মোহনা

 

আয়লার তোলপাড়ে সেদিন আর সুপ্রতীক ত্রিপাঠির সঙ্গে কথা হয়নি মোহনার। পরদিনই ঝড় বিদ্ধস্থ গ্রাম পঞ্চায়েতের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় বাকি সব কর্মচারীদের সঙ্গে। মাঝে মেইলে কথা হয় ভদ্রলোকের সঙ্গে। ভদ্রলোক আদতে সাংবাদিকপেশায় সাংবাদিকতা। নেশায় ছবি আঁকা। খুব বেশি তথ্য জানা বলেননি। মোহনাও জিজ্ঞেস করেনি। মোহনার কর্মস্থল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তথ্য জানায় মোহনা। কলকাতায় ভদ্রলোকের পেন্টিং একটা প্রদর্শনী হবে খুব শীঘ্রই। মোহনাকে আমন্ত্রন জানান। সম্মতি জানায় মোহনা। যদিও জানা নেই পঞ্চায়েতের কখন কোন কাজের চাপ ঘাড়ে চাপবে। নিস্তার পেলে নিশ্চয়ই যাবে ও।

তুই কি করে গেছিস?

কী করেছি?

সারা বাড়ি জুড়ে তোর পায়ের তোড়ার রিন রিন আওয়াজ ভেসে বেড়াচ্ছে

খিলখিল করে হেসে ওঠে মোহনা

ফোনের ওপ্রান্ত থেকে কথা ভেসে আসে, ভাবে হাসিস না

কে?

তোর চলে যাওয়ার পর বাড়ির সকলে শুধু তোর কথাই বলছে

তোমাদের বিশাল ছাদ থেকে গঙ্গা দেখা যায়। তোমাদের কত কাছে গঙ্গার ঘাট

তো গঙ্গার কথা মনে হল? বাড়ি শুদ্ধু লোকের মাথায় শুধু তুই ঘুরছিস মোহনা

র আমি গঙ্গার কথা বলছি। কেমন স্রোত দেখা যায়

তোর পারফিউমের গন্ধটা অদ্ভুত বিদঘুটে

হোগলা ঘাস মাড়িয়ে দিলে যে গন্ধ হয় অনেকটা সেইরকম। পারফিউমের ব্র্যান্ডটা এই স্মেলটা আনার চেষ্টা করেছে, টাইফা এলিফ্যান্টিনা। হোগলার বৈজ্ঞানিক নাম

ফোনের ওপ্রান্তে বিভ্রান্ত গলা, হোগলা ঘাসের গন্ধের পারফিউম? কি যে বলিস তার ঠিক নেই

গায়ের গন্ধ পাওনি বুঝি? আবার খিলখিল করে হেসে ওঠে মোহনা

মোহনা তুই জাদু জানিস

হ্যাঁ। ভানুমতীর খেল আবার হেসে লুটিয়ে পড়ে।

সেদিন রোববার। নেমন্তন্ন ছিল সপ্তর্ষির স্বল্প দিনের আলাপের এক বন্ধুর বাড়ি। বন্ধুটির মা বিশেষ অনুরোধ করেছিলেন তাঁদের বাড়ি যেতে। চিনি পাতা দই, একবারটি এস আমার কাছে, রেঁধে বেড়ে খাওয়াই তোমায়, কয়দিন বা আছি। বলেছিলেন তিনি। বড় স্নেহময়ী মানুষ। মোহনাকে মজা করে নাম দিয়ে দিয়েছিলেন চিনি পাতা দই। ছুটির দিন দেখে মোহনা নেমন্তন্ন রক্ষা করতে যায়। পুরোনো বড় এক লাল বাড়ি। সবুজ রঙ চটা বড় গেট। একান্নবর্তী পরিবারের মত কয়েক শরিক মিলে একসঙ্গে থাকে। হাঁড়ি আলাদা। বন্ধুটি সস্ত্রীক। একটি মাস তিনেকের ছোট্ট পুত্র সন্তান। পরিপূর্ন এক পরিবার। বিশাল বাড়ির আনাচ কানাচ জুড়ে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায় মোহনা। তিন তলার ছাদে উঠে ওর চঞ্চল পা শান্ত হয়ে যায়। সামনে গঙ্গা। কত কাছে। তিন তলার বিশাল বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে বিপুলা ভরা গঙ্গার দিকে তাকিয়ে কী যেন হয় মোহনার। এলাকাটি মুর্শিদাবাদের সৈদাবাদ রাজবাড়ীর কাছেকাছেই সেই রাজবাড়ীর ভগ্নস্তুপ। ইতস্তত ছড়িয়ে আছে ভাঙাচোরা কিছু শিবমন্দির। সবই প্রায় ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। শুধু জোড়া শিবমন্দির নামের একটি মন্দির টিকে আছেমোহনার মায়ের মামাবাড়ি এলাকা কাশিমবাজার অর্থাৎ বন্দর কাশিমবাজার এলাকায় কাটিগঙ্গার চারপাশে যেমন অসংখ্য শিবমন্দির ছড়িয়ে ছিল, জলা-জংলায় আচ্ছন্ন হয়ে, যার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই এখন। অথচ একসময় কাটিগঙ্গার চারপাশে শিবমন্দির অধ্যুষিত এলাকাটিকে বলা হত ব্যসকাশী।

কী রে, অনেকক্ষণ ভর দুপুরে ছাদে দাঁড়িয়ে গঙ্গা দেখছিস? চল নিচে চল, মা ডাকছে সপ্তর্ষির অল্পপরিচিত বন্ধুটি ছাদে এসে দাঁড়ায়। সপ্তর্ষির কথা মনে পড়ছে খুব?

না তোগঙ্গার কথা ভাবছি। পদ্মার কথা ভাবছিযে পঞ্চায়েতে কাজ করি তার কাছ দিয়ে ছাড়-পদ্মা। পদ্মার বুকে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য চর। সাদা বালির চর। বালি না কি নরম সাদাআমার এখনও যাওয়া হয়নি পদ্মার কাছ অবধি। মাঝখানে বয়ে চলেছি। গঙ্গা আর পদ্মার মাঝখান দিয়ে হাসে মোহনা ।

ঙ্গার জলের স্তর নেমে যাচ্ছে রে। বর্ষায় ভয়ানক মূর্তি নেয় অথচ ফাল্গুন-চৈত্রে একেবারে নেমে যায় জলের স্তর

মাদের এই গঙ্গার বুকেও চরা পড়বে বলছ? আবার হাসে মোহনা ।

নীচে চল। আন্দামান থেকে দিদি ফোন করবে। তোর সঙ্গে আলাপ করবে

ল। আসছি

কিন্তু আরও অনেকক্ষণ ওই পুরোনো বাড়িটার ছাদে একা দাঁড়িয়ে থাকে মোহনা। সৈদাবাদ, সওদা হত, বিকিকিনি হত, জমজমাট থাকত ইতিহাসের কোনো এক সময়। বন্দর কাশিমবাজার আর সৈদাবাদ এক নাড়ীর সূত্রে গাঁথা। সে নাড়ীর টান কাটিগঙ্গা, গঙ্গার যে অংশ কেটে বাদ দেওয়া হয় মূল গঙ্গা থেকে। ফরাসি, ওলন্দাজ, আর্মেনিয় বনিকদের সমাগমে ব্যবসা বানিজ্যে এই অঞ্চল ইতিহাসের পাতায় তার ছাপ এঁকে রেখেছে। সে ছাপও ভুলে গেছে ইতিহাসই। এমনটাই কালের ধারা। এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করত সপ্তর্ষি। সৈদাবাদের কোথায় আর্মেনীয়ন গীর্জার ভগ্নস্তূপ, তা নিয়েও মেতে উঠেছিল খুব। কর্ণসুবর্ন,শশাংক নিয়ে ডকুমেন্টারি করার পরের প্রজেক্ট হিসেবে ঠিক করে রেখেছিল সৈদাবাদ আর আর্মেনিয়দের নিয়ে কোনো ডকুমেন্টারি করার কাজ। আর্মেনিয়গির্জায় কেন গজ-সিংহ মূর্তি স্থাপিত হল এ নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছে মোহনা ওর বাবার সপ্তর্ষিরসপ্তর্ষি চলে যাওয়ার অনেক পর সপ্তর্ষির পুরোনো কাগজ-পত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে সৈদাবাদের গির্জার গজ-সিংহ মূর্তিটির ছবি দেখে। অদ্ভুত , সত্যিই খুব অদ্ভুত এটি। কোণার্কের সূর্য মন্দিরের নাট-মন্দিরে এই একই শৈলীর গজ-সিংহ মূর্তি আছে। কিন্তু হঠাৎ কেশর ফোলানো সিংহের মাথার সঙ্গে গজের মিশ্রনে তৈরী হল কেন সৈদাবাদের আর্মেনিয়গির্জাটির স্থাপত্য? পলাশীর যুদ্ধের পর ১৭৫৮তে আর্মেনিয়দের এই গির্জা স্থাপিত হয়। ১৮৯৭এর ভয়ানক ভূমিকম্পে মূর্শিদাবাদের অন্য স্থাপত্যের সঙ্গে এই গির্জাটিরও প্রচুর ক্ষতি করে। ১৯০৭এ দ্য ক্যালকাটা হিস্টোরিকাল সোসাইটির এক প্রতিনিধি দল এসেছিলেন মূর্শিদাবাদে যাদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে এই আর্মেনিয়গির্জাটির গজ-সিংঘ এর মূর্তির ভগ্নাবশেষ। কিন্তু কলিঙ্গ আর্কির্টেকচারের প্রভাবে আর্মেনিয়দের এই গির্জার শিল্প-শৈলী কেন! গঙ্গার বহমান স্রোতের দকে তাকিয়ে ভাবে মোহনা, গঙ্গার স্রোত আর কালের স্রোতে পার্থক্য কোথায়। আছে পার্থক্য আছে বৈকি। বিপুলা নদীর বুকে চরা পড়ে। কালের প্রবাহে চরা পড়েনা। কোণ-অর্ক, কোণার্ক, একটি বিশেষ কোণ থেকে সূর্য কৃষ্ণ-পুত্র শাম্ব, আর শাম্বের অভিশাপ মুক্তি। সপ্ত-অশ্বে টানা বিশাল রথ সূর্যের–কোণার্ক মন্দির। চন্দ্রভাগা তীরে। সেই মন্দিরের গজ-সিংহেরর মূর্তি আর মুর্শিদাবাদের সৈদাবাদের আর্মেনিয়গির্জার গজ-সিংহের কী বা যোগ? যোগসূত্র আছে নাকি কিছু? যোগ শুধু এক জায়গায় শাম্ব কৃষ্ণপুত্র, অনিরুদ্ধ কৃষ্ণ-পৌত্র। অনিরুদ্ধের সঙ্গে বিবাহ হয় শিব-ভক্ত বানাসুরের কন্যা ঊষারবানাসুর নটরাজের নৃত্যের প্রধান বাজনদার। শাপভ্রষ্ট অনিরুদ্ধ আর ঊষার আগমন হয় মর্ত্যলোকে, নাম–লখিন্দর আর বেহুলা। শিব-কন্যা মনসাকে দেবী মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করতে ডাক পড়ে বেহুলার। নইলে বনিক প্রধান চাঁদবেনে মনসাকে দেবী বলে গ্রাহ্য করবে না। তাই সুরসভায় ভালো নাচে বেহুলা নাচনীঅঙ্গ দেশ থেকে ব্রহ্মপুত্র বেয়ে পদ্মা ঘুরে গঙ্গা বেয়ে গঙ্গার মোহনা পেরিয়ে সমুদ্র যাত্রায় যান বনিক চন্দ্রধর। অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ এক যোগসূত্রে গাঁথা। মোহনার সঙ্গে সেসবের কী বা যোগ? মোহনাও বয়ে চলেছে মোহনার দিকে, যোগ এখানেই। মোহনার পঞ্চায়েতের মধ্যেকার কোন এক গ্রামের দিঘিতে এসে ভিড়েছিল চাঁদবেনের বানিজ্যতরী, জলঙ্গী-পদ্মার সঙ্গে কোনো এক কালে যোগ ছিল দিঘিটির, যোগ এখানেই। ছিন্নগঙ্গা ছিন্ন হয়ে পড়ে রইল মোহনার ছোটবেলা থেকে কিশোরীবেলা পেরোনোর বন্দর কাশিমবাজারে, যোগ এখানেই। সেই কাটিগঙ্গার তীরে তান্ত্রিকটি শোনালো এক বাচ্চা মানুষের পুরুষ হয়ে ওঠার গল্প, যোগ এখানেই। নির্দেশ দিল মোহনাকে মোহনার দিকে প্রবাহিত হওয়ার, যোগ এখানেই। শাম্ব প্রসবিত অভিশপ্ত মুষলের গুঁড়োর মিশেল টাইফা এলিফ্যান্টিনা হোগলা ঘাসের ওপরেই যুদ্ধ করে যদুবংশ ধ্বংস হল, লর্ড কৃষ্ণ মারা পড়লেন, যোগ এখানেও। হাসি পায় মোহনার। রিং রাং রিং রাং রিং…… মোহনার হাতের মুঠোয় ধরে রাখা মোবাইলটি বেজে ওঠে। ভাবনা স্রোত আর গঙ্গা স্রোত থেকে মন চোখ দুইই ফেরায় মোহনা। সুপ্রতীক ত্রিপাঠি। মোবাইলের স্ক্রীনে নামটা জ্বলছে নিভছে।

লুন

ডিসেম্বরের শেষ হপ্তায় আমার ছবির প্রদর্শনী। আসবেন

নেক শুভেচ্ছা

থিম–চরাচর

বাহ। বেশ তো। কোন চর?

টিকলির চর, ভুতনির চর, নির্মল চর, চর কুঠিবাড়ি

মানে ? এসব তো আখেরিগঞ্জ এলাকার পদ্মার চরের নাম

ফিরছি। এখন কোলকাতার পথে। প্রায় পঁচিশ দিন ঘুরে বেড়ালাম। মানে চরে চড়ে বেড়ালাম আর কী!

মি কিছু বুঝতে পারছি না। আপনি পঁচিশ দিন ধরে এখানেই ছিলেন?

বি আঁকছিলাম, তুলছিলাম। একটা আর্টিকেল খুব শিগগির বেরোবে

থচ আমাকে জানালেন না?

পনার অফিসের পাশ দিয়ে গেলাম ফিরলাম। আপনার ট্রেকারে চেপে। চাপা হাসি সুপ্রতীক ত্রিপাঠির গলায়

ট্রেকার আমার নয়। মোহনার হতভম্ব গলায় ক্ষোভ ঝরে পড়ে

হল। রোজ ভাঙাচোরা ট্রেকারে চেপে কোন সুবর্ণমৃগী গ্রামে যাওয়ার রোমহর্ষক বর্ননা দিয়েছিলেন

ব্যঙ্গ মিশ্রিত কৌতুকে হাসি পায় না মোহনার, দেখা করলেন না কেন?

সুন না ছবিগুলো দেখবেন। নিমন্ত্রণ করছি তো

জানি না যেতে পারব কি না। পঞ্চায়েতের কোন ডিউটি কাঁধে চাপবে কে জানে

আরএসবিওয়াই।

হ্যাঁ। সেরকমটাই শুনেছি। আপনি কী করে জানলেন?

পেশায় তো সাংবাদিক। দু কলম খবর বানিয়ে খাই। খোঁজ না রাখলে পেট চালাবো কি করে

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে মোহনা। নীচে সবাই অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। আন্দামান থেকে দিদিটি ফোনে আলাপ করবে ওর সঙ্গে। এদিকে মোহনা হতভম্ব হয়ে পুরোনো বাড়িটার ছাদে দাঁড়িয়ে। সুপ্রতীক ত্রিপাঠী লোকটা তো আজব। এত কথা বলে ফোনে, অথচ পঁচিশ দিন এখানে থেকে গেল, এঁকে গেল, একবারও মোহনাকে জানান দিল না। ফোনটা ওপাশ থেকে কেটে গেল কট করে। মোহনা সুইচ অফ করে নেমে আসে নীচে। বহু পুরোনো বাড়ির ছোট পরিসরের উঁচু ধাপের ঘোরানো সিঁড়ি বাড়িটার। আলো আঁধারির খেলা সিঁড়ি জুড়ে। বেলা পড়ে আসছে। বাড়িটার আনাচে কানাচে পুরোনো একটা নিবিড় গন্ধ জড়িয়ে আছে। সৈদাবাদের ইতিহাসে গন্ধ

সেদিনই জিয়াগঞ্জ ফিরে আসে মোহনা। ফোনে কথা হয় সপ্তর্ষির বন্ধু, বন্ধুর স্ত্রী, বন্ধুর মা এবং আন্দামানের দিদিটির সঙ্গে। ফিরে এসে একে একে সকলের সঙ্গে কথা বলে জানান দেয় নিরাপদে ফিরেছে সেদূরের মানুষ কেমন কাছে আসে। দূরের মানুষ কেমন দূরে দূরে থাকে। কাছের মানুষ কেমন দূরে যায়। এসব নিয়ে ভাবে মোহনা। বেশি ভাবে না। আর্মেনিয় গির্জা আর তার গজ-সিংহের মূর্তির কথা ভাবে। পদ্মার বুকে গজিয়ে ওঠা চরের কথা ভাবে। চরাচরভালো নাম রেখেছেন তো ভদ্রলোক। শুধু মোহনার সঙ্গে ইচ্ছাকৃত দেখা না করার কারণ বুঝতে পারে না। রাত বেশ গভীর হলশরৎকাল, শিউলির গন্ধ ভেসে আসে। দুর্গাপুজোয় সামনে।

নৌকার ওপর ডানিয়েল সাহেব নড়ে চড়ে বসলেন। ছবি আঁকার সরঞ্জাম তুলি একটু নাড়াচাড়া করলেন। সহরের মধ্যে দূরে আগিয়ে আসা ঢাকের বাদ্যি শোনা গেল। তার সঙ্গে নানা রকমের বাঁশীর আওয়াজ। বাঁশের ওপর রঙ্গিন কাগজের পতাকা মাথায় জৌলুষের সামনের দিকটা নদীর ধারে দ্যাখা গেল। ঢাকে আওয়াজ গলি থেকে বাইরে আসা মাত্র জোর হয়ে উঠল। পিছনে দ্যাখা গেল রূপোর কাজ করা ভেলভেটের বিরাট ছাতার তলে গন্যমান্যজনদের। তাঁদের থেকে সম্মান যাঁদের একটু কম তাঁরা তালপাতার বিরাট ছাতার তলায় এলেন। নানা রঙ দিয়ে এই ছাতাগুলিকে বিচিত্র করা হয়েছে। দ্যাখবার মতো সাজ ছত্রধরদের। তাদের বিরাট পাগড়ী আর রংদার পোশাকে তাঁরা তাদের প্রভূদের কৌলিণ্য ঘোষণা করছেন। এবার তাঁরা নদীর ঘাটের দুপাশে সরে দাঁড়ালেন আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ‘দুর্গা মাঈ কি জয়’ হাঁক দিয়ে বাঁশের মাচায় দুর্গাপ্রতিমা বহন করে ঢুকল প্রায় ৬৪ জন লোক। দুর্গা প্রতিমা দ্যাখা মাত্র একষট্টি বছরের বৃদ্ধ শিল্পী নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে উঠলেন” … (বন্দর কাশিমবাজারশ্রীসোমেন্দ্র চন্দ্র নন্দী)

নদীটির নাম গঙ্গা, অধুনা কাটিগঙ্গা, স্থান বন্দর কাশিমবাজার, শিল্পী টমাস ডানিয়েল। সেই সাহেবের বন্দর কাশিমবাজারের বাঁধাঘাটে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের দিন আঁকা ছবিটি কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে ডানিয়েল কক্ষে সাজানো আছে। সে ইতিহাস আজ ইতিহাস। যে ইতিহাসের ভগ্নস্তুপের মধ্যে বড় হয়ে উঠেছে মোহনা। মহারাজা মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর রাজবাড়িতে ডাকাতি হওয়ার পর দুর্গোৎসব বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কালের গ্রাসে আক্রান্ত একটি রাজবৈভবের কংকালের মতো দাঁড়িয়ে আছে রাজবাড়িটি। রাজা কমলাকান্ত রায়ে বাড়ির পুজো অক্ষুণ্ণ। কিন্তু সে জৌলুষ নেই। প্রথা অনুযায়ী নীলকণ্ঠ পাখি উড়ে আসার দিন প্রতিমায় শিল্পীর হাত পড়ে এখনও। নিজস্ব ধাঁচায় ডাকের সাজের প্রতিমা নির্মিত হয় রাজবাড়ির মধ্যেই। আবার কি কোনোদিন আঁকা হবে কাটিগঙ্গায় দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের চিত্র, যেমন এঁকেছিলেন ডানিয়েল সাহেব? ঘুম জড়িয়ে আসছে মোহনার দু চোখে। ল্যাপটপ অন করে একবার। নেট অন করে। আর এস বি ওয়াই নিয়ে সরকারি তথ্য গুলো ডাউনলোড করে রাখতে হবে। মেইল চেক করে। সুপ্রতীক ত্রিপাঠি—বন্দর কাশিমবাজারে কাটিগঙ্গার ধারে দুর্গা বিসর্জনের ছবি আঁকব বৈ কি…

(ক্রমশ…)

 
 
top