নতুন আলো

 

লোকেন পালিত লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যারিস্টার তারকনাথ পালিতের পুত্র। বয়সে রবীন্দ্রনাথের থেকে বছর চারেকের ছোটো। তাঁদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় প্রথম হয় বিলেতে। সে সময় সতেরো বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। লোকেন ছিলেন তাঁর সহাধ্যায়ী বন্ধু। এই দু-বয়সে বন্ধুত্ব হওয়া কঠিন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কোনো দ্বিধা দেখাননি। বুদ্ধির প্রাখর্য্যে লোকেন পালিত তাঁর সমধর্মাই ছিলেন।

কলেজের লাইব্রেরিতে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা করে। রবীন্দ্রনাথ ও লোকেন সেখানে চুটিয়ে আড্ডা মারতেন। লোকেন বরাবরই হাস্যরসিক। হাসির প্রভূত বাষ্পে তাঁর মন সবসময়ই পরিস্ফীত। কবির সাহচর্যে তা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত।

সবদেশে, সবকালেই ছাত্রীদের মধ্যে পাঠনিষ্ঠায় অন্যায় পরিমাণ আতিশয্য দেখা যায়। কবি ও লোকেনের সরব হাস্যালাপের ওপর তাই বহু নীরব পাঠরতা, নীলনয়নার ভর্ৎসনা-কটাক্ষ বর্ষিত হত। তাতে অবশ্য দুই বন্ধুর কিছু এসে যেত না। শুধু হাস্যালাপই হত বললে ভুল হবে। সাহিত্য আলোচনাও হত। বাংলা বই লোকেন পালিত রবীন্দ্রনাথের থেকে অনেক কম পড়েছিলেন, কিন্তু চিন্তাশক্তির প্রাখর্য্যে সে অভাব তিনি পূরণ করে দিতেন।

রবীন্দ্রনাথ বিলেতে সে যাত্রা বেশিদিন থাকেননি। লোকেন পালিত থেকে গিয়ে সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করেন। ভারতে ফেরার পর কবির সঙ্গে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল সৌহার্দ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে। রবীন্দ্রনাথ তখন সাধনার সম্পাদক। অধিকাংশ লেখা তাঁকেই লিখতে হত। অন্য লেখকদের রচনাকেও কেটেকুটে, ছেঁটেছুটে ছাপার উপযোগী করে তুলতে তাঁকে কলম চালাতে হত নিরন্তর। সেই গদ্য, পদ্যের নৌকোর পালে লোকেনের প্রবল আনন্দ বাতাস দিয়ে সামনে এগিয়ে দিত। কবি যেতেন মফসসলের বাংলোয়, যেখানে লোকেন্দ্রনাথ ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে কর্মরত। লোকেন পালিত আসতেন শিলাইদহে। দুজনের কাব্যালোচনা ও সংগীতের সভা সন্ধে থেকে রাত, রাত গড়িয়ে সকাল পর্যন্ত বিস্তৃত হত। সন্ধ্যাতারার সঙ্গে তাদের আরম্ভ, শুকতারার সঙ্গে তাদের অবসান।

সেই লোকেন এবার শিলাইদহে বেড়াতে এসেছেন। দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের পর কিঞ্চিৎ দিবানিদ্রা। তারপর রবীন্দ্রনাথের বোট পদ্মা-র ছাদে বসেছেন দুজনে। সূর্য অস্তায়মান। আকাশে গোধূলির আলো। মিঠে ঠান্ডা বাতাস বইছে। লোকেন্দ্রনাথ অবিশ্রান্ত চুরুট খান। নদীর হাওয়ায় চুরুট ধরাতে একটু অসুবিধা হচ্ছে বলে নীচে নেমে গিয়ে ধূমায়িত হয়ে ফিরে এলেন। ছাদের আরামকেদারায় গা এলিয়ে খোসগল্পে মেতে উঠলেন দুজনে।

লোকেন বললেনবি, আমার একটা অনুযোগ আছে

কী. ভাই?

দেখো, তুমি মহাকবি। যে যাই বলুক, হেম বাঁড়ুজ্যে, নবীন সেনকে আমি বড়ো কবি বলে গণ্য করি না। আমার কাছে মাইকেলের পরেই তুমি, কিন্তু সে অনুপাতে তুমি লিখছ কই?

রবীন্দ্রনাথ চোখ কপালে তুললেন, সে কী হে? লিখতে লিখতে যে হাতে কড়া পড়ে গেল!

না, মানে আমার খুব আশা যে, তুমি একটা মহাকাব্য লিখবে। মাইকেল মেঘনাদ বধ লিখেছেন, হেমচন্দ্র লিখেছেন বৃত্রসংহার, নবীন সেন লিখেছেন পলাশীর যুদ্ধ। তুমি নীরব কেন? মাইকেলকে বাদ দিলে, তুমি তো এদের থেকে ঢের ঢের বড়ো কবি?

রবীন্দ্রনাথ সলজ্জ হাসলেন, ভাবছিলাম তো একটা মহাকাব্য লিখব। ভেতরে ভেতরে একটা কল্পনা জমাট বেঁধে উঠছিল

তো? থামলে কেন? তোমার গান্ধারীর আবেদন বা কর্ণকুন্তীসংবাদ-র যে ক্লাসিক দার্ঢ্য সেটা পড়তে পড়তে আমি ভাবছিলাম যে, এই তো! হয়ে এসেছে! রবি এবার মহাকাব্য লিখে মাইকেলকে ছাড়িয়ে যাবে

রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলেন: 

তোমার তরে সবাই মোরে

করছে দোষী

হে প্রেয়সী!

বলছে—কবি তোমার ছবি

আঁকছে গানে।

প্রণয়গীতি গাচ্ছে নিতি

তোমার কানে,

নেশায় মেতে ছন্দে গেঁথে

তুচ্ছ কথা

ঢাকছে শেষে বাংলাদেশে 

উচ্চ কথা।

লোকেন সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, টা কী? এটা কী লিখেছ?

রবি সলজ্জে বললেন, ই কবিতাগুলোই তো মাথায় আসছে, লোকেন। এগুলোই তো লিখছি এখন

লে যাও

খাতা দেখে রবীন্দ্রনাথ পড়ে চললেন:

আমি নাবব মহাকাব্য—

সংরচনে

ছিল মনে—

ঠেকল কখন তোমার কাঁকন—

কিঙ্কিনীতে ।

কল্পনাটি গেল ফাটি

হাজার গীতে।

মহাকাব্য সেই অভাব্য

দুর্ঘটনায়

পায়ের কাছে ছড়িয়ে আছে

কণায় কণায়।

হায় রে কোথা যুদ্ধকথা

হৈল গত

স্বপ্ন-মতো!

পুরাণচিত্র বীরচরিত্র

অষ্ট সর্গ

কৈল খণ্ড তোমার চণ্ড

নয়ন-খড়্গ।

রইল মাত্র দিবারাত্র

প্রেমের প্রলাপ,

দিলেম ফেলে ভাবীকেলে

কীর্তিকলাপ।

শ্চর্য! বলে উঠলেন লোকেন, কার কাঁকন-কিঙ্কিনী, রবি?

বুঝলে না? আমার মানসসুন্দরীর। আমি গীতিকবি লোকেন। গীতিকবিতায় আমার সুখ, আমার সিদ্ধি। আমি কোন্ দুঃখে মহাকাব্য লিখতে যাব? আমি মাইকেল, হেম, নবীন, কিচ্ছু হতে চাই না, লোকেন। আমি আমি হতে চাই। ওয়র্ডসওয়ার্থ কি প্যারাডাইস লস্ট লিখতে গেছিলেন? তিনি কি মিল্টন হতে চেয়েছিলেন?

ঠিআরামকেদারায় আসীন লোকেন পালিত ভাবিত হয়ে পড়লেন। চুরুটের ধোঁয়া গলগল করে নদীর সান্ধ্য বাতাসে মিলিয়ে যেতে লাগল।

বি, তুমি মহাকাব্য লিখছ না ঠিকই, কিন্তু যা লিখছ তা অত্যাশ্চর্য, অদ্ভুত !এতো খটোমটো বাংলা নয় !এতো সহজ, আটপৌরে বাংলা ভাষা !

ঠিক লোকেনএই কবিতাগুলোতে একদম আটপৌরে, সহজ ভাষা ব্যবহার করছি

সেই ভাষার এতো শক্তি!এতো ঝর্নার ধারার মতো সহজ স্রোতে এগিয়ে চলেছে

রবীন্দ্রনাথ উৎসাহিত হয়ে উঠলেন, ঠিক বলেছ, লোকেন! বাংলা ভাষা যত ঘাঁটছি, যত খুঁড়ছি, তার রূপ দেখে, শক্তি দেখে, সৌন্দর্য দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি

দুই বন্ধু পায়ে পায়ে বজরার নীচের ঘরে নেমে এসেছেন। সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে।

কাব্যপাঠের পক্ষে বাইরের আলো অনুকূল নয়। ভৃত্য এসে বহুমূল্য চিনা লণ্ঠনে প্রদীপ জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ ও লোকেন জমিয়ে বসলেন। রন্ধনপটিয়সী মৃণালিনী দেবী বেশ কিছু মাংসের বড়া প্লেটে প্লেটে সাজিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেদিকে তাকিয়ে অকৃতদার লোকেন কপট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বেশ ভালোই তো আছ?! দাম্পত্যসুখ! গৃহসুখ!

রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলেন:

আমি যে বেশ সুখে আছি

অন্তত নই দুঃখে কৃশ,

সে কথাটা পদ্যে লিখতে

লাগে একটু বিসদৃশ।

লোকেন্দ্রনাথ অট্টহাস্য করে উঠলেন—টাও কি কবিতা না কি?

সেই কারণে গভীর ভাবে

খুঁজে খুঁজে গভীর চিতে

বেরিয়ে পড়ে গভীর ব্যথা

স্মৃতি কিম্বা বিস্মৃতিতে।

কিন্তু সেটা এত সুদূর

এতই সেটা অধিক গভীর

আছে কি না আছে তাহার

প্রমাণ দিতে হয় না কবির।

Wonderful! Excellent! Superb!

লোকেনের উচ্ছ্বাসে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ বেড়ে গেল। দীর্ঘকায় তিনি। আরামকেদারা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে একটা কপট অভিবাদন করলেন। তারপর বললেন:

কাব্য পড়ে যেমন ভাবো

কবি তেমন নয় গো।

আঁধার করে রাখেনি মুখ,

দিবারাত্র ভাঙছে না বুক,

গভীর দুঃখ ইত্যাদি সব

হাস্যমুখেই বয় গো।

বজরার কক্ষে রবীন্দ্রনাথের উদাত্ত কণ্ঠে কাব্যপাঠ ঝঙ্কৃত হচ্ছে। হো হো করে হাসছেন লোকেন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথ বলে চললেন:

সুখে আছি লিখতে গেলে

লোকে বলে ‘প্রাণটা ক্ষুদ্র’!

আশা এর নয়কো বিরাট,

পিপাসা এর নয়কো রুদ্র!

পাঠকদলে তুচ্ছ করে,

অনেক কথা বলে কঠোর—

বলে, ‘একটু হেসে খেলেই

ভরে যায় এর মনের জঠর।’

কবিরে তাই ছন্দে বন্ধে

বানাতে হয় দুখের দলিল।

মিথ্যা যদি হয় সে তবু

ফেলো পাঠক চোখের সলিল।

তাহার পরে আশিস কোরো,

রুদ্ধকণ্ঠে ক্ষুব্ধবুকে,

কবি যেন আজন্মকাল

দুখের কাব্য লেখেন সুখে।

লোকেন্দ্রনাথের অট্টহাস্যে বজরার কাঠের ছাদ কাঁপতে লাগল। চিনা লণ্ঠনের আলো দপদপ করতে লাগল। নিবে যায় আর কী!

কী লিখেছ, রবিকবি যেন আজন্মকাল দুখের কাব্য লেখেন সুখে!

Genius! Absolute Genius!

দুই বন্ধুর কলহাস্যে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী আকৃষ্ট হয়ে পাঠকক্ষে প্রবেশ করেছেন। স্মিত হাসছেন তিনিও। বললেন, মাংসের বড়াগুলো কেমন হয়েছে?

সুপার্ব, বউদি! আপনি সাক্ষাৎ দ্বিতীয় দ্রৌপদী!

রাতের আয়োজন আরো বেশি। এখনই পুরো পেট ভরিয়ে ফেলবেন না যেন

মেনুটা কী, জানতে পারি বউদি?

শাই, অত জেনে কাজ কি? একটু সারপ্রাইজই থাকুক না

রবীন্দ্রনাথ বললেন, চিতলের পেটি! চিতলের মুইঠ্যা। তোমার জন্য স্পেশাল করে বানানো হচ্ছে

মৃণালিনী কপটক্রোধে দু-চোখে অগ্নিবর্ষণ করে বললেন, বিশ্বাসঘাতক! সব বেমক্কা ফাঁস করে দিচ্ছ!

লোকেন হাসতে লাগলেন। বললেন, বি! লোকে গৃহসুখ, দাম্পত্যসুখ ছেড়ে কোন দুঃখে বনে গিয়ে তপস্যা করে বলতো? আমি তো ভেবেই পাই না

থার্থ বলেছ:

আমি হব না তাপস, হব না, হব না,

যেমনই বলুন যিনি।

আমি হব না তাপস নিশ্চয় যদি

না মেলে তপস্বিনী।

আমি করেছি কঠিন পণ

যদি না মিলে বকুলবন,

যদি মনের মতন মন

না পাই জিনি

তবে হব না তাপস, হব না, যদি না

পাই সে তপস্বিনী

পত্নী মৃণালিনীর চিবুক আদর করে নেড়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ:

আমি ত্যজিব না ঘর, হব না বাহির

উদাসীন সন্ন্যাসী,

যদি ঘরের বাইরে না হাসে কেহই

ভুবন-ভোলানো হাসি।

ছাড়ো! অসভ্যতা কোরো না!

যদি না উড়ে নীলাঞ্চল,

মধুর বাতাসে বিচঞ্চল,

যদি না বাজে কাঁকন মল

রিনিক-ঝিনি—

আমি হব না তাপস, হব না, যদি না

পাই গো তপস্বিনী। 

কী, ভাই ছুটি! চলো, আমরা দুজনে তপস্যা করতে যাই চলো!

র তপস্যা! ঘর-সংসারের কী হবে? ছেলেপুলের কী হবে? চিতল মাছেরই বা কী হবে? ছাড়ো! পালাই!

কবির হাত ছাড়িয়ে মৃণালিনী দৌড়ে পালালেন। গমনোদ্যত পত্নীর চঞ্চল গতিভঙ্গি দেখে অট্টহাস্য করে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে সঙ্গে যোগ দিলেন লোকেন।

রবীন্দ্রনাথ বললেন, ভাই লোকেন, যাই বল, বনে যদি সস্ত্রীক যেতে হয় তাহলে এই বয়সই ভাল

তোমার এখন কত বয়েস চলছে, রবি?

র বল কেন? প্রায় চল্লিশে পা দিলাম। চল্লিশ পেরোলেই তো চালসে! 

বনে এত বকুল ফোটে,

গেয়ে মরে কোকিল পাখি,

লতাপাতার অন্তরালে

বড় সরস ঢাকাঢাকি।

চাঁপার শাখে চাঁদের আলো,

সে দৃষ্টি কি কেবল মিছে?

-সব যারা বোঝে তারা,

পঞ্চাশতের অনেক নীচে।

পঞ্চাশোর্ধ্বে বনে যাবে

এমন কথা শাস্ত্রে বলে,

আমরা বলি বাণপ্রস্থ

যৌবনেতেই ভাল চলে 

র বুড়োরা? 

বুড়ো থাকুন ঘরের কোণে,

পয়সাকড়ি করুন জমা,

দেখুন বসে বিষয়-পত্র,

চালান মামলা-মকদ্দমা,

ফাগুন-মাসে লগ্ন দেখে

যুবারা যাক বনের পথে,

রাত্রি জেগে সাধ্যসাধন

থাকুন রত কঠিন ব্রতে 

হাসতে হাসতে লোকেনের চোখে জল এসে গেছে। অবরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, তোমাদের বিবেকানন্দ স্বামী তো উল্টো কথা বলছে হে? বলছে, কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ করতে! ব্রহ্মচর্য পালন করতে! ও তো তোমার এইসব কবিতা দেখলে রাগে ভস্ম করে ফেলবে হে! আবার কিছু বিদেশি শিষ্যাও জুটিয়েছে শুনছি

রবীন্দ্রনাথ সংক্ষেপে বললেন, হুঁ। বেশি কথা বলা সমীচীন মনে হল না তাঁর।

তই স্বামীজির গেরুয়া ধরুক, ও আমার কাছে সিমলেপাড়ার নরেন দত্তই থাকবে। দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গার উল্টোদিকে নাকি জমি কিনে কী সব বাগানবাড়ি বানাচ্ছে?

বাগানবাড়ি না, মঠ। সন্ন্যাসীদের থাকার মঠ। জায়গাটা বালির খুব কাছে—নাম বেলুড়। শুনেছি খুব সুন্দর জায়গা

তুমি এইসব বুজরুকি বিশ্বাস কর, রবি?

বীন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন না। আরামকেদারায় দীর্ঘ দেহ প্রসারিত করে উজ্জ্বল দৃষ্টি মেলে লোকেন পালিতের দিকে চেয়ে রইলেন

লোকেন বললেন, মাঝে তোমাদের দেখা হয়েছিল না?

মাথা হেলালেন রবীন্দ্রনাথ, হ্যাঁ। গত বছর সিস্টার নিবেদিতার বাসায় একটা টি-পার্টির আয়োজন হয়েছিল। অনেকে নিমন্ত্রিত ছিলেন

ঠি! ঠিক! নামটা মনে পড়ছে। সিস্টার নিবেদিতা—ভগিনী নিবেদিতা। ওনাকে কেমন মনে হয় তোমার, রবি?

রবীন্দ্রনাথের অনিন্দ্যসুন্দর মুখে সংশয়ের ছায়াপাত হল। ভগিনী নিবেদিতার সঙ্গে তাঁর গত দু-বছরের আলাপ। মাঝেমধ্যে এখানে, সেখানে দেখা হয় তাঁদের। ভাগ্নী সরলা ঘোষালের সঙ্গেও নিবেদিতার বিশেষ খাতির। কিন্তু নিবেদিতার সংস্পর্শে এলে কেমন সঙ্কুচিত বোধ করেন তিনি। নিবেদিতার সঙ্গ কবির কাছে খুব প্রীতিপ্রদ নয়।

রবীন্দ্রনাথ বললেন, নি জাতে আইরিশ। আসল নাম মার্গারেট নোবল

তো? তোমার তো কোনদিনই জাতের ছুৎমার্গ ছিল না?

না, সে কথা হচ্ছে না। আসলে কী জান, লোকেন—এই পাশ্চাত্য জাতটা গায়ের জোরটা খুব পছন্দ করে। মনে করে যে গায়ের জোরে, বিরোধী মত উড়িয়ে দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করবে। আমরা প্রাচ্যরা তুলনায় অনেক বেশি মৃদু স্বভাবের। নিবেদিতার সঙ্গ এইজন্য আমার কাছে তৃপ্তিদায়ক নয়। উনি সবসময় যুদ্ধং দেহি হয়ে রয়েছেন। সবসময় আদর্শের তাল ঠুকছেন। ভাবছেন যে বাগ্মীতা আর কথার জোরে বিপক্ষকে স্বপক্ষে টেনে আনবেন। ওঁর সঙ্গে সবসময়ই আমার একটা ঠান্ডা লড়াই চলে

র্থাৎ তুমি ওঁকে পছন্দ কর না?

ছন্দ করি বলব না, কিন্তু শ্রদ্ধা করি। ভাবো দেখি—ঘর, সংসার, ধর্ম, দেশ ছেড়ে এক বিজন-বিভুঁইতে এক কথায় চলে আসা? তুমি পারতে? আমি পারতাম? আর নরেনের প্রতি ওঁর ভক্তি,শ্রদ্ধাও অকৃত্রিম। অনেকবার সে প্রমাণ আমি পেয়েছি

তা, সেদিনের টি-পার্টিতে কী হল?

তেমন কিছু নয়। জগদীশ ছিলেন। আমি ছিলাম। ড. মহেন্দ্রলাল সরকার ছিলেন। আমি তিনটে গান গাইলাম। নরেনও কিছু বলল

কী বলল?

যা ও সর্বত্র বলে থাকে, তাই আর কী হিন্দুধর্মের মাহাত্ম্য  অদ্বৈত, বেদান্ত, সর্বধর্মসমন্বয়, ইত্যাদি। তবে দুর্দান্ত বক্তা—Powerful Orator

ত্যি?

হ্যাঁ, লোকেন। আমি কেশব সেনের বক্তৃতা শুনেছি, সুরেন বাঁড়ুজ্যের শুনেছি। এরা ভালো বক্তা।কিন্তু মানতেই হবে যে নরেন অন্যস্তরের। আমি বিলেতেও ওর দরের ইংরেজি বক্তৃতা শুনিনি

ঠিক বলছ? মনে আছে তুমি আর আমি পার্লামেন্ট ভবনে গিয়ে গ্ল্যাডস্টোন আর জন ব্রাইটের বক্তৃতা শুনতাম? তাদের থেকেও ভালো?

হ্যাঁ। তাদের থেকেও ভালো। বিলেত-আমেরিকায় এত প্রশংসা ও এমনিএমনি পায়নি

তা, নরেন সেদিন তোমার সাথে কোন্ কথা বলল?

না, তেমন আর বলল কই? ভাব দেখে তো মনে হল চিনতেও পারেনি

শ্চর্য! কিন্তু তোমরা তো পরস্পরকে ভালো করেই চেনো, তাই না?

বশ্যই। নরেনের কাকা তারক দত্ত তো আমাদের জোড়াসাঁকোর বাড়ির উকিল ছিলেন। আমরা ওদের বাড়ি গিয়েওছি। এমনকী নরেন আমার কাছে গান পর্যন্ত শিখেছে

তুমি নরেনকে গান শিখিয়েছ!

হ্যাঁ। ও তো ভালো গায়কও বটে। মার্গসংগীত শিখত সিমলের কানাইবাবুর কাছে। রাজনারায়ণবাবুর মেয়ের বিয়েতে আমার লেখা দু-তিনটে গান ওকে শিখিয়েছিলাম। দারুণ গলা

সেই নরেন তোমায় দেখে চিনতে পারল না!

চিনতে পারল না, না চিনেও না-চেনার ভান করল — কে জানে?

কেন বলছ এ কথা?

নিবেদিতার কাছে আমাদের সম্বন্ধে কিছু মন্তব্য করেছে। জানো তো মেয়েদের পেটে কথা থাকে না। নিবেদিতা আবার হুড় হুড় করে সব কথা সরলাকে লাগিয়েছে

কী বলেছে?

লেছে যে, আমরা, ঠাকুরবাড়ির ছেলেরা, নাকি সাহিত্যের নাম করে সারাদেশে দুর্নীতি, প্রেম আর আদিরসের বন্যা বইয়ে দিচ্ছি। আর কিছু মন্তব্য তো মনে হয় আমাকে উদ্দেশ্য করেই ও করেছে

কী বলেছে?

রবীন্দ্রনাথ হাসলেন, বাদ দাও, লোকেন, যেতে দাও। কী হবে এসব ঘেঁটে?

না, রবি, তুমি আমার বন্ধু। আমার বন্ধু সম্বন্ধে আপত্তিকর মন্তব্য কেউ করলে নিশ্চয়ই আমার তা জানার অধিকার আছে

বলেছে, মার নাকি মেয়েমানুষের মতো বেশভূষা। নরম নরম বুলি কাটি। এঁকেবেঁকে চলি। কারো চোখের ওপর চোখ রেখে কথা কইতে পারি না। ভূমিষ্ঠ হয়ে অবধি পিরীতের কবিতা লিখি আর বিরহের জ্বালায় হায় হাসান, হায় হোসেন করি

কে? তোমার ওপর এত রাগ কেন?

জানি না। তবে কড়ি ও কোমল বেরোনোর পর একবার ওর সাথে ব্রাহ্মসমাজের এক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল। ও তখন দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণ পরমহংসের কাছে যাতায়াত করছে। ব্রাহ্মসমাজ ছেড়ে দিয়েছে বললেই হয় । আমার দিকে জ্বলন্ত চোখে চেয়ে থেকে বলেছিল, রবিবাবু! এসব কী ছাইপাঁশ লিখছেন? আপনার এই সনেট—‘বিবসনা’, এটা কোনো কবিতা হয়েছে? এ তো অশ্লীলতার উৎসমুখ! বেলেল্লাপনার প্রস্রবণবলে হন হন করে হেঁটে উল্টো বাগে চলে গেছিল

বুকশেল্ফে সারি সারি রবীন্দ্রনাথের বই সাজানো। লোকেন পালিত আরামকেদারা থেকে উঠে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। কড়ি ও কোমল-এর একটা কপি বের করে পাতা উল্টোতে লাগলেন, ই তো পেয়েছি!বিবসনা— 

ফেলো গো বসন ফেলো—ঘুচাও অঞ্চল।

পরো শুধু সৌন্দর্যের নগ্ন আবর 

রবীন্দ্রনাথ ব্যস্ত হয়ে বললেন, চু! চুপ! লোকেন! 

কে? চুপ করব কেন? 

রে, রথী বড়ো হচ্ছে। ও অনেকসময় আড়ি পেতে বড়োদের কথা শোনে 

লোকেন ভ্রূক্ষেপও করলেন না। পড়ে চললেন:

সুরবালিকার বেশ কিরণবসন,

পরিপূর্ণ তনুখানি বিকচ কমল,

জীবনের যৌবনের লাবণ্যের মেলা।

বিচিত্র বিশ্বের মাঝে দাঁড়াও একেলা।

সর্বাঙ্গে পড়ুক তব চাঁদের কিরণ,

সর্বাঙ্গে মলয়-বায়ু করুক সে খেলা। 

রবীন্দ্রনাথ এর মধ্যে একবার বাইরে দেখে এসেছেন। না, জ্যেষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথ কোথাও ঘাপটি মেরে বসে নেই। আরেক ঘাপটি-বিশারদ বেলিকেও দেখা যাচ্ছে না। 

লোকেন পড়ে চলেছেন:

অসীম নীলিমা মাঝে হও নিমগন

তারাময়ী বিবসনা প্রকৃতির মতো,

অতনু ঢাকুক মুখ বসনের কোণে

তনুর বিকাশ হেরি লাজে শির নত।

আসুক বিমল উষা মানবভবনে,

লাজহীনা পবিত্রতা—শুভ্র বিবসনে। 

কাব্যপাঠ শেষে বই থেকে মাথা তুলে লোকেন বললেন, সব পড়ে নরেন যদি ক্ষেপে যায়, তাহলে ওকে বিশেষ দোষ দিতে পার না, রবি

কিন্তু লোকেন কড়ি ও কোমল-এই তো আমি থেমে যাইনি। তারপর লিখেছি মানসী, সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালিকড়ি ও কোমল আমার প্রথমদিককার লেখা। নরেন আমার পরের লেখাগুলো তার মানে কিছুই পড়েনি 

ঠি 

রেকটা ব্যাপারও বুঝি না, লোকেন। আমাদের দেশাত্মবোধীদের প্রেমের কবিতার ওপর এত রাগ কেন? রাজা বিক্রমাদিত্য শক দস্যুদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বীর ছিলেন তিনি। কিন্তু কালিদাসকে কি মেঘদূত লিখতে বারণ করেছিলেন? যে পৌরুষের আমরা সাধনা করছি, তা তো আমার মনে হয় একেবারেই নিষ্ফলা। এ নকল পৌরুষ 

ঠি, ঠিক, রবি! মনে পড়ছে তুমি তোমার মানসী কাব্যে এ ব্যাপারে কিছু লিখেছিলে

হ্যাঁ, দেশের উন্নতি:

হয়তো আমি শয্যা পেতে

মুগ্ধহিয়া আলস্যেতে

ছন্দ গেঁথে নেশায় মেতে

প্রেমের কথা কই।

শুনিয়া যত বীরশাবক

দেশের যাঁরা অভিভাবক

দেশের কানে হস্ত হানে,

ফুকারে হৈ-হৈ 

রবীন্দ্রনাথের কথা শেষ হল না। উর্দি-আঁটা ভৃত্য ঢুকে খবর দিল  নৈশাহার প্রস্তুত। কবি ও বন্ধু পাশের ঘরে প্রবেশ করলেন। বজরার এই ঘরটা ডাইনিং রুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবলুশ কাঠের মস্ত টেবিল। ফুলদানিতে দু-জোড়া গোলাপ সুগন্ধ বিতরণ করছে। অবগুণ্ঠনবতী মৃণালিনী দেবী তদারক করছেন। টেবিলের ওপর থরে থরে দেবভোগ্য খাদ্যবস্তুর সম্ভার। কী নেই সেখানেসরু চালের ভাতমাছের মাথা দিয়ে সোনামুগের ডালবেগুনভাজাশুক্তোচিংড়ি মাছের মালাইকারিপাঁঠার কালিয়া এবং সর্বোপরি চিতল মাছের পেটি ও মুইঠ্যা। চিতলের পেটিগুলো প্রায় একফুট লম্বা। প্রকাণ্ড ডিশে যেন সোনা মেখে হাসছে।

মৃণালিনী বললেন, ঠাকুরপো! অনেক কষ্ট করে নিজের হাতে রেঁধেছি। সব খেতে হবে কিন্তু!

বউদি! আমাকে কি বকরাক্ষস ঠাউরেছেনসহাস্যে বললেন লোকেন

তারপর দুই বন্ধু আহারে নিমগ্ন হলেন। টেবিল ঘিরে ছোট ছোট আরো কয়েকটা চেয়ার। বড়ো মেয়ে মাধুরীলতা, জ্যেষ্ঠপুত্র রথীন্দ্রনাথ এবং মেজো মেয়ে রেণুকাও বসেছে। রবীন্দ্রনাথের অপর দুই ছেলেমেয়ে—শমীন্দ্রনাথ ও মীরা নিতান্তই ছোট। তারা মার কোলে বসে আগেই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রতিটি চেয়ারের পিছনে একজন করে ভৃত্য বহাল আছে। যখন যার যা চাহিদা, তা তারা এনে দিচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ বাচ্চাদের সাথে খেতে পছন্দ করেন। খাওয়ার সময় বেশ গল্পগুজব হয়। বাচ্চারা অনেক কিছু শিখতে পারে। এদের মধ্যে বেলি বেশ গপ্পোবাজ। মায়ের স্বভাব পেয়েছে। সে পলানের গল্প শুরু করল। শিলাইদহের গয়লাপাড়ার কৈলাস ঘোষের বিধবা স্ত্রী হল পলানের মা। তার দেওয়া দুধে জল নাকি থাকবেই থাকবে। শুধু জল মেশানো নয়, পলানের মা নাকি ভয়ঙ্কর ঝগড়ুটে। তার বেচারা ছেলেটাকেও সে নাকি প্রচণ্ড মারধোর করে।

বাবা, পলানের মা ছেলেকে সাধুভাষায় কী বলে, জান?

কী?

বলে, লায়ন! হি হি হি! বাবা, পলানের সাধুবাংলা কি পলায়ন হতে পারে?

মাধুরীলতা দুলে দুলে হাসতে লাগল। রবীন্দ্রনাথের মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। লোকেন্দ্রনাথ অট্টহাস্য করে উঠলেন।

বড়ো ছেলে রথীও বেশ মিশুক। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র মাঝে মাঝে শিলাইদহে বেড়াতে আসেন। রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে বেশ সহজভাবে, বন্ধুর মতো মেশেন। শিলাইদহে এসে জগদীশ ভুলে যান যে, তিনি বিজ্ঞানী। তিনি এলেই দুজনে মিলে বিস্তীর্ণ পদ্মার চরে বেড়াতে বেরিয়ে পড়েন। সেখানকার অনন্ত নিস্তব্ধতার মধ্যে জগদীশ হারিয়ে যান। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে বক, ডাহুক ও বিবিধ জলজ পাখি। শেয়ালছানারা ঘুরে বেড়ায়। বালি খুঁড়ে দুজনে বের করেন কচ্ছপের ডিম। 

তাঁর গল্প শুনে লোকেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, বি, শিলাইদহে এসে বুঝেছি যে, এই জায়গাটা তোমার পক্ষে বড়ো প্রয়োজন। এর মানুষজন সরলপ্রকৃতির, উদার। তোমার গল্প, তোমার কবিতার রসদ তুমি তো এখান থেকেই সংগ্রহ করে নিতে পার। তার ওপর অখণ্ড অবসর।সৃষ্টি করতে আর কী চাই, রবি? 

ঠিক লোকেন। কলকাতা আমার ভালো লাগে না। ওখানে আমি হাঁপিয়ে উঠি। জোড়াসাঁকোয় আমি জন্মেছি কিন্তু ওখানে থেকেও তিলমাত্র স্বস্তি পাই না। বড়ো গণ্ডগোল, তাড়াহুড়ো, ভিড়ভাট্টা। আমার শিলাইদহই ভালো

গদীশের খবর কী?

ভালো না। প্যারিসে যাবার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন কিন্তু সরকার থেকে ওর পেছনে লেগে নানা গোলমাল পাকাচ্ছে। দুঃখ করে চিঠি লিখেছিলেন। পড়ে নিজের মনে প্রবল ধিক্কার এল

সাহেবদের ওপর চটছ?

শুধু সাহেব কেন, লোকেন? আমরা দেশের মানুষই কি কিছু কম অপদার্থ। এত বড়ো একজন বিজ্ঞানী—তাঁকে কেন সাহেবদের দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে? আমরা কেন তাঁর জন্য একটা ভালো গবেষণাগার গড়ে দিতে পারব না? তাঁর গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতে পারব না?

তোমার বন্ধু সেই ত্রিপুরার মহারাজকে বলবে না কি?

লোকেন, আমি নিজে যদি এই ঠাকুর কোম্পানির ব্যাবসায় ফেঁসে গিয়ে ঋণগ্রস্ত না হতাম, তাহলে কাউকে ধরতে হত না। জগদীশের ব্যবস্থা আমি নিজেই করতাম। এ তো আমাদের জাতীয় কর্তব্য, লোকেন

খাওয়া হয়ে গেছে। সবাই একে একে টেবিল ছেড়ে উঠছেন। কলহাস্য ও গল্পমুখর সেই পরিবেশে একজনই কোনো কথা বলেনি। মুখ বুজে, গম্ভীর মুখে, নীরবে খেয়ে গেছে। খুব বেশি যে খেয়েছে, তাও নয়। ভুক্তাবশেষ তার কাঁসার থালায় স্তূপীকৃত হয়ে রয়েছে—রবীন্দ্রনাথের মধ্যমা কন্যা রেণুকা।

তার দিকে তাকিয়ে লোকেন বললেন, তোমার এই মেয়ে বড্ড চুপচাপ, রবি

হ্যাঁ, ও একটু একা একা নিজের জগতে থাকতে পছন্দ করে

শ্যামলা, কৃশকায়া রেণুকা গম্ভীর মুখে, কোনো কথা না বলে ডাইনিং টেবিল ছেড়ে উঠে চলে গেল।

খাবার পর কবি ও লোকেন বজরার ছাদে বসলেন। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। পদ্মার ঝোড়ো হাওয়ায় দুজনের চুল উড়তে লাগল। এই সময়টা গানের সময়। যখন রাত্রি ঘনিয়ে আসে, অন্ধকারে দিকচক্রবাল এক হয়ে যায়, তখন সেই নৈশ নিস্তব্ধতায় কবি সুরের জাল বোনেন। লোকেন বললেনগান গাও রবি

রবীন্দ্রনাথকে বলতে হল না। তিনি খালি গলায় গান জুড়লেন:

ওরে সাবধানী পথিক, বারেক

পথ ভুলে মরো ফিরে।

খোলা আঁখি-দুটো অন্ধ করে দে

আকুল আঁখির নীরে।।

সে ভোলা পথের প্রান্তে রয়েছে

হারানো হিয়ার কুঞ্জ,

ঝরে পড়ে আছে কাঁটা-তরুতলে

রক্তকুসুমপুঞ্জ—

সেথা দুই বেলা ভাঙা-গড়া-খেলা

অকূল সিন্ধুতীরে।।

অনেক দিনের সঞ্চয় তোর

আগুলি আছিস বসে,

ঝড়ের রাতের ফুলের মতন

ঝরুক পড়ুক খসে।

আয় রে এবার সব হারাবার

জয়মালা পরো শিরে। 

কবির উদাত্ত কণ্ঠ পদ্মার নৈশবাতাসে মিশে যেতে লাগল। মুগ্ধ লোকেন বললেন, বাহ্, রবি! নতুন লিখেছ?

হ্যাঁ, চিরকুমার সভা বলে একটা নাটক লিখছি, তারই গান

চিরকুমার সভা? যেটা সরলার ভারতীতে বেরোচ্ছে?

হ্যাঁ। আর বল কেন! সরলাটা কেমন পাগলি তা তো জান? আমাকে না জানিয়ে ফস্ করে ভারতীতে বিজ্ঞাপন ছেড়ে দিয়েছে যে, আগামী সংখ্যা থেকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রহসন লিখবেন। কী আর করি? ভাগ্নীর অনুরোধ বলে কথা!

ভারতীর রিসেন্ট কপি পাইনি। কী নিয়ে লিখছ?

য়েকজন তরুণ যুবা ধনুর্ভঙ্গ পণ করেছে যে, তারা চিরকুমার থেকে গিয়ে দেশের কাজ করবে। তাদের পণ কী করে ভঙ্গ হল—তাই নিয়ে প্রহসন। প্রজাপতিকে ক্ষেপিয়ে কি ভাই কোনো লাভ আছে?

বাস্ রে! এটা কি নরেনদের কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগের ওপর ব্যঙ্গ?

তকটা বলতে পার। এদের এই আজীবন কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগ আর ব্রহ্মচর্যের ব্রত আমার খুব সুস্থ বা স্বাভাবিক বলে মনে হয় না। নারীর সান্নিধ্য না পেলে পুরুষ কোনোদিন পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না, লোকেন। সুতরাং এই আধুনিক ঋষ্যশৃঙ্গদের কী করে তপোভঙ্গ হল, তা নিয়ে তো বেশ একটা মজাদার প্রহসন ফাঁদা যেতেই পারে। লিখতে লিখতে মজাও পাচ্ছি বেশ

তোমার এই গানটা নরেনকে শিখিয়ে দাও না?

রবীন্দ্রনাথ উচ্চহাস্য করলেন, রেনকে শেখাব এই গান? ও তো তেড়ে মারতে আসবে! আর শেখাতে চাইলেও শিখতে পারবে কি না সন্দেহ

কে?

কালোয়াতি গান শিখছে। কালোয়াতি গানের ওস্তাদরা আমার এখনকার গান গাইতে গেলে সমস্যায় পড়ে। লোকেন আমি তো মাঝে মাঝেই রাগচ্যুত হই। দ্বিজুবাবুও একই কথা বলেন। বলেন, রবিবাবু আপনার গান শুনতে সোজা, গাইতে কষ্ট। রাগরাগিণী মিলিয়ে মিশিয়ে আপনি এমন খিচুড়ি বানান যে, আমরা তল খুঁজে পাই না।

কে? এত রাগরাগিণীর মিশ্রণ করছ কেন?

লোকেন, আমার কাছে গানের কাব্যের ভাবটাই মুখ্য। ধর, এই গানটা খাম্বাজে বেঁধেছি, কিন্তু প্রকৃত খাম্বাজের চলন এতে নেই। ভাব বজায় রাখতে গিয়ে খাম্বাজ রাগটা মরল না বাঁচল তা নিয়ে আমার কোনোরকম মাথাব্যথা নেই

লোকেন বললেন, দ্বিজুবাবুর কি কিছু হয়েছে?

কে?

মাঝে হঠাৎ কোনো খবর না দিয়ে আমার বাসায় উপস্থিত। সেদিন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম। অত নজরও দিতে পারিনি। মুখ ঘোঁচ করে বসে রইলেন। ভালোভাবে কারুর সাথে কথাও বললেন না

দ্বিজুবাবু তো খুব আমুদে লোক? যেখানে যান—হাসিঠাট্টায়, হাসির গানে মাতিয়ে রাখেন?

তাই তো, রবি। ভাবছি ওনার হলটা কি? এমন আমুদে, সদাহাস্যময় মানুষটা থম মেরে গেলেন কেন?

রবীন্দ্রনাথ নিজেও সম্প্রতি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কাছ থেকে একটা অদ্ভুত চিঠি পেয়েছেন। বললেন, কাজ করে বোধহয় সুখ পাচ্ছেন না। এই নিয়েই বোধ করি অশান্তি!

লোকেন মলিন হাসলেন, সাহেবদের অধীনে কাজ করে সত্যিই সুখ নেই, রবি। চাকুরির দড়িদড়া যদি অঙ্গের ভূষণ হতে পারে, প্রতিনিয়ত যদি জো-হুজুর বলে সেলাম ঠুকতে পার, তবেই তোমার উন্নতি। আমি ম্যাজিস্ট্রেট তো, তাই হাড়ে হাড়ে বুঝি এটা। প্রতি মুহূর্তেই ওরা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ওরা রাজার জাত আর আমরা নেহাতই পদলেহি ভৃত্য

যেমন জগদীশ হাড়ে হাড়ে বুঝছেন!

চ্ছা রবি? সরলার খবর কী? ও শুনছিলাম নরেনের সাথে নাকি বিলেত যাবে?

পাগলিটা কখন কী করে, কখন কী ভাবে, তার তাল রাখা আমার পক্ষে মুশকিল,  লোকেন। হ্যাঁ, মাঝে ও নিবেদিতা আর নরেনকে নিয়ে খুব মাতামাতি করেছিল বটে। বিলেত যাবার কথাও হয়েছিল শুনেছি। কেন সব ভেস্তে গেল জানি না। দিদি-জামাইবাবু হয়তো পছন্দ করেননি

কি চিরটাকাল আইবুড়ো হয়েই থাকবে? ইন্দিরার তো বেশ দেখি বিয়ে হয়ে গেল

বীন্দ্রনাথের ভাইঝি ইন্দিরা দেবীর সম্প্রতি বেশি বয়সে বিয়ে হয়েছে প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে। বিয়ে নিয়েও কম গণ্ডগোল হয়নি। একসময় তো সবকিছু ভেস্তেই যাচ্ছিল। তবে বিয়েটা সুখের হয়েছে। ইন্দিরা ও প্রমথ পরস্পরের মধ্যে মগ্ন হয়ে রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পত্নী মৃণালিনী সুগৃহিনী, গৃহকর্মনিপুণা, রন্ধনপটিয়সী। কিন্তু কবিকে মানসিক সঙ্গদানে অক্ষম। ভেতরে ভেতরে রবীন্দ্রনাথ একা, খুব একা। কোনো সৃজনশীল পুরুষের প্রতিভার দীপ্তিকে জাগিয়ে তুলতে হলে আলো চাই। চাই প্রেরণা। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি সেই প্রেরণা সেই আলো আসে প্রেমময়ী কোনো নারীর কাছ থেকে। প্রথম যৌবনে রবীন্দ্রনাথ যেটা বৌঠান কাদম্বরী দেবীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন। তারপর ভরা যৌবনে সুন্দরী, শিক্ষিতা, সূক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্না ইন্দিরাই ছিল তাঁর প্রেরণার উৎস। কত কবিতা তাকে উৎসর্গ করেছেন। শিলাইদহে পদ্মায় বাসকালে অপূর্ব নৈসর্গিক শোভা তাঁর মনে যে অনির্বচনীয় ভাবের সৃজন করত, তা কত অসংখ্য পত্রে ইন্দিরাকে লিখে জানিয়েছেন। ইন্দিরা তো মাঝে মাঝেই বলে—রবিকা! আমাকে লেখা তোমার চিঠিগুলো ভাবছি ছাপিয়ে ফেলি। নইলে এমন অমূল্য সম্পদ নষ্ট হয়ে যাবেসেই ইন্দিরার বিয়ে হয়ে গেলপ্রমথকে অবশ্য খুব পছন্দ করেন কবি। বুদ্ধিমান, পড়ুয়া ছেলে। তবু তার চিঠি লেখার পাত্রী কেমন যেন দূরে সরে গেছে।

সে তো যাবেই! মনে মনে বললেন রবীন্দ্রনাথ:

যেতে নাহি দিব, কিন্তু তবু যেতে দিতে হয়। হায়রে হৃদয়, তোমার সঞ্চয়, দিনান্তে, নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়। নাই, নাই, নাই রে সময়। 

রবীন্দ্রনাথ চিন্তায় এতই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে, লোকেনের দুয়েকটা কথা কানে যায়নি। চটকা ভাঙল যখন শুনলেন লোকেন জিগ্যেস করছেন, রলার বয়স কত এখন, রবি?

তা আঠাশ-উনত্রিশ তো বটেই!

বাপরে। এত বয়েস পর্যন্ত আইবুড়ো?

বাবামশাই তো ওর সাথে তলোয়ারের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন! ও যা একরোখা মেয়ে, ও সারা জীবন কাউকে বিয়েই করবে বলে তো মনে হয় না

প্রভাত মুখুজ্যের ব্যাপারে কী সব শুনছি?

ভারতী পত্রিকার নিয়মিত লেখক, সুসাহিত্যিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সরলা দেবীর সম্পর্কের একটা গুজব বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের কানেও এসেছে সেটা।

রবীন্দ্রনাথ সশব্দে হাসলেন, হুঁ! সাহিত্যিকের সঙ্গে সম্পাদিকার প্রেম! এ নিয়ে জমিয়ে আরেকটা প্রহসন লেখা যেতে পারে! তবে প্রভাত ছোটো গল্পটা বেড়ে লেখে, এটা মানতেই হবে। লেখার হাত আছে ওর

তোমার ছোটোগল্প লেখা কেমন চলছে?

খন তো মাসে মাসে সাধনা বের করতে হচ্ছে না। সুতরাং সেই চারটা নেই। তবে জগদীশ যখনই আসেন তখনই আবদার করেন যে নতুন গল্প শোনাতে হবে। সেই ধাক্কায় যে কিছু কিছু লিখছি না তা নয়

বি, একটা কথা সাহস করে বলব?

?

রেনের ব্যাপারে যে তুমি চুপচাপ থাক, কোনো কথা বলতে চাও না সেটা দেখে তোমার গান্ধারীর আবেদন-এর একটা পংক্তি আমার মনে পড়ছে

কী পংক্তি?

দুই বনস্পতি মধ্যে মধ্যে রাখে ব্যবধান—লক্ষ লক্ষ তৃণ

একত্রে মিলিয়া থাকে বক্ষে বক্ষে লীন।

নক্ষত্র অসংখ্য থাকে সৌভ্রাত্রবন্ধনে—

এক সূর্য, এক শশী।

রবীন্দ্রনাথ হাসলেন, মার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিলে? লোকেন, তুমি সাভোনারোলার নাম শুনেছ?

জিরোলামো সাভোনারোলা?

কজ্যাক্টলি! ভাসারি তাঁর লাইভস-এ সাভোনারোলার কথা লিখেছেন

ঠাৎ এই প্রসঙ্গ?

মার কাছে নরেন সাভোনারোলার মতো ব্যক্তিত্ব। প্রচণ্ড প্রতাপশালী, বাগ্মী। ও কথার বন্যায় সবকিছু ডুবিয়ে দিতে, ভাসিয়ে দিতে পারে। সে বন্যা লোকেন সবসময় কল্যাণকর নাও হতে পারে

হ্যাঁ, সাভোনারোলা তো ফ্লোরেন্সে বনফায়ার অব ভ্যানিটিজ করেছিলেন। বতিচেল্লির মতো শিল্পী তাঁর আঁকা-ছবি বিসর্জন দিয়েছিলেন সে আগুনে

ঠি! ভাবো তো কলাজগতের কত বড়ো ক্ষতি হয়েছিল সেদিন? তাছাড়া

তাছাড়া?

রেন বেশিদিন বাঁচবে না, লোকেন

সে কী হে? ও তো তোমার চেয়েও বয়সে ছোটো?

সেদিন চায়ের আসরে ও যখন বক্তৃতা দিচ্ছিল, তখন খুব সুস্থ লাগছিল না ওকে। ঘন ঘন শ্বাস টানছিল। ওর মুখে আমি স্পষ্ট মৃত্যুর ছায়া দেখলাম লোকেন। আসন্ন মৃত্যুর ছায়া

লোকেন্দ্রনাথ পালিত বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কী যেন ভাবছেন।

এদিকে সন্ধে গড়িয়ে রাত। রাত গড়িয়ে ভোরের দিকে এগোচ্ছে। সন্ধ্যাতারা আকাশে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যে আসরের শুরু, সেই আকাশে এখন শুকতারা ফুটি ফুটি করছে। বজরার ছাদে বসে আছেন দুই বন্ধু। পদ্মার প্রবল হাওয়া মাতামাতি করছে তাদের শরীরে।

লোকেন বললেন,বি, তোমার নতুন যে কবিতাগুলো লিখছ, সেই বই-এর নাম কী দেবে ঠিক করেছ?

ভাবছি নাম রাখব ক্ষণিকা

কে? এই নাম কেন?

তো ক্ষণিকের গান লোকেন। সহজ ভাষায়, সহজ ছন্দে, সহজ জীবনের কথা বলা। এর মূল্য তো নেহাতই ক্ষণিকের মূল্য

না, রবি, এ ক্ষণিকের মূল্য নয়। এর মূল্য চিরকালীন। সত্যি বলছি, তোমার এই কবিতা শুনে যে আনন্দ পেয়েছি তা বহুদিন জোটেনি। একটা অনুরোধ রাখবে, রবি?

কী?

পাণ্ডুলিপিটা আমায় দেবে? জানো তো কী নিঃসঙ্গ জীবন আমার। বিজন, বিভুঁইয়ে একা পড়ে থাকি। কবিতাগুলো সে সময় আমায় দুর্লভ আনন্দ দেবে

ই ছাপানোর জন্য অপেক্ষা করবে না?

র সইছে না, রবি

রবীন্দ্রনাথের হাতে প্রায় সবসময়ই একটা ছোট্ট লাল খাতা থাকে। তিনি ইচ্ছেমতো তাতে লেখেন। ক্ষণিকার কবিতাগুলি সেখানেই রয়েছে। খানিক ভেবে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ঠিক আছে। একটা কাজ করা যাক। বেলিকে বলি, ও এই কবিতাগুলো একটা খাতায় কপি করে তোমাকে দেবে

তথাস্তু।

আকাশে ভোরের আলোর আভাস। দুই বন্ধু বজরার ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে নীচের শয়নকক্ষে নামলেন।

(ক্রমশ…)

 

 
 
top