নতুন আলো

 

 

পর্ব ২৫

প্রেমাঙ্কুরদের বাড়ির কাছেই অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি মিশনতার অধিকর্তা ক্রিশ্চান পাদ্রি রেভারেন্ড ব্রাউনঅতি মহাজন মানুষ তিনি সারা পৃথিবীকে প্রেমের দৃষ্টিতে দেখেনদুনিয়ার কারো সঙ্গে তাঁর অবনিবনা নেই রাস্তা দিয়ে যখন চলেন, তখন রাজ্যের ছেলে ঘিরে থাকে তাঁকে পকেট থেকে লজেন্স, মিষ্টি, ছবির কার্ড তাদের অকাতরে বিলোতে থাকেন ফাদার ব্রাউন

রাস্তাঘাটে চেনাজানা লোক দেখলেই তাকে বাংলায় সম্ভাষণ করবেন তিনিজড়িয়ে ধরে চকাৎচকাৎ করে দু-গালে চুমু খাবেন প্রেমাঙ্কুররা ফাদার ব্রাউনকে ভালোবাসে, দাদা বলে ডাকে তাঁকে অবশ্য এই যত্রতত্র সবাইকে ধরেধরে চুম্বন বিতরণের ব্যাপারটা তাদের খুব একটা পছন্দের নয় একদিন এক খাটা পায়খানার মেথরকে চুমু খেয়েই বুড়ো, লালুকে চুম্বন করেছিলেন ব্রাউন ফলস্বরূপ বাড়ি ফিরেই পনেরো মিনিট সাবান দিয়ে গাল ধুতে হয়েছিল দু-ভাইকে।

ইস্কুলফেরত বুড়ো আর লালু বাজার করতে বেরিয়েছে। বাজার করায় দুই ভাইয়েরই প্রবল উৎসাহ। মহেশচন্দ্র কড়া অভিভাবকতাঁর শাসনে ছেলেদের হাতখরচের পয়সা থাকে না। ফুচকা, আলুকাবলির রেস্ত জোটে না। বাজার করলে সেই সুবাদে এক, দু-পয়সা বিলক্ষণ আয় হয়। অতএব চাকরবাকরদের দিয়ে বাজার করানোর ব্যাপারে দুই ভাই ঘোর বিরোধী। বাজার করার গুরুদায়িত্ব পালন করার ব্যাপারে দুজনেই অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ণসেই কর্তব্য পালনের পথেই ব্রাউনের সঙ্গে দেখা। পালানোর পথ নেইহেদোর সামনের ফুটপাথে তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন সাহেব

‘বাচ্চারা টোমরা কোঠায় যাইটেছ?’

‘বাজার করতে যাচ্ছি, দাদা।’

‘বালো, বালো, লজেন্স খাবা?’

সাহেবের হাত থেকে লজেন্স নিল দু-ভাই।

‘পড়াশোনা করিটেছ তো? টোমাদের পিটা বলিটেছিলেন যে, টোমরা টিন ভাই নটি আছ। পড়ায় মন নাই।’

খেয়েছে! পিতা মহেশচন্দ্র তাদের পড়ায় অমনোযোগের কথা তাহলে সর্বত্র রাষ্ট্র করে বেড়াচ্ছেন!

‘মন ডিয়া পড়িবে। বাবা মায়ের মনে কষ্ট ডেওয়া ঠিক আছে না।’

ভাগ্য ভালো, ব্রাউন সাহেব কিঞ্চিত উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হলেন। তাঁর হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে দুই ভাই হেদুয়ার জলাশয়-সংলগ্ন পার্কে ঢুকল।

বিকেল গড়িয়ে এসেছে। হেদুয়ার জলাশয় তথা পার্ক এ সময় অত্যন্ত মনোরম। অনেকে বৈকালিকও সান্ধ্য ভ্রমনে আসেন। গাছে গাছে পাখির কলকাকলি। জলে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম প্রতিফলন। মলয় বাতাসে ফুলের সুগন্ধ। বেঞ্চে বেঞ্চে বসে আছেন অনেকানেক প্রৌঢ়। জলাশয়ের পাশের বাঁধানো পথ দিয়ে পদচারণা করছেন কেউ কেউ।

প্রেমাঙ্কুর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছেন দুই ব্যক্তিনিবিড় আলাপে মগ্ন দু-জনে। তাঁদের মধ্যে একজন প্রেমাঙ্কুরের পূর্বপরিচিত।

‘লালু, মনে আছে আমরা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি গেছিলাম?’

‘হ্যাঁ, দাদা।’

‘একটা খুব সুন্দর দেখতে লোক মহর্ষির ঘরের বাইরে বেঞ্চে বসেছিল?’

‘হ্যাঁ, দাদা, বেশ মনে পড়ছে।’

‘রবি ঠাকুর লোকটার নাম মহর্ষির ছেলে।’

‘সেই লোকটাই কি আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে গেল?’

‘তাই তো মনে হচ্ছে কিন্তু সঙ্গের লোকটা কে?’

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী ভদ্রলোক বেশ গাঁট্টাগোট্টা পরনে আলখাল্লা শ্যামলা গায়ের রং মুখের ভাবে এবং চোয়ালের দৃঢ় গঠনে পৌরুষ ও বুদ্ধির ছাপ স্পষ্ট

সেই সুন্দর বিকেলে ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়কে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ হেদুয়ায় হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা কেউ আজকাল কাছে নেই। জগদীশচন্দ্র বিলেতে। লোকেন পালিতও তাই। আলুর চাষে বিফল হওয়ার পর দ্বিজেন্দ্রলাল একটু দূরে সরে গেছেন। প্রিয়নাথের সঙ্গে আজকাল মূলত বৈষয়িক কথাবার্তা হয় কবির। এই মানসিক নিঃসঙ্গতার মধ্যে হঠাৎ ধূমকেতুর মত আবির্ভূত হয়েছেন ব্রহ্মবান্ধবমাসিক সোফিয়া-য় রবীন্দ্রকাব্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসার পর দুজনের সখ্য খুব নিবিড় হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝেই কার্তিক নার বেথুন রো-র বাড়িতে চলে আসেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর দু-জনের মধ্যেকার তুমুল আলোচনা অনেক সময়ই শেষ হয় নিকটবর্তী হেদুয়ার ধারে। তীক্ষ্ণধী রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছেন যে ব্রহ্মবান্ধব এক সমধর্মী প্রতিভা। তাঁর মধ্যেও হিরের ধার।   

এই সব আলোচনায় ব্রহ্মবান্ধবই মূল বক্তা। রবীন্দ্রনাথ ধৈর্যবান শ্রোতার ভূমিকায় আছেন।

‘রবিবাবু, আপনি কখনো গাঁজা বা সিদ্ধি খেয়েছেন?’

ব্রহ্মবান্ধবের প্রশ্নে মুচকি হাসলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে এহেন প্রশ্ন করার সাহস একমাত্র ব্রহ্মবান্ধবই দেখাবেন।

‘না, সে সৌভাগ্য হয়নিআপনি খেয়েছেন নাকি?’

‘আপনি তো মশাই গুডি গুডি বয়। না, আমি গাঁজা খাইনি বটে, তবে একসময় খুব সিদ্ধির নেশা করতাম।’

‘বটে!’

‘আপনার মনে পড়ে আমাদের ছোটোবেলায় একসময় লেকচারের খুব ধুম উঠেছিল?’

‘পড়বে না? সুরেন ব্যানার্জি, আনন্দমোহন বোস!’

‘বটেই তো। লেকচারে লেকচারে দেশ তখন মাতোয়ারা। শ্যামের বাঁশি শুনে রাধার যা  অবস্থা আমারও তাইকেমন একটা ঘোরের মধ্যে সবসময় থাকতাম, মশাইআমার ঠাকুমা রাগ করে বলতেন—নেকচারেই দেশটাকে খেলে!’

‘ঠিকই বলতেন। এত লেকচারে দেশের কিছুমাত্র উন্নতি হয়েছে?’

‘মশাই, সে সব বোঝার অবস্থা তো ছিল না তখন। লেকচার যখন ফুরিয়ে যেত কীরকম ফাঁকা ফাঁকা যেন লাগত সব কিছু। মেট্রোপলিটান কলেজে তখন পড়ি।’

‘আপনি সুরেন ব্যানার্জিকে তাহলে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ। আমাদের ইংরেজির ক্লাস নিতেন। দারুণ পড়াতেন। ইতিহাসের গল্পও করতেন ক্লাসে। ক্লাসে এসে বলতেন, তোমাদের মধ্যে ম্যাজিনি কে হবে? গ্যারিবল্ডি কে হবে?’

‘আপনারা কী বলতেন?’

‘আমরা ব্যাকবেঞ্চাররা হাত তুলে লাফাতাম—আমি হব! আমি হব!’

‘সেই সময়ই কি সিদ্ধি ধরলেন?’

‘একটা অদ্ভুত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম, রবিবাবু। ভেতরে কোনো অবলম্বন পাচ্ছিলাম না। শেষে একদিন আনন্দমোহনবাবুর  বাড়ি গিয়ে সটান তাঁর সাথে দেখা করলাম।’

‘উনি তো জগদীশবাবুর ভগ্নিপতি।’

‘হ্যাঁ, সেদিন আনন্দবাবুর ওখানে জগদীশবাবুর বাবা বসেছিলেন, ডেপুটি ভগবানচন্দ্র বসু।’

‘তা আনন্দবাবুকে কি বললেন?’

‘আমি মশাই কাউকে হক কথা বলতে ছাড়ি না। আনন্দবাবুকে বললাম যে, -সব বক্তৃতাবাজি করে দেশোধ্বার হবে না বুঝেছেন, তলোয়ার চাই, তলোয়ার!’

‘মুখের ওপর বললেন কথা?’

‘হ্যাঁ, বললাম তা আনন্দবাবু মজা করে বললেন, “ছোকরা তুমি কার সামনে এ কথা বলছ, সে খেয়াল আছে? ইনি সরকারি ডেপুটি! তোমাকে ধাঁ করে গারদে চালান করে দেবেন!” পরে অবশ্য খাতির করে চা, মিষ্টি খাওয়ালেন আমার বাবার সঙ্গে ভাল খাতির আছে ওনার তবে ওঁর কথায় মন ভরল না।’

‘কেন?’

‘সেই ফাটা বাঁশির মতো একই সুর, একই কথাইংরেজরা নাকি স্বাধীনতার দূত! আমাদের সভ্য করার জন্যেই তারা নাকি এদেশে এসেছে! তাদের সঙ্গে লড়তে পাশব শক্তির কোনো প্রয়োজনই নেই! বিদায় দেবার আগে দরজায় দাঁড়িয়ে আনন্দবাবু বলতে থাকলেন, “রিমেম্বার, মাই বয়! দা ইংলিশ আর অ্যাপসলস অফ ফ্রিডম অ্যান্ড ইন্ডিপেন্ডেন্স! দে আর সিভিলাইজড পিপল!”‘

রবীন্দ্রনাথের দিকে ফিরে প্রদীপ্তস্বরে প্রশ্ন করলেন ব্রহ্মবান্ধব, ‘ কথাগুলো কি আপনি বিশ্বাস করেন রবিবাবু যে, ইংরেজরা সভ্য, সিভিলাইজড? ভারতকে স্বাধীন করতে তারা এদেশে এসেছে?’

রবীন্দ্রনাথের নিজের মধ্যে ব্যাপারে সংশয় আছে একসময় ইংরেজি সাহিত্য পড়তে পড়তে, কিটস, শেলি, বায়রনের রসাস্বাদন করতে করতে বা গ্ল্যাডস্টোন, জন ব্রাইট, এডমান্ড বার্কের বক্তৃতায় সর্বমানবের বিজয়ঘোষণায় তাঁর মন যে উদ্দীপ্ত হয়নি, তা নয় ব্রাহ্মরা নিজেরাও মোটামুটি রাজভক্ত কিন্তু শিলাইদহে গিয়ে গ্রামবাংলার সার্বিক দারিদ্র দুর্দশা তাঁর মতো লোককেও চঞ্চল করে তুলেছে এর মূল কারণ তো অবশ্যই ব্রিটিশ শোষণ বুয়র যুদ্ধে  চিনেই বা ইংরেজরা কোন মহত্ত্বের ধ্বজা ওড়াচ্ছে?

‘আপনার প্রশ্নের উত্তর খুব জটিল, উপাধ্যায়জি। এককথায় এর উত্তর হয় না একদিন লিখে এর জবাব আমি দেব আমরা তো আপনার সিদ্ধি খাওয়া নিয়ে আলোচনা করছিলাম!’

সিদ্ধি!সহাস্যে বললেন ব্রহ্মবান্ধব, ‘যে সংশয়ের কথা আপনি বলছেন, রবিবাবু, সেটা একসময় আমার মধ্যেও এসেছিল সেই মানসিক কষ্টে সিদ্ধির নেশায় ডুবে গেছিলাম এমনকী সুরেনবাবুর ক্লাসে অবধি সিদ্ধির নেশায় ভোম হয়ে ঘুমিয়ে থাকতাম!’

‘ক্লাসের মধ্যে?’

‘হ্যাঁ একদিন সেরকম ঘুমিয়ে রয়েছি মাথার কাছে বই খোলা সুরেনবাবুর বোধহয় দরকার হয়েছিল বইটা উনি একদম মাথার কাছে চলে এসে দেখলেন আমি ঘুমোচ্ছি আমার এক সহপাঠী বলল, ভবানী সিদ্ধি টেনে ঘুমোচ্ছে, স্যার।’

‘তা সুরেনবাবু কী করলেন?’

‘উনি নির্বিকারভাবে বললেন, আমার তো ছেলেটাকে দরকার নেই, বইটাকে দরকার! পরে ঘুম ভেঙে উঠে এই কথা শুনে প্রবল বুকের মধ্যে ধাক্কা লাগল, মশাই। আমার এত পতন হয়েছে! আমি কোনো হিসেবের মধ্যেই পড়ি না! সেই দণ্ডেই সিদ্ধি ছেড়ে দিলাম।’

‘আপনার আসল নাম ভবানী নাকি?’

‘হ্যাঁ, পিতৃদত্ত নাম ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।’

‘রেভারেন্ড কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাহলে আপনার …’

‘কাকা। উনি সম্পর্কে আমার খুল্লতাত।’

‘তাঁর অনুপ্রেরণাতেই কি তাহলে …’

‘না, না, মশাই আমার ক্রিশ্চান হবার গপ্পো সম্পূর্ণ আলাদা। বড়ো  বিচিত্র আমার জীবন। সে গপ্পো করব একদিন আপনার ওখানে, আপনার ব্রাহ্মণীর হাতের ঝোল ভাত খেতে খেতে।’

‘আসুন না। সাদর আমন্ত্রণ রইল।’

‘আপনি, মশাই, বড্ড ফর্মাল। আমি বাউণ্ডুলে লোক। হুট করে  একদিন খবর না-দিয়ে চলে যাব।’

‘আসুন, সুস্বাগতম! আচ্ছা, উপাধ্যায়জি?’

‘বলুন।’

‘আপনি এই অদ্ভুত নামটা নিলেন কেন?’

ব্রহ্মবান্ধব অট্টহাস্য করে উঠলেন, ‘সবাই আমাকে এই প্রশ্নটাই করে, রবিবাবুআসলে যখন করাচিতে জেসুইট পাদ্রি ফাদার থিওফিলাস পেরিগ আমাকে প্রথম রোমান ক্যাথলিক মতে দীক্ষা দিলেন তখন আমার নামও রাখা হয় “থিওফিলাস” যার অর্থ হল ব্রহ্মবন্ধু। পরে যখন গেরুয়া ধরলাম, তখন “ব্রহ্মবান্ধবনামটা ওখান থেকেই এল।’

‘আর উপাধ্যায় ?’

‘আমার কৌলিক উপাধিবন্দ্যোপাধ্যায়”। ওর “বন্দ্য” শব্দটার মধ্যে বড্ড গরিমার গন্ধ পাই আমি। একজন যিশু-ভক্ত ক্যাথলিক বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর পক্ষে সেটা বেমানান, রবিবাবু। তাই ওটা ছেঁটেছুটে উপাধ্যায় করে নিয়েছি।’

‘আপনি যিশু-ভক্ত ক্যাথলিক আবার বৈদান্তিক সন্ন্যাসী ! সে তো সোনার পাথরবাটি!’

ব্রহ্মবান্ধব গম্ভীর হয়ে গেলেন, ‘রবিবাবু, যিশু তো খুব অল্প বয়েসে মারা যান, তাই না?

‘ঠিক।’

‘তাহলে এই যে রোমান ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাস অর্থাৎ ট্রিনিটি, অরিজিনাল সিন বা আদি পাপ, ফাদার, সন অফ ফাদার, হোলি স্পিরিট—এগুলো কে তৈরি করল?’

‘যিশুর পরে যে সন্তরা এসেছেন।’

‘একজাক্টলি। যিনি এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড়ো কাজ করেছেন, তিনি হলেন টমাস অ্যাকুইনাস। উনিই অ্যারিস্টটলের গ্রিক দর্শনের ওপর খ্রিস্টান থিয়োলজি আরোপ করেছেন। রোমান ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাস পুরোটা ওঁর কাজের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ভারতে এসব চলবে না, যে কারণে ভারতে খ্রিস্টানরা এগোতে পারছে না। একটা জায়গায় গিয়ে আটকে যাচ্ছে।’

‘কেন?’

‘কারণ রবিবাবু ভারতের যে প্রাচীন দর্শন অর্থাৎ অদ্বৈত বেদান্ত তা অ্যারিস্টটলের গ্রিক দর্শনের থেকে বহুগুণে প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ।’

‘অর্থাৎ?’

ভারতে যদি খ্রিস্টান ধর্ম চালাতে হয়, রবিবাবু, পাতক-ত্রাতা নরহরি যিশুর বাণী শোনাতে হয় সবাইকে, তাহলে হ্যাট, কোট পরে একটা বিজাতীয় দর্শন আওড়ালে চলবে না। লোকে সেটা নেবে না। খ্রিস্টানদের ভারতীয় সন্ন্যাসীর গেরুয়া ধারণ করতে হবে, আশ্রম জীবন যাপন করতে হবে আর তার থেকেও বড়ো কাজ করতে হবে দর্শনের ক্ষেত্রে। খ্রিস্টান থিয়োলজি আরোপ করতে হবে বেদান্তের ভিত্তির ওপর। আমাদের একজন ভারতীয় অ্যাকুইনাস চাই।’

এরকম অদ্ভুত নতুন কথা রবীন্দ্রনাথ আগে কখনো শোনেননি তিনি মুগ্ধ নৈঃশব্দ্যে ব্রহ্মবান্ধবের কথা শুনতে লাগলেন

‘আমার এই বিশ্বাসটা কখন দৃঢ় হল জানেন, রবিবাবু?’

‘কখন?’

‘যখন নরেনের বক্তৃতা শুনলাম।’

‘নরেন?’

‘হ্যাঁ। স্বামী বিবেকানন্দ। ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াতের সময়। দু-জনে একসাথে কেশব সেনের কাছে গিয়েছি। রামকৃষ্ণ পরমহংসের ওখানেও গিয়েছিসেই নরেনের বক্তৃতা শুনে আমার ঝাঁট চড়ে গেল, মশাই!’

‘কেন?’

‘ও বলছে, “দ্য ওয়ার্স্ট লাই দ্যাট ইউ এভার টোল্ড ইয়োরসেলফ  ওয়াজ দ্যাট ইউ ওয়্যার এ সিনার। ইন ফ্যাক্ট, ডেলিউডেড বাই ইগনোর‍্যান্স অ্যাবাউট দ্য ডিভিনিটি অফ আওয়ার ট্রু সেল্ভস, উই থিঙ্ক দ্যাট উই আর মিয়ার মর্টালস। ইন ট্রুথ, এভ্রিথিং দ্যাট ইউ সি, ফিল অর হিয়ার, দ্য হোল ইউনিভারস ইজ দ্য লর্ড হিমসেলফ।”‘

‘তা ঠিক কথাই তো বলছে নরেন, উপাধ্যায়জি। ভালোই তো বলছে।’

ঠিক বলছে নরেন!ব্রহ্মবান্ধব আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘আপনি জানেন এই ধরনের কথার ফল কী? আমাদের পুরো খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাস অরিজিনাল সিনের কনসেপ্টের ওপর দাঁড়িয়ে আছেএ ধরনের কথা সেই ভিত্তিটাকেই নাড়িয়ে দেয় শঙ্করাচার্য যেমন বৌদ্ধদের পেছন মেরে দিয়েছিলেন, ব্যাটা নরেন আমাদের খ্রিস্টানদের পেছন মেরে দেবে। ভাববেন না যে, আপনারা ব্রাহ্মরাও এই নতুন শঙ্করাচার্যের হাত থেকে নিরাপদ!’

রবীন্দ্রনাথ চমকে উঠলেন। একটু আগে যে লোকটা গভীরতম দর্শনের আলোচনা করছিল, হঠাৎ সে এত প্রাকৃত ভাষা ব্যবহার করে কী করে?

ব্রহ্মবান্ধবও বুঝেছেন যে তিনি অনৃতভাষণ করে ফেলেছেন। লজ্জিত স্বরে বললেন, ‘রবিবাবু, সরি ! মুখ ফস্কে বলে ফেলেছি। আসলে আমি পুলিশের ছেলে। ছোটোবেলায় গুন্ডামি করে ফিরিঙ্গি পর্যন্ত ঠেঙিয়েছি। সেই ভাষা মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ে।’

ব্রহ্মবান্ধব বলে চললেন, ‘নরেনকে ঠ্যাকাতে হলে অ্যারিস্টটল বা অ্যাকুইনাস দিয়ে হবে না, রবিবাবু! আমাদের বেদান্তের আশ্রয় নিতে হবে। আমাদেরকে হিন্দু ধর্মমতের সঙ্গে ক্যাথলিক বিশ্বাসকে মিলিয়ে দিতে হবে।

‘সেটা কি সম্ভব?’

‘কেন সম্ভব নয়, রবিবাবু? আমি একদিন বোঝাব আপনাকে সেটাএকটু জটিল। মোদ্দা কথা হল আমি হিন্দু হয়ে জন্মেছি, আমৃত্যু আমি হিন্দুই থাকব, কারণ একটা বিশেষ তত্ত্বে বিশ্বাসের ওপর হিন্দুত্ব নির্ভর করে না। কপিল আর ব্যাস তো পরস্পর উল্টো কথা বলে গেছেন, কিন্তু তাহলেও তো দুজনেই ঋষি ! দৈহিক ও মানসিক গঠনে আমি হিন্দু, কিন্তু অমর আত্মার ক্ষেত্রে আমি ক্যাথলিক, আমি হিন্দু ক্যাথলিক!’

‘আপনাদের চার্চ মানবে আপনার কথা?’

‘সেখানেই তো মুশকিল হয়েছে, রবিবাবু। ভারতের ক্যাথলিক চার্চের সর্বময় কর্তা ডেলিগেট অ্যাপোস্টলিক মাইকেল জ্যালেস্কি আমার ওপর সাংঘাতিক ক্ষিপ্ত। জব্বলপুরে আমার আইডিয়া মতো একটা ক্যাথলিক মঠ স্থাপন করতে গেছিলাম। ব্যাটা ভেস্তে দিল। সোফিয়া পত্রিকাটা ওর জ্বালায় বন্ধ করতে বাধ্য হলাম।’

‘সোফিয়া বন্ধ হয়ে গেছে?’

‘হ্যাঁ, মশাই। জ্যালেস্কি এত উঠেপড়ে লেগেছে যে, পারলাম না, বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলাম। তার জায়গায় টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি বলে আরেকটা পত্রিকা বের করছি এখন। সোফিয়া ছিল সাপ্তাহিক। এটা হবে মাসিক।’

রবীন্দ্রনাথ চুপ করে রইলেন। সোফিয়া-র পাতাতেই তাঁর প্রথম উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন ব্রহ্মবান্ধব। তাঁকে সম্বোধন করেছেন বিশ্বকবিবলে। সেই সোফিয়া বন্ধ হয়ে গেল !

ব্রহ্মবান্ধব বলে চললেন, ‘ভারতের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের এই গাঁট, গণ্ডমূর্খ, অশিক্ষিত লোকগুলোর সাথে যুঝে যুঝে আমি ক্লান্ত, রবিবাবুমাঝে মাঝে মাথায় আমার একটা অদ্ভুত চিন্তা আসে

‘কী চিন্তা?’

‘আচ্ছা, আমি নরেনের সাথে লড়ছি। ওর সাথে পাল্লা দিয়ে ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসকে অদ্বৈত বেদান্তের ওপর স্থাপন করতে চাইছিঅথচ ও আর আমি যদি একজোট হতাম, রবিবাবু? ভেবে দেখুন, আমাদের সম্মিলিত ব্রেন! দুটো এক হলে কী দুর্জয় শক্তি তৈরি হত!’

বলতে বলতে থেমে গেলেন ব্রহ্মবান্ধব। তাঁর চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত। বিড় বিড় করে বলে উঠলেন, ‘আরে এ কারে হেরি আমি ? সকালে আজ কার মুখ দেখে উঠেছিলাম?

 

 

প্রেমাঙ্কুর আর জ্ঞানাঙ্কুর রবীন্দ্রনাথ এবং ব্রহ্মবান্ধবকে কিছুক্ষণ দেখে অনেক আগেই প্রস্থান করেছে। সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। হেদুয়ার পার্কের বেঞ্চে এসে বসেছেন এক গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী এবং তাঁর সঙ্গী।

উত্তেজিত ব্রহ্মবান্ধব বললেন, ‘আরে, তো নরেন! ঠিক চিনেছি! ওর কথাই এতক্ষণ হচ্ছিল আর ওই উপস্থিত! তো মেঘ না-চাইতেই জল! আসুন, রবিবাবু। ওর সাথে আলাপ করে আসা যাক

‘না!’

রবীন্দ্রনাথের স্বর অস্বাভাবিক কঠোর।

সবিস্ময়ে ঘাড় ঘোরালেন ব্রহ্মবান্ধব। রবীন্দ্রনাথ সচরাচর মৃদুভাষী। তাঁর মুখের এহেন কঠোর প্রত্যাখ্যান কিঞ্চিত রূঢ় শোনাল ব্রহ্মবান্ধবের কানে।

রবীন্দ্রনাথ বুঝেছেন সেটা। কণ্ঠস্বর অপেক্ষাকৃত কোমল করে বললেন, ‘আমার একটু তাড়া আছেউপাধ্যায়জিপ্রিয়নাথবাবু বেলির বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আলোচনা করতে জোড়াসাঁকোতে আসবেন আজকে। আমাকে এখনই চলে যেতে হবে।’

যাবেন না তাহলে? নরেনের সাথে কথা বলবেন না?ব্রহ্মবান্ধবের কণ্ঠে স্পষ্টই নৈরাশ্যের সুর।

‘আজ থাক, উপাধ্যায়জিপরে একদিন হবে। আজ আমার সত্যিই তাড়া আছে।’

হেদুয়ার পাশে অপেক্ষমাণ নিজের জুড়িগাড়িতে চেপে জোড়াসাঁকোয় ফিরে গেলেন রবীন্দ্রনাথ। একাকী ব্রহ্মবান্ধব গোধূলির আলোয় হেদুয়ার বেঞ্চে উপবিষ্ট স্বামী বিবেকানন্দের দিকে এগিয়ে গেলেন।

(ক্রমশ…)

 
 
top