মাধবী

 
থিয়েটার কর্মী

গুলশনারা খাতুন

 

মাধবী: পুরাণ পেরিয়ে ক্ষেত্রজা যে নারী আজও  সমকালীন

 

সূচনা

নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি তাঁর মহাভারতের কথা গ্রন্থের  সূচনায় বলেছেন, মহাভারত, জটিল সমাজের আধুনিক সংস্করণকে অবধি তুলে ধরে। বর্তমান সমাজের বিন্যাস, তথা নারীচরিত্র রূপায়ণের প্রাথমিক সূচনার সুরটা মহাভারত-এই ধরা আছে। এই মহাকাব্যের হাত ধরেই উঠে আসে কুন্তী, সত্যবতী, দ্রৌপদী, মাধবীর মতো চরিত্ররা। পুরাণ-এর সময়কাল পেরিয়ে যে নারীরা অন্য নামে, অন্য রূপে এখনও এ সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন। মহাভারত-এ এমনই একটি দৃষ্টান্তমূলক চরিত্র মাধবী। এ চরিত্র নিয়ে ভীষ্ম সাহানির মাধবী নাটকটি বহুলপ্রশংসিত ও জনপ্রিয়। সেই নাটকের বাংলা রূপায়ণ নান্দীকারের মাধবী

মাধবী চরিত্রের অবতারণা শুধুমাত্র পুরাণ-কে ধরতে নয়। বরং পুরাণ-এর সময় পেরিয়ে উনিশ শতকের বাংলায় তথাকথিত নারীজাগরণের পালাবদলের পালা ছুঁয়ে এই আধুনিক সময় অবধি নারীর আদলটি আদতে এক বলে দাবি করেছেন কোনো কোনো নারীবাদী। পুরুষতন্ত্র নারীকে যেভাবে গড়ে নিতে চেয়েছে, তা পুরাণ থেকে উনিশ শতকের নতুন নারীর সময়ও একই রূপে এসেছে। তাই পুরাণ-এর মাধবীর গল্প রং পালটে সেই মহাভারত থেকে আজকের প্রেক্ষাপটেও ভীষণভাবে সমকালীন মনে হয়।

ক্ষেত্রজা মাধবীর সেই পৌরাণিক গল্পে আজকের আধুনিক সারোগেসির প্রতিফলন দেখে তাকে নতুনভাবে সৃজন করলেন নান্দীকারের পক্ষ থেকে স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। নারীর গর্ভ থেকে শুরু করে তার অটুট কুমারীত্বের ওপর পুরুষতন্ত্রের নিরঙ্কুশ বিকিকিনির অধিকারের গল্প এক রয়ে গেল এ নাটকে। কিন্তু তা ত্যাগের জেহাদ ঘোষণায় মাধবী আপন প্রতিবাদটুকু করতে ভুলল না। নাটকের তুল্যমূল্য বিচার এ প্রবন্ধ বিশেষ করেনি। কিন্তু ক্ষেত্রজারূপে নারী যেভাবে পুরাণ থেকে উনিশ শতক পেরিয়ে একেবারে এই সময় পর্যন্ত একই রয়ে গেল, সেদিকে কিছু প্রশ্ন রাখার চেষ্টা করেছি। 

 

মাধবীর পুরাণ কথা

পুরাণ-কথিত মাধবী রাজা যযাতির কন্যা। দানবীর রাজা যযাতি সর্বস্ব দান করে মাধবীকে নিয়ে বনবাস করেছিলেন। একদিন তার কাছে আসে গালব। বিশ্বামিত্রের কাছে অস্ত্রশিক্ষা শেষে গুরুদক্ষিণাস্বরূপ গালবের প্রয়োজন ছিল আটশোটি অশ্বমেধ ঘোড়া। কিন্তু তা কিনতে অপারগ গালব। তাই যযাতির কাছে দান চায় সে। কিন্তু নিঃস্ব যযাতি গালবকে দান করলেন আপন কন্যা মাধবী। দেবতার বরে মাধবী অক্ষয় কুমারীত্বের অধিকারিণী এবং তার গর্ভের সন্তান রাজচক্রবর্তী পুত্র হবেই। গালব মাধবীকে বিয়ে করে পরপর তিন বছর তিন রাজার কাছে রাখে। সেই রাজাদের ঔরসে মাধবীর গর্ভে যে পুত্র জন্মায়, রাজাকে সেই পুত্র দিয়ে তার বিনিময়ে দুশোটি ঘোড়া গালবকে এনে দেয়। শেষ দুশোটি ঘোড়ার সন্ধান মেলে স্বয়ং বিশ্বামিত্রের কাছে। গুরুর কাছে মাধবীকে পাঠায় গালব। কিন্তু গুরুদক্ষিণাশেষে গালব-মাধবীর মিলনে নাটক শেষ হয় না। গুরুর সঙ্গে এক রাত্রি সহবাসের পর মাধবীকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেয় না গালব। কারণ মাধবী এখন তার গুরুমা। মহাভারত-এর গল্প এখানে শেষ হয়।

 

মঞ্চে মাধবী

নান্দীকারের নাটকে গল্প এগিয়ে চলে। এক বছর পর মাধবীর আকাঙ্ক্ষায় আবার সেই বনে আসে গালব। কিন্তু এ মাধবী আর সে মাধবী নেই। আপন অক্ষয় কুমারীত্ব আর যৌবন ত্যাগ করে এখন সে জরাজীর্ণ বৃদ্ধা। যে কুমারীত্ব আর যৌবনের অভিশাপে মাধবী পুরুষতান্ত্রিক বিকিকিনির শিকার, তাকে সে ফিরিয়ে দিয়েছে। মাধবীর এহেন রূপ মেনে নিতে পারল না গালব। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই উচ্চকিত প্রতিবাদেই গালব ফিরে যায় কিনা, সে প্রশ্নের উত্তর মেলে না। শুধু প্রেক্ষাগৃহে গমগম করে অশ্রুসজল মাধবীর অট্টহাসি।

 

পুরাণ কি অতীত? নাকি বর্তমান তার অখণ্ড ধারক?

মাধবী নাটকে পুরাণ-এর সঙ্গে বর্তমানকে মিলিয়েছেন স্বাতীলেখা। কিন্তু সে গল্পের মূল সুত্রটিই অন্য কতগুলি প্রশ্ন তুলে দেয়। প্রথমত, নারীর গর্ভকে ব্যবহার করে পুরুষতান্ত্রিকতার এই রূপটি এখনও বর্তমান কিনা, সেই প্রশ্নেই বারবার করে নারীর পৌরাণিক রূপ ও উনিশ শতকের প্রসঙ্গ এসেছে। মনুসংহিতা কুমারী নারীর দৃষ্টান্ত দিয়ে বারবার আদর্শ নারীর প্রসঙ্গ এনেছে। নারীর কুমারীত্ব আর সতীত্ব সেখানে ভীষণভাবেই পুরুষকাঙ্ক্ষিত হিসেবেই তৈরি হয়েছে। আবার পুরাণ-এই এই সতীত্ব বা কুমারীত্বের চিরাচরিত ধারণা পালটে সেখানে পুরুষ নতুন করে সেই কাহিনি তৈরি করে নিয়েছে প্রয়োজনমতো। কুমারী মাতা কুন্তীকে একদিকে সমাজের দায় নিয়ে কর্ণকে জলে ভাসিয়ে দিতে হয়। আবার অন্যদিকে, সন্তান জন্মে অপারগ স্বামীর অনুমতি নিয়েই, বংশরক্ষার স্বার্থেই এক এক দেবতার ঔরসে কুন্তীর গর্ভে সন্তান আসে। পরপুরুষের সঙ্গের বিষয়টি একেবারে সাধারণ করে দেখাতেই কুন্তীর জীবনের এই পুরুষেরা দেবতা। ধর্মের আড়ালে নারীর গর্ভকে ব্যবহার করার এহেন পুরুষতান্ত্রিক ব্যাবসাকেও মহান বলে প্রশংসা করা হয়েছে শতাব্দীজুড়ে। মনুসংহিতা-র পাতায় নারীর বিবাহ ও সতীত্ব নিয়ে যে তরজা আছে তা মহাভারত-এ বেশ কয়েকবার লঙ্ঘিত হলেও, একেবারে পুরুষতান্ত্রিক তরজাতেও তা আপন স্বার্থে ব্যবহার করেছে সেই সময়ের সমাজ। নারী গর্ভ আর তার কুমারীত্বের দায় নিয়ে পুরুষশাষিত সমাজের এই যে নিয়ম তা লঙ্ঘিত হয়েছে দ্রৌপদী, সত্যবতী, মাধবীর ক্ষেত্রে। পুরুষের প্রয়োজন হয় বলেই, বহু পুরুষের সঙ্গে সহবাস করে মাধবীর কৌমার্য অক্ষুণ্ণ থাকে। আবার যে  সে নপুংসক রাজার মন্ত্রীর সঙ্গে সহবাসে বাধ্য হয় , সেই ঘটনাও সন্তানধারণ এবং বংশরক্ষার প্রসঙ্গে চাপা পড়ে যায়। নারীর এই কুমারীত্ব আর সতীত্ব নিয়ে পুরুষতন্ত্রের আপন মর্জিমাফিক নিয়মের প্রসঙ্গেই উনিশ শতক আসে। উনিশ শতকের নব্য-পুরুষ সমাজ গড়ার নানা ভাবনায় যুক্ত করেছিল নারীকেও। তার আগে নারীর স্থান সর্বজনবিদিত। সে সমাজে গৌরীদান স্বীকৃত ছিল। মনুসংহিতা-র নিয়ম পালন করেই, মেয়ে রজস্বলা হওয়ার আগেই তাকে বিয়ে না দিলে সমাজ একঘরে করত কন্যাপক্ষকে। শরীর গঠনের আগেই বিয়ের এহেন রীতিতে বাধ সাধে তৎকালীন নব্য-পুরুষ। ব্রাহ্মসমাজের হাত ধরে মেয়েদের বয়সোচিত বিয়ের প্রসঙ্গ প্রাসঙ্গিক হয়েছে বটে, কিন্তু সেই সতীত্ব আর পাতিব্রত্যের প্রশ্নে নারীর অবস্থান ঠিক করে দিয়েছে পুরুষই। পুরাণ-এর যে পুরুষ নারীর অবস্থান ঘরে বেঁধে দিয়েছিল, উনিশ শতকের সেই ইংরেজি শিক্ষিত পুরুষই বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর বয়স বাড়ার স্বাধীনতা দিয়েও তাকে গৃহশিক্ষার বাইরে রাখেনি মোটেই। এমনকী নারী স্বাধীনতার এমন জয়গান পুরুষের স্বার্থ মেটাতেই। নব্য পুরুষ এভাবেই চেয়েছে নারীকে। বিধবা বিবাহে নারীর স্বীকৃতি ছাড়াই তা স্বীকৃতি পেয়েছে বাইরের জগতে। ঠিক এইখানেই বারবার প্রাসঙ্গিক হয় মাধবী-র কাহিনি। নিজের বাবা থেকে শুরু করে স্বামী, সকলের কাছেই মাধবী বারবার বিক্রি হয়েছে তার গর্ভের কারণে। যে সারোগেট মাদারের ধারণা মহাভারত-এর সেই সময়ে তৈরি ছিল, তা বর্তমান সময়ের মাধবীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সারোগেট মাদারের ভূমিকাতেও মেয়েটির এজেন্সি নির্মিত হয় পুরুষের কথানুসারেই। সন্তানধারণের পর তা নিজের কাছে রাখার সিধান্তও মাধবীরা পাবে কিনা, তা নির্ধারণ করে তার স্বামী বা পিতা বা এককরূপে সমাজ। ফলে পুরাণ-এর মাধবীর কাল্পনিক গল্পের সঙ্গে মিলে যায় আজকের মাধবী-র গল্পও।

সূত্র

. মহাভারতের স্ত্রী পর্ব, জ্যোতির্ময়ী দেবী

. মহাভারতের কথা, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১০

. ভয়েজেস ফ্রম উইদিন, মালবিকা কারলেকর, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৩

. বেঙ্গলি উইমেন, মনিষা রায়, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস, ১৯৭৫

. ন্যাশানালিস্ট আইকোনোগ্রাফি : ইমেজ অব উইমেন ইন দ্য নাইনটিনথ সেঞ্চুরি বেঙ্গলি লিটরেচার, তনিকা সরকার, দ্য ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি, ভল্যিউম ২২, নাম্বার ২৭, নভেম্বর ২১, ১৯৮৭

. অ্যানথ্রোপলজিক্যাল এক্সপ্লোরেশন ইন জেন্ডার, লীলা দুবে, সেজ পাবলিকেশন, জুন ২০০১

 
 
top