অন্তঃপুরের মসীকথা

 

উনবিংশ শতাব্দীর সূচনায় যদি নবজাগরণের শুরু হয়, তাহলে মধ্যভাগটা হবে নবজাগরণের উত্তাল প্রবাহমানতা। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয় কামিনী সুন্দরী দেবীর উর্ব্বশী নাটক এবং বালাবোধিকা পত্রিকাতে নাটকটি প্রকাশিত হয় ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে। তিনিই প্রথম বাঙালি মহিলাদের মধ্যে নাটক রচনা করেছিলেন। দ্বিজতনয়া নামেও তিনি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বসবাস স্থল ছিল শিবপুর। নাটকটির আখ্যাপত্রটি এইরকম:

উর্ব্বশী নাটক

দ্বিজতনয়া প্রণীত

কলিকাতা,

শ্রীযুক্ত ডিরোজারিও কোম্পানীর মুদ্রাযন্ত্রে প্রকাশিত

সং ১২৭২—ইং ১৮৬৬

নাটকটিতে লেখিকা প্রথমে নিজের নাম লেখেননি। পরে ঊষা (১৮৭১) এবং রামের বনবাস (১৮৭৭) নাটকে লেখিকা নিজের নাম লেখেন। নাটকের বিজ্ঞাপনে লেখা হয়:

আমি অশিক্ষিতা। এই আমার প্রথম রচনা।

নাট্যকাহিনিটি দৈমিনী সংহিতা-দণ্ডীপর্ব থেকে নেওয়া হয়েছে। লেখিকা বইটি প্রসঙ্গে লিখেছেন, আমার গ্রন্থে অপবিত্র প্রণয় ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু কেবল তাহা বলিয়াই সূক্ষ্মদর্শী পাঠকমণ্ডলী আমার গ্রন্থকে অনাদর করিবেন না।

উর্বশী-র বিষয়বস্তু নির্বাচনে লেখিকা পৌরাণিক ঘটনা অবলম্বন করলেও তা তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার ইতিবৃত্তেই রচিত। নাটকে চারটি অঙ্ক, চৌত্রিশটি দৃশ্য। কেবলমাত্র নারী চরিত্রের বিভিন্নতাই নাটকে পরিলক্ষিত হয়। সমকালের মেয়েদের পরিবার জীবনের কথাই নাটকটির মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে। নারীদের মৃৎ স্বামীদের স্থানে দেবতাদের বসিয়ে চরিত্রাবলীর রূপায়ণ করা হয়েছে। চরিত্রাবলীর আচার আচরণ এবং জীবন যাপনে সে যুগের রুচি বিকৃতির স্পষ্টতা প্রকাশ পেয়েছে। উর্বশীর বিহনে ইন্দ্রের চিত্ত বৈকল্য, উর্বশীর প্রতি কৃষ্ণের আসক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে বিবাহিত পুরুষের অন্য নারীর প্রতি আসক্তির জন্য স্ত্রীদের মনবেদনার কথা ব্যক্ত হয়েছে। ইন্দ্রের অন্দরমহলে উঁকি দিলে দেখা যাবে শচীর মনঃকষ্ট। দণ্ডীরাজ ঘোটকীরূপী উর্বশীর প্রতি মোহান্বিত হয়ে নিজের স্ত্রীদের প্রতি অবহেলা করেছেন। নিজগৃহে রাত না কাটিয়ে উর্বশীর গৃহে রাত কাটাচ্ছেন—এই ঘটনাগুলি সেই সময়কার বাবু সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র। কলকাতার বাবুদের বাগান বাড়ির রক্ষিতারা রাতে উর্বশীর বেশে নাচ গান করে বাবুদের মনোরঞ্জন করত। দেব-দেবীদের চরিত্রের আড়ালে সে যুগের সমাজের ভ্রষ্টাচারই নাটকটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

সে কালের বিবাহপূর্ব প্রেম মানেই ভয়, লজ্জা এবং তা সমাজের কাছে পাপের বিষয়। বিবাহপূর্ব প্রেম শুধুমাত্র বিদ্যাসুন্দরের কাব্যের মধ্যেই পাওয়া যায় এবং তা রাধাকৃষ্ণ তত্ত্বের উচ্চমার্গে আবদ্ধ। দ্বারকানাথ অধিকারীর সংবাদ প্রভাকরে সতীত্বের আক্ষেপোক্তি-তে শোনা যায়:

নবীন যুবকগণে   স্বদেশী যুবতী সনে

        বিবাহের পূর্বে চাহে ভাব।।

কিন্তু এসব ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের সময়কার। উনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের লেখিকারা কিন্তু নারী জীবনে প্রেমের ছবি আঁকতে বিন্দু মাত্রও দ্বিধা বোধ করলেন না। এখনও সমাজে স্বামী-স্ত্রীর প্রেমই একমাত্র বৈধ প্রেম। প্রেম যে কোনো পাপ নয়, দুজন নর-নারীর মানসিক ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম, তাঁরা সেটিকে তুলে ধরলেন। তাঁরা বললেন যে প্রেমের জন্য চাই উন্মুক্ত পরিবেশ, শিক্ষা এবং রুচি। অবৈধ প্রণয় সম্পর্কে হেমাঙ্গিনী দেবী বলেছেন, একটি যুবকের সহিত একটি স্ত্রী লোকের প্রণয় জন্মিল, কিন্তু যুবার পিতা মাতা যুবার বিবাহ অন্য যুবতীর সহিত দিলেন। সেই শোকে উপরোক্ত স্ত্রী লোকটি আত্মহত্যা করিয়া প্রাণত্যাগ করিল,—এদিকে যুবক পূর্ব প্রণয়ণীর আশা জলাঞ্জলি দিয়া নির্বাসিত হইয়া গেল।

হেমাঙ্গিনী দেবির কথাগুলো শুনলেই বোঝা যায় অবৈধ প্রণয় সম্পর্কে লিখতে তিনি একটুও সঙ্কোচ বোধ করেননি। তাঁর লেখা দুটি উপন্যাস হল মনোরমা এবং প্রণয় প্রতিমামনোরমা প্রকাশিত হয় ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে এবং এটি মূলতঃ একটি সমাজকেন্দ্রিক উপন্যাস। উপন্যাসটির কাহিনি, চরিত্রায়ন, উপন্যাসে বর্ণিত সমাজ সচেতনতা বেশ দুর্বল হলেও নারীর পারিবারিক জীবনের গঠনশীলতা যে আদর্শবোধের ভাবধারায় গঠিত তা অত্যন্ত সচেতনভাবেই লেখিকা উপস্থাপন করেছেন। সামাজিক জীবনের কাঠামো যে ধর্ম ও কুসংস্কারের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল তার বিরুদ্ধে আঘাত হানলেন সমাজ সংস্কারকরা। প্রচলিত ধর্মীয় বিধিনিষেধের বন্ধন ছিন্ন হল। কিন্তু তার বদলে নতুন কোনো বোধের জন্ম হোল না। কিন্তু সঠিক কোনো মূল্যবোধ ব্যতীত সামাজিক সংস্কার এবং জাগরণ সম্ভব নয়। সেই মূল্যবোধের জাগরণ দেখা যায় সেই যুগের লেখিকাদের লেখার মধ্যে। তাঁরা অনুভব করেছিলেন যে গার্হস্থ্য জীবন যাপন করতে করতেই আত্মবিকাশের পথ খুঁজতে হবে। লেখিকা গ্রন্থশীর্ষে লিখলেনমনোরমা দরিদ্র ব্রাহ্মণের কন্যা, সম্পত্তির মধ্যে এক সরল, কোমল ও উদার মন। আর সচ্চরিত্র স্বামীর সহবাসকে যদি উচ্চশিক্ষা বলেন তবে মনোরমা সে শিক্ষা লাভ করিয়াছে।

উপন্যাসটি প্রসঙ্গে ড. জ্ঞানেশ মিত্র বলেছেন: উপন্যাসটিতে নারীশিক্ষা, পরিবার গঠনের শিক্ষা, ব্রাহ্মধর্মের নতুন পরিবেশ, স্বামী-স্ত্রীর আদর্শ, নীতিভ্রষ্ট জমিদার, দাম্পত্য জীবনের সামাজিক ও ধর্মীয় লক্ষ্য বিবৃত হয়েছে। দুর্নিবার ইমোশন কাহিনি ও চরিত্রের পিনদ্ধতা নষ্ট করেছে। তবুও গ্রন্থটিতে গঠনশীল মধ্যবিত্ত জীবনের চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হেমাঙ্গিনীর দ্বিতীয় উপন্যাস প্রণয় প্রতিমা-র প্রকাশকাল ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দ। এটি একটি সম্পূর্ন কাল্পনিক উপন্যাস। বহুবিবাহ এবং বাল্যবিবাহ এই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু।

(ক্রমশ…)

 
 
top