অন্তঃপুরের মসীকথা

 

পর্ব ৩

সারদাসুন্দরী দেবী

দীর্ঘ জীবনে অনেক শোকতাপই সহ্য করেছিলেন সারদাসুন্দরী দেবী। তবু সবকিছু হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। পরম ভক্তিমতি মহিলা ছিলেন তিনি। ১৮১৯ সালে ত্রিবেণীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ত্রিবেণীতে সারদাসুন্দরী দেবীর মামাবাড়ি, আর পিত্রালয় হল তৎকালীন ২৪ পরগণার গৌরীডা গ্রামে। পিতার নাম গৌরহরি দাস। যখন তাঁর মাত্র নয় বছর বয়স, তাঁর বিয়ে হয়ে যায় দেওয়ান রামকমল সেনের মধ্যমপুত্র প্যারিচরণ সেনের সঙ্গে। একান্নবর্তী পরিবারে সংসারের কাজ সামলাতেই তাঁর সারাটা দিন কেটে যেত। কিন্তু সারদাসুন্দরী দেবীর স্বামী ছিলেন প্রকৃতার্থেই বিদ্যানুরাগী। মূলত তাঁর উৎসাহেই সারদাসুন্দরী দেবী অল্প হলেও লেখাপড়া শিখেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যখন তাঁর মাত্র উনত্রিশ বছর বয়স, তাঁর স্বামী মারা যান। তিনি সাতটি সন্তানের জননী ছিলেন, তার মধ্যে ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র অন্যতম। সারদাসুন্দরী দেবী নিজের কথা নিজে লেখেননি, মুখে মুখে আত্মকথা বলেছেন আর অনুলিখন করেছেন যোগেন্দ্রনাথ খাস্তগীর। পরে রচনাটি মহিলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

কৈলাসবাসিনী দেবী, নিস্তারিনী দেবী এবং স্থির সৌদামিনী দেবী

এছাড়াও যে সকল বঙ্গললনারা সেই সময়ে নিজেদের আত্মকথা লিখেছিলেন বা মুখে বলেছিলেন (যা পরে অনুলিখিত হয়েছিল), তাঁরা হলেন কৈলাসবাসিনী দেবী, নিস্তারিনী দেবী এবং স্থির সৌদামিনী দেবী।

কৈলাসবাসিনী দেবীর আত্মকথাটি ডাইরির মতো লেখা। তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে দৈনিক বসুমতি পত্রিকাজনৈকা গৃহবধূর ডাইরি নামে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। রাজপুরে আনুমানিক ১৮২৯ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম গোরাচাঁদ ঘোষ। মাত্র এগারো বছর তাঁর বিবাহ হয় কিশোরীচাঁদ মিত্রের সঙ্গে। কিশোরীচাঁদ মিত্র সেই সময়কার বিখ্যাত দেশনায়ক, প্রসিদ্ধ লেখক এবং সমাজ সংস্কারক এবং আলালের ঘরের দুলাল প্রণেতা প্যারিচাঁদ মিত্রের কনিষ্ঠ ভ্রাতা। স্বল্প শিক্ষিতা নারী হয়েও তিনি বিদ্বান স্বামীর সাহচর্যে অনেক উদার মানসিকতার অধিকারিণী হয়েছিলেন। একমাত্র কুমুদিনকে নিয়ে তাঁরা অনেক স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন। ১৮৯৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

নিস্তারিনী দেবীর সরাটা জীবন কেটেছিল চরম দুঃখ আর দারিদ্র্যে। বর্ধমানের খন্যান গ্রামে আনুমানিক ১৮৩৩ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সেই সময়ের ঠগী দমনকারী স্লিম্যান সাহেবের অন্যতম সহকারী কর্মচারী। রেভারেন্ড কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর ভ্রাতা। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দেবীচরণ বন্দ্যোপাধায়ের পুত্র ছিলেন ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধায় যিনি ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় নামে বিখ্যাত।

খানাকুল কৃষ্ণনগরের বহুপত্নীক কুলীন ব্রাহ্মণ ঈশ্বরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, থাকতেন পিত্রালয়েই। ছোটো ভাইয়ের নাতি মন্মথধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তিনি তাঁর শেষ জীবন কাটান। লেখাপড়া তিনি জানতেন না, মুখে মুখেই তিনি তাঁর জীবন বর্ণনা করেছিলেন যা মন্মথধন অনুলিখন করেন। ভারতবর্ষ পত্রিকায় সেকেলে কথা নামে এই অনুলিখিত জীবনকথা প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯১৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

স্থির সৌদামিনী দেবীর আত্মজীবনী কিন্তু অনুলিখিত নয়, তিনি নিজে লিখেছিলেন: আমাদের পারিবারিক কাহিনী। যশোর জেলার মাগুরা গ্রামে ১৮৪২ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতা হরিনারায়ণ ঘোষ। শৈশবেই মতিলাল বকশীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তিনি পরলোকচর্চায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর ছোটো বোনের সঙ্গে রামসুন্দরী দেবীর ছেলের বিবাহ হয়েছিল। সরলাবালা ছিলেন তাঁর বোনের মেয়ে। ১৯২৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

পত্রপত্রিকায় মসীকথা

বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলিন্য প্রথা ইত্যাদি সেকালের মেয়েদের অকাল বৈধব্য এনে দিত। এই সমস্ত কুপ্রথা তখনকার সমাজজীবনকে কতটা যে ক্লেদাক্ত করে দিয়েছিল, তার চালচিত্র পাওয়া যায় তৎকালীন পত্রপত্রিকার পাতায়।

সম্বাদ ভাস্কর-এর পাতায় বিদ্যাদেবী নামে একজন বাল্যবিধবা পত্রের মাধ্যমে তার যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবন প্রকাশ করেন। ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া এবং দ্য মর্নিং ক্রনিকেল-এ সেকালের বাল্যবিধবারা যারা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ফলে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁদের জীবনকাহিনি প্রকাশিত হয়। অনেক বাল্যবিধবা নারীই সামাজিক নিষ্পেশনের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য বিপথগামী হতেন এবং জীবনযন্ত্রণা আরও বাড়ত। তৎকালীন পত্রপত্রিকায় এরকম অনেক যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবন প্রকাশিত হয়েছে।

একটি ষোল বছরের কুলীন কন্যা অনেকদিন অপেক্ষার পর, প্রথম তাঁর স্বামীকে দেখে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন তার বর্ণনা:

কোন দিবস অপরাহ্নে পঞ্চাশৎবর্ষ-বয়স্ক একজন মনুষ্য আমাদিগের গৃহদ্বারে উপস্থিত হইলেন এবং পরিচয় গ্রহণ দ্বারা জানা গেল মাত্র অন্তঃকরণ কম্পিত হইল। লজ্জা, ঘৃণা, ক্ষোভ, ক্রোধ, সংশয় প্রভৃতি ভাবের এ প্রকার আন্দোলন হইয়াছিল যে, আমি আর লোকসমাজে মিশ্রিত হইবার অভিলাষ একেবারে ত্যাগ করিয়াছিলাম। তাহার কুৎসিত আকৃতি, স্খলিত অঙ্গ এবং পক্ক কেশাদি দর্শন করিয়া আমি হতবুদ্ধি হইয়াছিলাম। আমি জ্ঞানতঃ তাহাকে বরণ করি নাই। তাহার সহিত আমার মনের ঐক্য বা প্রণয়ের সঞ্চার হয় নাই। অথচ তিনি আমার পতি, আমার সুখের মূলাধার। কি আশ্চর্য্য, তাহার মূর্তি যেমন কুৎসিত, রজনীতে তাহার ব্যবহার তদ্রুপ প্রত্যক্ষ হইল।

কৃষ্ণকামিনী দেবী

সেকালের বিধবা রমণীদের করুণ আর্তি বিদ্যাসাগরসহ বেশ কিছু উদার মনস্ক মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। তাই অনেক বাগবিতণ্ডা, আবেদন-নিবেদনের পর অবশেষে ১৮৫৫ সালের ২৬ জুলাই বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন করে হয়। আর সেই সময়েই নারীদের ক্ষোভ, যন্ত্রণা, আশা-আকাঙ্ক্ষার কাব্যরূপ দিলেন কৃষ্ণকামিনী দেবী তাঁর চিত্তবিলাসিনী-তে। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বইটি প্রসঙ্গে সংবাদ প্রভাকর-এ লিখলেন: অঙ্গনাগণের বিদ্যানুশীলন বিষয়ে যে সুপ্রণালী এদেশে প্রচলিত হইতেছে, তাহার স্বরূপ এ গ্রন্থ। এখানে বইটি থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হল।

পুরুষ: দেবগণ মধ্যে হয় আমার বসতি।/ ধম্ম নামে খ্যাত আমি শুন রসবতি।।/ সমাদরে যারা করে আমার সাধন।/ তাদের শরীরে করি শতত ভ্রমণ।।/মর্ত্ত্যলোকে সেই হেতু আমার বসতি।/ আপন বৃত্তান্ত ধনি কহ লো সম্প্রতি।।

কামিনী: প্রবৃত্তির কন্যা আমি দয়া নামে খ্যাত।/ শ্রদ্ধা নামে ভগ্নী মম জগতে বিখ্যাত।।/ মর্ত্ত্যলোকে মহাত্মাগণের অন্তরেতে।/ নিবাস আমার তাই ভ্রমি হেন মতে।।/ সুরগণ শ্রেষ্ঠ তুমি ধর্ম্ম মহামতি।/ এরূপ ব্যাভার কেন অবলার প্রতি।।/ তোমার উচিত কভু না হয় এমন।/ ছাড় ছাড় পথ করি স্বস্থানে গমন।।

পুরুষ: দয়া ছাড়া ধর্ম্মবল আছে কোনখানে।/ যেখানেতে দয়া দেখ ধর্ম্ম সেইখানে।।/ অতএব কেন কর এমন ভাবনা।/ দয়া ছাড়া ধর্ম্ম প্রিয় কখন হবে না।।/দয়াহীন ধর্ম্মের নাহিক হয় গতি।/ দয়া ধর্ম্ম দুয়ে হয় একাধারে স্থিতি।।

কামিনী: শপথ করিতে যদি পার মহাশয়।/ তবে যে আমারই যে হইবে প্রত্যয়।।/ যেখানে রব আমি সেইখানে রবে।/ তিলেক তিলার্দ্ধ নাহি ছাড়াছাড়ি হবে।।/ তুমি ধর্ম্মরাজ হও সত্যের আশ্রয়।/ ত্রি সত্য করিলে পরে ঘুচিবে সংশয়।।/ দুইজনে সত্যবদ্ধ করি হেন মতে।/ পারিজাত হার দিল দোঁহার সমেতে।।/ আপন আপন করে লইয়ে আপনি।/ উভয়ে উভয়ে গলে করিল আপনি।।/ … হেনকাল আচম্বিতে নিদ্রাভঙ্গ হলো।/ কিছু নাহি জানিলাম পরে কি ঘটিল।।

এই নাতিদীর্ঘ কাব্যটির ভাষা এবং বর্ণনা সুন্দর, সরল ও প্রাঞ্জল। কাব্যগ্রন্থটির শুরুতে পয়ার ছন্দে মঙ্গলকাব্য-এর ঢঙে ব্রহ্মবন্দনা করে লেখিকা তাঁর আত্মপরিচয় দিয়েছেন। হুগলী জেলার সুখরিয়া গ্রামে শ্রীশান্তিভূষণ মুস্তাফী হলেন তাঁর স্বামী। চিত্তবিলাসিনী গ্রন্থটিতে লেখিকা নারী সংলাপ রচনায় বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বইটি সেই সময়কার নারীমুক্তি আন্দোলনে প্রভাবও ফেলেছিল।

দৃশ্যকাব্য রচনায় কৃষ্ণকামিনী দেবী ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। নবঙ্গিকা এবং মদয়ন্তিকা-য় লেখিকা কুলীন কন্যার বিরহ ও কামনার এক নাটকীয় চিত্র তুলে ধরেছেন: রাঢ়ের বিয়ে যদি আগে অব্দি থাকত তবে আর এসব কম্ম কেঊ করতো না, দেক্‌ দিকি বোন কত লোক লজ্জার ভয়ে , পেট ফেলে, পেটের ছেলে যে প্রাণের চেয়েও বড়, তাও নষ্ট করচে। তাকি পোড়ার মুকো ড্যাকরারা চোকে দেখে না? এই সামাজিক চিত্র তৎকালীন বাংলার কৌলিন্য প্রথা এবং বাল্য বিধবায় জর্জরিত, নিপীড়িত পরিবারগুলির ঐতিহাসিক বাস্তব।

তবে লেখিকা এদেশে ইংরেজ শাসনের গুণবন্দনা করেছেন। ইংরেজরা এদেশে এসে স্টীমার, টেলিগ্রাফ, বাস্পীয় শকট চালু করে নারীদের দুঃখমোচন করেছে। আগে বিরহকাতরা স্ত্রীরা স্বামীর পথ চেয়ে বসে দিন কাটাত, তার খবরের অপেক্ষায় অধীর হয়ে উঠত। কিন্তু এহন সেই বিরহজ্বালা তাদের আর সহ্য করতে হয় না:

এখন দুবেলা পাব,          মন সাধ পুরাইব,

           হবে না বিচ্ছেদ জ্বালা আর।

লেখিকা নারিদের সুস্থ জীবনবোধে উজ্জীবীত হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। নারীরা কেবল যৌন কামনার আগুনে নিজেকে সমর্পিত না করে জ্ঞানের পবিত্র মন্ত্রে নিজেদেরকে দীক্ষিত করে তুলবে। লেখিকা কুলীন কন্যাদের প্রসঙ্গে বলেছেন:

কুলের কামিনী হয়ে          কুলে জলাঞ্জলি দিয়ে,

         কুলটা কুৎসিত নাম ধরো না লো ধরো না।

পড় পতি প্রীতি কূপে,       দেখ যেন কোনরূপে,

         ভ্রমান্ধ হইয়ে ডুব দিও না লো দিও না।

পতিসঙ্গ পরিহরি,            উপপতি সঙ্গ করি,

         কলঙ্কের ভার শিরে নিও না নিও না।।

(ক্রমশ…)

 
 
top