঁধা নৌকাটা খুঁড়ে বার করেন তিনি গুরুর চিতাভস্ম। জমে বরফ হয়ে যাওয়া ঝরনা খুদে তৈরি করেন বরফের বুদ্ধমূর্তি। গুরুর চিতাভস্ম লাল কাপড়ে মুড়ে তিনি লাগিয়ে দেন সেই চিতাভস্মের ত্রিনয়নের জায়গায়। বরফের ঝরনার সামনে এই বরফের বুদ্ধমূর্তিকে দেখা যায়। বরফ ফাটিয়ে তখন পিছনে বইছে জলের ধারা। এও অলৌকিক। যেন জগতের বাইরের কোনো কিছু্‌ এই বুদ্ধমূর্তি।

শিষ্যকে দেখা যায় একটা প্রাচীন পুঁথি খুঁজে বার করতে। যে দেরাজ খুলে তিনি সেটা পান, তার উপরেই আমরা দেখেছি সেই সাপটাকে। এও যেন গুরু তথা বোধিসত্ত্বের নির্দেশিত। শিষ্যকে এরপর দেখা যায় সেই পুঁথিতে আঁকা মার্শাল আর্টস অনুশীলন করতে। মার্শাল আর্টসের নানান মুদ্রায় বার বার ফ্রিজ হয়ে যায় ফ্রেম। এইখানে মার্শাল আর্টস যেন আবার হারমনির ইঙ্গিত করে। মার্শাল আর্টস অনুশীলনরত শিষ্যের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখতে পাই বরফ ফাটিয়ে বয়ে চলা ঝরনা। কখনো পারসপেকটিভে, কখনও-বা ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজে। আমরা বুঝতে পারি, জমাট হয়ে যাওয়া অনুভূতির ভিতর থেকে জন্ম নিচ্ছে ফল্গুধারার মতো বোধ। শিষ্যও বোধিসত্ত্ব। সেও এইবার বুদ্ধ হয়ে উঠছে।

মঠে আগমন ঘটে এক মহিলার। কোলে শিশু। তাঁর মুখ ঢাকা নীল কাপড়ে। রাত্রে বুদ্ধমূর্তির সামনে উপাসনারত অবস্থায় তাঁর চোখ দিয়ে জল পড়ে। অথচ তাঁর মুখ ঢাকা নীল কাপড়ে।  অদ্ভূত সুররিয়াল। চোখের জল যেন তাঁর জীবনের পাপের অনুশোচনার প্রতীক। শিষ্য এই নারীকে দেখেন মঠের ভিতরে রাখা দরজার ভিতর দিয়ে। এইবার কিন্তু তাঁর দেখা সামারের মতো দরজার বাইরে দিয়ে নয়। আমরা বুঝতে পারি, তিনি এখন বৌদ্ধধর্মের অনুশাসনের ভিতরে। দরজাহীন দরজার প্রকৃত অর্থ বুঝতে পেরেছেন তিনি। দরজাটা আস্তে আস্তে বন্ধ করে দেন তিনি। তিনি এখন কামনা-বাসনা রহিত। আরো রাত হলে মহিলা ঘুমিয়ে পড়েন। দরজার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে শিষ্য তার মুখের কাপড় খুলতে চান। মহিলার হাত স্পর্শ করে তাঁর পা। তিনি কাপড় খোলেন না আর। তিনি যেন বুদ্ধের মতোই ক্ষমাশীল। আরো রাত হলে মহিলাটি শিশুটিকে ফেলে একা পালাতে চান মঠ থেকে। বরফে মোড়া হ্রদের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি পড়ে যান জলের জন্য শিষ্যের খুঁড়ে রাখা গর্তে।

সকাল হয়। শিশুটি মঠের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে। বরফের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে এগিয়ে যায় সেই গর্তের দিকে। শিষ্য তার কান্না শুনতে পেয়ে ছুটে আসেন। বাচ্চাটিকে তুলে নেন। দেখা যায় বরফের বুদ্ধমূর্তি ঝরনার জলের ভিতর গলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। বুদ্ধ যেন লীন হচ্ছেন প্রকৃতিতে। কিংবা হয়তো গুরুর ত্রিনয়নের আর প্রয়োজন নেই শিষ্যের। সে বোধিসত্ত্ব থেকে ক্রমে বুদ্ধ হয়ে ওঠার পথে।

জমাট বাঁধা হ্রদের নীচে ভাসমান মায়ের দেহ। শিষ্য তাঁকে তুলে আনেন। বরফের ওপর। মুখ খোলেন তাঁর। ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজে আবার দেখা যায় মায়ের সেই নীল মুখ ঢাকার কাপড়ের ওপর একটা বুদ্ধমূর্তি রাখা। যেন সবই মায়া। সবই বুদ্ধ। কিংবা পাপীর মধ্যেও বুদ্ধ আছেন। এই নারীও যেন অবলোকিতেশ্বর। যিনি শিশু মৈত্রেয়কে পৌঁছে দিয়ে গেলেন।

শিষ্য বার করে আনেন যিনি ভবিষ্যৎ বুদ্ধ সেই মৈত্রেয়র মূর্তি। এইখানে পরিচালক একটি অসামান্য চিত্রকল্প ব্যবহার করেন। মঠের ভিতর যে তাক খুলে তিনি মৈত্রেয়র মূর্তি বার করে আনেন, তার দরজায় বোধিপ্রাপ্ত বুদ্ধের ছবি। যেন বুদ্ধের মধ্যে  মৈত্রেয়র উপস্থিতি।

প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রের ওপর বসে, শিষ্য কোমরে বেঁধে নেন ভাবচক্র। ভাবচক্র হল বৌদ্ধধর্মের সমস্ত নির্যাসসম্পন্ন এক চক্র। এই ভাবচক্রকে বলা হয় জীবনের চক্র, বা জীবনের সব কিছুই যে আসলে চক্রাকারে ঘটে, সেইটা বোঝানোর জন্যই এই চক্র।

কোমরে বাঁধা এই চক্র নিয়ে, খুব কষ্ট করে শিষ্য উঠতে থাকেন পাহাড়ের চূড়ায়। বারবার পড়ে যান তিনি। তাঁর এই ওঠার মাঝে ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজে ব্যবহার হয়ে স্প্রিং-এর সেই পাথর-বাঁধা মাছ, ব্যাঙ আর সাপের দৃশ্য। আমরা বুঝতে পারি, জীবনের চক্রাকার পুনরাবৃত্তি। আর এই বোধের মধ্যে দিয়েই যেন বোধিসত্ত্ব থেকে থেকে বুদ্ধ হয়ে ওঠেন শিষ্য। পাহাড়চূড়ায় তিনি বসিয়ে দেন মৈত্রেয়র মূর্তি। আর পাহাড়ের ওপর থেকে তিনি দেখতে পান অনেক দূরে অনেক পাহাড়ের ঠিক মধ্যিখানে চক্রবৎ একটু হ্রদ আর তার মাঝে মঠটা। কোরিয়ান ট্র্যাডিশনাল গান চ্যাংগজেন আররাংগ-এর ব্যবহার এই উপরে ওঠার সিকোয়েন্সটার অনন্যতাকে যেন আরো বেশি করে ডাইমেনশন দেয়।

এইখানেই শেষ হয় শীত। জীবনের পর্যায় শেষ হয় যেন। জীবন থেকে পুনর্জীবন। বোধিসত্ত্বের বার বার জন্ম নেওয়া এবং অন্য সমস্ত প্রাণীর সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাণপ্রাপ্ত হয়ে বুদ্ধ হয়ে ওঠার পর্যায়:

 

 

পুব্বেনিবাসং যো বেদী সগ্‌গাপায়ঞ্চ পস্‌সতি।

অথো জাতিক্‌খয়ং পত্তো অভিঞ্‌ঞাবোসিতো মুনি।

সব্‌ববোসিতবোসানং তমহং ব্রূমি ব্রাহ্মণং।।

 

যিনি পূর্বজন্মকে জানেন, স্বর্গ ও নরককে জানেন, যাঁর পূর্বজন্ম ক্ষীণ হয়ে গেছে, যার অভিজ্ঞান পূর্ণ হয়ে গেছে, যিনি নিজের সব কাজ সমাপ্ত করেছেন, তাঁকে আমি ব্রাহ্মণ বলি (ধম্মপদ)

 

অ্যান্ড স্প্রিং: বং বসন্ত

আবার বসন্ত ফিরে আসে। শিষ্য এখন গুরু। আর বাচ্চাটি এখন তার নতুন শিষ্য। এই নতুন শিষ্যের ভূমিকায় আমরা দেখি স্প্রিং-এর শিষ্যের ভূমিকার সেই একই অভিনেতা ঝং হো কিমকেই। এই শিশুটি প্রথমে অত্যাচার করে একটি কচ্ছপকে। কচ্ছপ আসলে পুনরাবৃত্তির প্রতীক। এই শিশুটিকেও আমরা দেখতে পাই তার গুরুর মতোই একটা মাছ, ব্যাঙ আর সাপের ওপর অত্যাচার করতে। শুধু বাঁধার বদলে সে এদের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয় পাথরগুলো। আর অনেক উপর থেকে যেন সেইটাই দেখে যান মৈত্রেয়। তিনি পরবর্তী বুদ্ধ। তিনি আসবেন একদিন এই হিংসা দ্বেষ ভরা পৃথিবী থেকে মানুষকে মুক্ত করতে। ততক্ষণ ধরে আবর্তিত হবে এই চক্র:

 

 

 

অত্তা হ অত্তনো নাথো কো হি নাথো পরো সিয়া।

অত্তনাব সুদন্তেন নাথং লভতি দুল্লভং।।

 

মানুষ নিজেই নিজের প্রভু, অন্য কে তার প্রভু হতে পারে? নিজেকে দমনকারী সেই দুর্লভ প্রভুত্বরূপী নির্বাণকে লাভ করে।

১. ধম্মপদ, ওয়াংচুক দোরজি নেগি, রামকৃষ্ণ দাস, পরশপাথর প্রকাশনী 

২. Jeongseon Arirang

(সমাপ্ত)

 
 
top