অন্তঃপুরের মসীকথা

 

রামমোহন যে শিক্ষার প্রসারের বীজ বপন করেছিলেন, তাঁর অনুগামীরা সেই বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটান। ডিরোজিও ও তাঁর ইয়ং বেঙ্গল সোস্যাইটির উদ্যোগে নারীমুক্তি আন্দোলন এক অন্য মাত্রা পায়। রামমোহন ও তাঁর অনুগামীরা সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য যে আত্মীয় সভা গঠন করেছিলেন, তা সারা বাংলায় আলোড়ন তুলেছিল। এই প্রসঙ্গে ডিরোজিওর নাম অগ্রগণ্য। রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর মধ্যবর্তী পর্যায়ে, ডিরোজিও হলেন সেই ব্যক্তি যার চিন্তার প্রসারতা তৎকালীন সমাজে, বিশেষত যুব সমাজে, পরিবর্তনের জন্য আলোড়ন তুলেছিল। যদিও ফিরিঙ্গি সমাজে তাঁর জন্ম, তিনি তৎকালীন বাঙালি সমাজে, বিশেষত তরুণদের কাছে, সমাজ সংস্কারের প্রতিভূ হয়ে উঠেছিলেন। এই তরুণদেরই বলা হত ইয়ং বেঙ্গল এবং তাঁরা আসলে হিন্দু কলেজের ছাত্র ছিলেন। হিন্দু কলেজে পাশ্চাত্য শিক্ষার সংস্পর্শে এসে তাঁরা পাশ্চাত্য ভাবধারায় নিজেদেরকে উজ্জীবিত করতে পেরেছিলেন আর এই কাজে যিনি সর্বোতভাবে তাঁদের পাশে ছিলেন তিনি হলেন ডিরোজিও।

ডিরোজিওর সংস্পর্শে যারা এসেছিলেন, তাঁরা পরবর্তীকালে নারীমুক্তি আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। রাধানাথ শিকদার, রামগোপাল ঘোষ, রামতনু লাহিড়ী, শিবচন্দ্র দেব, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, প্যারীচাঁদ মিত্র প্রমুখরা ছিলেন তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র। এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন তাঁর প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। পার্থেনান নামক মুখপত্রে ইয়ং লায়ন্সদের প্রথম গর্জন শোনা যায়। হিন্দু কলেজের রক্ষণশীল পরিচালকরা এই তরুণ ছাত্রদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের সেই চেষ্টা সফল হয়নি। পার্থেনান-এ নারীশিক্ষা, ভারতীয় বন্দী নারীদের উপর বিশেষ নিবন্ধ ছাপা হয় এবং বিশেষ গুরুত্ব সহকারে নারীশিক্ষার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এ ছাড়াও বিধবাবিবাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলিন্য প্রথা—এসবের বিরুদ্ধে তরুণ ছাত্ররা সোচ্চার হয়ে উঠেছিল।

১৮২৫ থেকে ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত সময়কে বলা হয় বাংলার নবযুগের সময়কাল। এই সময়েই সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা—সব দিকেই এক বিশাল পরিবর্তনের ঢেউ উঠেছিল। ১৮১৭ থেকে ১৮৫১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তৎকালীন বাংলাদেশে সমাজ সংস্কারের এক উত্তাল তরঙ্গ শুরু হয়েছিল। হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা, ডিরোজিওর হিন্দু কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান ও তাঁর ছাত্রদের উপর প্রভাব, ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা, সতীদাহ রদ, বেথুন স্কুলের প্রতিষ্ঠা, বিধবাবিবাহ আইন পাশ ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজে এবং সামাজিক বোধের মধ্যে এক নতুন পরিবর্তন এসেছিল। ধর্মীয় অনুশাসন এবং আচার সর্বস্বতার বিরুদ্ধে যুক্তি, বুদ্ধি ও হৃদয়ের ধর্মই  প্রাধান্য পেতে শুরু করেছিল।  

 
 
top