নবারুণ এবং বিদ্রোহ বিস্ফোরণের সম্ভাবনা প্রভৃতি

 

মসোলিয়াম এর কার্নিভাল এবং ফ্যাতাড়ু চাকতিদের পুনরুভ্যুদয়

তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। সেই সময়ে কমিউনিস্ট সোভিয়েত রাশিয়ায় বাখতিন পেশ করলেন তাঁর গবেষণা সনদ র‍্যাবেলিয়াস অ্যান্ড হিজ ওয়ার্ল্ড। এখানে তিনি আনলেন তাঁর বিখ্যাত সেই কার্নিভাল তত্ত্ব যা পরবর্তীকালে সংস্কৃতিজগতের ভাবনাচিন্তাকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক মাত্রায় প্রভাবিত করল। বাখতিন কার্নিভাল-এর বিশেষ বৈশিষ্ট দেখিয়ে লিখলেন :   

on the contrary, all were considered equal during carnival. Here, in the town square, a special form of free and familiar contact reigned among people who were usually divided by the barriers of caste, property, profession, and age. The carnival atmosphere holds the lower strata of life most important, as opposed to higher functions (thought, speech, soul) which were usually held dear in the signifying order. At carnival time, the unique sense of time and space causes individuals to feel they are a part of the collectivity, at which point they cease to be themselves. It is at this point that, through costume and mask, individual exchanges bodies and is renewed. At the same time there arises a heightened awareness of one’s sensual, material, bodily unity and community. 

নবারুণ যখন ফ্যাতাড়ুদের মতো চরিত্র নির্মাণ বা মসোলিয়াম-র মতো উপন্যাস নিয়ে কথা বলেন, তখন তাঁর প্রেরণা হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন এই কার্নিভাল তত্ত্বের। ২০০৪-এ ভাষাবন্ধন পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত এই উপন্যাসটির আগে পরেও ফ্যাতাড়ু চাকতিদের নিয়ে লিখেছেন নবারুণ। ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক গল্পগ্রন্থে যে ধরণের চরিত্র আর আখ্যানের সূচনা হয়েছিল, সেই সূত্রেই এরপর নবারুণের বিখ্যাত ক্লাসিক কাঙাল মালসাট লিখিত হয়। মসোলিয়ম তারই পরবর্তী অধ্যায়। মসোলিয়ম-এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে ভাষাবন্ধন পত্রিকায় ২০১০-এর গোড়া থেকে ধারাবাহিকভাবে বেরোতে শুরু করেছিল মগবগে নভেল, কিন্তু কালান্তক ব্যাধি ও শেষমেষ নবারুণের অকালমৃত্যুতে তা অসমাপ্তই থেকে গেল। এই জাতীয় লেখাগুলি কেন লেখেন সে প্রসঙ্গে নবারুণের কৈফিয়ৎ ছিল:

 

বাংলায় যাকে বলে আমোদগেঁড়ে, আমি একটু আমোদগেঁড়ে আছি, কার্নিভাল ভালোবাসি। পুজোটুজো এলে আমার প্রচণ্ড আনন্দ হয়। এই যে এত লোক আনন্দ করছে আমি হয়তো তাদের মতো করে করতে পারি না কিন্তু আমার লোভ হয়। হিংসে হয়। এবং মানুষের সামান্যতম আনন্দে আমি খুবই আনন্দিত হই। রাস্তায় একটা ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে – আমি দাঁড়িয়ে দেখি। এই যে মানুষের হাজার দুঃখের মধ্যেও তার বেঁচে থাকা প্রাত্যহিক সেলিব্রেশন – এইটা আমাকে অসম্ভব, মানে কী বলব মোটিভেট করে। তার প্রাত্যহিক জীবনে সেরকম কোনও কিছু নেই, কিন্তু সে যখন একটা বিড়ি ধরায় তখন সে কিন্তু রাজা। তার এই রাজকীয় ভাবটুকু আমি তার কাছ থেকে গ্রহণ করি। এই celebration of life এইটা কিন্তু আমার কাছে খুব দরকারি একটা ব্যাপার। এইটাই মানে আমাকে অনেকদূর অবধি নিয়ে গেছে মানে কাঙাল মালসাট অবধি নিয়ে গেছে। বা মসোলিয়ম অবধি নিয়ে গেছে। এবং হাজার দুঃখ হাজার কষ্টের মধ্যেও মানুষকে যেভাবে আনন্দের সন্ধান করতে দেখেছি সেটা থেকে আমার মনে হয় আরও বড় এক সেলিব্রেশনের অপেক্ষায় এই কার্নিভালগুলো অ্যারেঞ্জ করা দরকার। যে সেলিব্রেশনের কথা সম্ভবত লেনিন প্রথম বলেছিলেন। (নবারুণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে কথাবার্তা, কবিতীর্থআশ্বিন ১৪১৪, পৃ. ১৭৬)

নবারুণ কার্নিভাল প্রসঙ্গে লেনিনের কথার যে প্রসঙ্গ আনলেন তার সঙ্গে আমাদের সবারই কমবেশি পরিচয় আছে। লেনিন বলেছিলেন বিপ্লব হল জনগণের উৎসব। নবারুণ কাঙাল মালসাট-এ ফ্যাতাড়ু চাকতিদের রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াইয়ের যে ছবিটি হাজির করেছিলেন সেখানে জনগণের উৎসব ও প্রতিস্পর্ধার মেজাজটি পুরোমাত্রায় বর্তমান ছিল। সে প্রসঙ্গে এখানে নতুন করে আর আলোচনায় প্রবেশের প্রয়োজন নেই। আগ্রহী পাঠক এই সংক্রান্ত আমাদের আগের আলোচনা দেখে নিতে পারেন। মসোলিয়ম-এ এসে কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্মুখ সমরের বিষয়টিকে আর সেভাবে ফিরিয়ে আনা হয় না, বরং রাষ্ট্র ও প্রশাসন যন্ত্রকে বোকা বানানো, তার সঙ্গে লুকোচুরি খেলার একটা আয়োজন এখানে আমরা দেখতে পাই।

কাঙাল মালসাট-এ ভদি বাহিনীর তেলের খনি বের করে তেল উত্তোলনের যে স্বপ্ন ছিল, তা সফল হয়নি। কিন্তু টাকা যোগাড় করে মস্তি করার, উৎসব করার, কার্নিভালের মধ্যে থাকার আকাঙ্ক্ষাটা বজায় থেকে গেছে। মসোলিয়ম-এ মমি সংক্রান্ত ব্যবসা ফাঁদার মজার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এবং তা সাফল্যও পায়। ভদি বাহিনী ট্রাক ভর্তি টাকা কামাতে সফল হয়। ভদি একটি কাচের বাক্সে মমি হয়ে শুয়ে থাকে দিনের কয়েক ঘণ্টা। নট নড়ন চড়নের এক যোগবিদ্যা নাকি সে আয়ত্ত করেছে। ঘরে বাজতে থাকে বৈষ্ণব কীর্তনের আদলে ভদি ভদয়ে নমঃ ও অন্যান্য ভদীঙ্গী   সংগীত।  আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল পুরন্দরের ভদি অভিধান রচনার কাজ। কলকাতার কালীঘাটে এই মমি দেখতে লোকের ভিড় লেগে যায়।  এজন্য কোনও বিজ্ঞাপনেরও দরকার হয়নি। লোকমুখে দাবানলের মতো এ খবর ছড়িয়ে যায়, গণেশের দুধ খাবার মিথকে অনেক পেছনে ফেলেই। শাসক দলের কমরেড আচার্য গোটাটাকে বুজরুকি হিসেবে বরাবর দেখে এসেও অবশেষে মমিচক্রের হাইকমান্ডের সঙ্গে একটা আপোষ রফার মধ্যে দিয়ে মুখরক্ষার জায়গা খোঁজার রাস্তায় যেতে বাধ্য হন। ততক্ষণে অবশ্য তাঁর পুলিশ কমিশনার ও অনুচরেরা ভদির দলে ভিড়ে গেছে। 

মসোলিয়ম-এ নবারুণ বাংলার সংস্কৃতি জগৎ নিয়ে স্বভাবসিদ্ধ কিছু টীকা টিপ্পনি হাজির করেন। একদিকে বজরা ঘোষ-এর মতো ঔপন্যাসিককে আনেন যার  লেখা ব্যতিক্রমী, কিন্তু সাহিত্য জগৎ মোটেই তাকে কল্কে দেয় না। ব্যক্তিগত জীবনেও চরম ভাগ্যবিড়ম্বিত এবং সাহিত্যিক হিসেবেও এলিট মহলে নিতান্ত ব্রাত্য বজরা বাধ্য হয়ে নিজেই নিজের কল্পিত সাফল্যের অনেক ফ্যান্টাসি রচনা করে। এরই উল্টোদিকে থাকে শক্তিশালী ক্ষমতাবান অধ্যাপক ও সমালোচকের দল যাদের প্রতিনিধিত্ব করেন পিশাচদমন পাল। ভদিবাহিনীর হুড়কো খেয়ে তারা সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারে নামে মমির পক্ষ অবলম্বন করে। সংবাদপত্রে তাদের চিঠি প্রকাশের মতো ঘটনার মধ্যে দিয়ে চাপা স্যাটায়ার তৈরি করেন নবারুণ। বুদ্ধিজীবীরা যে আসলে মূলত আজ্ঞাবহ দাস এবং কখনো রাষ্ট্রের বা কখনো অন্য কোনও শক্তিধরের হাতের তামাক খেয়ে বিবেক বুদ্ধি চিন্তা জলাঞ্জলি দিয়ে তোষামোদে মত্ত হতে স্বতঃআগ্রহী, সেটা নবারুণ তাঁর বিভিন্ন আখ্যানে বাববার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনেন। এই রেকারেন্ট মোটিফটি এখানেও আছে।

নবারুণের প্রথম উপন্যাস হারবার্ট-এ মৃতের সহিত কথোপকথনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল। সেদিক থেকে দেখলে মৃত্যুকে নিয়ে ব্যাবসা মসোলিয়াম-এই প্রথম নয়। আর দু- ক্ষেত্রেই আমরা দেখি প্রতিক্রিয়া আসে স্তালিনপন্থী ভাবনা চিন্তার জগতের লোকেদের থেকে। যুক্তিবাদী সমিতির প্রবীর ঘোষের এক ছায়া চরিত্র হারবার্টকে মৃতের ব্যাবসা নিয়ে হুমকি দিয়ে গিয়েছিল, যার পরিণতিতে হারবার্ট শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে। মসোলিয়াম-এ শাসক দলের প্রধানবুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ছায়া চরিত্র কমরেড আচার্যর দিক থেকে প্রতিক্রিয়া আসে। এক্ষেত্রে অবশ্য পশ্চাদপসরণের পালাটা কমরেড আচার্যের দিক থেকেই হয় এবং কাঙাল মালসাট-এর মতো মসোলিয়ম-এও এই চরিত্রটিকে ঘিরে যথেষ্ট ঠাট্টা তামাসা করেন নবারুণ।   

ব্যক্তিগত ভাবনাচিন্তায় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের একান্ত অনুসারী, মার্কসবাদ-লেনিনবাদে আমৃত্যু বিশ্বাসী নবারুণ বস্তুবাদের পক্ষ থেকে ভাববাদের বিরুদ্ধে তোলা প্রশ্নগুলিকে নিয়ে কেন এত আগ্রাসী স্যাটায়ার তৈরি করেন, সেটা অনেককে মাঝে মধ্যেই ভাবায়। হয়তো বিষয়টিকে বস্তুবাদ ভাববাদ দ্বন্দ্বের জায়গা থেকে এখানে দেখতেই চান না নবারুণ। শিষ্ট জগতের ভদ্র প্রতিক্রিয়ার উল্টোদিকে সাব অল্টার্নদের নিজস্ব কার্নিভাল-এর সেলিব্রেশন হিসেবেই তিনি দেখেন ব্যাপারটিকে। হারবার্ট-এও মৃতের সহিত কথোপকথন-এর অফিসটিকে ঘিরে পাড়া বেপাড়ার সাব অল্টার্নদের আড্ডা জমত। ভদির মমির পরিকল্পনা ও রূপায়ণের সঙ্গে যুক্তরা তো একই সঙ্গেসাব অল্টার্ন ও রেবেল। মনে হয় এখানে চেনা ছকের প্রগতি প্রতিক্রিয়া বস্তুবাদ ভাববাদের দর্শনের দ্বন্দ্বকে যান্ত্রিকভাবে দেখতে চাননি আখ্যানকার। রাষ্ট্র ও তার অঙ্গগুলির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ও তাকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা, তাকে বোকা বানানোর নানা আয়োজনের কার্নিভাল-এর মধ্যেই আখ্যানের মেজাজটা ধরে রাখতে চেয়েছেন।

 
 
top