নতুন আলো

 

পর্ব ১৬

রবীন্দ্রনাথ অতিথিবৎসল হলেও সবসময় যে মানুষজন পছন্দ করেন, তা নয় শিলাইদহের নির্জনতার মধ্যে কবি এক অখণ্ড সম্পূর্ণতা খুঁজে পেয়েছেন সেই ক্ষুদ্র নির্জনতা হল তাঁর মনের ওয়ার্কশপ সেখানে নানাবিধ অদৃশ্য যন্ত্রতন্ত্র এবং সমাপ্ত, অসমাপ্ত কাজ চারদিকে ছড়িয়ে আছে এই নির্জন রাজ্যে তাঁর শরীরের থেকেও তাঁর মন অনেক বেশি জায়গা দখল করে রয়েছে

সেখানে অবাঞ্ছিত অতিথির পদার্পণ অনেকসময়ই হানিকর তাদের পদতারণায় কবির অবসরের তাঁতে চড়ানো অনেক সাধনার সূত্র পট পট করে ছিঁড়তে থাকে। অতিথিকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে কবি যখন আবার কর্মশালায় প্রবেশ করেন তখন অনুভব করেন যে, কী লোকসান তাঁর হয়েছে।

আবার এটাও ঠিক যে, প্রকৃত ভাবুক, চিন্তাশীল এবং মননশীল সান্নিধ্যের জন্যও রবীন্দ্রনাথ নিরন্তর তৃষিত।

জার্মান মহাকবি গ্যেটের জীবনী পাঠ করতে করতে এ কথা বারবার মনে হয় তাঁর। ভাইমার রাজসভার কবি ছিলেন গ্যেটে সেখানে সাহিত্যের জীবন্ত আদর ছিল। জার্মানিতে সে সময় একটা ভাবের মন্থন শুরু হয়েছিল। হার্ডার, শ্লেগেল, হুম্বোল্ট, শিলার, কান্ট প্রভৃতি বড়ো বড়ো ভাবুক, চিন্তাবিদরা দেশের চারদিকে জেগে উঠছিলেন। সে-সময় মানুষের সংসর্গ এবং দেশব্যাপী ভাবের আন্দোলন প্রাণপ্রাচুর্যে পরিপূর্ণ ছিল।

কবি বাংলাদেশে মানুষের ভেতরে সেই প্রাণের অভাব মনে মনে অনুভব করেন। তাঁর পরিচিতদের মধ্যে খুব কম লোকই অনুভব করতে পারে, চিন্তা করতে পারে এবং তদনুযায়ী কাজ করতে পারে। হয়তো ইংরেজি সাহিত্য কিছুটা তারা পড়েছে, কিন্তু তাদের অস্থি-মজ্জার মধ্যে সে ভাব প্রবেশ করেনি। কোনো ভাবের খিদে জন্মায়নি। জড় শরীরের মধ্যে তৈরি হয়নি কোনো মানস শরীরঅবশ্য মুখের কথায় তা বোঝার উপায় নেই। বাঙালিসুলভ চতুরতায় এরা সমস্ত বোলচাল ইংরেজি থেকে রপ্ত করে নিয়েছে

সমধর্মী শিলারকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন গ্যেটে। সেরকম একজন খাঁটি ভাবুকের প্রাণসঞ্চারক সঙ্গের জন্য রবীন্দ্রনাথ তৃষিতভাবে প্রত্যাশীকবির জীবনের মূল সফলতা তাঁর গানে, কবিতায়, ছোটোগল্পে। সেখানে একটা মনুষ্যসঙ্গের উত্তাপ তাঁর প্রয়োজন, যাতে তাঁর সৃষ্টির ফুলে, ফলে, ফসলে যথেষ্ট বর্ণ, গন্ধ ও রস সঞ্চারিত হয়।

অবশ্য গত দু-তিন বছর বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। জগদীশচন্দ্রের নিজের চমৎকার শিল্পী মন আছে। আছে অসাধারণ বাংলা ভাষার ওপর দখল। বস্তুত, সম্প্রতি নিরুদ্দেশের কাহিনী নামে তাঁর একটি ছোটোগল্প প্রকাশিত এবং পুরস্কৃত হয়েছে । বাংলা ভাষার প্রথম কল্প-বিজ্ঞান কাহিনি বলা যেতে পারে এটিকে।

নবলব্ধ বন্ধুর মধ্যে এক সহজ ঐশ্বর্য দেখতে পান কবি। অধিকাংশ মানুষই নিভে থাকা মাটির প্রদীপের মতোনিজের কোনো আলো নেই। সেই স্বকীয় আলো জগদীশচন্দ্রের মধ্যে দেখতে পান রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সান্নিধ্যে উপভোগ করেন এক সমধর্মা প্রতিভার সঙ্গ।

জগদীশচন্দ্র বলেন, বিবাবু, আমরা যখন বিজ্ঞানের ইতিহাস পড়ি, তখন নানা দেশের মনস্বীর নাম মুখস্ত বলে যাই। সেখানে ভারতবাসীর স্থান কোথায়? অন্যে যা বলেছে, তাই তো আমরা তোতাপাখির মতো আবৃত্তি করে যাচ্ছি। কবে আমরা নিজেদের কথা বলব?

রবীন্দ্রনাথ বলেন, টা কি মনে হয় না, জগদীশবাবু যে, ভারতবাসী ভাবপ্রবণ এবং স্বপ্নাবিষ্টএক্সপেরিমেন্টাল রিসার্চ আমাদের দিয়ে হবে না?

হায়, হায়, রবিবাবু! আপনিও শেষে এই কথা বলছেন? এই শুনতে শুনতে কান তো পচে গেল!

কিন্তু বিলেতের মতো আমাদের ল্যাবরেটরি কোথায়? সুক্ষ্ম যন্ত্র নির্মাণের শক্তি কোথায়?

বিবাবু, যে ব্যক্তি পৌরুষ হারিয়েছে, সেই বৃথা পরিতাপ করে। অবসাদ দূর করতে হবে। দুর্বলতা ত্যাগ করতে হবে। সহজ পন্থা আমাদের জন্যে নয়, রবিবাবু। সহজ পন্থা আমাদের জন্য নয়

রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে জগদীশের দিকে চেয়ে থাকেনজগদীশের বক্তব্যে তাঁরই চিন্তার প্রতিধ্বনি।

দুই বন্ধু এখন পদ্মায় বোটে ভ্রমণরত। দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের পর বেলা সাড়ে চারটের সময় বোটে উঠেছেন দুজনেডেকে চড়ে হাওয়া খাচ্ছেন। মৃণালিনী ও অবলা আসেননি। তাঁরা শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে গল্পে মত্ত।

বোটের মাঝি গফুর মিঞা এসে কুর্ণিশ করল, ত্তামশাই, হাওয়া উঠেছেপাল তুলে দিই?

দে গফুর

পাল তুলে দেওয়া হল। দু-দিকের ঢেউ কেটে কল কল শব্দে বোট সগর্বে চলতে লাগল। কবি ও বিজ্ঞানী বাইরে চৌকি টেনে পাশাপাশি বসলেন। নিবিড় নীল মেঘের অন্তরালে অর্ধনিমগ্ন জনশূন্য চর দেখা যাচ্ছে। পরিপূর্ণ, দিগন্তপ্রসারিত নদীর ওপর সূর্যাস্ত হচ্ছে। আকাশের অতি দূর প্রান্তে পদ্মার জলরেখার ওপর মেঘের নীচে রচিত হয়েছে এক সোনালি স্বর্ণপট। সেখানে সারি সারি লম্বা, কৃশ গাছগুলোর মাথা নীল হয়ে রয়েছে

মুগ্ধ জগদীশচন্দ্র বললেন, বা! আপনার দেশ আর কলকাতার মধ্যে কত তফাত, রবিবাবু!

রবীন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন না। নীরবে স্মিত হাসলেন।

পাল ফুলে উঠেছে। চারপাশে পদ্মার ফেনিল জল নৃত্য করছে।

বন্ধুর দিকে তাকালেন কবি, গদীশবাবু, ইন্দ্রের যেমন ঐরাবত, আমার তেমনি পদ্মা । এখানে এলে কীরকম যেন প্রকৃতির রাজা বলে মনে হয় নিজেকে

জগদীশচন্দ্র বিড় বিড় করে আবৃত্তি করছেন:

তার পরে কভু উঠিয়াছে মেঘ, কখনো রবি –

কখনো ক্ষুব্ধ সাগর, কখনো শান্ত ছবি ।

বেলা বহে যায়, পালে লাগে বায়

সোনার তরণী কোথা চলে যায়,

পশ্চিমে হেরি নামিছে তপন অস্তাচলে।

মাদের এই নিরুদ্দেশ যাত্রা কেমন লাগছে, জগদীশবাবু?

দারুণ! দারুণ! অনবদ্য!

মি আকাশ আর আলো এত ভালোবাসি!

পনার নামেই তো রবি!

গ্যেটে মরবার আগে বলেছিলেন, লাইট! মোর লাইট ! মরবার আগে আমি কী বলব জানেন?

কী?

লব মোর লাইট অ্যান্ড মোর স্পেস! আরও আলো, আরও আলো, মোর নয়নে প্রভু ঢালো!

পনিই তো লিখেছেন—

শূন্য ব্যোম অপরিমাণ,

মদ্যসম করিব পান

মুক্ত করি রুদ্ধ প্রাণ

ঊর্দ্ধ নীলাকাশে

কাশ, আলো আর জল! দেখুন, জগদীশবাবু, দেখুন! সন্ধ্যার শান্তি নামছে। আকাশ একটা নীলকান্ত মণির পেয়ালার মতো ভরে উঠছে!

কবি ও বিজ্ঞানীর সৌন্দর্যসম্ভোগে অবশ্য একটু বাধা পড়ল । হলদে কোমরবন্ধ পরা স্নিগ্ধ নীল রঙের মস্ত একটা ভ্রমর দেখা দিয়েছেবোটের চারদিকে গুঞ্জন ধ্বনি সহকারে চঞ্চল পাখনায় উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের দিকে সেটা বোঁ করে ধেয়ে এল।

ভ্রমরটা অবশ্য থাকল না বেশিক্ষণ। লোকান্তরের কোনো অস্থির, অতৃপ্ত প্রেতাত্মার মতো বোটের আরোহীদের কয়েকবার প্রদক্ষিণ করে সে চলে গেল।

অন্ধকার নেমে আসছেকবিদের বোটের পাশ দিয়ে একটা লম্বা নৌকা যাচ্ছে। অনেকগুলো ছোকরা ঝপ ঝপ করে দাঁড় ফেলছে। তালে তালে গানও গাইছে তারা:

ভ্রমরা, নিশীথে যাইয়ো ফুলবনে।

জ্বালাইয়া দিলের বাতি,

আমি জেগে রব সারা রাতি গো,

আমি কব কথা শিশিরের সনে।

সেই সংগীতমুখর তরণী ঝপঝপ দাঁড়ের শব্দে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বোধহয় কবিদের বোটের ভ্রমরটাকে সঙ্গে করে নিয়েই গেল।

জগদীশ বললেন, বা! আপনাদের এখানকার এই লোকগীতিগুলো তো চমৎকার, রবিবাবু!

হ্যাঁ, অসাধারণ সুন্দর। এগুলো থেকে আমি আমার গানের সুরের অনেক ইন্সপিরেশন পাই, জগদীশবাবু

পনার জল বেশি ভাল লাগে না পাহাড়?

, জগদীশবাবু, জল! পাহাড় আমার মোটেও ভাল লাগে না! কেমন যেন চেপে ধরে! পুরীতে যেবার সমুদ্রতীরে প্রথম গেলামএকদিকে ধূসর বালি ধূ ধূ করছে। অন্যদিকে গাঢ় নীল সমুদ্রপাণ্ডু নীল আকাশ দিগন্ত পর্যন্ত প্রসারিতসেদিন কী ভাল যে লেগেছিল তা কেমন করে বোঝাই?

শুনছি যে, আপনি নাকি পুরীর সমুদ্রতীরে একটা বাড়ি কিনেছেন?

ঠি! আপনি কিনবেন নাকি, জগদীশবাবু? পাশে জায়গা ফাঁকা আছে। আমরা তাহলে দুই বন্ধু আমাদের অবসর জীবন সেই গৃহহারা তরঙ্গের গর্জন শুনে কাটিয়ে দেব

শুনেই লোভ হচ্ছে। নির্বাসিত ভিক্টর হ্যুগো কী বলতেন মনে আছে?

হ্যাঁ। সমুদ্র আর শেক্সপিয়র! এই দুই নিয়ে তিনি দিব্যি তাঁর নির্বাসিত প্রবাস কাটাবেন

কবিদের সামনে একটা তৃণশূন্য বালির চর ধূ ধূ করছে।

রবীন্দ্রনাথ বললেন, জ পূর্ণিমা! বালির চরে জ্যোৎস্নায় বেরোবেন নাকি?

লুন, চলুন! নতুন একটা অভিজ্ঞতা হবে

ফুর, চরে বোট লাগা

সে কী, কত্তা? এই অন্ধকারে? অজানা, অচেনা জায়গা! সাপখোপ?

মেলা বকিস না, গফুর। যা বলছি তাই করএমন পূর্ণিমার জ্যোৎস্না আমি মাঠে মারা যেতে দিচ্ছি না!

গফুর দ্বিরুক্তি করল না। তার খেয়ালি, প্রতিভাবান মনিবটিকে সে ভালোই চেনে।

রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশ ছোট্ট জলিবোটে উঠলেন। রবীন্দ্রনাথই দাঁড় বাইছেন। পেশল বাহুর আন্দোলনে জলিবোট ছপ ছপ করতে করতে পারে গিয়ে ঠেকল।

সাবধানে নামুন, বললেন কবি, দিকটা বেশ কাদা আর পেছল

জগদীশ ধুতিটা মালকোঁচা মেরে হাঁটুর ওপরে পরেছেন। রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে সাবধানে নামলেন তিনি।

নরম কাদায় পা ডুবে গেল।

দু-একটা কাদাখোঁচা পাখি ল্যাজ নাচিয়ে নাচিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে।

জগদীশ বললেন, সেই ছড়াটা মনে পড়ছে?

কোন ছড়া?

এপার গঙ্গা, ওপার গঙ্গা, মধ্যিখানে চর।

তারই মধ্যে বসে আছে শিবসদাগর।

ঠি! আমরা তো সেই শিবসদাগর হয়েই বসে আছি!

আকাশে চাঁদের আলো ফুটেছে। চরের দিগন্তবিস্তৃত সীমাহীন ধূসর বালি জ্যোৎস্নায় ছায়াময়, মায়াময় দেখাচ্ছে। হু হু বাতাসে কবি ও বিজ্ঞানীর বসন আলুথালু হয়ে যাচ্ছে। দুজনে একটা ভাঙা ডালের ওপর বসেছেন। হাওয়ার শন শন শব্দ ছাড়া চরাচর নিস্তব্ধ।

জানেন, রবিবাবু, একটা কথা আমার মাঝে মাঝে খুব মনে হয়

কী কথা?

জ পর্যন্ত পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ কবি বা শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক জন্মায়নি

কে?

কারণ একজন কবি এবং একজন বিজ্ঞানী দুজনেই আলাদা আলাদা ভাবে অসম্পূর্ণ যতদিন না একাধারে এই দুই ধরণের জ্ঞানের সম্মিলন হবে, ততদিন উভয়ই অসম্পূর্ণ থাকবে

ঠি! কবির জ্ঞান যত সীমাহীন, যত বিস্তৃত হবে, তাঁর কবিত্বও ততটাই অনন্ত কালের হবে। কিন্তু সেই সীমাহীন বিস্তৃতি অর্জন করা তো একজীবনে সম্ভব নয়। তা, জগদীশবাবু, আপনি নতুন কী নিয়ে গবেষণা করছেন?

পনি তো মেটাল ফ্যাটিগের ওপর আমার কাজের কথা কিছু শুনেছেন

হ্যাঁ। আপনিই লিখে জানিয়েছিলেনঅসাধারণ, চমকপ্রদ কাজ। আর কিছু?

দেখুন, রবিবাবু, একটা কথা বললে নিজের ঢাক পেটানো হয়ে যাবে, কিন্তু বিজ্ঞানের এক বিশেষ বিষয়ে আমি পথিকৃৎ

কী সেটা?

মাইক্রোওয়েভজানেন, রবিবাবু, এই বিশ্বে অনেকরকম আলো আছে যা চোখে দেখতে পাওয়া যায় না আমি এদের বলি অদৃশ্য আলোআমি আমার যন্ত্রের সাহায্যে আলোর তরঙ্গের দৈর্ঘ্য কমাতে কমাতে এক ইঞ্চির ছয় ভাগের এক ভাগ পরিমাণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি! আমার আগে বিশ্বে আর কেউ সেটা করতে পারেনিসাধারণ চোখ এ আলো দেখতে পায় নাকিন্তু এই অদৃশ্য আলোয় আমি দেখেছি যে, উদ্ভিদ উত্তেজিত হয়, সাড়া দেয়

শ্চর্য! তা এ আলো আপনি দেখবেন কী করে?

সেখানেই আসছে আমার নতুন আবিষ্কার কৃত্রিম চক্ষু বা আর্টিফিশিয়াল রেটিনা!

কীভাবে বানালেন?

বিবাবু, আমাদের চোখের রেটিনায় যখন আলো পড়ে তখন বিদ্যুতের সঞ্চার হয়। সেইভাবেই আমরা দেখি। আমি কী করেছি জানেন? এক মিস্তিরিকে ডেকে একটা রুপোর পাতকে পিটিয়ে অনেকটা রেটিনার আকার দিয়েছি। সেই পাতের ওপর দিয়েছি ব্রোমাইডের আস্তরণ। এবার এই কৃত্রিম চক্ষুর ওপর মাইক্রোওয়েভ ফেললে আমি বৈদ্যুতিক গ্রাফ বানাতে পারছি!

রবীন্দ্রনাথ স্তম্ভিত হয়ে তাঁর বন্ধুর কথা শুনতে লাগলেন।

রও একটা মজার কথা বলি, রবিবাবু। ধরুন, একটা ছোটো নলের একপ্রান্তে একটা কাঁচ লাগালাম এবং সেই কাঁচকে ভুষোকালি দিয়ে কালো করে তাতে কয়েকটা সূক্ষ্ম আঁচড় কাটলাম, তাহলে সেখানে কিছু স্বচ্ছ অক্ষর ফুটে উঠল, তাই তো?

হ্যাঁ।

বার সেই জায়গায় চোখ রেখে উলটোদিক থেকে যদি স্বল্প সময়ের জন্য আলো ফেলেন, এবং তারপর সাথে সাথে চোখ বুজে ফেলেন, তাহলে কী হবে?

কী হবে?

প্রথমে চোখে ঘোর অন্ধকার দেখবেন। তারপর চোখবোজা অবস্থাতেই দেখবেন যে, অক্ষরগুলো ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। অবশ্য এই অন্তর্দৃষ্টি বেশিক্ষণ থাকবে না, মশাই, উধাও হয়ে যাবে

রবীন্দ্রনাথ বললেন, টা আমিও দেখেছি যে, কোনো উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকিয়ে তারপর চোখ বুজলে একটা উজ্জ্বল আলো প্রথমে দেখতে পাই এবং পরে সেটা চলেও যায়

ঠি! এটা কেন হয়, জানেন? প্রথমবার চোখে আলো পড়ার পর চোখের অণুগুলো বিচলিত হয়ে বিদ্যুৎ-তরঙ্গ সৃষ্টি করছে। এবার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেতে তাদের আণবিক বিচলন উল্টোদিকে হচ্ছে। এর ফলেও একটা হালকা বিদ্যুৎ-তরঙ্গ উঠছে যার ফলে আপনি অস্পষ্ট ছবি দেখতে পাচ্ছেন। এই ব্যাপারটার নাম আমি দিয়েছি পরান্দোলন বা আফটার অসসিলেশন

দ্ভুত! অদ্ভুত! আমাদের মানবদেহ কী অদ্ভূত!

রেকটা ব্যাপার বলি, আমরা দু-চোখে কিন্তু সমানভাবে দেখি না

মানে?

বাঁচোখে যখন ভালো করে দেখছি, ডানচোখ তখন বিশ্রাম নিচ্ছে। এর ঠিক পরেই আবার উলটো ব্যাপার ঘটছে। এই পরিবর্তনটা এত তাড়াতাড়ি ঘটছে যে, বাইরে থেকে মনে হচ্ছে দুই চোখই সমানভাবে দেখছে!

তাই নাকি?

হ্যাঁ, মশাই! দুটো বই একসাথে খুলে পড়ার চেষ্টা করুন। পারবেন?

না।

বার চোখ বন্ধ করুন। দেখবেন পর্যায়ক্রমে সেই লেখাগুলোর এক-একটা চোখের সামনে ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি তাই আমার প্রেসিডেন্সির ছাত্রদের বলি যে, ওহে, যদি চোখ খুলে বই পড়তে না-পার, তাহলে চোখ বন্ধ করো! তাহলেই দেখবে যে, ব্যাপারটা কী সহজ হয়ে গেছে!

পনার সঙ্গে কথা বললে, জগদীশবাবু, মনে হয় যে, জ্ঞানের এক-একটা নতুন দিগন্ত যেন কেউ চোখের সামনে খুলে দিচ্ছে!

পনারা কবি, সাহিত্যিকরাও তো আমাদের ইন্সপিরেশন!

যেমন?

ঙ্কিমের কৃষ্ণকান্তের উইল পড়ুন । বঙ্কিম লিখছেন: তখন উন্মত্ত গোবিন্দলাল একমুহূর্তে রোহিণীকে এবং পরমুহূর্তে ভ্রমরকে দেখিল। জগৎ রোহিণী ও ভ্রমরময় হইল। মশাই, এটাই তো পরান্দোলন বা আফটার অসসিলেশন! বঙ্কিম ওয়াজ অ্যাহেড অফ হিজ টাইম!

রবীন্দ্রনাথ অট্টহাস্য করে উঠলেন, গদীশবাবু, আপনি সাহিত্যিক হলে আমাদের অনেকেরই রুটি মারতেন! অবশ্য বাংলাভাষায় লিখে রুটির প্রত্যাশা করাটাও ভুল! এ একেবারেই নিষ্কাম কর্ম!

দুই বন্ধু গাছের ডাল থেকে উঠে জ্যোত্স্নালোকিত চরের মধ্যে পায়চারি করছেন। পরপারে, যেখানে পদ্মার জলের শেষপ্রান্ত দেখা যাচ্ছে, সেখানে ঝিকমিক করছে প্রশস্ত জ্যোৎস্নারেখা। যেন উজাড় পৃথিবীর অপর প্রান্তে একটা উদাসীন চাঁদের উদয় হয়েছে। নিস্তব্ধ চরে একটা টিটি পাখি একটানা ডেকে চলেছে।

সৌন্দর্য আমার কাছে একটা নেশার মতো, জগদীশবাবু। আমাকে সত্যি সত্যিই খেপিয়ে তোলে

খানে তো তার উপকরণও পাচ্ছেন যথেষ্ট

গজ্যাক্টলি! এখানে এলে আমার মনে হয় যে, এই মাটির মাকে আমার সমস্ত শিকড় জড়িয়ে স্তন্যরস পান করি। সর্বাঙ্গ দিয়ে এই অকৃপণ সূর্যালোক শুষে নিই

জগদীশ আবৃত্তি শুরু করলেন:

তোমার মৃত্তিকা মাঝে কেমনে শিহরি

উঠিতেছে তৃণাঙ্কুর , তোমার অন্তরে

কী জীবনরসধারা অহর্নিশি ধরে

করিতেছে সঞ্চরণ, কুসুমমুকুল

কী অন্ধ আনন্দভরে ফুটিয়া আকুল

এবার রবীন্দ্রনাথও:

সুন্দর বৃন্তের মুখে, নব রৌদ্রালোকে

তরুলতাগুল্মতৃণ কী গূঢ় পুলকে

কী মূঢ় প্রমোদ রসে উঠে হরষিয়া –

মাতৃস্তন পানশ্রান্ত পরিতৃপ্ত হিয়া

সুখস্বপ্নহাস্যমুখ শিশুর মতন।

নিস্তব্ধ পদ্মার চরে এবার যুগলকণ্ঠ ধ্বনিত- প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল:

জননী, লহ গো মোরে

সঘন বন্ধন তব বাহু যুগে ধরে –

আমারে করিয়া লহ তোমার বুকের ।

তোমার বিপুল প্রাণ বিচিত্র সুখের

উৎস উঠিতেছে যেথা সে গোপন পুরে

আমারে লইয়া যাও – রাখিয়ো না দূরে ।

দূর থেকে গলার স্বর ভেসে আসছে, বাবুমশাই! কর্তামশাই!

জমাট অন্ধকারের মধ্যে দুটো লণ্ঠনের আলো কম্পিত শিখায় ক্রমেই তাদের কাছে এগিয়ে আসছে।

র্তামশাই! বাবুমশাই! কোথায় আপনারা?

লণ্ঠনদ্বয়ের মালিকেরা সমীপবর্তী হল। প্রসন্ন আর গফুরের শঙ্কিত মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠল।

র্তামশাইরা ঠিক আছেন তো! সাপখোপ! শেয়াল-হুড়ার!

ঠিক আছি, প্রসন্ন, চিন্তা করিস না

গফুর বলল, লেন কত্তামশাই, চলেন! শিলাইদহ পৌঁছতে রাতকাবার হয়ে যাবে

জগদীশ আর রবীন্দ্রনাথ অনিচ্ছাসত্ত্বেও গাত্রোত্থান করলেন। পদ্মার চরের সুখস্মৃতি মনের মণিকোঠায় ভরে পায়ে পায়ে বোটের দিকে চললেন।

বোটে উঠতে উঠতে রবীন্দ্রনাথ বললেন, পনার প্যারিস যাবার কী খবর?

কটু আশার আলো দেখা যাচ্ছে, রবিবাবু

বা!

প্রথমে প্রেসিডেন্সির প্রিন্সিপাল আর শিক্ষাবিভাগের ডিরেক্টর খুবই ব্যাগড়া দিচ্ছিলেন কিন্তু ছোটোলাট উডবার্ন খুবই আনুকূল্য করছেন

য়ে যাবে তাহলে?

জানি না, রবিবাবু। প্রেসিডেন্সির প্রিন্সিপাল মাঝে আমায় ডেকে অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেন কিন্তু যেই প্যারিস যাবার কথা তুললাম, তখনই দেখলাম উল্টো সুর

মানে?

ললেন যে, আমি বিদেশ গেলে, প্রেসিডেন্সির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট কীভাবে চলবে?

সেই পুরোনো কথা?

হ্যাঁ, রবিবাবু, বিদেশ তো আমি আগেও গেছি। তখন কি ডিপার্টমেন্ট চলেনি? তারপর উনি প্যারিসের ইনভিটেশন লেটার দেখতে চাইলেন। তখন পড়লাম মহাফাঁপরে

কে?

রে মশাই, চিঠিটা পকেটে পকেটে ঘুরছিল। সেটা কোন ফাঁকে ধোপা বাড়ি কাচতে চলে গেছে। কিছুতেই খুঁজে পেলাম না

রবীন্দ্রনাথ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর গাঢ় স্বরে বললেন, গদীশবাবু, আপনার মাপের একজন বিজ্ঞানীকে একটা সামান্য কনফারেন্সে যাবার জন্য এত হীনভাবে উমেদারি করতে হবে? এ তো আমাদের জাতীয় লজ্জা! এইসব ছোটোলোকের কাছে প্রতিদিন আপনাকে মাথা নোয়াতে হয়?

সব টানাপোড়েনে শরীর-মন আমার সত্যিই অবসন্ন, রবিবাবু, তাই তো শিলাইদহে ছুটে এলাম। আমি ছোটোলাট মি. উডবার্নের ওপর ভরসা করে আছি। যদি প্যারিস যাওয়া হয় তাহলে ওঁর জন্যেই হবে

বোটে উঠতে উঠতে জগদীশ বললেন, ন্ধু, তুমি তোমার এত প্রতিভা আর ক্ষমতা নিয়ে বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ে অখ্যাত-অজ্ঞাত হয়ে পড়ে থাকবে, এ আমি হতে দেব না

কী করবে?

শ্বরের কৃপায় বিলেত যদি যেতে পারি তাহলে তোমার লেখা অনুবাদ করে ছাপানোর চেষ্টা করব

বিতা অনুবাদ করতে পারবে?

তোমার কবিতা অনুবাদ করা প্রায় অসম্ভব, কিন্তু ছোটোগল্প? কাবুলিওয়ালা বা ছুটি-র মতো ছোটোগল্প ক-টা সাহেব লিখতে পেরেছে? নতুন কিছু কী লিখেছ?

হ্যাঁ। তোমাকে শোনাব বলে একটা গল্প লিখেছি—যজ্ঞেশ্বরের যজ্ঞ

কী নিয়ে গল্পটা?

কটা কিশোরী মেয়ের বিয়ের গল্প

মাদের বেলার বয়সি?

হ্যাঁ, বেলার বয়সি

জগদীশচন্দ্র চুপ করে রইলেন। কিছুদিন আগে তাঁর কলকাতার বাসায় মাতাল শিক্ষক লরেন্সের নৈশাভিযানের কথা মনে পড়ে গেল তাঁর। অবশ্য সে বিষয়ে কবিকে কিছু না-বলাই শ্রেয় মনে করলেন তিনি।

বোট অন্ধকারে পদ্মার জল কেটে এগিয়ে চলেছে

রবীন্দ্রনাথ বললেন, ছোটোলাট তো খুবই ভালো, কিন্তু আমাদের নতুন বড়োলাট? লর্ড কার্জন? তাঁর সম্বন্ধে খবর কী পাচ্ছ?

ভালো কিছু নয়। খুব নাকি দাম্ভিক আর নাকউঁচু। বয়সও কম। তবে দেখা যাক! সদ্য এসেছে

শিলাইদহে বোট পৌঁছল প্রায় রাত দশটায়। একটা ব্যাপার অবশ্য কবি বা বিজ্ঞানী কেউই ঠাহর করলেন না। কোনো এক অজ্ঞাত সম্পর্কের রসায়নে, পদ্মার বুকের এই নৌযাত্রার সময় তাঁরা পরস্পরের কাছে আপনি থেকে তুমিতে রূপান্তরিত হয়েছেন।

(ক্রমশ…)

 
 
top