নবারুণ এবং বিদ্রোহ বিস্ফোরণের সম্ভবনা প্রভৃতি

 

খেলনানগর: রাষ্ট্রই যখন ঘটায় বিস্ফোরণ আর বানায় খেলার পুতুল

হারবার্ট, যুদ্ধ পরিস্থিতি, বা কাঙাল মালসাট-এর মতো বেশি পরিচিত উপন্যাসগুলির সূত্রে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ-বিস্ফোরণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনারত নবারুণ ভট্টাচার্যকেই আমরা বেশি করে চিনেছি, মনে রেখেছি। এই ধারার থেকে একটু ভিন্নধর্মী খেলনানগর নভেলেটটিতে এক অন্য নবারুণকে আমরা দেখি। রাষ্ট্রের দ্বারা শোষিত, নিপীড়িত, জর্জরিতদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ নয়, এখানে রাষ্ট্রকেই ঘাতক বিস্ফোরণকারী হিসেবে দেখিয়ে অসহায় মানুষের ধ্বংসলীলাকে সামনে এনেছেন নবারুণ। দেখিয়েছেন নির্মমতাকে। খেলনানগর উপন্যাসটির হিন্দি অনুবাদ খিলৌনা নগর প্রকাশের সময় মুখবন্ধে তিনি যা লিখেছিলেন তার তর্জমা করলে দাঁড়ায়:

বিষয়বস্তুকে যদি একটা শব্দে ধরতে চাই, তবে সেটা হল নির্মমতাঅসউইৎজ-ওসউইচেম এর মৃত্যু শিবির, ট্রেবলিংকা, গুলাগ, ভিয়েৎনাম বা হিরোশিমার নিষ্ঠুরতা। যে ক্রূরতা গত শতাব্দীতে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ নিয়েও তৃপ্ত হয়নি। সাম্রাজ্যবাদ আর তারই হাতে তৈরি সন্ত্রাসবাদ, না জানি ভবিষ্যতেও আরও কত কত এরকমই বীভৎসতা আর ত্রাসে ভরা দৃশ্য দেখাবেএখনো এ বিষয়ে আমাদের সঠিক কোনও আন্দাজই নেই। তবে এখনো পর্যন্ত যা ঘটে গেছে আর ভবিষ্যতে তা কতদূর পর্যন্ত ঘটবে, আমরা তার একটা অনুমান অবশ্য করতে পারি, আর তা পারলে শিউরে উঠতে হয়। সর্বগ্রাসী লোভ আর উন্মত্ত মতান্ধতার একদিকে বাণিজ্যিক গোলকায়ন আর অন্যদিকে বাড়তে থাকা নৃশংসতা, সমবেদনাহীনতা, জাতিবিদ্বেষ, জবাবদিহির দায় অস্বীকার করা। এই দুই দানবের নৃশংস তাণ্ডবে শুভবুদ্ধি দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এর পরিণতি কিন্তু এক বিশাল ধ্বংস। ব্ল্যাকহোলের অতল অন্ধকার! চরম নাস্তি! যখন জীবন্ত প্রাণী আর তাদের জীবনই ধ্বংস হয়ে যাবে, তখন কোথায় বসবে বাজার ? কেই বা মুনাফা লুটবে ?…সবারই ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

১৯৯৮ সালে শারদীয়া প্রতিদিন পত্রিকা পাতায় প্রথম প্রকাশিত হয় নবারুণের খেলনানগর উপন্যাসটি। কল্পকাহিনীর ছোট্ট এই নগরটি খেলনা বানানোর কারখানাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ১৯৯০-তে আর আখ্যান অনুসারে তা ধ্বংস হয়ে যায় ২০০৪ সালের ৪ ডিসেম্বর। প্রতিদিন- পাতায় উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশের ছয় বছর পরের এই দিনটিতেই গ্রন্থাকারে বেরোয় খেলনানগর। ধ্বংস হওয়ার আগেই অবশ্য প্রায় মৃত, পরিত্যক্ত এক নগরীতে পরিণত হয়েছিল খেলনানগর। আগুন লেগে খেলনা কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই সেখানে কমে আসে প্রাণচাঞ্চল্য। তারপর এর পশ্চিম প্রান্তে তৈরি করা হয় রাসায়নিক বর্জের আস্তাকুঁড়। বিষে আক্রান্ত হয় খেলনানগরের জল। নীল হয়ে যেতে থেকে অধিবাসীদের শরীর। ফ্ল্যাশব্যাকে নগরীর প্রাণচঞ্চল সময়টিকেও আমরা পেয়ে যাই নবাগত আগন্তুক উইনচিটারকে খেলনানগরের অধিবাসী বামনের দেওয়া কাহিনিসূত্রে।

১৯৯০ সালে একজন ব্যবসায়ী খেলনানগরের পত্তন করে। আগে এখানে কিছুই ছিল না। কয়েকটা টিলা, কাঁটাঝোপ, একটা পরিষ্কার জলের ছোট্ট নদী, তার স্বচ্ছ স্রোতের উল্টোদিকে কয়েকটা মাছের এগোনোর চেষ্টাএইরকমেরই আরও অনেক জায়গার মতো। তখন এই জায়গাটাকে ঘিরে ছিল বেশ কয়েকটা গ্রাম। সেইরকম একটি গ্রাম থেকেই খেলনা কারখানায় কাজ করতে এসেছিল সাদামুখ চরিত্রটির মতো বেশ কিছু মানুষ। যে ব্যবসায়ী খেলনা কারখানার পত্তন করেন তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা ছিল জাহাজ ভাঙার। ভাইদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তিনি তাঁর অংশ বেচে দিয়ে খেলনা কারখানা গড়ে তোলেন গ্রাম-ঘেরা এই শূন্য জনপদটিতে। খেলনা কারখানাটি ছিল দোতলা। দোতলায় ছিল মূল কারখানা, যেখানে তৈরি হত স্টাফড টয়। আর একতলায় ছিল খেলনা বানানোর কাঁচামালের গুদামঘর। সেখানে থরে থরে জমানো থাকত ফাইবার, ফোম রবার ও উলের কাপড়। শুরুর পর থেকেই কারখানার জেল্লা ছিল ভালো। এখানে তৈরি কুকুর, ভালুক, খরগোশ, হাতি, বাঁদর, কুমির, কচ্ছপ, পেঙ্গুইন, ডলফিন, জেব্রা, বেড়াল, তিমিমাছ, বাঘ, ক্যাঙারু ইত্যাদি নানারকম জীবজন্তুর আদলে তৈরি খেলনা দেশ ছাড়িয়ে পাড়ি দিত বিদেশেও। কানাডা আর ইতালিতে খেলনা রপ্তানি হত ভালো পরিমাণে। কারখানা রমরম করে চলত, ছিল শ্রমিক শোষণ আর বিক্ষোভের চেনা ছবি। কারখানা চালু হওয়ার কিছুদিন পরেই কম মজুরি দেওয়ার জন্য শ্রমিকেরা, বিশেষত মেয়েরা, ধর্মঘট করে। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর নতুন ম্যানেজার এনে পুনরায় চালু হয় কারখানা।

শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করার পদ্ধতি একেবারেই অহিংস ছিল না। বাইরে থেকে ব্যবসায়ী জনা দশেক দক্ষ পুরুষ শ্রমিক আনিয়েছিল। এখানে তাদের নামগত কোনো পরিচয় নেই, রক্তকরবী নাটকের কথা মনে করিয়ে দিয়ে আছে সংখ্যাগত পরিচয়। ধর্মঘটের সময় কারখানার সশস্ত্র গার্ডদের গুলিতে থেকে ৫ মারা যায়। গুন্ডা এনে শ্রমিকদের দমন করার প্রয়োজন বোধ করে মালিক, নিয়ে আসে হাতকাটা ও তার সঙ্গীদের। পরে রাস্তা অবরোধের আন্দোলনের সময় ৬ ও ৭ কে খুন করে তারা।

খেলনানগরের সূত্রে পুঁজিবাদী শোষণ তথা উৎপাদন পদ্ধতির দমনমূলক দিকগুলিকে প্রায় ছোটদের রূপকথার গল্পের সরল অনাড়ম্বর কায়দায় সরাসরি এখানে হাজির করা হয়েছে। যদিও কারখানা স্তরে এই শোষণ-দমন সামগ্রিক ও চরম নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার ভূমিকামাত্র। পরে নবারুণ আমাদের সামগ্রিক ধ্বংসের বিতত বিতংসটির মুখোমুখি করাবেন। তার আগে আমরা দুর্ঘটনার আড়ালে আসলে এক গণহত্যাকেই সংগঠিত হতে দেখি কারখানার মধ্যে। কারখানায় আগুন নেভানোর ব্যবস্থা ছিল না। আগুন লাগতে পারে কিনা দেখার জন্য যে ইনস্পেক্টর এসেছিল, তাকে প্রাণের ভয় দেখিয়ে ও ঘুষ দিয়ে সার্টিফিকেট আদায় করে নেওয়া হয়। দোতলায় শ্রমিকেরা ঢুকে যাওয়ার পরে গ্রিলের দরজা তালা দিয়ে দেওয়া হত। কেউ যাতে মাল চুরি করতে না পারে সেইজন্য প্রত্যেকটা জানলায় শিক তো ছিলই, বাইরে থেকে জালও লাগানো হয়েছিল।

বিশ্বায়নের রমরমা বাজারে ১৯৯৮-এর ফুটবল বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক টয় ফুটবলের অর্ডার এসেছিল। সে জন্য আরো বেশি শ্রমিক, বিশেষত সেলাই-জানা মেয়েদের দরকার হয়ে পড়েছিল। পুরোদমে যখন কাজ চলছে, তখনই আগুনটা লাগে। দুর্ঘটনার তারিখটিকে ১লা মে হিসেবে চিহ্নিত করে নবারুণ শ্রমিক অধিকার সংক্রান্ত নিষ্ঠুর আয়রনিটা স্পষ্ট করেছেন:

দিনটা ছিল মে দিবস ১ মে। মুহূর্তের মধ্যে লেলিহান আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। দোতলায় ওঠার যে একটাই সিঁড়ি সেটা ছিল কাঠের। ওপরে, হিসাবমতো বলা হয়েছে ৮১ জন পুড়ে মারা যায়। ৬ ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলেছিল। যারা মারা যায় তাদের মধ্যে বেশিরভাগই মেয়ে। এরা আশেপাশের গ্রাম থেকে আসত বা বাইরে থেকে এসে খেলনানগরে থাকত। মৃতের সংখ্যা অবশ্য কখনওই ঠিক করে জানা যাবে না। কারণ অনেককে আলাদা করে চেনাই যায়নি।ক্ষতিপূরণ? যারা আহত হয়েছিল তাদের হদিশই পাওয়া যায়নি। যদিও বলা হয়েছিল যে চিকিৎসার জন্য তাদের বাইরে পাঠানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে একমাত্র সাদামুখ লুকিয়ে সেরে ওঠে। ৮, ৯ আর বুড়ো দরজি বেঁচে যায়। কিন্তু দুর্ঘটনার পর ওদের তিনমাস আটকে রাখা হয়েছিল যাতে খবর না পাচার হয়।

নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতাকে দুটো স্তরে বিন্যস্ত করে খেলনানগর উপন্যাসে নিয়ে আসেন নবারুণ। প্রথমটা আমাদের রোজকার অভিজ্ঞতায় খানিক চেনা শ্রমিক শোষণ আর দমনের স্তর। কিন্তু দ্বিতীয় স্তরটা আমাদের সাধারণ চোখের বাইরে থাকা রাষ্ট্রের বৃহত্তর নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতা। অগ্নিকাণ্ডের পর খেলনানগর প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গেছে ধরে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের কাছে, কর্পোরেট ক্যাপিটালের কাছে নতজানু রাষ্ট্র যে নিষ্ঠুরতার খেলায় নামে।

দেশজুড়ে যখন গৃহযুদ্ধ চলছে তখন রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার ও তার আবর্জনা বেড়ে চলবে এটাই স্বাভাবিক। আবার পশ্চিমা বিশ্বের দামি জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানাকার রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় পদার্থেরও ডাম্পিং গ্রাউন্ড চাই। কিছু ডলারের বিনিময়ে তৃতীয় বিশ্বের সার্বভৌম দেশের যো হুকুম রাষ্ট্রনেতারা সর্বদাই প্রস্তুত নিজেদের জমিকে এ কাজে ব্যবহার করতে। ফলে খেলনানগরের মানুষ অবাক হয়ে দেখতে থাকল:

…তাজ্জব এক কাণ্ডকারখানা। পরের পর ট্রাক আসছে, পোড়াপাথর বা রবারের দলার মতো দেখতে জিনিস ফেলছে, তারপর ফের ওই আবর্জনা আনার জন্য ফাঁকা ফিরে যাচ্ছে। নিয়ম মেনে যেমন পিঁপড়েরা সার দিয়ে কাজ করে সেরকম।

এর ফল দাঁড়াল খেলনানগরের পশ্চিমদিকে তৈরি হল কৃত্রিম এক পাহাড়, রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় আবর্জনার পাহাড়। পাহাড় তৈরির পর প্রথম বর্ষা যখন এল, তখনই খেলনানগরের মানুষ প্রথম ভালোভাবে বুঝল এই পাহাড় আসলে বিষের পাহাড়:

নদীর জলের রঙ পালটে গেল। মাছ মরে গেল। গাছপালা এদিকে এমনিতেই কম কিন্তু নদীর পাড় দিয়ে একজাতের কাঁটা ঝোপ হত। ওতে হলুদ ফুল হত। সেই ঝোপগুলো মরে গেল।

নদীর বিষাক্ত জলই খেতে হত। ফলে সকলের হাতে পায়ে নীল নীল দাগ হয়ে গেল। এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছিল খেলনানগর। আর তাই বিনা দ্বিধায় একে মৃত্যুর ল্যাবরেটরি বানিয়ে ফেলল রাষ্ট্র। উইনচিটারের মতো রাষ্ট্রের গুপ্তচররা অপারেশনের আগে এসে শেষবারের মতো জরুরি পর্যবেক্ষণগুলি করে গেল। তারপর আকাশ থেকে নেমে এল নিরীক্ষার মারণবোমা। উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদে উইনচিটারের জবানীতেই এসেছে রাষ্ট্রীয় নির্মমতার কাহিনি:

খেলনানগরে আমাদের ছিল একটা টপ সিক্রেট সামরিক তৎপরতা যার নাম অপারেশন ভালচার। রিমোট সেন্সিং এর যন্ত্র বসানো শকুন তখন অনেক ওরকম বিচ্ছিন্ন ও বিপন্ন হ্যামলেটে পাঠানো হয়। দেখা হয় সেখানকার মানুষ কী মানুষ রয়েছে, না অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে যাদের খরচ করে ফেলা যায়?এর আগে ফিশন ও ফিউশন অস্ত্র আমরা তৈরি করেছি, এর আঘাত যেমন খেয়েছি, তেমন এর আঘাতও হেনেছি। খেলনানগরে আমরা পরীক্ষা করেছি নিউট্রন বোমা যার বিশেষ পারদর্শিতার জন্য কেউ কেউ একে ক্যাপিটালিস্ট বোম্বও বলে থাকে। খেলনানগরের ওপরেই আমাদের নিউট্রন বোমার প্রথম পরীক্ষা হয় ও সেই পরীক্ষা সম্পূর্ণ সফল। এনহানসড রেডিয়েশন ওভারহেডবলে অভিহিত এই অস্ত্র নিউট্রন ফিশনের ওপর নির্ভরশীল। এর বিস্ফোরণের ফলে যে তাপ ও ঝটিকাঘাতের সৃষ্টি হয় তা তুলনামূলকভাবে ছোট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ওই জায়গাটুকুর মধ্যে নিউট্রন ও গামা তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপক তরঙ্গ ওঠে যা বর্ম ও পুরু আস্তরণ অক্লেশে ভেদ করে ও যে কোন জীবন্ত কোষকে নিমেষে ধ্বংস করে। সম্পদ বা অন্য কিছু এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। স্বল্প পরিসরের মধ্যে এর ধ্বংসক্ষমতা পর্যাপ্ত এবং এর রেশ দীর্ঘমেয়াদী নয়। তাই ট্যাঙ্ক বাহিনীর বিরুদ্ধে রণকৌশলগত অস্ত্র হিসেবে এর ব্যবহার খুবই কার্যকর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এবং এই অস্ত্র যেখানে ব্যবহৃত হবে তার কয়েক মাইল দূরে যদি জনবসতি থাকে তার কোনও ক্ষতি হবে না। আমরা খেলনানগরের ওপর বিমান থেকে নিউট্রন বোমা ফেলেছি। কিন্তু ল্যান্স ক্ষেপণাস্ত্র বা ৮ ইঞ্চি অর্থাৎ ২০ সেন্টিমিটার হাউটজার কামানের সাহায্যেও নিউওট্রন বোমা ছোঁড়া যায়।

উইনচিটার চরিত্রটিকে আমরা দ্য নিউক্লিয়ার উইন্টার বইটা পড়তে দেখি। নিউক্লিয় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গণহত্যা চালানোর সঙ্গে যুক্ত লোকটির ঠান্ডা শীতল ভাবনায় মারণ পরিকল্পনা চালানোর গোটা বয়ানটিকে নবারুণ তুলে আনেন ঠান্ডা নির্লিপ্তিতে। আখ্যানে জড়িয়ে দেন এক হিমশীতল ভয়ের চাদর। এই ব্যাপক ষড়যন্ত্র, এই বিতত বিতংসের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার ক্ষেত্রে বা তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের দৈনন্দিন চেনা ছকগুলিও একেবারেই অকার্যকরী। নবারুণ উপন্যাসে গুরুত্বের সঙ্গেই পুনরাবৃত্তভাবে হাজির করেন মার্কস-লেনিন অনুগামী দুই নীতিনিষ্ঠ ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ৮ ও ৯-এর নিরলস সংগ্রামকে। কিন্তু নয়া এই বিপদের মাত্রাকে অনুধাবন করতেই তাদের প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সক্ষম নয়, প্রতিরোধ তো দূরের কথা। রাষ্ট্রের সন্ত্রাস ও নির্মমতার হিমশীতল পরিকল্পনার সামনে অসহায় আত্মসমপর্ণের বিধিলিপি সত্যই নবারুণের সাহিত্যে এক ব্যতিক্রমী দিক। নবারুণ যেন বলেন, আমরা সবাই এখন পরিণত হয়েছি এক খেলনানগরের বাসিন্দাতে। আর নয়া জমানার এই পুতুলনাচের ইতিকথাতে নির্মম আর নিষ্ঠুর এক ব্যবস্থায় আমাদের খেলার পুতুল বানিয়ে ক্রমাগত অদৃশ্য সুতোর টানে নাচানো হচ্ছে। পরিত্রাণ কোথায়?

(ক্রমশ…)

 
 
top