নতুন আলো

 

জলখাবারান্তে পাঠগৃহের ডিভানে আধশোয়া হয়ে সেই মারোয়াড়ি তনয়ের  কথাই ভাবছিলেন রবীন্দ্রনাথ—তৈলাক্ত মসৃণ হাস্য, পরনে ধুতি আর শেরওয়ানি, মাথায় ত্রিকোণ শিরস্ত্রাণ, কণ্ঠে মোতির মালা, গুম্ফশোভিত মুখমণ্ডল বিনয়ে অবনত—বন্ধুবর প্রিয়নাথ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল—মোতিচাঁদ নাখতার।

বড়োবাজারের গদিতে বসে এক প্রকাণ্ড জাবদা খাতায় মোতিচাঁদবাবু হিসেব দেখছিলেন। কবি ও তাঁর বন্ধুকে মহা সমারোহে বসিয়ে ছিলেন তিনি।

আসেন, আসেন, প্রিয়বাবু! আমার কী সৌভাগ্য! সঙ্গে করে কাকে লিয়ে এলেন?’

প্রিয়নাথ সংক্ষেপে রবি ও তাঁর সমস্যার পরিচয় দিয়েছিলেন।

নোমোস্কার। আপনার নাম শুনা আছে। জান-পহচান হয়ে বড়ো খুস হল।

প্রিয়নাথ বললেন, ‘আপনার মতো লোক যখন সহায়, তখন রবির আর ভাবনা কী?’

মোতিচাঁদ বিনয়াবনত হয়ে হেসেছিলেন, ‘হেঁ, হেঁসোকোলি ভগবানের হিঞ্ছা। হামি একেলা কী করতে পারি? কুছু না।

প্রিয়নাথ বলেছিলেন, ‘রবি, মোতিচাঁদবাবু যে কেবল পাকা ব্যাবসাদার তা মনে কোরো না। ইনি বেশ শিক্ষিত লোক।

রবীন্দ্রনাথ নীরব ছিলেন।

মোতিচাঁদ নাখতার বললেন, ‘বহুত বাঙ্গালির সাথে আমি মিলামিশা করি। বাংলা কিতাব ভি অনহেক পড়েছি। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ ভি আমি পড়েছি।

আনন্দমঠ!’

হ্যাঁ, হ্যাঁশালা নেড়েলোগকো কিতনা পিটান পিটাইছিল ভবানন্দ, জীবানন্দ, ধীরানন্দনে!’

সাহিত্য আলোচনার পর কাজের কথা শুরু হয়েছিল। ঠাকুর কোম্পানির সলিল সমাধির বিবরণ শুনে মোতিচাঁদ চুক চুক করে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন, ‘বড়ি আফসোস কি বাত। কারোবার তো বিশ হাত পানি মেঁ ডুব গয়া। রবিবাবু, উয়ো নিশিকান্ত জুয়াচোর আছে। উয়ো তো আপকো ডুবাকে ভাগে।

নিশিকান্ত যে তাঁদের সমূহ সর্বনাশ করে সরে পড়েছে, তাতে আর সন্দেহ কী! রবীন্দ্রনাথ এবারও নীরব রইলেন।

প্রিয়নাথের সাথে মোতিচাঁদের ঋণ-সংক্রান্ত আলোচনা চলছিল। রবীন্দ্রনাথের কেমন ছায়া ছায়া মনে হচ্ছিল সব কিছু। সেই অন্ধকার বড়োবাজারের গলি, গদি-আরূঢ় সেই মিস্টভাষী মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী, শিলাইদহের উন্মুক্ত আকাশ, উদার সূর্যের আলো, তরঙ্গচঞ্চল পদ্মা আর গোড়াই নদী থেকে তা যেন শত আলোকবর্ষ দূরে।

সম্বিত ফিরেছিল প্রিয়নাথের গলার আওয়াজে, ‘নাও, রবি, সই করো।

চল্লিশ হাজার টাকা ঋণ দিচ্ছেন মোতিচাঁদবাবু শতকরা সাত টাকা সুদে। তারই দলিল রবীন্দ্রনাথকে সই করতে হবে, সই করতে করতে হাত কেঁপে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের। যে লেখনী দিয়ে ক্লান্তিহীনভাবে গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ নিঃসৃত হয়েছে, সেই লেখনী নাম স্বাক্ষর করতে নিয়েছিল সুদীর্ঘ সময়।

জমিদারতনয় রবীন্দ্রনাথ। সামান্য মাসোহারায় তাঁর সংসার চলে। নিজের কোনো আয় নেই। জমিদারির মালিক তো তিনি নন। সই করতে করতে রবীন্দ্রনাথের মনে হচ্ছিল যে, এক অজগরের পাকে পাকে তিনি বন্দি হয়ে যাচ্ছেন। তাঁর নিশ্বাস রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই বন্ধন থেকে আজীবন তাঁর মুক্তি নেই।

পরে রাস্তায় জুড়িগাড়িতে প্রিয়নাথ নীরবতা ভঙ্গ করেছিলেন, ‘রবি, চুপ করে কেন? তোমার তো সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।

সমাধান? এ তো আরও বড়ো পাকে জড়িয়ে পড়লাম! শতকরা সাত টাকা সুদ!’

আপাতত তো বাঁচলে! মেড়োটা লোক খারাপ নয়, তবে ব্যবসায়ী লোক। লাভ ছেড়ে দেবে কেন? লোক চরিয়ে খায়।

না হে, ভালো লাগল না। লক্ষণ ভালো দেখছি না যে। দেখো না তোমার বন্ধু চাঁচলের মহারাজকে বলে। উনি আশা করি এতটা ব্যাবসাদার নন।

এ সব রাজা-মহারাজাকে বারোভূতে চুষে পদার্থ কিছু ফেলে রাখে না, রবি। কাঁচা টাকা এখন কলকাতায় মাড়োয়ারিদের হাতেই আছে।

জুড়িগাড়ি তখন চিতপুরের এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে। প্রিয়নাথের পাশে আসীন রবীন্দ্রনাথের কানে মোতিচাঁদের শেষ কথাগুলো বাজতে লাগল, ‘রবিবাবু, আসলে বাঙ্গালিরা বেওসা বুঝেন না। পাটের কারবার করলেন, আঁখের কারবার করলেন, লেকিন আলুর বেওসা কেন করলেন না! লাভে লাভ, রবিবাবু! হার সাল হামি আলুর বেওসায় পঁচিশ হাজার লাগাই, সাড়ে চৌত্রিশ হাজার মুনাফা মিলে।

শিলাইদহের পাঠগৃহে ডিভানে অর্ধশয়ান রবীন্দ্রনাথের কানে মোতিচাঁদের সেই অন্তিম উপদেশ বাজতে লাগল, ‘রবিবাবু, আলুর বেওসা করুন, আলুর বেওসা করুন।

ব্যাবসা করাই কি তাঁর নিয়তি? ইতিহাস কি তাঁকে এক অসফল ব্যবসায়ী হিসেবে মনে রাখবে, নাকি এক সর্বতোমুখী প্রতিভাধর সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবে?

রবীন্দ্রনাথ জানেন উত্তরটা কী। ব্যাবসা করলেও তাঁর প্রথম প্রেম, আসল প্রেম, কাব্যচর্চাকে তো কখনও ভুলে যাননি তিনি। মানসী, সোনার তরী, চিত্রা, কল্পনা, কথা ও কাহিনি -র পথ বেয়ে তাঁর কাব্যরচনা সহসা নতুন পথ বদল করেছে। বাংলা আটপৌরে ভাষায়, সহজ সুরে, সরল ছন্দে, একের পর এক কবিতা লিখেছেন তিনি। লিখতে লিখতেই অনুভব করেছেন বাংলা ভাষার কী অসাধারণ শক্তি, কী অনন্য গতিময়তা। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সবসময় একটা পকেটবই ঘোরে। মাথায় নতুন কোনো কবিতার লাইন এলেই, সে পকেটবই খুলে লিখে ফেলেন তিনি। আজ সকালের নানা বিপ্রতীপ, বিক্ষিপ্ত চিন্তায় তাঁর চিত্ত চঞ্চল হয়ে আছে। কিন্তু কী আশ্চর্য, তার মধ্যেই তাঁর মাথায় গুঞ্জরিত নতুন কবিতার লাইন! পকেটবইটা বের করে খাগের কলমে রবীন্দ্রনাথ লিখতে শুরু করলেন:

 

ভাগ্য যবে কৃপণ হয়ে আসে,

বিশ্ব যবে নিঃস্ব তিলে তিলে,

মিষ্টমুখে ভুবন ভরা হাসি

ওষ্ঠে শেষে ওজন-দরে মিলে,

বন্ধুজনে বন্ধ করে প্রাণ,

দীর্ঘদিন সঙ্গিহীন একা,

হঠাৎ পড়ে ঋণশোধেরই পালা,

ঋণীজনের না যায় পাওয়া দেখা,

তখন ঘরে বন্ধ হরে  কবি,

খিলের পরে খিল লাগাওখিল,

কথার সাথে গাঁথ কথার মালা,

মিলের সাথে মিল মিলাও  মিল।

 

কবিপত্নী মৃণালিনী উঠে এসেছেন। ডিভানে অর্ধশয়ান কবির পেছনে দাঁড়িয়েছেন তিনি। বিলি কাটছেন তাঁর ঘন কৃষ্ণ চুলে।

তুমি কিছু ভেব না তো। এই সংকট কেটে যাবে।

বলছ?’

হ্যাঁ গো, আমি বলছি। তুমি কেন এসব ব্যাবসার মধ্যে জড়ালে? ব্যাবসা করা কি তোমার কাজ? তোমার কাজ লেখা, গান করা। ব্যাবসা করার ঢের ঢের লোক তো রয়েছে।

আচ্ছা, ভাই ছুটি, তুমি দ্বিজুবাবু সম্বন্ধে কী মনে কর?’

ভালোই তো। মজার মানুষ। কী সুন্দর হাসির গান লেখেন! আমরা সবাই তো হেসেই কুটিপাটি! তবে…’

তবে?’

তোমাকে ঈর্ষা করেন উনি।

বলছ? কী করে জানলে?’

বুঝতে পারি। আমাদের মেয়েমানুষের মন। আমরা ঠিক বুঝতে পারি।

রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। স্ত্রীলোকের আশ্চর্য স্বাভাবিক বুদ্ধি। মৃণালিনীকে দ্বিজুবাবুর সাম্প্রতিক চিঠির কথা জানাননি তিনি।

মৃণালিনী শুধু চুলে বিলি কাটছেন না, হালকা করে কবির কপালও মালিশ করে দিচ্ছেন। আরামে রবীন্দ্রনাথের দু-চোখ বুজে এল।

হ্যাঁ গো, বেলিটা তো বড়ো হয়ে উঠেছে। বিয়ের কথা কিছু ভাবছ?’

হুঁ, প্রিয়নাথ তো সেই পাত্রের কথা বলছিল। কবি বিহারীলালের ছেলে।

দ্যাখো না সেইটা? প্রিয়বাবু খুব কাজের। ওনাকে তাড়া দাও।

রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘দেব। ছোটোটাকে নিয়ে তো চিন্তা নেই। ওর তো ঠিক হয়েই আছে!’

মৃণালিনী খিল খিল করে হেসে উঠলেন। তারপর ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন। রান্নাঘরে কাজ রয়েছে। চামরুর আনা পাখির মাংস কষিয়ে রাঁধতে হবে।

রবীন্দ্রনাথ পকেটবইটা বের করে আবার লিখতে শুরু করলেন। মন তাঁর ভালো হয়ে গিয়েছে। সেই প্রসন্নতা খাতার ওপর ঝরে পড়তে লাগল:

 

কপাল যদি আবার ফিরে যায়,

প্রভাত-কালে হঠাৎ জাগরণে,

শূন্য নদী আবার যদি ভরে

শরৎ-মেঘে ত্বরিত বরিষণে,

বন্ধু  ফিরে বন্দী করে বুকে,

সন্ধি করে অন্ধ অরিদল,

অরুণ চোখে তরুণ ফোটে হাসি,

কাজল চোখে করুণ আঁখিজল,

তখন খাতা পোড়াও খ্যাপা কবি,

দিলের সঙ্গে দিল লাগাও দিল,

বাহুর সঙ্গে বাঁধো মৃণাল-বাহু,

চোখের সাথে চোখে মিলাও মিল।

(ক্রমশ…)

 

 
 
top