নবারুণ এবং বিদ্রোহ বিস্ফোরণের সম্ভাবনা প্রভৃতি

 

অটো : নাগরিকতা ও সীমাবদ্ধতা

নবারুণ-এর আখ্যান-বিশ্ব আদ্যন্ত নাগরিক। তবে শুধু নাগরিকতাই সমকালীন বাংলা সাহিত্যে নবারুণকে বিশিষ্টতা দেয় নি, দিয়েছে নাগরিকতা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে স্পর্ধায় চ্যালেঞ্জ জানানোর এক আশ্চর্য মিশেল। নবারুণের আখ্যান জগতে ঘোরাফেরা করে আমরা আবিষ্কার করি যেখানে নাগরিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামো তথা শোষণ ও দমনের প্রতিস্পর্ধী রাজনৈতিক বয়ান তিনি হাজির করেন, সেখানে তার শিল্পীসত্তা তুঙ্গ উচ্চতা পায়হারবার্ট, যুদ্ধ পরিস্থিতি, কাঙাল মালসাট এবং অংশত খেলনানগর এর স্বাক্ষ্য দেবে। (খেলনানগর-এর মধ্যে একটা বিপরীতের বাস্তব ক্রিয়াশীল। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপের জন্য খেলনানগর নিয়ে আমাদের নির্দিষ্ট কথাবার্তা দ্রষ্টব্য।) ন্যদিকে নিও লিবারাল সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক অর্থনীতির ক্রিটিক হিসেবে তিনি যখন ভোগীর মত আধা মিষ্টিক চরিত্রকে কেন্দ্রে রেখে আখ্যান নির্মাণ করতে যান,সেখানে যেন পাঠকের মনে হতে থাকে এটা নবারুণের স্বক্ষেত্র নয়।

বর্তমান প্রসঙ্গে যার পাঠে আমরা অগ্রসর হয়েছি সেই অটো-তে নবারুণের নাগরিকতাকে আমরা পাই, কিন্তু সেই নাগরিকতার মধ্যে বিনু, রণজয় বা ফ্যাতাড়ুদের মতো কাউকে পাই না যে বা যারা সমসাময়িকতার দ্বারা গ্রস্থ হবার পরিবর্তে তাকে সবলে ও সরবে পালটে দিতে চাইবে। অটো-র নায়ক ড্রাইভার চন্দন পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা নানাভাবে গ্রস্থ ও সংকটে নিমজ্জিত। তার ক্রাইসিসটাকে নবারুণ ডিটেলিং সহই আখ্যানে হাজির করেন, কিন্তু নবারুণের আখ্যান বিশ্বের যেটা প্রধান আকর্ষণ, সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেখানো প্রতিস্পর্ধার সাহস, তাকে আমরা অটো-চন্দনের মধ্যে কিছুতেই খুঁজে পাই না। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে পাঠক আসুন উপন্যাসটির সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠ পরিচয় সেরে নেওয়া যাক।

নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনচর্যার দিকে নবারুণের দৃষ্টি বরাবরই প্রখর ও বাস্তবানুগ, তবে উপন্যাসের গোটাটা জুড়ে তারা এবং শুধু তারাই কেবলমাত্র অবস্থান করছে, এরকমটা অটোতেই প্রথম এবং অটো এই নিরিখেই একম অদ্বিতীয়ম কাঙাল মালসাট অবশ্যই নিম্নবিত্তদের আখ্যানবৃত্ত কিন্তু তার জাত আলাদা এবং নিম্নবিত্তসুলভ সংকট নয়, রাষ্ট্রবিরোধী আগ্রাসনই সেখানে চরিত্রায়নের প্রাণবস্তু। উলটোদিকে অটো আখ্যানের নায়ক চন্দন উপন্যাসের আদ্যন্ত এবং নানা নিরিখেই ভাগ্য বিড়ম্বিত এবং কেবল ভাগ্য বিড়ম্বিতই। কৈশোরে ভালো ফুটবল খেললেও দারিদ্রমাখা জীবনে উপযুক্ত খাদ্য মিলত না তার উপযুক্ত পুষ্টির অভাবে মাঝেমধ্যে মুখে রক্ত তুলে হলেও যে খেলা চলছিল, তাও বন্ধ হয়ে গেল বাবা মারা যাওয়ায়। বাবা হঠা মারা গেলে খেলার বিলাস বন্ধ করে যে রোজগারের ধান্দাতেই নামতে হবে চন্দনদের, এটা তো অবধারিত আর চেনা ছকের এক গল্প খেলা ছেড়ে দেবার পর ভোটের সময় (শাসকের হয়ে) খাটাখাটি করে সে অটোর পারমি জোগাড় করতে পেরেছিল। চুক্তিতে মালিকের থেকে ভাড়া করা অটোয় জীবিকা নির্বাহ শুরু করেও অবশ্য সুখের মুখ তার দেখা হয় নি। আয়ার কাজ করা মা রোগ পুষে রেখে অবশেষে একদিন চলে গেল। মায়ের রোগ পুষে রাখা অবশ্য অচেতনতাজাত নয়,ব্যয়বহুল চিকিৎসার ভয়ে। গরীব মানুষ নিজেকে ভুলিয়ে, পরিজনকে ঠকিয়ে কেবলই সেরে যাবার স্তোকবাক্য আওড়াতে বাধ্য হয়, এখানে তারই এক পরিচিত দৃষ্টান্ত অভিব্যক্ত।

বা মা মরা সদ্য জোয়ান রোজগেরে ছেলে চন্দন প্রথমদিকে নেশাতেই ঢেলে দিত তার অবসর আর খুজে নিতে চাইত আমোদ। এক্ষেত্রেও চেনা ছকের পায়ে পায়েই হেঁটেছে আখ্যান। অবশেষে ঘরে এলো মালা, স্ত্রী সান্নিধ্যে নেহাৎ আস্তানা হলো গৃহ। কিন্তু একটি ডাকাতির ঘটনার সূত্রে সব হিসেব ওলোট পালোট হয়ে গেল আবার। ডাকাতদের যেভাবে নৃশংশতার সঙ্গে মেরেছিল ক্ষুব্ধ জনতা তা চন্দনকে শুধু মানসিকভাবে শেষ করে দেয়নি, একটি বিশেষ দৃশ্যকল্পর সূত্রে সে হারিয়ে ফেলেছিল তার যৌনতাও। এরই পরিণামে তার স্ত্রী মালা জড়িয়ে পড়ল এক অবৈধ সম্পর্কে, আর পেটানো চেহারার সেই যুবক ভিকির সঙ্গে চলে গেল নতুন আস্তানাতেও। স্ত্রী আর ঘরই শুধু হারালো না চন্দন, ক্রমেই সহকর্মী অটোচালক ও পরিচিত জনেদের কাছে তার পরিচয়টা গেলো বদলে। ব্যঙ্গবিদ্রূপে ভরিয়ে তাকে ডাকা হতে থাকলো ধ্বজ বলে। অনেকগুলো মৃত্যু যার জীবনকে বারবার ভাগ্য বিড়ম্বিত করেছেবাবা মা থেকে ডাকাতদের পিটিয়ে মারার দৃশ্যের ট্রমা পর্যন্তসেই মৃত্যুকেই সে শেষপর্যন্ত হাতিয়ার করতে চাইল। একটি শটগান নিয়ে চলে গেল তার স্ত্রী ও প্রেমিক ভিকির আস্তানায়। সরাসরি স্ত্রীর প্রেমিককে গুলি করে হত্যা করে শান্তভাবে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করল। আর এই আত্মসমর্পণেই কাহিনী শেষ করলেন নবারুণ।

নবারুণ-এর সাহিত্যের বিশিষ্টতা এখানেই যে সে আত্মসমর্পণ এর বিপরীত স্রোতে সব সময় সাঁতার দিতে চায়। চন্দনের আত্মসমর্পণে শেষ হওয়া অটো-র প্রতি শুধুমাত্র এটা কোনও অনুযোগ হতে পারে না যে এটা প্রতিস্পর্ধার ইচ্ছাপূরণে সমাপ্ত হলো না, প্রতিশোধের চেনা ছকে হারিয়ে গেল। বরং উপন্যাসটি ঘিরে আমাদের অস্বস্তি এখানেই যে উপন্যাসটিতে চিন্তাগত বা নিরীক্ষাগত কোনও অগ্রসরণের মুখোমুখি হলাম না আমরা।

অথচ চন্দনের কাহিনীসূত্রে আমাদের মনে পড়ে যেতেই পারে ডি এইচ লরেন্স এর বিখ্যাত লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার-এর কথা, যেখানে পক্ষঘাতগ্রস্থ হয়ে একইভাবে যৌন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন ক্লিফোর্ড চ্যাটার্লি। আর তার স্ত্রী, লেডি চ্যাটার্লি, যৌন অবসাদ থেকে জড়িয়ে পড়েছিলেন অলিভার মেলারসের সঙ্গে অবৈধ এক সম্পর্কে। শ্রেণি বিভাজন থেকে মনস্তাত্ত্বিক সংকটের নানা বিভঙ্গে লরেন্স এর এই উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যে ঝড় তুলেছিল, কিন্তু নবারুণ তেমন কোনও দিককে এখানে আনতে চান নি। চন্দনের হতশ্বাস জীবন বৃত্তান্তের মধ্যেই উপন্যাসের কাহিনীকে তিনি সীমায়িত রাখতে চেয়েছেন।

যিনি সচেতনভাবেই বহুপ্রজ হতে চাননি কখনো, নিজেকে কখনো পুনরাবৃত্ত করতে চান নি, তিনি অটো-র মত একটি চেনা ছকের আখ্যান কেন লিখলেন, সেটা আমাদের খানিকটা অবাক করে। ২০০৩ সালে আজকাল পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় এই উপন্যাস লেখার অল্প আগেই তিনি লিখেছিলেন তার চিরন্তন ক্লাসিক কাঙাল মালসাট। তার পরেই সামান্যতার কাছাকাছি থাকা অটো আমাদের যতই বিস্মিত করুক না কেন, আমরা জানি সাহিত্যের ইতিহাসে এটা ব্যতিক্রমী বা নতুন কোনও ঘটনা নয়। কপালকুণ্ডলা- বিষ্ময়কর সাফল্যের পর বঙ্কিমের হাত থেকে সাদামাটা মৃণালিনী- জন্ম বা চোখের বালি- পর নৌকাডুবি-তে রবীন্দ্রনাথের শৈল্পিক পশ্চাদপসরণের সূত্রেই আমাদের মিলিয়ে দেখতে ইচ্ছে হয় কাঙাল মালসাট-এর আকাশস্পর্শী সাফল্যের পর অটো- সাধারণত্বকে।

(ক্রমশ…)

 
 
top