মোহনা

 

বিনিদি তুমি এখানে?

সামনে রাহি দাঁড়িয়ে। গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রতি মাসের নির্ধারিত সভার দিন। সমস্ত সদস্য, প্রধান, উপপ্রধান সহ বিভিন্ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলির স্বাস্থ্যকর্মী, আইসিডিএস ওয়ার্কার সহ সকলে উপস্থিত। বিশেষ তোড়জোড়। নানান খাতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার থেকে বরাদ্দ অর্থ অ্যানুয়্যাল অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী কীভাবে কোন সংসদে ব্যয় হবে সে সম্পর্কে আলাপ আলোচনা ও আরও নানান কর্মসূচী নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন হবে। জনস্বাস্থ্য সচেতনতা সম্পর্কে বিভিন্ন সংসদে প্রচারের জন্য বক্তব্যগুলো চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল মোহনা। জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বিশেষ কর্মসূচী গ্রহনের জন্য সংসদ মেম্বার দের জানাতে হবে। জন্ম নিয়ন্ত্রনের জন্য প্রচারের সময় স্বাস্থ্যকর্মীরা বিভিন্ন গ্রামে জনরোষের সম্মুখীন হচ্ছে, ওদের কাজে সহায়তার জন্য এই মান্থলি মিটিং এ কর্মসূচী গ্রহনের জন্য আলোচনা করতে হবে। আয়লা কবলিত এলাকায় ত্রান বিলি নিয়ে নানা ঝামেলা চলছে প্রতিটি গ্রামে। প্রচুর ঘর ভেঙ্গে গেছে। বেশ কিছু ঘর ভাঙার এনকোয়ারির ভার ছিল মোহনার , সে সম্পর্কে রিপোর্ট পেশ ইত্যাদি নানান কর্মসূচীর লিস্ট হাতে জেনারেল মিটিং হলের দিকে যাওয়ার মাঝে কড়িডোরে ব্যস্ত মোহনার সামনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে রাহি।

রাহি তুই এখানে?

মি তো এই এলাকায় কাজ করছি কিছুদিন হল

কী কাজ?

একটা এনজিও থেকে কাজ করছে রাহি। কাজ এইডস সহ নানান যৌন রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তোলা। কারণ বিপুল পরিমানে লোকজন বাইরে রাজমিস্ত্রী বা অন্যান্য কাজে চলে যায়। সঙ্গে করে বয়ে আনে নানান যৌন ব্যাধি। কিছুদিন আগেই যক্ষ্মার একটি পেশেন্ট পাওয়া গেছে একটি সংসদে রিপোর্ট এসেছিল মোহনার কাছে। সেই পেশেন্টও বাইরে কাজ করতে গিয়ে রোগগ্রস্থ হয়ে আসে। বিভিন্ন যৌন রোগও এভাবেই ঢুকতে শুরু করেছে সে রিপোর্টও পেয়েছে মোহনা। কিন্তু জনস্বাস্থ্য সচেতনতার কাজ ক্রমাগত বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের নানান অসুবিধের সামনে পড়তে হচ্ছে।

মাদের এনজিও থেকে বিভিন্ন পঞ্চায়েতে যৌন রোগ সম্পর্কে সচেতন করার জন্য কাজ করছে বিনিদি

খুব ভালো হল রে রাহি, একসঙ্গে অনেকটা কাজ করা যাবে, আজকের মিটিং এ তোদের এনজি- কর্মসূচী জানিয়ে দিলে আমার কাজেরও অনেকটাই সুবিধে হবে

কিন্তু বিনিদি শহর ছেড়ে, মা-বাবা আত্মীয় ছেড়ে, পরিচিত সকলকে ছেড়ে তুমি এত দূরে গন্ড গ্রামে চলে এসেছ কেন?

তুই এসেছিস কেন?

মার কথা ছাড়, একটা কাজের দরকার ছিল বিনিদি। তাই। মা আর নেই, বাবা দিদির কাছে থাকে। আমার যেকোনো কাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়া দরকার ছিল

পারমিতা মাসি নেই?

না। সপ্তর্ষিদার ঘটনার একবছর পরেই মা চলে গেছে, হঠাত হার্ট অ্যাটাক। তোমার মনে আছে বিনিদি তুমি আর সপ্তর্ষিদার সঙ্গে শেষ দেখা হল আমাদের সেই দুর্গা পুজোয় সন্ধিপুজোর আরতির সময়?

হ্যাঁ, মনে আছে

ওদের সঙ্গে দেখা দেখা হয়েছিল কাশিমবাজারের আরেক রাজা কমলাকান্ত রায়ের রাজবাড়ীর দুর্গা মণ্ডপে। পারমিতা মাসি মোহনার মায়ের ছোটবেলার বন্ধু। এক স্কুল এক কলেজে মোহনার মা আর রাকা রাহির মায়ের পড়াশোনা। বাপ গড়নি মেয়েরে তোর চিত্রা, খুব সুখী হবে দেখিস। মোহনাকে দেখলেই জড়িয়ে ধরে আদর করে বলত পারমিতা মাসি। পারমিতা মাসিও স্কুল টিচার , রাজা মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর অনুদানে নির্মিত কোনো এক স্কুলে পড়াত। রাকা, রাহি, মোহনার থেকে অল্প কয়েক বছরের ছোট।রাকা রাহি পারমিতা মাসির আগের স্বামীর সন্তান। খুব অল্প বয়েসে রাকা রাহির জন্মদাতা বাবা মারা যান। পরবর্তীকালে আবার বিবাহ হয় পারমিতা মাসির। দ্বিতীয় স্বামী হয়ে ওঠেন রাকা রাহির আসল পিতা। রাকা রাহির কখনো মনে হয়নি এই পিতা তাদের জন্মদাতা পিতা নন। সব মনে পড়ে মোহনার। কাশিমবাজার, কাটিগঙ্গা আর তার পাশে নীলমাঠ। যা এক কালে বন্দর কাশিমবাজারের জাহাজ ঘাটা ছিল। নীলচাষ হয়নি কখনো তবু পরবর্তীকালে লোকমুখে নাম হয় নীলমাঠ। আসলে পাশেই ছিল নীলকর সাহেবদের কুঠি। রাকা রাহি মোহনা ওই নীলমাঠে অনেক ছোটতে একসঙ্গে দৌড়ঝাঁপ করে খেলত। ওয়ারেন হেস্টিংস এর স্ত্রী আর কন্যার সমাধি সহ অন্যান্য কবর গুলোর আড়ালে লুকিয়ে লুকোচুরি খেলা ছিল ওদের। মনে পড়ে মোহনার।

জিনারেল মিটিন শুরু হইলছে বিটি, সেকেটারি বুলল তুমাদের তাড়াতাড়ি হলে যেতে। জুব্বান চাচা এসে তাড়া লাগায়।

ল রাহি

ফাইল পত্র নিয়ে জেনারেল মিটিং রুমে হাজির হয় ওরা। হল কানায় কানায় পূর্ণ। সমস্ত উন্নয়ন বিষয়ক আলোচনার পর, বিভিন্ন সংসদের অভাব অভিযোগ নিয়ে আলাপ আলোচনার পর মোহনার জনস্বাস্থ্য বিষয়ে বক্তব্য পেশ। জন্ম নিয়ন্ত্রনের বিষয়ে উদ্যোগী হতে অনুরোধ করে সব সংসদের মেম্বারদের। যদিও মোহনা জানে উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতার সব কাজ সামনের পঞ্চায়েত ভোটের ভোট ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে কার্যকরী হবে। মোহনার বক্তব্যের শেষে যৌন রোগ প্রতিরোধের জন্য বক্তব্য রাখে রাহি। বিশেষ সচেতন হতে হবে গ্রামের মেয়েদের, এ বিষয়ে বিস্তারিত ডোর টু ডোর ভিসিট করবে রাহি সহ ওদের এনজিও- অন্যান্য সদস্যরা, রাহি জানায়। মিটিং শেষ ঘোষনা করার আগে একটি বিশেষ সরকারী নির্দেশনামা পড়ে শোনান। নতুন এক কর্মসূচী আসতে চলেছে আরএসবিওয়াই,রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা যোজনা। মোহনার সামনে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে গ্রামবাসীর উন্নয়নের বিশাল কর্মসূচী।

র আগে কর্নসুবর্ণতে কাজ করছিলাম বিনিদি

র্নসুবর্ণ? থমকে দাঁড়ায় মোহনা

শাংকর রাজধানী, গৌড়ের স্বাধীন রাজা

হ্যাঁ, পড়েছিলাম ইতিহাসে। কী সব খোঁড়াখুঁড়ি চলছিল, জানো বিনিদি। মাঝে মাঝে নানান লোকজনের ভিড় হত। হঠাৎ হঠাৎ কোথাও থেকে পুরোনো যুগের হয়ত কিছু উঠে আসে খোঁড়াখুঁড়ি করতে করতে

মিটিংয়ের হলঘর থেকে বেরিয়ে অফিসে নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে কথা চলতে থাকে রাহির সঙ্গে মোহনার। কর্নসুবর্ণ। শব্দটা আরেকবার অনুচ্চস্বরে উচ্চারন করে মোহনা। একটুকরো কালো মেঘ ধেয়ে আসছে, সব তছনছ হবে। যাও হে যুবুতী মোহনার দিকে যাও। এই অমোঘ কঠিন উচ্চারণ করে দীর্ঘদেহী কুটীরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মনে পড়ল মোহনার। সপ্তর্ষি সেদিন গৌড়ের রাজা শশাংকর ওপর পড়াশোনা করতে ব্যস্ত, এক ডকুমেন্টারি তৈরীর কাজে ব্যস্ত। পুরোদমে খনন কার্য চলছিল তখন কর্নসুবর্ণতে। বিশেষ কিছু নতুন তথ্য এবং একটি অদ্ভুত নকশা কাটা ভাঙ্গা কলসীর সন্ধান মিলেছে শুনে তড়িঘড়ি ছুটে গিয়েছিল সেখানে সপ্তর্ষি। আর মোহনা ছিল কাশিমবাজারের ছিন্নগঙ্গার তীরে তান্ত্রিকের কুটীরের সামনে।

কিছু বললে বিনিদি?

ভিশপ্ত কর্নসুবর্ণ

থমকে দাঁড়ায় রাহি। হাত চেপে ধরে মোহনার। রি বিনিদি। আমার মনে ছিল না

ম্লান হাসে মোহনা। খোঁড়াখুড়ি চলছে এখনও?

পাতত কাজে একটু ভাঁটা পড়েছে মনে হয়। সরকারী উদ্যোগের পরিনতি তো জানোই। লোকাল পলিটিক্স

নিয়ে যাবি আমাকে?

তুমি যাবে বিনিদি?

বে যাবে বল?

লব একটু থেমে বলে মোহনা, মাকে যেতেই হবে

রাহি চুপ করে থাকে।

রেজোল্যুসনটা লিখে কমল্পিট করে দাও মোহনা পাশ দিয়ে যেতে যেতে পঞ্চায়েত সেক্রেটারী জানান দেয়।

ফোন নাম্বার দেওয়া নেওয়া করে মোহনা আর রাহি।

মাঝের হাট গ্রামটায় ভিজিট করেছিস রাহি?

হ্যাঁটিম মেম্বারদের সঙ্গে গিয়েছিলাম, কেন বলত?

কোনো বড় দিঘি বা খাল আছে ওই গ্রামে?

হ্যাঁ আছে , বেশ গভীর এক দিঘি, মাছ চাষ হয়

দ্মার সঙ্গে কোনো এক যুগে যুক্ত ছিল বোধ হয় ওই দিঘির অংশটা

ইন্দিরা আবাস যোজনার ঘরের এনকোয়ারি করতে এক বছর আগেই মোহনার পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল মাঝের হাট গ্রামে। কিন্তু ভরা বর্ষায় ভয়ানক কাদা পথ পেরিয়ে গত বছর আর পৌছনো হয়নি সেখানে মোহনার। এবছর আয়লায় সব তোলপাড় করে দিয়ে গেছে। পদ্মার কাছাকাছি গ্রামটায় এখনও মোহনার পৌঁছতে দেরি। গত বছর ইন্দিরা আবাস যোজনার তালিকাভুক্ত উপভোক্তাদের এনকোয়ারি করতে পরদিন পঞ্চায়েত থেকে অন্য কর্মচারীকে পাঠায় মাঝের হাটে, যেখানে চাঁদসদাগরের সপ্তডিঙ্গা ভিড়েছিল না কি, গ্রামের গল্প কথায় প্রচলিত।

গামীকাল লালগোলার কিছু পঞ্চায়েতে ভিজিট করব বিনিদি, ওখানে পদ্মা খুব কাছে

পারেই ওপার বাংলা, না রে?

হ্যাঁ।

কু-কিনার দেখা যায় না। আজ আসি বিনিদি

রাহি সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়। মোহনা নিজের রুমে ঢোকে।

কর্নসুবর্ণ, এ বঙ্গের এক স্বাধীন রাজা, ভাঙ্গা কলসীর অদ্ভুত নকশা, আর লাল মাটির স্তর। ১৯৬২ তে এখানে খননকার্য চলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তদানীন্তন প্রধান অধ্যাপক ড. সুধীররঞ্জন রায়ের তত্ত্বাবধানে। তারপর আবার বন্ধ ছিল খননকার্য। পরবর্তীকালে এখানে উতখনন শুরু করেন ভারতের পুরাতত্ব সর্বেক্ষণের পূর্বাঞ্চলের অধিকর্তা বিমল বন্দ্যোপাধ্যায়। বৌদ্ধ বিহার ও শশাংকর রাজধানী হিসেবে নানান প্রামান্য তথ্য আবিষ্কৃত হয়। মোহনার বাবার টিচার ও মুর্শিদাবাদ জেলার বিশিষ্ট গুনী ঐতিহাসিক অধ্যাপক বিজয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন মোহনার বাবা। সেসব নিয়ে সপ্তর্ষির সঙ্গে আলোচনা শুনেছে মোহনা। একটা লাল মাটির স্তর পাওয়া গেছে। শুনেছিল মোহনা। কর্নসুবর্ণ নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরী প্রসঙ্গে নানান তথ্য গল্পের মতো করে বলত সপ্তর্ষি। রূপকথার মতো শোনাত সেসব। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম দিকে নানান পুঁথি, লিপি, তাম্রলিপি, শিলালিপি আবিস্কার হয়। তাতে মালয় উপদ্বীপের একটি স্থান থেকে পাওয়া শিলালিপিতে লেখা ছিল এক প্রাচীন নগরীর নাম—রাঙ্গামাটি। এক নাবিক বুদ্ধগুপ্ত এই রাঙ্গামাটির বাসিন্দা এ তথ্যও জানা যায়। সেই নাবিকের সময় কাল প্রত্নতাত্বিকদের হিসাব অনুযায়ী ৪০০ খ্রিষ্টাব্দ। ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেনইহার অর্থবোধ করা কঠিন। কারণ লিপিটিতে এটুকুই স্পষ্ট মহানাবিক বুদ্ধ গুপ্তস্যরক্তম্রিত্তিবাস…কস্য। রক্তম্রিত্তিকা অর্থাৎ রাঙ্গামাটি। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুসারে উত্তরাপথে তিনস্থানে প্রাচীন রক্তমৃত্তিক নগরের অবস্থান নির্দেশ করা যাইতে পারে: ১। রাঙ্গামাটি—আসাম , ২। রাঙ্গামাটি—চট্টগ্রাম, ৩। রাঙ্গামাটি—মুর্শিদাবাদ। ইহার মধ্যে মুর্শিদাবাদ ও আসামের রাঙ্গামাটি সম্ভবত বুদ্ধগুপ্তের ছিল না, কারণ এতদুভয় সমুদ্র হইতে বহুদূরবর্তী; সুতরাং চট্টগ্রামই বুদ্ধগুপ্তের আবাসস্থান ছিল। কিন্তু তাঁর গবেষনা ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের। বাঙ্গালীর ইতিহাস—আদিপর্ব থেকে জানা যায় এই রক্তমৃত্তিকা মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি বা চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটিও হতে পারে।. নীহার রঙ্গন রায়ের বক্তব্য অনুসারে, তখন মনে হয়েছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি (তারও অর্থ রক্তমৃত্তিকা) মালয়ের কাছাকাছি, সুতরাং রক্তমৃত্তিকা সে রাঙ্গামাটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু আমার এ অনুমান ভুল। এখন আর সন্দেহ নেই যে, মহানাবিক—বুদ্ধগুপ্ত—লিপি—কথিত লো-তো-মোহ-চিহ। …এখন আর কোনো সন্দহ নেই যে মহানাবিক বুদ্ধগুপ্ত তদানীন্তন গঙ্গা ভাগীরথী সমীপবর্তী, কর্ণসুবর্ণান্তর্গত রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের ভিক্ষুসংঘের আশীর্বাদ নিয়ে গিয়েছিলেন বানিজ্য যাত্রায়। এসবই মোহনা শুনেছিল সপ্তর্ষির কাছে। খননকার্যে পাওয়া রাঙ্গামাটির আস্তরন খুঁজতে গিয়েছিল সেখানে। রাঙ্গামাটির পথের ধুলোয় সপ্তর্ষির গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট। সপ্তর্ষির বাবা কথিত ব্লু ব্লাড মিশে যায় বঙ্গে শেষ স্বাধীন রাজার রাজধানীর রাঙ্গামাটিতে। ও মাটি অভিশপ্ত। মোহনা যাবে সেখানে। গৌড়ের ইতিহাসের শেষ খুঁজতে। নাবিক বুদ্ধগুপ্তের রাঙ্গামাটি কি গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণের রাঙ্গামাটি? না কি আসামের ব্রহ্মপুত্রের তীরে দাড়াং বা ধুবড়ি স্থানের কাছাকাছি রাঙ্গামাটি? চাঁদসদাগর আসামের ছয়গাঁও এলাকার বাসিন্দা। বানিজ্যযাত্রায় সপ্তডিঙ্গা মধুকর নিয়ে নেমে এসেছিল গাঙ্গেয় বঙ্গে। ওপার বাংলার পদ্মা বেয়ে এপার বাংলার গঙ্গা বেয়ে তাঁর যাত্রা পথ নিশ্চয়ই। সেই বানিজ্যতরী ভেসে গেছে পদ্মা-জলঙ্গী পথে মোহনার পঞ্চায়েত এলাকার কাছ দিয়েও। আর এই বনিক বুদ্ধগুপ্ত র রাঙ্গামাটি কি সেই একই ব্রহ্মপুত্র নদীর ধার ঘেঁষা? সেও কি ওপার এপার দুপাড় বাংলার পদ্মা গঙ্গা বেয়ে যাত্রা করেছিল? না কি উল্লিখিত রাঙ্গামাটির বৌদ্ধবিহারে এসেছিলেন আশীর্বাদ ধন্য হতে? একরাশ প্রশ্নের সামনে মোহনা। এই সব প্রশ্নের উত্তর ওকে জানতে হবে। মোহনা কে বইতে হবে মোহনার দিকে। ব্রহ্মপুত্র বেয়ে চাঁদসদাগরের যাত্রা পথে মুর্শিদাবাদের রাঙ্গামাটি অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায় নলু পঞ্চাননের কায়স্থ কারিকায়:

গোলাঘাট ডিহিগঞ্জ সুরম্য নগরী

যাহা চাঁদ সদাগরের ব্যবসা নগরী।

জয়া দেবী নামে এক দেবী আরাধয়

মনসা দেবীর সহ বিবাদ করয়।

তিন্তিড়ি বৃক্ষের মূলে দেবীর দেউল

বহু বনিক পূজে দেবীকে মানে বনিককূল

সুতরাং সদাগর চাঁদ বনিক মুর্শিদাবাদের ভাগীরথী বেয়ে সাগর সংগ্মের দিকে যাত্রা করেছিলেন অনুমান করা যায়। জলঙ্গি স্রোতেও বয়ে গিয়েছিল হয়ত তাঁর বানিজ্যতরী। আর এসে কিছুকালের জন্য ঠেকেছিল পদ্মার জলঙ্গির কাছাকাছি মোহনার গ্রাম পঞ্চায়েতের কোনো গ্রামে। মোহনা বয়ে চলেছে মোহনার দিকে। উতস থেকে সঙ্গমের দিকে। গঙ্গার ওপারে রাঙ্গামাটির কর্ণসুবর্ণ। পদ্মার এপাড়ে মোহনার পঞ্চায়েতের কোনো এক দিঘিতে চাঁদসদাগরের সপ্তডিঙ্গা এসে থেমে থাকার গল্প। বর্গীদের লুটতরাজের খবর মেলে মুর্শিদাবাদের রাঙ্গামাটি এলাকায়।

মহুলা চৌরিগাছা আর কাঠালিয়া

আধারমানিক আইলা বরগী রাঙ্গামাটি দিয়া।।

তবে বর্গী পার হইল হাজিগঞ্জের হাটে

শীঘ্রগতি আইসা জগতশেঠের বাড়ী লোটে

(মহারাষ্ট্র পুরাণ,কবি গঙ্গারাম, ১১৫৮ বঙ্গাব্দ)

অভিশপ্ত কর্ণসুবর্ণর রক্ত মৃত্তিকা। রাহিকে সঙ্গে করে যাবে মোহনা সেখানে। তাকে মোহনার দিকে বিপুল বেগে প্রবাহিত হতে হবে

(ক্রমশ…)

 
 
top