নরেন্দ্র মোদির অর্থনীতি

 

পরিচয়সত্তার রাজনীতি ও নরেন্দ্র মোদির বিজেপি

ভারতবাসীর রাষ্ট্রচিন্তাকে সরাসরি নয়া উদারবাদের পক্ষে নিয়ে আসা যে সম্ভব নয়, গত দুই দশকে তা প্রমাণিত হয়েছে। নেহরুর জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তা অথবা বামপন্থীদের সোশ্যালিস্ট সরকার, এমনকী বহু পুরাতন মা-বাবা-সরকারসব কিছুই যে পরিচয়সত্তার ভিত্তিতে আম আদমি‘-র স্বার্থর কথা ভাবায়, সেই পরিচয়সত্তায় আমরা-ওরাব্যবধানের এক মেরুতে থাকে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষ, অন্য দিকে থাকে খাস আদমিযারা অর্থনীতির যাবতীয় সুফল ভোগ করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল, এই বঞ্চিত মানুষদের জন্য সুরাহার ব্যবস্থা করা—এই হল এই ধরণের সামাজিক চিন্তার মূল কথা। এর সঙ্গে নয়া উদারবাদকে মেলান যায় না। নয়া উদারবাদ যে অর্থনৈতিকভাবে যারা সুবিধাভোগী তাদের হাত শক্ত করে, এটা এই ধরণের চিন্তাভাবনার একটা বদ্ধমূল ধারণা। সোশ্যালিস্ট, কম্যুনিস্ট, কংগ্রেস, বিজেপি—সব দলের মধ্যেই এই ধারণার গ্রহণযোগ্যতা বিপুল, যে কারণে ভোটের সময় এই সব দলের কেউই বাজারমুখী সংস্কারের ডঙ্কা বাজায় না। এটা ছাড়া উপায় নেই‘, ‘বিশ্ব পরিস্থিতিই বাধ্য করেছে এ ধরণের নীতি গ্রহণ করতে‘—নয়া উদারবাদের হয়ে সাফাই গাওয়ার সময় সবারই কথা থাকে এই ধরণের। সংসদেও চলে এই একই খেলা (যে কারণে বিরোধী দল হিসেবে বিজেপে এবং কংগ্রেস, উভয়ই বিমা বিলের বিরোধিতা করে)

পরিচয়সত্তার জন্য যে রাজনীতি এ দেশে উঠে এসেছে, উত্তর ভারতে যা লোহিয়াপন্থী সোশ্যালিস্টদের চিন্তায় ছিল এবং মণ্ডল রাজনীতির পর যা আঞ্চলিক রাজনীতির চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে উত্তর ভারতে আর যা দক্ষিণ ভারতে ব্রাহ্মন্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে নানা রাজনৈতিক দলের চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে, সেই জাত-ভিত্তিক রাজনীতিও কিন্তু সারের বিচারে নয়া উদারবাদ বিরোধী। এ রাজনীতিও কিন্তু বঞ্চিতদের রাজনীতি, অর্থনৈতিক বঞ্চনা যে বঞ্চনার প্রধান উপাদান। অর্থনৈতিকভাবে যারা বঞ্চিত, নয়া উদারবাদ তাদের আরও বঞ্চিত করে, এটা তাঁরাও মনে করেন। শুধু তাই নয়, নয়া উদারবাদের সুফল পায় খাস আদমি, এটা তাঁরাও মনে করেন। তবে তাঁদের চিন্তায় এই খাস আদমি উচ্চ বর্ণের ভারতবাসী। কিন্তু এ সত্ত্বেও, এই রাজনীতিটি যেহেতু সুযোগসন্ধানীতে বোঝাই হয়ে গিয়েছে, এই রাজনীতির কুশীলবরা প্রায়শই কোনো একটি বড়ো দলের লেজুড় হয়ে দিল্লির ক্ষমতায় ভাগ বসায় এবং সেই সুবাদে নয়া উদারবাদী নীতির পক্ষে ভোটও দেয়। উপজাতি অর্থাৎ ট্রাইবাল পরিচয়সত্তার রাজনীতিরও একই দশা হয়েছে এই দেশে। কিন্তু সে যাই হোক, নয়া উদারবাদ এদের ওপর ভর দিয়ে ভারতের মাটিতে তার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, এ সম্ভবনা নেই, কেন না এদের কোন কোয়ালিশন দিল্লিতে ক্ষমতায় আসবে, সংসদীয় রাজনীতির অঙ্কে সেটা মেলান যায় না বর্তমান ভারতে।

নয়া উদারবাদী রাষ্ট্রচিন্তার অংশীদারত্ব দেওয়া তাই এই ধরণের পরিচয়সত্তার রাজনীতির কোনো একটাকে আশ্রয় করে গড়ে তোলা অসম্ভব। পর্যাপ্ত বুর্জোয়া বিকাশ হওয়া দেশগুলিতে এটা একভাবে সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যেই ধারণ করা সম্ভব হয়েছে, যদিও সে-সব দেশেও এটা নিয়ে সমস্যা আছে। ভারতের মতন দেশে নয়া উদারবাদকে রাষ্ট্রচিন্তার অংশীদারিত্ব দেওয়া অসম্ভব। কীভাবে তাহলে নয়া উদারবাদ এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে? বলা যায় যে, তৎসত্ত্বেও এই নয়া উদারবাদ তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারে যদি এমন একটা পরিচয়সত্তার রাজনীতি এ দেশে প্রাধান্যে আসে, যে রাজনীতিতে অর্থনৈতিক ইস্যুগুলির গুরুত্ব কম। একটি মাত্র পরিচয়সত্তাভিত্তিক রাজনীতি এ দেশে এ দায়িত্ব পালন করতে পারে। সে রাজনীতিটি হল ধর্মভিত্তিক পরিচয়সত্তার রাজনীতি, যা শ্রমজীবিদেরই বিভক্ত করে। ভারতবর্ষের মাটিতে এই রাজনীতির চাষ করলে যে সোনা ফলে, উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রামের যুগে ব্রিটিশ তার প্রমাণ রেখে গিয়েছে। গত ছয় দশক ধরে ভারতের মাটিতে এই চিন্তার প্রসারটি অনেকটাই আটকে রেখেছিল নেহরু রাজনীতি, সোশ্যালিস্ট রাজনীতি এবং জাতপাতের রাজনীতি। বাবরি মসজিদ কেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে এটাই আবার শুরু হয় নব পর্যায়ে, যার একটা পর্যায়ে অটলবিহারী তাঁর সরকার প্রতিষ্ঠা করেন কেন্দ্রে। অটলবিহারীর বিজেপির একটা বড়ো উপাদান ছিল আরএসএস, মোদি যার প্রতিনিধি। এই প্রতিনিধিটি গুজরাটে এক অন্য বিজেপি-র সূচনা করে। এই বিজেপি-টি মুসলিমকে সবকশেখায়, শ্রমজীবিদের কোণঠাসা করে এবং একই সঙ্গে কর্পোরেট যা চায়, অঙ্গরাজ্যের সীমিত ক্ষমতার মধ্যে তার সবটাই করে অসম্ভব দক্ষতায়। শ্রমজীবিদের কর্পোরেট বিরোধী ক্ষোভ কোনোভাবেই দানা বাধে না গুজরাটে, কারণ রাজনীতিতে সেখানে কর্পোরেট কোনো ইস্যু নয়। ইস্যু হল ধর্ম। মোদির গুজরাট আর একটা ঘটনাও ঘটিয়েছে। ধর্মকে ইস্যু করার অর্থে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাধিয়ে রাখা, এমন নয়। মুসলমানরা সেখানে সবকশিখে চলবে, বেচাল কিছু করলেই বিপদে পড়বে তারা এবং বেচাল কিছু না করলে কর্পোরেটভিত্তিক উন্নয়নের ছিঁটেফোঁটার স্পর্শ তারাও পাবে—এই হল ছকটি। হিন্দুদের কাছে এটা হল একটা মহা আনন্দের রাজনীতি, কারণ যাদের তারা ঘৃণা করে, তাদের দাবিয়ে রাখার রাজনীতি এই রাজ্যে কর্তৃত্বকারী রাজনীতি। এই রাজনীতি মসৃণভাবে চললে অন্য পরিচয়সত্তার রাজনীতি ক্রমশ পিছু হটবে, গুজরাটে ইতিমধ্যেই যা ঘটেছে। এই রাজনীতি মসৃণভাবে চললে নয়া উদারবাদ নিয়ে রাজনীতি করার পরিসরও ক্ষীণ হয়ে পড়ে, কারণ শ্রেণি বা জাতভিত্তিক কোনো রাজনীতিই এখানে দানা বাধবে না। গুজরাটের বিরোধী দলগুলির রাজনীতির ব্যর্থতায় এটা প্রমাণিত।

ভারতবর্ষের রাষ্ট্রচিন্তায় কর্পোরেট স্বার্থবাহী নয়া উদারবাদের উত্তরণ ঘটানো সম্ভব নয়। যেটা সম্ভব তা হল, এমন একটা পরিচয়সত্তার রাজনীতিকে প্রাধান্যে আনা, যেখানে কর্পোরেট স্বার্থবিরোধী পরিচয়সত্তাই দুর্বল হয়ে পড়ে। মোদির বিজেপি এ দায়িত্ব পালন করতে পারে, কর্পোরেটের দায়িত্বশীল অংশটি এ কথা মনে করে। এ কথা মনে করার যে যুক্তিসিদ্ধ কারণও আছে, গুজরাট তা প্রমাণ করেছে।

গুজরাটে মোদি যা পেরেছেন, দিল্লিতে তিনি কি তা পারবেন? এক কথায় এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে মোদি যে তাঁর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে বিসর্জন দিতে রাজি নন এবং মুসলিম তোষণতিনি যে করবেন না, তার লক্ষ্মণ ইতিমধ্যেই দেখা দিচ্ছে। তিনি ইফতার রাজনীতিকরবেন না, কিন্তু পশুপতিনাথে সাড়ম্বরে পুজো দেওয়া এবং নির্বাচনের পর বারানসীতে গঙ্গাপুজো তিনি করবেন। শিক্ষায় গৈরিকীকরণের কাজটা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মোহন ভাগবতকে তোয়াজ করার জন্য তিনি প্রস্তুত এবং তাঁর নবগঠিত বিজেপি-র সঙ্গে স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সম্পর্ক যে স্পষ্ট, সেটা প্রমাণ হয়েছে। দাঙ্গা তিনি বাধাতে চান না, কিন্তু স্থানীয় বা আঞ্চলিক স্তরে সঙ্ঘাত ঘটিয়ে মুসলিমদের সবকশেখানোর কথাটা তিনি অমিত শাহ মারফৎ চালু রেখেছেন। মুসলিমদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে গিয়েছে যে, কোনোরকম বেচাল দেখলে অমিত শাহ বা মোহন ভাগবত গুজরাট মডেলে তা দমন করবেন। ভোটের অঙ্কে যে এই বিভাজন ফলপ্রসূ হয় উত্তর প্রদেশ এবং বিহারে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে এই মডেলেই ভোট হবে এবং নয়া উদারবাদ নয়, ধর্মীয় পরিচয়সত্তাভিত্তিক রাজনীতিই প্রাধান্যে থাকবে। জাতপাতভিত্তিক পরিচয়সত্তার রাজনীতি দিয়ে এই নয়া বিজেপি-কে রুখে দেওয়া যায় কিনা, বিহারের উপনির্বাচনে সেটা প্রমাণিত হয়েছে। পরীক্ষায় বিজেপি সুবিধা করতে পারেনি বটে, তবে এই নয়া বিজেপি-র রাজনীতিতে জাতপাতের অঙ্কটার সঙ্গে ধর্মীয় বিভাজনের মেলবন্ধন ঘটানোর কৌশল নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। গুজরাটের সাফল্য থেকে এই বিজেপি ভালো রকম শিক্ষা নিয়েছে এবং দলটি যে আরও শেখার চেষ্টা করছে, তার প্রমাণও আছে।

ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি যাতে ভারতকে আড়াআড়িভাবে ভাগ না করে দেয়, আবার একটা পাকিস্তান গড়ার রাজনীতি যাতে এ দেশে মাথাচাড়া না দেয়, এ রাজনীতিকে যারা প্রাধান্যে নিয়ে এসেছেন, সে বিষয়ে তাঁরা সতর্ক। মুসলমানদের মধ্যে যারা নরমপন্থী, দলটি তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চাইছে। স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ভারতীয়ত্বর ওপর জোর দেয়। এই জোরটা মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের একটা বড়ো অংশের মধ্যে আছে। বস্তুত, পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর এ দেশের মুসলমানরা যে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছে, রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান যে তাদের আশ্রয় দিতে পারবে না এবং সংকটজর্জর পাকিস্তানে উদ্বাস্তু হয়ে হাজির হলে যে আদৌ সুবিধে হবে না, এ দেশের মুসলমানদের একটা বড়ো অংশ এটা বুঝেছে। স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এটা জানে, মোদির পিছনে যে কর্পোরেট আছে, তারাও এ বিষয়ে সচেতন। এটিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে একটি অন্য ধরণের ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি গড়াও মোদির পক্ষে সম্ভব। কোনটা শেষ পর্যন্ত দাঁড়াবে, সময় সেটা বলবে। তবে, কর্পোরেট যে ভারতবর্ষে একটা অন্য ধরণের পরিচয়সত্তার রাজনীতি চায়, যে রাজনীতি রাজনীতি থেকে অর্থনীতির মূল ইস্যুগুলিকে বিযুক্ত করতে পারে এবং তার ফলে কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে নয়া উদারবাদী সংস্কারের বকেয়া কাজগুলো সাঙ্গ করা যায় এই সার্বজনীন ভোটাধিকারভিত্তিক সংসদীয় রাজনীতির পরিসরেই, সেটা স্পষ্ট। মোদিকে ঘিরে এটাই তাদের অ্যাজেন্ডা। মোদি সেটা জানেন এবং সে লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছেন তিনি।

 

 
 
top