মোহনা

 

মোহনার দিকে যাও হে, যুবুতী সেই যে পরম রহস্যে ঘেরা তান্ত্রিকটি বলেছিল মোহনাকে, ওর মার মামাবাড়ির গ্রামে, দিঘিটির পাড়ে তারপর থেকে ওর খোঁজ কীসেরমোহনার। কোথায় সে মোহনাও কি নদীবয়ে চলেছে কোন্ সে প্রবল গতিধারায়, কোন্ সে নদীর প্রবাহ হয়ে ও বয়ে চলেছে!

মোহনা ফিরে আসে। সপ্তর্ষি যথারীতি তার সমস্ত কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত। সময় কোথা এ শহরে? শহর, শহর, চারদিকে শুধু শহর। মোহনাও জন্মেছে আরেকটি শহরে। পড়াশোনা, বড়ো হয়ে ওঠা অনেকটাই উত্তরবঙ্গের এক শহরে। যদিও ওর ছেলেবেলা কেটেছে অন্যত্রওর বাবা তখন রেলে চাকরি নিয়ে বিলাসপুরে। মা একা, ছোট্ট মোহনাকে নিয়ে। মা স্কুল টিচার। তাঁর স্কুল ছিল তাঁর বাপের বাড়ি এলাকায়। মোহনার ছেলেবেলা সেখানেই। জায়গাটা গ্রাম নয়, শহর নয়, এক প্রাচীন জায়গা। ইতিহাসের দেশ। পোড়া দেশের পোড়া ইতিহাস এখনও এই জায়গায় মুখ গুঁজে পড়ে আছে। এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পোড়া লাল লাল ইঁটের ভাঙা মন্দিরগুলো। অধিকাংশ শিবমন্দির, কয়েকটি দুর্গামন্দির। পুজো হয় না। জঙ্গলে ঢেকে আছে সব। এখানে ইংরেজরা আবাস গড়েছিল। এখানে নীলকুঠি ছিল তাদের। এখানে দুই রাজবাড়ি, রাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী আর রাজা কমলারঞ্জন রায়। এই দুই রাজবাড়ির মধ্যবর্তী এলাকায় মোহনার মামাবাড়ি। মোহনার মায়ের স্কুল। বাবাও বেশিদিন বিলাসপুরে থাকতে পারেননি। সে দেশের জলবাতাস তাঁর সহ্য হয়নি, অথবা ছোট্ট মোহনাকে ছেড়ে থাকতে পারছিলেন না। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি ছেড়ে চলে আসেন একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে। সেই স্কুলও এই রাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর এলাকার মধ্যেই। বহু গল্পে, বহু রোমাঞ্চে ঘেরা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর রাজবাড়িটি। রাজবাড়িটির অল্প দূরেই ছড়িয়ে থাকা পোড়ো মন্দিরগুলোর মধ্যেই হঠাৎ একটির মাথায় বসানো শতযুগের ধুলোমলিন কলসিটি নাকি নিরেট সোনার, মন্দিরটি নাকি পার্শ্বনাথের, আবিষ্কার করে নিয়ে গেলেন কোনো পুরাতাত্ত্বিক, মহা সমারোহে ছোট্ট মোহনা সেদিন বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো করে ভেবেছিল কত আশ্চর্য সব গল্প-কাহিনি।

সেই পোড়ো এলাকা আর নীলমাঠ। নীলমাঠে নীল চাষ হয়নি। নীলকুঠি পাশেই থাকায় স্থানীয় নাম হয়ে যায় নীলমাঠ। আসলে ওটি তো মাঠ ছিল না। ছিল নদীবক্ষ। ছিল বন্দর। ছিল জাহাজঘাটা। এখন পোড়ো প্রান্তর। রাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, আর বন্দর কাশিমবাজার, নীলমাঠ আরআর ছিন্নগঙ্গা। প্রচলিত নাম কাটিগঙ্গামোহনার দিকে যাও হে, যুবুতী… মোহনার কানে বাজতে থাকে সেই অট্টহাসি, তান্ত্রিকের গভীর উচ্চারণ, যেন অমোঘ নির্দেশ। শিহরিত হয় মোহনা। কেন বললেন তান্ত্রিক ওকে এভাবে? ওর নাম কেন মোহনা রেখেছিলেন ওর বাবা? ও কি নদী? কী নাম তার?

সেই ছিন্নগঙ্গা পড়ে আছে ওর ছেলেবেলার জায়গায়, ওর মামাবাড়ির দেশেভাগীরথী হঠাৎ খাত পরিবর্তন করে তুমুল বেগে বইতে শুরু করে অন্য পথে। বন্দরের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। ছিন্নগঙ্গা মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় একাকী। অথচ এই ছিন্নগঙ্গাই একসময় ছিল মূল স্রোত। বেগ ছিল প্রচণ্ড। সতীদাহ ঘাটে কত সতীদাহ হল, সতী হল। প্রচণ্ড বেগ ধুয়েমুছে দিয়েছিল সে সব, এই ছিন্নগঙ্গা যখন মূল স্রোত। বন্দর ছিল এই ছিন্নগঙ্গা। জাহাজ ভিড়ত কত। কত ইতিহাস বয়ে গেল এই কাটিগঙ্গার বুকের ওপর দিয়ে। কত ইতিহাস ইতিহাস হয়ে গেল। এখন পরিত্যক্তা, স্রোত নেই। তবু নাকি অতল। তার গভীর স্পর্শ করা যায় না। তবু নাকি চড়কের দিন খুব ভোরে, মানুষ না দেখা আবছায় এই ছিন্নগঙ্গার গভীর থেকে কালী উঠে আসেন, প্রচলিত কাহিনি।

কিন্তু সেই বাচ্চা মানুষটি সেদিন পুরুষ হয়… মনে পড়ে মোহনারতান্ত্রিকের কণ্ঠস্বর। তার কী ভীষণ যৌনতা পায়, জলের তলায় ডোবা কালী মূর্তিতে তার যৌনতা পায়, ভয় পায়। কী ভীষণ ভয়… গঙ্গার গভীরে ডুবন্ত একটি ছোট্ট ছেলে জ্ঞান হারাতে হারাতে দেখেছিল এক বিপুলকায়া ভীষণ কালীমূর্তি। আর সেই রাতে জ্ঞান ফিরে প্রথম যৌনতা পেয়েছিল ওই কালীমূর্তিতেমনে পড়ে মোহনার।

মোহনা নারী হল কবে? ছোট্ট মোহনা নারী হল কবে? কোন্ সে পুরুষের জন্য কামনায় থরথর করে কেঁপে উঠেছিল প্রথমবার? দীর্ঘদেহী, সুমেধাদৃপ্ত, তীব্র সে পুরুষ। যার উপস্থিতি ওর চেতন অচেতনকে ছেয়ে ফেলেছিল। কে সে? ইতিহাস থেকে নেমে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ছোট্ট মোহনা তীব্র নারীত্ব অনুভব করেছিল সে রাত্রে, যে রাত্রে মোহনার বাবার কাছ থেকে শুনেছিল রাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর রাজবাড়ি থেকে কুলদেবতা, মণিমুক্তোসহ সিংহাসন ডাকাতি হয়ে যাওয়ার গল্প। সে ভয়ানক ডাকাতির গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিল মোহনা। আর ঘুমের মধ্যে মোহনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সেই দীর্ঘদেহী। হাত রেখেছিলেন মোহনার কপালে। দুহাতে মোহনার মুখটা তুলে ধরে কপালে গভীর চুম্বন দিয়েছিলেন। তারপর আর কিছু মনে নেই মোহনার। চমকে ঘুম ভেঙে যায়। উষ্ণ স্রোত বইছে দুই উরুসন্ধিস্থল থেকে। শরীর অসহ্য এক ব্যথায় দুমড়ে মোচড় দিয়ে উঠছে। মোহনা সেই রাতে নারী হল।

মোহনা মায়ের মামাবাড়ি এলাকার কিছু ছবি তুলে এনেছিল। সপ্তর্ষিকে দেখাল। সপ্তর্ষি বলল, স্ক্যান করে ল্যাপটপে সেভ করে রাখ্ মোহনা সদ্য একটা নিউজপেপারের সঙ্গে কাজ করছে। স্থায়ী কোনো কাজ নয়। কিছু আর্টিকল ছাপা হয়েছে ওর। পরদিন সেই নিউজপেপার টিমের রবিনদাকে ও দেখায় ছবিগুলো।

কোথায় পেলি?

মি তুলেছি 

ফোটোগ্রাফি নিয়ে লেগে পড় মোহনা, পড়াশোনা কর, তোর হাত ভালো

বলতে বলতে চলে গেলেন ব্যস্ত হয়ে। রবিনদা ব্যস্ত মানুষ। চারপাশের সবাই বড়ো ব্যস্ত, ব্যস্ত শহর। চারদিকে শুধু শহর গজিয়ে উঠছে শহরের বুকে নিত্য।

সপ্তর্ষির সাবজেক্ট অ্যানথ্রোপলজি। শখ ডকুমেন্টারি আর শর্ট ফিল্ম বানানোএরকম অ্যানথ্রোপাগল ছেলে কেউ কখনো দেখেছে কিনা মোহনা জানে না। সপ্তর্ষিকে দেখলে মোহনার মনে হয় যেন কোনো শাপভ্রষ্ট ঋষিপুত্র। নৃতত্ত্বের আশ্চর্য সব রহস্য আবিষ্কারে নিমগ্ন। ওদের বসার ঘরে কোনো আসবাব নেই। বাড়িতে কোনো বুকশেলফ নেই। বসার ঘরে মেঝেতে থাকে থাকে সাজানো বই। অজস্র বই। বইয়ের থাকের ওপর বসেই পড়াশোনা ওদের। বইয়ের চেয়ার, বইয়ের টেবিল। অতিথি কেউ এলে চরম অস্বস্তিতে পড়ে সেই অতিথিই। মোহনার বেশ লাগে। কীরকম যেন রানি রানি ভাব। বইয়ের এক উঁচু থাকে বসে যেন ওর মনে হয় বাকি বইগুলো ওর অনুগত ভৃত্য। ওর সামান্য অঙ্গুলিহেলনে চোখের ইশারায় ওরা নিজেরাই উঠে আসবে মোহনার কোলে, আর নিজে থেকে নিজেদের পাতা উলটে নেবে। বইয়ের ঢিপিতে বসে ল্যাপটপ অন করে ওর তুলে আনা ছবিগুলো দেখতে থাকে। তান্ত্রিকের কোনো ছবি নেই। তুলতে চেয়েছিল মোহনা। তার আগেই ঘাট ছেড়ে ওপরে উঠে দ্রুত চলে গেলেন তিনি। বলে গেলেন ওকে মোহনার দিকে যেতে। কেন বললেন সে কথা? ওই কি ছিন্নগঙ্গা? ও কি পরিত্যক্ত পড়ে আছে ওর ইতিহাস বুকে নিয়ে? ওকে মূল স্রোতে মিশে সাগরের দিকে প্রবাহিত হতে হবে বিপুল বেগে? মোহনায় সাগর, নদী একাকার। কোন্ সে সাগর? ওর প্রথম নারী হওয়ার দিনের সেই পুরুষটিকেও আর কখনো স্বপ্নে দেখেনি। বলিষ্ঠ এক চাপ অনুভব করেছিল যখন সুদেহী ওর মুখ দুহাতে তুলে ধরেছিলেনবেশ চাপ পড়েছিল ওর নরম গালে। কেন সেই পুরুষ ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, পরিধানে প্রাচীন উজ্জ্বল রাজপোশাকমোহনার কোমলতা ভেদ করে উঠে এসেছিল তীব্র আরেক মোহনা। খসে পড়েছিল ওর বালিকাসজ্জা। উরুসন্ধি থেকে গরম নিঃসরণ। এক শরীর থেকে জেগে ওঠা আরেকটি শরীর। বালিকা মোহনার প্রথম তীব্র যুবতী হয়ে ওঠা। কোনো অজানা অচেনা নারী নয় যেন, খুব চেনা আরেক মোহনা যাকে জাগিয়ে দিয়ে গেলেন দীর্ঘদেহী, তীব্র তাঁর দৃষ্টি, কঠোর তাঁর স্পর্শ, অথচ কঠিন মুখাবয়বে কোমলতার এক নিবিড় ছায়াপাতকে সে?

মোহনা ছবিগুলো মেইল করে দেয় কিছু ওয়েবসাইটে। আরেকবার ও যাবে ওর মায়ের মামাবাড়ির দেশগ্রামে। ও আবার দেখা করবে সেই তান্ত্রিকের সঙ্গে। পথনির্দেশ চাইবে। জেনে নিতে চাইবে কোন্ পথে বইবে ও। জেনে নেবে কীভাবে খোঁজ পাবে ওর সেই প্রথম পুরুষটির। মোহনার দিকে বইবে এ যুবুতী

 
 
top