নতুন আলো

 

পর্ব ১৭

বিদায়ী লর্ড এলগিনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন লর্ড কার্জন লর্ড এলগিন সুপুরুষ ছিলেন না বেঁটে, কুঁজো, মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি তুলনায় কার্জনের গ্রিক দেবতাদের মতো কাটাকাটা নাক, মুখ, চোখ ধপধপে অ্যালাবাস্টারের মতো গাত্রবর্ণ। সমুদ্রনীল চোখের মণি। তবে সুন্দর সে মুখে স্পষ্ট অহংকারের ছাপ। তাঁর আমেরিকান স্ত্রী মেরিও অতীব রূপসী। ভাইসরয় লর্ড জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন এবং তাঁর পত্নী ভাইসরিন মেরি কার্জনই এখন কলকাতার বড়োলাট ভবনের বাসিন্দা। এমন সুশ্রী, রূপবান রাজদম্পতি দেশের মানুষ আগে কখনো দেখেনি।

গরম পড়েছে। পাশাপাশি দুটো ঘোড়ায় চেপে সস্ত্রীক কার্জন সকালে ময়দানে বেড়াতে এসেছেন। লন্ডনের হাইড পার্কের মতোই বিশাল, সবুজ মোড়া প্রান্তর। ঘোড়া ছোটাতে দিব্য আরাম। এ সময় ময়দান জনবিরল। স্থানীয় কারোরই প্রবেশাধিকার নেই। কার্জনরা অবশ্য ঘোড়া ছোটাচ্ছেন না। দুলকি চালে গল্প করতে করতে এগোচ্ছেন।

কার্জন বললেন, লাট ভবনটা কেমন লাগছে, মেরি?

ভালো! বেশ ভালো!

নেকটা আমাদের কেডলস্টোন হল বাড়িটার মতো নয়?

হ্যাঁ। আশ্চর্য মিল!

জানো মেরি, আজ থেকে বারো বছর আগে যখন আমি কলকাতায় এসেছিলাম

তুমি আগে এই শহরে এসেছ?

বশ্যই। তখন আমার বয়েস মাত্র আঠাশ। প্রথমবার হারার পর সদ্য ব্রিটিশ ইলেকশনে জিতেছি

, তুমি প্রথম বার ইলেকশনে হেরেছিলে বুঝি?

কার্জনের গর্বিত, উদ্ধত মুখে যুগপৎ রাগ ও লজ্জার ছায়া পড়ল। জকাল ইংল্যান্ডে ভদ্রলোকরা ইলেকশন লড়ে না, মেরি। ভোটার হল যত রাজ্যের কুলিমজুর। কালিঝুলি মাখা নোংরা চেহারা। সম্মান দেয় না। আমি যে-কিনা ইটন আর ব্যালিয়লের ছাত্র, চ্যাম্পিয়ন ডিবেটর প্রথমবার আমায় গোহারা হারিয়ে দিল ব্যাটারা!

মেরি হাস্যগোপন করলেন। স্বামীকে তিনি ভালোবাসেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর দাম্ভিকতাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। সে দাম্ভিকতায় চোট লাগলে মনে মনে তিনি খুশিই হন।

তো? কুলিমজুরদের পছন্দ কর না তুমি?

মায় ভুল বুঝো না, মেরি। কুলিমজুর, চাষাভুষোরা যে যার নিজের জায়গায় থাকুক। দেশ চালানো তাদের কাজ নয়। দেশ চালাব আমরা, অভিজাতরা, যারা শিক্ষা-সংস্কৃতিতে ঢের এগিয়ে। কুলিমজুররা ইংল্যান্ডে এত মাথায় চড়েছে কেন জান, মেরি?

কে?

ই লিবারাল বেজম্মা গ্ল্যাডস্টোনটার জন্য

কালেই মুখখারাপ করছ!

রি, মেরি! ওই গ্ল্যাডস্টোনটার নাম শুনলে আমার অজীর্ণ হয়। সহ্য করতে পারি না লোকটাকে! এ দেশে আমার জুনিয়র, ব্যাটা উডবার্নটাও তো ওরই চ্যালা!

ডবার্নকে তাহলে পছন্দ কর না তুমি?

ই হেট হিম! লিলি-লিভার্ড লিবারাল! সবসময় নেটিভদের সঙ্গে মিশছে!

শুনি ও নেটিভদের মধ্যে খুব পপুলার?

ই হেট হিজ চিপ পপুলারিটি! আমরা হলাম রাজার জাত। আমাদের ডিস্ট্যান্স মেইন্টেইন করতে হবে

যা হোক, দ্বিতীয়বার তো তুমি জিতলে?

হ্যাঁ। ততদিনে গ্ল্যাডস্টোন হেরে গেছে। নির্বাচনে কনজারভেটিভদের জয়জয়কার। সেই স্রোতে আমিও জিতলাম

তারপর? জিতে ভাবলে কলকাতায় আসবে?

মি ভাবলাম যে, সাম্রাজ্যের প্রকৃত অবস্থা কী সেটা তো আমার জানা উচিতনিজের উদ্যোগেই বেরিয়ে পড়লাম। আর কলকাতায় এসে মনে হল

কী মনে হল?

মেরি, মনে হল যে, ভারতের যা কিছু উন্নতি, সে তো ব্রিটিশরাই করেছে

তা ঠিক

পত্নীর সম্মতিতে উৎসাহী হয়ে উঠলেন কার্জন, দেখো, মেরি। এই কলকাতার দিকে তাকিয়েই দেখোএটা একটা ব্রিটিশ শহর যা আমরা ভারতের মাটিতে বেমালুম বসিয়ে দিয়েছিএখন এটার স্থান লন্ডনের পরেই। সেকেন্ড সিটি অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার! একে দেখে তোমার গর্ব হয় না, মেরি? আমরা, আমরা ব্রিটিশরা নিজেদের হাতে এটা বানিয়েছি! পারত? নেটিভরা এরকম একটা শহর বানাতে পারত?

বশ্যই

বে সত্যের খাতিরে একটা কথা স্বীকার করব, মেরি

কী?

ভারতে একটা জিনিস দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি। ব্যাটা নেটিভদের এত এলেম ছিল?

কীসের কথা বলছ, জর্জ?

তাজমহল, মেরি, তাজমহল । তাজমহল দেখে মেরি আমি উপলব্ধি করলাম যে, ব্রিটেন বা ইউরোপে কোনো কিছু এর সঙ্গে তুলনীয় নয়। এমনকী স্পেনের আল হাম্ব্রাও নয়

মাকে কবে সেখানে নিয়ে যাবে, জর্জ? শুনেছি, এক মুঘল সম্রাট তাঁর স্ত্রীর প্রতি প্রেমের নিদর্শন হিসেবে এই সৌধ বানিয়েছিলেন?

বশ্যই, মেরি। এখন অবশ্য খুব গরম ওখানে। শীতটা পড়ুক

 

গঙ্গার ধারে চলে এসেছেন দুজনে হাওয়া খাচ্ছেন বড়ো সুন্দর নদীটা দূরে মাঝিদের গান ভেসে আসছে যাতায়াত করছে স্টিমার ঢেউয়ের তরঙ্গে দোল খাচ্ছে দেশি নৌকা সদ্য উদিত সূর্যের আলো জলের ওপর ঝকঝক করছে

মেরি বললেন, বা! নদীটা কী সুন্দর! তোমাদের টেমসের থেকে ঢের বড়ো

পথে কার্জনের ঘোড়াটা হঠাৎ একটা পাথরে হোঁচট খেয়েছিল। মেরি দেখলেন যে, কঠিন মুখ করে কার্জন ঘোড়ার পিঠে বসে আছেন। উত্তর দিচ্ছেন না।

অল্প বয়সে একবার ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে শিরদাঁড়ায় চোট পেয়েছিলেন কার্জন। ফলস্বরূপ সবসময় একটা লোহার করসেট পরে থাকতে হয় তাঁকে। ব্যাপারটা বেশ কষ্টকর। থেকে থেকেই তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। সম্ভবত ঘোড়ার সহসা হোঁচটে সেই ব্যথা আবার জেগে উঠেছে।

মেরি সেই গোপন তথ্য সম্বন্ধে অবগত। বললেন, সেই ব্যথাটা আবার চাগাড় দিয়েছে?

কার্জন উত্তর দিলেন না। মেরি দেখলেন যে অসহ্য যন্ত্রণায় দু-ফোঁটা জল কার্জনের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সেই জল মুছে নিয়ে কার্জন কঠিন গলায় বললেন, মেরি! প্রথম যেদিন কলকাতায় আমি লাটভবন দেখি, সেদিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, এই লাটভবনে একদিন আমি এসে উঠব

তোমার সেই উচ্চাশা তো সফল হয়েছে, জর্জ

র মেরি আমি এখনো তরুণ। আমার যৌবন চলে যায়নি। মাত্র চল্লিশ বছর বয়স আমার

অনেকটা সামলে নিয়েছেন কার্জন। গঙ্গার ধার দিয়ে দুলকি চালে চলেছেন দুজনে। অদূরে হুগলির পন্টুন ব্রিজ দেখা যাচ্ছে। এক জায়গায় গোল হয়ে দশ-বারোজন দাঁড়িয়ে। পরনে ধুতি, গায়ে গামছা, কালো গায়ের রংতাদের মধ্যে একজন একটু মুরুব্বি গোছের। সে হাত নেড়ে নেড়ে কী সব বলছে। সাহেব দম্পতিকে দেখে থেমে গিয়ে সে শঙ্কিত চোখে চেয়ে রইল।

রা কারা? প্রশ্ন করলেন মেরি

কার্জনের নাসিকা ঘৃণা ও অবজ্ঞায় কুঞ্চিত হল, রা হল বাঙালি, মেরি। নেটিভ। অপদার্থ জাত!

পদার্থ বলছ কেন?

দের পাগুলো দেখোসরু, সরু। ক্রীতদাসদের পা এরকম হয়। এদের শরীরে একটা অঙ্গই ডেভেলপড, এদের জিভ। দিনরাত এরা বকতে পারে, শুধু বকতে পারে আর পারে মিথ্যে কথা বলতে

তুমি তাহলে এদের একদম পছন্দ কর না, জর্জ?

মাকে ভুল বুঝো না, মেরি। দেখো, আমরা ব্রিটিশরা মুসলিমদের হাত থেকে যুদ্ধ করে ভারত ছিনিয়ে নিয়েছি। তবু ব্যাটারা তো লড়েছিল। যে শত্রু লড়াই দেয়, আমরা ব্রিটিশরা সবসময় ভেতরে ভেতরে তাকে সম্মান করি। এই বাঙালিবাবুগুলো কী করেছে? এদের ইতিহাস ঘেঁটে দেখোএরা সবসময় যুদ্ধ থেকে কাপুরুষের মতো পালিয়েছে আর বই মুখস্ত করেছে। আর এখন আমাদেরই লেখা বই মুখস্ত করে আমাদের বোলচাল মারছে! ইনসাফারেবল!

টা তুমি ঠিক বলছ না, জর্জ! ইউ আর বিইং আনফেয়ার!

ট অ্যাট অল! কার্জন গর্জন করে উঠলেন। নেটিভদের যা ভালো তা আমি কি স্বীকার করছি না? তাজমহলকে কি আমি ভালো বলিনি? তা বলে এই ক্রীতদাস বাঙালি বাবুরা যদি স্বপ্ন দেখে যে, এরা একদিন লাটভবনে বসে দেশ চালাবে, তাহলে সে স্বপ্নকে বুটের লাথিতে গুঁড়িয়ে দেবার ক্ষমতা আমি রাখি! সেদিন আবার বম্বে থেকে এক হরিদাস পাল পার্শি ব্যবসায়ী আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল টাটা না কী যেন একটা নাম। খোয়াব দেখ, মেরি! ভারতে একটা সায়েন্স ইন্সটিট্যুট খুলতে চায়! ভারতীয়রা করবে সায়েন্স! একটা টেস্ট টিউব ঠিক করে ধরতে জানে না ব্যাটারা ! তুই পার্শি ব্যবসায়ী, ব্যবসা নিয়ে থাক! দেশে সায়েন্স ইন্সটিট্যুট হল কি হল না সেটা নিয়ে তোর মাথা ব্যথা কীসের? পত্রপাঠ তাকে হাঁকিয়ে দিয়েছি!

মেরি দেখলেন যে, কার্জনের সুন্দর মুখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। চোখে ক্রোধের দীপ্তি। অঙ্গসঞ্চালনে পরিস্ফুট সাম্রাজ্যবাদী অহমিকা।

স্বামীর এহেন ভাবান্তরের সঙ্গে মেরি পরিচিত। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি এত উত্তেজিত হয়ে পড় না জর্জ। তোমার স্বাস্থ্যের পক্ষেই ব্যাপারটা ভাল নয়। চল আমরা ফিরে যাই

দম্পতি দুলকি চালে লাটভবনের পথ ধরলেন। বেশি দূর নয়। তবে ফিরতি পথে পরস্পরের মধ্যে বাক্য বিনিময় হল না।

 

যে গ্রীষ্মের সকালে ময়দানে ঘোড়া ছোটাতে ছোটাতে বড়লাট জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন ভারতীয় তথা নেটিভ বাঙ্গালিদের আদ্যশ্রাদ্ধ করছিলেন, সেই সময়ই এক সাতাশ-আঠাশ বছরের কুমারী বাঙালি মেয়ে তার পিতৃগৃহের ড্রয়িংরুমে পিয়ানোয় বসে টুং টাং করছিল। মেয়েটি নিখুঁত সুন্দরী নয়, কিন্তু অসাধারণ গুণবতী। ভাল পিয়ানো বাজাতে পারে, স্বরলিপি করতে পারে, করতে পারে সুরসংযোগ। বিদুষীও বটেএই অল্প বয়সেই ভারতী পত্রিকার সম্পাদনা করছে সে। নিজের বাড়িতেই ভারতী পত্রিকার কার্যালয়। বাঙালি মেয়েদের সচরাচর অনেক অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায় কিন্তু এই মেয়েটি এখনো অনূঢ়া। বড় সড় বংশ পরিচয় রয়েছে মেয়েটির। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের পৌত্রী সে। রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নী। রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠা ভগ্নী স্বর্ণকুমারী দেবী ও জানকীনাথ ঘোষালের মেয়ে সরলা ঘোষাল। ঠাকুরবাড়িতে ঘর জামাই রাখার চল থাকলেও তেজস্বী পুরুষ জানকীনাথ তাতে সম্মত হননি। সরলা তাই পিতৃগৃহেই মানুষ হয়েছে। সরলার বাবা জানকীনাথ ঘোষাল আগে থাকতেন কাশিয়াবাগানে। পরে তিনি সরে এসেছেন ৩ নং সানি পার্কে। বাড়ি বানিয়েছেন নিজের।

পিয়ানোতে সরলা একটা সুর বাজাচ্ছিল। গানটা রবিমামার—আজি শুভদিনে, পিতার ভবনে, অমৃত সদনে চল যাই। সরলার আঙুল পিয়ানোর ওপর নৃত্য করে চলেছে। সুরের প্রবাহে নেচে উঠছে মনটা। এ সুর আসলে সরলার নিজেরকর্মসূত্রে বেশ কিছু দিন মহীশূরে ছিল সে। সেখান থেকে সংগ্রহ করে রবিমামাকে দিয়েছে । সেই কর্ণাটকি সুরে কথার মালা সাজিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।

বেশ কিছুক্ষণ পিয়ানো বাজিয়ে সরলা ক্লান্ত বোধ করল। বেশ গরম পড়েছে। ধপধপে ফর্সা সরলার কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু স্বেদ। পিয়ানো থেকে উঠে সরলা ড্রয়িংরুমের সোফার ওপর বসল। বড় হলঘর সুদৃশ্য সোফাসেট দিয়ে সাজানোমাঝখানে নিচু, গোল কাশ্মীরি টেবিল। দেওয়ালে ঝোলান অবনীন্দ্রনাথের ছবি। ঠাকুর পরিবারের এই তরুণ প্রতিভা ইতিমধ্যেই অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

দেরাজ থেকে একটা চিঠি বের করল সরলা। চিঠিটি তাকে লিখেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। বার বার পড়তে পড়তে চিঠিটা সরলার প্রায় মুখস্তই হয়ে গেছে।

প্রায় বছরখানেক আগের লেখা চিঠি ছত্রেছত্রে বিবেকানন্দের সুতীব্র ব্যঙ্গ ঝরে পড়ছে:

যদি আমার বা আমার গুরুভ্রাতাদিগের কোনো একটি বিশেষ আদরের বস্তু ত্যাগ করিলে অনেক শুদ্ধ্বসত্ত্ব এবং যথার্থ স্বদেশহিতৈষী মহাত্মা আমাদের কার্যে সহায় হন তাহা হইলে সে ত্যাগে আমাদের মুহূর্তমাত্র বিলম্ব হইবে না বা একফোঁটাও চক্ষের জল পড়িবে না জানিবেন এবং কার্যকালে দেখিবেনযদি যথার্থ স্বদেশের বা মনুষ্যকুলের কল্যাণ হয়, শ্রীগুরুর পূজা ছাড়া কি কথা, কোনো উৎকট পাপ করিয়া খ্রিস্টীয়ানদের অনন্ত নরকভোগ করিতেও প্রস্তুত আছি,জানিবেনতবে মানুষ দেখতে দেখতে বৃদ্ধ হইতে চলিলাম সংসার বড়োই কঠিন স্থান গ্রীক দার্শনিকের লণ্ঠন হাতে করিয়া অনেকদিন হইতেই বেড়াইতেছিতারপর যেসকল দেশহিতৈষী মহাত্মা গুরুপূজাটি ছাড়লেই আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন, তাঁদের সম্বন্ধেও আমার এতটুকু খুঁত আছে বলি, এত দেশের জন্য বুক ধড়ফড়, কলিজা ছেঁড়-ছেঁড়, প্রাণ যায়-যায়, কণ্ঠে ঘড়-ঘড় ইত্যাদি—আর একটি ঠাকুরেই সব বন্ধ করে দিলে?

বারবার পড়তে পড়তে মুখস্ত হয়ে গেছে চিঠিটা বিবেকানন্দ এই মুহূর্তে দেশে নেই নেই নিবেদিতাও অথচ নিবেদিতার সূত্রেই বিবেকানন্দের সাথে এত আলাপ-পরিচয় সরলার কী করছেন তাঁরা? কেমন আছেন বিবেকানন্দ ?

বছরখানেক আগের সেই ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়ে গেল সরলার কলকাতায় তখন প্লেগের সাংঘাতিক দাপট চলছে মানুষ মরছে পোকার মতো গঙ্গার ঘাটে প্রজ্বলন্ত চিতায় শয়েশয়ে শবদাহ হচ্ছে তরুণ স্বামী সদানন্দকে নিয়ে নিবেদিতা ত্রাণকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন

সেই সময় নিবেদিতার সঙ্গে আলাপ সরলার। একদিন মামাতো ভাই সুরেনের সঙ্গে সরলা দক্ষিণেশ্বরে গেছিল। সঙ্গে নিবেদিতা ও সদানন্দ। দুই তরুণ বয়স্ক ব্রাহ্মকে কালীমন্দির ঘুরিয়ে দেখাবার পর নিবেদিতা সদলবলে নৌকাযোগে গঙ্গা পেরিয়ে গেছিলেন বেলুড়। সেখানে তাঁদের সাদর অভ্যর্থনা করতে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ। বারান্দায় বসে চা খাওয়া হল। মঠে নিদারুণ অর্থাভাব। প্লেগ নিবারণ করতে গিয়ে অনেক খরচা হয়ে যাচ্ছে। চা পাতা সঙ্গে করে সরলাই নিয়ে গেছে। মঠের তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে শুধু দুধ আর গরম জল! গঙ্গা থেকে হু হু করে হাওয়া এসে সর্বাঙ্গ শীতল করে দিচ্ছে। সে দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিবেকানন্দ বললেন, জানো, মারগট?

কী, প্রভু?

মাঝে মাঝে ভাবি যে, মঠের জমি-টমি সব বিক্রি করে দিই

কে, প্রভু?

মরা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। লোকে না খেয়ে মারা যাচ্ছে, প্লেগে মরে যাচ্ছে পট পট করে পোকার মতোআর আমরা মঠফট তুলে পয়সা নষ্ট করছি

সবাই চুপ করে আছেন। সরলা বলল, পনাদের সেবাব্রত দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই, স্বামীজিমাঝে মাঝে মনে হয় সব ছেড়ে আপনাদের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ি

বেশ তো আসুন না। মারগটের কাছে আপনার অনেক প্রশংসা শুনি, মিস ঘোষাল। আপনার এডুকেশন পারফেক্ট। আমি মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছি যে, অনেক বড়ো বড়ো কাজ আপনি জীবনে করবেন

সরলা বলল, কটা কথা নির্ভয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করব?

রুন না

পনি ওই অশিক্ষিত পূজারি বামুন রামকৃষ্ণ পরমহংসকে অবতারজ্ঞানে পুজো করেন কেন? নারীকে যিনি নরকের দ্বার মনে করতেন? কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগ করার পরামর্শ দিতেন সবাইকে? এটা আমরা ব্রাহ্মরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না। আপনি রামকৃষ্ণকে ত্যাগ করুন, তাহলেই দেখবেন দলে দলে ব্রাহ্ম আপনার কাজে যোগ দিচ্ছে

বিবেকানন্দ সম্ভবত প্রত্যাশা করেন নি যে, তাঁর সামনে বসে থাকা তরুণী ব্রাহ্মিকাটি এমন উদ্ধত, মুখফোড় প্রশ্নবাণ তাঁর দিকে ছুড়ে দেবে। রাগে তাঁর মুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছিল। মনে হয়েছিল যে, প্রবল ক্রোধ দাবানলের মত লেলিহান হয়ে উঠবে। অনেক কষ্টে আত্মসংবরণ করে তিনি প্রসঙ্গান্তরে গেছিলেন।

মারগট, তোমার প্লেগের কাজ কেমন চলছে?

ভালো, তবে আরো টাকা চাই। সদানন্দ খুব খাটছে। বোসপাড়া লেনের রাস্তা, নর্দমা, ঝোপড়ি- ঝুগগির হাল রাতারাতি বদলে গেছে

তাই নাকি?

হ্যাঁসে দিন কলকাতার হেল্থ অফিসার ড. কুক এসেছিলেন, স্বামীজিআমাদের কাজ দেখে খুব প্রশংসা করে গেলেন। বললেন যে, আমরা বস্তিগুলোতে মডেল কাজ করছি। এগুলো মডেল বস্তি। এসব শুনে সদানন্দের উৎসাহ তো দু-গুণ বেড়ে গেছে। নোংরা নর্দমা দেখলেই আর স্থির থাকতে পারছে না! ঝাড়ু হাতে বেরিয়ে পড়ছে!

বিবেকানন্দের রাগ অনেকটা পড়ে এসেছেসহাস্যে বললেন, তাহলে তো সদানন্দের নাম দেওয়া উচিত স্ক্যাভেঞ্জার স্বামী!

তারপরে সরলার দিকে তাকিয়ে স্থির স্বরে বললেন, মিস ঘোষাল, আমার গুরুদেবের সম্বন্ধে যে প্রশ্ন আপনি করলেন তার উত্তর আজ আপনাকে দেব না। আপনি আজ আমার অতিথি। আপনি এর লিখিত জবাব পাবেন

তারপরই এই তীক্ষ্ণ, তীব্র পত্রাঘাত।

অবশ্য মতান্তর হলেও স্বামীজীর সঙ্গে মনান্তর হয় নি সরলার। বরং সরলাকে তাঁর সঙ্গে ইউরোপ-আমেরিকা যেতে উত্সাহিত করেছেন বিবেকানন্দ,পনি চলুন, মিস ঘোষাল। ওখানে গেলে দেখবেন যে, আপনার মতো উচ্চশিক্ষিত মহিলার জন্য কাজের ক্ষেত্র কত বিপুল, কত বিশাল! কলকাতায় কুয়োর ব্যাং হয়ে পড়ে থাকবেন কেন?

নানা পাকেচক্রে যাওয়া হয়নি সরলার। বাবা-মার আপত্তি ছিল। অবিবাহিতা মেয়েকে পরপুরুষের সাথে অত দূরপাল্লায় যাবার সম্মতি দেননি তাঁরা।

গ্রীষ্মের সকালে কলকাতায় ড্রয়িংরুমে বসে স্বামী বিবেকানন্দের চিঠি হাতে নিয়ে সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করছিল সরলা।

স্বামীজী চলে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে গেল নিবেদিতা। ওই তাহলে শেষ পর্যন্ত স্বামীজীর মতো ডায়নামিক, প্রজ্জ্বলন্ত ব্যক্তিত্বের দূতি হল। যেটা আমি হতে পারতাম। আমি, সরলা ঘোষাল। নিবেদিতা হিন্দু ধর্ম নিয়ে ফট ফট করে বেড়ায়, কিন্তু ও জানেটা কী? ভারতীয় সংস্কৃতি সম্বন্ধে ওর কি কোনো জ্ঞান আছে? সংস্কৃত পড়েছে আমার মতো? স্বামীজী তো নিজেই বলতেন যে, আমার এডুকেশন পারফেক্ট?

অবশ্য স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশযাত্রার পর সরলার জীবনে অন্য এক দিকবদল ঘটেছে। সেখানে শুরু হয়েছে প্রজাপতির আনাগোনা।

সরলার চটকা হঠাৎ ভেঙে গেল। চাকর রামদীন কক্ষে প্রবেশ করেছে

প্রভাতবাবু আয়ে হ্যায়। পকো মাঙ্গ রহা হ্যায়

সরলা ধড়মড় করে উঠে বসল। প্রভাতবাবু মানে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। ভারতী পত্রিকার বিখ্যাত গল্প লেখক।ভারতী পত্রিকার সম্পাদিকার কাছে প্রায়ই যাতায়াত তাঁর।

বাবুকে অফিসে বসা, রামদীন। আমি যাচ্ছি

প্রভাতকুমারের সঙ্গে সরলার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক সম্প্রতি গড়ে উঠেছে। দুজনে প্রায় সমবয়সি এবং দুজনেই সাহিত্যপ্রাণ। প্রভাতকুমার আবার রবীন্দ্রনাথের বিশেষ ভক্ত। রবিবাবু লতে ভক্তিতে তাঁর দুচোখ বুজে আসে। রবিমামার প্রতি সরলার ভক্তিও অবশ্য কিছু কম নয়। প্রভাতকুমার সেসময় প্রদীপ লে আরেকটি পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প পাওয়া নিয়ে দুজনের মধ্যে সংঘাত বাধে।

প্রভাতকুমার প্রস্তাব করেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথ যদি তাঁর একটি গল্প প্রদীপ- দেন তাহলে প্রভাতকুমার প্রতিদান হিসেবে তাঁর দু দুটি গল্প ভারতী-কে দেবেন।

প্রভাতকুমার স্বপ্নেও ভাবেননি যে, তাঁর এই নিরীহ প্রস্তাবের কী ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ক্রোধান্ধ সরলা প্রত্যুত্তরে চার পাতার এক আগ্নেয় চিঠি ছেড়েছিল প্রভাতকুমারকে। সে চিঠি পড়ে প্রভাতকুমার ল্যাজ গুটিয়ে তাঁর আগের প্রস্তাব প্রত্যাহার করেন। শুধু তাই নয়আগে মাঝেমধ্যে দু-একটা ছোটোগল্প দিলেই যেখানে চলত, সেখানে সরলার দাবিতে প্রতি মাসেই একটা করে ছোটোগল্প দিতে হচ্ছে প্রভাতকুমারকে। এভাবে ঝগড়া দিয়ে যে সম্পর্কের শুরু, তা সময়ের জারক রসে পরিপক্ক হয়ে ক্রমশ প্রণয়ে পরিণত হয়েছে।

প্রভাতকুমারের উল্লেখে তাই সরলার মুখে চকিত সুখের এক হাসি খেলে গেল। মুখটা ঈষৎ লজ্জারুণ হয়ে উঠল।

প্রভাতকুমার ভারতীর অফিসে প্রতীক্ষমাণ। সরলা চট করে পরে নিল হলুদ রঙের একটা ঢাকাই শাড়ি। কাজ করা, ফুলতোলা, ঘটিহাতা ব্লাউজ। আয়নার সামনে চট করে চুলটা ঠিক করে নিল। ফরাসি সুগন্ধি ছড়িয়ে দিল সর্বাঙ্গে।

প্রভাতকুমার ভারতী কার্যালয়ের আরামকেদারায় বসে নিবিষ্ট হয়ে একটা পাণ্ডুলিপি পড়ছিলেন। এতটাই আত্মমগ্ন যে, সরলার পদশব্দ শুনতেই পেলেন না।

কী পড়ছিলেন?

সুপুরুষ প্রভাতকুমার মুখ তুলে দাড়িগোঁফের ফাঁক দিয়ে অপরাধের হাসি হাসলেন, বিবাবুর এই পাণ্ডুলিপিটা। টেবিলে পড়ে ছিল। লোভ সামলাতে পারলাম না

সরলা রাগ করতে গিয়েও ফিক করে হেসে ফেলল।

ভারতীতে রবীন্দ্রনাথের প্রহসন চিরকুমারসভা কিস্তিতে কিস্তিতে বেরোচ্ছে। তারই পাণ্ডুলিপি হস্তগত করেছেন প্রভাতকুমার।

নিবিষ্ট প্রভাতকুমার পাঠ করতে করতে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন।

কোন জায়গাটা পড়ছেন?

ক্ষয়ের ডায়ালগ, আপনাদের এই চিরকুমারক-টির চিরত্ব যাতে হ্রাস না হয় সে দিকে একটু দৃষ্টি রাখবেন। বাতিকের চর্চা করছ করো, কিন্তু বাতের চর্চা তোমাদের প্রতিজ্ঞার মধ্যে নয়

সরলাও হাসতে লাগল, বিমামা এত অসাধারণ লেখে!

বেতেই টপক্লাস! কবিতাই বলুন, গানই বলুন আর ছোটোগল্পই বলুন! এখন তো দেখছি প্রহসনেও সবার কান কেটে নেবেন। কী চোখা ডায়ালগ আর কী সুন্দর গোটা গোটা হাতের লেখা!

পনার দেবী ল্পের প্লটটাও তো শুনি রবিমামা দিয়েছে

ঠিকই শুনেছেন। মনে হয় সেভাবে ফোটাতে পারিনি। উনি নিজে লিখলে ঢের ভালো হত

বিমামা কথা দিয়েছে যে, আরেকটা বড়ো গল্প ভারতী-তে দেবে—নাম নষ্টনীড়

বা! খুব ভালো খবর!

কটু চা খাবেন না?

লুন

রামদীনকে ডেকে চায়ের ফরমায়েশ দিল সরলা। চিরকুমার সভা-র পাণ্ডুলিপি এক পাশে রেখে চা পান করতে লাগলেন দুজনে।

পনার বিলেত যাবার কদ্দুর?

শা তো আছে এ বছরের শেষে। সে রকমই কথাবার্তা হয়ে রয়েছে

পেশায় উকিল এবং নেশায় সাহিত্যিক প্রভাতকুমার আর্থিক দিক দিয়ে তেমন সম্পন্ন নন। ঘরে তাঁর বিধবা মা। এদিকে সরলার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এখন বিবাহ-সম্ভাবনায় পৌঁছেছে। কথা চলছে যে, সরলার মামা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অর্থানুকূল্যে বিলেত যাবেন তিনি। ব্যারিস্টার হয়ে আসবেন। তারপর সরলার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হবেন।

প্রভাতকুমার বললেন, গে বিলেত

তারপর?

তারপর ব্যারিস্টার

তারপর?

তারপর ব্যাক টু বেঙ্গল, ব্ল্যাক নেটিভ, বাপ বাপ বলে! কেমন?

শুধু বেঙ্গল? ব্যাস? আর কিছু নয়?

প্রভাতকুমার সহাস্যে বললেন, তারপরই তো আসল কাজ!

কী কাজ?

গে বিলেত, তারপর ব্যারিস্টার, তাপর ব্যাক টু বেঙ্গল, ব্ল্যাক নেটিভ, বাপ বাপ বলে আর তারপর বিয়ে!

হ্যাঁ, এবার ছন্দ আর অনুপ্রাস ঠিকঠাক মিলেছে, মশাই! আশা করি আপনি চিরকুমারব্রত ধারণ করেননি?

৩ নং সানি পার্কের অভিজাত অট্টালিকায় বসে থাকা দুই উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীর মুখে গূঢ় হাসি খেলে গেল। দুজনের মুখই লজ্জায় ঈষৎ লাল হয়ে উঠল।।

(ক্রমশ…)

 
 
top