নতুন আলো

 

পর্ব ১৩

গভীর স্বামী বিবেকানন্দের অবর্তমানে বেলুড় মঠের কর্তৃত্ব স্বামী ব্রহ্মানন্দের ঘাড়ে ন্যস্ত । রাখাল মহারাজ স্বামীজির আবাল্য বন্ধু, খেলার সাথী, সহপাঠী। একই সঙ্গে দুজনে গেছেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছে। নিয়েছেন দীক্ষা।

বিবেকানন্দ কলকাতা ছেড়েছিলেন ১৮৯৯ সালের জুন মাসে। স্বামী তুরীয়ানন্দ ও নিবেদিতাকে নিয়ে গোলকুণ্ডা জাহাজে উঠেছিলেন কলকাতা বন্দর থেকে। শরীর তখন মোটেই ভালো নেই। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়স, কিন্তু নানা আধি ব্যাধিতে দেহ জরাজীর্ণকখনও ঘাড়ের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন, কখনও ডায়াবিটিস চাড়া দিয়ে উঠছে। হৃদযন্ত্রও খুব সবল নয়। রাতে ঘুম হয় না। মাঝে মাঝেই মৃত্যু চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বদমেজাজ। খিটখিটে হয়ে পড়েছেন। সেই বদমেজাজের ধাক্কা সামলাতে হয় ব্রহ্মানন্দসহ অন্য গুরু ভাইদের।

মাঝে মাঝে এতটাই শ্বাসকষ্ট হয় বিবেকানন্দের যে মুখ-চোখ লাল হয়ে ওঠে। সকলে ভাবে এই বুঝি প্রাণ বেরিয়ে যাবে। তখন উঁচু তাকিয়ার ওপর ভর দিয়ে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করেন স্বামীজি। বিবেকানন্দর অসুস্থতা নিয়ে গুরুভাইরা উদাসীন নন। নানা ধরণের চিকিৎসা চলছে। এমন কি চল্লিশ টাকা ফি দিয়ে মহার্ঘ্য অ্যালোপ্যাথকেও দেখানো হয়েছে। অবশ্য ফল হয়নি কিছুই।

স্বাস্থ্যোদ্ধারকল্পে দেওঘরেও ছুটেছেন বিবেকানন্দ। সেখানে আটদিন আটরাত্রি প্রাণ যায় যায়। শ্বাসকষ্টে মনে হয় এই বুঝি মহাপ্রাণ দেহ থেকে বেরিয়ে যাবে। মৃতপ্রায় অবস্থায় কলকাতায় ফেরেন তিনি। অবশ্য কোন অবস্থাতেই মনের জোর হারান নি তিনি। চিঠিতে লিখেছেন, দু বৎসরের শারীরিক কষ্ট আমার বিশ বছরের আয়ু হরণ করেছে। ভালো কথা। কিন্তু এতে আমার কোন পরিবর্তন হয় না। হয় কি? সেই আপনভোলা আত্মা একই ভাবে বিভোর হয়ে তীব্র একাগ্রতা আর আকুলতা নিয়ে ঠিক তেমনি দাঁড়িয়ে আছে।

বস্তুতঃ এবারের পাশ্চাত্য ভ্রমণ কিছুটা শরীর সারানোর জন্যও বটে। যদি ইংল্যান্ড, আমেরিকার উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা কিছু সুরাহার সন্ধান দিতে পারে। তবে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানেপাশ্চাত্যেও বিবেকানন্দের কর্মোদ্দ্যমেরবিরাম নেই। বক্তৃতা দিয়ে চলেছেন, টাকা তুলছেন বেলুড় মঠের জন্য, প্রচার করছেন বেদান্তর বাণী।

কলকাতায় থাকা কালীন স্বামীজীর অসুস্থতা নিয়ে প্রবল উৎকণ্ঠিতা ছিলেন নিবেদিতা। সে সময় এক বিখ্যাত জ্যোতিষীকে দিয়ে স্বামীজীর কোষ্ঠী করানো হয়েছিল। কোষ্ঠীর ফলাফল জেনে উল্লসিত হয়ে স্বামীজীর প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করেছিলেন নিবেদিতা।

স্বামীজি! কোন ভয় নেই!

কেমার্গট?

পনার লগ্নে বৃহস্পতি। অন্ততঃ সামনের নয় বছর কোন ভয় নেই

য় বছর ভয় নেই? কোন রামছাগল এই কোষ্ঠী করেছে? আর কত টাকা খরচকরেছ এর জন্য?

মন বলছেন কেন প্রভু?

মার্গট আমি জানিআমি বাঁচব না বেশিদিন। চল্লিশও পেরোব না আমি। আর তুমি ঐ বুজরুক গর্ভস্রাব জ্যোতিষীর পেছনে গাদাগুচ্ছের টাকা নষ্ট করলে? তোমার এই কুসংস্কার কেন?

রাগে আর উত্তেজনায় স্বামীজীর শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়েছিল। শুরু হয়েছিল প্রবল হাঁপানি আর কাশি। কক্ষান্তরে গিয়ে আকূল কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন নিবেদিতা। সে মনখারাপ অনেকদিন কাটেনি তাঁর।

স্বামীজি এত অবুঝ কেন? তিনি কি বোঝেন না যে নিবেদিতা তাঁকে নিবিড়ভাবে ভালবাসেন? ভালবাসার জনের জন্য যদি পয়সা খরচ করিয়ে কুসংস্কারের প্রশ্রয় দিয়েও থাকেন নিবেদিতা, তাহলেও কি এমন রূঢ় ভাবে সে কথা বলতে আছে?

স্বামী ব্রহ্মানন্দও বিবেকানন্দের বাক্যবাণের জ্বালা বহুদিন সয়েছেন। আজ বিবেকানন্দ দেশান্তরী, মাঝে মাঝে চিঠি আসে তাঁর। আসে পরিব্রাজকের লেখা, উদ্বোধনের সংখ্যায় ছাপানোর জন্য। কিন্তু আবাল্য অন্তরঙ্গের নিবিড় সঙ্গের জন্য উৎকণ্ঠিত হতে থাকেন ব্রহ্মানন্দমাঝে মাঝে খুলে বসেন তাঁকে লেখা বিবেকানন্দের চিঠির ঝাঁপি।

তোমার উপর অত্যন্ত কটু ব্যবহার করেছি; যা হবার তা হয়েছেকর্মআমি অনুতাপ কি করব?

এক্ষণে আমার সিদ্ধান্ত এই যে, আমি আর কাজের যোগ্য নইতোমার উপর অত্যন্ত কটু ব্যবহার করেছি বুঝতে পারছি, তবে তুমি আমার সব সহ্য করবে জানি; ও মঠে আর কেউ নেই যে সব সইবে! তোমার উপর অধিক অধিক কটু ব্যবহার করেছি; যা হবার তা হয়েছে–কর্ম আমি অনুতাপ কি করব, ওতে বিশ্বাস নেই–কর্ম! মায়ের কাজ আমার দ্বারা যতটুকু হবার ছিল, ততটুকু করিয়ে শেষে শরীর মন চুর করে ছেড়ে দিলেন ‘মা’! মায়ের ইচ্ছা! দু একদিনের মধ্যে সব ছেড়ে দিয়ে একলা একলা চলে যাব, কোথাও চুপ করে বাকি জীবন কাটাবো। তোমরা মাপ করতে হয় করো, যা ইচ্ছা করো।

পড়তে পড়তে ব্রহ্মানন্দের চোখ জলে ভরে আসে। তাঁর আবাল্য সুহৃদ কি জীবনের আশা ছেড়ে দিলেন? সেই চির আশাবাদী কি অস্তাচলের পথে ঢলে পড়েছেন?

কিন্তু বিবেকানন্দ বিবেকানন্দই। তাঁর অন্তরের বীর্য সিংহ গর্জনে জেগে ওঠে :

আমি লড়াইয়ে কখনো পেছপাও হইনি; এখন কি হবো? হার জিত সকল কাজেই আছে; তবে আমার বিশ্বাস যে কাপুরুষ মরে নিশ্চিত কৃমিকীট হয়েই জন্মায়! যুগ যুগ তপস্যা করলেও কাপুরুষের উদ্ধার নেই–আমায় কি শেষে কৃমি হয়েই জন্মাতে হবে? …আমার চোখে এ সংসার খেলা মাত্রচিরকাল তাই থাকবে। এর মান অপমান লাভ লোকসান নিয়ে কি ছ মাস ভাবতে হবে? …আমার চোখে জীবনটা এমন কিছু মিষ্টি নয় যে অত ভয়ডর করে হুঁশিয়ার হয়ে বাঁচতে হবে।

যে কদিন গোলকুণ্ডা জাহাজে ছিলেন, বেশ ভালই ছিলেন স্বামীজী। ধূমপান ও জল পান দুইই কমিয়ে ফেলেছিলেন। নিবেদিতা প্রশ্ন করলে স্বামীজীর উত্তর ছিল, মার্গট আমার সব কিছুই এক্সট্রিম। আমি চরমের সমাহার

যেমন?

মি প্রচুর খেতে পারি আবার একদম না খেয়েও থাকতে পারি। অবিরাম ধূমপান করি আবার সম্পূর্ণ ছেড়েও দিতে পারি। আমার ইন্দ্রিয়দমনের ক্ষমতা রয়েছে। আবার ইন্দ্রিয়ানুভূতিও আমার কম নয়। নইলে সে দমনের মূল্য কোথায় মার্গট?

৩১ শে জুলাই ১৮৯৯ সালে লন্ডনের টিলবেরি ডকে জাহাজ থেকে যখন নামলেন স্বামীজী তখন বেশ রোগা হয়ে গেছেন তিনি। যেন ফিরে এসেছেন তরুণ বয়সের বিবেকানন্দ।

পাশ্চাত্যে ভক্তরা স্বামীজীর চিকিৎসার ত্রুটি করেননি। বহু ডাক্তারের সংস্পর্শে এসেছেন তিনি। নানা মুনির নানা মত। কেউ বলে নিরামিষ খাও, ডাল ছুঁয়ো নাসব সর্বনাশ ইউরিক অ্যাসিড থেকে হচ্ছে। কেউ আবার বলে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। বিবেকানন্দ ধৈর্যের সাথে সবার উপদেশই পালন করার চেষ্টা করেছেন,ফল অবশ্য পাননি।

সেবার স্বামীজী নিউইয়র্কে পৌঁছলেন ২৬ শে অগাস্ট, ১৮৯৯সেখানে হাতুড়ে চিকিৎসকদেরও শরণাপন্ন হলেন তিনি। এলেন অস্টিওপ্যাথ ডাক্তার হেলমার। এলেন চৌম্বক-চিকিৎসায় পারদর্শিনী মিসেস মিল্টন। ইনি আবার লিখতে, পড়তে পারেন না। কথা বলেন নিগ্রো ডায়ালেক্টে। তাঁর চিকিৎসায় বিবেকানন্দর বুকে চাকা চাকা লাল লাল দাগ ফুটে উঠল। ঘষে ঘষে স্বামীজীর গা থেকে কয়েক ইঞ্চি চামড়াও তুলে দিলেন তিনি। মাঝে মাঝেই সর্দি জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন স্বামীজী। চলছিল পেটের গোলমাল এবং স্নায়বিক দৌর্বল্য।

অবশ্য এর মধ্যেই বক্তৃতারও বিরাম নেই। নানা জায়গায় ভাষণ দিয়ে চলেছেন স্বামীজী। অবশ্য মঞ্চে যখন দাঁড়ান তখন তিনি অন্য মানুষ। কিছু একটা ভর করে তাঁর উপর। দৈববাণীর মত বজ্রগর্ভ বাক্য নির্গত হতে থাকে তাঁর কন্ঠ থেকে।

জুন মাস পাশ্চাত্য গোলার্ধে বড় মনোরম। দিন হয়ে যায় দীর্ঘায়িত। রাত আটটা নটা পর্যন্ত অকৃপণ সূর্যের আলো। আরামদায়ক উষ্ণতা বাতাসে। পার্কে, উদ্যানবীথিতে ফুলের সমারোহ, পাখির কলকাকলি।

১৯০০ সালের জুন মাসের এক সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের অভিজাত সভাগৃহে স্বামীজীর বক্তৃতার আসর বসল। হল কানায় কানায় পূর্ণ। দেয়ালের ঝারলন্ঠন দীপ্র শিখায় জ্বলছে। অদ্বিতীয় বাগ্মী বিবেকানন্দের বক্তৃতা শুনতে উৎসুক সকলে।

নিবেদিতা হলে প্রবেশ করেছিলেন সবার আগে। তাঁর বসার একটা বিশেষত্ব আছে। দ্বিতীয় সারির বাঁ দিকে তিনি বসেন। এটাই বরাবরের অভ্যেস তাঁর। লন্ডনে যখন মুগ্ধ হয়ে স্বামীজীর বক্তৃতা শুনতেন তখনো এই নিয়মের ব্যত্যয় হত না।

স্বামীজীর প্রতীক্ষারত নিবেদিতার মধ্যে একটা শিহরণ খেলে গেল। মনে পড়ে গেল লন্ডনের সেই দিনগুলো, যখন একই ভাবে স্বামীজীর প্রতীক্ষা করে থাকতেন তিনি। তারপর জীবন তাঁর এক অত্যাশ্চর্য মোড় নিয়েছে। পুরনো জীবন ছেঁড়া কাঁথার মত ত্যাগ করেছেন তিনি। সর্বস্বত্যাগ করে অনুবর্তিনী হয়েছেন এক দিব্যপুরুষের।

ঠিক কি করেছেন? ঠিক কি করেছেন?

ভেবে ভেবে কূল পান না নিবেদিতা। মাঝে মাঝে বিগত বছর দুয়েকের ঘটনাক্রম স্বপ্নবৎ মনে হয়। যেন একটা মায়া, একটা ইলিউশনের মধ্য দিয়ে ভেসে চলেছেন তিনি।

কম্পিত ও শিহরিত নিবেদিতা দেখলেন যে স্বামীজী ধীরে ধীরে মঞ্চে প্রবেশ করছেন। রূপবান, তেজস্বী পুরুষ। অঙ্গে রেশমের গৈরিক জোব্বা। সহাস্য মুখে অসুস্থতার কোন চিহ্ন নেই।

নিবেদিতার মনে হল যে স্বামীজীর আবির্ভাবই যেন একটা স্তবের মত, প্রার্থনার মত, পূজার মত তাঁর সর্বাঙ্গ স্নিগ্ধ করে দিচ্ছে। এক দৃষ্টে চেয়ে রইলেন তিনি।

সমবেত শ্রোতৃমণ্ডলীর দিকে স্বামীজীও স্নিগ্ধ হাসি মুখে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। তারপর তাঁর গম্ভীর কন্ঠস্বর হলের মধ্যে মন্দ্রিত হয়ে উঠল:

দ্রমণ্ডলী, আজ আমি তেমন প্রস্তুত হয়ে আসিনি। কি বলব বলুন?

একজন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বেদান্ত নিয়ে কিছু বলুন স্বামীজী

ওঃ ! বেদান্ত ! আচ্ছা শুরু করা যাক

সেই আশ্চর্য, অশরীরী কন্ঠস্বর এক পবিত্র অর্গানের মত বেজে উঠল।

দ্রমহোদয়গণ, আমাদের দুটো জগৎ আছে: একটা ভেতরের, একটা বাইরের। যুগযুগান্তর ধরে মানুষ দুই জগতেরই রহস্য সন্ধান করছে। প্রথমে সে খুঁজেছে বাইরের জগতেলাভ করেছে অপূর্ব সব উত্তরসত্য, শিব, সুন্দর।

কিন্তু আমাদের অন্তর্জগৎ আরও মহৎ, আরও বিরাট, আরও সুন্দর। ভারতের ঋষিরা ডুব দিয়েছিলেন এই অন্তর্জগতে।

মি বেদের জ্ঞানকাণ্ডের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। একে উপনিষদ বা আরণ্যক বা বেদান্ত বলেও অভিহিত করা হয়। এখানেই আমরা পাই গভীরতম জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ, মহত্তম সত্যের অভিব্যক্তি।

ই জগতের সবচেয়ে মৌলিক, সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে প্রামাণ্য সত্য হলসব কিছুই আসলে ব্রহ্ম। যা আমরা চোখের সামনে দেখছিসোনা, দানা, প্রেম, ভালোবাসা, দুঃখ, বেদনা, এই মরজগৎসবই আদতে ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছু নয়। তারা বহুরূপে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে কিন্তু একই ঈশ্বরের বহিঃপ্রকাশ তারা।

সেই বেদান্তের বাণী হলকস্মিত্রু ভগবো বিজ্ঞাতে সর্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতি

কোন সে বস্তু যাকে জেনে আমরা সবকিছুকে জানবো? সব কিছুকে পাবো? আজকের যুগের ভাষায়, উপনিষদের উদ্দেশ্য হল এই বিশ্বের সবকিছুর মধ্যে যে ঐক্য, বিপুল বৈচিত্রের মধ্যে যে সর্বময় সত্য, তাঁকে খুঁজে বের করা।

জ যা বস্তু, কাল তা আত্মায় রূপান্তরিত হবে। আজ যে কীটমাত্র সে উত্তীর্ণ হবে দেবত্বে। আমাদের মধ্যের যে অনন্ত বিভেদ তা আসলে এক অসীম সত্যেরই বহিঃপ্রকাশ।

তত্বমসি শ্বেতকেতু–শ্বেতকেতু, দ্যাট দাউ আর্ট।

জ আমরা বিজ্ঞানের অসাধারণ আবিষ্কার গুলো দেখছি। বিজ্ঞান দেখাচ্ছে যে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঐক্য রয়েছে। তাপশক্তি, চৌম্বকশক্তি, বিদ্যুৎশক্তি সব একই শক্তির লীলা মাত্র। মাধ্যাকর্ষণই বলুন, আকর্ষণই বলুন, বিকর্ষণই বলুন সব সেই একই শক্তির খেলা।

সেই আশ্চর্য সুন্দর ভরাট অর্গানের মত কন্ঠস্বর সভাগৃহের মধ্যে রণিত, অনুরণিত হতে লাগল। একের পর এক অনুপ্রাণিত বাক্যে সন্ধ্যার বাতাস থর থর করে কাঁপতে লাগল।

চিন্তা কি?সেও এক শক্তি যা আমাদের অন্তঃকরণ থেকে আসছে, প্রাণের থেকে আসছে।

প্রাণ কি?প্রাণ স্পন্দন বা ভাইব্রেশন ছাড়া কিছু নয় । সেও এই শক্তিরই প্রকাশ।

খন ব্রহ্মাণ্ড আবার তার প্রাথমিক অবস্থায় ফিরে যাবে তখন এই অনন্ত শক্তির কি হবে? সে কি অবলুপ্ত হয়ে যাবে?

না বন্ধুগণ, না ! শক্তিই যদি অবলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে পরের তরঙ্গ আসবে কি করে?

ব্রহ্মাণ্ড মানেই অনন্ত চলিষ্ণুতাতরঙ্গের মত সে উঠছে, পড়ছে, বিলয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং আবার নতুন করে সৃজিত হচ্ছে। বিলয়ের পর সমস্ত প্রাণ আবার কোথায় যাবে? তারা ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একিভুত, ঘনীভূত হবেসেই ব্রহ্ম স্পন্দনশীল আবার স্পন্দনশীল নন। স্থির অথচ অস্থির।

যদিদং কিঞ্চ জগৎসর্বং এজতি নিঃসৃতম

জ মানে স্পন্দন। জগতের সবকিছু এই স্পন্দন থেকে নিঃসৃত হয়েছে। নতুন সৃষ্টির সময় এই স্পন্দন দ্রুততর হয় । সেই স্পন্দন-সৃষ্ট তরঙ্গ থেকে তৈরি হয় তারা, গ্রহ, সৌরজগৎ

কে বলে যে আইডিয়াই আসল, কন্ঠ কিছু নয়। স্বামীজীর কন্ঠ উঠছে, পড়ছে আর তার অন্তর্নিহিত কাব্য, সংগীত শ্রোতাদের সত্বার অণুপরমাণুতে মিশে যাচ্ছে। জীবনের হট্টমেলা থেকে কোন নির্জন, নিমগ্ন, শব্দহীন সুদুরলোকে তাদের উড়িয়ে নিয়ে চলেছেন স্বামীজী। তাঁর মুখ দিব্যদ্যুতিতে ঝলমল করছে।

ন কি? মন ব্রহ্মেরই অংশ যা আমাদের মস্তিষ্কের জালে বাঁধা পড়ে আছে। সব মনের সমষ্টি থেকে উৎপন্ন হচ্ছে বিশ্বমন। আমরা এক একজন হলাম মাইক্রোকজম আর সমস্ত বিশ্ব হল ম্যাক্রোকজম।

ত্মা কি? মনই কি আত্মা? না বন্ধু । দার্শনিকেরা বলেন যে আত্মা হল সেলফআত্মাই হল আমাদের ভেতরকার আসল মানুষ যে মনের মাধ্যমে আমাদের পরিচালিত করছে

পনারা জানেন যে শুক্তির মধ্যে এক বিন্দু বালি ঢুকলে তার জ্বালায় অস্থির হয়ে শুক্তি তার দেহ থেকে নিঃসৃত করে আপন রস। সেই রস কেলাসিত হলে আমরা পাই মুক্তো।

কই ভাবে বাইরের আঘাত, উত্তেজনাতে আমরা সাড়া দিই , সে সময় আমাদের মনেরই একটা অংশকে সেই আঘাতের উদ্দেশে মেলে ধরি।

ন্ধুরা, আপনারা বস্তুবাদী। কিন্তু আপনারাও মানতে বাধ্য যে চোখে যে দেখছেন, আপনাদের ইন্দ্রিয়ের কাছে যা প্রতীয়মান হচ্ছে তার মধ্যে মনেরও একটা বিরাট অংশ রয়েছে।

ত্মাও তাই। আত্মাকে আমরা আমাদের মনের মাধ্যমে জানি বা জানতে চাই। সেই জানার মধ্যেও মনের বিশাল অংশ থেকে যায়।

গীতায় লিখেছে: নৈ্নং চ্ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি, নৈনং দহতি পাবকঃ।

ই আত্মা কে অস্ত্র দিয়ে ছেদন করা যায় না, অগ্নি দিয়ে দহন করা যায় না, জল দিয়ে সিক্ত করা যায় না, বাতাস দিয়ে শুষ্ক করা যায় না । এই আত্মা অজর, অমর, অক্ষয়।

কে বলে আপনারা পাপী? কে বলে আপনারা ভ্রষ্ট? আপনারা সবাই ব্রহ্মের অংশ। আপনাদের সবার মধ্যেই আছে ব্রহ্মের শক্তি, ব্রহ্মের সম্ভাবনা !

জকের বিজ্ঞানীরা বিবর্তনের কথা বলেন, ইভল্যুশনের কথা বলেন। যোগীশ্রেষ্ঠ পতঞ্জলিও একই কথা বলেছেন।

জাত্যন্তরপরিণাম প্রকৃত্যাপুরাত

ক জাতি বা স্পিসিস অন্য জাতি বা স্পিসিসে রূপান্তরিত হচ্ছে। কিন্তু আপনারা বলেন যে এই বিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হল প্রতিযোগিতা। আমরা তা বলি না। বেদান্ত বলে যে প্রতিটা আত্মাই অসীম। বুদ্ধের মধ্যে যে আত্মা, একটা কীটাণুকীটের মধ্যেও সেই একই আত্মা। শুধু তাদের প্রকাশ ভিন্ন। কীট অল্প পরিমাণ শক্তি প্রকাশ করছে আর একজন মহামানব সুপ্রচুর শক্তির প্রকাশক।  আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই তাই অনন্ত শক্তি, অনন্ত সম্ভাবনা, অনন্ত সমৃদ্ধি। আমরা যারা অসীমের স্বপ্ন দেখতে পারি তারা সামান্য স্বপ্নেই পরিতৃপ্ত! কি পরিতাপ! কি পরিতাপ!

বিবেকনন্দের কন্ঠ বেদনায় বিধুর হয়ে উঠল:

সেই অসীমকে কে সাহায্য করতে পারে? কে? কে?

ন্ধকারের মধ্যে যে হাত আপনার কাছে এগিয়ে আসবে সে হাতটাও আপনারই হতে হবে। আর কেউ থাকবে না সেখানে।

হরি ওম তৎসৎ! হরি ওম তৎসৎ! হরি ওম তৎসৎ!

স্বামীজীর ভাষণ শেষ হয়ে গেল। মঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রান্ত হলেন তিনি। অন্ধকার সভাগৃহে চুপ করে বসে রইলেন নিবেদিতা। তাঁর মনের সংশয় কেটে গেছে। জীবনের অসীমতার দিকে তাঁকে নিয়ে গেছেন স্বামীজী। তাঁর জীবনটাকে নিজের হাতের তালুর মধ্যে ধরে তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। নির্দেশিত করে দিয়েছেন যাত্রাপথ।

অভিভূত নিবেদিতার চটকা সহসা ভেঙ্গে গেল। তাঁর গুরু, তাঁর নেতা, তাঁর মহারাজ সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। সস্নেহে স্পর্শ করছেন নিবেদিতার চিবুক, মার্গট ! তুমি এখনো বসে আছো?

চমকে চাইলেন নিবেদিতা। সভাগৃহের প্রায়ান্ধকারে স্বামীজী মুচকি মুচকি হাসছেন। গুরু-শিষ্যার মধ্যে অবশ্য বেশি বাক্য বিনিময় হল না ।

স্বামীজী ক্যান আই প্লীজ হ্যাভ এ ব্রীফ ওয়ার্ড উইথ ইউ?

হ্যাট-কোটধারী এক সাহেব এসে দাঁড়িয়েছেন। ভদ্রলোক অস্বাভাবিক লম্বা এবং কৃশকায়। মাথাটা প্রকাণ্ড। ত্রিকোণাকৃতি মুখে চওড়া কপাল তীক্ষ্ণ চিবুকে এসে মিশেছে। সরু কালো গোঁফ। মুখ বুদ্ধির দীপ্তিতে ঝলমল করছে। দেখলেই বোঝা যায় যে ভদ্রলোক সাধারণ ব্যক্তি নন।

বিবেকানন্দ উল্লসিত হয়ে উঠলেন, হাই নিকোলা! হাউ আর ইউ?

তারপর নিবেদিতার দিকে ফিরে বললেন, রিচয় করিয়ে দিইমাই ফ্রেন্ড নিকোলা টেসলাওয়ার্ল্ড ফেমাস সায়েন্টিস্ট। অ্যাণ্ড দিস ইজ মারগারেট নোবল, মাই ডিসাইপল, নাউ নোন অ্যাজ সিস্টার নিবেদিতা

টেসলা এবং নিবেদিতা করমর্দন করলেন।

বিবেকানন্দ বললেন, নিকোলা তোমার সেই কাজের কি হল?

স্টিল ওয়ার্কিং অন ইট স্বামীজী। টাফ প্রব্লেম টু ক্র্যাক

নিবেদিতাকে বিবেকানন্দ বললেন, মার্গট তুমি যদি বেদান্ত ঠিক ভাবে বুঝে থাক তাহলে তোমার কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে পদার্থ আর শক্তি আসলে এক এবং পরস্পরে অবিরত রূপান্তরিত হয় এবং হচ্ছেআমাদের ঋষিরা এটাকেই বলতেন প্রাণ আর আকাশ। নিকোলা এটা নিয়েই কাজ করছে। ওর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল বছর পাঁচেক আগে

টেসলা বললেনরাইট ইউ আর স্বামীজী! আমরা যদি কোনোভাবে মাস আর এনার্জির ইকুইভ্যালেন্স দেখাতে পারিদ্যাট উড বি রেভলুশনারি। আই অ্যাম স্টিল হান্টিং ফর অ্যান ইকুয়েশন, ফর এ ম্যাথামেটিকাল ফর্মুলা টু ডেমন্সট্রেট ইট

বিবেকানন্দ, অ্যাণ্ড দ্যাট উড প্লেস বেদান্ত অন দা শিয়োরেস্ট সায়েন্টিফিক ফাউণ্ডেশন

নিবেদিতা, নি সাকসেস? এনি জয়?

টেসলা, নফরচুনেটলি নট ইয়েট মিস নোবল। ইটস এ টাফ প্রব্লেম টু ক্র্যাক

বিবেকানন্দ, কিপ ওয়ার্কিং অন ইট নিকোলা। তা তুমি আমার আসার খবর পেলে কোথায়?

ট ওয়াজ ইন দা পেপারস স্বামীজী। হাউ ক্যান আই মিস ইট?

বিবেকানন্দ বললেন, বুঝলে মার্গট, নিকোলা সারাদিন ল্যাবে এত ব্যস্ত থাকে যে নাওয়া, খাওয়ারও সময় পায় না কিন্তু আমার বক্তৃতা হলে ও আসবেই এবং ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে শুনবে

টেসলা বললেন, সিমস দ্যাট ইয়োর ভেদিক ঋষিজ হ্যাড এ ফার গ্র্যাণ্ডার কনসেপশন অদ্য ওয়ার্ল্ড দ্যান দ্য গ্রেটেস্ট মেন অফ সায়েন্স অ দিস এরা!

বিবেকানন্দ সহাস্যে বললেন, অ্যান্ড দ্যাট ইনক্লুডস ইউ অ্যাজ ওয়েল নিকোলা!

দুই বন্ধুই এবার হো হো করে অকৃত্রিম অট্টহাস্যে ফেটে পড়লেন

(ক্রমশ…)

 
 
top