নবারুণ এবং বিদ্রোহ বিস্ফোরণের সম্ভবনা প্রভৃতি

 

লুব্ধক ও প্রাণমণ্ডলের গৃহযুদ্ধ

লুব্ধক নবারুণের একেবারেই অন্যরকম এক লেখা, যেখানে গোটা আখ্যানের কেন্দ্রে থাকে অসংখ্য কুকুর। সাধারণভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্পেষণ ও তার প্রতিক্রিয়ার যে ছকটি নবারুণ তার লেখায় রেকারেন্ট মোটিফ-এর মতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনেন, যা শেষপর্যন্ত তাঁর সিগনেচার স্টাইল হয়ে ওঠে, তা এখানেও বিদ্যমান। তবে দমন ও প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে এখানে নিম্নবর্গের মানুষেরা নয়, আছে কুকুরেরা। নবারুণকে পড়তে পড়তে আমরা লক্ষ করতে থাকি ওয়াশিংটন সনসেন্সাস ভিত্তিক আগ্রাসী ডেভেলপমেন্টাল হেজিমনির চেহারাটি তিনি তাঁর আখ্যানগুলিতে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনেনকাঙাল মালসাট, অটো, ভোগী-র মতো নানা রচনায় উন্নয়ন প্রায়শই নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে সন্ত্রাসের নামান্তর হয়ে দাড়ায়। লুব্ধক এক অর্থে এদেরই সগোত্র। মানুষের জায়গায় কুকুরদের সামনে রেখে আখ্যানের পরিকল্পনা হলেও মৌলিক প্রশ্নটি থেকে পাঠককে কিছুতেই সরতে দেন না নবারুণ। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শ্রেণি-নিরপেক্ষ উন্নয়ন বলে আদৌ কিছু হওয়া সম্ভব কিনা, সেই আত্মসমীক্ষার দিকে উন্নয়ন স্বপ্নের মৌতাতে বুঁদ পাঠককে বারবার ঠেলতে থাকেন আখ্যানকার। সেইসঙ্গে লুব্ধক-এ এসে উন্নয়ন-এর মধ্যে মানবসর্বস্ব দিকটিকে প্রশ্নায়িতও করেন তিনি। অসংখ্য জীবকুলের আবাসভূমি এই পৃথিবী থেকে ক্ষমতাবান মানুষের মর্জিমাফিক পরিকল্পনার জন্য বাকিদের ঝরে যেতে হবে কেন, এই প্রশ্নকে উচ্চবিত্তের উন্নয়ন বিলাসের প্রয়োজনে নিম্নবিত্তদের উচ্ছেদ-এর বিষয়টির সঙ্গে জড়িয়ে দেন নবারুণ।

লুব্ধক-এর মতো একটি আখ্যানের পরিকল্পনা তিনি কেন করেছেন, তা জানাতে গিয়ে গ্রন্থাকারে উপন্যাসটি প্রকাশের সময় (দিশা সাহিত্য পত্রিকায় ২০০০ সালের শারদ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশের ছয় বছর পর ২০০৬ সালে অভিযান প্রকাশনী থেকে এটি গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়) লেখা মুখবন্ধে তিনি জানানএকটি কুকুর উপকথা লেখার পরিকল্পনাটি আমার দীর্ঘদিনের, যার পরিণতি ‘লুব্ধক’। কুকুর, বেড়াল, পাখি, মাছএদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছোটোবেলা থেকেই। তারা যেমন আনন্দ দিয়েছে আমাকে, তেমনি দুঃখ দিয়েছে চলে গিয়ে। শিখিয়েছে আমাকে অনেক কিছুই যা ঠিক বই পড়ে শেখা যায় না। আমার ছোটোবেলার সঙ্গী জিপসির প্রতি আমার যে ঋণ থেকে গিয়েছে তা শোধ করার চেষ্টা হিসেবেও লেখাটিকে দেখা যেতে পারে। প্রাণমণ্ডলের অধিকার একা মানুষেরই নয়, সকলেরই। এই অধিকারের মধ্যেই নিহিত আছে প্রাণ ও মৃত্যুর নিয়ত ভারসাম্যের এক সমীকরণ যাকে বিঘ্নিত করলে মানুষের লাভের চেয়ে ক্ষতি হবার সম্ভাবনাই বেশি।

লুব্ধক আর একটি আখ্যান খেলনানগর-এর সঙ্গে যুগ্মভাবে যখন হিন্দি অনুবাদে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল, তখন সেখানে সালভাদোর দালির স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আঁকা প্রিমোনিশন অব সিভিল ওয়্যার ছবিটি প্রচ্ছদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্যের। খেলনানগর-এ আণবিক পরীক্ষার জন্য হিমশীতল পরিকল্পনায় একটি প্রায়-পরিত্যক্ত জনবসতিকে কিছু মানুষসহ বেছে নিয়েছিল রাষ্ট্রযন্ত্র। আর লুব্ধক-এ আমরা দেখতে পাই কলকাতাকে ঢেলে সাজানোর জন্য শহরের কুকুরদের বিশেষ উপদ্রব বলে রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তারা মনে করেন। কুকুর নিধনের জন্য নানা পরিকল্পনা ছকা হতে থাকে। এর কোনো কোনোটি আবার হিটলারের নাত্‍সি জমানায় ইহুদি নিকেশ পরিকল্পনার আদলে তৈরি হয়। নবারুণ তীব্র স্যাটায়ারে দেখান শাসক একবার তার অপরকে নির্মাণ করে নিতে পারলে তার নিকেশ প্রক্রিয়াকে কত ব্যাপক ও ভয়ানক করে তুলতে পারে। শেষপর্যন্ত অবশ্য খেলনানগর-এর মত হিমশীতল মৃত্যু আসে না লুব্ধক-এ, প্রতিবাদ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে তীব্রতম প্রক্রিয়াগুলিকে বিরতি দিয়ে একটি আপাত নরম কিন্তু কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ঠিক যেভাবে গণতন্ত্রশোভিত বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি ভিয়েতনাম বা আবু ঘ্রাইব-এর উদাহরণগুলি স্বত্বেও চেষ্টা করে নাজি বা ফ্যাসিবাদী জমানার গণহত্যাগুলির প্রত্যক্ষতাকে সাধারণভাবে কিছুটা বদলে নিতে। নবারুণ দেখান ওভার্ট নয় কভার্ট অপারেশন-এর মন্ত্র নিয়েছে তারা লুব্ধক-এ শেষপর্যন্ত কুকুরগুলিকে সরাসরি মেরে না ফেলে ধরে ধরে আবদ্ধ পিজরাপোলে পাঠানো হতে থাকে। সেখানে খাবার আর জল বন্ধ করে ধীরে ধীরে তাদের শুকিয়ে মারার পরিকল্পনা হয়। কুকুর ধরার পর্ব শুরু হলে ইতিউতি কিছু নিম্নবর্গীয় মানুষ প্রতিবাদ জানায়। আর নবারুণ বোধহয় সুশীল সমাজের অতি ভদ্র দায়হীন অকার্যকরী নিয়মরক্ষার প্রতিবাদগুলিকে ব্যঙ্গ করেই আখ্যানে কিছু মানুষকে দিয়ে বলান কুকুর যেন এমনভাবে ধরা না হয় যাতে এই দৃশ্য অল্প বয়সের ছেলেমেয়েদের ওপর প্রভাব ফেলে। কুকুর ধরা চলতে থাকে মূলত ছেলেমেয়েদের স্কুল চলাকালীন সময়ে।

প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠে আক্রান্ত তার ওপর দমনের প্রতিক্রিয়া জানাবেই, এটা নবারুণ তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সব সময়েই দেখিয়ে এসেছেন। আমাদের সময়ের অন্যতম ক্লাসিক কাঙাল মালসাট চাকতি আর ফ্যাতাড়ুদের যে শ্রেণিযুদ্ধকে দেখায়, ঠিক সেইমাত্রায় বা পদ্ধতিতে না হলেও লুব্ধক-এ কুকুরেরাও নীরব মৃত্যুকে মেনে নেয় না। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে শক্তিশালী মানুষ ও তার যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাকে অতিক্রম করার প্রয়াসে লিপ্ত হয়। প্রথম দিকে বিচ্ছিন্নভাবে দু একটি কুকুর পালায় ,তারপর তারা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। এমনকী বাঁচার এই লড়াইয়ে তারা বেড়ালদের সঙ্গে স্বভাবসিদ্ধ বৈরিতা পেরিয়ে গড়ে তোলে মৈত্রিভিত্তিক যুক্তফ্রন্ট।

ইতিহাস-পুরাণের আনুবিশ থেকে মহাকাশের প্রথম কুকুর লাইকা পর্যন্ত ইতিহাসখ্যাত সকলেই কুকুরদের শহর ছেড়ে মহানিষ্ক্রমণের পর্বে প্রেরণা হয়ে ওঠে। মহাকাশের কুকুরমণ্ডল থেকে আসা বার্তাকে আত্মস্থ করে বয়োবৃদ্ধ কুকুরেরা। ধরা পড়া এড়ানোর সংগ্রামী পর্বের সূচনায় তাদের কয়েকজনই স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে নিষ্ক্রমণ সংগ্রামে ভ্যানগার্ড শহিদের ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

আখ্যানের শেষপর্বে এসে এক অসামান্য দৃশ্যকল্প তৈরি করেন নবারুণ। লক্ষ লক্ষ কুকুরের এক বিশাল মিছিল শহরের সমস্ত রাস্তাঘাট, যান চলাচল আর প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে থমকে দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কৌতূহল তৈরি করে শহর ছেড়ে কোনো অজানা গন্তব্যে পাড়ি দিতে থাকে। যে কুকুরদের পারস্পরিক বিবাদকেই চেনা চোখ দেখতে অভ্যস্ত এই সংঘবদ্ধ বিশাল মিছিল তাদের কাছে অদৃষ্টপূর্ব এবং অচিন্ত্যনীয়ই বটে। নবারুণ যেন ঈপ্সিত কিন্তু অধরা এক প্রলেতারিয় মহামিছিলের রূপকল্প ভাসিয়ে দেন দীক্ষিত পাঠকের অন্তরে। এই উন্নয়ন সন্ত্রাসের দিনগুলিতে আধুনিক শ্রেণিযুদ্ধের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলে। উপন্যাসের শুরু এবং শেষে উল্কাপাতের যে মহাজাগতিক বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে শহর ধ্বংসের ঠিক সাত ঘণ্টা আগে কুকুরদের নিরাপদ মহানিষ্ক্রমণের কথা বলা হয়েছে, তা যেন এক পোয়েটিক জাস্টিস। ক্ষমতার গজদন্তমিনারে আসীন শক্তিমানের পরিকল্পনা ও দম্ভবিলাসের মুখে কাল-নির্ধারিত এক নির্ণায়ক ধাক্কা।

 
 
top