নতুন আলো

 

পর্ব ১৫

ঠিক এই সময়েই অগ্নি ও স্বাহাদেবীর স্কন্দ নামক একটি পুত্র জন্ম গ্রহণ করিল। ইহার আর এক নাম কার্তিকেয়খোকাটি নিতান্তই অদ্ভুতরকমের, তেমন আর কেহ দেখেও নাই, শোনেও নাই। খোকাটির ছয়টি মাথা, বারোটি চোখ, বারোটি কান, বারোটি হাত!

মহাদেব যে ধনুক দিয়া দানব মারিতেন, সেই বিশাল ধনুক হাতে লইয়া খোকা গর্জন করিল; ত্রিভুবনের ভিতরে কেহই সে গর্জন শুনিয়া স্থির থাকিতে পারিল না

চিত্র ঐরাবত নামক ইন্দ্রের দুই হাতি সেই গর্জন শুনিয়া ছুটিয়া আসিয়াছিল তাহাদিগকে দেখিয়া খোকা, দুইহাতে শক্তি এবং আর দুইহাতে তাম্রচূড় এবং কুক্কুট নামক দুইটি অস্ত্র লইয়া ঘোরতর গর্জনপূর্বক লাফাইতে লাগিল আর দুইহাতে এইবড়ো একটি শাঁখ লইয়া ফুঁ দিল আর দুই হাতে আকাশের খোলায় ধুপধাপ করিয়া বিষম চাপড় আরম্ভ করিল! তখন হাতির পুত্রেরা লেজ খাড়া করিয়া, কোনদিকে পলায়ন করিয়াছিল, তাহা বলিতে পারি না

অথবা

খানিকটা পাখি, খানিকটা জানোয়ার, বিদঘুটে চেহারা, খিটখিটে মেজাজ, ভারি জ্ঞানী, বেজায় ধনী, অসুর ঘ্যাঁঘামহাশয় একমাসের পথ দূরে, অজানা নদীর ধারে, অচেনা শহরে, সোনার পুরীতে বাস করেন মানুষটিকে দেখতে পাইলেই, রসগোল্লার মতো টুপ করিয়া তাহাকে গিলিয়া ফেলেন সেই ঘ্যাঁঘামহাশয়ের পালক মানিক আনিতে চলিয়াছে

১৩নং কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়িতে ভেতরের বড়ো বারান্দায় সন্ধেবেলা গল্পের আসর বসে কথক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী অপূর্ব গল্প বলেন তিনি কতরকমের গল্প যে তাঁর অফুরন্ত ভাণ্ডারে আছে!  দেশবিদেশের কথা, রূপকথা, রামায়ণ-মহাভারতের গল্প, হাসির গল্প, দুঃখের গল্প, যুদ্ধ, বিপদ, রোমাঞ্চের গল্প

বন্ধুবর রবীন্দ্রনাথ প্রায়ই আক্ষেপ করেন, কী যে করছেন উপেনবাবু! এমন ভাণ্ডার আপনার! ঈশ্বর আপনাকে এত অপূর্ব, সরস গল্প বলার শক্তি দিয়েছেন! লিখে ফেলুন মশাই, লিখে ফেলুন! নয়তো সব হারিয়ে যাবে উপেন্দ্রকিশোর মুচকিমুচকি হাসেন এগুলো যে একসময় লিখে ফেলবেন সে জল্পনাও করেন মনেমনে আসলে বহুমুখী প্রতিভাধর উপেন্দ্রকিশোরের এত বিচিত্র শখ ও খেয়াল যে কোনটাকে ছেড়ে কোনটাকে ধরবেন সে ব্যাপারে মাঝেমাঝেই সংশয়ে ভোগেন তিনি

গল্প শোনার জন্য ভিড় করে বসে তাঁর ছেলেমেয়ে, আত্মীয়পরিজন উল বুনতে বুনতে, সেলাই করতে করতে শোনেন স্ত্রী বিধুমুখী সমাজসংস্কারক শিক্ষাবিদ দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির জ্যেষ্ঠাকন্যা বিধুমুখীকে বিয়ে করেছেন মসুয়ার জমিদার উপেন্দ্রকিশোর পাঁচটি সন্তান আপাতত হয়েছে তাঁদের সুখলতা, সুকুমার, পুণ্যলতা, সুবিনয় এবং শান্তিলতা

সবার বড়ো সুখলতা খুব শান্ত আর চুপচাপ তার পরেপরেই জন্মানো সুকুমার আবার সাঙ্ঘাতিক দুষ্টু আর ডানপিটে পুণ্যলতার চুল ছেলেদের মত ছোটো করে ছাঁটা সেও কিছু কম দুষ্টু নয় পরের ভাই মণি অর্থাৎ সুবিনয় ধপধপে ফরসা নীল চোখ অনেকটা মেয়েদের মতো মাথাভরা চুল সবচেয়ে ছোটো টুনি বা শান্তিলতা ডলপুতুলের মতো সুন্দর যে দেখে সেই আদর করতে চায় তাকে

সপরিবারে লাহাবাবুদের এই প্রাসাদোপম বাড়ির দোতলায় ভাড়া থাকেন উপেন্দ্রকিশোর তিনতলায় থাকে শ্বশুর দ্বারকানাথের পরিবার দ্বারকানাথ মারা গেছেন কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী কাদম্বিনী গাঙ্গুলি, যিনি দেশের প্রথম মহিলা ডাক্তার, তিনি দাপটে প্র্যাকটিস করছেন, সংসার চালাচ্ছেন এবং ছেলে মানুষ করছেন তাঁর ছেলেমেয়েরা অর্থাৎ সুকুমার, সুখলতাদের মামা মাসিরা তাদের ভাগ্নে, ভাগ্নীদের প্রায় সমবয়সি সুকুমারদের কাছে তাদের পরিচয় জংলুমামা, মংলুমামা, ভুলুমামা, চামিমাসী ইত্যাদি মামাভাগ্নেরা মিলে এই বিশাল বাড়ি গুলজার করে রেখেছে সবসময় হইচই উৎসবের পরিবেশ জংলু তথা প্রভাত আবার প্রেমাঙ্কুরের বিরাট বন্ধু

জমিদারি ছাড়াও উপেন্দ্রকিশোরের ছবি আঁকা এবং ফোটোগ্রাফি থেকে আয় আছে তাছাড়া চমৎকার হারমোনিয়াম এবং বেহালা বাজান তিনি ব্যাপারে এতটাই পারদর্শী যে, হারমোনিয়াম শিক্ষার ওপর একটা বই পর্যন্ত লিখে ফেলেছেন বিশাল বাড়িটায় অনেকগুলো ঘর তালাবন্দি একটা ঘরে ঢুকতে তো বেশ গা ছমছম করে অন্ধকার ঘর লালকাঁচের ভেতর দিয়ে অস্পষ্ট আলো ঢুকে সেই ঘরের মধ্যে এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এটা উপেন্দ্রকিশোরের ফোটোগ্রাফির ডার্করুম

আরেকটা ঘরও ভীতিপ্রদ তার দেয়ালে পূর্ণবয়স্ক এক মানুষের কঙ্কাল ঝুলছে বড়োবড়ো আলমারিতে নানারকম ডাক্তারি বই যন্ত্রপাতি এটা কাদম্বিনীর পড়ার ঘর কাদম্বিনী অবশ্য তাঁর ড্রয়িংরুম বিলেতের নানা সুন্দর সুন্দর আসবাবে সাজিয়েছেন সুবিনয়, পুণ্যলতারা সন্তর্পণে সে ঘরে ঢুকে আস্তে আস্তে সে-সব নেড়েঘেটে দেখে দ্বারকানাথ মারা গেলেও ঘরের কোণে তাঁর ব্যবহৃত লাঠিগুলো সাজানো আছে

একটা হল বুলডগমুখো মোটা লাঠি হলদে কাঁচের চোখওয়ালা বুলডগটা মুখ খিঁচিয়ে রয়েছে আরেকটা হল দারচিনি ডালের তৈরি লাঠি সেটা কামড়ালেই দারচিনির স্বাদ-গন্ধ পাওয়া যায়! বলা বাহুল্য, বাচ্চাদের কামড়ে কামড়ে সে লাঠি বাদামখোলার মতো এবড়ো খেবড়ো হয়ে গেছে আর আছে একটা সাদা হাতির দাঁতে তৈরি পিঠ চুলকোনোর হাত ঘরে ঢুকলেই বাচ্চারা সেটা দিয়ে পিঠ চুলকে নেয়

এই প্রকাণ্ড বাড়ির একটা প্রকাণ্ড ছাতও রয়েছে বাচ্চাদের খেলার জায়গা সেটা চোরচোর, লুকোচুরি, কুমিরডাঙা ইত্যাদি বহুবিধ খেলা স্কুলের পর বাচ্চারা খেলে থাকে প্রেমাঙ্কুররাও মাঝেমাঝে যোগ দেয় তাতে ছাদের একদিকের পাঁচিল একটু নিচু খেলতে খেলতে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা যে নেই, তা নয়

আরেকটা মজার ব্যাপার হল বাড়ির মধ্যেই স্কুল! শুধু দরজা পেরিয়ে গেলেই হল! ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয় প্রকাণ্ড বড়ো উঠোন আর তার তিনদিক ঘিরে লম্বালম্বা ঘর আর থামওয়ালা বারান্দা অন্যদিকে পুজোর দালান একতলায় স্কুল, দোতলায় মেয়েদের বোর্ডিং

বিকেল হলে বোর্ডিং-এর মেয়েরাও ছাতে উঠে খেলায় যোগ দেয় তারা অবশ্য সুকুমারকে একটু সমঝে চলে উপেন্দ্রকিশোরের জ্যেষ্ঠপুত্র ডানপিটে সুকুমারের একটা প্রিয় খেলা হল লাঠি হাতে বোর্ডিং-এর ছোটো ছোটো মেয়েদের ছাতময় তাড়া করে বেড়ানো

রাত হলে ছাতে অন্য একটা শব্দ ওঠে ঠকঠক ঠকঠক শব্দে কেউ যেন চরে বেরাচ্ছে সে সময় উঁকি মারলে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায় জনমানুষ নয় ছাতের ওপর দুলকি চালে হেঁটে বেরাচ্ছে একটা টাট্টুঘোড়া!

আসলে কাদম্বিনীর সম্প্রতি ডাক পড়েছিল নেপালের রাজদরবারে রাজমাতা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং নারীচিকিৎসক ছাড়া কাউকে দেখাবেনও না কাদম্বিনী দীর্ঘদিন নেপালে থেকে রাজমাতাকে সুস্থ করে ফিরেছেন উপঢৌকন হিসেবে লাভ করেছেন হিরে-জহরত ছাড়াও একটা সাদা গোলগাল নেপালি টাট্টুঘোড়া ! শহর কলকাতায় দিনমানে চরবার মাঠ বেচারা কোথায় পাবে? সন্ধ্যা হলে সহিসের সাথে সিঁড়ি বেয়ে উঠে সে ছাতের ওপর টুকটুক করে হেঁটে বেড়ায়।

সে সময়ের কলকাতায় মোটরগাড়ি বা রিকশার চলন নেই কিন্তু ঘোড়ার গাড়ি চলে অনেক রকমের। ফিটন গাড়ি, ভিক্টোরিয়া ফিটন, মি-লর্ড ফিটন, ল্যান্ডো, জুড়িঘোড়ার গাড়ি রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ায়ধনীরা জুড়িগাড়িতে বসে গড়গড়ায় তামাক টানেন । শৌখিন বাবুরা বিকেলবেলায় টমটম হাঁকিয়ে হাওয়া খেতে যান

ট্রামগাড়ি টানে ঘোড়ায় রাস্তার মাঝেমাঝেই তাই ট্রাম-ঘোড়াদের আস্তাবল সেখানে ঘোড়াবদল হয় গাড়িগুলোর দুদিকে পাদানি লোকে ইচ্ছেমতো দুদিক থেকেই উঠছে, নামছে চালকের মুখে বাঁশি সামনে জনমানুষ এসে পড়লেই সে বাঁশি পিঁপিঁ করে বেজে ওঠে দেখাদেখি শহরের ছোটো ছোটো বাচ্চারাও সেইরকম বাঁশি হাতে ঘুরে বেড়ায়

রাস্তায় আলো নেই সন্ধে হলেই তাই ট্রামের ঘোড়াদের গলায় ঘণ্টা বেঁধে দেওয়া হয় নির্জন অন্ধকারে সেই ঠুংঠাং শব্দে বোঝা যায় যে, দূর থেকে ট্রাম আসছে বস্তুত, শহরের শিশুচিত্তে ট্রাম তথা ঘোড়ার প্রভাব বেশ গভীর ব্যাপক

এক গ্রীষ্মের দুপুরে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলের সামনে ট্রামের ঘোড়া দুটো ক্ষেপে গেল। অন্য গাড়ির ঘোড়া ক্ষেপে গেলে দিগ্বিদিকে দৌড় মারে । সেই উন্মত্ত তুরঙ্গের সামনে অনেক মানুষ জখম হয়। মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। ট্রামের ঘোড়া ক্ষেপলে ব্যাপারটা অন্যরকম দাঁড়ায় । ভারী ট্রামগাড়ি নিয়ে এদিক ওদিক যাবার সামর্থ্য নেই। তারা তাই নট নড়নচড়ন হয়ে অহিংস অসহযোগ করে। হাজার মারধর, টানাটানি, ঠেলাঠেলিতেও তারা নড়বে না ।

ঘোড়াদের এই ক্ষ্যাপামিতে ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা ভারি মেতে উঠল। টিফিন টাইমের বিরতি। দালানের এক কোণে ময়রা তার বারকোশে নানাবিধ সুখাদ্য নিয়ে বসেছে। লুচি, মণ্ডা, ঘুঘনি, আলুকাবলি, কচুরির সদ্ব্যবহার হচ্ছে । এর মধ্যেই ঠিক হল যে, ঘোড়া-ঘোড়া খেলা হবে. প্রেমাঙ্কুর এবং তার ভাই জ্ঞানাঙ্কুরের ভালো ঘোড়া হিসেবে খ্যাতি আছে। ঠিক হল যে, তারা ঘোড়া হবে। লাকলাইন দড়ি জোগাড় করে তাদের জুতে ফেলা হল।

জুড়িঘোড়া তো মিলল, এবার সহিস তথা কোচোয়ান মিলবে কোত্থেকে ?

স্কুলের দালানের এক কোণে সুকুমার আসর জমিয়েছেসে বানিয়ে বানিয়ে চমৎকার গল্প বলতে পারে। বোধহয় বাবা উপেন্দ্রকিশোরের প্রতিভা কিছুটা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। দুলে দুলে থপথপিয়ে চলে ভবন্দোলা। আর মন্তু পাইন—সে তো এক আশ্চর্য জীব! তার সরু লম্বা গলাটা কেমন পেঁচিয়ে গিঁট পাকিয়ে রাখে! তবে সবচেয়ে বেচারা হল কম্পু। আহা, বড়োই অবলা। গোলমুখো, ভ্যাবাচোখো। অন্ধকার বারান্দার দেয়ালের পেরেকে বাদুড়ের মতো সে ঝুলে থাকে! এই সব আশ্চর্য, অদ্ভুত জানোয়ারের কথা বলে সে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। সহিস হবার প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হল সে।

দালানের আর এক কোণে একটা তালঢ্যাঙা ছেলে খুব লাফাচ্ছে। এটাকে সে বলে ক্যাঙ্গারু লাফ। দুই হাঁটু মুড়ে, হাত দুটোকে বুকের কাছে গুটিয়ে, গলা লম্বা করে, মুখটাকে বাড়িয়ে দিয়ে হুশ করে এমন প্রকাণ্ড লাফ সে মারছে যে, সবাই ভ্যাবাচাকা হয়ে দেখছে। ছেলেটির নাম যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত দ্বিতীয় সহিস নির্বাচিত হল সে।

হাতে লম্বা কঞ্চির ছিপটি নিয়ে সুকুমার আর যতিন কোচোয়ান। প্রেমাঙ্কুর এবং জ্ঞানাঙ্কুর ঘোড়া। অতএব খেলা জমে উঠল। পক্ষীরাজের মতো ঘোড়ারা উড়ছে। স্কুলের উঠোন, ঠাকুরদালান, সিঁড়ি কাঁপিয়ে তাদের হ্রেস্বাধ্বনি উঠছে। ওদিকে শপাং শপাং করে ছিপটিও চলছে । লাল হয়ে উঠছে দুই ঘোড়ার পশ্চাতদেশ ।

স্কুলের অন্য ছেলেমেয়েরা আগে পেছনে হইহই রইরই করতে করতে চলেছে । সে এক হুলস্থূল কাণ্ড।

দুই উড়ন্ত পক্ষীরাজের সামনে সহসা এক মানুষ পড়ে গিয়ে অবশ্য বিপত্তি ঘটাল। সুলতা। বাচ্চা মেয়ে। থাকে মেয়েদের বোর্ডিং-এ। খ্যাপা দুই ঘোড়ার অতর্কিত ধাক্কায় চিৎপটাং হল সে।

আর পড়ে গিয়েই শুরু হল তার তারস্বরে চিৎকার। অ্যাঁ! অ্যাঁ! আমায় মেরেছে! রাক্কোশগুলো আমায় ধাক্কা দিয়ে মেরে ফেলেছে গো! আমায় চাপা দিয়েছে গো! আমি কোথায় যাব গো! আমার হাড়গোড় ভেঙ্গে গেল গো! আমার কি লেগেচে গো! আমি আর উঠতে পাচ্ছি না গো !

সঙ্গে সঙ্গে চলল ভেউ ভেউ করে কান্না। পরে একটু ঠান্ডা হয়ে ধুলো ঝেড়ে উঠে, প্রেমাঙ্কুরের দিকে সক্রোধে তাকিয়ে সে বলল, মায় ইচ্ছে করে চাপা দিলি?

না! না! ওটা আচমকা হয়ে গেছে!

মিথ্যেবাদী! আমি যাচ্ছি সুপারিন্টেন্ডেন্টের কাছে!

যা! যা! নালিশ করে বালিশ জিতে নিয়ে আয়!

প্রত্যুত্তরে সুলতা জিভ বের করে, বুড়ো আঙুল তুলে কলা দেখাল। তারপর দুদ্দাড় সিঁড়ি বেয়ে বোর্ডিং-এর ওপরতলায় ছুটল। তার পেছন পেছন গেল আরও কিছু বোর্ডিংনিবাসী মেয়ে।

মেয়ে বোর্ডিং-এর সুপার এক রহস্যময় ব্যক্তি। সচরাচর তাঁকে দেখতে পাওয়া যায় না। জনশ্রুতি যে তিনি অত্যন্ত রাশভারী ও কড়া ব্যক্তি।

ঘোটক দুজনের অবশ্য উত্তেজনায় অতশত মনে নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তারা চিঁহি চিঁহি ডাক ছেড়ে সহিসদের উদ্দেশে চাঁট ছুড়ছে। সহিসরাও প্রত্যুত্তরে শপাশপ ছিপটি চালাচ্ছে ।

এমন সময় তিন চারজন বড়ো মেয়ের সঙ্গে সুলতার অবতরণ, ওপরে চল, সুপারিন্টেন্ডেন্ট ডাকছেন

ব্যস! আগুনে যেন জল ঢেলে দেওয়া হয়েছে! সহিসরা কাঁচুমাচু হয়ে ছিপটি হাত থেকে ফেলে দিয়েছে। সবারই বুক দুর দুর। প্রেমাঙ্কুর ও জ্ঞানাঙ্কুর ভাঙবে তবু মচকাবে না। তারা চিঁহি চিঁহি শব্দে মাটিতে শুয়ে পড়ল। তাদের চ্যাংদোলা করে ওপরে নিয়ে যাওয়া হল।

সব মিলে প্রায় জনা পনেরো আসামি। মূল আসামি দুই ঘোড়া মেঝেতে শুয়ে হাত পা ছুড়ছে।

সহসা তাদের চাঞ্চল্য স্তব্ধ হয়ে এক প্রগাঢ় নৈঃশব্দ্য নেমে এল ঘরের মধ্যে একপাশের পর্দা সরিয়ে তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে এক মহিলা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছেনসে তো প্রবেশ নয়, মহাপ্রবেশ!

বাপরে! বোর্ডিং-এর অন্তঃপুরে এ কী বিভীষিকা বিরাজ করছিল?

বিপুলদেহিনী নারীমূর্তির মধ্যপ্রদেশ পর্বতাকার। টকটকে গৌরবর্ণের ওপর ঈষৎ লালচে আভা। পুরুষ গ্রীক মূর্তির মতো চোখ, নাক। কঠিন গাম্ভীর্যমণ্ডিত মুখ। সেই মহামানবীর কণ্ঠ স্বর রণডম্বরুর মতো বেজে উঠল, সাইলেন্স! সাইলেন্স! সাইলেন্স!

ঘরে সূচিভেদ্য নীরবতা। ভূতলশায়ী ঘোটকদ্বয়ও নিশ্চুপ।

তাদের দিকে তাকিয়ে তিনি গর্জন করে উঠলেন, স্ট্যান্ড আপ! উঠে দাঁড়াও!

কাঁপতে কাঁপতে দুই ঘোড়া উঠে দাঁড়াল

তামাশা দেখতে ভিড় করা মেয়েদের দিকে তাকিয়ে তিনি হুঙ্কার ছাড়লেন, হাঁ করে দেখছ কী? যাও, যাও, এক্ষুনি বিদেয় হও!

নিরাশ মেয়েরা চলে গেলে অপরাধীদের একে একে জবানবন্দি নেওয়া হতে লাগল। দুই কোচোয়ান আর দুই ঘোড়া বাদে বেকসুর খালাস হল সবাই।

এর পর চার অপরাধীর পালা। তাদের দিকে তাকিয়ে মহিলা বললেন, নিল ডাউন হও!

কিছুক্ষণ নিল ডাউন থাকার পর কোচোয়ানদের উঠতে বললেন তিনি

সুকুমারের পরিচয় জানার পর বললেন, ! তুমিই সেই সুকুমার! তোমার নামে বহু কমপ্লেন আমার কাছে এসেছে তুমিই বিকেলে ছাতময় বোর্ডিং-এর কচি কচি মেয়েদের তাড়িয়ে বেড়াও?

জ্ঞে না তো!

ফের মিথ্যে কথা! মহিলা গর্জন করে উঠলেন। ফের তুমি মেয়েদের তাড়া করেছ শুনেছি তো সোজা তোমার বাবা উপেনবাবুকে চিঠি ধরিয়ে দেব! বাপের নাম ডোবাবে দেখছি তুমি!

যতীন্দ্রমোহনকে বললেন, না তোমার নামে বড়ো কোনো কমপ্লেন নেই। তবে তুমি খুব লাফঝাঁপ করে বেড়াও শুনেছি

বোঝা গেল যে, বাইরে দেখা না গেলেও মহিলা সব খবরই রাখেন।

দুই কোচোয়ানকে কঠিনভাবে সতর্ক করলেন তিনি, বর্দার! ফের যদি দেখেছি কাউকে এরকম ছিপটির বাড়ি মেরেছ, তাহলে সে ছিপটি তোমাদের পিঠেও শপাশপ পড়বে! বুঝলে? এখন যাও! বিদেয় হও!

এসব কথা বুঝতে দেরি হয় না। মুক্তিপ্রাপ্ত দুই কোচোয়ানই দুদ্দাড় করে দৌড়ে পালাল।

সব শেষে ডাক পড়ল দুই ঘোড়ার ।

প্রেমাঙ্কুর ও জ্ঞানাঙ্কুরের হাতে প্রবল নাড়া দিয়ে ভদ্রমহিলা জিগ্যেস করলেন, তোরা সুলতাকে ধাক্কা দিলি কেন?

মরা ঘোড়া-ঘোড়া খেলছিলাম যে!

তা তো খেলছিলি, তা ধাক্কা মারতে গেলি কেন?

ঘোড়া ক্ষেপে গিয়েছিল, তাই!

এই উত্তরে মহিলার কঠোর মুখমণ্ডলে বিদ্যুত-ঝিলিকের মতো এক টুকরো হাসি খেলে গেল ।

সেটা সামলে নিয়ে বললেন, মানুষ ঘোড়া ক্ষেপলে যদি জানোয়ারের মতো আচরণ করে তাহলে তাহলে দুয়ের মধ্যে তফাত কিরে বোকা? ঘোড়ায় ঘাস খায়। তোরাও কি ঘাস খাস?

এ কথার উত্তর হয় না। দুই ভাই অপরাধীর মতো মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

তাদের চুপ করে থাকতে দেখে মহিলা সদয় হয়ে বললেন, ঠিক আছে যাও! এমন আর কখনো করবে না!

প্রেমাঙ্কুর আর জ্ঞানাঙ্কুর চলেই যাচ্ছিল। মহিলা তাদের পিছু ডাকলেন ।

তোমরা দুই ভাই, তাই না?

হ্যাঁ।

বাবার নাম কী?

হেশচন্দ্র আতর্থি

, তোমরা মহেশবাবুর ছেলে? তিনি তো বিখ্যাত বীরপুরুষ! তোমাদের দেখে আমার ছোটো ভাইয়ের কথা মনে পড়ল। ছোট্ট বেলায় কী দুষ্টু যে ছিল! আর ডানপিটে! ঢাকা বিক্রমপুরের বাঙাল টান নিয়ে কলকাতার ছেলেরা ওকে খেপাত। তাই নিয়ে মারপিট করে করে প্রতিদিন কালশিটে গায়ে বাড়ি ফিরত। ও তখন সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়ে

কে তিনি?

র নাম জগদীশ, জগদীশচন্দ্র বসু

কী করেন তিনি?

ভদ্রমহিলার নাসারন্ধ্র ভ্রাতৃগর্বে স্ফীত হয়ে উঠলবিখ্যাত বিজ্ঞানী সে। বড়ো হয়ে তোমরা তার নাম শুনবে। ভূভারতে এমন বিজ্ঞানী নেই। সারা দুনিয়া তাকে একডাকে চেনে

বুড়ো আর লালু এতক্ষণে অনেকটা সাহস সঞ্চয় করেছে । বুড়ো জিগ্যেস করল, র আপনার নাম? আপনার নাম জানতে পারি কি?

ভদ্রমহিলাকে অতটা ভীতিপ্রদ মনে হচ্ছে না। মুখে মাতৃত্বের কোমলতা। শান্ত স্বরে বললেন, নিশ্চয়ই পার। আমার নাম লাবণ্যপ্রভা,লাবণ্যপ্রভা বসু

(ক্রমশ…)

 
 
top