নতুন আলো

 

পর্ব ১৯

পিতা মহেশচন্দ্র আতর্থি এক বিচিত্র চরিত্রের মানুষ। একদিকে তিনি আদর্শবাদী ব্রাহ্ম, অন্যদিকে নিদারুণ কড়া অভিভাবক। বাড়িতে প্রতিদিনই প্রেমাঙ্কুরদের নানাবিধ উপদেশ শুনতে হয়। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, কেশব সেন, বিদ্যাসাগর প্রমুখ মহাপুরুষরা কখন কী বেদবাক্য বলেছিলেন; গ্যারিবল্ডি, জর্জ ওয়াশিংটন, মার্টিন লুথার কবে কোন মহান কাজ করেছিলেন, সে ব্যাপারে ছেলেদের নিত্য সজাগ রাখেন তিনি। এছাড়া প্রতি রবিবারে আছে সানডে স্কুল। ব্রাহ্মদের অনেক সামাজিক অনুষ্ঠান ক্রিশ্চান ঘেঁষা। ক্রিশ্চানদের সানডে স্কুল-এর অনুকরণে এই উদ্যোগ। বুড়ো আর লালু তাই প্রতি রবিবার ভোরে উঠে চান করে সানডে স্কুলে যায়। দাদা বাবু ওরফে নরেশচন্দ্র পড়ে ডফ কলেজে। কুস্তি লড়ে বড়ো করিমের আখড়ায়। সানডে স্কুলে যাওয়ার বয়স সে পেরিয়ে এসেছে অনেকদিনই

সানডে স্কুলে সমাজের অনেক ধনী লোকের ছেলেরাও আসে ছেলেরা সচরাচর পড়ে সেন্ট জেভিয়ার্সে আর মেয়েরা লোরেটোতে। বিচিত্র এদের চালচলন। প্রেমাঙ্কুরদের অত্যন্ত তুচ্ছ জ্ঞান করে এরা। সে উপেক্ষাটা অবশ্য প্রেমাঙ্কুররাও সুদেআসলে ফিরিয়ে দেয়। তবে মনে মনে প্রেমাঙ্কুররা এই সব আধা ট্যাঁশ আধা ফিরিঙ্গি ছেলেমেয়েদের একটু সম্ভ্রমই করে। নিজেদের মধ্যে যখন এই সব ছেলেমেয়েরাshan’t, can’t, aren’t, Oh My! প্রভৃতি বিচিত্র শব্দ ব্যবহার করে, তখন অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে দুই ভাই।

সানডে স্কুল শুরু হয় গান দিয়ে।

স্বর্গীয় অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠের অংশবিশেষে সুরসংযোগ করে এই অভূতপূর্ব সংগীত রচিত হয়েছে। কী তার ভাব! কী তার ভাষা! কী তার ছন্দ! কী তার অনুপ্রাস!

অদ্ভুত প্রকাণ্ড কাণ্ড ব্রহ্মান্ড কী চমৎকার!

হৃদয়-উপচানো এই সংগীতে অবগাহিত হয়ে শিশুরা সানডে স্কুলে প্রতিদিন নিমগ্ন হয়। তবে একদিক থেকে এই স্কুল দৈনন্দিন স্কুলের থেকে অনেক ভালোপড়াশোনার বালাই নেই। মাঝে মাঝে স্কুলশুদ্ধ ছাত্রকে নিয়ে যাওয়া হয় শিবপুরের বাগানে বা আলিপুরের চিড়িয়াখানায় পিকনিক করতে। নামজাদা কেউ কেউ এসে গল্পচ্ছলে ছেলেদের নানা উপদেশ দিয়ে যান। প্রেমাঙ্কুরদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয়তো ভালোই হত যদি না চরিত্র পুস্তক-এর বিষয়টা থাকতসানডে স্কুলের প্রতিটি ছেলেমেয়েকেই একটা খাতা রাখতে হয়। তার পাতায় রবিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত সাত দিনে নিজেদের বাড়িতে ব্যবহার ও পাঠ-কে কেমন করেছে তার হিসেব দাখিল করতে হয়। অভিভাবকরাই এটা লিখে দেন। অন্য ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে গোলমাল নেই। অভিভাবকরা সবাই লিখছেন—পাঠ ভালো, ব্যবহার ভালো। মহেশচন্দ্র অন্য ধাতুর লোক। গুরুতর রকমের ভালো ব্যবহারের পরিচয় না দিলে তিনি চরিত্র পুস্তকে চোখ বুজে পাঠ মন্দ তথা ব্যবহার মন্দ লিখে দেন। পাঠ ও ব্যবহারের মধ্যে প্রভেদ তিনি রাখেন না। পাঠ খারাপ হলে ব্যবহার তাঁর কাছে খারাপ হয়ে যায়। ব্যবহার মন্দ হলে পাঠ হয়ে যায় মন্দ। পাঠ আর ব্যবহার, এই দুই তালবেতালকে সামলাতে গিয়ে জেরবার হয়ে উঠল দুই ভাই।

চরিত্র পুস্তক- মন্তব্য লেখার ব্যাপারেও মৌলিকতার পরিচয় রাখেন মহেশচন্দ্র।

বুড়ো ওরফে প্রেমাঙ্কুর একদিন ছাতে লাট্টু ঘোরাচ্ছে। ওড়ন গচ্চা খেয়ে লাট্টু হাত থেকে উড়ে গিয়ে নীচের উঠোনে বাসন মাজতে থাকা বুড়ি ঝির পিঠে পড়ল। মর্মাহত মহেশচন্দ্র সেবার চরিত্র পুস্তকে লিখলেন: এই ব্যক্তি অত্যন্ত আত্মসুখপরায়ণ দুর্বৃত্ত। ক্ষণিক আত্মসুখের জন্য নারীহত্যা এমন কি মাতৃহত্যায়ও পরাম্মুখ নহে

তাঁর এই মন্তব্যে স্কুলে হইচই পড়ে গেল

একবার বুড়ো আর লালু দুভাই চুরি করে আমসত্ত্ব খেয়েছে।

মহেশ চন্দ্র লিখলেন: এ ব্যক্তি অত্যন্ত চতুর তস্কর। শুধু তাহাই নহে, অন্যকেও তস্করবৃত্তি অবলম্বন করিতে প্রলুব্ধ করে।

স্কুলের নীতিশিক্ষাদাত্রীরা প্রেমাঙ্কুরদের দুই ভাইকে নিয়ে হিমশিম খেতে লাগলেন। ধন্য তাঁদের অধ্যাবসায়! সপ্তাহে সাত দিনই পাঠ আর ব্যবহার মন্দ দেখেও তাঁরা হতাশ বা বিচলিত হয়ে পড়লেন না, স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিলেন না বা পুলিসের হাতে সমর্পণ করলেন না। একটু আধটু ধমকধামক দিয়ে আর ভবিষ্যতে ভালো আচরণ করার উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হতেন তাঁরা। তবে ডাকসাইটে দুষ্টু ছেলে হিসেবে দুই ভাইয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল।

আমসত্ত্ব চুরির পর পিতার মৌলিক মন্তব্যে চোর সাব্যস্ত হয়ে ক্ষুণ্ণমনে সানডে স্কুলের পেছনের বেঞ্চে বসে আছে প্রেমাঙ্কুর। একটা মেয়ে তার পাশে এসে বসল

খুব আস্তে আস্তে ফিসফিস করে তাকে বলল, তুমি খুব দুষ্টু, না?

মেয়েদের কাছে দুষ্টু ছেলে বলে বাহাদুরি নেবার মনস্তত্ত্ব তখনো প্রেমাঙ্কুরের গজিয়ে ওঠেনি। কী বলবে ভাবছে, এমন সময় মেয়েটি আবার ফিসফিস করে বলল, মি কিন্তু দুষ্টু ছেলেদের বড্ড ভালোবাসি। তুমি আর কী দুষ্টু? আমার দাদারা যা দুষ্টু!

প্রেমাঙ্কুর কিছু জবাব দেবার আগেই মেয়েটি বলল, তোমার নামটা কিন্তু ভাই খুব মজার!

এখন নিজের অসাধারণ নাম নিয়ে প্রেমাঙ্কুর বিশেষ সচেতন। এ বিষয়ে আলোচনা উঠলে সে দমে যায়। এবারও সে চুপ করে রইল

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেয়েটি বলল, মার কথায় রাগ করলে, ভাই?

এমন মিষ্টি মেয়ের উপর রাগ করা যায়? প্রেমাঙ্কুরের ভেতরের সমস্ত রাগ, অভিমান, কষ্ট মুহূর্তে মিলিয়ে গেলমেয়েটির দিকে তাকাল সে

তাকিয়েই চমকে উঠল, আরে! এ তো সেই ছিঁচকাঁদুনে মেয়েটা—সুলতা! ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলের বোর্ডিংয়ে থাকে! সেই দিন এর নালিশের জন্যই তো ঘোড়া ঘোড়া খেলতে গিয়ে তাদের দুই ভাইকে অত নাকাল হতে হয়েছে!

মেয়েটির দিকে অবরুদ্ধ আক্রোশে চেয়ে প্রেমাঙ্কুর বলল, তু! ছিঁচকাঁদুনে, মিথ্যেবাদী, নালিশকুটি! তোর জন্য সেদিন অত বকা খেলাম!

মেয়েটি তার বড়ো বড়ো চোখের দৃষ্টি প্রেমাঙ্কুরের দিকে ক্ষেপণ করে বলল, র সেদিন তুই আমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলি যে!

চ্ছে করে দিয়েছি? আচমকা লেগে গেছে

ভেরি ভেরি সরি! আয় নে ভাব করি মেয়েটি বুড়ো আঙুল তুলল

প্রেমাঙ্কুর প্রত্যুত্তরে কড়ে আঙুল দেখাল, না, আড়ি! আড়ি!

মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে বইয়ে মনোনিবেশ করল।

ওদিকে তাদের কানে সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ ভেসে আসছে। সানডে স্কুলে উপনিষদের পাঠ দিচ্ছেন পণ্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণব। কেন উপনিষদ থেকে পাঠ দিচ্ছেন তিনি।

মেয়েটি যদিও বইয়ে মুখ গুঁজে আছে কিন্তু শুনছে বলে মনে হয় নাতার শরীর ফুলে ফুলে উঠছে।

প্রেমাঙ্কুর সাহস করে এক ঝটকায় বইটা সরিয়ে দিল। মেয়েটা ফুলে ফুলে কাঁদছে। মুখ চোখ লাল। চোখের কোণে মুক্তোর দানার মতো অশ্রুবিন্দু।

তুই কাঁদছিস?

তুই আমায় বকলি? ভাব করলি না! জানিস আমার মা নেই?

মা নেই?

মার মা কবে সগ্গে চলে গেছে! আকাশের তারা হয়ে গেছে। বাবা আবার বিয়ে করেছে। আমি একলা একলা বোর্ডিংয়ে থাকি। বাবা আমায় দেখতে আসে না!

প্রেমাঙ্কুর নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। সত্যিই তো! মেয়েটার কত দুঃখ! সে এবার তার বুড়ো আঙুল তুলল।

মেয়েটির মুখে এবার হাসির রেখা ফুটে উঠল, ভাব তো?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভাব, ভাব, ভাব

 

এর কয়েক দিন পরেই একবার সানডে স্কুলের তরফ থেকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে যেতে হল প্রেমাঙ্কুরদের।  সঙ্গী হয়ে গেলেন পণ্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণব। ছাত্ররা উপনিষদের কিছু শ্লোক মুখস্ত করেছে। তাদের এই কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়ে বিদ্যাবত্তা প্রদর্শনের জন্য মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কাছে পাঠিয়েছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ।  প্রেমাঙ্কুর দুষ্টু ছেলে হলেও মেধাবী। উপনিষদের শ্লোক অনায়াসেই মুখস্ত করেছে সে। সুলতাও  গেল তাদের সঙ্গে

জোড়াসাঁকোর প্রাসাদে তাঁর নিজের মহলে বেতের চৌকিতে সোজা হয়ে বসে থাকেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বয়েস আশি ছাড়িয়েছে তবে মন এখনো সজাগ। ইন্দ্রিয় এখনো সচল ও সক্রিয়ঋষিপ্রতিম চেহারাই বটে! ধপধপে ফর্সা গায়ের রং। সাদা গোঁফ, দাড়ি। পায়ের কাছে একটা মোড়া। কখনো কখনো পা রাখছেন তার ওপর। পাশে একটা তেপায়াতার ওপর একটা হাফেজের কবিতার বই, যেটা পড়তে খুবই ভালোবাসেন তিনি এছাড়া ব্রাহ্মধর্মের ওপর বইও রয়েছেসামনে একটা ছোট্ট পিরিচে কিছু ফুল—বেলফুল, জুঁই বা শিউলি। দু-পাশে খান দুয়েক চেয়ার অতিথি, অভ্যাগতদের জন্য।

সামনের জাজিমে গোল হয়ে বসল সানডে স্কুলের ছাত্রবৃন্দ—প্রভাত, প্রেমাঙ্কুর, জ্ঞানাঙ্কুর।  বাচ্চাদের মিষ্টি আর শরবত দেওয়া হল। তারপর স্মিত কণ্ঠে দেবেন্দ্রনাথ বললেন, বেশ, এবার কী  শিখেছ আবৃত্তি করে শোনাও দেখি।

শিবধন বিদ্যার্ণব শীর্ণকায়, মুণ্ডিতমস্তক ব্রাহ্মণ। কণ্ঠে দোদুল্যমান যজ্ঞোপবীত। তিনি শশব্যস্ত হয়ে বললেন, বাচ্চারা, তোমাদের তো আমি কেন উপনিষদ শিখিয়েছি। সেখান থেকে কী শিখেছ শোনাও।

বিদ্যার্ণব মশাইয়ের আজ্ঞায় বাচ্চারা কম্পিত বক্ষে একে একে দাঁড়িয়ে মুখস্ত শ্লোক উগরে দিতে লাগল।  

সুলতা বলল:

 

ওঁ কেনেষিতং  পততি প্রেষিতং মনঃ

কেন প্রাণঃ প্রথমঃ প্রৈতি যুক্তঃ।

কেনেষিতাং বাচমিমাং বদন্তি

চক্ষুঃ শোত্রং উ দেবো যুনক্তি।।

প্রভাত উঠল:

 

ন তত্র চক্ষুর্গচ্ছতি ন বাগগচ্ছতি নো মনঃ

ন বিদ্মো ন বিজানীমো যথৈতদনুশিষ্যাৎ।।

প্রেমাঙ্কুর কম্পিত কন্ঠে বলল:

যদ বাচাহনভ্যুদিতং  যেন বাগভ্যুদ্যতে।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদুমুপাসতে।।

সবার শেষে উঠল জ্ঞানাঙ্কুর:

 

যৎ প্রাণেন ন প্রাণিতি যেন প্রাণঃ প্রণীয়তে।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিমুপাসতে।।

দেবেন্দ্রনাথ স্মিত মুখে, ধ্যানমগ্ন হয়ে শুনছিলেন। বাচ্চারা সব যে শুদ্ধ বলছে তা নয়। মাঝে মাঝেই কঠিন সংস্কৃত শব্দ গুলিয়ে ফেলছে তারা। তবে আন্তরিক চেষ্টা আছে প্রত্যেকেরই।

কিছুক্ষণ পর চটকা ভেঙে স্বস্তিবাচন করলেন, সাধু! সাধু ! তা শিবধন, এরা তো ভালোই শিখেছে

বিদ্যার্ণব মশাই কৃতার্থ হয়ে বিগলিত হাসলেন।

দেবেন্দ্রনাথ এর পর সুললিত কন্ঠে কেন উপনিষদের ব্যাখ্যা শুরু করলেন।

এই উপনিষদের নাম কেন কারণ এটা শুরু হয়েছে একটি বিশেষ প্রশ্ন দিয়ে, কেন অর্থাৎ কার দ্বারা। উপনিষদ প্রশ্ন করছেন কার দ্বারা এই জগৎ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এর উত্তর হচ্ছে—ব্রহ্মের দ্বারা।

ব্রহ্ম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু নন অথচ ব্রহ্মের সহায়তা বিনা ইন্দ্রিয়রা কাজ করতে অসমর্থ। সব শক্তির উৎস ব্রহ্মই পরম সত্ত্বা। তিনিই আমাদের আত্মা। তিনি সত্য, নিত্য এবং অপরিবর্তনীয়। ব্রহ্মে আশ্রিত বলেই জগৎ সত্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ব্রহ্মকে বাদ দিলে জগতের অস্তিত্ব থাকে না।

বাচ্চারা সব যে বুঝল তা নয়। ঠাকুরবাড়িতে ঢুকে ইস্তক চমকে গেছে তারা। বিশাল, বিশাল ঘর, দালান। চওড়া বারান্দা। চিকের ঘেরাটোপ। লোকে, লস্করে, বেয়ারায়, পেয়াদায় সরগরম চারদিক। আবার দেবেন্দ্রনাথের ছায়ান্ধকার মহল সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। চাঁপা ফুলের হালকা গন্ধে সুবাসিত সেই মহলে ঋষিকল্প মানুষটি সুললিত কণ্ঠে ব্যাখ্যা করে চলেছেন ভারতীয় দর্শনের চিরকালীন অথচ প্রাসঙ্গিক জ্ঞান। দেবেন্দ্রনাথের ব্যাখ্যা শেষ হতে একে একে প্রণাম করে বিদায় নিল তারা।

মহল থেকে বেরিয়ে বারান্দা। কাঠের বেঞ্চি পাতা সেখানে। সেই বেঞ্চির ওপর আসীন অত্যন্ত রূপবান, দীর্ঘদেহী এক পুরুষঘন কৃষ্ণ গুম্ফ-শ্মশ্রুশোভিত মুখে আশঙ্কা ও চিন্তার কালো  ছায়া। পাশে জাবদা খাতা হাতে বসে আছে শীর্ণকায় এক সহযোগী। দুজনে নিবিষ্ট হয়ে মৃদু কণ্ঠে বাক্যালাপ করছেন।  

রূপবান পুরুষটিকে দেখে চমকে উঠল প্রভাত। পাশে পাশেই হাঁটছে প্রেমাঙ্কুর। প্রভাত বলল, ই লোকটা কে জানিস?

কো লোকটা?

ই যে বারান্দায় বেঞ্চের উপর বসে ছিল? খুব সুন্দর দেখতে?

কে রে?

ই তো রবি ঠাকুর। মহর্ষির ছোটো ছেলে

চিনলি কী করে?

রে আমাদের জামাইবাবু উপেনবাবুর খুব বন্ধু। প্রায়ই আসে আমাদের বাড়ি। খুব গুণী লোকটা। খুব ভালো গান আর কবিতা লেখে। উপেনবাবু তো দারুণ প্রশংসা করেন

যাই বল, ঠাকুরবাড়ির লোকদের খুব সুন্দর দেখতে। আর মহর্ষিকে দেখতে তো পুরোনো দিনের মুনি-ঋষিদের মতো  

প্রভাত বলল, লোকে ওঁর পেছন পেছন একটা মজার কথা বলে বেড়ায়, জানিস?

কী কথা রে?  

নার নাকি বিশাল অর্শ আছে। খুব রক্তপাত হয়শুধু উনি নন, ওনার পরিবারের অনেকেরই নাকি এক ব্যামো তাই উনি মহর্ষি খেতাব পেয়েছেন!

প্রভাতের কথায় খিল খিল করে হেসে উঠল প্রেমাঙ্কুর।

বাচ্চারা, তোমরা তাড়াতাড়ি পা চালাওগল্প কোরো না পেছন থেকে অধৈর্য শিবধন বিদ্যার্ণব তাড়া দিলেন।

প্রভাত, প্রেমাঙ্কুররা চলে যাওয়ার পর মহর্ষির মহালে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সঙ্গীর ডাক পড়ল।

 

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ আদি ব্রাহ্মসমাজের প্রাণপুরুষই শুধু নন, এক বিশাল পরিবারের গোষ্ঠীপতিও বটে। সেই গোষ্ঠীপতি তথা জমিদার হিসেবে তীক্ষ্ণ বিষয়বুদ্ধিরও অধিকারী তিনি। ঐহিকতার সঙ্গে পারমার্থিকতার কোনো বিরোধ মহর্ষি বা তাঁর পুত্ররা দেখেন না। পুরাণের জনকরাজা কি একই সঙ্গে দুয়ের সমন্বয় ঘটাননি?

পিতার প্রতিনিধি হিসেবে শিলাইদহ-পতিসরের জমিদারির দেখভাল করছেন রবীন্দ্রনাথ। প্রতিমাসের দোসরা ও তেসরা তাঁর হিসাব দাখিলের দিন। গতমাসের এবং গতবছরের সঙ্গে তুলনা করে সমস্ত আয়ব্যয়ের বিবরণ তাঁকে দেবেন্দ্রনাথের সামনে তুলে ধরতে হয়। দেবেন্দ্রনাথ নিজে পড়েন না। মোটা অঙ্কগুলো কানে শুনে প্রথমে মনে মনে যোগ-বিয়োগ করে নেন। অসঙ্গতি অনুভব করলে ছোটো ছোটো অঙ্কগুলোও শোনাতে হয়। হিসেবের কোনো দুর্বলতা চেপে যাওয়ার উপায় নেই। মহর্ষি ঠিক ধরে ফেলবেন। এই কারণে মাসের এই দুটো দিন রবীন্দ্রনাথের কাছে বিশেষ উদ্বেগের। তিনি সহায় হিসেবে যজ্ঞেশ্বরকে নিয়ে এসেছেন। স্ত্রী মৃণালিনীর গাঁয়ের লোক এই যজ্ঞেশ্বর শিলাইদহের সেরেস্তায় কাজ করে এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও কর্মদক্ষ হিসেবে নাম কিনেছে।

প্রায় এক ঘণ্টা নিবিষ্টচিত্তে হিসেব নিকেশের বিবরণ শুনলেন মহর্ষি। তার শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখে অবশেষে তৃপ্তির হাসি ফুটল। অঙ্গুলি নির্দেশে যজ্ঞেশ্বরকে চলে যেতে বললেন তিনিরবীন্দ্রনাথকে নির্দেশ দিলেন দরজায় খিল লাগিয়ে দিতে।

অর্গলবদ্ধ ঘরে মুখোমুখি হলেন পিতাপুত্র।

বি, তোমার সঙ্গে বিশেষ কথা আছে

রবীন্দ্রনাথের মুখ আশঙ্কায় পাণ্ডুর হয়ে উঠল।

তোমার ঠাকুর কোম্পানির কী অবস্থা?

চমকে উঠলেন রবীন্দ্রনাথপিতার প্রশ্ন যে এমন কুটিল বাঁক নেবে তা অনুমান করেননি তিনি। ভগ্নকণ্ঠে বললেন, খুব লোকসান চলছে

ত টাকা লোকসান?

ঞ্চাশ হাজারেরও বেশি

মাড়োয়াড়ি মহাজনের কাছে চড়া সুদে ধার করেছ?

খেয়েছে! মাড়োয়ারি মহাজনের কাছে ধার করার সংবাদও সর্বজ্ঞ পিতার কাছে পৌঁছে গেছে!

তুমি মানুষ চেন না, রবি। ব্যাবসা করা তোমার কম্ম নয়। জ্যোতি ব্যাবসা করতে গিয়ে লোক হাসাল। তুমিও এক পথে হাঁটছ! লেখা-পড়া, গান-বাজনা নিয়েই তো বেশ থাকতে পারতে? সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় কেন তোমাদের? শুনলাম, নিশিকান্তর ওপর খুব ভরসা রাখতে?

দেবেন্দ্রনাথের কাছে আসা সব খবরই অভ্রান্ত। বরিশালের নিশিকান্ত গুপ্তই তো সত্তর হাজার টাকার হিসেবের গরমিল করে কোম্পানিকে ডুবিয়ে দিয়ে গেছেরবীন্দ্রনাথের ইচ্ছে হল জিগ্যেস করেন যে, শিলাইদহের সেরেস্তার কোন কর্মচারী চুকলি খেয়ে পিতাঠাকুরকে সংবাদগুলো সরবরাহ করেছে। কিন্তু তাঁর সাহসে কুলোল না।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির নিরালা, ছায়াচ্ছন্ন, চাঁপা-চামেলি সুবাসিত, অর্গলবদ্ধ ঘরে বছর চল্লিশের পুত্রের মস্তকে অশীতিপর ঋষিকল্প পিতার তিরস্কারবাক্য বর্ষিত হতে থাকল। অবনত মস্তকে, নীরবে সবই গ্রহণ করলেন রবীন্দ্রনাথ।

তোমায় একটা বিশেষ কারণে ডেকেছি রবি

রবীন্দ্রনাথ চুপ করে রইলেন।

তোমায় একটু এলাহাবাদ যেতে হবে

কে?

লেন্দ্রনাথ মারা যাবার পর বধূমাতা সাহানা ওখানে পিতৃগৃহে আছে। আমার কাছে সংবাদ এসেছে যে, তাঁর বিধবা-বিবাহের কথা হচ্ছে। তুমি অবিলম্বে তাঁকে জোড়াসাঁকোয় ফিরিয়ে আনো

সাহানার বিধবা-বিবাহে আপত্তি আছে আপনার?   

রবীন্দ্রনাথ আমতা আমতা করে বললেন।

পিতার চোখের দৃষ্টি প্রখর হয়ে উঠল।

সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের শিবনাথ, দ্বারকানাথ, দুর্গামোহন অনেক রিফর্ম করেছে, রবি। দুর্গামোহন নিজের বিধবা বিমাতাকে আবার বিবাহ দিয়েছে! নিজে বিধবা বিবাহ  করেছে! সব আমার জানা আছে। আদি ব্রাহ্ম সমাজে ওসব আমি ঢুকতে দেব না। ঠাকুর ফ্যামিলির কোনো মেয়ে এ দেহে প্রাণ থাকতে বিধবা বিবাহ করতে পারবে না। সাহানাকে যেমন করে পার বুঝিয়ে সুজিয়ে এলাহাবাদ থেকে নিয়ে এসোএটাই তোমার ওপর আমার দেওয়া দায়িত্ব। এখন যাও, আমি বিশ্রাম করব

মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়েসে প্রয়াত হয়েছেন ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ। স্ত্রী সাহানার বয়স কতই বা? ওর বাপের বাড়ির লোক যদি আবার বিয়ের কথা ভাবে তাহলে দোষ কোথায় ?

মনে মনে এসব জল্পনা করলেও প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পিতার সামনে বিদ্রোহের ধ্বজা ওড়াতে পারলেন না রবীন্দ্রনাথ। পিতার অন্নদাস তিনি, অন্যদিকে আপাদমস্তক ঋণজর্জরিত। অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ, বিষণ্ণ মনে বিদায়  নিয়ে নিজের মহালে ফিরে চললেন তিনিসারা সকালটা তেতো হয়ে গিয়েছে তাঁর কাছে।

জোড়াসাঁকোর বাড়ির তেতলায় নিজের মহালে ফিরে গিয়ে আরামকেদারায় গা এলিয়ে রবীন্দ্রনাথ চুপ করে বসে রইলেন। মনে নানা বিপ্রতীপ চিন্তার ঝড়। ঘরের মধ্যে বেয়ারা ঝগড়ু ঝাড়পোঁছ করছে। মনিবকে দেখে একগাল হেসে এগিয়ে এল সে, ত্তামশাই, জলখাবার কি দেব? লুচি খাবেন?

সকালে পিতৃদেবের সঙ্গে বৈষয়িক আলোচনার পর কবির খাওয়ার ইচ্ছে একেবারেই উবে গেছে। তাও বিরস কণ্ঠে বললেন, দে, সঙ্গে একটু আলুর ছোকা করিস

পনার কিছু চিঠি এসেছে

দে।

রবীন্দ্রনাথ উল্টেপাল্টে চিঠিগুলো দেখতে লাগলেন। বেশির ভাগই কেজো বৈষয়িক চিঠি। অতি সাধারণ-দর্শন একটা ইংরেজি পত্রিকাও রয়েছে। মোড়ক খুলে কবি দেখলেন যে,  পত্রিকাটার নাম সোফিয়া

সোফিয়া? অদ্ভুত নাম তো! এরকম পত্রিকার নাম আগে কখনো রবীন্দ্রনাথ শোনেননি।

এই অসাধারণ নামের পত্রিকার সম্পাদকের নামটাও অসাধারণ—ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়

কে এই ব্যক্তি? কবি তো এরকম নামের কাউকে চেনেন না! কি পিতৃদত্ত নাম নাকি ছদ্মনাম?

পত্রিকার সম্পাদকীয় অংশ লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করা। যিনি পাঠিয়েছেন তিনি স্পষ্টতই চান যে,  রবীন্দ্রনাথ ওই অংশটুকু পড়ুন।

সম্পাদকীয়ের শীর্ষক—দ্য ওয়ার্ল্ড পোয়েট অফ বেঙ্গল

কৌতূহলী রবীন্দ্রনাথ পড়তে শুরু করলেন। লেখাটা তাঁকে নিয়েই। লেখক স্বয়ং ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়!

প্রবন্ধ আরম্ভ হয়েছে কবির রূপ বর্ণনা দিয়ে। উচ্ছসিত  ব্রহ্মবান্ধব বলছেন যে, কবি  র‍্যাফায়েল বা মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর মতো চিত্রকরকে অনুপ্রাণিত করার মতোই দৈহিক সৌন্দর্যের অধিকারী।

এরপর অত্যন্ত সচেতনভাবে ব্রহ্মবান্ধব রবীন্দ্রপ্রতিভার উন্মেষকাল থেকে তার ক্রমবিকাশের বিচিত্র পথ অনুসরণ করেছেনলিখছেনরবীন্দ্র ইজ নট ওনলি এ পোয়েট অফ নেচার অ্যান্ড লাভ বাট হি ইজ এ উইটনেস টু দা আনসিন 

প্রবন্ধ শেষ হচ্ছে এক অসাধারণ প্রশংসাবাক্য দিয়েইফ এভার দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ স্টাডিড বাই ফরেনার্স ইট উইল বি ফর দ্য সেক অফ রবীন্দ্র। হি ইজ এ ওয়ার্ল্ড পোয়েট।

ওয়ার্ল্ড পোয়েট!? বিশ্ব কবি!? রবীন্দ্রনাথের শ্রবণে, স্মরণে, মননে এই বাক্যবন্ধ গুঞ্জরিত হতে লাগল।

কে এই অচেনা গুণগ্রাহী? কী আশ্চর্য তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও রসবোধ!?

প্রবন্ধ পাঠ করতে করতে এতই মগ্ন হয়ে গেছিলেন কবি যে,  ঝগড়ু বেয়ারা যে অনেকক্ষণ পাশে এসে দাঁড়িয়ে আছে সে খেয়াল করেননি।

ত্তা মশাই আপনার লুচি তো জুড়িয়ে জল হয়ে গেল!

চমকে উঠে রবীন্দ্রনাথ লুচির থালাটা টেনে নিলেন। সকালে পিতার সাথে সাক্ষাৎকারের পর যে তিক্ততা কবির মনে সঞ্চিত হয়েছিল,  তা কোথায় উধাও হয়ে গেছে। কবির মনে বাজতে লাগল ব্রহ্মবান্ধবের শব্দবন্ধ—ওয়ার্ল্ড পোয়েট! ওয়ার্ল্ড পোয়েট! তাঁকে এত বড়ো প্রশংসা করেছেন ব্রহ্মবান্ধব?!

বাঙালি পাঠক মহলে কিছু অনুরাগী থাকলেও অধিকাংশ মানুষই রবীন্দ্রনাথের মাহাত্ম্য সম্পর্কে অবহিত নন। সুরেশ সমাজপতি বা পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিষকুম্ভ সমালোচকরা তো ছিদ্রান্বেষণের জন্য মুখিয়েই আছেন। বস্তুত, সমালোচনার নামে অকুণ্ঠ নিন্দাবাদেই কবি অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে অযাচিত, এত অকুণ্ঠ প্রশংসা আগে কখনো পাননি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর মনে গুঞ্জরিত হতে থাকল প্রবন্ধটির শেষ পঙক্তিগুলি:

ইফ এভার দা বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ স্টাডিড বাই ফরেনার্স ইট উইল বি ফর দা সেক অফ রবীন্দ্র। হি ইজ এ ওয়ার্ল্ড পোয়েট।

এই প্রবন্ধটা বিলেতপ্রবাসী জগদীশবাবুর কাছে পাঠাতে হবে। একমাত্র তিনিই এর কদর করবেন। 

দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের পর যে তিক্ততা মনে সঞ্চিত হয়েছিল, তা কেটে গিয়ে প্রসন্নতার সুপবন বইছে। গুনগুন করে সুর ভাঁজতে ভাঁজতে কবি স্নানঘরের দিকে চললেন।

 

বাইরের আঘাত বা উত্তেজনার প্রভাবে সজীব মাংসপেশীতে যেমন সঙ্কোচন হয়, ধাতুপদার্থেও একই রকম বিকৃতির লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই বিকৃতি বৈদ্যুতিক। আঘাত-উত্তেজনায় প্রাণীদেহ বা ধাতু উভয়েরই তড়িত-পরিচালনা শক্তি সাময়িকভাবে বেড়ে যায় এবং কিছু পরে তারা অবসন্ন অবস্থায় ফিরে যায়। এই ঘটনার বৈদ্যুতিক গ্রাফ নির্মাণ সম্ভব এবং সেটাই করে দেখিয়েছেন জগদীশচন্দ্র বসু।

শুধু তাই নয়, টিনের ওপর কস্টিক পটাশ প্রয়োগ করেছেন বসুঅল্প মাত্রায় প্রয়োগ করলে সজোর বৈদ্যুতিক আন্দোলন দেখেছেন তিনি। কিন্তু বেশি মাত্রায় প্রয়োগ করলে আবার উল্টো ফল! টিনের মতো ধাতু হয়ে পড়ছে অসাড়! যেন মৃত্যুমুখী! আফিম, বেলেডোনা বা ইপিকাকের মতো রাসায়নিক দ্রব্য, যা অল্প মাত্রায় ওষুধ এবং বেশি মাত্রায় বিষ, তারাও ধাতুর ওপর একইরকম আশ্চর্যজনক ফলাফল দিচ্ছে!

অন্য কেউ হলে ব্যাপারটা ভাঁওতা বা বুজরুকি বলে উড়িয়ে দেওয়া যেত। জগদীশের হাতেকলমে পরীক্ষা এবং বৈদ্যুতিক গ্রাফ দেখে সবাই স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছেন।

প্যারিসেও ব্যাতিক্রম হল না। কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট জগদীশের সঙ্গে কথা বলে অত্যন্ত অবাক হলেন। এরপর দেখা করতে এলেন সেক্রেটারি মহোদয়। ইনি ইংরেজি জানেন। ঝাড়া একঘণ্টা জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করলেন তিনি। তারপর ফরাসিসুলভ কায়দায় কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, বামসিয়োঁ, দিস ইজ ভেরি বিউটিফুল!

বাট কথাটার মানে হল ভদ্রলোক পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না!

এর মধ্যেই বেশ কয়েকবার বক্তৃতা দিয়েছেন জগদীশ, সর্বসমক্ষে প্রদর্শন করেছেন তাঁর গ্রাফগুলো।

প্যারিসের বৈজ্ঞানিক মহলে প্রবল সাড়া পড়ে গেল। প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠতে লাগল। এই ভৌতিক ফলাফলের ব্যাখ্যা কী?

উত্তরে জগদীশ চন্দ্র বললেন যে, যখন কোনো বস্তুকে আঘাত করা হচ্ছে তখন তার আণবিক বিন্যাস বিকৃত হয়ে পড়ছে। বিকৃত অংশের অণুগুলো প্রকৃতিস্থ হবার জন্য সচেষ্ট হচ্ছে। এর ফলে দেখা দিচ্ছে তড়িৎ প্রবাহ। অবসাদ বা ফ্যাটিগও দেখা দিচ্ছে একই আণবিক বিকৃতির জন্য। চেতনা বা অচৈতন্য, সজীবতা বা নির্জীবতার সঙ্গে এই অবসাদের কোনো সম্পর্কই নেই।

বক্তৃতার পর হল করতালিতে ফেটে পড়ল। ম্যাগনিফিক! ট্রেস জলি ম্যাগনিফিক! সমস্বরে বললেন মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতৃবর্গ।

একদল পক্ককেশ, শ্মশ্রূমণ্ডিত বিজ্ঞানী এগিয়ে এলেন জগদীশের দিকে। তাঁদের পুরোভাগে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি।  ফরাসিদের স্বভাবসুলভ উচ্ছ্বাসে কেউ করমর্দন করলেন, কেউ পিঠ চাপড়ালেন, কেউ-বা চকাস করে চুমু খেলেন জগদীশের গালে  

সেক্রেটারি বললেন, দেয়ার ইজ গুড নিউজ ফর ইউ, প্রোফেসর বোস!

টেল মি

কংগ্রেসে যত পেপার পড়া হয়েছে তার মধ্যে তোমারটাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সাড়াজাগানো বলে আমাদের মনে হচ্ছে। ট্র্যানজাকসন্স অফ দ্য কংগ্রেসের প্রথম ভলিউমে এটা ছাপা হবে

প্রশংসা কার না ভালো লাগে। জগদীশচন্দ্রের মুখে গর্ব ও সুখমিশ্রিত হাসি খেলে গেল। অবলাও স্বামীগর্বে স্ফীত হয়ে উঠলেন।

বৈজ্ঞানিকরা  যে সর্বদা গবেষণা বা পঠনপাঠন নিয়েই মত্ত থাকেন, তা নয়। এই সব কংগ্রেস, কনফারেন্সের সুবাদে পানভোজন, খোশগল্প, হাসিঠাট্টাতেও  সময় কাটান তাঁরা। ডেলিগেটদের সম্মানে প্যারিসের এক অভিজাত হোটেলে নৈশভোজের আয়োজন হল। শ্যাম্পেন, শেরি ও অন্যান্য মহার্ঘ্য সুরার স্রোত বইতে লাগল। চারদিকে শোনা যেতে লাগল মদের গেলাসের মূর্ছনা। জগদীশ বা অবলা মদ্যপান করেন না, এককোণে জড়োসড়ো হয়ে তাঁরা ফরাসি চিজের টুকরোয় কামড় দিচ্ছিলেন। সহসা ভিড় ঠেলে এক সাহেব এগিয়ে এলেন। ভদ্রলোকের মাথায় টাক, পুরু গোঁফ, চোখমুখ বুদ্ধিতে শাণিত। জগদীশের হাত ধরে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, . বোস, আমি প্রোফেসর ওয়ারবুর্গ। বার্লিনে প্রোফেসর হেল্মহোলত্জ সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন। তাঁর পদে যোগ দিয়েছি আমি 

গ্ল্যাড টু মিট ইউ জগদীশচন্দ্র উষ্ণ করমর্দন করলেন।

মার ল্যাবে এক ছোকরা বৈজ্ঞানিক এসেছিল। কোহেরার নিয়ে কাজ করতে চায়। তাকে আমি কি বললাম জানেন, . বোস?

কী বললেন?

ললাম যেকী কাজ আর করবে? কোহেরার নিয়ে করার মতো কোনো কাজ আর অবশিষ্ট নেই। ক্যালকাটার ড. বোস সবই শেষ করে দিয়েছেন। তুমি অন্য কোনো বিষয়ের কথা ভাবো

জার্মান সাহেবের এই অযাচিত প্রশংসায় জগদীশ স্মিত হাসলেন।

প্যারিসে কি শুধু কাজ নিয়েই থাকবেন, . বোস? শহরটা ঘুরবেন না একটুকী সুন্দর শহর! অবশ্য আমাদের বার্লিন এর থেকে ঢের ভালো!

প্রোফেসর ওয়ারবুর্গের কন্ঠে প্রচ্ছন্ন স্বজাতিপ্রেম গোপন রইল না।

না, না, কাল ভাবছি শহরটা ঘুরব একটু। আইফেল টাওয়ারটা চড়া হয়নি

বশ্য! অবশ্য ! তবে আপনি বার্লিনে আসার কথাও ভাবুন,  . বোসআপনাকে সাদর আমন্ত্রণ রইল। ওখানে আপনার বহু গুণমুগ্ধ ভক্ত পাবেন

জগদীশকে বার্লিন যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে ওয়ারবুর্গ চলে গেলেন।

পরদিন সকালে আইফেল টাওয়ারে সস্ত্রীক গেলেন জগদীশচন্দ্র। বছর দশেক তৈরি হয়েছে ইস্পাতের এই সুউচ্চ টাওয়ার। ফরাসি বুদ্ধিজীবীরা অনেকেই অবশ্য আইফেল টাওয়ারকে সুনজরে দেখেন না। তাঁদের মতে ফরাসি ধ্রুপদি স্থাপত্যকীর্তি যেমন নোতর দাম গির্জা, ল্যুভর মিউজিয়াম বা আর্ক দ্য ট্রায়াম্ফের পাশে আইফেল টাওয়ার কদর্যতার প্রতিমূর্তি ছাড়া আর কিছু নয়। তবে বুদ্ধিজীবীদের উন্নাসিকতাকে উপেক্ষা করেই সেই গ্রীষ্মের সকালে আইফেল টাওয়ারের টিকিটঘরের নীচে লম্বা লাইন। জগদীশরা সেখানে দাঁড়ালেন।

গলায় কংগ্রেস ডেলিগেটের ব্যাজ ঝুলছে। অতএব জগদীশচন্দ্রের টিকিট লাগল না। অবলা অবশ্য নিষ্কৃতি পেলেন না। অপটু ফরাসিতে কিঞ্চিৎ দরদস্তুর করে পকেট থেকে মূল্যস্বরূপ পাঁচ ফ্রাঁ বের করলেন জগদীশ।

হঠাৎ শুনলেন কানের পাশে কে বলছে, পনাকে সাহায্য করতে পারি কি?

ভদ্রলোক ফরাসি, তবে ভালো ইংরেজি জানেন। জগদীশের অপটু ফরাসি শুনে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন।

কার্ড বিনিময় হল।

কার্ডটা পড়ে ভদ্রলোকের ভুরু কুঁচকে গেল, বো! আপনিই কি জগদীশ বোস?

হ্যাঁ।

ভদ্রলোকের মুখভাব নিমেষে বদলে গেল। টিকিটবিক্রেতার দিকে ফিরে আরক্ত মুখে ঝড়ের গতিতে ফরাসি বাক্যস্রোত বইয়ে দিলেন তিনি।

জগদীশ ও অবলা সবিস্ময়ে দেখলেন টিকিট-বিক্রেতার নাজেহাল, কাঁচুমাচু অবস্থা নাকের জলে চোখের জলে এক হয়ে জগদীশকে পাঁচ ফ্রাঁ  মূল্য ফেরত দিল সে তারপর আভূমিপ্রণত হয়ে ডবল সেলাম ঠুকল

ব্যাটাকে একটু ঝাড় দিলাম! সহাস্যে বললেন ফরাসি ভদ্রলোকটি পনি আমাদের এত বড়ো সম্মানিত অতিথি! আপনার কাছে টিকিটের দাম চায়! এত বড়ো দুঃসাহস! ওকে বললাম যে, সব জায়গায় ছ্যাঁচড়া ব্যাবসাবুদ্ধি খাটাতে যেয়ো না!

ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে এলিভেটরে চড়ে হুশ করে উঠে গেলেন সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র গন্তব্য একদম ওপরের ব্যালকনি—থার্ড লেভেল—মাটির ন-শো ফুট ওপরের এই অলিন্দ থেকে সুন্দরী প্যারিস নগরীর সবচেয়ে দর্শনীয়, মোহময়ী রূপ দৃষ্টিগোচর হয়।

এত ওপরে প্রবল হাওয়ার মাতামাতিহু হু হাওয়ায় জগদীশ আর অবলার চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। নীচে গ্রীষ্মের সূর্যালোকে ঝলমল করছে প্যারিস।

দারুণ দৃশ্য ! তাই না, অবলা?

সহসা জগদীশের কানে ভেসে এল এক অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর,. বোস, আই প্রিজিউম?

ঘাড় ঘুরিয়ে জগদীশ চমকে উঠলেন।

এক অতি পরিচিত মহিলা প্রসারিত হস্তে, হাস্যোজ্জ্বল মুখে এগিয়ে আসছেন তাঁদের দিকে—গিনী নিবেদিতা!

চকাৎ করে জগদীশ ও অবলার গালে চুমু খেয়ে নিবেদিতা বললেন, পৃথিবীটা সত্যি সত্যিই ছোটো! আপনাদের জন্য একটা সারপ্রাইজ রয়েছে!

কীসের সারপ্রাইজ?

বিস্ময়ের কারণটা অচিরেই জানা গেল। নিবেদিতার পেছন থেকে আত্মপ্রকাশ করলেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ

বিবেকানন্দ উচ্চতায় প্রায় পাঁচ ফুট আট, সাড়ে আট ইঞ্চি। প্রশস্ত গ্রীবা, বিস্তৃত বক্ষ, পেশল বাহু, শ্যামল চিক্কণ ত্বক, পরিপূর্ণ মুখমণ্ডলতবে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর তাঁর দুই চোখ। আয়ত পল্লবভারে অবনত পদ্মপলাশ লোচন। যে রাজকীয় চক্ষুদ্বয় কখনো হয়ে ওঠে ভাবাবেগে তন্ময়, কখনো বা রোষে অগ্নিবর্ষী অথবা পরিহাসে প্রখর। জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় অবশ্য তা আন্তরিকতায় স্নিগ্ধ।

জগদীশচন্দ্র ও বিবেকানন্দ যে পরস্পর অপরিচিত, তা নয়। আগেও কলকাতায় সাক্ষাৎ হয়েছে দুজনের। কিন্তু সে পরিচয়ের মধ্যে একটা দূরত্ব, একটা ব্যবধান ছিল। আইফেল টাওয়ারের এই সে দূরত্ব ঘুচে গেল। 

সাদরে জগদীশকে বুকে টেনে নিলেন বিবেকানন্দ, ন্য জগদীশবাবু, ধন্য! আপনি তো ফাটিয়ে দিয়েছেন মশাই!

বিবেকানন্দের কণ্ঠস্বর গম্ভীর, ব্যারিটোন। ভায়োলিন-চেলো বাদ্যযন্ত্রের শব্দের মতো মধুর। তাঁর আঙুলগুলো চাঁপার কলির মত। নখ ঈষৎ রক্তাভ। পুরুষসিংহ হলেও বিবেকানন্দের হাত নারীদের মতোই কোমল।

কী যে বলেন! সলজ্জ হাসলেন জগদীশ।

ধামাকা মাচিয়ে দিয়েছেন, মশাইব্রাভো! ব্রাভো! যেখানেই যাচ্ছি, শুনছি আপনারই জয়গান!

উচ্ছ্বাসের আবেগে জগদীশচন্দ্রকে আলিঙ্গন করে নানা প্রশংসাবাক্য বলে চললেন বিবেকানন্দ।

ওদিকে নিবেদিতা পাকড়েছেন অবলাকে, মাস্ট বি প্রাউড অফ ইয়োর হাজব্যান্ড! সাচ আ গ্রেট ম্যান!

স্মিত হাসছেন অবলাও।

জগদীশকে নিবেদিতা বললেন, বেয়ার্ন আপনার সাথে প্যাট্রিকেরও আলাপ করিয়ে দেব। খুব ভাল লাগবে

প্যাট্রিক?

প্যাট্রিক গেডেস। ও এখন প্যারিসে আছে। আপনার মতোই প্যাট্রিকও বহুমুখী প্রতিভা। আলাপ করে সুখ পাবেন

১৯০০ সালের প্যারিসের বিশ্বমেলা উপলক্ষে আমেরিকা থেকে এসে স্বামী বিবেকানন্দ উঠেছেন তাঁর ধনাঢ্য মার্কিন ভক্ত মি. লেগেটের প্রাসাদোপম প্যারিসের বাড়িতে। রাজকীয় মর্যাদায় সেখানে বাস করছেন তিনি। প্রতিদিনই সেখানে বুধসম্মিলন হচ্ছে। নানা বিষয়ের জ্ঞানী,গুণীরা একত্র হচ্ছেন, মতবিনিময় করছেন। হাস্যপরিহাসে অথবা গুরুগম্ভীর চিন্তাশীল আলোচনায় ব্যাপৃত হচ্ছেন। খাদ্য,পানীয়ের অঢেল, অফুরন্ত আয়োজন কখনো-বা দল বেঁধে দেখতে যাওয়া হচ্ছে শিল্পকলার পীঠস্থান প্যারিসের নানা দ্রষ্টব্য বস্তুএ ব্যাপারে স্বামী বিবেকানন্দের উৎসাহ সমধিক। নানা বিষয়ে তাঁর বিশ্বকোষতুল্য জ্ঞান। চিত্র বা ভাস্কর্যকলাও তার ব্যতিক্রম নয়।

একদিন প্যাট্রিক গেডেস বললেন, লুন, আমরা রঁদ্যার ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে যাই

রঁদ্যা?

হ্যাঁ, অগুস্ত রঁদ্যা। ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত ভাস্কর। ও তো বিশাল কাণ্ড করেছে এবার!  

কী রকম?

মিসেস লেগেট বললেন, স্বামীজি, রঁদ্যা আমার আর আমার স্বামীর বিশেষ পরিচিত। বিশ্বমেলা উপলক্ষে ও বিশাল এক ফাটকা খেলেছে

তাই নাকি?

সীন নদীর ধারে রাতারাতি দুশো ফুট লম্বা, চল্লিশ ফুট উঁচু এক বাড়ি বানিয়ে ওর এতাবৎ সেরা কাজগুলোর প্রদর্শনী করছে। বাজারে প্রায় এক লাখ ফ্রাঁ ধার ওর। আশা করছে যে বিক্কিরির টাকায় ধার-দেনা সব শোধ করে লাভ করবে

ক লাখ ফ্রাঁ?

হ্যাঁ। ও বলল মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার! হয় এস্পার, নয় ওস্পার ! চলুন, চলুন, এটা বেশ একটা দেখার মতো জিনিস হবে!

তখনই  ঠিক হল যে সদলবলে রঁদ্যার প্রদর্শনী দেখতে যাওয়া হবে। জগদীশ, অবলা এবং প্যাট্রিক গেডেসও চললেন। মিসেস লেগেট পথপ্রদর্শক। মনোরম গ্রীষ্মের সকাল। প্যারিস সূর্যালোকে বিধৌত। সীন নদী থেকে মন্দ মন্দ বাতাস বইছে। প্যাট্রিক গেডেসের কালো দাড়ি আন্দোলিত হচ্ছে সে হাওয়ায়। স্বামী বিবেকানন্দ পাশ্চাত্য সাজে অর্থাৎ কোটপ্যান্ট পরিহিত। এসব জায়গায় গেরুয়া পরলে বড্ড দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

বিবেকানন্দ আইসক্রিম খেতে ভালোবাসেন। এক জায়গায় সদলবলে আইসক্রিম কিনে খাওয়া হল।

সীন নদীর ধারেই র‍্যঁদার সুরম্য প্রদর্শনশালা। র‍্যঁদা ভেতরেই ছিলেন। মান্য অতিথিবর্গের আগমনে শশব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। বিশালদেহী পুরুষ। মুনি-ঋষিদের মতো দাড়িগোঁফ। সবাইকে ফরাসি কায়দায় বাও করলেন তিনি। করমর্দন করলেন প্রত্যেকের সঙ্গেতারপর স্বয়ং ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে শুরু করলেন তাঁর কাজ।

বড়ো বড়ো স্ট্যান্ডে স্থাপিত অনুপম সব ভাস্কর্য—দ্য বার্ঘার অফ ক্যালে, দ্য কিস, দ্য থিঙ্কার, দ্য প্রডিগ্যাল এবং অবশ্যই বালজাক

ওপরের শার্সি থেকে আলো এসে মূর্তিগুলোকে উদ্ভাসিত করে তুলেছে। সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলেন।

ব্রিলিয়ান্ট কাজ, মশাই, অসাধারণ! সপ্রশংস বিবেকানন্দ জগদীশের দিকে ফিরলেন, পনার কেমন লাগছে?

জগদীশচন্দ্র স্মিত মুখে নীরব রইলেন।

মার্গট, . বোসকে যদি একটা ফুলগাছসুদ্ধ মাটির টব দাও তাহলে উনি শুধু ফুলগাছ নয়, মাটির টবেরও রেসপন্স দেখিয়ে দেবেন কিন্তু এসব জায়গায় উনি মুখ খোলেন না! সহাস্যে বললেন বিবেকানন্দ

সবাই তখন দ্য থিঙ্কার-এর সামনে দাঁড়িয়ে। এক পেশল, বলিষ্ঠ, নগ্ন মানুষ বসে আছেন। গভীর চিন্তামগ্ন। থুতনি হাতের ওপর সন্নিবিষ্ট। প্রতিটি বিভঙ্গে পরিস্ফুট তাঁর মানসিক শক্তি।

দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ করে বিবেকানন্দ স্বগতোচ্চারণ করলেন, বা!

রদ্যাঁ সামনে এসে দাড়ি উঁচিয়ে ফরাসিতে কিছু বলতে লাগলেন। দোভাষীর কাজ করলেন মিসেস লেগেট।

রদ্যাঁ বলছেন যে, দ্য থিঙ্কার তাঁর অন্যতম প্রিয় কাজ। তবে ভারতীয় অতিথিদের ওনার খুব পছন্দ হয়েছে। স্বামীজি যদি চান তাহলে রদ্যাঁ সস্তায় দিয়ে দেবেন কাজটি!

তাঁর মতো ভিক্ষুক, পরিব্রাজক বিদেশি কিনবেন এই মহার্ঘ্য শিল্পবস্তু! দ্য থিঙ্কার-এর নীচে মুদ্রিত অর্থমূল্য আগেই দৃষ্টিগোচর হয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের। তিনি অট্টহাস্য করে জগদীশচন্দ্রের দিকে ফিরলেন, কী মশাই, কিনবেন না কি ? আপনি তো আমার থেকে ঢের বড়োলোক!

জগদীশচন্দ্রও দুলে দুলে হাসতে লাগলেন।

প্রদর্শনীতে আরও তিন বিশিষ্ট অতিথি এসেছেন। রদ্যাঁ এগিয়ে গেলেন তাঁদের অভ্যর্থনা করতে। একজন বিশাল লম্বা-চওড়া সুপুরুষ। মাথায় ঢেউখেলানো বাবরি চুল। কিন্তু মুখটা বিষাদ মাখাচোখের কোণে কালো কালির ছোপ—অস্কার ওয়াইল্ড!

দ্বিতীয় ব্যক্তি বামন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। মাথায় বাওলার হ্যাট। পরিধানে কালো কোট-প্যান্ট। হাতে লাঠি। মুখে হালকা দাড়িগোঁফ—তুলুজ লোত্রেক! লোত্রেক ঠিক প্রকৃতিস্থ নন। দিনের বেলাতেই নেশা করেছেন তিনিমুখ দিয়ে ভক ভক করে সস্তা ফরাসি মদের গন্ধ আসছে।

তৃতীয় জনও বিখ্যাত ব্যক্তি। ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত চিত্রশিল্পী—ক্লদ মোনে। 

রদ্যাঁ এবং মিসেস লেগেটের সহায়তায় বিশিষ্ট অতিথিবর্গ পরস্পর পরিচিত হলেন এবং ঘুরে ঘুরে প্রদর্শনী দেখতে লাগলেন। বিশাল আয়োজনছোটোবড়ো মিলিয়ে প্রায় দেড়শো ভাস্কর্য, কুড়িটার কাছাকাছি চিত্র এবং ড্রয়িং-এরও কিছু নমুনা।  

মোনে বললেন, গুস্ত, প্রদর্শনী তো ভালোই করেছ। বিক্রিবাট্টা কিছু হচ্ছে?

হ্যাঁ। ভালোই সাড়া মিলেছে। ফিলাডেলফিয়া, কোপেনহাগেন, হ্যামবুরগ, ড্রেসডেন, বুদাপেস্ট প্রভৃতি মিউজিয়াম প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। বেশ কিছু কাজ বায়নাও হয়ে গেছে

নিবেদিতা ও মিসেস লেগেট একটু পিছিয়ে গেছেন। তাঁদের সামনে হাঁটছেন বিষণ্ণবদন অস্কার ওয়াইল্ড। মিসেস লেগেট অস্কার ওয়াইল্ডকে দেখে মোটেও খুশি হননি। ফিস ফিস করে বললেন, ই হাড় হাভাতে শয়তানটা এখানে কেন?

কে? কী হয়েছে?

তুমি কাগজে কিছু পড়নি? কী বিচ্ছিরি নোংরা মামলা-মোকদ্দমা হয়েছিল লোকটাকে নিয়ে! জেল খেটে এসেছে! ব্রিটেন থেকে লাথি মেরে তাড়িয়েছে ওকে!

সমকামিতার অভিযোগে অভিযুক্ত এবং কারাদণ্ডভোগী অস্কার ওয়াইল্ড সত্যি সত্যিই ব্রিটেন থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। তাঁর কুখ্যাতি ফ্রান্সেও ছড়িয়েছে। আগের লাবণ্য আর নেই তাঁর। উধাও হয়ে গেছে তাঁর বাকবৈদগ্ধ্য যার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন তিনি। হতমান, লুপ্তগৌরব ওয়াইল্ড মাথা নীচু করে নীরবে হাঁটছেন। প্রদর্শশালার অনুপম সংগ্রহও খুব মন দিয়ে দেখছেন বলে মনে হয় না। তাঁর পাশে লাঠি ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অবিরাম ফরাসিতে বকে চলেছেন লোত্রেক। তাঁর মুখ থেকে বেরোনো মদের গন্ধ আবিল করে তুলছে পরিমণ্ডল।

উঃ! সক্কালবেলাতেই টেনে এসেছে! বললেন মিসেস লেগেট। ই আরেকটা মেয়েবাজ হতচ্ছাড়া শয়তান! গুণের ঘাট নেই! মোনেট তাও ভদ্রলোক। বাকি আর্টিস্টগুলো হয় মাতাল, নয় পাগল নয়তো নেশাখোর, মেয়েবাজ শয়তান ! এদের একটা তো মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করে মরেছে!

কে সে?

নামটা বোধ হয় গখ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভিন্সেন্ট ভ্যান গখ! মিসেস লেগেট বলে চললেন, মাতাল, পাগলটার ভাইটা আবার আর্ট ডিলার! ভিন্সেন্ট মরবার পর ওর একটা ছবি বিক্কিরির জন্য মি. লেগেটের কাছে এনেছিল। আমার স্বামী বলে বলছি না, মি. লেগেট এসব ব্যাপারে ভীষণ বুঝদার। এত ভালো ছবির সমঝদার খুব কম আছে। উনি তো এক কথায় হাঁকিয়ে দিলেন!

বিটা কী ছিল?

কী জানি, ভাই মিসেস লেগেট অবজ্ঞায় হাত উল্টোলেন। কটা ফুলের টবের ওপর কয়েকটা সূর্যমুখী ফুল। সান ফ্লাওয়ার। মি. লেগেট বললেন যে এত বাজে পেন্টিং উনি ওনার টয়লেট সাজাবার জন্যেও রাখবেন না

জগদীশচন্দ্র কিছুক্ষণ থেকেই অসুস্থ বোধ করছিলেন। পেটের ভেতরটা থেকে থেকে গুলিয়ে উঠছিল তাঁর। সেটার কারণ কী? সকালে খাওয়া সীন নদীর তীরের আইসক্রিম? নাকি লোত্রেকের মুখনিঃসৃত সস্তা ফরাসি মদের গন্ধ? নাকি সামনে এগিয়ে চলা মিসেস লেগেটের উচ্চমার্গীয় চিত্রকলা সমালোচনা?

হঠাৎ এক সুতীব্র বেদনা পেটের ভেতর থেকে ঠেলে উঠল তাঁর। মুখ দিয়ে হড় হড় করে বমি বেরিয়ে এল। প্রবল যন্ত্রণায় নীল বর্ণ মুখে তিনি কোনোক্রমে স্ত্রীকে বললেন, বলা! অবলা! আমায় ধরো! আমি পারছি না! আমি পারছি না!

 

বংশগত উপাধি বন্দ্যোপাধ্যায় পিতৃদত্ত নাম ভবানীচরণ জন্ম হুগলি জেলার খন্যান গ্রামে। পিতা হরচন্দ্র স্লিম্যান সাহেবের বিখ্যাত ঠগীদমন বিভাগে পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন। পুত্রেরও বীরত্বের প্রতি আকর্ষণ ছিল মজ্জাগত।

চুঁচুড়াতে সেসময় একদল ফিরিঙ্গি আর আর্মেনিয়ান ছোকরা গুন্ডামি শুরু করেছিল। গরীব গ্রামবাসীদের কাছ থেকে জিনিস কিনে দাম দেয় না। মেয়েরা গঙ্গাস্নান করতে গেলে পারে দাঁড়িয়ে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে।

ভবানীচরণ সদলে এই অশিষ্ট ফিরিঙ্গি তনয়দের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন। মার খেয়ে ছোকরারা ঘায়েল হলে ব্যাপারটা থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়াল। তবে শেষ পর্যন্ত আইন-আদালত হল না অভিভাবকরা নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নিলেন।

ভবানীচরণের কৈশোরেই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু প্রমুখ দেশাত্মবোধিরা নতুন আন্দোলন শুরু করেছেন। তাঁদের গরম গরম লেকচারে দেশ মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে। ভবানীচরণও মেতে গেলেন। এই সময়ই তিন-তিনবার তিনি বাড়ি ছেড়ে পালালেনপরাধীন ব্রিটিশ ভারতে বাঙালির যুদ্ধবিদ্যা শেখার সুযোগ নেই। ভবানীচরণ ভাবলেন যে, তিনি দেশীয় রাজ্যে গিয়ে সৈনিক হবেন, শিখবেন যুদ্ধবিদ্যা। তারপর মেরে ফিরিঙ্গিদের দেশছাড়া করবেন। নানা কারণে তাঁর দেশোদ্ধারের এই স্বপ্ন সফল হল না। পুলিশ বিভাগের কর্মচারী হরচন্দ্রের ভারতের নানা জায়গায় যোগাযোগ ছিল। সেই সূত্রেই বার বার ধরা পড়ে গেলেন ভবানীচরণ কলকাতায় ফিরতে হল তাঁকেমেট্রোপলিটান কলেজে পড়লেন কিছুদিনসেখানে শিক্ষক হিসেবে পেলেন সুরেন বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এই সময়ই বন্ধু হিসেবে পেয়েছেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত তথা উত্তরকালের স্বামী বিবেকানন্দকে।  দুজনে একসঙ্গে ব্রাহ্ম সমাজে যাতায়াত করেছেন। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর রামকৃষ্ণ সন্দর্শনে গেছেন বেশ কয়েকবার। এদিকে কেশবচন্দ্র সেনেরও প্রবল প্রভাব পড়েছে তাঁর ওপর। কেশবচন্দ্র প্রবর্তিত বাইবেল ক্লাসে যোগ দিচ্ছেন। পরবর্তী কালে প্রকটিত খ্রিস্টভক্তির বীজও এই সময়েই প্রোথিত হচ্ছে তাঁর মনে। কেশবচন্দ্রের মৃত্যুর তিন বছর পরে ১৮৮৭ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্রাহ্মধর্মে  দীক্ষা নিয়ে সিন্ধু প্রদেশে রওনা হলেন ভবানীচরণউদ্দেশ্য শিক্ষকতা ও ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচার।

ব্রহ্মচারী, নিরামিষাশী, সংস্কৃতে পারঙ্গম ভবানীচরণ সিন্ধু প্রদেশেও বিখ্যাত হয়ে পড়লেন। বয়স তখন তাঁর ত্রিশও পেরোয়নি। কিন্তু এক অশান্ত আত্মিক অভিযাত্রার বশে ক্রমশই ঢলে পড়তে লাগলেন খ্রিস্টধর্মের দিকে। মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য যিশুর দেহধারণ এক অসাধারণ মহিমাময় আত্মত্যাগ বলে বিবেচিত হল তাঁর কাছে।  অবশেষে ১৮৯১ সালে করাচিতে জেসুইট ফাদার থিওফিলাস পেরিগ ভবানীচরণকে ক্যাথলিক মতে দীক্ষা দিলেন। দীক্ষান্তে তাঁর নাম দেওয়া হল থিওফিলাস—অর্থ ব্রহ্মবন্ধু।

খ্রিস্টান হবার পর ভবানীচরণের ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়াল ভারতকে কীভাবে খ্রিস্টীয় মতে আনা যায়। চলল অবিশ্রান্ত লেখা, বক্তৃতা, তর্কযুদ্ধ। এর মধ্যেই  ১৮৯৪ সালে করাচি থেকে প্রকাশিত হল সোফিয়া পত্রিকাক্যাথলিক কাগজ হলেও যার উদ্দেশ্য অন্যান্য ধর্ম, বিশেষত বেদ, উপনিষদ, পুরাণের তত্ত্ব নিরপেক্ষভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরা। অবশ্য সোফিয়া-র পাতায় অন্য ধর্মের কাউকে রেয়াত করলেন না ব্রহ্মবান্ধব। শিকাগো বক্তৃতার পর স্বামী বিবেকানন্দ তখন বিশ্ববিখ্যাত হয়ে পড়েছেন। বিবেকানন্দ, ব্রাহ্মসমাজ, থিয়সফিস্ট—সব ধর্মমতেরই সুতীব্র সমালোচনা ব্রহ্মবান্ধবের ঝাঁঝালো, জোরালো কলম থেকে বেরিয়ে এল।

তবে বিবেকানন্দের মতামতের একটা পরোক্ষ প্রভাব ব্রহ্মবান্ধবের ওপর ঠিকই পড়ছিল। তাঁর চিন্তাধারায় সহসা এক দিক পরিবর্তন এল। সোফিয়া-র পাতায় Are We Hindus নামধারী এক অত্যন্ত বিতর্কিত প্রবন্ধ লিখলেন ব্রহ্মবান্ধব। তাঁর বক্তব্য, তিনি হিন্দু হয়ে জন্মেছেন, আমৃত্যু হিন্দুই থাকবেন।  কারণ কোনো বিশেষ তত্ত্বে বিশ্বাসের ওপর হিন্দুত্ব নির্ভর করে না। কপিল ও ব্যাসের মতো পরস্পরবিরোধী হলেও উভয়েই ঋষি বলে পরিগণিত। দৈহিক ও মানসিক গঠনে ব্রহ্মবান্ধব হিন্দু, কিন্তু অমর আত্মার ক্ষেত্রে তিনি ক্যাথলিক—তিনি হিন্দু ক্যাথলিক।

শুধু তাই নয়, ব্রহ্মবান্ধবের মতে, আবহমান কাল ধরে ভারতে ধর্মপ্রচারের যে পন্থা অনুসৃত হয়েছে, খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের সেই পথই ধরতে হবে। চার্চের বদলে মঠ স্থাপন করতে হবে, গেরুয়া পরতে হবে, জীবনযাপন করতে হবে সন্ন্যাসী-ফকিরদের মতোতাহলে, একমাত্র, তাহলেই ভারতের মাটিতে খ্রিস্টধর্ম দৃঢ় শিকড় গাড়বে।

যেমন কথা, তেমন কাজ জব্বলপুরের কাছে নর্মদা নদীতীরে একটা ক্যাথলিক মঠ তৈরির চেষ্টাও করলেন ব্রহ্মবান্ধব নাম দিলেন কাস্থলিক মঠ তবে সে প্রচেষ্টা সফল হল না

বলা বাহুল্য, ভারতে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের হোমরা চোমরারা ব্রহ্মবান্ধবের এই বৈপ্লবিক মতামত ও কাজকর্মে চটে আগুন হলেন। ডেলিগেট অ্যাপস্টলিক মাইকেল জ্যালেস্কি তখন ভারতের ক্যাথলিক চার্চের সর্বময় কর্তা। তিনি সোফিয়া পত্রিকা তথা সম্পাদক ব্রহ্মবান্ধবের ওপর খড়্গহস্ত হলেন। ততদিনে অবশ্য ব্রহ্মবান্ধব করাচির পাট গুটিয়ে কলকাতায় চলে এসেছেন। আস্তানা গেড়েছেন তাঁর বাল্যবন্ধু কার্তিক নানের বেথুন রোর বাসায়। মাসিক সোফিয়া প্রকাশিত হচ্ছে সেখান থেকে। শুধু তাই নয়, সেই বাড়িতে ছোটোখাটো একটা স্কুলও খুলে বসেছেন তিনিকার্তিক নানের ছেলে সুধীর স্বয়ং ছাত্র সেখানে দু-জন অনুগত সিন্ধী ভক্ত এসেছেন তাঁর সঙ্গে। খেমচাঁদ ও রেবাচাঁদ। খেমচাঁদ সোফিয়া প্রকাশনার দায়িত্বে আছেন। রেবাচাঁদ স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।

কার্তিক নানের বেথুন রোয়ের বাড়ির সামনে শারদ সকালে একটা জুড়িগাড়ি এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নামলেন অত্যন্ত রূপবান, বছর চল্লিশের এক ব্যক্তি। দীর্ঘকায়, শ্মশ্রু-গুম্ফশোভিত গৌরবর্ণ পুরুষ। পরনে ঢাকাই ধুতি আর আদ্দির পাঞ্জাবি।  

গেরুয়াধারী ব্রহ্মবান্ধব দোতলার বারান্দায় বাঘছালের ওপর বসেছিলেন। স্কুলের এক ছাত্র দৌড়ে গিয়ে খবর দিল, গুরুজি, একজন খুব সুন্দর দেখতে লোক আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে। রাজা-মহারাজা কেউ হবে

নাম কী?

নাম বলছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ব্রহ্মবান্ধব ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, যা, যাও! এখুনি ওপরে নিয়ে এসোসুধীর, একটা চেয়ার দে, বাবা

রবীন্দ্রনাথ দোতলার বারান্দায় উঠে এলে খুব খাতির করে বসানো হল তাঁকে। রবীন্দ্রনাথের হাতে সোফিয়া পত্রিকার সেই সংখ্যা যাতে তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন ব্রহ্মবান্ধব। কবিকে শিগগিরি এলাহাবাদ যেতে হবে বলেন্দ্রপত্নী সাহানাকে ফেরত নিয়ে আসার জন্য। তার আগেই তিনি খুঁজে খুঁজে ব্রহ্মবান্ধবের কাছে চলে এসেছেন।

কবি ও সন্ন্যাসী পরস্পরের দিকে অপলক বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। ভারতীয় সন্ন্যাসী বলতে ক্ষীণতনু, ভিক্ষাজীবী যে রূপ ভেসে ওঠে, ব্রহ্মবান্ধবের আকৃতি সেরকম নয়।  পেশল, বলিষ্ঠ দেহ। কঠিন, দৃঢ়তাব্যঞ্জক চোয়াল। কুস্তিগির, কুস্তিগির চেহারা।

ব্রহ্মবান্ধবও একদৃষ্টে পরম রূপবান সেই আগন্তুকের দিকে চেয়ে রইলেন। রবীন্দ্রনাথ একটু লজ্জা পেলেন। তাঁর স্মরণে এল যে, সোফিয়া-য় প্রকাশিত প্রবন্ধে তাঁর দৈহিক সৌন্দর্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন ব্রহ্মবান্ধব।

ব্রহ্মবান্ধব অবশ্য সে প্রসঙ্গে গেলেন না। সুধীরকে অতিথির জন্য চা আনতে আদেশ দিয়ে বললেন, পনি তো একষট্টির ব্যাচ?

কষট্টির ব্যাচ?

ঠেরশো একষট্টিতে তো জন্ম আপনার? আমারও তাই। নিন, হাত মেলান

উভয়ে করমর্দন করলেন।

রবীন্দ্রনাথ বললেন, মাদের ব্যাচে আর দুজন আছে

কে কে?

কেন বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায় আর ডাক্তার নীলরতন সরকার

তাহলে তো আমাদের জুয়েল ব্যাচ মশাই ! নরেন বোধহয় আমাদের থেকে দু-ব্যাচ জুনিয়র

রেন?

হ্যাঁ, স্বামী বিবেকানন্দ। ও তো স্টুডেন্ট লাইফে আমার বিশেষ বন্ধু ছিল। ওর সাথে ব্রাহ্মসমাজে গেছি বহুবার। আপনাকেও দেখেছি দূর থেকে। কাছে ঘেঁষার সাহস হত না, মশাই। আপনাদের ঠাকুরবাড়ির সবাইকে কী সুন্দর দেখতে! আপনার এক ভাইঝিকে মনে পড়ছেপরীর মতো রূপ 

বিবি? ইন্দিরা? ওর তো বিয়ে হয়ে গেল এই সে দিন

বিয়ে হয়ে গেল! ব্রহ্মবান্ধব কপট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বিবাবু জামাই হওয়া আমার ভাগ্যে নেই। পাতানো সম্পর্কেও কেউ আমায় জামাই বলে ডাকেনি! তাই এক একটা সুন্দরী মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় আর আমি সন্ন্যাসী মানুষ বসে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলি!

রবীন্দ্রনাথ স্মিত হাসলেনএমনিতে লাজুক প্রকৃতির মানুষ তিনি। লোকের সাথে বরাবরই একটা দূরত্ব থেকে যায়। ব্রহ্মবান্ধবের সহজ ব্যবহারে তাঁর সঙ্কোচ কেটে যাচ্ছে। বললেন, পনার সোফিয়া- প্রবন্ধ পড়ে বড় ভালো লাগল। ধন্যবাদতবে আপনি বোধহয় একটু বেশি প্রশংসা করে ফেলেছেন। অতটার যোগ্য আমি নই

ধু, মশাই! ফালতু বিনয় করছেন! যা লিখেছি, ঠিক লিখেছিএই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যে আপনি যা লিখছেন তা বিশ্বের পাতে দেবার যোগ্য। ইংল্যান্ডে কে কবি আছে এখন? কিপলিং? ফুঃ! ওটা একটা কবি হল?

ঘোর সাম্রাজ্যবাদী কবি রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের এখন খুব নামডাককিন্তু রবীন্দ্রনাথ আদৌ পছন্দ করেন না তাঁকে। তিনি উদ্দীপ্ত হয়ে বললেন, ত্যি! আগে ছিল ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলি, বায়রন, কিটস, টেনিসন, ব্রাউনিং! আর এখন? সব গিয়ে এসে ঠেকেছে কিপলিংয়ে! কী অধঃপতন!

বেই তো, মশাই সাম্রাজ্য, সাম্রাজ্য করে ইংরেজ জাতটা অধঃপাতে যাচ্ছে। একটা জাতের ভেতরে ভেতরে যদি পচন ধরে যায় তাহলে ভালো কাব্য, ভালো সাহিত্য আসবে কোত্থেকে? বুয়র যুদ্ধে ব্যাটারা কী কাণ্ড করছে, দেখছেন?

রবীন্দ্রনাথ মাথা নেড়ে সায় দিলেন। বুয়র যুদ্ধে সত্যি সত্যিই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন রূপ চোখে পড়ছে। লর্ড রবার্টস আসার পর উনিশশো সালের জুন মাসের মধ্যে প্রধান প্রধান নগরগুলো অধিকৃত হয়েছিল। বুয়র নেতারা পলাতক। লর্ড রবার্টস সে সময় হাসি হাসি মুখে বলেছিলেন, মিশন অ্যাকমপ্লিশড! ব্যাপারটা অবশ্য অত সহজে মেটেনি। সম্মুখ যুদ্ধে পরাভূত, স্বাধীনতাপ্রিয় বুয়ররা গেরিলা যুদ্ধের পথ ধরেছে। ইংরেজদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছেইংরেজরাও  ছাড়ার পাত্র নয়।  রবার্টস ও কিচেনারের জল্লাদ বাহিনী বুয়রদের ক্ষেতখামার জ্বালিয়ে দিচ্ছে, হাজার হাজার অসহায় বৃদ্ধ, নারী, শিশুকে বন্দি করছে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের খোঁয়াড়ে। মারা যাচ্ছে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ। সেই বীভৎস অত্যাচারের বিবরণ সংবাদপত্রবাহিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দিগ্বিদিক।

ব্রহ্মবান্ধব বললেন, চিনেই বা ব্যাটারা কী করছে? বক্সার আন্দোলনের কথা পড়েছেন? এত সুসভ্য প্রাচীন জাতের সঙ্গে কী অসভ্যতাই না ব্যাটারা করছে!

রবীন্দ্রনাথ বললেন, রাই আবার সভ্যতার বড়াই করে! এদের এখনকার নীতির সঙ্গে যিশু খ্রিস্টের প্রেমধর্মকে এরা মেলায় কী করে?

ঠি, রবিবাবু, ঠিক! এখনকার শিষ্যদের কার্যকলাপ দেখলে প্রভু যিশু আবার স্বেচ্ছায় ক্রুশে চরতেন। বলতেন, প্রভু! এরা জানে না এরা কী করছে! জানেন রবিবাবু, এরা আমার পেছনেও লেগেছে!

তাই নাকি?

হ্যাঁআমি নাকি ক্যাথলিক ধর্মের অপব্যাখ্যা করছি। তবে আসল কারণটা  অন্যজ্যালেস্কি তো ব্যাপারটা ভেঙে বলবে না!  

জ্যালেস্কি?

হ্যাঁ। মাইকেল জ্যালেস্কি, ডেলিগেট অ্যাপোস্টলিক। ভারতের ক্যাথলিক চার্চের সর্বময় কর্তা হল ও-ই। ওই তো হাত ধুয়ে  আমার আর সোফিয়া-র পেছনে লেগে গেছে

কে?

মি মশাই সোজাসাপ্টা লোক। রেখে ঢেকে মন জোগানো কথা লিখতে পারি না। বুয়র বা বক্সার যুদ্ধটা খ্রিস্টানজনোচিত কিছু হচ্ছে না। বিশেষ করে চিনে মিশনারিরা যে ধরণের আচরণ করছে আমি তার ঘোরতর বিরোধী। এ বিষয়ে বেশ কিছু সমালোচনামূলক লেখা আমি সোফিয়া-য় ছাপিয়েছি। তা ছাড়া ক্যাথলিক ধর্মের কিছু নতুন ব্যাখ্যাও দিয়েছি। এতেই ব্যাটা জ্যালেস্কির গায়ে জ্বালা ধরে গেছে। ও ফতোয়া দিয়েছে যেক্যাথলিকরা সোফিয়া পড়তে পারবে না। দেখিকতদিন সোফিয়া বের করতে পারি। জ্যালেস্কিটা জ্বালিয়ে খেল মশাই

রবীন্দ্রনাথ চুপ করে রইলেন, সোফিয়া বন্ধ হয়ে যাবে? এত ভালো পত্রিকাটা!

ব্রহ্মবান্ধব বোধহয় আঁচ করলেন কবি কী ভাবছেন, বিবাবু, আমি হাল ছাড়ার পাত্তর নই ফাদার মারচাল হল গে কলকাতার অস্থায়ী আর্চবিশপ ও লোকটা খারাপ নয় আমাদের প্রতি সহানুভূতিও আছে দেখি কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়!

ঘণ্টা বেজে স্কুলের ছুটি হয়ে গেছে ছাত্ররা একে একে ব্যঘ্রচর্মে আসীন ব্রহ্মবান্ধবকে প্রণাম করে বিদায় নিচ্ছে। তাদের দিকে তাকিয়ে ব্রহ্মবান্ধব বললেন, নানা ঝামেলায় মন যখন বিষিয়ে যায়, রবিবাবু, যখন শ্রান্ত, বিষণ্ণ হয়ে পড়ি, তখন এই বাচ্চাগুলোর দিকে তাকালে মন আমার ভরে যায়। এরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ, রবিবাবু, এরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ। যদি এদের ঠিকঠাক মানুষ করে তোলা যায়?

গেরুয়াধারী, মুণ্ডিত মস্তক এক তরুণ সন্ন্যাসী এতক্ষণ ছাত্রদের পড়াচ্ছিলেন। তিনি এসে ব্রহ্মবান্ধবকে প্রণাম করলেন। 

ব্রহ্মবান্ধব বললেন, লাপ করিয়ে দিই। রবিবাবু এ হল রেবাচাঁদপুরো নাম রেবাচাঁদ, জ্ঞানচাঁদ মখিজানি। সিন্ধুপ্রদেশে এ আমার শিষ্য হয়েছে। ভাল পড়ায়। খুব ভালো ছেলে

রেবাচাঁদ, যাকে দেখছ তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এনার সমকক্ষ কবি এখন সারা দুনিয়ায় কেউ নেইপ্রণাম করো 

রেবাচাঁদ প্রণাম করলেন।

পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলেন রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মবান্ধববাবু, আপনার সাথে তো কাব্যালোচনাই হল না! এই কবিতাটা  সদ্য লেখা। আপনার পড়ার জন্য এনেছি

সাগ্রহে হাত পেতে কাগজটা নিলেন ব্রহ্মবান্ধব, ই হয়েছে মুশকিল মশাইবৈষয়িক আর রাজনীতির আলোচনা করতে গিয়ে সত্যিকারের ভালো কাজ যেমন কাব্যপাঠের সময় থাকে না। কী কবিতা এটা?

কটা সনেট। আজকাল প্রতিদিন একটা করে সনেট লিখে ঈশ্বরকে নিবেদন করি। বই হিসেবে ছাপালে নাম দেব ভাবছি নৈবেদ্য 

বা! ব্রহ্মবান্ধব উদাত্ত কণ্ঠে পড়তে শুরু করলেন:

হে  সকল ঈশ্বরের পরম ঈশ্বর,

তপোবন তরুচ্ছায়ে মেঘমন্দ্র স্বর

ঘোষণা করিয়াছিল সবার উপরে

অগ্নিতে, জলেতে, এই বিশ্ব চরাচরে,

বনস্পতি, ওষধিতে এক দেবতার

অখণ্ড, অক্ষয় ঐক্য ! সে বাক্য উদার

এই ভারতেরি ! যাঁরা সবল স্বাধীন

নির্ভয়, সরলপ্রাণ বন্ধন বিহীন,

সদর্পে ফিরিয়াছেন বীর্য্যজ্যোতিষ্মান

লঙ্ঘিয়া অরণ্য, নদী, পর্বত, পাষাণ

তাঁরা এক মহান বিপুল সত্যপথে

তোমারে লভিয়াছেন নিখিল জগতে,

কোনোখানে না মানিয়া আত্মার নিষেধ

সবলে সমস্ত বিশ্ব করেছেন ভেদ !

পূর্ব, রবিবাবু, পারফেক্ট! অসাধারণ লিখেছেন!

বিদায় নেবার সময় এসেছে। কার্তিক নানের বাড়ির দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত ব্রহ্মবান্ধব রবীন্দ্রনাথকে এগিয়ে দিতে এলেন। বললেন, সুন্দর লিখেছেন, রবিবাবু—তপোবন তরুচ্ছায়ে মেঘমন্দ্র স্বর আচ্ছা আজকের যুগে, সেদিনকার মতো, সে যুগের মতো তপোবন তৈরি করা যায় নাযেখানে গুরুগৃহে থেকে শিষ্যরা শিক্ষালাভ করবে? 

রবীন্দ্রনাথ একদৃষ্টে ব্রহ্মবান্ধবের দিকে চেয়ে রইলেন।

ব্রহ্মবান্ধব বলে চললেন, বিবাবু আমার ঘর নেই, পুত্র-কলত্র কেউ নেই। ভেবেছিলাম নর্মদার তীরে একটা আশ্রম তৈরি করে সেই নিভৃত স্থানে ধ্যান-ধারণায় জীবন কাটিয়ে দেব। কিন্তু তাও, মশাই, হল কই?

একটা ছোটো মেয়ে পায়ে পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে ব্রহ্মবান্ধবের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে অবাক চোখে রবীন্দ্রনাথের দিকে চাইছে ব্রহ্মবান্ধব আদর করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, বিবাবু, এ হল অ্যাগনেস, আমার আর এক শিষ্য ক্ষেমচাঁদের মেয়ে, বড়ো ভালো মেয়ে

(ক্রমশ…)

 
 
top