নরেন্দ্র মোদির অর্থনীতি

 

মোদি এবং সংস্কারের রাজনীতি

মোদি যে বাজারমুখী সংস্কারের উগ্র সমর্থক, গুজরাটে তিনি তার প্রমাণ রেখে এসেছেন। তিনি যে যোজনা কমিশন তুলে দিতে চান, সেটা তিনি ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন। এখনই সম্ভব নয় জেনেও, নরেন্দ্র মোদির বিত্তমন্ত্রী বিমার ক্ষেত্রে ৪৯% শেয়ার বেসরকারি পুঁজির হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছেন। বিজেপি যখন বিরোধী দল, কংগ্রেসের আনা এই প্রস্তাব যে বিজেপি-ই নাকচ করেছিল, সেটার মর্যাদা দেওয়ার দরকারও মনে করেননি তিনি। শ্রম আইন বদলানো, বিদেশি পুঁজির অবাধ প্রবেশাধিকার ত্বরান্বিত করার জন্য টাকার পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরযোগ্যতা আনা, জমি আইনে কংগ্রেসের আনা সংশোধনগুলোর মধ্যে যেগুলি কর্পোরেটের অপছন্দ সেগুলি তুলে দেওয়া—এসবই এঁদের অ্যাজেন্ডায় আছে। কাজের অধিকারনিশ্চিত করার লক্ষে একটিমাত্র আইন আছে এদেশে: মহাত্মা গান্ধি গ্রামীণ কর্মসংস্থান আইন, অর্থাৎ একশো দিনের কাজ। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে, সেটিকে এঁরা ইতিমধ্যেই অধিকার‘-এর জায়গা থেকে, আর পাঁচটা সরকারি প্রকল্পের মতো সরকারের মর্জিমাফিক চলার মতো প্রকল্পে, যাকে বলে টার্গেটেড, নামিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কী চায় এই সরকার, সেটা নিয়ে তাই সংশয় নেই। তবে কখন কোনটা করতে পারবে এই সরকার, সে নিয়ে বহুবিধ অনুমান করার যুক্তিসঙ্গত কারণ অবশ্যই আছে। একথা যেমন বলাই যায় যে, চিদম্বরম বা মনমোহন যেমন চাইলেও সরকারি খরচ কমিয়ে বাজারের হাতে বিনিয়োগের দায় তুলে দেওয়ার কাজটি করে উঠতে পারেননি অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে, জেটলি বা নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রেও সে সমস্যা আছে। অর্থনীতি এই ধরণের অবস্থার মধ্যে পড়ে থাকলে জেটলিকেও চিদম্বরমের পথ অনুসরণ করতে হবে। খুল্লমখুল্লা সংস্কার এখনই এঁরা করতে পারবেন না, করতে গেলে সংকট আরও বাড়বে যার রাজনৈতিক দায় ঘাড়ে নেওয়ার সাধ্য এঁরা এখনও অর্জন করে উঠতে পারেননি।

এই অবস্থায় তাহলে কি দাঁড়াবে মোদির অর্থনীতি? গত কয়েক বছরে বাজার চাঙ্গা করার লক্ষে চাহিদা সৃষ্টির জন্য সরকার যা খরচ করেছে, যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন অরুণ জেটলিও,এই সরকার অনুমান করছে যে, তার ফলে অর্থনীতি কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াবে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রাক্‌বাজেট বিবৃতিতে জেটলি যা বলেছেন, তাতে এই ইঙ্গিত আছে। জেটলি উল্লেখ করেছেন যে, অর্থনৈতিক লেনদেন খাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে এবং রপ্তানি কিছুটা চাঙ্গা করে ইতিমধ্যেই চলতি খাতে ঘাটতি বেশ কিছুটা কমানো গিয়েছে, জাতীয় আয়ের অংশ হিসেবে এই অংকটি ইতিমধ্যেই ৪.৭ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১.৭ শতাংশে। মূল্যবৃদ্ধির প্রকোপ কিছুটা কমেছে। জাতীয় উৎপাদনে বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। জেটলির অনুমান এদেশের জিডিপি আগামী বছর ৫.৪ থেকে ৫.৯ শতাংশের মতন বৃদ্ধি পাবে—৪.৭ শতাংশের তুলনায় যা অনেকটাই ভাল। প্রাক্‌বাজেট বিবৃতিতে এ কথাও বলা হয়েছে যে, আগামী বছর বিশ্ব অর্থনীতির উৎপাদন বৃদ্ধির হার যদি ৩.৫ শতাংশের ওপরে থাকে (যেটা বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্থা অনুমান করছে)তাহলে ভারতের রপ্তানি বাজারে একটা ত্বরণ ঘটবে এবং তার ফলে চাহিদা-স্বল্পতা কেটে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো হবে, আয় বৃদ্ধির হারেরও ত্বরণ ঘটবে। আয় বৃদ্ধির প্রত্যাশিত হারটি ৫.৪ থেকে ৫.৯ শতাংশর মধ্যে থাকবে, এই অনুমানের এটাও একটা কারণ। কিন্তু সে যা-ই হোক, জেটলি-মোদির আশা বা অনুমান, অর্থনৈতিক মন্দা কিছুটা কাটবে আগামী এক বছরের মধ্যে এবং সেই সুযোগে সংস্কারের বকেয়া কাজগুলো করে ফেলবেন ওঁরা।

এটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, জাতীয় অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেই নরেন্দ্র মোদির সরকার বাজারমুখী সংস্কারের বকেয়া কাজগুলো সাঙ্গ করতে নামবে। প্রশ্ন হল, জাতীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবার সম্ভাবনা কতটা? এ বছর বৃষ্টি ভালো হয়নি, দেশের বেশ কিছু জায়গায় খরা পরিস্থিতি বিদ্যমান। কৃষি উৎপাদনে আশানুরূপ বৃদ্ধি না-হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেটা ঘটলে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা থেকেই যাবে এবং তার ফলে মূল্যবৃদ্ধির সাধারণ হারটিও কমবে না। যদি মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক সংকট বাড়ে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে, তার ধাক্কাও পড়বে মূল্যস্তরে। বিদেশি বাজার কতটা চাঙ্গা হবে, সে বিষয়েও প্রশ্ন আছে। গত দু-বছর ধরেই এই কথা শোনা যাচ্ছে যে, ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মন্দা কাটিয়ে উঠছে এবং তার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠছে। কার্যত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগ এবং আয় বৃদ্ধির হার কিছুটা বাড়লেও, ২০০৮-এর পূর্ববর্তী স্তরে ফিরে যাওয়ার লক্ষণ নেই এই অর্থনীতির। সম্ভবত একটা বড়ো ধরণের যুদ্ধ না বাধলে এই অর্থনীতিটি চাঙ্গা হবে না অতিদ্রুত (১৯২৯-এর মন্দা যেমন শেষ পর্যন্ত কেটেছিল ১৯৩৯-এ যুদ্ধ বাধার পরে, এ অবস্থাটা অনেকটা সে রকমই)। ইউরোপের অবস্থাও একই ধরণের। জার্মান অর্থনীতি ছাড়া দক্ষিণ ইউরোপে কোনো অর্থনীতির অবস্থাই ভালো নয়। নরডিক দেশগুলির অবস্থা তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো। তবে বিশ্ব অর্থনীতিকে টেনে তোলার মতন ক্ষমতা নেই এই দেশগুলোর এবং কোনোদিনই সে ক্ষমতা ছিল না এদের। সুতরাং, বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং ভারত তার রপ্তানি বাজার চাঙ্গা করতে পারবে অদূর ভবিষ্যতে, এ সম্ভাবনা কম। ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইদানিং চিন, রাশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতে, বিশেষত ব্রাজিলে, উৎপাদন বৃদ্ধির গতি ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্ব অর্থনীতি এরপর এইসব দেশগুলিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে, এমন সম্ভাবনা অবশ্য এখনই দেখা যাচ্ছে না। তবে এই দেশগুলির গুরুত্ব বাড়ছে, ‘ব্রিকস‘-এর মধ্য দিয়ে বাজার সম্প্রসারণের একটা সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। নরেন্দ্র মোদি এটা যে বুঝেছেন, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এ সব থেকে কিছুটা বৈদেশিক চাহিদা বৃদ্ধি ও পরিকাঠামোতে বিনিয়োগের অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু অতিদ্রুত চমকপ্রদ কিছু ঘটতে পারে, এটা ভাবার কারণ নেই।

আমাদের অনুমান, চমকপ্রদ কিছু ঘটবে না। অর্থনীতিতে যদি সামান্য গতি সঞ্চার হয়, এই সরকার বাজারমুখী সংস্কারের বকেয়া কাজগুলো সাঙ্গ করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কর্পোরেটের যে অংশটা বাজারের নিয়ম মেনে বিনিয়োগ মারফৎ মুনাফা বাড়াতে চায় (মাফিয়াবৃত্তি নয়), মোদিকে ঘিরে তাদের আশা এটাই। এঁদের হিসেব এই রকম যে, মোদি ভালো প্রশাসক। কোন ভালো কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলে, সেটা কার্যকর করাতে কালক্ষেপ তিনি করেন না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতা থাকবে না, কেন না কোয়ালিশন রাজনীতির টানাপোড়েনে মোদিকে বিব্রত থাকতে হবে না, লোকসভায় তাঁর আছে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। দলের মধ্যেও ইতিমধ্যে অনেকটা সংস্কার সাধন করা হয়ে গিয়েছে। গুজরাটে বিজেপি যেমন শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আরএসএস মদতপুষ্ট মোদি-কেন্দ্রিক একটি দল হিসেবে এবং বিএসএস বা স্বদেশি জাগরণ মঞ্চও সেখানে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছিল। যারা এ দেশে বাজারমুখী সংস্কার চান, নানা ধরণের টানাপোড়েনে পড়ে থাকা মনমোহন সিংহের সরকারের তুলনায় নরেন্দ্র মোদির বিজেপি-র ওপর বেশি আস্থা তাঁরা রেখেছিলেন এই কারণেই।

কেন মোদি এতটা পারবেন? তাঁর জোরের জায়গাটা কী? এই আলোচনা করতে হলে শুরু করতে হবে ভারতের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নয়া-উদারবাদী সংস্কারের দ্বন্দ্বের বিষয়টি থেকে। মনে রাখা দরকার, নয়া-উদারবাদী অর্থনীতি যে মতাদর্শগত পরিমণ্ডল গড়তে চায়, যে পরিমণ্ডলটি এই নয়া-উদারবাদী ভাষায় কথা বলতে শেখায়, সর্বত্র যা নয়া-উদারবাদের পক্ষে জনমত গড়ে তোলে, ভারতবর্ষে তা গোড়া থেকেই নানাবিধ কারণে দুর্বল। এমনকী বিজেপি-র মধ্যেও এর গ্রহণযোগ্যতা কম। এর একটা কারণ এই যে এ দেশে স্বাধীনতার পর অন্তত দুটি প্রজন্ম এই ভাবধারায় বড়ো হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের আর্থিক সমস্যা মেটানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের একটা বড়ো ভূমিকা আছে—রাষ্ট্রকে পেছনে ঠেলে বাজারকে সার্বভৌম ক্ষমতা দিলে ভালো হবে না সাধারণ মানুষের। কেন এটা জনমানসে এত প্রবল, তারও কারণ আছে। এ দেশে যে রাষ্ট্রচিন্তা গড়ে উঠেছে, তার মধ্যে প্রাক্‌স্বাধীনতা যুগের মা-বাপ সরকার‘ (অর্থাৎ সরকারই শেষ ভরসা) থেকে নেহরু চিন্তার জনকল্যাণমুখী সরকার হয়ে বামপন্থীদের সোশ্যালিস্ট সরকার‘ (কম্যুনিস্ট-লোহিয়া-নরেন্দ্র দেব-জয়প্রকাশ, সব কিছুর মিশ্রনে গড়া একটা ধারণা)সব কিছুর একটা শক্তিশালী উপস্থিতি আছে। এর সঙ্গে আবার আছে সার্বজনীন ভোটাধিকার—যার ক্ষমতা এত বিপুল, দেশবাসী তা ইতিমধ্যেই অনেকটা উপলব্ধি করেছে। সংস্কারের রথে চেপে ইন্ডিয়া শাইনিংকরতে গিয়ে অটলবিহারী বাজপেয়ীর বিজেপি সরকার পরাস্ত হয় এই কারণে যে, ভোটদাতারা মনে করে  সংস্কারের ফলে খাস আদমি‘-র উন্নতি হয়েছে, ‘আম আদমি‘-র ক্ষতি হয়েছে। অর্থাৎ তাদের রাষ্ট্রচিন্তায়, জনগণের যে প্রত্যাশা, বাজপেয়ী তা পূরণ করেননি। একশো দিনের কাজনিয়ে ডঙ্কা বাজিয়ে ইউপিএ-১ থেকে ইউপিএ-২ সরকার গড়ার যুদ্ধ লড়েছে কংগ্রেস; ব্যাঙ্ক বিলগ্নিকরন কিংবা শ্রম আইনের সংস্কারের কথা উচ্চারণ পর্যন্ত করেননি সোনিয়া কিংবা মনমোহন সেই সময়—কারণ ভোটযুদ্ধে লড়তে হলে, এ দেশের অধিকাংশ মানুষের মনে যে ধরণের রাষ্ট্রচিন্তা আছে তাতে তাল মেলাতে হয়। এবারের লোকসভা নির্বাচনেও বিকাশ পুরুষবাজারমুখী সংস্কারের দামামা বাজাননি, বরং সবকে লিয়েউন্নয়নের কথা বলতে হয়েছে তাঁকে।

এই অবস্থায় কর্পোরেট পুঁজির দায়িত্বশীল অংশটি এটা বুঝেছে যে, কংগ্রেস বা বিজেপি, ক্ষমতায় যে দলটিই থাকুক না কেন, সংস্কারের কাজটি বাধাগ্রস্ত হবেই, যদি না এমন একটি শক্তি ক্ষমতায় আসে, ভারতবাসীর যে রাষ্ট্রচিন্তা সেটিকে নয়া-উদারবাদের পক্ষে নিয়ে আসার ক্ষমতা সে শক্তিটি রাখে এবং সেই কারণেই চাই অনুকুল অর্থনৈতিক পরিবেশে যা দ্বিধাহীনভাবে এই সংস্কারের কাজটি করে ফেলতে পারবে। আমাদের অনুমান, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন নয়া বিজেপি হল কর্পোরেটের দায়িত্বশীল অংশের বিবেচনায় সেই রকম একটি রাজনৈতিক শক্তি। নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় আনার জন্য এরা সব শক্তি প্রয়োগ করেছিল এই কারণেই।  

(ক্রমশ…)

 
 
top