নতুন আলো

 

মেছোবাজারের সবচেয়ে বড়ো গুন্ডা বড়ো করিমের সবচেয়ে বড়ো শাগরেদ মধুসূদন ঘোষ ওরফে মোদো স্বনামে বিখ্যাত। সে নরেশচন্দ্র আতর্থি বা বাবুর সহপাঠী। তারা দুজন ডফ কলেজে পড়ে। নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে সে এক বিশাল থামওয়ালা বাড়ি। বড়ো বড়ো ঘর। এক এক ক্লাসে একশো-দেড়শো ছেলে। আর কী সব ছেলে? বাবার সঙ্গে ময়দানে নকল যুদ্ধ দেখতে গিয়ে বাবু, বুড়ো আর লালু তিনজনেই অনেক খারাপ খারাপ কথা শুনেছিল। কিন্তু ন-মাসে ছ-মাসে, অতি সন্তর্পণে বন্ধুমহল ছাড়া তা উচ্চারণ করার সাহস নেই। আর এখানে ছেলেরা দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে, চিৎকার করে একতলার বন্ধুদের সঙ্গে সেই ভাষায় আলাপ করে! আর মাস্টাররা এক একটি সাক্ষাৎ যমদূত। ছাত্র পেটানোই তাদের পেশা ও নেশা! কথায় কথায় বেত্রাঘাত। মাঝে মাঝে ক্লাসসুদ্ধু ছেলেকে পাইকারি ঠ্যাঙানি। তবে যমরাজ আসেন সপ্তাহে দু-তিন দিন। তাঁর নাম আলেকজান্ডার টমরি।

আলেকজান্ডার টমরি বিলিতি ইহুদি। বেঁটেখাটো, ফর্সা মানুষ। দু-গালে বিশাল গালপাট্টা। ইনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো। এছাড়া ডফ কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। টমরি ক্লাসে ঢুকেই বাংলা ভাষায় জিজ্ঞাসা করেন, মাস্টারমহাশয়, এ ক্লাসে কোন বদমায়েশ ছেলে আছে কি যাহাকে বেত্রাঘাত করা প্রয়োজন?

মাস্টারমশায়দের যে যে ছেলের ওপর রাগ থাকে, সেই সেই ছেলেকে টমরির কাছে পাঠান। এভাবে ক্লাসে ক্লাসে ঘুরে ছেলে জোগাড় করে তাদের হলঘরে জমায়েত করা হয়। সেখানে টমরি বেতিয়ে তাঁর হাতের সুখ করেন। সেইসব ছেলেদের চিৎকারে অন্য ছেলেদের ভয়ে রক্ত জল হয়ে যায়।

অবশ্য সবাই যে ভয় পায় তা নয়। ডফ কলেজে কাঞ্চন কৌলীন্য প্রথা প্রবল। নামজাদা বড়োলোক ঘরের ছেলেদের গায়ে টমরি হাত দিতে সাহস পান না। তারা প্রকাশ্যেই বলে, শালা, টমরি আমাকে একবার মেরে দেখুক না! বাবার বিয়ে দেখিয়ে দেব ব্যাটাকে বলা বাহুল্য, এইসব ঔদ্ধত্যপূর্ণ বাক্য মাস্টারমশায়রা শুনেও না শোনার ভান করেন।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর সেই সন্ধিক্ষণে ভারতের রাজধানী কলকাতা শহরের জনসংখ্যা ছয় লাখের বেশি নয়। শহরটা কয়েকটা পাড়ায় বিভক্ত: আহিরীটোলা, জোড়াসাঁকো, বাগবাজার, লেবুতলা, চোরবাগান, ঝামাপুকুর, দরজিপাড়া, জানবাজার, মুচিপাড়া, গড়পার, ইত্যাদি। প্রত্যেক পাড়াতেই একটা করে কুস্তি ও জিমন্যাস্টিকের আখড়া, থিয়েটারের ক্লাব আর শখের যাত্রাদল। লোকের মধ্যে পাড়াগত ভাব প্রবল। লোকে সগর্বে পরিচয় দেয়, হুঁ হুঁ বাবা! আমরা বাগবাজারের ছেলে! আমাদের সঙ্গে জোচ্চুরি চলবে না

এক পাড়ার লোক অন্য পাড়ায় গিয়ে প্রহৃত বা অপমানিত হলে, তাতে সমস্ত পাড়ার অপমান। এই নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুন-জখম চলতেই থাকে।

সেই সময় আহিরীটোলার খুব নামডাক। সেখানে পাঁচ-সাতজন এমন বীর আছে, যারা বেমালুম ছুরি মারতে পারে। বেমালুম ছুরি কী জিনিস? ছুরি যখন মারা হয় তখন কিছুই বুঝতে পারা যায় না। মারপিটের পর বাড়ি গিয়ে মালুম হবে।

মধুসূদন ঘোষ আহিরীটোলার একজন মুখোজ্জ্বলকারী সন্তান। তাছাড়া করিমের শাগরেদ হিসেবেও তার অন্যরকম সম্মান রয়েছে। মধুসূদন ছেলেটি কিন্তু অতি অমায়িক। ছোটোখাটো পালোয়ানের মতো চেহারা হলেও, কারুর সঙ্গে তার অবনিবনা নেই। টিফিন টাইমে সে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবু ও তার অন্য বন্ধুরা গদাম গদাম করে তার হাতে ঘুষি মারে। মধুসূদন হ্যা হ্যা করে হাসতে থাকে।

এছাড়া সপ্তাহে চারদিন অর্থাৎ সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, মধুসূদন নিয়ম করে স্কুল কামাই করে। শুক্রবার ইস্কুল বসলেই তার বিচার হয় এবং মাস্টারমশাই বা টমরির কাছে অবধারিতভাবেই ঘা দু-তিন বেত খায়।

বাবু জিগ্যেস করে, ভাবে স্কুল কামাই করিস কেন?

মধু বলে, দূ! রোজ রোজ ইস্কুলে আসতে ভালো লাগে কারো! দুপুরবেলা ঘুরে বেড়াই। বড়ো করিমের আখড়ায় ডাম্বেল ভাঁজি। শালতি করে নতুন খাল পেরিয়ে চলে যাই বাদায়। কখনো যাই মেটেবুরুজের নবাববাড়ি। কখনো বেপাড়ার সাথে মারপিটও করতে যাই

বেপাড়ার সাথে মারপিটও করতে যাস!

হুঁ। সে দিনই তো দরজিপাড়ার সাথে একচোট লড়ে এলাম। ওদের দুটো মস্তানকে শুয়ে দিয়েছি। তোরাও আমার মতো ডনবৈঠক করে, পেস্তা-বাদামের শরবত খেয়ে শরীরটাকে তৈরি কর্। তোদেরও বেপাড়ার সাথে মারপিটে নিয়ে যাব। মুচিপাড়ার সাথে আমাদের সামনের মাসে ফাইট আছে।

সেই মধুসূদনই ইতিহাসের শিক্ষক শ্যামবাবুর ক্লাসে বিষম বিপদে পড়ে গেল। ইনি আবার মহেশচন্দ্র আতর্থির বন্ধু। এঁর কাজ ছিল নিজের ক্লাস ছেড়ে অন্য মাস্টারদের ক্লাসে ছেলে ঠেঙিয়ে বেড়ানো। সেই প্রহারে কখনো ছাত্ররা গুরুতর জখমও হত। মাঝে মাঝে তিনি অবশ্য ক্লাসও নিতেন।

একদিন মধুসূদন পেছনের বেঞ্চে বসে বেশ আড্ডা জমিয়েছে। এমন সময় শ্যামবাবু তাকে একটা প্রশ্ন করলেন। বলা বাহুল্য, মধুসূদন সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না।

শ্যামবাবু বঙ্কিম হাস্য করলেন, বাবা মধু, বৃথাই বাবা তোমার নাম রেখেছিলেন মধুসূদন

মধু নিশ্চুপ।

শ্যামবাবু গলা খাঁকড়ি দিয়ে বললেন, ধুসূদন কে ছিল জান?

কে, স্যার?

ক বিরাট পণ্ডিত। কবিতা লিখত, নাটক লিখত, খুব নাম করেছিল

সে তো খ্রিস্টান হয়েছিল, স্যার

হুঁ! খ্রিস্টান  হলে কী হবে, শেষমেশ তো সেই হিঁদু দেবদেবীকে নিয়েই লিখতে হল তাকে

খ্রিস্টান কেন হল, স্যার?

মোদো ভেবেছিল যে খ্রিস্টান হবে, বিলেত যাবে, সেখানে গিয়ে মেম বিয়ে করবে। তো খ্রিস্টান হয়ে তো মোদো দেশগাঁয়ে বেড়াতে গেছে। সেখানে পড়শিদের ডেকে বলেছে, দেখ, আমি তোদের জাত ছেড়ে খ্রিস্টান হয়েছি, সভ্য হয়েছি।

তো পড়শিরা কী বলল, স্যার?

ড়শিরা তো শুনে চমকে গেল। তাক লেগে গেল তাদের। তারা বললে, বেশ করেছ, বাবা মোদো। তোমার চোদ্দো পুরুষ তুমি উদ্ধার করেছ। জিতা রহো বেটা। তো সে কথা তো কানাঘুষো হতে হতে মোদোর মায়ের কানে পৌঁছল

মা কী বলল, স্যার?

মা তো অবাক। বললেন, হ্যাঁ রে, মোদো, এসব কী শুনছি? তুই নাকি কেরেস্তান হয়েছিস? মোদো বলল, হব না কেন, মা? আমার যে ফেৎ হয়েছে।

শ্যামমাস্টারের কথা শেষ হতে না-হতেই, মধুসূদন তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, মারও একটু একটু ফেৎ হচ্ছে, স্যার শুনে ক্লাসসুদ্ধু ছেলে হো হো করে হেসে উঠল।

শ্যামবাবুর শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখ রাগে বেগুনি হয়ে উঠল। তিনি সিংহগর্জন করে উঠলেন, সাইলেন্স! সাইলেন্স! ঘর ঠান্ডা। ছেলেরা মহা আশঙ্কায় দুর্গানাম জপতে লাগল।

শ্যামবাবু রক্তচক্ষু দিয়ে মধুসূদনের দিকে তাকালেন, ধুসূদন ঘোষ, তুমি কায়েত ঘোষ না গয়লা ঘোষ?

কায়েত ঘোষ, স্যার

লেখাপড়ার নমুনা আর স্বভাবচরিত্র দেখে তো মনে হয় গয়লা ঘোষ। তা তোমার তাহলে ফেৎ হয়েছে?

হ্যাঁস্যার

সো, আমার কাছে এসো

মধুসূদন এগিয়ে যেতেই শ্যামবাবু তাঁর হাতের আড়াই হাত লম্বা বেতটা শপাং করে বসিয়ে দিলেন। মধুসূদনের হাতে একটা লাল আড়াআড়ি দাগ ফুটে উঠল।

ফেৎ হয়েছে তোমার না? ফেৎ হয়েছে? ফেৎ ছোটাচ্ছি!

শ্যামবাবু বেত চালাতে লাগলেন সাঁই-সাঁই-সাঁই, সাপের নিঃশ্বাসের মতো।

মধুসূদন নীরবে মার খেতে লাগল, টুঁ শব্দটি করল না।

ক্লাসসুদ্ধু ছেলেদের মুখ বেদনায় বিকৃত হয়ে উঠল।

মধুসূদনের ব্যায়ামপুষ্ট লৌহ কঠিন দেহে বেতের ঘা বেত মারার পরই সেটা ভেঙে পাঁচ টুকরো হয়ে গেল। শ্যামবাবু তখন আর একটা বেত আনলেন। ঘা কয়েক দিতে না দিতেই সেটারও পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটল।

মধুসূদন বললে, মাকে মেরে আপনার বগলে বিচি আউড়ে যাবে স্যার, আমার কিছুই হবে না। কেন বেত ভেঙে ইস্কুলের ফালতু লোকসান করছেন? হাত দিয়েই মারুন

(ক্রমশ…)

 
 
top