মোহনা

 

মাঝের হাট যাবা বহিন? এত কাছখানি এসেছ? আমার বাড়ি দিকেও লিয়ে যাব। বাড়িউলি খুব বলে তুমার কথা। গ্রামপঞ্চায়েত অফিসের জিপি কর্মীটি জিজ্ঞেস করে মোহনাকে। আরএসবিওয়াই এর কাজ পুরোদমে চলছে। এক এক গ্রাম সংসদ ভিত্তিক বুথ করা হয়েছেমোহনা এসেছে রমনাডিহি সংসদে। খুব কাছেই সেই মাঝের হাট গ্রাম। যেখানকার এক দিঘির সঙ্গে এক সময় যোগ ছিল জলঙ্গী ও পদ্মার। যেখানে সপ্তডিঙ্গা মধুকর ভিড়িয়েছিলেন চাঁদ বেনে। জেদী একরোখা পুরুষটির সমস্ত বানিজ্যতরী ডুবিয়ে সর্বশান্ত করেছিল ‘পাপিষ্ঠা মনসা‘,শিব কন্যা মনসা, প্রাপ্য দেবী মর্যাদা থেকে বঞ্চিত মনসা। একমাত্র চাঁদবেনে পারে তার দেবী মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু কেন? কেন মনসাকে মর্ত্যলোকের বনিক প্রধানের পুজো পেতেই হবে,নইলে সে দেবী মহিমা থেকে বঞ্চিত থেকে যাবেকৌশলী মনসা। হাতের ঘুঁটি আরেকটি নারী। বাণাসুর কন্যা উষা তথা বেহুলা। বেহুলা পারে তার দেবী মহিমা ফিরিয়ে দিতে। বেহুলা পারে সেই জলপথ পরিক্রমা করে উলটো পথে যাত্রা করতে যে জলপথ বেয়ে বেহুলার শ্বশুর মহাশয় অঙ্গদেশ অধুনা আসাম থেকে ব্রহ্মপুত্র বেয়ে পদ্মা হয়ে গঙ্গা পদ্মার ত্রিবেণি সঙ্গম হয়ে সমুদ্র যাত্রায় পাড়ি দিয়েছিল। বেহুলা পারে মোহনা থেকে উৎসমুখে প্রবাহিত হতেমাথায় ভিড় করে আসে এক মুহূর্তে এইসব কথা। মোহনা মুহূর্তের জন্য আনমনা হয়।

না দাদা। কাজে এসেছি। এই গ্রামের কাজ শেষ হতেই বাথানডিহি। জানোই তো আমাকেই পাঠানো হয় বারবার ততক্ষণে সামনে আবার গ্রামবাসীদের লম্বা লাইন পড়ে গেছে। আরএসবিওয়াই প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত কিছু ছেলের টিম এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিযুক্ত একটি প্রাইভেট সংস্থার মাধ্যমে। পাশাপাশি টেবিল চেয়ারে বসে আছে ওরা। যে যার নিজের কাজ বুঝে করে চলেছে। মোহনা গ্রামসংসদ অধিবাসীদের নামের তালিকা মিলিয়ে ছেলেগুলির সঙ্গে কাজ করে চলেছে। একটি প্রাইমারি স্কুলবাড়িতে দুটো পাশাপাশি ক্লাসরুমে দুটো সংসদের কাজ চলছে,রমনাডিহি ১ আর রমনাডিহি ২। একটা সংসদের দায়িত্বে মোহনা। আরেকটি সংসদের দায়িত্বে পাশের ক্লাসরুমটিতে পঞ্চায়েতের নির্বাহী সহায়ক। ভদ্রলোক অবসর প্রাপ্তির দোর গোড়ায়হৃদরোগসহ নানান অসুস্থতায় জর্জরিত। স্নেহ প্রবণ মানুষটি অত্যন্ত দায়িত্ব সচেতন। মাঝে মাঝেই কাজের ফাঁকে এসে মোহনার রুমের পরিস্থিতি খোঁজ নিয়ে যাচ্ছেন।

শীতের দিন বহিন,বেলা ফুরিয়ে আসে তাড়াতাড়ি জিপি কর্মীটি মোহনাকে উদ্দেশ্য করে বলে। ইঙ্গিতটা বোঝে মোহনা। সন্ধে নামতেই এই অঞ্চলের মানুষজনের মুখ চোখ বদলাতে শুরু করে। সামনের লাইনটার দিকে তাকায় মোহনা। সকাল থেকে তেমন ভিড় ছিল না। এখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। যদিও এই বুথের জন্য তিনদিন বরাদ্দ। কিন্তু আজকের জন্য নির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত গ্রামবাসীদের কাজ শেষ করেই ফিরতে হবে।

পাশের ঘরে চিৎকার,গোলমাল,অসম্ভব কিছু একটা তুলকালাম শুরু হয়েছে। চেয়ার টেবিল আছড়ানোর শব্দ। মোহনা স্থির। বিপদ সামনে। পাশের আরএসবিওয়াই-এর ছেলেরা পাশের ঘরের তাদের সহকর্মীদের জন্য উদবিগ্ন হয়ে ওঠে। ছবি তুলছিল যে ছেলেটি সে পাশের ঘরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই গেটের কাছ থেকে সজোরে ধাক্কা। মুখ থুবড়ে পড়ে ছেলেটি। বাকি ছেলেগুলি উঠে দাঁড়িয়েছে। পড়ে যাওয়া ছেলেটিকে তুলতে যাওয়ার আগেই সামনের দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা লাইন ধাক্কা দিয়ে একদল গ্রামবাসী ঢুকে পড়ে। টেবিলের ওপর থেকে কম্পিউটার সহ যাবতীয় সরঞ্জাম ভাঙচুড় করতে থাকে। মোহনাকে ঘিরে দাঁড়ায় একদল গ্রামের মেয়ে।

তুমরা যা কিছু কইরতে চাহাও কর। রাঙ্গাদিদিমুনির দিইকে আগাইলবার চেইষ্টা কইরবা না মেয়েরা গোল করে ঘিরে রেখেছে মোহনাকে।

তুরা সইরবি কি না? উত্তেজিত গ্রামবাসীরা মেয়েদের উদ্দেশ্যে।

না। রাঙ্গা দিদিমুনি কিই করিইলছে যি?

য়া কে আর ওই ঘরে পঞ্চায়িতের আরেকটা ইস্টাফকে বেঁইধে দু ঘা লাগাইলে বিডিও, এসডিওর বাপ ছুইট্টে আইসবে, সর তুরা

না আগে আমাদিকে বেঁইন্ধে পিটাও। মরদ হইলছে সব। গ্রামের মেয়েদের সজোরে প্রতিবাদ।

পিছিয়ে যায় উত্তেজিত লোকগুলো। মোহনা দেখে আরএসবিওয়াই-এর ছেলেগুলির একটিও ঘরে নেই। এমনকি জিপি কর্মীটিও না।

তুমি ভয় কইরবা না রাঙ্গাদিদিমুনি। আমাদের জান থাইকতে তুমার কিছু হইলবে না মেয়েরা বলে। মোহনার ভয় করে না আর। বাথানডিহির বিপিএল তালিকা তৈরির সময় পাটকাঠির ঘরে লাগা আগুনে পুরো গ্রাম চোখের সামনে ভস্মীভুত হতে দেখেছে। ওই লেলিহান শিখা ঘিরে ধরেছিল মোহনাকে। সেদিনও গ্রামের মেয়েরা ওকে বাঁচায়। ওরা জান কবুল করে দেবে মোহনার জন্য,ও তা জানে। কিন্তু হঠাৎ কি এমন হল! দিব্বি সুন্দর কাজ এগোচ্ছিল। শুধু সকালে একেবারে ভিড় ছিল না। হঠাৎই ভিড়টা যেন অস্বাভাবিক তাড়াতাড়ি বেড়ে গেল। পাশের ঘরে কি চলছে ও বুঝতেই পারছে না। বৃদ্ধ অসুস্থ নির্বাহী সহায়কের কী পরিস্থিতি ওর জানার কোনো উপায় নেই।

মার কলার চেপে ধরেছিল মোহনা। চেয়ার টেবিল সব ভেঙে দিয়েছে ওরা নির্বাহী সহায়ক ভদ্রলোকটি কাঁপতে কাঁপতে মোহনার ঘরে এসে ঢোকেন। ওনাকে ধরে আছে জিপি কর্মী দাদাটি। বাইরে তান্ডব চলছে। গ্রামের নির্বাচিত মেবার আর বিরোধী দলের মেম্বারের মধ্যে বচসা বাধে নির্ধারিত তালিকা নিয়ে। সঠিক কোনো অভিযোগ নেই। প্ল্যান করে একটা ঝামেলার সৃষ্টি করে কাজটা পন্ড করা। সামনের ভোটে এর এফেক্ট পড়বে। সংক্ষেপে বলে জিপি কর্মীটি। রাজনীতি। রাজনীতির আসলে নির্দিষ্ট কোনো রঙ হয়না। বড় বেশি রকমের রঙিন রাজনীতি শব্দটা মোহনার কাছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে বিডিও অফিস থেকে কিছু আধিকারিক সহ পুলিশ এসে উপস্থিত হয়। উত্তেজিত জনগনের মধ্যে দিয়েই মোহনা সহ অন্যান্য স্টাফদের গাড়িতে নিয়ে তোলে। পুলিশ এবং কিছু আধিকারিক থেকে যান সমস্যা মেটানোর জন্য। মোহনা দের গাড়ি যে পথে এসেছিল সে পথ দিয়ে আর ফিরবে না। পুরো পথ না কি আগলে রেখেছে উত্তেজিত গ্রামবাসী। ফিরতে দেবেনা ওদের। ঘুর পথে ফিরতে হবে। মাঝের হাট হয়ে।

মাঝের হাট! চমকে বলে মোহনা।

যাবা না বলছিলা যিসেই তো যেছোই এত কিছুর মধ্যেও জিপি কর্মী দাদাটি হাসতে হাসতে বলে মোহনাকে। বিলটা তুমাকে টান দিছে মোহনা। উ বিলের টান বড়। চোরাপাঁক আছে কুনখানে। কতজন তলিয়ে গেইছে আবার হাসে জিপি কর্মীটি।

কোন বিলকালদিঘি? ড্রাইভারটি জিজ্ঞেস করে। তার মানে বেশ বিখ্যাত ওই দীঘি বা বিলটি এ অঞ্চলে। মোহনা বোঝে। নির্বাহী সহায়ক ময়ানুষটি একটু ধাতস্থ হয়েছেন। অভিজ্ঞতা তো কম নয়। পোড় খাওয়া লোক।

কি মোহনা জনগন স্বাস্থ জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজে উৎসাহ পাচ্ছো আর? একটু ব্যঙ্গ করেই জিজ্ঞাসা করলেন। জনস্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে মোহনার আবেগ আর আরএসবিওয়াই নিয়ে উচ্ছ্বাস একটু যেন বেশিই। কত কম খরছে চিকিৎসা পাবে মানুষগুলো। স্বাস্থ্যের অধিকার সবার। এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পঞ্চায়েতের নির্ধারিত কর্মসূচীর বাইরেও মোহনা জন উদ্যোগ গড়ে তোলার কাজ করে। সঙ্গে এখন ওর সাহায্যে আছে একটি দুটি এনজিও।

গাড়ি মাঝের হাটে ঢোকে। হুই যি ই ই ই... আঙুল তুলে দ্যাখায় জিপি কর্মীটি। এবড়ো খেবড়ো পথে এমনিতেই গাড়ি ধীরেই চলছিল। গ্রামের শীত। ঝুপ করে কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। একটু দূরেই সেই কালদিঘি নামের বিলটি। গাড়িটা দিঘিটির পাশ দিয়েই ধীরে ধীরে এগোয়। জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে মোহনা। এই দিঘিতে ভিড়েছিল চাঁদ বেনের বিপুল বানিজ্যতরী?

লঙ্গী আর পদ্মা দু এর সঙ্গেই সিধা যোগ ছিল এই বিলের জিপি কর্মীটি বলে।

তা ডুব দিয়ে নেবে না কি একবার মোহনাএই পৌষের শীতের সন্ধেতে মন্দ লাগবে না। কোনদিন লাশ হয়ে এরই জলে ভাসতে হবে আমাদের কে জানে নির্বাহী সহায়কের তির্যক ব্যঙ্গ আর ক্ষোভ।

 

কালদিঘি বিলটির উপর জমাট কুয়াশায় অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে। ভালো করে দ্যাখা যাচ্ছেনা দীঘিটি। কিন্তু অমোঘ কোনো আকর্ষণ যেন অনুভব করছে মোহনা।

দিদি তোমার ব্যাগে ফোন ভাইব্রেট করছে অনেকক্ষণ থেকে গাড়ির পিছনের দিকে বসা ছেলেগুলো ব্যাগ এগিয়ে দেয় মোহনাকে। হাত বাড়িয়ে নেয় মোহনা। ব্যাগ গাড়িতে রেখেই ও আরএসবিওয়াই-এর ক্যাম্পে ঢুকেছিল। ব্যাগ খোলে। মোবাইলে আলো জ্বলছে নিবছে। সুপ্রতিক ত্রিপাঠি। কেটে দেয় ফোনটা। একটা মেসেজ পাঠিয়ে দেয়। বাড়ি ফিরে ও ফোন করবে। এই ত্রিপাঠিকে ও ঘাড় ধরে নিয়ে আসবে ঠিক কালদিঘির ছবি আঁকাতে। লোকটা পদ্মার চরের ছবি এঁকে গেল একমাস ধরে। ওরই অফিসের সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করল অথচ একবারও দ্যাখা করল না। বলে কি না কাটিগঙ্গার ধারে দুর্গা বিসর্জনের ছবি এঁকে দেবে।

মোহনাদের গাড়ি কালদিঘি বিল ছাড়িয়ে মাঝের হাট পেরোয়। তার আগে জিপি কর্মীটিকে নামিয়ে দেয় নির্দিষ্ট জায়গায়।

বাড়িউলির সহিত দ্যাখা হল না তুমার বহিন। এত বলে তুমার কথা। বিল দ্যাখাতে লিয়ে যেতক বলতে বলতে নেমে যায় গাড়ি থেকে জিপি কর্মীটি।

সব তো

শীতের গাঢ় অন্ধকার চিরে গাড়ির লাইট এসে পড়ে মেইন রোডে। পাশে বসা নির্বাহী সহায়কটি ঝিমিয়ে পড়েছেন। মাঝে মাঝে বিডিও অফিস থেকে ফোন এলে চমকে উঠে জবাব করছেন। গাড়ির পিছনে বসা আরএসবিওয়াই-এর টিমের ছেলেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছে।

একটা ব্রিজ পেরোয় গাড়িটি। ম্যাডাম নীচ দিয়ে পদ্মার পানিআপনি আখেরিগঞ্জের পদ্মা এখনও দেখেননি? গাড়ির ড্রাইভারটি বলে মোহনাকে।

ব্রিজের নীচ দিয়ে পদ্মার জল বইছে। ছাড় পদ্মা। আসল পদ্মা পর্যন্ত পৌঁছতে না কি অনেকটা চর পেরোতে হয়। বিএসএফ ক্যাম্প। এদিক ওদিক নানান চর। তবে আখেরিগঞ্জের পদ্মার ভাঙনের ঘরছাড়াদের কাছে বর্ননা শুনেছে মোহনা। নদী একুল ভাঙে ওকুল গড়ে। এই তো নিয়ম।

দ্মার পানি ম্যাডাম,ভাঙন চাহেন তো ভাঙন,চর চাহেন তো চর। কুনটা লিবেন ম্যাডাম ড্রাইভারটি হাসতে হাসতে বলে।

দ্মা কতদূর?

হুইই দিকের ক্ষেতটা দেইখছেনউ ডা পেরোলেইছুটির দিন দিইখ্যে বুলেন। লিইয়ে যাব। ইদিকেই বাড়ি আমারভাঙনে ক্ষেত খামার লিল নদীডা। এখুন পরের গাড়ির ডিরাইভারি

গাড়ি মেইন রাস্তা ধরে হু হু করে ছুটে চলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিডিও অফিসে এসে পৌঁছয়। নির্বাহী সহায়ক আজকের কাজের রিপোর্ট জমা দিতে আর পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কি হল রমনাডিহির ইত্যাদি জানতে বিডিওর কাছে যাবেন। মোহনাকে ট্রেকার ধরে ফিরে যেতে বলে। মোড়ে নেমে যায় মোহনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেকার এসে পড়ে। বেশ রাত নেমে এসেছে। চেপে বেসে মোহনা। আখেরিগঞ্জের কাছাকাছি পঞ্চায়েত অফিস সহ অন্যান্য স্কুল ও অফিসের কিছু লোকজন আছেন ট্রেকারটায়।

ভাবলাম আজ আপনার আর আপনার এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্টের দম শেষ একজন সহযাত্রী বলেন। মানে খবর ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র। কাল আমরা ডেপুটেশন দিচ্ছি সাড়া জেলা জুড়ে পঞ্চায়েত কর্মচারীদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চলছে। আর এসবের জন্য দায়ী উর্ধতন কর্তৃপক্ষ এবং সরকার বেশ ভাষণ দেওয়ার ভঙ্গী। মানে কোনো এক কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা গোছের কেউ। আজকের ঘটনাটা একটা জোরালো ইস্যু হয়ে গেছে। প্রয়োজনে আমরা লাগাতার ডেপুটেশন দেব। একজন মহিলা কর্মচারী হিসেবে কিভাবে হ্যারাসড হয়েছেন এ বিষয়ে আপনাকে সোচ্চার হতে হবে দাবী মানতে হবে গোছের বক্তব্য।

মি হ্যারাসড হই নি তো সংক্ষিপ্ত জবাব মোহনার।

মানে আমরা যে শুনলাম

মাকে গ্রামের মেয়েরা রক্ষা করে। আমাদের সঙ্গের আরএসবিওয়াই-এর ছেলেগুলির ওপর খুব অত্যাচার চলেআর আমার নির্বাহী সহায়ক

ই ছেলেদের কথা ছাড়ুন। ওদের কোম্পানি বুঝে নেবে ওদের ব্যাপার। আমরা পঞ্চায়েত কর্মচারীদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে বলতে থাকে নেতা গোছে সহযাত্রীটি। মোহনার কানে ঢোকেনা কথাগুলো। আরএসবিওয়াই-এর টিমের ছেলেগুলো মারধোর খেল। সে বিষয়টা কোনো বিষয়ই নয়ওদের বিষয়টা ওদের কোম্পানি বুঝবেরাজনীতির রঙ আশ্চর্য রঙিন লাগে মোহনার কাছে। পদ্মার পানির রঙ কেমনগাড়ির ড্রাইভারটি বলছিল চর চাইলে চর ভাঙন চাইলে ভাঙনকি চায় মোহনা হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করছিল। কি চায় মোহনামোহনার দিকে বয়ে চলেছে মোহনা। উৎস থেকে মোহনার দিকে। কিন্তু এ ভয়ংকরী পদ্মার উৎস কোথাগঙ্গা ভেঙে ভাগ হল কবেব্রহ্মপুত্র এসে মিশলকরতোয়া এসে ঢেলে দিল বিপুল জলরাশি। তবে না পদ্মা ভয়ংকরী হল। কুশী নদী পূর্বগামিনী হল না। মিশল এসে গঙ্গায়। জলরাশি উপচে বইতে লাগল পদ্মা বেয়ে। তবে না পদ্মা ভয়ংকরী হল। নইলে তো শীর্ণকায়া বা প্রায় কায়াহীণা হয়ে থাকতে হে বিপুলা। হাসি পেয়ে মোহনার।

পনি হাসছেনআপনার কি মনে হচ্ছে এই সব প্রতিবাদ করা গুরুত্বহীন? গর্জে ওঠেন প্রায় নেতা সহযাত্রীটি। ট্রেকার স্ট্যান্ডে ঘ্যাঁচ করে এসে থামে ট্রেকার। সবাই হুড়মুড় করে নামে। মোহনা ক্লান্ত। ম্নান হাসে, না। প্রতিবাদ হওয়া দরকার। সবাই আক্রান্ত বলে রিক্সা স্ট্যান্ডের দিকে এগোয়। শীতের সন্ধে মানে যেন গভীর রাত। জিয়াগঞ্জ প্রায় শহর এলাকা। গঙ্গা দেখা যায় রিক্সায় ফিরতি পথে। এপার গঙ্গার পাড় ওপাড় পদ্মার পাড়। মাঝখান দিয়ে মোহনা বয়ে চলেছে।

মাঝের হাট। কালদিঘি। পদ্মার পানির ওপর দিয়ে ব্রীজ। ভাঙনচরঘুম জড়িয়ে আসছে চোখে মোহনার। নির্বাহী সহায়ক ফোনে জানিয়ে দিয়েছেন কাল রমনাডিহির কাজ বন্ধ রেখে বাথানডিহির কাজ শুরু করতে নির্দেশ দিয়েছেন বিডিও। সুপ্রতীক ত্রিপাঠিকে ফোন করা হল না আর। মেইল করে দেয় একটা। চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে আসে। বাথানডিহির তালিকা নিয়ে বসে। কিছু কাজ নিজের সুবিধের জন্য এগিয়ে রাখতে চায়। বাথানডিহি এমনিতেই ঝামেলাপ্রবণ এলাকা। আগুনে পুড়ে দহনের অভিজ্ঞতা আছে মোহনার। রাজনীতির রঙ হল আগুন। হঠাৎ মনে হল মোহনার।

কার জন্য কান্দ প্রিয়া সব মিছা মায়া… (বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ)। চাঁদবেনে বলে পুত্রহারা সনকাকে। পাপিষ্ঠা মনসা পাষাণ তার হিয়া একের পর এক সদাগর চন্দ্রবনিকের পুত্র কেড়ে নিলেও অচল অনড় অবিচল সে। পুরুষকারের প্রতীক সে। তার পুজো না পেলে মনসা দেব সমাজ বহির্ভুত থেকে যাবে। শিবকন্যা মনসাপদ্মাবতী মনসাজরৎকারু মুনি পত্নী মনসা দেবি পদমর্যাদা বহির্ভুতা। ব্রাত্যবর্গের দেবি সে। প্রজননের দেবি সে। কিন্তু চাঁদবেনে পুজো না করলে পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিতা হতে পারবে না।

জনম দুঃখিনী আমি দুঃখে গেল কাল।

যেই ডাল ধরি আমি ভাঙ্গে সেই ডাল।। (বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ)

মোক্ষম ঘুঁটি বেহুলা। অকুলে ভেলা ভাসাল বেহুলা। উৎস সন্ধানে বইল বেহুলা।

জাগ প্রভু কালিন্দী নিশাচরে।

ঘুচাও কপট নিদ্রা ভাসি সাগরে।।

মড়া প্রভু নহ রে তুমি গলার হার।। (নারায়ণ দেবের মনসামঙ্গল কাব্য)

মনে পড়ে মোহনার। নৃপেণ ভট্টাচার্য তাঁর ছাত্রদের বেদ পুরাণ ব্যাখ্যার সময় নানান প্রসঙ্গের অবতারনা করতেন। শিবপুরান প্রসঙ্গে মনসামঙ্গল কাব্য-এর বিভিন্ন দিক গুলো তুলে ধরতেন। নৃপেন ভটচায্যির এক মুগ্ধ ছাত্রী মোহনা। সপ্তর্ষির সঙ্গে প্রায়ই যেত তাঁর কাছে। বাথানডিহির তালিকা মেলাতে মেলাতে মনে ভাসে এসব কথা। মাঝের হাটের কালদিঘির পাশ দিয়ে ফিরেছে আজ। চন্দ্রধর বনিক কামরূপ থেকে বানিজ্যতরী নিয়ে রওনা হয়েছিলেন। ব্রহ্মপুত্র থেকে পদ্মা বেয়ে ত্রিবেণি পেরিয়ে মুর্শিদাবাদের রাঙামাটিও পৌঁছেছিলেন। জলঙ্গী বেয়ে যাওয়ার সময় থেমেছিলেন মাঝের হাটের কালদিঘি বিলটিতেও। তখন ওই বিলটি আসলে পদ্মা আর জলঙ্গীর সঙ্গে যুক্ত জলস্রোত। কিন্তু এত পরিক্রমা কেনসাগর পথে পাড়ি দিতে বিপুলা পদ্মা তখনো কি বিপুলা ভয়ংকরী হয়ে ওঠেনি। পদ্মা তখনও কি নাব্য নয়শীর্ণকায়াগঙ্গা থেকে উপচে যাওয়া সামান্য স্রোত মাত্র?

সুলতান হুসেন শাহ নৃপতি তিলক (বিজয়গুপ্ত) বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্য লেখার সময়কাল এতে স্পষ্ট। কানা হরিদাসে রচনাকান জানা যায় না। কিন্তু মনসামঙ্গল কাব্যের রচনাকালের পদ্মা পরিপুষ্ট বেগবতী। অথচ শিবপুরাণ-এর সময় অবধিও সম্ভবত বিপুলা পদ্মা ক্ষীনকায়া। হি (. বুকানন হ্যামিল্টন) অলসো সাজেস্টস দ্যাট ইট মে হ্যাভ বিন ত্য গ্রেট ইনক্রিজ ইন ইটস ওয়াটার্স কসড বাই সাবসিক্যুয়েন্ট উনিয়ন অব দিজ রিভার্স উইথ দ্য গ্যাঞ্জেস, দ্যাট কসড দিস ল্যাটার রিভার (দ্য গ্যাঞ্জেস) টু ডেসার্ট দ্য ন্যারো চ্যানেল অব ভাগিরথি অ্যান্ড ব্রেজ ফ্রম ইটসেলফ দ্য নিউ অ্যান্ড ওয়াইডার বেড অব দ্য পডমা উইদিন হুইচ ইট ইজ কনটেইন্ড (ডব্লু ডব্লু হান্টার). হান্টার সাহেব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কুশী নদী আর মহানন্দা নদীর মিলিত জলধারায় পুষ্ট হয়ে পদ্মার বিপুলা স্রোতের সৃষ্টি। ভাগীরথী ক্ষীণকায়া হতে থাকে। বুকে পলি জমতে থাকে। নাব্যতা হারাতে থাকে। ওদিকে ব্রহ্মপুত্র করতোয়ার সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মায় জলরাশি বৃদ্ধি করতে থাকে। দ্য কোর্স অব ব্রহ্মপুত্র অ্যাপিয়ার্স ইন আর্লি ডেইজ টু হ্যাভ রান ফর টু দ্য ইস্ট অব দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব ময়মনসিং (ডব্লু ডব্লু হান্টার). সুতরাং হে গর্বিতা স্বাস্থ্যবতী পদ্মাপদ্মাবতীপদুমাপঁউয়া তোমার অস্বিত্বের চরম সংকট ছিল এক কালে। আসামের ছয়গাঁও থেকে বনিক চন্দ্রধরের সমুদ্র অভিমুখে যে বানিজ্য যাত্রার পথ তা শিবপুরাণ রচনাকালে বর্নিত তখন পদ্মার অস্তিত্বের সংকট। পদ্মাবতী দেবী মনসারও একই অস্তিত্বের সংকট। আশ্চর্য চমকপ্রদ এই কাব্য এবং তার চরিত্রগুলি মোহনার কাছে। বেহুলা ভেলা ভাসালো উৎসমুখের দিকে। চমক এখানেও। একটি প্রভাবশালী পুরুষচরিত্র পারে অন্ত্যজনের দেবীকে দেবলোকে পদ মর্যাদা পাইয়ে দিয়ে। কিন্তু আসলে তো আরেকটি নারী চরিত্র বেহুলাকে প্রয়োজন হল পদ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে আরেকটি নারীকে। ভাল নাচে বেহুলা নাচনী (কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ)।

একদৃষ্টে দেবগণ সবে করে নিরীক্ষণ

বেহুলা নাচেন সুরপুরে(কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ)

রাজনীতির রঙ আগুন। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে মোহনার। পরদিন বাথানডিহি

(ক্রমশ…)

 

 
 
top