মোহনা

 

একাদশতম! মোহনা বারবার দেখে ভালো করে। সাব সেন্টার থেকে পাঠানো লাল রঙ এর জন্ম নথিভুক্ত করণের রিপোর্ট ফর্মে লেখা। বাচ্চাটি তার মায়ের একাদশতম সন্তান।

গারোটা বাচ্চা! মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় মোহনার। রিপোর্ট ফর্মের দিকে তাকিয়ে আছে মোহনা।

? তুমার কি রাঙ্গা দিদিমুনি? আমি নিছি আমার বাচ্চা, জন্ম সাট্টিফিট নিইতে এনু। তুমার কাজ তুমি কইরে দাও ঝাঁঝিয়ে ওঠে টেবিলের ওপ্রান্তে দাঁড়ানো মহিলা।

মুখ তোলে মোহনা। জাঁদরেল চেহারার এক গ্রাম্য মহিলা। বয়েস বোঝার উপায় নেই। দেখে মাঝ বয়েসি বলে বোধ হচ্ছে। একাদশতম বাচ্চার জন্ম সার্টিফিকেট নিতে এসেছে। তা ঠিক মোহনা উত্তর করে। নিয়ম মাফিক জন্ম নথিভুক্ত করে সার্টিফিকেট ইস্যু করে মোহনা। জিজ্ঞেস করে, তোমার স্বামী কি করেন?

জালসা

জালসা? সেটা কী?

শুনো নাই তুমি? গিরামে যি জালসা বসে, মেলা মানুষ আসে শুইনতে

আচ্ছা জলসা ধরনের কিছু হবে নিশ্চয়ই, মোহনা ভাবে।

আমি আবার আইসব, নাতিনের সাট্টিফিট নিইতে

অ্যাঁ? মোহনা রীতিমত ঘাবড়ে গেছে। মহিলা বলে কি! নিজের একাদশতম বাচ্চার সার্টিফিকেট নিয়ে আবার নাতনিরও নিতে আসবে!

? মেইজ মেইয়েডার বাচ্চার সাট্টিফিট নিইতে আসা হয়নি

দিন হল নাতনির বয়েস?

মাস

লেট রেজিস্ট্রেশন হবে তো তাহলে। আলাদা ফরম ফিল আপ করতে হবে

কী বুইলছ? বুঝিয়ে বল? সাট্টিফিট দিবা না নাতিনের?

হা দেব না কেন? অন্য কিছু নিয়ম আছে। তোমার গ্রামের মেম্বারের কাছে জেনে নিও

আসি দিদিমুনি, মানুষডা জালসায় যাইলবে

ঘাড় নাড়ে মোহনা। চলে যায় একাদশতম সন্তানের জননী। এত যে স্বাস্থ্য সচেতনতা,জন্ম নিয়ন্ত্রন কর্মসূচি, সব কিছুর এই পরিনতি? ভাবে মোহনা।

কলকল করতে করতে দু তিন জন স্বাস্থ্যকর্মি ঘরে ঢোকে, মোহনাদি খুব ঝামেলা গ্রামে, আমরা কাজ করতে পারছি না।

স আগে। বল কী ঝামেলা

ন্ম নিয়ন্ত্রনের বিষয়ে কিছুতেই বোঝাতে পারছিনা, গ্রামের লোকজন আমাদের যা তা বলছে

কোন কোন সংসদে অসুবিধে হচ্ছে, একটা লিস্ট করে দিয়ে যাও, মেম্বারদের সঙ্গে বসতে হবে

গোলাপি আর বেগুনি শাড়ি পড়া স্বাস্থ্যকর্মিরা একটা লিস্ট করে দেয়।

চ্ছা এইসব গ্রামে জলসার আসরও বসে? মোহনার কৌতুহল।

লসা? এখানেস্বাস্থ্যকর্মিরা হতবাক

হ্যাঁ, এক মহিলা জন্ম সার্টিফিকেট নিতে এসে বলল ওনার হাসব্যান্ড না কি জলসা করেন

কিছুক্ষণ থেমে হো হো করে হেসে ওঠে মেয়েগুলো। মোহনাদি ওটা জালসা। জলসা নয়। ইসলামধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় গানের আসর। হিন্দুদের যেমন কীর্তন, অনেকটা সেরকমই

আচ্ছা

মোহনা বোঝে এতক্ষণে। স্বাস্থ্যকর্মিরা আবার কলকল করতে করতে চলে যায়। জন্ম নিয়ন্ত্রন বিষয়ে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া দরকার। শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য এবং নারী ও শিশু কল্যান উপসমিতির সঞ্চালকদের জানাতে হবে বিষয়টা। কিন্তু কাজটা এত সহজ নয়। নানান বাধা আসবে সামনে। মোহনা সরকারি কর্মসূচি ও তার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে গেছে এতদিনে। রাজনীতি জড়িয়ে আছে তুমুল ভাবে। যত জনসংখ্যা তত ভোট। মেম্বাররা ভোট বাক্সের দিকে তাকিয়ে যা কাজ করার করবে। জন্ম নিয়ন্ত্রনে উতসাহ না দেখানোই খুব স্বাভাবিক। নিজস্ব উদ্যোগে গ্রামের মেয়েদের বোঝাতে হবে। কর্মরত এনজিও আর গোষ্ঠির মেয়েদের নিয়ে মোহনা নিজেই জন্ম নিয়ন্ত্রন, স্বাস্থ্য সচেতন করার বিষয়ে উদ্যোগি হবে। প্রতিটি সংসদ ওকে ঘুরতে হবে এর জন্য।

মি একটা আস্ত ফুটবল টিম বানাবো, দেখো?

মানেপ্রতি বছর একটা করে বাচ্চার জন্ম দিবি ঠিক করেছিস?

হ্যাঁ।

ন্য লোক খোঁজ মোহনা, আমি মরে যাব। সপ্তর্ষির করুণ জবাব।

মানে? কি জঘন্য কথা, তুমি একথা বলতে পারলে? আমি ফুটবল টিম বানাবোই মোহনার সাফ জবাব।

বেবি কনসিভ করার প্রসঙ্গ উঠলেই মজা করে বলত মোহনা সপ্তর্ষিকে। একাদশতম বাচ্চার জন্মদাত্রী মার নাম নথিভুক্ত করে মোহনা। ওকে জন্ম নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির জন্য সক্রিয় হতে হবে।

সুমনাদি আমি বাচ্চা অ্যাডাপ্ট করব

সে কী মোহনা? তুমি একা

তো? আমি একলা মা হতে ইচ্ছুক

মোহনা, এটা খুব ভালো ভাবনা। কিন্তু অনেকটা দায়িত্ব, তুমি একা মোহনা

সুমনাদি মাকে বোঝাও। মা কিছুতেই রাজী না

খুব স্বাভাবিক। আমিও রাজী না

তুমিও? কেন?

পুরুষ সঙ্গী খুঁজে নাও মোহনা

না।

কে?

নে

দুজনেই নীরব হয়। সুমনা আর সপ্তর্ষির অসম্ভব ভালো বন্ধুত্ব ছিলসপ্তর্ষি চলে যাওয়ার পর মানসিকভাবে সুমনা ছোট্ট বোনটাকে চুড়ান্ত সামলেছে। চাকরি নিয়ে বাড়ি ছেড়ে দূরে চলে আসার পর এই প্রথম সুমনা এল মোহনার সঙ্গে দেখা করতে। খুব শিগগির সুমনার ডিভোর্স হয়ে যাবে, ওর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে শুরু করবে ওরা।

তুমি কি দিল্লীতেই থাকবে এর পর থেকে?

হ্যাঁ। ছেলের পড়াশোনা ওখানেই

তুমি ভালো থেকো সুমনাদি

তোমারও ভালো হোক মোহনা, নইলে আমরা কেউ স্বস্তি পাব না ম্লান হাসে মোহনা। ঘুমিয়ে পড় সুমনাদি। কাল ভোরের ট্রেন ধরবে

সারাদিন রাত ধরে বৃষ্টি হয়ে চলেছে অঝোরে। ভরা বর্ষা। রোববার। বাড়িতে অফিসের ফাইল নিয়ে মোহনা বসে আছে সকাল থেকে। ইন্দিরা আবাস যোজনার ঘরের তালিকা। আগামী দুদিনের মধ্যে বাহাত্তরটা ঘর ইনকোয়ারি করে রিপোর্ট জমা করতে হবে ওকে। দুদিনে বাহাত্তরটা ঘরের এনকোয়ারি ও করবে কেমন করে। বিডিওর করুণ অবস্থা। জেলা থেকে চাপ। পঞ্চায়েতের অন্য কর্মচারিদের আরও নানান গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের কাজের দায়িত্ব দিতে হয়েছে। কিছু কর্মচারি-সংগঠন এর মধ্যে ঘন ঘন ডেপুটেশন দিতে ব্যস্ত। কাজ বয়কট করে মিটিং মিছিল চলছে লাগাতার। নিরুপায় চাপ মোহনার ওপর।

বাহাত্তরটা ঘরের এনকোয়ারি দুদিনে স্যার?

পনি তাহলে বলে দিন যে কাজটা পারবেন না বিডিওর নিরুত্তাপ ডিপ্লোম্যাটিক উত্তর।

কাজে হাত না দিয়ে বলি কি করে কাজটা পারব নামোহনার নিরুত্তাপ উত্তর।

লেগে পড়ুন, পঞ্চায়েতটা ঘুরে দেখাও হবে আপনার

হ্যাঁ।

সংশ্লিষ্ট সংসদ গুলোর মেম্বারদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে নেয় কিভাবে কোন গ্রামে কখন যাবে মোহনা। ইন্দিরা আবাস যোজনার ঘরের প্রথম অধিকার মেয়েদের। কাজটা পরিশ্রমের হলেও খুব ভালো লাগার কাজ মোহনার। গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে দেখা করবে ও। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতন করে তোলার আর জন্ম নিয়ন্ত্রনের কথা বোঝানোরও সুযোগ পাবে। উপভোক্তাদের নামের লিস্ট তৈরি করে সংসদ অনুযায়ী ভাগ করে রাখছে মোহনা।

জ কি নাওয়া খাওয়া মাথায় তুলেছ মোহনা দিদিভাই? রান্না, ঘরের কাজ, বাজার হাট, এবং মোহনার যাবতীয় বিষয়ে তদারকির জন্য বহাল মিনু মাসি ঝাঁঝিয়ে ওঠে।

হ মিনু মাসি জ্বালিও না, আজ রোববার

রোববার বলে কি মাথা কিনে নিয়েছ? এত সব অনিয়ম দুচক্ষে দেখতে পারছি না বাপু, সময় মত নাওয়া খাওয়া করে যা করার কর, আমার তো বাড়ি ঘরদোর ছেলেপুলে আছে না কি? ঝাঁঝ মিনু মাসির গলায়।

তোমার কটা ছেলেমেয়ে মাসি? ফাইল থেকে মুখ না তুলেই জিজ্ঞেস করে মোহনা।

টা

অ্যাঁ? ফাইল থেকে মুখ তুলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে মোহনা, টা!!

হ্যাঁ, মা বিষহরির কৃপায়

বিষহরির কৃপায়?

হ্যাঁ। নাও ওঠো এবার। আজ আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, নাগমাতার পুজোর দিন আজ

নসা পুজো?

বার উপোস কাপাস করতে পারলাম না আমি, গায়ে পালছি। বড় মেয়েটা ব্রত রেখেছে। রাতে মনসা গান আছে, কাল সকালে এসে তোমাকে একটা তাবিজ পরিয়ে দেব দিদিভাই, মস্ত ওঝা আসবেন আজ, বড় গুনিন, তুমি কোন আদারে বাদারে ঘুরে বেড়াও বাপু, ভয় করে, মায়ের কোল ছেড়ে এসেছ

থাক মিনু মাসি তোমাকে আর তাবিজ আনতে হবে না, কাল সকালে এসে কাজ নেই তোমার। খুব সকালে বেরিয়ে যেতে হবে আমাকে, একেবারে রাতে এস

মিনু মাসি চলে যায় অঝোর বৃষ্টির মধ্যে। এই ভরা বর্ষাতেই প্রজনন উর্বরতার দেবি নাগমাতা বিষহরি মনসার পুজো হয়, মনসামঙ্গল পালাগান হয়:

তবে সে মনসা তারে হইল পরিতোষ।

পুজা লইতে উত্তরিলা ক্ষমি সর্বদোষ ।।

নিজরূপে অবতার হরের কুমারী।

যেই পাদপদ্ম ভাবে চাঁদ অধিকারী।।

মাঝের হাটউই যিখেনে বড় বিলটা আছে। যিখেনে হেঁদুদের কোন রাজার নৌকা ভিড়েছিইল? সিখেনে গ্রাম্য বধূটির কথা মনে পড়ে মোহনার। প্রথম যখন কাজে জয়েন করেছিল তখনকার কথা। চাঁদসদাগর তাঁর সপ্তডিঙ্গা মধুকর নিয়ে এ পথ দিয়ে গিয়েছিলেন এমনই গল্প প্রচলিত এখানে। ওই দিঘির সঙ্গে মূল জলঙ্গী নদীর যোগ ছিল কোনো এক যুগে, আমার বাড়ি ওই মাঝের হাট গ্রামেই। বলেছিল গ্রাম পঞ্চায়েত কর্মিটি। মনে পড়ে মোহনার। ইন্দিরা আবাস যোজনার উপভোক্তাদের তালিকায় দ্রুত চোখ বোলাতে থাকে—মাঝের হাট। তিনটে উপভোক্তা সেখানে। সহকর্মিটিকে সঙ্গে নেবে ও।

মনসা বলে বেনেশুন তুমি একমনে

আমি দেবী জয় বিষহরি।

মহেশ আপন বাপঅনুকূল যত সাপ

ইহার ভরষা মাত্র করি।।

ভুজঙ্গ জননী কয়আমার উচিত নয়

ভুজঙ্গ ছাড়িয়া লইতে পূজা।

তবে ঘুচে মনস্তাপআগে পিছে যত সাপ

যদি তুমি সব কর পূজা।।

চাঁদ সদাগরের সপ্তডিঙ্গা মাঝের হাট গ্রামের কোন খালে এসে ভিড়েছিল ভাবতেই অবাক লাগে মোহনার। এমনিতেই মোহনা থৈ পায় না কামরূপ থেকে কোন নদীপথে চাঁদ সদাগর বঙ্গদেশে প্রবেশ করল। ঠিক কোন পথ ধরে। চম্পক নগর মানে আসামের ব্রহ্মপুত্রের ধারে গুয়াহাটি থেকে ২৪,৮ কিলোমিটার দূরে ছয়গাঁও এলাকার বাসিন্দা লোকটা। তার সপ্তডিঙ্গা মধুকর নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সপ্তগ্রাম, ত্রিবেনী সঙ্গম হয়ে সমুদ্র যাত্রা করেছে চাঁদ সদাগর। মনসামঙ্গল কাব্যের মূল পটভূমি কখনই বঙ্গদেশ নয়। অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের অঙ্গদেশে। অথচ এপার ওপার দুই বাংলা জুড়ে মনসামঙ্গল কাব্যের প্রসার মনসা পুজোর প্রচার। চাঁদসদাগরের সমুদ্র যাত্রাই এর মূল কারণ। ঠিক কোন জলপথে লোকটা বানিজ্যতরী ভাসিয়েছিল তা জানার অদম্য কৌতুহল মোহনার। অবশ্যই ব্রহ্মপুত্র থেকে শুরু করে ওপার বাংলার পদ্মা হয়ে এপার বাংলার গঙ্গাপথে যাত্রা করেছিলেন। একগুঁয়ে একটা লোক, জেদি, পরিশ্রমী, আত্ম মর্যাদায় পরিপূর্ণ। খুব প্রিয় চরিত্র মোহনার। অপরদিকে প্রজনন ও উর্বরতার দেবী মনসা। হরের কুমারী হওয়া সত্ত্বেও দেবী মর্যাদাহীন । স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে তাকে পুজো পেতে হয়েছিল চম্পক নগরের চাঁদ বনিকের। আর সেই পুজো পেতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে সে আরেকটি নারীকে—বেহুলা নাচনী’ তথা উষা গল্পটা মনে রেখ মোহনা—বানাসুরের মেয়ে উষার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শ্রীকৃষ্ণর নাতির, আর বানাসুর শিবের তান্ডব নাচের সহায়ক বাদ্যযন্ত্রী নৃপেন ভট্টাচার্য বেদ পুরাণ আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন মোহনাকে :

নৃত্যগীতে মন মোহেযতেক দেবতা কহে

ভাল নাচে বেহুলা নাচনী।।

মনে একটা খাল। তার ওপর অসম্ভব ভাঙ্গাচোরা বহু পুরোন নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। সামনের গ্রামে ঢোকার এই একমাত্র পথ। ইন্দিরা আবাস যোজনার কয়েকটি উপভোক্তার বাস যেখানে। থমকে দাঁড়িয়ে থাকে মোহনা। এই ভয়ানক সাঁকো ও পেরোবে কী করে? গ্রামের লোকজনই বেশ সাবধানে ভয়ে ভয়ে পার হচ্ছে। তারা নিরুপায়। যথেষ্ট দুলছে সাঁকোটা। দেখে মনে হচ্ছে এই বুঝি ভেঙ্গে পড়বে। নীচে গভীর খাল। বর্ষার জলে ভরে উঠেছে।

সেন মোহনাদি, সাঁকোটা পার হতে হবে এই সংসদের মেম্বার আনোয়ার হোসেন হাত নেড়ে ডাকে মোহনাকে।

র কোনও পথ নেই আনোয়ার ভাই? মোহনার আতংকিত স্বর।

মোহনার ভয় পাওয়া দেখে হেসে ফেলে মেম্বার সহ আসে পাশে দাঁড়ানো গ্রামবাসী।

হর থিইক্যে এই গিরাম দেইশ্যে এইয়েছেন দিদিমুনি, ভাঙ্গা সাঁকো দেইখ্যে ভয় খাইলছেন যি গিরামের উন্নতি কইরবেন কি কর‌্যে? এক গ্রামবাসী ব্যঙ্গ করে মোহনাকে।

নোয়ার ভাই এই খালটাই কি বাথানডিহির খালের সঙ্গে যুক্ত?

হ্যাঁ মোহনাদি, সোজা বাথানডিহি হয়ে এসেছ। জলঙ্গী আর পদ্মার সঙ্গে যোগ

র্ষার পানি রে বিটি, পদ্মা পাড়ের গিরাম গুলোন ভাসতে লেগেইলছে, এই খালডা না থাকলি আমাদের গিরামও ভাসতুক, চল রি বিটি পার হই এক বৃদ্ধা হত দরিদ্র গ্রামবাসী বলে।

এগোয় মোহনা। পা রাখে সাঁকোতে। অসম্ভব দুলছে।

মি আছি মোহনাদি, আপনার থেকেও আপনাকে নিয়ে ভয় আমার অনেক বেশি, দায়িত্ব নিয়ে আপনাকে নিয়ে এসেছি বলে মেম্বার আনোয়ার হোসেন। মুখের দিকে তাকায় মোহনা। নিজের দাদার মতো লাগে যেন। সব স্নেহশীল দাদাদের মুখ বোধ হয় একই রকম হয়। এই ভাঙ্গাচোরা সাঁকোটা ওকে পেরোতেই হবে। ওপারে কিছু উদগ্রীব মুখ অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। ইন্দিরা আবাস যোজনার ঘরের প্রথম দাবিদার পরিবারের মহিলা সদস্য। এই গ্রাম সেরে ওকে মাঝের হাট গ্রামে যেতে হবে। যে গ্রামের না কি চাঁদ সদাগরের নৌকো ভিড়েছিল। ধীরে ধীরে এগোয় মোহনা। সাঁকোটার অনেক যায়গাতেই বড় বড় ফাঁক হয়ে গেছে, পচা বাঁশ খসে পড়ে গেছে। একবার পা ফস্কে গেলে সর্বনাশ। সাঁকোটার মাঝামাঝি এসে আর চলতে পারছে না মোহনা। ভয়ানক দুলছে। ও পা ফেলতে পারছে না।

হাতটা ধরুন আনোয়ার ভাই, খুব ভয় করছে আমার

কোনও ভয় নেই বহিন, সাঁকোটা পেরোতে পারলে দেখবেন ফেরার সময় আর ভয় করছে না। মোহনার হাত ধরে গ্রামের মেম্বার পরম স্নেহে।

নীচে বয়ে চলেছে ভরা বর্ষায় ভরন্ত খাল। সাঁকোটা পেরোয় মোহনা। পিছন ফিরে দেখে। ও পেরিয়ে এসেছে।

(ক্রমশ…)

 
 
top