ড্রিভন

 

এই মুহূর্তে রাজারহাট সিসিটু-র পাশের সারভিস রোড দিয়ে পুব-পশ্চিম বরাবর ছুটে যে মেয়েটি সবুজ মাঠে ঢুকে পড়েছে, তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, সে স্পোর্টসম্যান।

থুড়ি, মেয়ে যখন স্পোর্টসউওম্যান-ই বলা ভালো। তবে কাটা কাটা চোখ-নাক-মুখের প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট মেয়েটা যে ক্ষিপ্রতায় কোনো ম্যানের থেকে কম হবে না, তা ওর ছোটার ভঙ্গি দেখলেই বিলক্ষণ বোঝা যায়।

কানে ইয়ারপ্লাগ গুঁজে বিদেশি ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক শুনতে শুনতে এমনভাবে দৌড়চ্ছে ও, যেন ওর কোনো তাড়া নেই, অথচ জানুয়ারির এই শীতের সকালে ঘাসের ডগায় লেগে থাকা শিশিরে একটিবারের জন্যও কিন্তু ওর চেটো পড়ছে না। শিশিরবিন্দুকে প্রথমে ভাঙছে ওর টো—সবুজ কেডস পরা ওর বুড়ো আঙুল।

ও ছুটছে, মাঝে মাঝে চোখের ওপর থেকে সরিয়ে নিচ্ছে অবাধ্য চুল। হলুদ কাপ্রির সঙ্গে পরা গায়ের সঙ্গে সাঁটানো জ্যাকেটটার চেন অনেকটা নামানো। ফলে ভেতরের কালো ভেস্ট প্রতীয়মান হচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে অ্যাথলিটের মতো ওর স্মিত বুকের সুনিয়ন্ত্রিত ওঠানামা।

না, মানতেই হবে, খাসা ফিজিক মেয়েটার—ছেলেরা তো বটেই, তেমন তেমন মেয়েরাও যে-কোনো অজুহাতে বছর বাইশের এই যৌনপ্রতিমার সঙ্গে শুয়ে পড়তে চাইবে।

আপাতত ও কিন্তু দাঁড়িয়ে পড়েছে। মোবাইলের গান বন্ধ হয়ে সেখানে টিঁটিঁ টিঁটিঁ শব্দে একটা মেসেজের আগমনবার্তা ঘোষিত হয়েছে।

একটা নয়, পর পর তিনটে

STP

FND

BSH

ছোটা থামিয়ে বসে পড়ল মেয়েটা। মাঠের পাশে একটা সিমেন্টের বেদিতে। একটা কিছু ভাবছে। এক, দুই, তিনএ রকম আরও কয়েকটা মুহূর্ত। তারপর মাঠ পেরিয়ে, মাটির ঢিবি পেরিয়ে ও খুঁজতে খুঁজতে চলে এল সেইখানটায়, যেখানে জমি ঢালু হয়ে ক্রমেই নীচু হয়ে গেছে, যেখানে জলা জমিতে প্রায় একমানুষ সমান ঘাস হয়ে রয়েছে

ঘাড় নীচু করে খুঁজতে লেগে গেল ও। যদিও কী খুঁজছে, আর কেনই-বা খুঁজছে তা সে জানে না। শুধু কোনো এক অজানা কারণে অচেনা নাম্বার থেকে হঠাৎ আসতে থাকা এই মেসেজগুলোকে কোনোভাবেই ও অগ্রাহ্য করতে পারছিল না।

ঝোপের মধ্যে হাতড়াতে হাতড়াতে ও পেয়ে গেল একটা ব্যাগ। কালো চামড়ার। ওয়ালেটের থেকে একটু বড়ো। বেশ ভারী। কী আছে ভেতরে? ওর আঙুল চেনটা ছুঁতে যেতেই আবার টিঁটিঁ

NT YRS

যন্ত্রচালিতের মতো ওর হাত সরে এলআর তারপর এক পা এক পা করে ও পিছিয়ে আসতে থাকে সার্ভিস রোডের দিকে।

ও জানে না ব্যাগটা নিয়ে এখন ও কী করবে? ওকে কিছু ভাবার সুযোগ না-দিয়েই একটা ট্যাক্সি হঠাৎ ঘ্যাঁচ করে ওর প্রায় ঘাড়ের ওপর এসে ব্রেক কষল।

ওর মুখ থেকে অবধারিতভাবেই বেরিয়ে আসছিল এফ দিয়ে শুরু হওয়া সেই ফোর লেটার ওয়ার্ডটাতক্ষুনি আবার টিঁটিঁ…

TK D KB

পেছনের দরজাটা যেন আপনা থেকেই খুলে গেল। ও ঢুকে পড়ল ইস্পাতের খাঁচাটার উষ্ণ গহ্বরে।

গাড়িটা গড়াতে শুরু করতেই

4/3 RDN ST

পাখিপড়ার মতো ও মেসেজে পাওয়া ঠিকানাটা ড্রাইভারকে বলল। ঘাড় নেড়ে ড্রাইভার গতি বাড়াল।

রোদের তেজ বেড়েছে। ও দাঁড়িয়ে আছে একটা পাঁচতলা বাড়ির  সামনে। কাপ্রির পকেটের ভেতরে স্পন্দন শুরু হতেই ও মোবাইলটা বার করে আনে।

থার্ড ফ্লোর। ফ্ল্যাট বি ওয়ানের দরজার ঠিক সামনে ও চলে এসেছে

PSH

দরজা ঠেলতেই খুলে যায়। সে ঢুকে পড়ে আধো আলো, আধো অন্ধকার একটা ঘরে। যেটুকু আলো সেটা লাললালচে

চোখ তাতেই সইয়ে নিয়ে সে আবিষ্কার করে ঘরে টিভি চলছে। সোফায় বসে আছে কেউ। টিভি দেখছে।

কী দেখছে?

স্ক্রিনটা ব্ল্যাংক। কোনো ছবি আসছে না। কেবল ফল্ট হলে যেমন হয়, ঝিরঝির করছে। তাহলে লোকটা কী দেখছে?

লোকটার শীর্ণ অবয়ব। অলসভাবে তার দিকে ঘুরে তাকিয়েছে। ঘাড় অবধি লম্বা চুল। গোঁফ, খোঁচা খোঁচা দাড়ি। একটা সবুজ রং ওঠা পাঞ্জাবির সঙ্গে পরে আছে সাদা পাজামা।

লোকটা চোখের ইশারা করে লোকটা সেন্টার টেবিলটা দেখাল ব্যাগটা সে ওখানে রাখে

মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে পরবর্তী মেসেজ…

FK

সে জ্যাকেটের চেনটাকে আনজিপ করে। কাপ্রির সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলে  কালো ভেস্টটাকেও।

শীর্ণ লোকটি জুলজুল চোখে তাকিয়ে দেখে, কালো অন্তর্বাস পরা একটা শরীর তার দিকে এগিয়ে আসছে লাল আলোটা লোকটার চোখে পড়ে চকচক করছে। লোকটার মুখ থেকে নাল  গড়িয়ে পড়ছে সবুজ পাঞ্জাবিতে।

সে পোশাক পরে নিয়েছে। নিষ্প্রাণ দেহটার গলায় জড়ানো তারের ফাঁসটা সাবধানে খুলে নেয় এবারতারপর প্লাগ কানে গুঁজে ফের গান শুনতে করে। গান তো ঠিক নয়। আবহ। কোনও এক ভিনদেশি সুরকার যেন মৃত্যুর কথা ভেবেই এইসব নোটেশন লিখেছেন

আবার বাইপাস। হাত দেখাতেই থেমে যায় ট্যাক্সি। পেছনের দরজাটা আপনা থেকেই যায় খুলে । সে ঢুকে পড়ে ইস্পাতের আর একটা খাঁচার উষ্ণ গহ্বরে। বাইরে চড়চড় করছে রোদ। যেন গ্রীষ্মকাল। জ্যাকেটটা খুলে পাশে রাখতে যেতেই হাত একটা ব্যাগে ঠেকে। কাপড়ের বটুয়ার মতো দেখতে। গোলাপি রঙেরহাত সরিয়ে নিতেই টিঁটিঁ।

NJY

এসক্যালেটরে এই সে ওপরে উঠছে। ওপরের তলায়। কাচের দরজা। সেটাকে ঠেলে সে চলে আসে উন্মুক্ত লবিতে। রোদ এখন অতটা চড়া নয়। হাওয়া দিচ্ছে। সূর্য আসতে আসতে ঢলছে আকাশের পশ্চিম কোণে।

এখানে বসে কেউ ট্যাবে আঙুল ছোঁয়াচ্ছে, কেউ নিমগ্ন বন্ধুর সঙ্গে প্রেমালাপে।

তার চোখ আটকে যায় দেওয়ালের সঙ্গে আটকানো একটা দানবীয় আকৃতির ফ্লেক্সে। নেকলেস গলায় জনপ্রিয় এক বলিউড দিভা। জুয়েলারির বিজ্ঞাপন। অপার্থিব সেই অলংকার তার আঙুল ছুঁয়ে দেখে।

কিছুক্ষণ পর আর একটা কাচের দরজা ঠেলে সে ঢুকে পড়ে শপিং জোনে। তার দু-হাত ভরে উঠতে থাকে একের পর এক ক্যারিব্যাগে। কসমেটিক্স, জুয়েলারি, পোশাক ছাড়াও তাতে রয়ে যায় বেশ কয়েক জোড়া কালো অন্তর্বাস।

HM

বাড়ি।

ফেরার পথে যে গাড়িটা মল থেকে কমপ্লেক্সের গেট অবধি তাকে লিফট দিয়েছিল, সেখানেই দেখা অদ্ভুতদর্শন একটা লোকের সঙ্গে। লোকটাই গায়ে পড়ে তার সঙ্গে আলাপ জমাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

হাই!

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই নীল চেক শার্টের সঙ্গে ঘন নীল রঙের স্যুট পরা কুচকুচে কালো লোকটাকে সে প্রথম খেয়াল করে। ধবধবে শাদা দাঁত বার করে কৃতার্থের মতো লোকটা তার দিকে চেয়ে।

হা, ম্যাডাম!

ভুরুটা ধনুকের মতো বাঁকিয়ে সে সোজা করে নেয়। লোকটার কালো মুখ ফ্যাকাসে মেরে গিয়ে বেগুনি হয়ে যায়। কাঁচুমাচু মুখ করে লোকটা বলে, রি, ম্যাডাম! আসলে আমি আপনার ঠিক পরের কমপ্লেক্সটাতেই থাকি। আপনাকে রোজ দেখি। এখানেই কোথাও আপনার অফিস বোধ হয়

সে কানে ইয়ারপ্লাগটা গুঁজে দেয়। স্ট্রেঞ্জারদের সঙ্গে কথা বলার অভ্যেস এখনও সে রপ্ত করতে পারেনি।

বাড়ি মানেই স্নান। শাওয়ারের গরম জলে ধুয়ে ফেলা সারাদিনের যাবতীয় মালিন্য। তারপর তোয়ালে জড়িয়ে চলে আসা বেডরুমে। ওয়ারড্রোব থেকে বের করে নেওয়া পছন্দসই রাতপোশাক।

অত:পর কফিতে চুমুক। মাফিনে কামড়। টিভিতে সিরিয়াল। তারপর ডেস্কটপ অন। প্রথমে মেল, তারপর টুইটার, শেষে ফেসবুক। মেসেজবক্সে উঁকিঝুঁকি। না, ফাঁকা। তারপর ফ্রেন্ডলিস্টে গিয়ে একের পর এক শুধু আনফ্রেন্ড করে যাওয়া।

শরীরটা ক্লান্ত হয়ে আসছে। দু-চোখ বেয়ে নেমে আসছে ঘুম—রাত্রির অন্ধকারে জাহাজের দিকে ভেসে আসা এক অচিন আইসবার্গের মতো, যার একভাগ জলের ওপর, বাকি তিনভাগ অতল গভীরে।

ইউপিএস বন্ধ করে প্রায় টলতে টলতে সে এগোতে থাকে বেডরুমের দিকে

পোশাক পরেই শুয়ে পড়ার দিশি অভ্যেস তার কোনোকালে ছিল না। তাই লেপের তলায় এখন সে সম্পূর্ণ নগ্ন। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল ছিল না। ঘুম ভাঙল সেই টিঁটিঁ আওয়াজে। একটা নয়, পরপর তিনটে।

LV

YR

BDY

নাভি ছাড়িয়ে তার মধ্যমা চলে এল সেইখানটায় যেখানে জমি ঢালু হয়ে ক্রমেই নীচু হয়ে গেছে, যেখানে জলা জমিতে প্রায় একমানুষ সমান ঘাস হয়ে রয়েছে।

এখানেই ঝোপের মধ্যে সে খুঁজে নিল উষ্ণ গহ্বর। সুড়ঙ্গসন্ধানী শিকারির মতো কখনো মধ্যমা, কখনো তর্জনী, কখনো-বা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ড্রেজিং মেশিনের মতো যান্ত্রিক সূক্ষতায় খুঁড়ে চলতে লাগল তার গভীর, তার অতল অভ্যন্তর।

এটা স্বপ্ন কিনা সে নিশ্চিত নয়। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এটা স্বপ্ন। কেননা তার স্পষ্ট মনে আছে বাস্তবে সে মাঠ পেরিয়ে, মাটির ঢিবি পেরিয়ে তবে জলা জমিটায় নেমেছিল।

কিন্তু এখানে (মানে স্বপ্নটাতে, অবশ্য এটা যদি স্বপ্ন হয়) সে মাটির ঢিবিটা পেরোচ্ছে না। সেটায় উঠছে। আর কী কাণ্ড! যত উঠছে, সাদা ঢিবিটা যেন ততই লম্বা হয়ে যাচ্ছে!

তাহলে কি সে কখনোই এটার মাথায় উঠতে পারবে না?

না, তাও নয়। এই তো পেরেছে। এখন সে শীর্ষে।

হাওয়া বইছে। ঠান্ডা হাওয়া। এ রকম বাতাসেই কি লেগে থাকে মৃত্যু মৃত্যু গন্ধ?

ধুর! সে তো শীর্ষে। মৃত্যুর কথা মনে করে সাদা-সাদা কুয়াশার মতো, পেঁজা পেঁজা তুলোর মতো, আইসক্রিমের ক্রিমের মতো, শ্যাম্পেনের ফেনার মতো ক্রমশই নরম, আরও নরম হয়ে আসা শৃঙ্গজয়ী উত্তুঙ্গ এই আনন্দকে খামোকা মাটি করতে যাবে কেন?

আরে একী! ঢিবিটা টলমল করে উঠল না? নাকি তার মাথাটাই একবার ঘুরপাক খেয়ে গেল?

হাওয়াটা শন শন করে বইছে। মৃত্যু মৃত্যু গন্ধটা কোথা থেকে আবার তার নাকে এসে ঢুকে পড়ছে

গাঁজার দমের মতো, হুইস্কির কিকের মতো গন্ধটা তাকে বেসামাল করে দিচ্ছে। তার মনে হচ্ছে এখন চাইলেই সে উড়তে পারবে। ভেসে থাকতে পারবে। শূন্যে। অনন্ত গগনে

ঠিক এই সময় তার চোখ হঠাৎ নীচের দিকে চলে গেল। পৃথিবীচেনা পৃথিবী। অনেক নীচে অনেক দূরে। এখান থেকে, এই শীর্ষ থেকে পা বাড়ালে সেখানে কি পৌছনো যায়? কাপ্রির পকেটের গভীরে ছটফট করতে শুরু করে দিয়েছে যন্ত্রটা। টিঁটিঁ। আলোকিত স্ক্রিনে মেসেজ।

JMP

ঘুম ভাঙতেই দেখে কাচের জানলার মধ্য দিয়ে ঝাঁপ দিয়ে ইতিমধ্যেই ঘরে ঢুকে পড়েছে রোদ। তার মানে সকাল অনেক্ষণ আগে হয়েছে। কুয়াশার সংক্ষিপ্ত উপস্থিতির পর ফলো অন এড়াতে এখন রোদ্দুর ব্যাট করতে নেমেছে।

তাহলে তো অফিসে আজ নির্ঘাত লেটবসের বকুনি। কলিগদের টিকা-টিপ্পনি। সে দ্রুত তৈরি হতে থাকে।

খানিক পরেই ফিট বিবিটি হয়ে সে নীচে নেমে আসে। কমপ্লেক্সের গেট পেরিয়ে সোজা বাইরে।

রোদ্দুরে ধাঁধিয়েই যেতে পারে চোখ। তাই কালো গগলস। চুলটা আজ ছেড়ে রাখা। পোশাকটাও পুরোপুরি ফরমাল নয়। কাঁধে একটা স্টাইলিশ সাইডব্যাগ। সব মিলিয়ে জবরদস্ত।

ইয়ারপ্লাগটা বরাবরের মতো কানে গোঁজা। আজ একটা বেশ চারমিং মিউজিক বাজছে। ট্যাক্সি? সুমো? নাকি বাস? বাসই ভালো। না, অ্যাপস দিয়ে বুক করা ক্যাবগুলো এখানে পাওয়া যায় না। পেলে সুবিধে হত। তবে, বাস আজ বেশ রেগুলার। একটা ঝাঁ- চকচকে নীল এসি বাসেই সে উঠে পড়ল।

অফিসের গেটের সামনে নেমে দেখল, না, লেট হয়নি। গেট দিয়ে ঢুকতেই ওয়াচম্যানদের স্যালুট। হুমমমানে, অফিসে তার পজিশন মন্দ নয়।

আজ পর পর অনেকগুলো মিটিং। পর পর সাইন করাতে থাকা অনেকগুলো কন্ট্রাক্ট। দুপুরে কনফারেন্স রুমে বোর্ড মিটিং। তার প্রেজেন্টেশনের পর স্বয়ং বসের উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি। তারপর বসকে ফলো করে অন্য সবারও স্ট্যান্ডিং ওভেশন।

থৈ, য়্যু আর জাস্ট আমেজিং! আমি আজই একটা ডিটেইল্ড প্রোজেকশন চাই

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। প্রজেক্ট জমা দিয়ে রাত্রির প্রথম প্রহরে যখন সে ছুটি পেল, তখন অফিস ফাঁকা। বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার গাড়ি যথারীতি গরহাজির।

অগত্যা বাইপাসে এসে লিফটের জন্য হাপিত্যেশ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকল না। বেশিক্ষণ অবিশ্যি দাঁড়াতে হল নাহেডলাইটে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে অচিরেই একটা অমনি ঘ্যাঁচ করে এসে ওর প্রায় ঘাড়ের ওপর ব্রেক কষল।

য়েলকাম, ম্যাডাম!

ইস্পাতের খাঁচার ভেতরে ধবধবে সাদা দাঁতের সেই কুচকুচে কালো অদ্ভুতদর্শন লোকটা। আজও ও পরে আছে সেই একই নীল চেক শার্টের সঙ্গে ঘন নীল রঙের স্যুট।

পনি, আবার?

বারবার, বারবার শুধু আপনার সঙ্গেই কী করে যে দেখা হয়ে যায়! আরে, দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? উঠে আসুন, প্লিজ!

সে উঠে আসে। সিটে বসতে না বসতেই লোকটার বকবকানি শুরু হয়ে যায়। প্রথমে ওয়েদার, তারপর আইপিএল-এ কেকেআর, তারপর হঠাৎ আচমকা ইয়র্কারের মতো নির্লজ্জ ফ্ল্যাটারি।

কটা কথা বলব, ম্যাডাম?

থা?

হ্যাঁ, ম্যাডাম

কী কথা?

সেটাই বলব কিনা পারমিশন চাইছি

পারমিশন? ওকে, বলেই ফেলুন

থ্যাংক ইউ, ম্যাম! যদি অভয় দেন

ভয়? হোয়াট ইজ দ্যাট?

হো, আপনি তো নিঘ্ঘাত ইংলিশ মিডিয়াম। অভয় মানে হল গিয়ে আপনার অ প্লাস ভয়, মানে অ্যাবসেন্স অফ ফিয়ার। তার মানে ব্যাপারটা গিয়ে দাঁড়াল আপনার, ইফ ইউ অ্যালাউ মি টু টেল ইউ সামথিং উইদাউট ফিয়ার, মে আই আটার সাম ওয়ার্ডস?

হুমমনাউ আই আন্ডারস্ট্যান্ড। বলুন

পনাকে না আজকে খুব সুন্দর লাগছে!

সুন্দর? আর য়্যু শিয়র?

শিওর, ম্যাডাম! ইউ আর রিয়েলি বিউটিফুল!

নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোনায় হাসির রেখা ফুটে ওঠে। স্তূতি, তা সে যতই মেকি হোক না কেন, শুনতে ভালোই লাগেধবধবে সাদা দাঁতের কুচকুচে কালো লোকটা কি তার প্রেমে পড়ে গেল?

ধুত, এসব সে কী ভাবছে? আপাতত তার জন্য অপেক্ষা করে আছে একটা শাওয়ার, এক কাপ কফি আর তারপর গভীর একটা ঘুম। আজও কি সেই শৃঙ্গজয় নতুন করে হবে? নতুন করে পাওয়া অনিঃশেষ স্নোফল?

সামনের রেড সিগন্যালটাকে ভেঙে গাড়িটা হঠাৎ বিপজ্জনক একটা বাঁক নিল। তার মাথাটা ধাক্কা খেল গাড়ির ছাদে।

উঃ! ব্যথায় ককিয়ে উঠল সে। মুখ থেকে অবধারিতভাবেই বেরিয়ে আসছিল এফ দিয়ে শুরু হওয়া সেই ফোর লেটার ওয়ার্ডটা।

কিন্তু তার আগেই গোঁত্তা খাওয়া বোমারু বিমানের মতো কানের পরদায় ধাক্কা খেল ফিসফিসে একটা কণ্ঠস্বর

পনি এখনও বেঁচে আছেন, ম্যাডাম?

কে বলল কথাটা? বিস্ময়ে হাঁ হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখে কালো লোকটা জুলজুল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। গাড়িটা লাফানোর পর ওদের দূরত্ব কমে এসেছে। হ্যাঁ, কোনো সন্দেহ নেই, , -ই বলেছে কথাটা।

মানে?

পনি এখনও বেঁচে আছেন?

হোয়াট ডু ইয়ু মিন!

পনি কোনো এসএমএস পাননি?

সএমএস? কই নাতো! এসএমএসকে আপনি? কী বলতে চাইছেন?

রে, আরে, আরে ভয় পেয়ে গেলেন নাকি? আই ওয়জ জাস্ট জোকিং!

জোকিং? আর ইয়ু? আই ডোন্ট লাইক জোকস! ড্রাইভার, স্টপ দ্য কার! আমি নেমে যাব!

ম্যাডাম, ফ্লাইওভার ধরে নিয়েছি। এখন নামা যাবে না

তাহলে ফ্লাইওভারের শেষ হলে নামবআই জাস্ট ওয়ান্ট টু লিভ!

কে, ম্যাডাম!

লোকটা দূরে সরে গেছে। ওর কালো মুখ ফ্যাকাসে মেরে গিয়ে বেগুনি হয়ে গিয়েছে

ফ্লাইওভারটা শেষ আর হচ্ছে না। এ যেন এক অনন্ত যাত্রা। বাইরে হাওয়া বইছে। ঠান্ডা হাওয়া। ভেতরে সাফোকেশন লাগছিল বলে অনেক আগেই সে তার দিকের জানলাটা একটু ফাঁক করে রেখেছে।

কাঁচুমাচু মুখ করে লোকটা বলল, রি, ম্যাডাম! আসলে নাটক-টাটক করি তো। একটু রিহার্সাল দিয়ে নিলাম আর কী

সে কিছু বলল না। শুধু তার গলা থেকে খুকখুক একটু কাশির শব্দ বেরিয়ে এল।

রে, জানলাটা খোলা! ঠান্ডা হাওয়া আসছে

না, না, ইটস ওকে

কে বললে হবে? ঠান্ডা হাওয়া আসছে। সর্দি লেগে যাবে

ললাম তো ঠিক আছে

কিছুই ঠিক নেই, ম্যাডাম! দাঁড়ান, আপনার দিকের জানলাটা বন্ধ করে দিই

না! চিৎকার করে সে লোকটাকে থামাতে গেল। কিন্তু লোকটা তার ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। সে লোকটার কব্জিতে কামড় বসাল। লোকটা রক্ত ঝরতে থাকা কব্জিটা দিয়েই তার ডান কানের পর্দা ফাটিয়ে প্রচণ্ড একটা ঘুষি মারল। সে সর্বশক্তি দিয়ে লোকটার বুকে মাথা দিয়ে আঘাত করল। লোকটার ইস্পাতের মতো শরীর একটু টলে গিয়ে ওর পাল্লা এড়িয়ে টান মেরে পাশাপাশি খুলে ফেলল স্লাইডিং ডোর

তারপর একটা কিক। তার দেহটা পালকের মতো উড়ে গিয়ে প্রথমে ধাক্কা খেল রেলিং-এর সবচেয়ে ওপরের বারে। তারপর শিশিরে পড়া ঘাসের ওপর মিসড ক্যাচের মতো পিছলে গেল। টপকে গেল রেলিং

বাঁই বাঁই করে পাক খেতে খেতে ভাসতে লাগল শূন্যে অনন্তে। তারপর একসময় নামতে লাগল নীচে, ক্রমশ আরও নীচে।

নিথর হয়ে পৃথিবী ছুঁতে এখনও ওর অনেকটা দেরি। 

 
 
top