মোহনা

 

সুপ্রতীক ত্রিপাঠী। এই নামের একজন মেইল করেছেন। মেইল খোলে মোহনা। ওর তোলা কিছু ছবি অ্যাটাচ করে পাঠিয়েছেন। জানতে চেয়েছেন লোকেশনটার ডিটেইল। ছবি গুলো মোহনার মামাবাড়ি এলাকার কাটিগঙ্গার পাড় আর তার আসে পাশের কিছু ছবি। যেদিন প্রথম দ্যাখা হয় তান্ত্রিকের সঙ্গে মোহনার। মোহনার দিকে যাও হে যুবুতী মনে পড়ল সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর। সেই কালীমূর্তিতে কী ভীষণ যৌনতা পেল বাচ্চা ছেলেটির… কাটিগঙ্গার সিঁড়ির ধাপে বসে তান্ত্রিক বলছিলেন গল্প, আর মোহনা চুপ করে অবাক হয়ে শুনছিল ছবি তুলতে চেয়েছিল তান্ত্রিকের। উনি নিষেধ করেছিলেন। উঠে চলে গেছিলেন। মনে পড়ল। বাড়ি ফিরে সপ্তর্ষি’র কথা মত ল্যাপটপে সেভ করে রেখেছিল ছবিগুলো। একটা ওয়েবসাইটে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কোনো উত্তর আসেনি। না আসাই স্বাভাবিক ছিল। ফটোগ্রাফি নিয়ে কোনো প্রফেশনাল নলেজ নেই, প্রথাগত পড়াশোনাও নেই ওর। সপ্তর্ষিদের ফ্যামিলির এক আজব শখ পুরুষগুলোর। ফটোগ্রাফি। সবাই গলায় একটা করে দামী ক্যামেরা না ঝুলিয়ে যেন ঘরের বাইরে পা দিতে পারে না। ভয়ানক হাস্যকর লাগত মোহনার। কোনো টুরিস্ট-স্পটে যেমন ক্যামেরাম্যানরা ঘোরে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে। ছবি তোলার বাতিক যেন। আওয়াজ দিত মোহনা সবাইকে। এমন কি শ্বশুরমশাইকেও ।

ব্রিটিশ আমলের ক্যামেরা বৌমা, বিদেশ থেকে আনা, তাচ্ছিল্য করো না

হ্যাঁ ওই ক্যামেরা দিয়ে বৃটিশ আমলের সব দুষ্প্রাপ্য ছবি তো তুলে রেখে গেছে তোমার বাপ-ঠাকুর্দা, বিক্রি হবে লাখ টাকায়! শাশুড়ির ঝাঁঝালো উত্তর।

বেনের মেয়ে, তুমি জমিদার বাড়ির কদর কি বোঝো?

নামেই তালপুকুর, ঘটি ডোবে না, জমিদারবাড়িতে বিয়ে হচ্ছে শুনে ভেবেছিলাম না জানি কি? সেই তো খাওয়ার পর রাঁধা আর রাঁধার পর খাওয়া শাশুড়ির ঝাঁঝ বাড়ছে।

বাইশ বছর এক চাকাতেই বাঁধা/ মনে হচ্ছে, সেই চাকাটা ওই যে থামল যেন -/ থামুক তবে। আবার ওষুধ কেন? বসন্তকাল বাইশ বছর এসেছিল বনের আঙিনায় গন্ধে-বিভোল দক্ষিণবায় / দিয়েছিল জলস্থলের মর্মদোলায় দোল—/হেঁকেছিল ‘খোল রে দুয়ার খোল।

পলাতকা- মুক্তি কবিতাটি থেকে আবৃত্তি করে চলে মোহনা। শাশুড়ি-শ্বশুর চুপ।

তুমি আসতে আপিস থেকে, যেতে সন্ধেবেলায়/ পাড়ায় কোন শতরঞ্চ খেলায়।/থাক সে কথা।/ আজকে কেন মনে আসে প্রাণের যত ক্ষণিক ব্যাকুলতা!

চুপ করে মোহনা। শাশুড়ির চোখের কোণ যেন ভেজা। অপূর্ব গানের গলা ভদ্রমহিলার এই ষাট বছর বয়েসেও। মানবেন্দ্র, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখার্জী’রা তখনও বিখ্যাত হননি। অনেক মঞ্চে একসঙ্গে গান গেয়েছেন সপ্তর্ষির মা, বিয়ের আগে। বড় ওস্তাদের কাছে তালিম ছিল তাঁর, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এক সঙ্গীতপ্রিয় মানুষ। যাঁর প্রথম ও শেষ প্রেম সঙ্গীত। বাকিটা কম্প্রোমাইজ। ত্রিদিবেন্দ্র নাথ ভৌমিক রায়চৌধুরী, কুমিল্লার এক জমিদার বাড়ির মেজ ছেলে। তাঁর সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর সবটা কম্প্রোমাইজ। ভদ্রমহিলার গুণ দেখে বিয়ে করেছিলেন ত্রিদিবেন্দ্র নাথ। কিন্তু জমিদারি আভিজাত্যবোধ থেকে তিনি বেরোতে পারেননি। তাঁর ধ্যান ধারণা অনুযায়ী ঘরের বউ কখনও বাইরে গান গেয়ে বেড়াবে না। এখানে বিরোধ। একে একে তিন সন্তান। দুটি মেয়ে একটি ছেলে। সপ্তর্ষি’র কাছে সবটা শুনেছে মোহনা । শ্বশুর বা শাশুড়ির কোনো তরফেরই দোষ খুঁজে পায়নি । যে যার নিজের অবস্থানে সঠিক। মায়া পড়ে যায় শাশুড়ির গলার কাছে চেপে রাখা দুঃখের জন্য। এই বয়েসেও যখন খালি গলায় মীরার ভজন গেয়ে শোনান ভদ্রমহিলা, শুধু মুগ্ধ হতে হয়:

যো তুম তোড়ো পিয়া ম্যায় নাহি তড়ু রে।

তো সে প্রীত তোড় কৃষ্ণা কৌন সঙ্গ জড়ু রে।।

তুম ভয়ে মোতি প্রভুজি হাম ভয়ে ধাগা।

তুম ভয়ে সোনা হাম ভয়ে সুহাগা।।

এইচ-এম-ভি থেকে ক্যাসেট বের করার অফারও নাকি পেয়েছিলেন সেই আমলেত্রিদিবেন্দ্র নাথ রাজী হননি। তাঁর ব্লু-ব্লাড তাঁকে বাধা দিয়েছে। ভদ্রমহিলা কম্প্রোমাইজ করেছেন ছেলে মেয়েদের জন্য। কিন্তু কথায় কথায় তীব্র ঝাঁঝ বেরিয়ে আসে।

থাক সে কথা।/ আজকে কেন মনে আসে প্রাণের যত ক্ষণিক ব্যাকুলতাআবৃত্তি থামায় মোহনা।

ব্রিটিশ আমলের ক্যামেরার গপ্প শুনে আর কাজ নেই মোহনা, স্নান সেরে এস, তুমি তো আজ হোস্টেল ফিরে যাবে শাশুড়ি উঠে চলে যান।

মার অন্যায় হয়েছে বৌমা, আমি জানি। কিন্তু বংশ-মর্যাদা বিসর্জন দিতে পারতাম না, তুমি দ্যাখো যদি এখনও তোমার শাশুড়িকে তাঁর প্রিয় মঞ্চ ফিরিয়ে দিতে পারো। পারলে তুমিই পারবে ত্রিদিবেন্দ্র নাথ নত মস্তকে অনুচ্চ স্বরে কথা গুলো বলেন।

মোহনাও ভেবেছিল ও পারবে একজন সঙ্গীত প্রেমিককে তাঁর মঞ্চ ফিরিয়ে দিতে। ইউনিভার্সিটি শেষ করে একটা নিউজপেপার অফিসে ক্যাজুয়াল হিসেবে জয়েন করে। অ্যানথ্রোপলজি পাগল সপ্তর্ষি তখন পুরো মাত্রায় তাঁর সাবজেকট নিয়ে ব্যস্ত, আর সেই সঙ্গে কিছু ডকুমেন্টারি বানাতে ব্যস্ত। সপ্তর্ষির একটা পুরোনো ক্যামেরা নিয়ে মোহনাও ছবি তুলতে বেশ মজা পেত। সেই ক্যামেরাতেই তোলা কাশিমবাজারের কাটিগঙ্গার ধারের ছবিগুলো। বন্দর কাশিমবাজার, ওর ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা। ছিন্ন গঙ্গা লুটিয়ে পড়ে আছে।

মোহনার দিকে যাও হে বেজে ওঠে কানে। চমকে ওঠে মোহনা। মেইলটা ভাল করে দ্যাখে। সু্প্রতীক ত্রিপাঠি। গুগল অ্যাকাউন্টটা চেক করে। ভদ্রলোকের কোনো ছবি নেই। প্রোফাইলে একটা পেন্টিং। বেসিক ইনফো, আর্টিস্ট। কিছু পেইন্টিং আর কিছু পেইন্টিংয়ের সাইট আপলোড করা আছে। মোহনা ওর ছবিগুলোর লোকেশনের ডিটেইল টাইপ করে মেইলের রিপ্লাই করে। সঙ্গে সঙ্গেই ধন্যবাদ জানিয়ে রিপ্লাই আসে।

পনি কি ঐ এলাকার বাসিন্দা?

না, আমার রিলেটিভ থাকেন

মার ফোন নাম্বার দিলাম, আপনার আপত্তি না থাকলে ফোনে কিছু কথা বলতে চাই

মোহনা ওর মোবাইল নাম্বার টাইপ করে পাঠায়। ওপাশ থেকে ধন্যবাদ আসে। জানায় সময় মত কথা বলে নেবেন ভদ্রলোক।

শালা হারামিদের পঞ্চায়েতে পা রাখতে ঘেন্না করে, শালারা গভর্নমেন্টের টাকা লুটে ফাঁক করে দিচ্ছে, অথচ একটা জেনুইন ট্রেড লাইসেন্স দিতে হাজার নিয়ম দ্যাখাবে। জালি মালগুলোর কাছ থেকে টাকা খেয়ে ভুয়ো ট্রেড লাইসেন্স দিতে এদের মুহূর্ত মাত্র সময় লাগে না, জেনুইন কেস দেখলেই ঝোলাবে

অফিসের জেনারেল সেকশনে তুমুল হই চইকানে আসে মোহনার। ডেথ-বার্থের ফাইলে মুখ গুঁজে বসে আছে। জন্ম আর মৃত্যু। দেহের যাওয়া আসার হিসাব রাখে মোহনা। কানে আসে চিৎকার। সঙ্গে এটাও খুব আশ্চর্যের বিষয় যে সেই চিতকারে গভর্নমেন্ট, জেনুইন, মুহূর্ত মাত্র ইত্যাদি শব্দের উচ্চারণ। এবং কোনও প্রচলিত টান নেই। লোকটা পরিশীলিত। কোনো কারণে ক্ষেপে গেছে। জন্ম-মৃত্যুর হিসেব নথিভুক্ত করে মোহনা। ভুল হলে চলবে না। এ এক কঠিন হিসাব। এ এক আশ্চর্য কাজ মোহনার কাছে। দেহ আসে যায়। মোহনা নথিভুক্ত করে।

কোথায় শালা আপনাদের সেই স্টাফ, জন্ম সার্টিফিকেট ইস্যু করে যে। আজ ফেরত পাঠালে আমি এস-ডি--কে রিপোর্ট করববলতে বলতে কণ্ঠস্বরটি মোহনার টেবিলের উলটো দিকে।

মুখ তোলে মোহনা। কণ্ঠস্বরের মালিক থমকে দাঁড়িয়ে।

পনি কে?

মিই জন্ম মৃত্যুর সার্টিফিকেট ইস্যু করি, বসুন

দাঁড়িয়ে থাকে তরুণ এক যুবা পুরুষ। শুধু তরবারি আর রাজবেশ নেই। নইলে কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র, রাজবংশ-জাত যোদ্ধা ভাবতে ভুল হত না। তীক্ষ্ণ নাকে বিন্দু ঘাম জমেছে। টকটকে ফর্সা রঙ উত্তেজনায় লাল। চোখের দৃষ্টি আরও তীব্র। মুখে হালকা দাড়িপরিচ্ছন্ন বেশবাস। মোহনার দিকে খুব অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

পনি কতদিন হল এসেছেন? আগে দেখিনি তো?

ছর দুয়েক হতে চলল

! এর মধ্যে আমার আসা হয়নি যদিও, পাশের পঞ্চায়েতে বাড়ি, পিচ রাস্তার ঠিক ওপারেই, রূপনগর পঞ্চায়েত। এসেছি দিদির ছেলের জন্ম সার্টিফিকেট নিতে। হসপিটালটাতো এই পঞ্চায়েতেই পড়ে। দিদির প্রথম বাচ্চাটার সার্টিফিকেট নিতে এসে অসম্ভব ঘুরতে হয়েছিল। আগে যে স্টাফ ছিল

পনি বসুন

মোহনা আগের স্টাফের বদনাম শুনতে নারাজ। যাই ঘটে থাকুক এটা ও বরদাস্ত করে না। ছেলেটি সটান দাঁড়িয়েই থাকে। জুব্বান-চাচাকে ডেকে মোহনা নির্দিষ্ট ফর্ম দিতে বলে। আশ্চর্য, ছেলেটি দাঁড়িয়েই টেবিলের ওপর ঝুঁকে ফর্ম ফিল আপ করে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসহ মোহনার হাতে জমা দেয়। দিন পনেরো পরে সার্টিফিকেট তোলার নির্দিষ্ট দিন জানায় মোহনা

পনি অন্য চাকরির এক্সামে বসুন। এই চাকরি ছেড়ে চলে যান

মানে? গ্রামের উন্নতির জন্য কাজ করতে আমার ভালো লাগে

পারবেন না

কে?

তটুকু বোঝেন গ্রামের রাজনীতি? তাছাড়া আপনি এখানে বেমানান

মানে?

কদিন এ চাকরি আপনাকে ছাড়তেই হবে। মিলিয়ে নেবেন

দেখি

সার্টিফিকেট নিতে দিদি আসবে। আমি আর আসব না। আপনি যতদিন এখানে আছেন আমি আসব না

শ্চর্য! কিন্তু কেন? মোহনা হতচকিত।

মার আর আসাটা খুব ভুল হবে। মারাত্মক ভুল হয়ে যেতে পারে। আপনার পক্ষে যা ক্ষতিকারক। আমার পক্ষেও হয়ত

মি কিছুই বুঝতে পারছি না

কিছুই কি বুঝতে পারছেন না? এত নির্বোধ কি আপনি?

এবার গাল দুটো গরম হয়ে ওঠে মোহনা। কী তীব্র প্রপোজ ছেলেটির। চোখের দিকে তাকায়। কী তীব্র মুগ্ধতা। চোখ ফেরাতে পারে না মোহনা।

পনার নাম?

নাম মনে রাখার খুব দরকার কি?

না।

লি আপনিও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অন্য কোনো কাজ নিয়ে চলে যান অন্য কোথাও

বলতে বলতে এক-পা দু-পা করে পিছিয়ে যেতে থাকে ছেলেটি দরজার দিকে। কিন্তু স্থির দৃষ্টি মোহনার দিকে। মুখে সুন্দর হাসি ফুটে উঠছে, যেন বিজয়ী বীর। বেশ পরাভূত করতে পেরেছে নিমেষে অপর পক্ষকে। হাসিটি নির্মল, কোনো মালিন্য নেই দরজার কাছে পৌঁছে খুব দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল তরবারি হাতে কোনো যেন ঐতিহাসিক চরিত্র। এক লহমার জন্য মোহনার মনে হল এই হাসিটি ওর খুব চেনা। ঠিক এরকম করে কাউকে কখনও হাসতে দেখেছে ও, মনে পড়ছে না কিছুতেই। ছেলেটির জমা দেওয়া আবেদনপত্র দেখে মোহনা, বাচ্চার মার নাম আয়েষা সুলতানা, বাচ্চার বাবার নাম আতিকুর রহমান, আবেদনকারীর নাম হিসেবে আয়েষা সুলতানাজুব্বান-চাচা ঘরে ঢোকে।

বিটি রিপোট কমপিলিট হল্যে বুল। সেক্কেটারি জিগাইলছিল

য়ে যাবে এখনই চাচা একটু বস, আচ্ছা রূপনগরটা পাশের পঞ্চায়েত? পিচ রাস্তার ও পারে?

হ্যাঁ বিটি, উখেনে পীরের দরগা আছেইন, বিরাট মেলা বসে। যা মান্নাত কইরবা তাইই পাবা, কত লাঠিখেলা দ্যাখানু বিটি। এক ঘায়ে দশটা শালার ব্যাটা শালাকে

চ্ছা বুঝেছি, এই নাও রিপোর্ট, বিএমওএইচ-এর কাছে জমা করে রিসিভ কপি নিয়ে এসো

জুব্বান-চাচা ঘাড় নাড়তে নাড়তে জেনারেল সেকশনে চলে যায়। রূপনগরে অরূপ-জনার বাস। ঘরে পাশে আরশিনগর পড়শি বসত করে। হেসে ফেলে মোহনা। অনেকদিন পর মুগ্ধ হল। অনেকদিন পর মুগ্ধ দৃষ্টি ওকে ঘায়েল করে গেল। নিজের চারপাশে একটা কঠিন দেয়াল বানিয়ে তুলছিল। সেটার ভিত নড়ে গেল যেন। রিং রাং রিং করে ব্যাগের মধ্যে মোবাইলটা বাজছে। বের করে দ্যাখে সুপ্রতীক ত্রিপাঠি’র নম্বর।

হ্যালো, বলুন

মস্কার, নম্বরটা সেভ করে রেখেছিলেন দেখছি

হ্যাঁ, নইলে অচেনা নম্বর তুলি না

বে, কথা বলা যাবে?

না আমি অফিসে। একটা গ্রামের পঞ্চায়েত অফিসে কাজ করি, এসময় বেশিক্ষণ কথা বলা অসুবিধে, মনোযোগ দিতে পারব না তাই

বেশ বাড়ি ফিরে সময় করে একটা মেসেজ লিখে পাঠাবেন, আমি ফোন করে নেব

চ্ছা

রাখছি, পরে কথা হচ্ছে

রেখে দেন সু্প্রতীক ত্রিপাঠি। ছবি আঁকিয়ে মানুষ। হয়ত ওর তোলা ছবি গুলো দেখে বন্দর কাশিমবাজার, কাটিগঙ্গা ইত্যাদি সম্পর্কে কৌতুহল জেগেছে। কথা হলে বোঝা যাবে। রূপনগরের অরূপ মানুষটাকে রাজবেশ পরিয়ে খাপ খোলা তরবারি হাতে ধরিয়ে একটা ছবি আঁকিয়ে নিলে মন্দ হয় না। নিজের ভাবনায় হাসি পেয়ে যায় মোহনার।

পাখি কেমনে আসে যায়, ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়, খাঁচার ভিতর। গ্রামের কোনো বাউল গাইতে গাইতে ফিরছে। ফাইল গোটায় মোহনা। আসা যাওয়ার পথের ধারে বাজল যে বীণ বীণ তো বাজে। মোহনার গালে গরম ভাপ জাগে। আর নড়ে যায় চারপাশের গড়ে তোলা প্রাচীরের ভিত। ব্যাগ গোছায় মোহনারাতে কথা বলে নেবে সুদীপ্ত ত্রিপাঠি’র সঙ্গে। ছিন্নগঙ্গা পড়ে আছে যেখানে, সেই হারিয়ে যাওয়া বন্দরের কথা নিয়ে আলোচনা করবে ওনার সঙ্গে। হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে জুব্বান-চাচা।

বিটি এখুনি বাইর হও। আইলা না লাইলা আইসছে

সেটা কী?

ব্যাগ কাঁধে জেনারেল সেকশনে ঢোকে মোহনাশোনে ফ্যাক্স করে সব পঞ্চায়েত-অফিসে জানান দেওয়া হয়ে প্রবল বেগে এক ঝড় ছুটে আসছে। বিপদকালীন ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে। মোহনাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরে যেতে বলে সবাই। দ্রুত বেরিয়ে আসে অফিস থেকে। হ্যাঁ, চারপাশ কিরকম থমথমে। দ্রুত পথ হাঁটে ট্রেকার-স্ট্যান্ডের দিকে। ট্রেকারে অসম্ভব ভিড়। কোনোরকমে সিট করে দেয় চেনা খালাসি। ফ্ল্যাটে ফেরে। ততক্ষণে জোর হাওয়া বইয়ে শুরু হয়ে গেছে। দ্রুত বেগ বাড়ছে। নিমেষে পাওয়ার কাট। বাবা-মাকে ফোন করতে মোবাইল খোলে। নেটওয়ার্ক নেই। ঝড়ের দাপট শুরু। তিনতলায় যেন বেশি বোঝা যাচ্ছে। বাজ পড়ছে কড় কড় করে। ভয়ানক ভয় করে মোহনার। ফ্ল্যাটের অন্য সদস্য রা দরজায় নক করে, মোহনা বেরিয়ে এস, আমাদের ঘরে এস পাশের ফ্ল্যাটে গিয়ে বসে মোহনা। কী ভয়ানক ঝড়! কত গ্রাম যে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে। পদ্মার পাড়ের বাংলাদেশের বর্ডার ঘেঁষা এলাকাগুলোর অবস্থা যে কী হতে পারে কল্পনা করে শিউরে ওঠে মোহনা। আগামিকাল থেকে কোমর বেঁধে লেগে পড়তে হবে ত্রাণের কাজে। তারপর শুরু হবে ঘর ভাঙ্গার তালিকা তৈরি, ঘুরে ঘুরে এনকোয়ারি করে দেখা। মনে মনে প্রস্তুত হয় মোহনা। ঝড় থামে একসময়। নিজের ঘরে ঢোকে মোহনা। সবরকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্নপাওয়ার কাট, মোবাইলে টাওয়ার নেই। সুপ্রতীক ত্রিপাঠিকে মেসেজ করার কথা ছিল। ভয়ানক ঝড় বয়ে গেল। গঙ্গার ওপারে জংশন স্টেশন থেকে নিয়মিত উত্তরবঙ্গগামী অথবা ফিরতি কোনো ট্রেনের হুইসলও ভেসে আসছে না। ট্রেন চলাচল ব্যাহত নির্ঘাত। একদিকে গঙ্গার তুমুল প্রবাহ আর অন্যদিকে বিধ্বংসী ঝড়ে বিদ্ধস্ত পদ্মা-পাড়। মোহনা দুই প্রবাহের ঠিক মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে যেন। অনেক কিছু ভেঙে গুড়িয়ে গেছে আজকের ঝড়ের ধাক্কায়। সু্প্রতীক ত্রিপাঠির সাথে দেখা হলে ও ঠিক রূপনগরের পড়শিটির ছবি আঁকিয়ে নেবে।

 
 
top