মোহনা

 

হ্যালো, কেমন আছো তুমি বিনিদি?

ভালো রে। তোর খবর কী?

ই তো চলছে গো, রিসার্চ পেপার নিয়ে ঘেঁটে আছি। আর কলেজ পলিটিক্স তো জানোই। কবে যে কলকাতায় ট্রান্সফার হতে পারব!

মার কাছে বেড়াতে আয় সময় করে

হ্যাঁ গো অনেকদিন দেখিনি তোমাকে সব কিছু ছেড়ে একা হয়ে দূরে চলে গেলে, যেখানে চাকরি সেটা তো খুব গণ্ডগ্রাম শুনেছি। তোমার অসুবিধে হচ্ছে না?

হাসে মোহনা, কোনো অসুবিধেই কী আর অসুবিধে বলে ভাবা উচিত আমার? দূরে আসাটা খুব দরকার ছিল রে বৃন্দা, কাছের মানুষদের নইলে চেনা যায় না। অনেক রাত হল ঘুমোবি না কাজ নিয়ে বসবি? আমার আগামিকাল গ্রামসংসদ সভার মিটিং আছে। এ বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই রে আমার, পঞ্চায়েতের বইগুলো ঘেঁটে বোঝার চেষ্টা করছি

না ঘুমোতে দেরি আছে একরাশ খাতা দেখতে হবে। কাল তো শনিবার, তোমার ছুটি নেই বিনিদি?

না, সেকেন্ড আর ফোর্থ স্যাটারডে ওয়ার্কিং ডে পঞ্চায়েতে। পারলে সব দিনই ওয়ার্কিং ডে, গ্রামের মানুষদের উন্নতির জন্য কাজ, তার আবার ছুটির দিন কিসের? হাসে মোহনা।

জ রাখি তাহলে, তুমি ঘুমোও। আমি ঠিক ফোন করব। সাবধানে থেকো

শুভরাত্রি জানিয়ে মোহনা ফোনটা কাটে মোহনা। তিনতলার ফ্ল্যাটে জানালা লাগোয়া বিছানায় জ্যোৎস্না এসে পড়েছে। কোকিল ডেকে চলেছে আকূল হয়ে। মাঝে মাঝে রাতে ফোন করে বৃন্দা। খোঁজ নেয়। দূরে চলে এলে কাছের মানুষ চেনা যায়। হাতে গুনে দু একজন ছাড়া কেই বা আর মনে রাখে মোহনা কোথায় কেমন আছে? মোহনা সাগরের দিকে বইছে নাকি উৎস সন্ধানে। পিক কুহরি উঠে বারবার। বসন্ত ঋতু শেষের দিকেসুখে আছে যারা সুখে থাক তারা, সুখেরই বসন্ত সুখে হোক সারামোহনা কি দুঃখে আছে? মোহনা একা আছে। একা থাকা সুখের না দুঃখের? একা থাকার কোনো সুখ দুঃখ নেই। সপ্তর্ষি থাকতে সুখ ছিল, দুঃখ ছিল। মোহনা সুখে নেই, মোহনা দুঃখেও নেই। মোহনা শুধু প্রবাহিত হয়ে চলেছে। ওকে উৎস থেকে সাগর সংগম অবধি প্রবাহিত হতে হবে। রাত গভীর হল। মোহনার বিছানা জুড়ে জ্যোৎস্না।

 

এমন দূর গ্রাম যে ভ্যানে চেপেও যাওয়া যায় না। কিছু দূর ভ্যানে যাওয়ার পর নেমে যেতে হল। এত ভাঙাচোরা পথ। আদৌ রাস্তা বলা যায় না। কত বছর আগে মেরামত হয়েছে কে জানে। খানা-খন্দে ভরা। এখনও অনেকটা পথ অতিক্রম করলে মোহনা নির্দিষ্ট গ্রামে পৌঁছতে পারবে। যেখানে বাৎসরিক গ্রামসভা ডাকা হয়েছে পঞ্চায়েত থেকে। সঙ্গে একটি মাত্র কর্মচারী যার বাড়ি এই গ্রামের কাছাকাছি মাঝের-হাট গ্রামে। তার সাইকেলের পেছনে চেপে বাকি রাস্তাটা যেতে হবে মোহনাকে। কী দুর্গম গ্রাম! ইলেকট্রিসিটি ঢোকেনি এখনও। সাত-পাঁচ ভাবে না মোহনা। সহকর্মীটির সাইকেলের পেছনের সিটে চেপে পড়ে। কবে শেষ সাইকেলে চেপেছিল মোহনা? হাসি পায় ওর। সেই ছোটোতে বাবার সাইকেলে চেপে যখন ঘুরে বেড়াত। আজ এতদিন পর হঠাৎ সাইকেলের পেছনে চেপে গ্রামের এবড়ো-খেবড়ো পথে চলতে গিয়ে ছোট্ট বেলাটাই মনে পড়ছে ওর।

হিন, কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তোশহরের মানুষ তুমি। গিরামের পথ খুব খারাপ বহিন কর্মচারীটি জিজ্ঞাসা করে।

না না, চল তুমি। পৌঁছোতে তো হবে

পৌঁছোয় মোহনা। গ্রামের নাম বাথান ডিহি। প্রায় দুশো আড়াইশো গ্রামবাসী জমায়েত হয়েছে। সব পুরুষ। মুখে ক্ষোভ আক্রোশ। হাতে চকচকে দা, টাঙ্গি বল্লম। এ কি! এ কোথায় এল মোহনা!

উত্তেজিত গ্রামবাসী ফেটে পড়ে, মেইয়েডা কে? পঞ্চায়িত থিইক্যে উয়াকে পাঠাইলছে কেন? প্রধান কুথায় লুকাইলছে? সেকেটারি কুথায়? উয়াদের আজ ফিইরতে দিতুক না

এই সব কথা ভেসে আসে দুশো আড়াইশো উত্তেজিত জনগণের মধ্যে থেকে। চারদিকে তাকায় মোহনা। কী করবে ও এখন? নিয়ম মাফিক লোকাল থানায় পঞ্চায়েত থেকে চিঠি করা হয়েছিল। সুরক্ষার কিছুই তো চোখে পড়ছে না।

গ্রামের বয়স্ক কয়েকজন এগিয়ে আসেন, বিটি তুমি নতুন জয়েন কইরেছ, লয়?

হ্যাঁ

য়ারে বইসতে দে। নতুন মানুষ। আমাদের গিরামের ইজ্জত নষ্ট করিসনা তুরা গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে বলে বয়স্ক একজন। কয়েকটা কাঠের টুল এনে পেতে দেওয়া হয়। বসে মোহনা। এতটা এবড়ো-খেবড়ো পথ সাইকেলের পেছনে চেপে এসে এই ভয়ানক জনরোষ। মানুষগুলোর চোখে আগুন জ্বলছে। সামনে দিয়ে একটা গভীর খাল বয়ে গেছে। কী নাম কে জানে! সবুজ ক্ষেত, ফসল ভরা ক্ষেত, মাঠে রাখাল গরু চড়াচ্ছে। মাঝে বয়ে চলেছে একটা ছোট নদীর মত জলের ধারা। তবু এ গ্রাম ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় নয়। অশান্ত, আগুন ছড়িয়ে পড়বে মুহূর্তে। এ দাবানল শুধু গ্রামে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বুঝতে পারে মোহনা। এ ক্ষোভ দীর্ঘদিনের বঞ্চিত অবহেলিত হওয়ার ক্ষোভ।

য়াকেই বেঁইন্ধে রাখ, প্রধান না আসুক বিডিও আইসবে ঠিক। মেইয়েছেলেকে পাঠাইলছে কী এমনি? যাতে আমরা কিছু না বুইলতে পারি। উ নতুন এইসেছেন শহর থিইকে। জন্ম মিত্যু সাট্টিফিট লেখে। উয়াকে পাঠানোর ছল বুঝেন না আপনারা? এক ক্ষুব্ধ যুবক বলে বয়স্কদের।

বয়স্ক মানুষরা ধমকে ওঠে, চুপ যা, বেশি তড়পাস না, তর ভাই যিখন রাস্তা মেরামতির টাকার ভাগ খেল নিম্বারের সঙ্গে মিইলে তখন বুইলতে পারিসনি? নতুন এইয়েছে এই বিটিডা। আমাদের গিরামের মেহমান। গিরামের ইজ্জত নষ্ট কইরব না আমরা। ছল যে হইলছে তা বুঝনু। তার জবাব আমরা পঞ্চায়েত অফিসে গিইয়ে জানব। এখুন সভাডা কইরতে হবে। মান আছে গিরামের

থামে বয়স্ক মানুষটা। প্রথামত বাৎসরিক গ্রাম সংসদ সভায় উপস্থিত জনগণের সাক্ষর গ্রহণ করে মোহনার সঙ্গের কর্মচারিটি। মোহনা দ্যাখে একটিও মহিলা সদস্য নেই। গ্রামের বয়স্কদের বলে সে কথা। মহিলাদের ডেকে পাঠাতে বলে। দুরদার করে ছুটে আসে গ্রামের মহিলা শিশুরা।

এক যুবতী বউ বলে, কাইজ্যা হল না, লয়রাঙা দিদিমুনিটো এইয়েছেন। জানতুক আজ আর কাইজ্যা হইলবেক না

কাইজ্যা মানে কাজিয়া, মানে দাঙ্গা, মারপিট। গ্রামের ভাষা কিছু বুঝতে শিখছে মোহনা। সরল উক্তি বউটির। হেসে ফেলে মোহনা। কিন্তু বুঝতে পারে কাজিয়া দাঙ্গা হাঙ্গামা এই সব গ্রামের নিত্যদিনের ঘটনা। প্রথা অনুযায়ী সভা শুরু হয়মোহনা পঞ্চায়েতের বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব পাঠ করে শোনায়।

আবার জ্বলে ওঠে গ্রামবাসী, বাথান ডিহির জইন্যে কত টাকা বরাদ্দ ছিল আর কত কুথায় খরচ ডা কেমুন কইর‌্যে হইলছে? সরকারের টাকা না প্রধানের বাপের? থামায় বয়স্করা।

গ্রামের অভাব অভিযোগ জানতে চায় মোহনা। কাগজ কলমে তালিকা লিখতে থাকে। রাস্তা মেরামতি থেকে ইন্দিরা আবাস যোজনার ঘর, সব কিছুর তালিকা করে।

বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী থেকে প্রশ্ন, কী কইরবেন দিদিমুনি উয়া লিইখে? সিনিমার মতুন কইরে সব একদিনে মিট্যে দিবেন না কি? হা হা করে হেসে ওঠে চারপাশ।

না আমি সমস্ত কিছু পঞ্চায়েত এর উঁচুতলার দপ্তরে পাঠাব, বলে মোহনা।

ঞ্চায়েত থিইক্যে উঁচু তলায় পাঠাইলতে দিবে আপনাকে? হা হা করে হেসে ওঠে সকলে।

মোহনা আর উত্তর করে না। কত বড় সমস্যার সামনে ও দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে। বেলা পড়ে আসছে। গ্রামে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধে নেমে আসে। আবার সেই সাইকেলে চেপে ফিরতে হবে। বাৎসরিক গ্রামসভা শেষ করে মোহনা।

কিছু মহিলা এগিয়ে আসে। বিটির মুখ খান শুকাইল গেইলছে। ভয় পেইলছে বিটিডা গো! কিছু খাবা বিটি? মা এর ছেইলে কখুন সকাল খানে খেইয়ে বেইরেছো

না গো। এখন আর কিছু খাব না

মরা গরীব বুলে, লয়?

ছি ছি! কী যে বল তোমরা!আরেকদিন আসব। তোমাদের গ্রাম দেখব ঘুরে ঘুরে

ইসবা বিটি? আমদের গিরাম দেশ দেখতে ভাল লাইগবে তুমার?

হ্যাঁ গো, আসব। আচ্ছা এই খালটা কোথা থেকে শুরু কোথায় শেষ?

হুইজি জলঙ্গী নদী থিইকে ইদিক পানে এই খালটা হইলছে, আবার পদ্মার সাথেও জুড়ে আছে । ভরা বর্ষা হইল্যে পদ্মার পানিতে খাল ভরে যায় বিটি

দ্মা কতদূর এখান থেকে?

বেশি দূর তো লয় বিটি। যাবা একদিন? আমার বড় বেটা লছিমন চালায়। উয়ার সাথে দেইখ্যে এস, আর কি রে বিটি ভাঙ্গনে সব লিল। আমাদিগের সুনার ফলন্ত জমি জিরেত

পদ্মার ভয়াবহ ভাঙ্গনের কথা শুনেছে মোহনা। এরা সেই পদ্মা পাড়ের ভাঙ্গনের ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আশেপাশের গ্রামগুলোতে বসতি গড়েছে। তার মানে শুধু বাথান ডিহি নয় আসে পাশের গ্রামগুলোতেও প্রায় একই রকম জনরোষ পুঞ্জিভুত।

ঞ্চায়েত অফিসে যেও তোমরা। কোনো অসুবিধে হলে আমাকে জানিও, নইলে পোলিও খাওয়াতে আসে গোলাপি শাড়ি পড়া দিদিমনিদের বল তোমাদের অভাব অভিযোগের কথা, আমি ঠিক আসব তোমাদের গ্রামে

মোহনা সাইকেলে চাপে। আবার এবড়ো-খেবড়ো পথ, খানা-খন্দ পেরিয়ে ফিরতে হবে। ক্লান্ত অবষন্ন হয়ে আসছে মোহনা। এ গ্রাম কোন গ্রাম? এ পশ্চিমবাংলাকে মোহনা আগে জানত না। কতজনই বা এই গ্রাম বাংলার খোঁজ জানে। পদ্মা কতদূর? পদ্মা পেরোলেই ওপার বাংলা! পদ্মার জলের রঙ কেমন। জলঙ্গীর এই খালের সঙ্গেই কি সেই চাঁদ সদাগরের গল্প কাহিনি জড়ানো সেই মাঝের হাটের বিলের কোনো যোগ আছে? জানা হল না মোহনার।

গ্রাম পেরিয়ে বড় সড়কে এসে ট্রেকারে তুলে দেয় মোহনাকে সঙ্গের কর্মচারিটি। যাতায়াতে মুখ চেনা হয়ে গেছে। ট্রেকারের খালাসিটা বলে, বাথান ডিহি খতরনাক গিরাম দিদিমুনি, গিইয়েছিলেন কেন? আর কখুনো যাবেন না

চুপ করে থাকে মোহনা। যেতে ওকে হবেই। মাঝের হাটের চাঁদ সদাগরের ডিঙা ভিড়েছিল যে বিলে সেই বিল দেখতে, বাথান ডিহি যেখানে পদ্মার ভাঙ্গনে জমি জিরেত হারানো লোকজন এসে বসতি গড়েছে, যে খালে ভরা বর্ষায় পদ্মার পানি উপচে আসে, সেখানে যেতে হবেই মোহনাকে।

ফ্ল্যাটের তালা খুলে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে মোহনা। বৃন্দাকে মোবাইলে মেসেজ টাইপ করে জানিয়ে দেয় ও নিরাপদে ফিরেছেবাড়িতে বাবা-মাকে প্রতিদিনের মত ফোন করে জানিয়ে দেয় অফিস থেকে ঘরে ফেরার কথা। কাউকেই মোহনা ওর অভিজ্ঞতা জানায় না। কাছের জনরা দূরে থাকলে অযথা বিভ্রান্ত হয়। কাছের জনদের ভাল রাখার জন্য মোহনার দূরে সরে আসা। ট্রেনের হুইসল কানে আসে। কাছে মূল গঙ্গা। গঙ্গা পেরোলেই এক বড় জংশন স্টেশন। উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনগুলো ওইদিক দিয়ে যায়। তীব্র হুইসল কানে আসে। রাত বাড়লে স্টেশন থেকে ট্রেন আসা যাওয়ার ঘোষণাগুলোও স্পষ্ট শোনা যায়। হাসি পায় মোহনার। এপার গঙ্গার পাড়, ওপার পদ্মার পাড়গঙ্গা পদ্মার মাঝখানে বাস মোহনার। দুই পার জুড়ে যাতায়াত মোহনার। এপারে গঙ্গার ভাঙ্গন ওপারে পদ্মার ভাঙ্গন। মোহনার বুঝি ভাঙ্গন নেই। এক নদী দুই ভাগ হল। ভাগীরথী আর পদ্মা নাম নিয়ে বয়ে চলেছে অসংখ্য শাখা-উপশাখা নিয়ে। রাত বাড়লে তিনতলার ছাদে গিয়ে দাঁড়ায় মোহনাগঙ্গার ওপারে জংশন থেকে ঘোষণা ভেসে আসে তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস কখন যাবে এদিক দিয়ে। আকাশের দিকে তাকায় মোহনা। ছোট্ট মোহনাকে ওর বাবা রোজ রাতে আকাশ দেখাতে ছাদে নিয়ে যেতেন। তারা চেনাতেন। চেনা তারা, অচেনা তারা, নতুন তারা সব আলাদা আলাদা করে রাখত মোহনা। যেন ছোট্ট মোহনাই পারে ওই বিশাল মহাকাশটাকে যত্ন করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে। এখন সেই মহাকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে মোহনা। বসন্ত রাত্রি, জ্যোৎস্নায় ভেসে যায় চরাচর। তীব্র হুইসল দিতে দিতে কোনো ট্রেন চলে গেল ওপার দিয়ে। মরি হায় বসন্তের দিন চলে যায়, যায় গো… মাথার ওপর ওই অসংখ্য তারা জ্বলা মহাকাশ, মোহনার একপাশে গঙ্গা আরেক পাশে পদ্মা বিপুল বেগে প্রবাহিত। মাঝে মোহনা। উৎস থেকে সাগর সঙ্গমের দিকে পাড়ি দিয়েছে সে

(ক্রমশ…)

 
 
top