খোঁজ

 

যতির চোখ দুটো কথা বলে। বড়ো প্রাঞ্জল, বড়ো নির্মল সে চোখের দৄষ্টি। দুটো চোখের পাতায় ফুটে ওঠে যতির যত মনের কথা, যত অনুভূতি, যত ভালোবাসা, যত রোমাঞ্চ, যত ভয়সব। যতির চোখ কথা বলে, দৄষ্টি ভালোবাসায় উদ্বেল হয়, ভয়ে শিহরিত হয়, অজানা প্রশ্নে আলোড়িত হয়, আর বেদনায় আকুল হয়। এ তো বহু মানুষেরই হয়। কিন্তু যতির ক্ষেত্রে যেটা আশ্চর্য, তার চোখ ছবি আঁকতে পারে। যতির চোখ আর মন দুই-ই ছবি খোঁজে, ছবি আঁকে। তার গ্রামের বাড়ির দাওয়ায় বসে দূরে বাঁশঝাড়ের মধ্যে দিয়ে পাতার ফাঁকে ফাঁকে আকাশের যেটুকু চোখে পড়ে, তার মধ্যে মুহূর্তে যতি দেখতে পায় অনেক কিছুকখনও ঘোড়া, কখনও বাড়ি, কখনও একটা নুইয়ে পড়া লতা বা ফুল। বাঁশঝাড়ের পাতারা এদিক ওদিক বাতাসে কাঁপে আর যতির ছবিগুলো বদলে যায়। আকাশে যখন মেঘের স্তর জমে ওঠে, ওই তো যতি দেখতে পায় একটা প্রকাণ্ড বড়ো মুখ, রাক্ষস-খোক্কস হবে বোধহয়; কিংবা একটা বিশাল নৌকাএক্ষুনি ঢেউ-এর দোলায় বুঝি মেঘের সমুদ্রে ভেসে পড়বে; বা একটা পক্ষিরাজ ঘোড়াযে ডানা দুটো মেলে দিয়েছে অসীম শূন্যের দিকে। বাতাস এসে মেঘের স্তর উড়িয়ে নিয়ে যায়, যতির ছবিরাও পাল্টাতে থাকে।

ওড়গ্রামের অনেকটা অংশ জুড়ে আছে বিশাল একটা মাঠঘাটবেড়িয়ার মাঠ। জায়গায় জায়গায় সবুজ ঘাসের আভরণ আর এখানে সেখানে আগাছা-লতা-গুল্ম, বুনো ফুলের গাছ। মাঠের শেষে বয়ে চলেছে ওড়নদী-সংযুক্ত একটা খাল। খালের ওপারে ধানের জমি, যতদূর চোখ যায় আদিগন্ত সবুজ। ধান পাকার দিনে সবুজ রঙে সোনার ছোঁয়া লাগে। আরও দূরে আকাশ লুটিয়ে পড়েছে অসমান বনরেখায়

এই মাঠে যতির বয়সি ছেলেমেয়েরা খেলা করে  ভোলা, মানিক, নিমি। যতির খেলার সাথী নেই। সে মিশতে পারে না কারো সঙ্গে, মনের ভাব ভাষায় ফোটাতে কষ্ট হয় তারযতি কথা বলতে শিখেছে স্বাভাবিক শিশুদের চেয়ে অনেক দেরিতে। শুধু নিমির কাছেই সে একটু যা সহজ। নিমি যতির চোখের ভাষা হয়তো বোঝে, কিংবা হয়তো মায়া হয় তার, আহা রে যতির তো কোনো বন্ধু নেই!

সবাই যখন খেলে যতির চোখ চলে যায় দূরে — ধানজমি পেরিয়ে আকাশ যেখানে মাটিকে ছুঁয়েছে, সেখানে অজস্র গাছের মাথাগুলো উঁচু-নিচু হয়ে একটা তরঙ্গায়িত ঘন সবুজ আস্তরণের মতো দেখায়। সেখানেও যতির মন এঁকে ফেলে একটা কুটিরের ছবি, কখনও-বা মাছের বা কোনো জন্তুর, কখনও আস্ত একটা মানুষের। সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমশ বিস্তৃত হয়। গাঢ় সবুজ আস্তরণ প্রগাঢ় হয়। যতির গা ছমছম করে ওঠেএকসময় তার দৃষ্টিতে তৈরি অবয়বগুলো অন্ধকারে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

এইভাবে অহর্নিশ তার মন, তার চোখ ছবি খুঁজে চলে। এটাই যেন তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞানসে চায় কি না চায় তার ওপর যেন কিছুই নির্ভর করে না। কে যেন চুপিচুপি কানের কাছে বলে চলেছে, চোখ মেলে দ্যাখ্, চারিদিকে কত কিছু ছড়ানোমেঘের মধ্যে শুধু মেঘ নেই, জলের মধ্যে শুধু জল নেই, পাতা আর ডালপালার ফাঁকে শুধু টুকরো হয়ে যাওয়া আকাশ নেইআছে কত অজানা বিস্ময়, কত রহস্য!

মাঝে মাঝে যতি ক্লান্তি বোধ করে, আলস্য এসে ভর করে চোখের পাতায়। সে চোখ বুজে ফেলে। কিন্তু তাতেও যেন নিস্তার নেই। বন্ধ চোখের পাতার ভেতর রঙেরা খেলা করেলাল, হলুদ, গাঢ় নীল, কালো, সাদা। তার আশ্চর্য লাগে, ভালো লাগে, ভয় করে। কেবল ঘুমোলেই শান্তি। যতি স্বপ্ন দেখে না। তার মনে পড়ে না কখনও স্বপ্ন দেখে দুঃখে সে কেঁদেছে, ভয়ে শিউরে উঠেছে বা খুশিতে উচ্ছল হয়েছে।

তোর পড়াশুনো হবে নারে, যতীন! বুড়ো হয়ে গেলি এখনও উলটো লিখিস! গ্রামের সরোজমাস্টারের বকাঝকা যতিকে প্রায়ই শুনতে হয়।

রে, যতীনভগবান কি তোর মাথায় কিছুই দেননি? একটা সাধারণ যোগ করতেও শিখলি না! অঙ্কের মাস্টারেরও একই আক্ষেপ।

কিন্তু যতি যে নিরুপায়। বইয়ের অক্ষরগুলো আর সংখ্যারা পরস্পর কাল্পনিক রেখায় যুক্ত হয়ে নিত্যনতুন ছবির আকারে কেবল ধরা দেয়। সে চেষ্টা করে একনাগাড়ে বইয়ের দিকে তাকিয়ে মন দিতে, কিন্তু পারে না। তার মন অবিরত ছুটে চলে ফুল, পাখি, গাছ, গাড়ি, নদীর সন্ধানে। তাই রাতের আকাশে অজস্র তারা দেখে সাধারণ মানুষের মনে যে মুগ্ধ ভাব জন্মায়, যতির অনুভবে সেই মুগ্ধতা থাকে না। রাতের অন্ধকারের আকাশ যেন তাকে টানে। মাটির থেকে আকাশের দূরত্ব অনুমান করার চেষ্টা করে সে। কতদূর? কী আছে সেখানে? মনে মনে সে এক কল্পিত জগতে পৌঁছে যায়। বহুদূরের জ্বলজ্বলে তারাদের সে কাল্পনিক সরলরেখায় যুক্ত করে নিমেষে তৈরি করে ফেলে অসংখ্য চিত্র। যতির তারাদের দুনিয়ায় সপ্তর্ষিমন্ডল বা কালপুরুষের কোনো স্থান নেই, আছে তার নিজস্ব সৃষ্ট চিহ্নরা, মানুষেরা আর অনেক জাগতিক বস্তুরা।

ওড়গ্রামের লোকেরা গরিব হলেও চতুর্দিকে এখন লেখাপড়া শেখার চল হয়েছে। বংশানুক্রমে যারা জমি চাষ করে, এমনকী ভাগের জমি চাষ করে যারা, তারাও খেয়ে না-খেয়ে ছেলেদের লেখাপড়া শেখাচ্ছে। ভোলা স্কুলের পড়া শেষ করে বাপের মুদির দোকান সামলায়। মানিক চারটে গ্রাম পরে গঞ্জের কলেজে ভর্তি হয়েছে। শৈশব থেকে কৈশোরে পা দেওয়ার আগেই যতির পড়াশোনায় ইতি হয়ে গেছে। বাপ কোন্ ছোটোবেলায় মরেছে যতির মনেও পড়ে না। আশ্বিন মাসে ধানের জমিতে জল জমেছিল। বাপ তার হাঁটুজলে নেমে মাছ ধরছিল, সাপের কামড়ে গেল। বিস্মৃতির অতল হাতড়ে সে বাপের চেহারা মনে করার চেষ্টা করে, কিছুই মনে পড়ে না। খুব আবছা স্মৃতিমরা বাপ উঠোনে শুয়ে ছিল, আরও অনেকে ছিল, মা আছারি-পিছাড়ি খাচ্ছিল। তারপর তাদের মা ছেলের জীবনে যতি মাকে শুধু কাজই করতে দেখেছে। ধান বোনার কাজ, ধান কাটা হলে ঝাড়াই-এর কাজ। গ্রামের শেষে বড়ো রাস্তার ওপারে কোল্ড স্টোরেজ তৈরি হওয়ার সময় গ্রামের অনেক মেয়ে-পুরুষ কাজ পেল, তার মাও পেল। মিস্ত্রিদের যোগাড়ের কাজে জুটে গেল। যতিকেও লাগিয়ে দিল। কিন্তু রোগা-ভোগা যতির শরীরে এত পরিশ্রম সহ্য হবে কেন। বালিসিমেন্ট নিয়ে ওপর-নীচ করতে করতে তার জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ত, ধুঁকত সে। তারপর মা আর তাকে কোনো  কাজ করতে দেয়নি। শরীর তার ক্ষীণজীবি, কিন্তু মন কেবল ছুটে চলতে থাকে দুর্বার গতিতে দূর-দূরান্তে। শীর্ণকায় শরীরে জেগে থাকে কেবল দুটি চোখ জীবনের অস্তিত্ব জানায় তারা, সীমাহীন সে চোখের গভীরতা। 

মা ছাড়াও আর একজন তার জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেফুলিমাসি। তাদের পাশে নিজের একফালি জমিতে বিধবা ফুলি ঘর বেঁধে নিয়েছেমা সকালে বেরিয়ে যায়, সন্ধ্যায় ফেরে। ফুলি সারাদিন যতির কাছে আসে-যায়, সময়ে অসময়ে তার খেয়াল রাখে, নিজে যা খায় যতির মুখের কাছে তাই ধরে দিয়ে যায়।

যতির একলা দিনমান কেটে যায় নিঃশব্দে। দূরে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলোয় মাখা আকাশে কখনও সহসা তার চোখে পড়ে একটা কুঁজো লোকের অবয়ব, পাকিয়ে যাওয়া চেহারা, কাঁধ দুটো খাঁচার মতোকখনও দাঁড়িয়ে থাকা, কখনও হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গিতে। তার মলিন কাঁথার এলোমেলো ভাঁজেও সে দেখতে পায় ভীষণ রোগা, মাথাটা একদিকে হেলে যাওয়া লোকটাকে। আশ্চর্য লাগে তার! তারপর শনশন বাতাসে পাতারা ঝিরঝির করে কাঁপে, সেই ছবি হারিয়ে যায়, নতুন ছবিরা ভিড় করে। তারপর একসময় সব কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। আবার তারা আসে, আবার যায়, নতুন আকার নিয়ে, নতুন রূপ নিয়ে বারবার আসে। এক সময় আলো নিভে আসে। যতির দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত্রি। তারপর আবার একটা দিনের শুরু হয়।

বাপের মৃত্যুকে সে বোঝেইনি ভালো করে, কিন্তু মায়ের চলে যাওয়া তার অন্তঃকরণ যেন শূন্য করে দিয়ে গেছে। গ্রামের ডাক্তার বলেছিল, রোগীকে এভাবে এখানে বাঁচানো যাবে না….সিমেন্টের ধুলোয় বুকের বাজে দোষ হয়ে গ্যাছে যেশহরের সদর হাসপাতালে নিয়ে দ্যাখো যদি ফিরিয়ে আনতে পার

শহরে আর নিয়ে যেতে হয়নিশেষদিকে মা সারারাত খুব কাশতকাশির দমকে মাথাটা ঠেলে ঠেলে ওপর দিকে উঠত, চোখগুলো ঠেলে বেরিয়ে আসত। যতি কাঁদত, ভেতরে ভেতরে, সংগোপনে, চোখের জল বাইরে ছাপিয়ে উঠত না কখনও। চোখ বুজলেই ভেসে উঠত রক্তের গোলার মতো লাল রং  ছিটকে ছিটকে উঠছে।

মায়ের জ্বলন্ত চিতার সামনে সে অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি করল একটা। লকলকে আগুনের শিখা কেঁপে কেঁপে উঠছে আর যতি দেখছে আগুনের কতগুলো ফোঁটা জলের ফোঁটার মতো টপটপ করে ক্রমাগত ঝরেই যাচ্ছে। সেই প্রথম মায়ের জন্য কাঁদল যতি, ফুলিকে জড়িয়ে ধরে। তবুও ভারী নিঃশব্দে, তার অন্তরের বেদনার আওয়াজ কেউ পেল না। কেবল অঝোরধারায় অশ্রু বয়ে চলল। যতি চোখ বুজল, বন্ধ চোখের পাতার ভেতর তখন শুধুই অথই ঘোলাটে জলের ঢেউ সে দেখতে পেল।

ফুলিমাসি তার জীবনে এসেছিল মায়ের জায়গা নিয়ে এরপর। তবু মা যে নেই, কিছুই যেন নেই, চারিদিক শূন্য, মনের ভেতর কীসের যেন হাহাকার। ফুলি আসে, মন ভোলাবার চেষ্টা করে তার, কখনও ভাতের গ্রাস মেখে মুখে তুলে দেয়। তবু যতির বুক ঠেলে কান্না আসে, বড়ো বড়ো চোখ দুটো সজল হয়ে ওঠে, কিন্তু কাঁদতে পারে নাহপ্তায় দু-দিন হাটে সবজি নিয়ে বসে ফুলি, যতিকেও সঙ্গে নিয়ে যায়। সময় এগিয়ে চলে, ফুলির দিনপাতের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায় যতি, মনের মধ্যে মায়ের অস্তিত্ব ক্রমশ ফিকে হতে থাকে। 

মাঝে মাঝে নিমি আসে তার কাছে। নিমি এলে তার মনে হয় এই পৃথিবীটা আশ্চর্যরকমের সুন্দর, দুঃখ নেই, ব্যথা নেই, কান্না নেই; কেবল হাসি, কেবল আনন্দ। নিমি এক ঝলক মিষ্টি হাওয়ার মতো তার কাছে আসেহঠাৎ হঠাৎ। কখনও গাছের জামরুল হাতে করে, কখনও-বা এমনি। যতি স্নিগ্ধতায় ভরে যায়। ইচ্ছে করে নিমি তার কাছে বসে থাক্ আজীবনকাল ধরে। অনেক কথা বলতে চায় সে নিমিকে, বুকের মধ্যে জমে থাকা অনেক কথা। বলতে পারে না, শুধু অদ্ভুত এক অনুভূতিতে তার দৃষ্টি আর্দ্র হয়ে ওঠে। 

ফুলিমাসি বলেকয়ে শেষে লাটুর দোকানে যতির একটা কাজ জুটিয়ে দিল। বিক্রিবাটা সামলাবে, ফাইফরমাস খাটবে। কিন্তু মুশকিল হল দোকানের হরেকরকম রঙিন প্যাকেটের এত জিনিস তার চোখের সামনে গিজগিজ করে যে অসোয়াস্তি হয়তার দৃষ্টি আটকে গেছে চৌহদ্দির সীমানায়। দৃষ্টি ছুটে যেতে চাইত বহু দূরে, মেঘের দেশে, দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ধানের ক্ষেতে, দিকচক্রবালেযেখানে আকাশ মিশেছে সবুজ বনান্তে।

সেদিন দোকানের পথে যেতে যেতে ঘোষেদের যে বাগানটা পড়ে, তার দিকে চোখ পড়ে যতির। পাঁচিলের কিছু অংশ ভেঙে তার থেকে ইঁট খসে গেছে। যতি থমকে দাঁড়ায়। চোখের তারাগুলো খুব দ্রুত  এপাশ ওপাশ করতে থাকে। নিমেষে সেই ইঁট-খসা পাঁচিলের গায়ে ফুটে উঠল শীর্ণ কুঁজো একটা লোকের চেহারা। যতি আবার দেখল সেই হেলে যাওয়া, পাকিয়ে যাওয়া আবছা আকৃতিকে। কেন যে বারবার এই চেহারাটা তার চোখের সামনে ধরা দেয়! সেদিন বিকেলেও সে পুঞ্জীভূত মেঘে দেখেছে অনেকগুলো পাহাড়ের চুড়ো, বইয়ের ছবিতে যেরকম থাকে, তার সামনে কুঁজো মতো একটা লোক দাঁড়ানো, মাথাটা তার বুকের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। সে সচরাচর স্বপ্ন দেখে না। কিন্তু সেদিন রাতে সে আশ্চর্য একটা স্বপ্ন দেখল। একটা ভীষণ রোগা মতো লোক হাঁটছে, হাড় বার করা কাঁধগুলো তার, খাঁচার মতো চেহারা অন্ধকার রাতে আবছা চাঁদের আলোয় সে হাঁটছে তো হাঁটছেই। জঙ্গল পার করে সে পৌঁছোল চরা পড়ে যাওয়া একটা নদীর সামনে। পায়ে পায়ে নদী পেরোল সে। নদীর ওপারে বালিয়াড়িবিস্তৃত, কোথায় শেষ জানা নেই। যতির ঘুম ভেঙে গেল। সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে। ভীষণ ভয় করতে লাগল তার।

যতির দিন কোনোরকমে কেটে যায়। দোকানে কাজে ভুল হয়, হিসাবে ভুল হয়, গালাগাল খায়, তবু যেতে হয়। ফুলিমাসি তার একমাত্র আশ্রয়। মায়ের শেষ সময়ে মাসি না থাকলে কোথায় যেত যতি? ভেসে যেত সে। ফুলিরও তো কেউ নেই। বিধবা ফুলির জীবনে পরে একজন এসেছিল। দিব্যি সংসার করতে পারত ফুলি আবার, কিন্তু না, সে টেঁকেনি। তারপর থেকে ফুলির নিঃসঙ্গ জীবনে আর কারো পা পড়ে নি। এখন যতি আর ফুলিমাসি পরস্পরকে অবলম্বন করে জীবন অতিবাহন করতে লাগল। যতির জন্য তার বড়ো মায়া। কিন্তু মা-বাপ মরা অদ্ভুত প্রকৃতির এই ছেলেটাকে, মূখে যে প্রায় কথাই বলে না, ফুলি আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারল না।

ইদানীং যতির মনের গহনে নতুন খেলা শুরু হয়েছে। তার ছবিরা আকৃতি পালটাচ্ছে, রং বদলাচ্ছেআজকাল যতি আকাশের পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘে দেখতে পায় পাশ ফিরে থাকা এক নারীর উদ্ধত স্তন। সেদিন নিমিদের বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে তাদের বাগানে যেখানে পাশাপাশি পেয়ারা আর জামরুল গাছের পাতাগুলো জড়িয়ে আছে, সেই দৃষ্টিপথে আকাশের অংশে সে স্পষ্ট দেখল পাতার রেখায় সৃষ্ট এক নারীর অস্পষ্ট চেহারা, পিছন ঘুরে দাঁড়ানো। মরাল গ্রীবা তার, কী নিখুঁত কোমরের খাঁজ! এই তো সেদিন পুকুরের ঘাটে পা দিতেই জলের নীচে মেলে থাকা জলজ আগাছাগুলো যেন তৈরি করেছে একঝাঁক মেয়ের মুখকেঊ লাস্যময়ী, কেঊ-বা বিষণ্ণ। যতি বিবশ হয়, বিমোহিত হয়। 

আজকাল গ্রামে সবাই তাকে পাগল আখ্যা দিয়েছে। ভোলা, মানিক তাকে ডাকে পাগলা যতীন বলে। লোকেরা বলে, মা-মরা ছেলেটার মাথা গেছে। কেউ বলে রাত-বিরেতে মা এসে ভর করে বুঝি, তাই একমুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায় চাঁদনি রাতে। ঘরে আলো জ্বলে না, অন্ধকারে বসে থাকে। তারা কী করে বুঝবে জ্যোৎস্না রাতে যতির উঠোনে আলো-আঁধারিতে খেলে বেড়ায় হাজার হাজার অপ্সরীরা। গাছের ছায়া প্রশস্ত হয়, আবর্তিত হয়, অপ্সরীদের নাচের ভঙ্গিও বদলে যায়। যতির হৃদয়ের গভীরে সেই নৃত্যগীত সঞ্চারিত হয়। যতি আবেগে কাঁপতে থাকে।  

নিমি আসে মাঝে মাঝে। সন্ধ্যাবেলা ঘাটবেড়িয়ার মাঠে যেখানে যতি বসে থাকে সেখানে খুঁজতে আসে। এই পাগল ছেলেটার জন্য তার কীসের দুঃখ সে নিজেই জানে না। 

তীন, দিন দিন তুই কেমনতরো হয়ে যাচ্ছিসযতীন তোকে যে সবাই পাগলা বলে আমার একটুও ভাল্লাগে না কী হয়েছে তোর?

কেমন অদ্ভুত চোখে নিমির দিকে তাকায় যতি। সে দৃষ্টির মধ্যে বাস্তবতা নেই, যেন পৃথিবী ছাড়িয়ে কোনো কল্পলোকের দিকে তার দৃষ্টি চলে গেছে। নিমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে থই পায় না। 

ত কী দেখিস…কী দেখিস এত বল্ না?

মি দেখতে পাই

কীকী দেখতে পাস?

নেক কিছু

দূরে মেঘের দিকে আঙুল দেখায় যতি, খালের জলের দিকে, তারপর কোনদিকে যে দেখাল নিমি বুঝতে পারল না।

দেখিয়ে বলল,খানে

কী ওখানে?

নিমির কেমন ভয় ভয় করতে লাগল। হঠাৎ তার দিকে ঘুরে তাকায় যতি। নিমি ভয় পেয়ে যায়, মনে হয় এই যতীনকে সে চেনে না।

মি দেখতে পাই মেঘের মধ্যে ওই যে ঘোড়া ছুটছেঅনেক লোকওই যে ফুল আর পাতাওই যে ওখানেওখানে আগুন জ্বলছেনীচে আমার মা শুয়ে আছে

নিমি ফ্যালফ্যাল করে যতির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। যতি পাগলই হয়ে গেছে।

তবুও নিমি আসে। কীসের এক আকর্ষণ তাকে এই পাগলটার কাছে টেনে আনে। যতির চোখের বিহ্বলতা তাকে মায়ায় জড়ায়।

তীন তুই ঘোড়া, আগুন, পাখি এখনও দেখিস? বল্ না যতীন বল্ নাদেখতে পাস এখনও? কীভাবে দেখতে হয়? আমি কি দেখতে পাব?…বল্ না

উত্তর দেয় না যতি।

হঠাৎ নিমি যতির হাতটা ধরে ফেলে।

তুই আমায় দেখতে পাস না?…ইচ্ছে করে না তোর আমায় দেখতে?

যতি চমকে ওঠে। হাতটা সরাবার চেষ্টা করে না। নিমির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। বুকের মধ্যে কী যেন তোলপাড় করে ওঠে। কী বলতে চায় সে বলতে পারে না। চোখ দিয়ে তার ভাষা ব্যক্ত করার চেষ্টা করে। দূরে আকাশে কালো মেঘ জমে আসে। চারিদিক থমথম করছে, ঝড় উঠবে বোধহয়। যতির চোখ চলে যায় দূর আকাশের দিকে। কালো মেঘের গায়ে সূর্যাস্তের বিচ্ছুরিত শেষ রশ্মি এসে পড়েছে। মেঘের মধ্যে সে এক নারীর আনত মুখ দেখতে পায়আরক্ত মুখে একফালি রক্তিম রশ্মি যেন তার সিঁথিকে রাঙিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ সে নিমির দিকে তাকায়। নিমির চোখে জল। দুজনের মধ্যে ঘনিয়ে ওঠে ঝড়ের আগের ভয়ানক নিস্তব্ধতা।

সেদিন হরতাল, বাজার বন্ধ। আজ আর লাটুর কাছে তার গালাগাল খেতে হবে না। খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে যতি পুকুরঘাটের দিকে গেল। কাছাকাছি এসে সে থমকে দাঁড়াল হঠাৎ। ফুলিমাসি পিছন ফিরে জলে দাঁড়ানো। সদ্য ডুব দিয়ে উঠেছে বোধহয়। সারা গা দিয়ে টপটপ করে ঝরে পড়ছে বিন্দু বিন্দু জলকণা। জল কোমরের নীচ পর্যন্ত। নগ্ন ভিজে পিঠের ওপর ভিজে চুল এলিয়ে আছে আর ভিজে আঁচলটা সাপের মত পাকিয়ে জড়িয়ে আছে।

কী সুন্দর, কী আশ্চর্য সুন্দর! মনে হচ্ছে কোনো মানুষ না, জলদেবী দাঁড়িয়ে আছেন। মরাল গ্রীবা তাঁর, কী নিখুঁত কোমরের খাঁজ। চমকে উঠল যতি, এ যে তার কল্পনায় সৃষ্ট দৃশ্য, সে যে আগেই দেখেছে  পিছন ফিরে থাকা এক নগ্ন নারীর শরীর। দু-চোখ বুজল যতি, আবার খুলল। সেই অপুষ্টিতে ক্লিষ্ট, প্রায় যৌবনবিগতা রমণী তার দৃষ্টিতে অসামান্যা হয়ে উঠল। আস্তে আস্তে নিজেকে আড়াল করে নিল সে। সেদিন রাত্রে সারারাত সে দু-চোখের পাতা এক করতে পারল না। ঘুরে-ফিরে মনের মধ্যে জেগে উঠল জল থেকে উত্থিত এক নারীর নগ্ন পিঠ, তাকে এঁকে বেঁকে জড়িয়ে রয়েছে ভয়ঙ্কর এক সাপ। যতির শরীরে মেঘ গর্জায়, বৃষ্টি নামে, প্লাবন আসে। 

পাড়ায় খুব হাঁক-ডাক, হই-চই, চতুর্দিকে মাতো-মাতো ভাব। সরকারবাড়ির ছোটো মেয়ে নমিতার, নিমির, বিয়ে। শোনা যায় নিমি নাকি খুব কেঁদেছিল, বাপ-মায়ের পায়ে ধরে বলেছিল দূরে কোথাও বিয়ে দাও আমার। কিন্তু কপালফেরে বর তার এ গ্রামেই জুটল। পাগল যতীন আরও পাগল হয়ে গেছে, বাড়িতেই বসে থাকে, কোথাও যায় না। দোকানের কাজটা ইতিমধ্যে গেছে। লাটু উত্তমমধ্যম দিতে যাচ্ছিল। সবাই হাঁ-হাঁ করে থামাতে যা নয় তাই গালাগাল দিয়ে তাকে দোকান থেকে তাড়াল। ইদানীং কাজে খুব ভুল হত তার, ঠিকমতো হিসাব মেলাতে পারত না। তাই তাকে চোর বলতেও ছাড়েনি লাটু। 

ফুলির তিনকুলে কেউ নেই, তবু খাটে খুব। যেখানে যেমনটা কাজ পায় করে। জমিতে কাজ করে, হাটে বসে, আবার ঘোষদের বাড়িতে কোনো কাজ হলে ডাক পড়লে যায়। যতিকে সে মমতা আর স্নেহে আগলে রাখে। যতিকে সে বোঝে না, শুধু এটুকু বোঝে এই দুনিয়া যতির জন্য নয়, তার দুনিয়া আলাদা। ফুলিমাসির দিকে তাকায় না যতি। তবু সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে ফুলি যখন তার ঘরে আসে যতির চোরা দৃষ্টি আপনা আপনি তার দিকে পড়েপ্রদীপের আলোয় ফুলির বুকের আর চিবুকের রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আলো-ছায়া তার সারা শরীরে যেন এক অজানা রহস্য সৃষ্টি করে। যতির নেশা লেগে যায়। ফুলি কাছে এলেই বুকের ভেতর কীসের এক ছটফটানি টের পায় সে। 

নিমির বিয়ের দিন এসে গেল। নিমিকে কি সে ভালবেসেছিল ? জানে না যতি। শুধু এটুকু বুঝেছিল নিমির সঙ্গ তার প্রতিটা মুহূর্তকে রঙে ভরিয়ে দিত। নিমি আর কোনোদিন আসবে কি তার কাছে? কালো মেঘের ওপর সূর্যাস্তের বিকীর্ণ রশ্মিতে লজ্জায় রাঙা এক বধূর মুখ সে দেখেছিল, সিঁথিতে তার সিঁদুর। যতি জানত তার জীবন থেকে এভাবেই নিমি হারিয়ে যাবে একদিন।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। নিমির বিয়ের সানাইয়ের একটানা সুরে আচ্ছন্নর মতো লাগে যতির। ফুলি একটা লণ্ঠন হাতে নিয়ে ঘরে ঢোকে। যতির মনের জমাটবাঁধা অন্ধকার তবু সরে না। সে ফুলির দিকে সরাসরি আর একটা দিনও তাকায়নি। তবু তার অস্তিত্ব টের পেলে যতির ভেতর এক দস্যু যেন দাপাদাপি করে।

তি একবার এদিকপানে চা দিকি?… একটিবার চনিমির বর দেখে আসিচ দিকি আমার সঙ্গে

কোন উত্তর দেয় না সে। মাসির দিকে স্পষ্টভাবে মুখ তুলে তাকাল অনেকদিন পর। তার মনে হল কতকাল সে মাসিকে ভালোভাবে চেয়ে দেখেনি, কতকাল মাসির সঙ্গে দুটো ভালো করে কথা কয় নি। গলার কাছে একটা কান্নার ডেলা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল। ফুলির পরণে আজ একটা ভালো শাড়ি, কোনো প্রসাধন নেই। তবু কণ্ঠার হাড় বার করা, খেটে খাওয়া, লাবণ্যহীন চেহারাটাকে তার অপরূপা বলে মনে হল। হঠাৎ সে প্রবলভাবে ফুলিকে জড়িয়ে ধরল, আস্তে আস্তে তার বুকে মুখ রাখল। ফুলি সরিয়ে দিল না তাকে, পরম স্নেহে আঁকড়ে ধরল তার মাথাটা নিজের বুকের মধ্যে। একসময় যতি টের পায় ফুলি তার হাতের বাঁধন আলগা করে কখন চলে গেছে। যতির সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে, ক্লান্তি বোধ করে সে, পিপাসা পায় তার। জল খাবার জন্য উঠে দাঁড়ায় সে। হঠাৎ দেওয়ালের দিকে চোখ পড়ায় আশ্চর্য হয়ে যায়। লণ্ঠনের আলোয় পরিস্কার দেখতে পায় ছায়াটাকেএকটা কুঁজো লোক, কাঁধের কাছে হাড়গুলো উঁচিয়ে আছে। এ তো তার নিজেরই ছায়া, ভীষণ অবাক হয় সে। কতবার, কতবার যতি এই লোকটাকে দেখেছে, ভাঙা পাঁচিলের গায়ে, মেঘের মধ্যে, অবিন্যস্ত কাপড়ের ভাঁজে। পলকহীন চোখে সে ছায়াটাকে দেখতে থাকে। সে এগোয় আর পেছোয়, কুঁজো লোকটাও ছোটো হয়, বড়ো হয়।

যতি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। হাঁটতে থাকে গন্তব্যহীন এক ঠিকানার দিকে। দূরে গাছগুলোর ডালপালাদের যেন কতগুলো হাতের মতো মনে হয় তার, বাতাসে কেঁপে কেঁপে তারা যতিকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। হাঁটতে হাঁটতে ঘাটবেড়িয়ার মাঠ পেরিয়ে যায় সে। গ্রামের কিনারায় এসে শ্মশানের কাছে দাঁড়ায়। বৃষ্টির ছাঁট গায়ে এসে লাগে। বিদ্যুৎ চমকে ওঠে। বিদ্যুতের আলো এলোমেলো বৃষ্টি ধারার ওপর পড়ে আগুনের শিখার মতো মনে হয়। যতি আবার চলতে থাকে। বৃষ্টি থেমে যায়। ভাঙা চাঁদের ধূসর আলোয় কুঁজো লোকটাও তার সঙ্গে সঙ্গে চলে।

তারপর বহু বছর কেটে গেছে। ওড়গ্রামের পরিবেশ এখন অন্যরকম হয়ে গেছে। অনেক রাস্তা পাকা হয়েছে, অনেকগুলো পাকা বাড়িও উঠেছে। আগে যে রাস্তা দিয়ে সাইকেল বা ভ্যান-রিকশা চলত, এখন সেখান দিয়ে মাঝে মাঝে একটা দুটো মোটরবাইক যাতায়াত করে। ঘাটবেড়িয়ার মাঠ সেরকম আর নেই। জায়গায় জায়গায় ঘাস মরে গেছে। ওড়গ্রামের সেই সবুজের প্রাচুর্য, প্রকৃতির সেই লাবণ্য কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। ওড়নদীর খালে টলটলে জল আর বয়ে যায় না, কচুরিপানা আর আগাছায় খালটা মজে গেছে। নিমির ঘর-সংসার ভরন্ত। স্বামী, ছেলে, মেয়ে নিয়ে সে এখন ভারিক্কি গিন্নী। তবু ক্ষণিকের জন্য একমুখ দাড়িওয়ালা, সদ্য কৈশোর পার করা এক যুবক, বিশেষ করে দুটো চোখ তার মনে উঁকি মারে। নিমির দীর্ঘশ্বাস ব্যাপ্ত হয়। ফুলি এখন প্রৌঢ়া, কোনোরকমে দু-এক বাড়ি কাজ করে দিনযাপন করে। হঠাৎ করে তার মনে পড়ে যায় সেই পাগলটার কথা, যে শুধু বড়ো বড়ো চোখ মেলে কী যেন দেখত, কী যেন ভাবত, কী যেন বলতে চাইত। পৃথিবীতে তাকেই বোধহয় ফুলি আপনার জন না হয়েও সবচেয়ে আপন বলে মেনেছিল। ফুলির চোখ ভিজে যায়।

যতি নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। আর কেউ কোনোদিন তাকে দেখেনি। আজও কি যতি ডালপালা আর পাতার ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান আকাশের মধ্যে, স্বচ্ছ জলের তলায় আগাছার মধ্যে, দিকচক্রবালে গাঢ় সবুজ আঁকা-বাঁকা আভরণের মধ্যে বা জ্যোৎস্না রাতে মাটির আলোছায়ার মধ্যে খুঁজে চলে প্রজ্জ্বলিত চিতার লকলকে শিখা বা সদ্য জল থেকে উঠে আসা এক জলদেবীকে? আজও কি যতিকে কুঁজো লোকটা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়? আজও কি যতির চোখ দুটো আকুল হয়ে ওঠে সীমন্তিনী এক মেঘ-বধূকে দেখার জন্য?

কে-ই বা তার খোঁজ রাখে

 
 
top