মোহনা

 

With what dignity and undaunted a countenance she set fire to the pile the last time, and assumed her seat, can only be conceived, for words cannot convey a just idea of her. (Ancient Descriptions of Human Sacrifices in the East, The Oriental Herald, and Journal of General Literature, Vol IX, p. 96)

এরপর জাগতিক দিক থেকে বিদায় নেবার পালা উপস্থিত হল। প্রথমে শিশু-সন্তানদের কাছ থেকে, তারপর একে একে বাবা-মা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া শেষ হলে একজন ব্রাহ্মণ একটুকরো ঘি মাখানো জ্বলন্ত কাপড় তার হাতে দিয়ে তাকে চিতার দিকে নিয়ে গেলেন। বণিক পত্নী এবার সতী হতে চলেছে, তাই উপস্থিত ব্রাহ্মণগণ তার পায়ে লুটিয়ে পড়লেন, আশীর্বাদ নিতে চায় তারাসতীর আশীর্বাদ। সবাইকে আশীর্বাদ করলে তাঁরা কাঁদতে কাঁদতে তার পথ ছেড়ে দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল

নির্ভীক চিত্তে চিতায় ওঠার সময় স্বামীর পায়ে শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে স্বামীর মাথার কাছে গিয়ে বসল বণিক পত্নী। যেন আত্মস্মাহিত–কোনওদিকে কোনও ভ্রূক্ষেপ নাই কোনও কথা কর্ণগোচর হচ্ছে না। কেবল বিহ্বলচোখে স্বামীর মুখের পানে চেয়ে আছে, হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা নিয়ে। চিতার মধ্যে বসে নিজের হাতে চিতার অগ্নি সংযোগ করলেন। কিন্তু বাতাসের গতিতে সেই অগ্নি বাইরের দিকে যেতে লাগল। তখন তিনি পুনরায় উঠে বায়ুর গতির অভিমুখে বসে স্বামীর পদযুগল নিজের কোলে তুলে নিয়ে পুনরায় চিতায় অগ্নি-সংযোগ করলেন। দেখতে দেখতে তার কোমল দেহ চিতাগ্নিতে ভষ্ম হয়ে গেল। সেই সময় তার চিত্তের দৃঢ়তা, এবং নির্ভীক মনোবলের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম বলে প্রত্যক্ষদর্শী মিষ্টার হলওয়েল জানিয়েছেন। (শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ি ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ অনুসরনে)

১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দেরঠা ফেব্রুয়ারি ভোরে রামচন্দ্র পণ্ডিত নামের এক ধনী মহারাষ্ট্রীয় বণিক হঠা মারা যান। তার আঠারো বয়সি স্ত্রীকে সহমরণে যেতে দেখেছিলেন হলওয়েল সাহেবসতী হয়েছিল মেয়েটি। সতীদাহের স্থান – মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজারের অধুনা কাটিগঙ্গা সংলগ্ন সতীদাহ ঘাট। কাশিমবাজার তখন প্রধান বন্দর, ব্যবসা বাণিজ্যের অন্যতম স্থান।

চৈত্রসংক্রান্তি পার হয়ে গেছে। চড়কের বাজনা শেষ, সর্বনাশের বোল তোলা সেই ঢাকের আওয়াজের দিন পেরিয়ে গেছে। প্রচলিত কথাকাহিনির সেই জাগ্রত কালী কাটিগঙ্গার বুক থেকে উত্থিত হয়ে আবার স্বস্থানে নিমজ্জিত হয়েছেন অনেকদিন পর মোহনা এসেছে তার মায়ের মামাবাড়ি এলাকায়, কাশিমবাজার, বন্দর কাশিমবাজারে। কাটিগঙ্গার ধারে ঘাটে এসে বসেছে। সতীদাহ ঘাটকালের কবলে চলে গেছে সতীদাহ ঘাট অনেক কাল আগেই, যেমন করে এই ঘাটেই কালের স্রোতে ভেসে গেছে কত সতী স্বেচ্ছায়, অনিচ্ছায় অথবা শোকে উন্মাদ হয়ে। সেই ঘাটেরই ভগ্নাবশেষ এখনও কাশিমবাজারের সতীদাহ ঘাট নামে পরিচিত। সংলগ্ন পোড়ো শিব মন্দিরখানা গঞ্জের বাঁয়। না এটা অঞ্জনা নদীতীর নয়, এটা হারিয়ে যাওয়া বন্দরের লুটিয়ে পড়ে থাকা কাটিগঙ্গার তীর। এর একশো গজ দূরে বাঁধাঘাট। এখানে রাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী আর কমলাকান্ত রায়ের রাজবাড়ির দুর্গাপুজার বিসর্জন হত মহাসমারোহে। বিজয়া দশমী ১৮১০ খ্রি। সোনালি আলোয় আকাশ রাঙা। দুপুরের মেঘ কেটে গিয়ে যেন দিনটাকে আরও উজ্জ্বল করেছে। বৃদ্ধ শিল্পী টমাস ডানিয়েল ভাবছেন এই উৎসবমুখর সন্ধ্যার আকাশের বর্ণাঢ্য তাঁকে একদিন আঁকতেই হবে। দুর্গা প্রতিমা দেখামাত্র বৃদ্ধ শিল্পী নৌকার উপর উঠে দাঁড়ালেন। হাতের কাগজে পড়ল আঁচড়। প্রথম আঁচড়েই ডানিয়েল সাহেব দুর্গাপ্রতিমার চালচিত্রটি এঁকে ফেললেন। দ্রুত তাঁর হাত চলতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাগজের ওপর স্কেচটি ফুটে উঠল। দশপ্রহরণধারিনী দশভূজার রূপ আঁকতে দক্ষ শিল্পীর এতটুকু ভুল হয়নি। মুর্শিদাবাদের এক অখ্যাত ঘাটে নৌকার উপর দশভূজার বিসর্জনের ছবি ইংরেজ আমলে হিন্দুর দুর্গোৎসবের এক প্রামাণিক দলিল হয়ে আছে – (শ্রী সোমেন্দ্রচন্দ্র নন্দী, বন্দর কাশিমবাজার)। সেই বাঁধাঘাট এখন জঙ্গলে ঢাকা। ঘাটের চিহ্ণ নেই। সতীদাহ ঘাট যেখানে অবস্থিত তার নাম ছিল ব্যাসকাশী। কারণ চারপাশে প্রায় ছোটোবড়ো মিলিয়ে ১০৮টি শিবমন্দির ছিল। এখন কিছু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পুজো হয় না। ঝোপঝাড়ে ঢাকা। কালকেউটে, গোখরোর বাস। ঘাটে বসে আছে মোহনা। খর তাপ বৈশাখের। তান্ত্রিকের ডেরা দূরে। শেষ দেখা হওয়ার দিন তান্ত্রিক মানুষটা বলেছিল, এক টুকরো কালো মেঘ ধেয়ে আসছে। সব তছনছ হবে। যাও হে যুবুতী মোহনার দিকে যাও সত্যিই সবকিছু তছনছ করা ঝড় উঠল সেদিন। ঝড় থেমে গেল এক সময়। পড়ে রইল মোহনা, এই ছিন্নগঙ্গা যেভাবে পড়ে রয়েছে। মোহনার দিকে যেতে বলেছিল তান্ত্রিক। মোহনার দিকে যাত্রা করতে হলে উসমুখের সন্ধানে যেতে হবে মোহনাকে উলটো বইতে হবে কোন পথ ধরে ভেলা ভাসাবে সে? স কোথায়? এই ছিন্নগঙ্গার উস কোথায়? বন্দর কাশিমবাজারের উকীভাবে? জানে না মোহনা। জানতে ইচ্ছে করে না আর। ছোটোবেলা, ওর কিশোরীবেলা কেটেছে এই ইতিহাসঘেরা এলাকায়। ওই যে পুরোনো ভাঙা লাল ইঁট বের করা রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে যাচ্ছে কাটিগঙ্গা থেকে মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর রাজবাড়ির দিকে, সেই রাস্তার দু-ধারে ইতিহাস ছড়িয়ে আছে। মোহনা একসময় ভাবত, বন্দর কাশিমবাজারের ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ইতিহাসের টুকরোগুলো গেঁথে ফেলতে পারবে এক বিনিসুতোর মালায়। তান্ত্রিক ওর ডাকনাম শুনে মজা করেই বলেছিলেন হয়তো বিনি সুতোয় মালা গাঁথা হয় না হে। মোহনা কি নিজেই টুকরো হয়ে ভেঙে ছড়িয়ে গেছে? ওর টুকরোগুলো গেঁথে জোড়া দেবে কে? সে মানুষ আছে কি কোথাও? ঘাটের ভগ্ন সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে আছে সে। ফুলের বাহার নাইকো যাহার ফসল যাহার ফলল না, অশ্রু যার ফেলতে হাসি পায়, দিনের আলো নাইকো যাহার সাঁঝের আলো জ্বলল না, সেই বসেছে ঘাটের কিনারায় নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে মোহনা। সে যুগ হলে কি মোহনা পুড়ে মরত? সতী হত? চিরকাল মোহনা ভেবে এসেছে কী করে সেই সব মানুষজন একটা জীবন্ত মানুষের পুড়ে যাওয়া দেখতে পারত? অনুভূতির সহ্যের অতিরিক্ত নয় কি ওই ভয়ংকর দৃশ্য? সপ্তর্ষির সঙ্গে যখন পণ্ডিত নৃপেন ভট্টাচার্যের বাড়িতে মাঝে মাঝে যেত, মোহনা দেখত বহু ছাত্রছাত্রীকে বেদ পুরাণের ব্যাখ্যা শোনাচ্ছেন। ঘরের এক কোণে চুপ করে বসে শুনত মোহনা । কিছু বুঝত, অধিকাংশই বুঝত না।

ইমা নারীর বিধবাঃ সুপত্নীরাঞ্জনেন সর্পিষা সংবিশন্তু।

অনশ্রাবোহনমনা বাঃ সুরত্নাঃ আরোহন্তু জনয়োযোনীমগ্নে।। (ঋকবেদ)

এই সব নারীগণ যাঁরা অবিধবা ও সুপত্নী তাঁরা বৈধব্য ক্লেশ ভোগাপেক্ষা অঞ্জন ঘৃতাদি নিয়ে চিতায় প্রবেশ করুক। অশ্রুশূন্য ও দুঃখশূন্য হয়ে সেই নারীগণ উত্তম রত্নালংকারে ভূষিতা হয়ে অগ্নিমধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করুক। মোহনা অশ্রুশূন্যা ও দুঃখশূন্যা। অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করেনি ও। ছিন্নগঙ্গা থেকে অনেক দূরে চলে গেছে গ্রামের মানুষদের উন্নয়নের কাজ নিয়ে। যার খুব কাছ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে পদ্মা, জলঙ্গি, ভৈরব। যেখানে কোন ঘাটে না কি চাঁদ সদাগরের বাণিজ্য তরী এসে ভিড়েছিল। একা মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারার দরকার হয় না। একা মানুষের সুখ দুঃখ নেই। ঘাটের জল থেকে ভেজা পা তুলে নেয় মোহনা। অনেকক্ষণ ও এই ঘাটে এসেছে। আর দেরি করলে মায়ের মামাবাড়ির লোকজন চিন্তা করবে। খুঁজতে বেরোবে। আপনজনদের কখনো দুশ্চিতায় ফেলতে নেই। ঘাট থেকে উঠে পড়ে সে। তান্ত্রিকের সঙ্গে প্রথমদিনের সাক্ষাতদৃশ্য মনে পড়ে ওর। মোহনার দিকে যেতে বলেছিলেন ওকে। ও উস সন্ধান না করলে মোহনার দিকে যাবে কেমন করে। শুরু থেকে শেষের দিকে প্রবাহিত হয় সব নদী। মোহনাও বইবে – শুরু থেকে শেষের দিকে।

 

রাঙ্গাদিদি মুনিইই পেইলে চলেন, আগ লেগেইলছে গোওও

ঘাড় নিচু করে হাতের বিপিএল সার্ভের কাগজে তথ্যগুলো নথিভুক্ত করছিল মোহনা। গ্রাম বাথানডিহি। গ্রামের কিছু আইসিডিএস-এর মেয়ে আর স্বয়ম্ভর গোষ্ঠির মেয়ের সঙ্গে নিয়ে বাথানডিহির প্রতিটি বাড়ি গিয়ে গিয়ে বিপিএল সার্ভে করছিল মোহনা। বিপিএল সার্ভের জন্য তখনও মেশিন বন্দোবস্ত করেনি সরকার। সরকারী কর্মচারীদের নিদির্ষ্ট পদ্ধতি অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে স্কোর নির্ধারন করে দপ্তরে জমা করাতে হয় সার্ভে রিপোর্ট। আগের দিন বিপিএল সার্ভে সংক্রান্ত মিটিং-ট্রেনিং হয়ে গেল বিডিও অফিসে। কোন পঞ্চায়েত কর্মচারীর কোন গ্রাম সংসদ তা জনিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল।

কোন সংসদ পড়েছে তোমার মোহনা? মাঝবয়সী এক কর্মচারী জিজ্ঞেস করেন মিটিং-ট্রেনিং শেষে।

বাথানডিহি

সে কি! বাথানডিহি তোমাকে দেওয়া হল কীভাবে? ওখানে তুমি যাবে কীভাবে? সার্ভে করবে কীভাবে? প্রায় প্রতিদিন দাঙ্গা-মারপিট বেধেই থাকে ওখানে, তোমাদের পঞ্চায়েতের সব থেকে সমস্যাপূর্ণ সংসদ

গিয়েছিলাম একবার গত মাসে

গিয়েছিলে? তোমাকে পাঠিয়েছিল পঞ্চায়েত থেকে? সেকী!

চুপ করে থাকে মোহনা। আরও কয়েকজন কর্মচারী এগিয়ে আসে। মাঝবয়সী ভদ্রলোকটি বাকিদের বলে মোহনাকে বাথানডিহিতে সার্ভে করতে নির্ধারিত করা হয়েছে সে কথা।

আরেকজন কর্মচারী মোহনাকে বলে, খনই এটা আমরা হতে দিতে পারি না আপনার সঙ্গে, আপনি তো আমাদেরই কর্মচারী সংগঠনের মেম্বার। আমরা দলবদ্ধভাবে বিডিও সাহেবকে গিয়ে এখনই প্রতিবাদ জানাব। যাতায়াতের পক্ষে অসম্ভব দুর্গম এবং অত্যন্ত অশান্তিপূর্ণ বিপজ্জনক। বাথানডিহিতে গ্রামে ঘুরে ঘুরে সার্ভে করা কোনো মহিলার পক্ষে সম্ভব না। আর সদ্য জয়েন করেছেন, একবছরও হয়নি আপনার এখানে আসা। আগে গ্রামপঞ্চায়েতটা ভালোভাবে চিনতে দেওয়া হোক, অভিজ্ঞতা হোক, তারপর দুর্গম এলাকায় পাঠালে আমাদের কিছু বলার থাকবে না। চলুন আপনি আমাদের সঙ্গে। বিডিওর ঘরে। আমরা সবাই প্রতিবাদ করব, অনুরোধ জানাব আপনাকে কাছাকাছি কোনো গ্রামসংসদে দেওয়ার জন্য। কে এই অবাস্তব লিস্ট বানিয়েছে, আমরা জানব। তাছাড়া আমাদের আরও অনেক কর্মচারীর ক্ষেত্রেই অন্যায় করা হয়েছে। বয়স্ক, অসুস্থ অনেক কর্মচারীকেই বহু দূরের গ্রামসংসদে বিপিএল সার্ভে করতে দেওয়া হয়েছে। আরো কিছু অভাব-অভিযোগ আছে আমাদের। সম্মিলিতভাবে সব জানাব আজই। আসুন আপনি আমাদের সঙ্গে

দম নিতে থামে ভদ্রলোক। কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাস্থানীয়। বলতে বলতে গলা চড়ে গিয়েছিল।

মার কোনো অভিযোগ নেই নীচু গলায় সংক্ষেপে জানায় মোহনা।

মানে? আপনি প্রতিবাদ করবেন না আপনার সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে তার? ইউনিয়নের আরও কর্মচারীরা হাঁ হাঁ করে ওঠে।

কাজে হাত না দিয়ে বলি কী করে কাজটা করা আমার পক্ষে সম্ভব না অসম্ভব? মোহনার উত্তর।

নেতা ভদ্রলোক ফোনে ব্যস্ত। মোবাইলের আরেক প্রান্তকে জানাচ্ছেন যে আজই তাঁরা বিডিও- কাছে প্রতিবাদ জানাবেন। মোবাইলের স্পিকার অন। ও প্রান্ত থেকে কর্কশ এক পুরুষ কণ্ঠ, ই ইস্যুটা ছেড়ো না, জনার্দন। নতুন মহিলা কর্মচারীকে অযথা দুর্গম যায়গায় ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা, একটা দারুণ জোরালো ইস্যুফোন কেটে দেয় তাড়াতাড়ি নেতা ভদ্রলোক। মোহনা চুপচাপ।

দেখুন, আপনি শহর থেকে সদ্য এসেছেন, পঞ্চায়েত সম্পর্কে ভালোভাবে সুস্পষ্ট ধারণাই গড়ে ওঠেনি আপনার, বাথানডিহি খতরনাক গ্রাম। যা খুশি তাই হতে পারে। ওখানকার লোকজন অসম্ভব ক্ষিপ্ত হয়ে থাকে

সংসদ মিটিং করতে গিয়ে তা বুঝেছি মোহনা জানায়।

বে? চলুন বিডিও- কাছে

আর কিছু বলে না মোহনা। জোর করে বিপজ্জনক কাজের ভার নেওয়ার ইচ্ছেও নেই মোহনার, কিন্তু এভাবে পিছিয়ে আসাটাও তার পছন্দের নয়। বাথানডিহি যাতায়াত মানে সেই কারো সাইকেলের পেছনে চেপে মাইলের পর মাইল এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে যাওয়া-আসা। গ্রামের মানুষরা কতটা উত্তেজিত থাকে,  তা ও দেখেছে। বাকি কর্মচারীদের সঙ্গে, ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে বিডিও- ঘরে যায় মোহনা। ওকে কিছুই বলতে হয় না। যা বলার ইউনিয়নের নেতারা বলেন। দেখা গেল শুধু মোহনা বা অন্য বয়স্ক বা অসুস্থ কর্মচারীদের দুর্গম সংসদে পাঠানোর বিরুদ্ধে শুধু নয়, আরও হাজার রকমের অভাব অভিযোগ এর লম্বা তালিকা নিয়ে এসেছে ইউনিয়নের নেতারা। তার মধ্যে মোহনাকে বাথানডিহি পাঠানোটা একটা জোরালো ইস্যু। 

সব অভাব-অভিযোগ শোনার শেষে, প্রশ্নোত্তরের শেষে বিডিও বলেন, ই মুহূর্তে লিস্ট চেঞ্জ করা সম্ভব না। লিস্ট মহকুমা আর জেলায় পাঠানো হয়ে গেছে। কাজটা আপনাদের এই লিস্টের ভিত্তিতেই করতে শুরু করতে হবে মোহনার দিকে তাকিয়ে বলেন, দুর্গম জায়গা, বিপজ্জনকও। আমি বুঝতে পারছি ওই সংসদে পাঠানোটা ঠিক হয়নি। কাজটা শুরু করুন। প্রয়োজনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাজ শুরু না হলে চেঞ্জ করা সম্ভব নয়, লেগে পড়ুন, বুঝলেন? নতুন অভিজ্ঞতা হোক কিছু। ওই সংসদের মেম্বার, বিরোধী সদস্যকে আমি বলে দিচ্ছি আপনাকে সাহায্য করতে

ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় মোহনা। মিটিং-ট্রেনিং, প্রতিবাদ সব শেষ হল। ট্রেকার ধরে বাসায় ফেরে। পরদিন থেকে আবার বাথানডিহি যাওয়া আসা।

লেগিইলছে যি গোওওও

রাঙ্গাদিদিমুনিটাকে বাহির কর রি, মেইয়াডা পুর‌্যে মইরবে যি রি

দুরদার করে লোকজন দৌড়াদৌড়ি করতে শুরু করল। মহা কলরব।

দিদিমুনিই ই চলেন গো গোষ্ঠির মেয়েটির চিকারে বিপিএল-এর কাগজ থেকে মুখ তুলে তাকায় মোহনা। আগুন। চারপাশে আগুন। যে বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে সার্ভে করছিল সেই বাড়ির চালে আগুন। সব পাটকাঠির বেড়া দিয়ে তৈরি ঘর। মুহূর্তে নীরবে আগুন ছেয়ে ফেলছে। সেই বাড়ি শুধু নয়, পর পর সব বাড়িগুলোই জ্বলছে। চোখের সামনে ভয়াবহ আগুন। মোহনার পাশে ঘরটা পুড়তে শুরু করল। চারদিক থেকে আগুন ঘিরে আসছে। মোহনার পা সরছে না। পাথর হয়ে যেন আটকে গেছে মাটিতে। দু-তিনটে গোষ্ঠির মেয়ে মোহনাকে হ্যাঁচকা টানে। সেখান থেকে টেনে বের করে দৌড়োতে থাকে ঊর্ধশ্বাসে। ঘোরে পাওয়া অবস্থায় মোহনা ওদের হাত ধরে দৌড়োয়। পিছনে আগুন এগিয়ে আসছে। পুরো গ্রাম প্রায় জ্বলছে। নীরবে আগুন গ্রাস করছে পাটকাঠির বেড়া দিয়ে বাঁধা ঘরগুলো। সাবিনা, রেহেনা, মেহেরুন্নেসা গোষ্ঠির মেয়েগুলোর সঙ্গে মোহনা এক বিশাল খোলা মাঠে এসে পড়ে। গ্রামের সব মহিলা-শিশু সেখানে জড়ো হয়েছে। গ্রামের পুরুষরা নেমে পড়েছে খাল থেকে জল এনে আগুন নেভানোর কাজে। মাঠের ঘাসে প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছিল মোহনা। সামনে একটা গ্রাম জ্বলছেআর এক মুহূর্ত দেরি হলে মোহনা ওই আগুনে জ্বলে ভস্মীভুত হত। এত নীরবে আগুন গ্রাস করে সব কিছু, মোহনার ধারণার অতীত ছিল। অশ্রুশূন্য ও দুঃখশূন্য হয়ে সেই নারীগণ উত্তম রত্নালংকারে ভূষিতা হয়ে অগ্নিমধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করুকনৃপেন ভট্টাচার্যের গমগমে কণ্ঠস্বরে শ্লোকের ব্যাখ্যা করে ছাত্রদের বুঝিয়ে দেওয়া মনে পড়ে মোহনার। অগ্নি মোহনাকে ঘিরে এসেছিল। হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল অগ্নির ভয়ংকর শান্ত রূপ। চেতনা বিলুপ্ত পেয়েছিল মোহনার। রেহেনা, সাবিনারা মোহনাকে টেনে নিয়ে এসে ফেলল খোলা মাঠে। কিন্তু অগ্নি মোহনাকে গ্রাস করেছে, মোহনা অগ্নিমধ্যে আশ্রয় নিয়েছে, বুঝতে পারে সে। এ অগ্নি তার অন্তরাত্মাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে,  মর্মে মর্মে বোঝে মোহনা। এ এক আশ্চর্য দহন। দহনে অন্তরের মুক্তি? হয়তো। জানে না মোহনা। পরদিন সকালে মুখ্য নিউজপেপার গুলো জেলার খবরের পাতায় একটা ছোট্ট খবর হতে চলেছিল বাথানডিহি গ্রামে বিপিএল সার্ভেরত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে আকস্মিক মৃত্যু এক মহিলা পঞ্চায়েতের কর্মচারীর। কর্মচারী ইউনিয়নের কাছে আরো জোরালো ইস্যু হতে পারত। হাসি পেয়ে গেল মোহনার

চোখেমুখে পানি দাও, রাঙ্গা দিদিমুনি, সাবিনা বলে। সংসদ মেম্বার সহ আরও কয়েকজন গ্রামের মাথা গোছের লোক এগিয়ে আসে। চল বিটি তুমাকে বড় রাস্তায় ট্রেকারে তুইল্যে দিয়ে আসি, ঘর যাও বিটি

যাদের ঘর পুড়ল, তাদের এখন কী হবে?

কী আর হইলবে? বছরে কতবার পুড়ছে। বিডিওর ঘর থিক্যে ক্ষতিপুরণ পাবেক, লতুন ঘর বেইন্ধে নিইবে উয়ারা

থমকায় মোহনা। সাবিনা, রেহেনা আর মেম্বারদের সঙ্গে এক-একজনের সাইকেলে চেপে গ্রাম থেকে রওনা হয় মোহনাপথ বড়ো উঁচু-নীচু। বড়ো দুর্গম বটে। 

দ্মা দেইখতে যাবেন বুইলেছিলেন যি, দিদিমুনি, সংসদ মিটিন-এর দিন মেম্বার সাইকেল চালাতে চালাতে বলে।

হ্যাঁ যাব এ কোন দহন হল ওর। পদ্মা কত দূর? যেতে হবে ওকে পদ্মাপাড়ে। এক বিশাল বিপুল নদী দু-ভাগ হয়ে বইছে। গঙ্গা-পদ্মার মাঝখান দিয়ে বইতে শুরু করেছে মোহনা। দহন শেষ। 

(ক্রমশ…)

 
 
top