অন্তঃপুরের মসীকথা

 

গঙ্গামণি দেবী

আনন্দময়ী দেবীর পরবর্তী মহিলা কবিদের মধ্যে আমরা গঙ্গামণি দেবীকে পাই। তিনি ছিলেন লালা রামপ্রসাদের মেয়ে এবং লালা জয়নারায়ণ ও লালা রামগতির বোন। অর্থাৎ গঙ্গামণি দেবী সম্পর্কে অানন্দময়ী দেবীর  পিসি ছিলেন। তিনি অনেক বিবাহ-সংগীত রচনা করেছিলেন। সে সময়ে সেইসব সংগীতের বিপুল সমাদর ছিল। বর্তমানে গানগুলির অধিকাংশই লুপ্ত হয়ে গিয়েছে।

এখানে গঙ্গামণি রচিত একটি খণ্ডিত গানের উল্লেখ করা হল, যাতে তাঁর সুগভীর কবিত্বশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়:

জনক নন্দিনী সীতা হরি যে সাজায় রাণি।

শিরে শোভে সিঁথিপাত হীরা, মণি, চুণী।।

নাসার অগ্রতে মোতি বিম্বাধর পরই।

তরুণ নক্ষত্র ভাতি যিনি রূপ হেরি।।

মুকুতা দশন হেরি লাজে লুকাইল।

করীন্দ্রের কুম্ভমাসে মজিয়া রহিল।।

জলে দিল থরে থরে মুকুতার মালা।

রবির কিরণে যেন জ্বলিছে মেখলা।।

কেয়ূর, কঙ্কন দিল আর বাজুবন্ধ।

দেখিয়া রূপের ছটা মনে লাগে ধন্দ (দ্বন্দ্ব)।।

বিচিত্র ফণীত শঙ্খ কুল পরিচিত।

দিল পঞ্চ কঙ্কন উপছি বেষ্টিত।।

মনের মত আবরণ পরাইয়া শেষে।

রঘুনাথ করিতে যান মনের হরিষে।।

এই গানটিতে সীতার বিয়ের বর্ণনা করা হয়েছে। মহিলাদের অঙ্গসজ্জায় অলংকার একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। প্রায় দেড়শো-দুশো বছর আগে মহিলাদের অলংকরণ কীভাবে পুরুষদের মোহিত করত, তারই একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই গানটির মধ্যে পাওয়া যায়।

 

রামসুন্দরী

হে পরমেশ্বর, তুমি আমায় লেখাপড়া শিখাও। বোবা কান্নায় ইশ্বরের কাছে আকুলভাবে প্রার্থনা করতেন রামসুন্দরী। পরমেশ্বর বোধহয় তাঁর সেই প্রার্থনা শুনেছিলেন। একদিন ভোররাতে স্বপ্ন দেখলেন যে, তিনি চৈতন্য ভগবত পুঁথি পড়তে বসেছেন। সেই স্বপ্ন তাঁর মধ্যে এক সুদীর্ঘ মধুময় আবেশ ছড়িয়ে দিল। সংসারে যে কাজই করেন না কেন, সর্বদা একই চিন্তা: তাঁকে পুঁথিখানি পড়তে হবে।

১৮০৯ সাল। সারা বাংলাদেশ জুড়ে সতীদাহ প্রথা, কৌলীন্য প্রথা, পণপ্রথা, বহুবিবাহ সমাজের বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করে চলেছে। সমাজকে অগ্রাহ্য করার দুঃসাহস কারুরই ছিল না। যে সামাজিক বিধান অস্বীকার করত, তাকেই শাস্তিস্বরূপ একঘরে করে দেওয়া হত। মেয়ের বিয়ে, ছেলের বিয়ে, বাপ-মায়ের শ্রাদ্ধ - সমস্ত সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেত। সে ছিল এক কল্পনাতীত অসহনীয় অত্যাচার। তাই একঘরে হওয়ার ভয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে ধনী সমাজপতিদের বিধান মেনে চলত।

পলাশির যুদ্ধ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন এনে দিলেও সামাজিক দিক থেকে সেরকম কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। নতুন সমাজব্যবস্থায় সামাজে যে পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা ছিল তা তো হয়ই নি, উলটে সে সময়কার ইংরেজ কর্তারা ভোগবিলাসে নিজেদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তারা খুব উচ্চ আদর্শেরও ছিল না। রাজনারায়ণ বলেছেন, সেকালের সাহেবরা অর্ধেক হিন্দু ছিল। তারাও মন্দিরে উপঢৌকন পাঠাত, বাঈজির মজলিশে যেত, খানা-পিনার মধ্যে নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখত। লুঠতরাজ যে শুধুমাত্র দেশীয় দুষ্কৃতীরাই করত তা নয়, ইংরেজরাও মাঝরাতে গৃহস্থের ঘরে ঢুকে অবাধ লুঠপাঠ চালাত: there were Englishmen in Calcutta little more than a hundred years ago who not only bought and sold African slaves, but also for the breeding of them for the slave market.

ততদিনে বাংলার মসনদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হয়ে গিয়েছে। দাস-দাসীর ক্রয়-বিক্রয়ের বাজার রমরমিয়ে চলছে। ইংরেজরা দেশীয় এবং আফ্রিকান মেয়েদের নিয়ে তাদের কামনা চরিতার্থ করত। তাদের অবৈধ সন্তানরা নানান সমস্যা তৈরি করতে থাকলে, ইংরেজ মহিলারা যাতে তাদের স্বামীদের সঙ্গে এ দেশে আসে সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়: বাংলাদেশের প্রধান শহর কলকাতা, বর্ধমান, কৃষ্ণনগর ও ঢাকা লাম্পট্যের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। বাইরে কোঁচার পত্তন, ভিতরে ছুঁচোর কেত্তন চলছে। এই ব্যাভিচারের স্রোত গৃহ ও গৃহস্থকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। গৃহবধূ এবং ললনারা আত্মরক্ষা করতে পারেননি। অথচ সবকিছুই হচ্ছিল ধর্মের নামাবলির আড়ালে।

সমাজের এইরকম একটা অস্থির সময়ে পাবনা জেলার পোতাজিয়া গ্রামে ১৮০৯ সালে রামসুন্দরী জন্মগ্রহণ করেন। পিতা পদ্মলোচন রায়। যখন তাঁর বারো বছর বয়স, তাঁর বিয়ে হয়ে যায় ফরিদপুর জেলার রামাদিয়া গ্রামের ভূস্বামী সীতানাথ সরকারের সঙ্গে। সেকালে মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ খুব কমই ছিল, প্রায় ছিল না বললেই চলে। রামসুন্দরী নিজের চেষ্টায়, অক্লান্ত পরিশ্রম করে লেখাপড়া শিখেছিলেন। তিনিই প্রথম বঙ্গনারী যিনি নিজের কথা লেখেন। তাঁর লেখা আমার জীবন গ্রন্থটি সে সময়কার গ্রাম্য জীবনের এক জীবন্ত দলিল।

আর পাঁচটা মেয়েদের মতন রামসুন্দরীকে সতীনের ঘর করতে হয়নি। তাঁর শ্বাশুড়িও ছিলেন মায়ের মতন। তিনি রামসুন্দরীকে মেয়ের মতোই ভালোবাসতেন। যেহেতু রামসুন্দরী শৈশবেই পিতৃহীনা হয়েছিলেন, তাই তাঁর মা তাঁকে অনেক আদরে মানুষ করেছিলেন। মাকে ছেড়ে আসতে তাঁর খুব কষ্ট হয়েছিল। বিয়ের দিনও তিনি বোঝেননি যে,  তাঁকে মাকে ছেড়ে চলে আসতে হবে। যখন তাঁকে পালকিতে তোলা হয়, তাঁর নিজেকে বলির পাঁঠা বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু তাঁর মায়ের আদরের অভাব তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকেদের সুমধুর ব্যবহারে পূর্ণ হয়েছিল। তাঁর শ্বাশুড়ি বালিকা বধূটির জন্য নানারকম খেলনা এনে দিতেন। তাঁর ভাষায়, তাহাদের পোষাপাখি হইয়া তাহাদেরি শরণাগত হইলাম।

সংসার সামলাতেই তাঁর সারাদিন কেটে যেত। গা-ভর্তি ভারী গয়না, হাতে শাঁখা এবং সিঁথি ভরা সিঁদুর নিয়ে রামসুন্দরী স্বপ্ন দেখতেন কবে তিনি চৈতন্য ভগবত পুঁথিটি পড়বেন। সংসারের কাজ করার মধ্যেই আকুলভাবে প্রার্থনা করতেন, হে দীননাথ, আমি কল্য স্বপ্নে যে পুঁথিখানি পড়িয়াছি, তুমি ওই পুঁথিখানি আমায় চিনাইয়া দাও, ওই চৈতন্য ভগবত পুঁথিখানি আমায় দিতেই হবে। 

অবশেষে তাঁর স্বপ্ন পূর্ণ হল। ভগবান যেন তাঁর কথা শুনলেন। একদিন তিনি যখন রান্নাঘরে হেঁসেল সামলাতে ব্যস্ত, তিনি শুনতে পেলেন তাঁর স্বামী বড়োছেলে বিপিনকে ডেকে বলছেন, আমার চৈতন্য ভগবত পুঁথিখানি এখানে থাকিল। আমি যখন তোমাকে লইয়া যাইতে বলিব, তখন তুমি লইয়া যাইয়।

আনন্দের আতিশয্যে তাঁর দেহমন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। আট বছরের বিপিন যখন খেলতে গিয়েছে, রামসুন্দরী তখন ঘরে ঢুকে আস্তে করে পুঁথিটাকে দু-হাতে আঁকড়ে ধরলেন। প্রিয়জনের গায়ে হাত বোলানোর মতো করে তিনিও পরমযত্নে পুঁথিটির গায়ে হাত বোলাতে লাগলেন। পুঁথির সঙ্গে বাঁধা যে কাঠের মলাটটি তার ওপরে আঁকা রঙিন প্রচ্ছদটিকে তিনি ভালোভাবে চিনে রাখলেন যাতে পরে পুঁথিটি চিনতে ভুল না হয়। এরপর দুর্বোধ্য, আঁকাবাঁকা মসিরেখাগুলোর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকলেন তিনি। মনে মনে বললেন যে, এই পুঁথি তাঁকে পড়তেই হবে। ভোরের স্বপ্ন কখনও যে মিথ্যে হয় না

সেই কোন্ ছেলেবেলার কথা মনে পড়ল রামসুন্দরীর। সেকালে কেউ মেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার কথা ভাবতই না। বাপের বাড়িতে চণ্ডীমন্ডপের পাশে ছেলেদের একটা পাঠশালা চলত। যখন পাঠশালা চলত, তিনিও সেখানে বসে থাকতেন। এভাবেই শুরু হয় তাঁর অক্ষর পরিচিতি। কিন্তু সে চর্চায় ছিল অনিয়মিত এবং বিয়ের পর সংসার সামলানোর ভারে তা একেবারেই উঠে যায়। কিন্তু বাসনা ছিল অদম্য। তিনি প্রার্থনা করতেন, হে পরমেশ্বর তুমি আমায় লেখাপড়া শিখাও। 

এই ঐকান্তিক প্রার্থনাই পরিণতি পেল চৈতন্য ভগবত পুঁথিটি পাঠের মধ্য দিয়ে। তাঁর কাছে রান্নাঘরটাই ছিল সবথেকে নিরাপদ জায়গা। সেখানে বসেই তিনি নিজেকে ঘোমটার আড়ালে লুকিয়ে রেখে চৈতন্য ভগবত পুঁথিটি থেকে একটার পর একটা পাতা পড়ার চেষ্টা করে যেতে থাকলেন। মাঝে মাঝে ভয়ও পেতেন যে যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে আর নিন্দার শেষ থাকবে না। বড়ো ছেলে বিপিনের অ---খ মকশো করার পাততাড়ি লুকিয়ে এনে, চুপিচুপি শৈশবের অক্ষরজ্ঞানের ওপর ভর করে আবার লেখাপড়া শুরু করলেন। মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে পড়তেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত তিনি লেখাপড়া শিখলেন। পড়লেন চৈতন্য ভগবত। লিখলেন আমার জীবন যা তাঁর একান্তই নিজের কথা, নিজের সময়ের এক গ্রাম্য নারীর কথা। এবং রেখে গেলেন এক নিঃশব্দ বিপ্লব বাংলা ভাষার প্রথম মহিলা আত্মজীবনীকার হিসেবে। 

(ক্রমশ…)

 
 
top