নতুন আলো

 

কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরের ঠিক উলটো দিকে লাহাবাবুদের প্রাসাদোপম অট্টালিকা। সেই বাড়ির উত্তর অংশে ভাড়া থাকে বুড়ো ওরফে প্রেমাঙ্কুরের বন্ধু প্রভাতের পরিবার। প্রভাতের একটা বিশিষ্ট পরিচয় আছে। তার মা কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় ভারতের প্রথম পাশ করা মহিলা ডাক্তার। প্রভাতের বাবা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ও বিখ্যাত তেজস্বী পুরুষ। পাশাপাশিই ভাড়া থাকেন প্রভাতের জামাইবাবু উপেনবাবুরা। ময়মনসিংহের মসুয়ার জমিদার উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বহুমুখী প্রতিভাধর, বিচিত্রকর্মা পুরুষ তিনি। ছবি আঁকেন, বাচ্চাদের গল্প লেখেন, বেহালা বাজান, ছাপাই ছবির কাজ করেন। ভবিষ্যতে ছাপাখানা খোলা এবং পত্রিকা বের করার ইচ্ছেও মনে মনে পোষণ করেন তিনি। প্রভাতরা অনেক ভাইবোন। উপেন্দ্রকিশোরেরও অনেক ছেলেমেয়েসুকুমার, সুখলতা, সুবিনয় ও পুণ্যলতা। সব মিলিয়ে দুই বাড়িতে সবসময় প্রবল হুল্লোড় আর হইচই লেগেই আছে।

প্রভাতের বাড়িতেই থাকেন তার তিন মামা। অসীম জ্ঞানপিপাসা তাঁদের। রোজগারের অধিকাংশই খরচ হয় বই কেনায়। এভাবে প্রভাতের বাড়িতে গড়ে উঠেছে এক বিরাট পারিবারিক লাইব্রেরি, যে লাইব্রেরির সদ্ব্যবহার করে প্রভাত অকালপক্কতা অর্জন করেছে এবং সে জ্ঞান অকাতরে বিতরণ করছে বন্ধুদের মধ্যে।

লাহাবাবুদের অট্টালিকার দক্ষিণ অংশে ব্রাহ্ম গার্লস স্কুল। আর উলটো দিকে এক ছোট্ট দোতলা বাড়িতে সপরিবারে ভাড়া থাকেন বুড়ো, বাবু আর লালুর বাবা মহেশচন্দ্র আতর্থী।

পয়লা জানুয়ারির সেই শোকাবহ অভিজ্ঞতার পর মাস দুই তিন কেটে গিয়েছে। বাতাসে বসন্তের পরশ। বাবু, বুড়ো, লালু নিয়মিত স্কুল যাচ্ছে। আগে তারা উলটো দিকে ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলে পড়ত। বাবু এখন যায় ডফ কলেজে। বুড়ো আর লালু এখনও ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলেই পড়ে রয়েছে।

উপেন্দ্রকিশোরের বড়ো ছেলে সুকুমার এবং বাবু প্রায় সমবয়সি এবং প্রবল বন্ধু। সুকুমার অত্যন্ত আমুদে, মজাদার ছেলে। ভাইবোনদের সাথে তার খুনসুটি লেগেই আছে। লালু অবশ্য সুকুমারকে একটু সন্দেহের চোখেই দেখে এবং তার যথেষ্ট কারণও রয়েছে।

প্রথম পরিচয়ের পর সুকুমার জিগ্যেস করেছিল, তো নাম কী রে?

লালু

তো ডাক নাম। ভাল নাম কী?

জ্ঞানাঙ্কুর

জ্ঞানাঙ্কুর! দারুণ নাম! দেখব তোর জ্ঞানের অঙ্কুর কেমন গজিয়েছে? আই গো আপ-এর বাংলা কী হবে বল্ তো?

মি ওপরে যাই

ছাই জানিস!

জ্ঞানাঙ্কুর রুখে উঠেছিল। আগের দিনই ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলের দিদিমণি তাকে শিখিয়েছেন আই গো আপ-এর বাংলা কী হবে।

জ্ঞানাঙ্কুরের প্রতিবাদে মুরুব্বির মতো হেসেছিল সুকুমার, তো তোদের মুশকিল! ছোট্ট থেকেই এঁড়ে তক্কো শিখে যাস! আই গো আপ-এর বাংলাটা শিখে নেআই অর্থাৎ চোখ, ঠিক কি না? গো মানে অতি সোজা, গোরু আর আপ মানে হচ্ছে অপ অর্থাৎ জল। সব মিলিয়ে কী হল?

জ্ঞানাঙ্কুর নীরবে হাঁ করে শুনছিল।

বোকাটা! সব মিলিয়ে হল গোরুর চক্ষে জল। কিন্তু গোরুর চোখে জল কেন? সেটাই তো লাখ টাকার প্রশ্ন!

জ্ঞানাঙ্কুর তোতলাতে তোতলাতে প্রশ্ন করেছিল, কে? গোরুর চোখে জল কেন?

রে উই গো ডাউন, না! উইপোকা গোডাউনে ঢুকে সব সাবড়ে দিয়েছে! গোরুর জন্য কিছু ফেলে রাখেনি! তাইলে আই গো আপ, উই গো ডাউন মানে যদি কেউ জিগ্যেস করে তাহলে কী বলবি?

কী বলব?

লবি যে উই পোকা গোডাউনে ঢুকে সব সাবড়ে দিয়েছে বলে গোরু কেবল কাঁদছে

জ্ঞানাঙ্কুর এই অপ্রত্যাশিত জ্ঞানের অভিঘাতে নীরবে মাথা নেড়েছিল। সুকুমারের জ্ঞান অবশ্য তখনও শেষ হয়নি। সে বলেছিল, রেকটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট কথা শুনে রাখ্

কী?

বরদার কখনো আলুভাতে খাবি না!

কে?

লুভাতে ব্রেনের পক্ষে খুব খারাপ। ঘিলু ভেস্তিয়ে যায়, বুদ্ধি গজায় না

তাই নাকি?

হ্যাঁরে। দেখবি ডাক্তার-বদ্যিরা কেউ কখনো আলুভাতে খায় না সুকুমার সুর করে বলে উঠেছিল:

কহ ভাই কহ রে

অ্যাকাচোরা শহরে

বদ্যিরা কেন কেউ আলুভাতে খায় না।

কে?

লেখা আছে কাগজে

আলু খেলে মগজে

ঘিলু যায় ভেস্তিয়ে বুদ্ধি গজায় না।

লালুর ওপর সুকুমারের এই উপদেশামৃত যখন বর্ষিত হচ্ছে, তখন বুড়ো, বাবু কেউই ধারে কাছে ছিল না। জ্ঞানাঙ্কুর সেই জ্ঞান গলাধঃকরণ করে পরিপূর্ণ চিত্তে বাড়ি ফিরে প্রথমেই মায়ের কাছে ঠাস করে এক চড় খেয়েছিল। কারণ, দুপুরে মা ভাতের সঙ্গে আলুভাতে মেখে দিয়েছিলেন এবং অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই মস্তিস্কবিনাশী সেই খাদ্যদ্রব্য সে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

পরের ইতিহাস আরও করুণ। রবিবার সকালে মহেশচন্দ্র ছেলেদের পড়া ধরেন। সেখানে আই গো আপ আর উই গো ডাউন-এর সুকুমারকৃত ভাষ্য জ্ঞানাঙ্কুর তার বাবাকে শুনিয়েছিল। মহেশচন্দ্র দীর্ঘকায়, গৌরবর্ণ পুরুষ। আবক্ষ কালো দাড়ি। চুয়াল্লিশ ইঞ্চি ছাতি। সাড়ে উনিশ ইঞ্চি বাহুর বেড়। জ্ঞানাঙ্কুরের উত্তর শুনে তাঁর মুখ রাগে গনগনে লাল হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল ক্রোধে দাড়ির আগায় আগুন লেগে যাবে।

ছেলেকে কষিয়ে বেত মেরে, অবরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি গর্জন করে উঠেছিলেন, ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলে এসব ধাষ্টামো শেখানো হচ্ছে! আমার সঙ্গে ইয়ার্কি!

লালু কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, না বাবা, ইস্কুলে এ সব শেখায়নি

কে? কে তবে শিখিয়েছে এই সব ছাইপাঁশ?

তাতাদা

তাতা কে?

বাড়ির সুকুমারদা

কোন্ সুকুমার?

পেনবাবুর বড়ো ছেলে

পেনবাবুর ছেলে সুকুমার! সে এত বড়ো তালেবর হয়েছে নাকি! দাঁড়াও, দেখাচ্ছি খাটো ধুতি আর চাদর গায়ে সেই রবিবার সকালেই মহেশচন্দ্র উপেন্দ্রকিশোরের বাড়ি ছুটেছিলেন।

 

উপেন্দ্রকিশোরের বৈঠকখানা ঘরে তখন গান হচ্ছে। রবিবার প্রাতঃকালীন প্রার্থনার পর তাঁরা সপরিবারে গান করেন। উপেন্দ্রকিশোর বেহালা বাজান। দোতলার ঘর থেকে গানের সুর ভেসে আসছে। ঘোরানো সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে মহেশচন্দ্র শুনতে লাগলেন:

আমার বিচার তুমি কর তব          আপন করে।

দিনের কর্ম আনিনু                  তোমার বিচারঘরে।।

যদি পূজা করি মিছা দেবতার,    শিরে ধরি যদি মিথ্যা আচার

যদি পাপমনে করি অবিচার      কাহারো ‘পরে

আমার বিচার তুমি কর তব       আপন করে।।

মহেশচন্দ্র নিজেও সংগীতচর্চা করেন। অস্বাভাবিক ক্ষমতা তাঁর কণ্ঠের। দুর্জনেরা বলে যে সন্ধের সময় পড়ার আসরে তাঁর হাঁকডাকের চোটে প্রায় প্রতিদিনই রেড়ির তেলের প্রদীপ অকালে নির্বাপিত হয়, হ্যারিকেনের আলো পর্যন্ত দপদপ করতে থাকে। এ ছাড়া সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ প্রকাশিত ব্রহ্মসঙ্গীত গ্রন্থে যে নানা রাগরাগিণীর প্রায় পাঁচশো গান আছে, সে গানও সকালে, সন্ধায় ব্রহ্মোপসনার পর তিনি গেয়ে থাকেন। গান নতুন হলেও সুর সম্পর্কে তিনি অমানুষিক একনিষ্ঠ। যে কোনো গানকে, যে কোনো সুর, ছন্দ ও লয়ের মধ্যে ফেলে তিনি অক্লেশে গেয়ে দিতে পারেন। এ হেন সঙ্গীতবীর মহেশচন্দ্র এ রকম গান আগে কখনো শোনেননি। শুনতে শুনতে তাঁর মন দ্রব হয়ে গেল।

পায়ে পায়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এলেন তিনি। বড়ো জানালা দিয়ে বাইরের রোদ এসে ঘরের মধ্যে পড়েছে। সুদর্শন, শ্মশ্রুমন্ডিত উপেন্দ্রকিশোর চোখ বুজে নিবিষ্টচিত্তে বেহালা বাজাচ্ছেন। পিয়ানোয় সঙ্গত করছেন কন্যা সুখলতা। সুকুমার, সুবিনয়, পুণ্যলতা, প্রভাত এবং তাদের পরিবারবর্গ মেঝের কার্পেটে বসে চোখ বুজে গান গাইছে:

লোভে যদি কারে দিয়ে থাকি দুখ, ভয়ে হয়ে থাকি ধর্মবিমুখ,

পরের পীড়ায় পেয়ে থাকি সুখ ক্ষণেক-তরে—

তুমি যে জীবন দিয়েছ আমায় কলঙ্ক যদি দিয়ে থাকি তায়,

আপনি বিনাশ করি আপনায় মোহের ভরে,

আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে।।

গান শেষ হল। নিমিলিত-আঁখি বেহালাবাদনরত উপেন্দ্রকিশোর চোখ মেলে দেখলেন দ্বারপ্রান্তে মহেশচন্দ্র দাঁড়িয়ে আছেন।

সুন, আসুন, মহেশবাবু। সকালে কী মনে করে? বসুন

মহেশচন্দ্র গানের অভিঘাতে সুকুমারের দুষ্কর্ম ভুলে গেছেন। ঘরে ঢুকে পায়ে পায়ে আরামকেদারায় বসে পড়লেন। সলজ্জ কণ্ঠে বললেন, পনাদের গান শুনে ঢুকে পড়লাম। বড়ো ভাল গান

হ্যাঁ রবি রচেছে

বি?

হ্যাঁ, আমার বন্ধু রবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঠাকুর পরিবারের?

হ্যাঁ।

জোড়াসাঁকো না পাথুরেঘাটা?

জোড়াসাঁকোর। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ছেলে

সে এত ভালো গান লেখে নাকি?

শুধু গান লেখে? সুর দেয়, গায়, কবিতা লেখে। এ ছাড়া ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, কী নেই? রবি বহুমুখী প্রতিভা। আমাদের ব্রহ্মসঙ্গীত বইটাতে তো ওর অনেক গান আছে

যেমন?

তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা, এটা তো রবির-ই লেখা। সুরটা অবশ্য ভাঙা-আলাইয়া বিলাওল থেকে নিয়েছে

মহেশচন্দ্র নীরব রইলেন। ব্রহ্মসঙ্গীত বইটাতে অনেকক্ষেত্রেই গীতিকার বা সুরকারের নাম থাকে না। সুতরাং অমানুষিক একনিষ্ঠার সঙ্গে তিনি হয়তো রবীন্দ্রনাথের অনেক গানও সকাল, সন্ধের প্রার্থনার পর গেয়েছেন।

স্ত্রী বিধুমুখী চা এনে দিয়েছেন। টি-পট থেকে সুগন্ধি, ধূমায়িত চা মহেশচন্দ্র ও স্বামীকে ঢেলে দিচ্ছেন।

মহেশচন্দ্র বললেন, ই গানটা তো আগে কোথাও পাইনি?

পাবেন কী করে? রবি তো সদ্য বেঁধেছে এটা। আমি বন্ধু বলে শিখিয়েছে আমায়

চা খেতে খেতে মুগ্ধ স্বরে বলে যেতে লাগলেন উপেন্দ্রকিশোর, রাগটা তো বুঝতেই পারছেন, কেদার। কিন্তু কথা? হিন্দুস্থানি গানে এমন কথা পাবেন, মহেশবাবু? পাবেন?

বাংলা গানেও এ রকম পাওয়া যায় না

ঠি। সহজ অথচ গভীর। মধুর অথচ সরস। কী কথা:

যদি পূজা করি মিছা দেবতার, শিরে ধরি যদি মিথ্যা আচার,

যদি পাপমনে করি অবিচার কাহারো পরে।

এই কথা শুনলে মন পবিত্র হয় মহেশবাবু, পবিত্র হয়ে যায়

মহেশচন্দ্র ভুলে গেলেন যে, তিনি সুকুমারের ব্যাপারে অভিযোগ জানাতে এসেছিলেন। নীরবে উপেন্দ্রকিশোরের বক্তব্য শুনতে লাগলেন।

কালের বিচারে আমাদের সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ, নববিধান, আদি ব্রাহ্মসমাজ কোথায় বুদ্বুদের মত মিলিয়ে যাবে, মহেশবাবু। কিন্তু রবির এই গানটা থাকবে। যতদিন বাঙালি থাকবে, যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন লোকে এ গান গাইবে:

লোভে যদি কারে দিয়ে থাকি দুখ, ভয়ে হয়ে থাকি ধর্মবিমুখ,

পরের পীড়ায় পেয়ে থাকি সুখ ক্ষণেক-তরে—

তুমি যে জীবন দিয়েছ আমায় কলঙ্ক যদি দিয়ে থাকি তায়,

আপনি বিনাশ করি আপনায় মোহের ভরে,

আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে।।

চা খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছে। মহেশচন্দ্র কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ঘরে ফিরে এলেন। বড়ো ছেলে বাবু ওরফে নরেশচন্দ্র খবরের কাগজের মলাট দেওয়া একটা বই পড়ছে। বাবার পায়ের আওয়াজে সে ভীত, সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল।

কী পড়ছিস রে, বাবু?

তিহাস, বাবা। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর

শুনি একবার

বাবু সরবে পড়তে শুরু করল:

লোকে প্রথমে ভিক্ষা করিতে আরম্ভ করিল, তারপরে কে ভিক্ষা দেয়!

উপবাস করিতে আরম্ভ করিল। তারপরে রোগাক্রান্ত হইতে লাগিল। গোরু বেচিল, লাঙ্গল-জোয়াল বেচিল, বীজধান খাইয়া ফেলিল। ঘরবাড়ি বেচিল। জোত জমা বেচিল। তারপর মেয়ে বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর স্ত্রী বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর মেয়ে, ছেলে, স্ত্রীকে কে কিনে? খরিদ্দার নাই, সকলেই বেচিতে চায়। খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল, ঘাস খাইতে লাগিল, আগাছা খাইতে লাগিল। ইতর ও বন্যেরা কুক্কুর, ইন্দুর, বিড়াল খাইতে লাগিল। অনেকে পলাইল, যাহারা পলাইল, তাহারা বিদেশে গিয়া অনাহারে মরিল। যাহারা পলাইল না, তাহারা অখাদ্য খাইয়া, রোগে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল।

শুনতে শুনতে মহেশচন্দ্রের গৌরবর্ণ মুখ রাগে, দুঃখে লাল হয়ে উঠল। দু-চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নামল। অবরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, কী দুঃখের ইতিহাস! কোন বই রে এটা?

বাবু কিছু বলার আগেই খপ্ করে তার হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে তিনি পাতা ওলটাতে লাগলেন। তারপর এক গম্ভীর গর্জন তাঁর কণ্ঠ থেকে বেড়িয়ে এল, ঙ্কিম পড়া হচ্ছে! খবরের কাগজের মলাট দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বঙ্কিমের আনন্দমঠ পড়া হচ্ছে! ব্রাহ্মবাড়িতে এইসব নাটক, নভেল ঢোকাবে! বাঘের ঘরে ঘোগের বসতি! চাবকে তোমার পিঠের ছাল যদি আমি আজ না তুলেছি!

বাবু ত্বরিতগতিতে ছাদের দিকে দৌড়ে পালাল। বেত হাতে সিঁড়ি দিয়ে পেছন পেছন ধাওয়া করলেন মহেশচন্দ্র। ছাদের আলশের পাশে ছেলেকে পাকড়াও করলেন তিনি।

বাবা পায়ে পড়ি! মেরো না! মেরো না!

উদিত সূর্যের প্রখর কিরণ বেতের ওপর ঝলকাচ্ছে। মহেশচন্দ্রের হাত শাসনে উদ্যত। হঠাৎই তা নুয়ে এল। সকালে শোনা গানের একটা কলি তাঁর স্মরণে ভেসে উঠেছে:

লোভে যদি কারে দিয়ে থাকি দুখ, ভয়ে হয়ে থাকি ধর্মবিমুখ,

পরের পীড়ায় পেয়ে থাকি সুখ ক্ষণেক-তরে—

তুমি যে জীবন দিয়েছ আমায় কলঙ্ক যদি দিয়ে থাকি তায়,

আপনি বিনাশ করি আপনায় মোহের ভরে,

আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে।।

সহসা মহেশচন্দ্রের মুখভাব কোমল হয়ে উঠল। বললেন, তোমাদের মারিধরি, বকিঝকি, সবই তোমাদের ভালোর জন্য। লুকিয়ে লুকিয়ে নাটক-নভেল পড়ে মাথা গরম করে নিজের আখের নষ্ট করবে, সেটা কোন্ বাবা চাইবে? ঠিক আছে, যাও নীচে যাও। ভবিষ্যতে কখনও যেন এমনটা না দেখি

বাবু মাথা নীচু করে ছাদ থেকে নীচে নেমে গেল। বুড়ো আর লালু মজা দেখতে দাঁড়িয়ে আছে। তারা সমস্বরে বলল, দাদা বেঁচে গেলি? বাবা মারেনি?

না তো! বাবুর কণ্ঠেও বিস্ময়। কেন যে বাবা তাকে মারলেন না, কেন যে তাঁর উদ্যত বেত সহসা নত হয়ে গেল, সে রহস্য তার কাছেও অজানা থেকে গিয়েছে।

(ক্রমশ…)

 
 
top