মোহনা

 

দেহীর দেহ যেভাবে কৌমার, যৌবন ও জরার মাধ্যমে তার রূপ পরিবর্তন করে চলে, মৃত্যুকালে তেমনই ওই দেহী (আত্মা) এক দেহ থেকে অন্য কোনও দেহে দেহান্তরিত হয়। স্থিতপ্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা কখনও এই পরিবর্তনে মুহ্যমান হন না

দেহিনোহস্মিন যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা

তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি।।

গীতা পাঠ করে প্রতিটি শ্লোকের ব্যখ্যা করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন পণ্ডিত নৃপেন্দ্র ভট্টাচার্য কে শুনছে, কে শুনছে না সেদিকে তাঁর কোনো দৃষ্টি নেই মগ্ন হয়ে পাঠ করছেন মোহনার কানে পৌঁছচ্ছে শ্লোক, ব্যাখ্যা। শ্রাদ্ধ শেষ। মোহনাই মুখাগ্নি করেছে। মোহনাকেই শ্রাদ্ধ করতে হল। অপঘাত মৃত্যু। তিনদিনে সব পারলৌকিক ক্রিয়া কর্ম সমাপ্ত। এত শোক, এত স্তব্ধতা। চারপাশে আত্মীয় পরিজন সকলেই আছে নীরবে যে যার দায়িত্ব পালন করে চলেছে। মোহনার সামনে আসছে না কেউ। মোহনার কানে গীতার শ্লোক আর তার ব্যাখ্যা:

যে মানুষ জীবাত্মা ও পরমাত্মার স্বরূপ এবং পরা ও অপরা উভয় প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পুর্ণভাবে অবগত, তাঁকে বলা হয় ধীর। এই প্রকার মানুষ জড় দেহের পরিবর্তনের জন্য কখনো শোক করেন না

পণ্ডিত নৃপেন ভট্টাচার্য পাঠ ও ব্যাখ্যা করে চলেছেন একমনে। সপ্তর্ষিকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এই পিতৃতুল্য মানুষটি। ওনার ছেলের বাল্যবন্ধু সপ্তর্ষি। মোহনাকে নিয়ে যেদিন প্রথম গিয়েছিল সপ্তর্ষি ওনার কাছে উনি মোহনার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন, তি তীব্র হোক। প্রবাহিত হও, এগিয়ে চলো সপ্তর্ষির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আপন বেগে পাগলপারা নদীটিকে খুঁজে পেলে কোথায় হে?

আজ নৃপেন্দ্র ভট্টাচার্য স্বেচ্ছায় এসেছেন সারাদিন একমনে গীতা পাঠ করছেন। ব্যাখ্যা করছেন। হয়তো নিজেকে স্থির করতে, সপ্তর্ষি ওনার পুত্রসম। কখনও নিজের পুত্রটির থেকে আলাদা করে ভাবেননি সপ্তর্ষিকে। এ পুত্রশোক উনি সহ্য করতে এসেছেন। এই শোকে মুহ্যমান পরিবেশকে শান্ত করতে এসেছেন। মোহনাকে তার প্রবাহে ফেরাতে এসেছেন। মোহনাকে প্রবাহিত করতে এসেছেন। মোহনা কি আদৌ শুনছে গীতার শ্লোক? ব্যাখ্যা?

স্থিতপ্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা কখনও এই পরিবর্তনে মুহ্যমান হন না

মোহনা তো স্থিতপ্রজ্ঞ পণ্ডিত নয়। কেন সপ্তর্ষির দেহ দেহান্তরিত হবে? কেন হল? নৃতত্ব নিয়ে কত কী পড়াশোনার ছিল যে সপ্তর্ষির, কত কী কাজ করার আছে বলেছিল। সঙ্গে ছিল কত সব তথ্যচিত্র বানানোর নেশা। গৌড়ের শেষ স্বাধীন রাজা শশাংক। তাকে নিয়ে কত সব পড়াশোনা। কত সব কিছু বলছিল মোহনাকে গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ। কী এমন আছে সেখানে?

বিনাশি তু তদ্বিদ্ধি যেন সর্বমিদং ততং

বিনাশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিত কর্তুমর্হতি।।

যা সমগ্র শরীরে পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে,তাকে তুমি অবিনাশী বলে জানবে। সেই অব্যয় আত্মাকে কেউ বিনাশ করতে সক্ষম নয়… নৃপেন্দ্র ভট্টাচার্য পাঠ করে চলেছেন একমনে।

 

পনিই রাঙা দিদিমুনি?

চমকে মুখ তুলে তাকায় মোহনা। অফিসে ফাইলের মধ্যে মুখ গুঁজে বসেছিল। এখন চৈত্রমাস। আজ সেই ভয়ংকর দিন। বছর দুয়েক আগে যেদিন সপ্তর্ষির দেহ দেহান্তরিত হল। সবটা ছায়াছবি। ঘটমান অতীত। ঘটমান বর্তমানে ফেরে মোহনা।

না, আমি তো নই উত্তর দেয়

এক গ্রাম্য অল্পবয়সি বধূ।

তালি যে আমার মানুষটা বইল্ল ই অপিসে একজন রাঙা দিদিমুনি এয়েছেন নতুন

এই গ্রাম্য অফিসটিতে মোহনাই নতুন জয়েন করেছে। তাহলে ওকেই বলছে বধূটি। হাসি পেয়ে গেল মোহনার।

জিজ্ঞেস করে, রাঙা দিদিমনির কাছে কী দরকার বলো?

কখান সাট্টিফিট। শাশড়ি মারা গেইলছে। ইখান থিকে দিইবে বুলল গিরামের নিম্বার

তড়িঘড়ি জুব্বান চাচা ঢোকে মোহনার ঘরে। সবচেয়ে প্রবীন কর্মচারী। এক সময় চৌকিদারি করত। চৌকিদারি প্রথা উঠে যায়। সরকার থেকে পঞ্চায়েত অফিসে বহাল করে। এ তল্লাট যেন ওই জুব্বান চাচারই এক্তিয়ারের একমাত্র। এই গ্রামের মানুষদের ভাষা বুঝতে পারে না মোহনা। তালগোল পাকিয়ে যায়। জুব্বান চাচা ভরসা।

বুঝলে না বিটি? ওর শাশুড়ি মারা গেছে। ডেথ সার্টিফিকেট নিতে এসেছে, নিম্বার মানে ওই এলাকার মেম্বার

এতক্ষণে বোধগম্য হয় মোহনার।

বে, তোমার ভোটার আই কার্ড, তোমার স্বামীর ভোটার আই কার্ড আর তোমার শ্বাশুড়ির ভোটার আই কার্ড নিয়ে এসো, এই নাও ফর্ম। এটা গ্রামের মেম্বারকে দিয়ে পূরন করে এনো, তাহলেই ডেথ সার্টিফিকেট দিতে পারব আমি

যথাসাধ্য বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে মোহনা। জুব্বান চাচা আবার দোভাষির মতো গ্রাম্য ভাষায় বুঝিয়ে দেয় বউটিকে।

তালি আপনিই রাঙা দিদিমুনি, লয়?

বউটির সরল প্রশ্ন। হাসি পায় মোহনার।

জুব্বান চাচা হেসে বলে, বিটি গ্রামের মানুষ এই নামে ডাকতে শুরু করেছে তোমাকে

তোমাদের বাড়ি কোনদিকে? কী নাম তোমাদের এলাকার? মোহনা জিজ্ঞেস করে।

মাঝেরহাটউই যিখেনে বড়ো বিলটা আছে। যিখেনে হেঁদুদের কোনো রাজার নৌকা ভিড়েছিইল, সিখেনে

বউটা বলতে থাকে হুড়মুড়িয়ে। মোহনা জুব্বান চাচার দিকে তাকায়।

জুব্বান চাচা বউটিকে বলে, মি বুঝিয়ে বলছি তোমাদের রাঙা দিদিমনিকে। এখন তুমি যাও

নির্দিষ্ট ফর্ম হাতে ধরিয়ে দেয় জুব্বান চাচা। বউটি চলে যায়। বার্থ আর ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করা কাজ মোহনার, সঙ্গে জনস্বাস্থ্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি গ্রামবাসীদের মধ্যে। শহর থেকে বহু দূরে অজ গ্রামে চলে এসেছে এই কাজ নিয়ে। জন্ম মৃত্যুর হিসেব রাখে ও। দেহ ছেড়ে যায়। দেহ আসে। মোহনা তার হিসেব রাখে

বুঝলে বিটি ওই মাঝেরহাটে কত লাঠিখেলা দেখিয়েছি। বয়স ছিল বিটি, লাঠি ধরলে আর কাছে ভিড়ত না কেউ জুব্বান চাচা বলে।

মোহনা শুনেছে এখানে এসে জুব্বান চাচার লাঠিখেলার গল্প। লাঠি হাতে নিলে নাকি জুব্বান চাচার অন্যরূপ। ওস্তাদ খেলিয়ে।

বিটি বলেছি তোমাকে কেহ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না। এই বুড়ো হাতে লাঠি ধরলে আজও দশটাকে ফেলতে পারি, কত শালার ব্যাটা শালাকে এই লাঠির ঘায়ে জব্দ করেছি

জুব্বান চাচা তার লাঠি খেলার গল্পে প্রায়ই আবেগপ্রবন হয়ে পড়ে।

হা চাচা, এটা সরকারি অফিস, তোমার গা থেকে চৌকিদারি গন্ধ গেল না!

বলতে বলতে মোহনার ঘরে ঢোকে আরেক কর্মচারী। সেও কাছাকাছিই থাকে।

মাঝেরহাটের গল্প কী বলছিল সোহরাবের বউ? সে মোহনাকে জিজ্ঞেস করে।

সেখানে নাকি কোন হিন্দু রাজার নৌকো ভিড়েছিল বলল, কোন দিঘিতে, কিছুই বুঝলাম না  

চাঁদসদাগর তাঁর সপ্তডিঙ্গা মধুকর নিয়ে এ পথ দিয়ে গিয়েছিলেন এমনই গল্প প্রচলিত এখানে, ওই দিঘির সঙ্গে মূল জলঙ্গী নদীর যোগ ছিল কোনো এক যুগে, আমার বাড়ি ওই মাঝেরহাট গ্রামেই বলে কর্মচারীটি।

অবাক হয়ে শোনে মোহনা। মঙ্গলকাব্যের সেই চাঁদ সদাগর, সেই একরোখা জেদি মানুষটা, আর প্রবল জেদি ব্রাত্য সমাজের দেবী মনসা। আনমনা হয় মোহনা।

জ মনসামঙ্গল পালাগান হবে গ্রামে, বলে কর্মচারীটি।

ফাইলে মুখ গোঁজে মোহনা। জুব্বান চাচা আর আরেকটি কর্মচারী চলে যায় নিজের নিজের কাজে। জন্ম মৃত্যুর হিসাব কষে মোহনা। রিপোর্ট পাঠাতে হয় প্রতি মাসে জেলায়। দেহ আসে দেহ যায়। তার হিসাব। সপ্তডিঙ্গা মধুকর নিয়ে এ পথ দিয়ে গিয়েছিলেন চাঁদ সদাগর। হিসেব কষতে কষতে ভাবে। হিসেব ভুল হয় মোহনার। দেহের যাওয়া-আসার হিসেব রাখার কাজ স্বেচ্ছায় নিয়েছে ও। ভুল হলে হবে কেন?

সুতলিয়া নাগে কৈল গলার সুতলি

দেবী বিচিত্র নাগে কৈল বক্ষের কাঁচুলি।।

পদ্মনাগে কৈল দেবীর সুন্দর কিংকিনি।

কেতনাগ দিয়া কৈল কাঁকলি কাচুনী।।

নিম্নশ্রেণির ব্রাত্য শ্রেণির দেবীর রূপ বর্ণনা মনে পড়ে মোহনার। মনসা খুব আকর্ষণীয় চরিত্র তার কাছে। ততোধিক আকর্ষণীয় চাঁদ বেনে। সেই চাঁদ বেনের ডিঙ্গা নাকি ভেসে গেছে এই গ্রাম দেশের কোনো নদীর শাখা-প্রশাখা হয়ে। বেলা পড়ে আসছে। চৈত্রের গনগনে দাবদাহ ঝিমিয়ে এসেছে। মোহনা কাজ গুছিয়ে নিতে থাকে। জনস্বাস্থ্য জনসচেতনতা নিয়ে সভা আছে কয়েকদিনের মধ্যেই। গ্রামের স্বাস্থ্য কর্মীদের নিয়ে বসতে হবে ওকে। মাঝেরহাট এলাকায় কোন কোন স্বাস্থ্য কর্মী আছে জেনে নিতে হবে ওকে। পাপিষ্ঠা মনসা পাষাণ তার হিয়াদেবী মহিমায় মহিমান্বিত হতে চেয়েছে সে। সমাজের নিম্নবর্গের ব্রাত্যজনের পূজনীয়া হয়েও সে দেবীগৌরবে গৌরবান্বিত হয়নি কেন? কেন তাকে সমাজের উচ্চবর্গের শ্রেষ্ঠ মানুষটি পূজা না করলে দেবসমাজে ঠাঁই মিলবে না? ভাবে মোহনা। অন্যদিকে প্রবল পরাক্রমী চাঁদ সদাগর, পর্বতের ন্যায় অটল, দৃঢ়। এই দুই প্রবল ব্যক্তিত্বের টানাপোড়েনের মাঝখান দিয়ে ভেসে গেল ভেলা, উজানে বইল, উলটো দিকে। মোহনার দিকে গেল না সে। নদীর উৎসের সন্ধানে ভেলা ভাসল। মোহনার জন্ম মৃত্যুর হিসেব ভুল হয়ে যায় বারবার। কোনদিকে বইবে মোহনা? শেষ থেকে শুরুর দিকে, না কি শুরু থেকে শেষের দিকে। নদীর উৎস সন্ধানে? নাকি মোহনার দিকে

(ক্রমশ…)

 
 
top