নতুন আলো

 

শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ

শিলাইদহে কুঠিবাড়ির দোতলায় নিজস্ব পাঠগৃহে রবীন্দ্রনাথ চুপ করে বসে আছেন। ঘরের সাজসজ্জা সাধারণ একটি কাঁঠাল কাঠের টেবিল। রবীন্দ্রনাথ নিজেই ফরমায়েশ দিয়ে স্থানীয় এক ছুতোরকে দিয়ে বানিয়েছেন। টেবিলের ওপর বহু কাগজপত্র অবিন্যস্তভাবে ছড়ানো। দু-একটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শিশি দেখা যাচ্ছে। কবি অবসর সময়ে শখের হোমিওপ্যাথি চর্চাও করেন। রৌপ্যাধার দোয়াত,আঠার শিশি এবং বল পয়েন্টেড নিবের বাক্স একদিকে রাখা। মাটির ঘটে কিছু রজনীগন্ধার স্টিকও রাখা আছে। সেই ফুলের মৃদু সুবাস রবীন্দ্রনাথকে একটু উন্মনা করে দিচ্ছে।

পাশের শ্বেতপাথরের সাইড টেবিল থেকে রবীন্দ্রনাথ একটি পত্র তুলে নিলেন। পত্রটি আগেও বেশ কয়েকবার পড়েছেন, কিন্তু অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। লিখেছেন প্রিয় বন্ধু দ্বিজেন্দ্রলাল রায়:

কাল সন্ধ্যায় বালিগঞ্জ অভিমুখে গিয়ে বড় অপ্রতিভ হলাম। কেউ কোত্থাও নেই। শেষে সস্ত্রীক শকটারোহণে একেবারে পালিতদের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত। আমার সঙ্গে কেউ কথা কচ্ছে না বড়। কেবল অপমান করবার যোগাড়ে আছে ।

অফিসের কার্য্যের নিঃষ্পেষণে বসে গিইছি। আর তো পেরে উঠিনে। চাকরি ঢের ঢের করিছি।কিন্তু কৃষিকার্য্য বিভাগের চাকরি

বাপরে !

আপনি তো বেশ সুখে আছেন। আমার ঐরকম একটা সুবিধা করে দিতে পারেন?

শারীরিক অবস্থা আমার নিহাৎই মন্দ নয়। কিন্তু মানসিক তা আর বোলে কাজ নেই। যে রকম অবস্থা দাঁড়িয়েছে কার ওপর রাগটা ঝাড়ি বুঝে উঠতে পাচ্ছিনে।

 

 

আপনি তো বেশ সুখে আছেন!

আপনি তো বেশ সুখে আছেন!’

দ্বিজেন্দ্রলালের পত্রের এই আপাত ব্যঙ্গোক্তি রবীন্দ্রনাথকে চঞ্চল করে তুলল। দ্বিজেন্দ্রলাল ঠিক কী বলতে চাইছেন? জমিদারনন্দন হিসেবে  রবীন্দ্রনাথের যে আরামের জীবন,অবকাশের জীবন—সেটাকেই কি আক্রমণ করছেন দ্বিজেন্দ্রলাল?

হ্যাঁ, হয়তো আরামের জীবন, কিন্তু সেই আরামের জীবন, সেই নিশ্চিন্ত অবকাশ তো কত শত অপদার্থ জমিদারই মদ খেয়ে,বাইজি নাচিয়ে, পায়রা উড়িয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের মতো এত বিচিত্র বহুমুখী সৃষ্টির উৎসবে নামতে পারছে কি? ধরা যাক দ্বিজুবাবুকেই যদি রবি ঠাকুরের জায়গায় বসিয়ে দেওয়া যায়, তিনি কি একই স্তরের সৃষ্টিক্ষমতা দেখাবেন?

ভাবতে ভাবতে রবীন্দ্রনাথের মাথা গরম হয়ে গেল। চেয়ার ছেড়ে উঠে কক্ষের মধ্যে পায়চারি করতে লাগলেন। হর্ম্যতলের নরম মুলতানি গালিচায় তাঁর পা বসে যেতে লাগল। দেয়ালে একটা মনোরম চিত্র বিলম্বিতচূণার দুর্গ। এঁকেছেন প্রিয় বন্ধু উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। সেই চিত্রের দিকে ক্ষণেক তাকিয়ে রইলেন তিনি ।

আপনি তো বেশ আরামে আছেন!’

হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের খুব হাসি পেয়ে গেল, ‘আরামে আছি ! হুঁ আরামেই তো আছি!’ কবির দেউলিয়া দশার কথা কি দ্বিজুবাবু জানেন? জানেন কি যে, ঠাকুর কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে তাঁকে ঠিক কতখানি বিপদের মধ্যে ফেলেছে!

দেয়ালে আরেকটি সুদর্শন যুবকের ছবি ঝুলছে। রবীন্দ্রনাথ সেই ছবির দিকেও কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেনবলু,বলেন্দ্রনাথ। এই অগাস্টে,মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে ভাইপো বলু মারা গেছে। রবীন্দ্রনাথ ও স্ত্রী মৃণালিনীর অতি প্রিয়পাত্র বলু। ঊনত্রিশ বছরের টগবগে যুবক। কত তার পরিকল্পনা! কত তার ভবিষ্যৎ চিন্তা! ঠাকুর কোম্পানি ব্যবসা করে লক্ষ্মীলাভ করবে ! সারা দেশের একেশ্বরবাদীদের মধ্যে সমন্বয় ঘটবে।বোলপুরে মহর্ষির কেনা জমিতে ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপন করবে।

 

 

সব স্বপ্ন,সব পরিকল্পনায় জলাঞ্জলি দিয়ে বলু অকালে চলে গেল।

কেন গেল? ঊনত্রিশ বছরটা কি যাওয়ার বয়স? তাঁর আর স্ত্রী মৃণালিনীর প্রিয়পাত্র এত সম্ভামনাময়,এত প্রতিভাবান বলু?

মনে অস্থিরতা থাকলে রবীন্দ্রনাথ পায়চারি করতে থাকেন। সেই অস্থির পদক্ষেপেই দোতলা থেকে একতলায় নেমে এলেন। তারপর পায়ে পায়ে কুঠিবাড়ির বাইরে ডিসেম্বর মাস। ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ কাশ্মীরি শালটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিলেন। সূর্যের আলো শিশিরে পড়ে চিকচিক করছে। পাখি ডাকছে। বেশ মনোরম পরিবেশ। চারপাশের জমিটা কেমন ন্যাড়া, ন্যাড়া, ফাঁকা,ফাঁকা। সে দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রবীন্দ্রনাথ। এটা তাঁর আরেক ব্যর্থতার ক্ষেত্র। আরেক হতাশার জন্মভূমি। ব্যবসায়ী হিসেবে ব্যর্থ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। ব্যর্থ হয়েছেন কৃষিকাজেও। কুঠিবাড়ির চারপাশে প্রায় পঞ্চাশ বিঘে জমির ওপর গতবছর আলুচাষ করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশে আলুর চাষ হয় না। নৈনিতাল আলু আসে উত্তরপ্রদেশ থেকে। আগে উত্তরপ্রদেশ পরিভ্রমণ করে সে ব্যাপারে অবগত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সংকল্প করেছিলেন যে, সাহিত্যের জমিতে কাব্যের ফলনের মতোই চাষের জমিতেও আলুর ফলন ঘটাবেন। সে ব্যাপারে সর্বতোভাবে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলালদ্বিজুবাবু। দ্বিজুবাবু তো শুধু প্রতিভাবান কবি ও গীতিকারই নন। তিনি বিলেতের চিচেস্টার থেকে পাশ করা কৃষিতত্ত্ববিদ। এগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্টের অন্যতম সহকারী ডিরেক্টর। এ ব্যাপারে ওঁর উৎসাহের অন্ত ছিল না। রবীন্দ্রনাথও মেতে উঠেছিলেন। কলকাতার এগ্রিকালচার অফিস থেকে বীজ আর সার আনানো হয়েছিল। ক্রয় করা হয়েছিল পাঁচশো টাকা দিয়ে একটি এয়ারো-মোটর যন্ত্র, যা জমিতে সার ও জলের যোগান ঠিকঠাক দিতে পারবে। জলের মতোই অর্থব্যয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে তদারক করেছেন সব কিছু। শুধু কি নৈনিতাল আলু? অমরাগাছির আলুর বীজও আনিয়েছিলেন। তারপর পঞ্চাশ বিঘে জমিতে ছক কেটে সার দিয়েবিনাসারেএই দু-ধরনের আলু চাষের মহতী ও মহার্ঘ্য আয়োজন। দ্বিজেন্দ্রলাল অক্লান্ত উৎসাহে মাঝে মাঝেই এসে কাজ দেখে গেছেন ।

ফলাফল?

এক সুবিশাল অষ্টরম্ভা ছাড়া কিছু নয় ।

পঞ্চাশ বিঘে আলুর খেত পরিত্যক্ত যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পড়ে আছে। মাঝে মাঝে বোনা আলু গাছের শুকিয়ে যাওয়া অবশেষ দেখা যাচ্ছে

আলুখেতের বেড়া শখ করে লতানো কুসুম গাছ দিয়ে করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রতিদিন অনেক কুসুম ফুল মাটিতে ঝরে থাকে। স্ত্রী মৃণালিনী সেগুলো শুকিয়ে রং বানাচ্ছেন। সেই কুসুম ফুলের বেড়া দেখে হাসি পেয়ে গেল রবীন্দ্রনাথেরবর্ণোজ্জ্বল ফুলগুলো হাস্যোজ্জ্বল মুখে তাঁর দিকে চেয়ে আছে ।

কে বলে আলু চাষে তাঁর লাভ হয়নি?

এই তো লাভ! এই ফুলগুলো! সব কিছু কি টাকা-পয়সার হিসেবে বিচার করা যায়?

দূর থেকে হন্ হন্ করে কেউ হেঁটে আসছে। একটু কাছে আসতে রবীন্দ্রনাথ দেখলেনচামরু। তাঁর রাজবংশী ভৃত্য চামরু। এক হাত তার কাটা। মুখ ভর্তি দাড়ি। দাড়ি বাদ দিয়ে মুখের যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তা বসন্তে খোবলানো। কাঁধে ঝোলা।

কী রে, চামরু? সক্কাল সক্কাল গেছিলি কোথায়?’

পদ্মার চরে, কত্তা।

পদ্মার চর কুঠিবাড়ি থেকে বেশ দূর। খানিকটা হেঁটে যেতে হয়। আসলে পদ্মার ভাঙনের আশঙ্কা করেই নদীর তীর থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই কুঠিবাড়ি তৈরি হয়েছে।

এত সকালে কী ব্যাপার?’

কত্তামা পাঠালেন।

কত্তামা মানে মৃণালিনী দেবী। কবির স্ত্রী ।

‘কত্তামা বললেন, ”চামরু,বাড়িতে মাংস কিছু নেই। বাচ্চারা খুব মাংস খেতে চাইছে। যা তো, পদ্মার চর থেকে কিছু ডাহুক, তিতির মেরে আন্ তো। কষিয়ে রান্না করি”’

চামরু হাত-কাটা হলে কী হবে? তার গুলতির টিপ অসাধারণ ।

ক-টা পেলি?

পিঠের ঝোলার দিকে আঙুল তুলে চামরু বলল, ‘চারটে ডাহুক, পাঁচটা তিতির। যাই কত্তা, কত্তামাকে দিয়ে আসি

চামরু ঝোলা কাঁধে চলেই যাচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথ পিছু ডাকলেন, ‘চামরু?

হ্যাঁ কত্তা…’

আমার আলুখেতের অবস্থা তো দেখছিস। কিছুই পারলাম না। তুই তো একই বীজে পাঁচ কাঠা জমিতে সোনার ফসল ফলালি রে! কী করে পারলি?

চামরুর বসন্তচিহ্নিত মুখ শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখে মুচকি হাসি খেলে গেল। অনেক কষ্টে হাস্য সংবরণ করে সে বলল, ‘কত্তা, আপনার সবই তো ঠিক ছিল, শুধু জলটা যে বেশি পড়েনি। যা জল দিয়েছিলেন, তার দু-গুণ জল লাগত

বলছিস?’

হ্যাঁ, কত্তা। তবে যেটুকু আলু ফলেছিল সেগুলো বড় মিঠে ছিল, কত্তা। নৈনিতাল আলুর থেকেও ভালো। আপনি লেগে থাকুন, কত্তা। আপনার হবে।

মনিব রবীন্দ্রনাথকে আশ্বস্ত করে ঝোলা-কাঁধে চামরু চলে গেল

তার পেছন পেছন শাল গায়ে বেড়িয়ে এল অনিন্দ্যরূপসী এক কিশোরী। বাহারি লাল শাড়ি পরে এই শীতের সকালে অপরূপ দেখাচ্ছে তাকে।

কী রে, বেলি?

বেলা বা মাধুরীলতা কবির জ্যেষ্ঠা কন্যা। তার আসার উদ্দেশ্য অত্যন্ত মহৎ: বাবা, মা ডাকছে। তোমার জলখাবারের লুচি, ছোলার ডাল জুড়িয়ে যাচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ মেয়ের পেছন পেছন চললেন। মেয়ে বড়ো হয়েছে। রূপে, গুণে অদ্বিতীয়া এই কন্যাকে এবার পাত্রস্থ করতে হবেতিনি তো শুধু কবি নন—জমিদার, সংসারী, পিতা, স্বামী, ব্যবসায়ী, চাষী, লেখক, সংগীতকার, সম্পাদক। তাঁর বহু সত্তা। সব সত্তার প্রতি সুবিচার সবসময় করা সহজ নয়। কঠিন, অত্যন্ত কঠিন ।

 

রন্ধনপটিয়সী মৃণালিনী দেবী শুধু লুচি, ছোলার ডাল নয়, সঙ্গে মোহনভোগও রান্না করেছেন। স্ত্রীর সঙ্গে কবির কথাবার্তা হয় মূলত খাওয়ার সময়। অন্য সময় মৃণালিনী দেবী হয় রান্নাঘরে নয় সংসারে ব্যস্ত। কবি ব্যস্ত তাঁর নানাবিধ কর্মকাণ্ডে ।

আসনপিঁড়ি হয়ে বসে খেতে খেতে রবীন্দ্রনাথ দেখলেন যে, মৃণালিনী দেবী কিছুটা গম্ভীর, তাঁর মুখ বিষণ্ণ, চিন্তাক্লিষ্ট

ভাই ছুটি , কী ভাবছ?’

বলুর কথা ভাবছি গো

হ্যাঁ বড়ো অকালে চলে গেল

হ্যাঁ গো , আমাদের তরফে কোন দোষ-ত্রুটি হয়নি তো?

কেন বলছ এ কথা?’

ছেলেটা শেষবার যখন এল, তোমার তো মনে আছেতোমরা দিন-রাত হিসেবে ব্যস্ত থাকতে। হিসেব কিছুতেই মিলছিল না

মিলবে কী করে? বরিশালের নিশিকান্ত তো বিস্তর গরমিল করে গেছে

বরিশালে ঠাকুর কোম্পানির বিশ্বস্ত কর্মচারী নিশিকান্ত গুপ্তই প্রকৃতপক্ষে তাঁদের ডুবিয়ে গেছে। তহবিল থেকে সত্তর হাজার টাকা সরিয়ে  সেই যে  সে উধাও হয়েছে, তার টিকির খোঁজও আর পাওয়া যাচ্ছে না। তাগাদার পর তাগাদা দিয়েও তাকে ধরা যায়নি। এদিকে ডুবন্ত ব্যবসার হিসেব মেলাতে পাগলের মতো স্নানাহার ভুলে খেটেছেন রবীন্দ্রনাথ আর বলেন্দ্রনাথ ।

তোমরা পাগলের মতো নাওয়া-খাওয়া ভুলে হিসেব নিয়ে পড়ে থাকতে। কখনো তিনটে, কখনো পাঁচটার সময় খেতে বসতে। আমি খাবার সাজিয়ে বসে থাকতাম

হ্যাঁ, সত্যিই একটু অনিয়ম হয়েছে

বলু তো সুস্থ ছিল না পশ্চিম থেকে যবে ফিরল, তখনই তো ওর এটা সেটা লেগে ছিল। বৃন্দাবনে সীতাকুণ্ডে চান করেই কী একটা কানের ব্যথা নিয়ে এল। তারপর এই অনিয়ম। আমার আসলে মন অন্য কারণেও খারাপ

কী কারণ?

শুনলে তুমি রাগ করবে।

রবীন্দ্রনাথ মুখ তুলে দেখলেন যে, মৃণালিনীর চোখে জল টলটল করছে ।

কী হয়েছে ভাই, ছুটি?’

‘নানা কথা কানে আসে। -বউঠান নাকি বলে বেড়াচ্ছেন যে, আমাদের এখানে অনিয়মের জন্যেই বলু অকালে মারা গেল।’

-বউঠান অর্থে প্রফুল্লময়ী দেবী। রবীন্দ্রনাথের উন্মাদ-রোগগ্রস্ত দাদা বীরেন্দ্রনাথের স্ত্রী। বলেন্দ্রনাথের মা।

রবীন্দ্রনাথের অনিন্দ্যসুন্দর মুখে মেঘসঞ্চার হল ।

হ্যাঁ, -বৌঠান যেন কেমন হয়ে গেছেন

কেন?

তোমায় বোধহয় বলেছি যে, বলুর শ্রাদ্ধের আগের দিন ওনার ঘরে গিয়ে অবাক হয়ে গেছিলাম। একমাত্র ছেলে অকালে মারা গেছে আর উনি খালি টাকাকড়ি, কেনাবেচার কথা বলছেন। খালি বৈষয়িক আলোচনা! খুব বিরক্ত বোধ করছিলাম।

মৃণালিনী বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি তো পত্রে সেটা লিখেছিলে। দ্যাখো, ব্যাপারটা ওভাবে নিলে হবে না। কী দুঃখের জীবন ভাবো! স্বামী বদ্ধ-পাগল। একমাত্র ছেলে অকালে মারা গেছে। শোকে তো পাথর হয়ে যাবারই কথা

এই আলোচনা কবি বা তাঁর পত্নী কারো কাছেই রুচিকর নয় ।

খেতে খেতেই রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ পালটালেন, ‘জগদীশবাবু আসছেন

সত্যি!

পত্র লিখেছেন। এক দু-মাসের মধ্যেই এসে পড়বেন। একটা শনি-রবি কাটিয়ে যাবার ইচ্ছে

মৃণালিনী খুশি হয়ে উঠলেন। জগদীশচন্দ্র যে শুধু বিখ্যাত বিজ্ঞানী তা নয়, খুব রসিক, আমুদে মানুষ। সাহিত্যপ্রেমী। মৃণালিনীর রান্নার সমঝদার তিনি এলে নানা গল্পগুজবে কবিরও সময় কাটে ভালো ।

উনি তো আমাদের সঙ্গে সম্বন্ধই পাতিয়ে ফেলেছেন!

মৃণালিনীর কথা সত্যি। জগদীশচন্দ্র ওঁকে বেয়ান বলে ডাকেন!

কবি বললেন, ‘হ্যাঁ, ওঁর  মীরাকে খুব পছন্দ!

কবির কনিষ্ঠা কন্যা মীরাকে জগদীশচন্দ্র আর তাঁর স্ত্রী অবলা খুব পছন্দ করে ফেলেছেন। নিঃসন্তান জগদীশ তাঁর ভাগ্নে অরবিন্দমোহনকে পুত্রবৎ পালন করেন। ঠিক করেছেন যে, মীরাকে তাঁদের পুত্রবধূ করবেন ! এ নিয়ে কবি ও কবিপত্নীর সঙ্গে জগদীশচন্দ্রের নিত্য হাস্যপরিহাস চলে ।

জগদীশ বলেন,’বেয়ান, এইবেলা অরবিন্দ ছোটো থাকতে থাকতে পাকা কথা সেরে নিন!

মৃণালিনী কপট ক্রোধ দেখিয়ে বলেন, ‘কেন?

বেয়ান, অরবিন্দ যত পাশ দেবে, তত তো ওর বিয়ের বাজারে দর চড়ে যাবে! আপনাদের ভালো ভেবেই বলছি

কবি বলেন, ‘অরবিন্দকে কী করবেন ভাবছেন বড়ো হলে?

জগদীশ উত্তর দেন, ‘আর যাই হোক, বৈজ্ঞানিক নয়!

কেন?

জানেন না, বৈজ্ঞানিক হলেই লক্ষ্মী তাকে ছেড়ে যায়। সে লক্ষ্মীছাড়া হয়ে যায়! অরবিন্দ বৈজ্ঞানিক হলে ওর খোরপোশের ভার আপনাদের নিতে হবে, বলে রাখলাম! তার থেকে উকিল হোক, ব্যারিস্টার হোক,  ডাক্তার হোক!

উকিল, ব্যারিস্টার!‘, রবীন্দ্রনাথ কপট ক্রোধে মাথা নাড়েন, ‘দোহাই জগদীশবাবু, অরবিন্দকে দিয়ে বার লাইব্রেরির ভূভার বৃদ্ধি করাবেন না!

জগদীশচন্দ্রের মনোরম সঙ্গের স্মৃতি রোমন্থনে রবীন্দ্রনাথ এতটাই মগ্ন হয়ে গেছিলেন যে, পত্নীর শেষ কথাগুলো শুনতে পেলেন না ।

মৃণালিনী কাঁধে ঝাঁকুনি দিতে সম্বিত ফিরল ।

হ্যাঁ গো, কী চিন্তা করছিলে? আরো দুটো লুচি দিই?

দাও, বেশ ভালো হয়েছে

আচ্ছা বলু যে চলে গেল, তোমাদের ব্যবসাপত্তরের কী হাল?

রবীন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন না। অন্যমনস্কভাবে ছোলার ডাল মেখে লুচি মুখে পুরতে লাগলেন।

ব্যবসাপত্তরের হাল! হাল সত্যিই শোচনীয়। বলার মতো কিছু নয়। ঠাকুর কোম্পানির সলিলসমাধি হয়েছে।

মৃণালিনী উচ্চবাচ্য করলেন না। রবীন্দ্রনাথ সচরাচর বৈষয়িক আলোচনা তাঁর সঙ্গে করেন না। তবে মৃণালিনী জানেন যে, বলেন্দ্রনাথের অকালমৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথের ঘাড়ে বিপুল ঋণের বোঝা চেপেছে। বন্ধু প্রিয়নাথ সেনের কাছে ঋণমুক্তির জন্য বহুবার ছোটাছুটি করেছেন তিনি। এমনকী এক মারোয়াড়ি মহাজনের কাছেও যেতে হয়েছে তাঁকে।

 
 
top