নতুন আলো

 

মধুর কথা শুনে শ্যাম মাষ্টার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বোধহয় টমরির কাছে মধুর নামে লাগাতে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে শ্যামবাবু একাই ফিরে এলেন।

পরের দিন সাতসকালে টমরি এসে হাজির। হাতে মালাক্কা দ্বীপে তৈরি এক মানুষ লম্বা বেত।

টমরি মিনিট দুয়েক ছাত্রদের ওপর চোখ বুলিয়ে হাঁক পাড়লেন, ধুসূদন ঘোষ

ডাক শুনে মধুসূদন উঠে দাঁড়াল।

, আমার সঙ্গে এস

মধুসূদন সুড় সুড় করে টমরির পেছন পেছন চলে গেল।

মিনিট পনেরো বাদে ফিরে এল মধুসূদন। তার ধুতি ও জামায় রক্তের দাগ। চোখ লাল টকটকে। ডান হাতের তেলোটা সে উঁচু করে ক্লাসে দেখাল, যেন ছুরি দিয়ে তেলোটা কেউ আড়াআড়ি কেটে দিয়েছে। সেই ভয়াল দৃশ্য দেখে ক্লাসসুদ্ধু ছেলেরা সমবেত দীর্ঘশ্বাস ফেলল, শশশ

মধুসূদন চিৎকার করে বলল, তোরা শুনে রাখ সব, শালা কুত্তার বাচ্চা টমরিকে আমি দেখে নেব। আর এই শুয়ার শ্যাম মাষ্টারকে ধোবিপাট যদি না দিয়েছি, তবে আমি মধুসূদন ঘোষ নই। শালারা জানে না আমি আহিরীটোলার ছেলে

এই বলে বই-খাতাপত্র নিয়ে মধুসূদন ঘোষ দুড়দাড় করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে চলে গেল।

 

চারটের স্কুল ছুটির পর শ্যামবাবু গেট দিয়ে বেরিয়ে গটগট করে বিডন স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে চললেন। হঠাৎ সামনের গলি থেকে জনাদশেক মুশকো জোয়ান বেরিয়ে এল। তাদের নেতা শ্যামবাবুর নাকে মারল গদাম করে একটা ঘুসি।

শ্যামবাবুর নাক দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত ঝরতে লাগল। তিনি ধুতির কোঁচা নাকে চেপে ধরতেই, সেই লোকটা বলল, শালা! আমাদের মোদোকে মেরে হাতের সুখ করেছিস, তাই না?

বলতে বলতে আরও দুটো লোক দুদিক থেকে শ্যামবাবুর গালের দাড়ি খামচা করে টানতে লাগল। জুলপি ধরে মারল রামটান।

শ্যামবাবু হাত পা ছুঁড়ে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। প্রত্যুত্তরে আহিরীটোলার সেই বীরবাহিনির একজন এমন একটা প্যাঁচ কষল যে শ্যামবাবুর তিনমন শরীর শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে ধপাৎ করে রাস্তার ওপর চিৎ হয়ে পড়ল।

তারপর মিনিট পনের শ্যামবাবু একতরফা মার খেলেন। হাতের সুখ মিটিয়ে আততায়ীরা চলে যাওয়ার আগে চেঁচিয়ে বলে গেল, ফের মোদোর গায়ে যদি হাত তুলবি তাহলে বাপের বিয়ে দেখিয়ে দেবো

অর্থাৎ আজকের অনুষ্ঠান আইবুড়ো ভাত মাত্র!

মার খেয়ে শ্যামবাবুর ডান চোখ সম্পূর্ণ বুজে গিয়েছে। ভুরু ফুলে চোখের ওপর ঝুলে পড়েছে। নাক ফুলে শিঙাড়া। মুখের বেশ খানিক জায়গায় খামচা খামচা দাড়ি উঠে গিয়েছে। সারা মুখ এবং শরীরে কালশিটের দাগ। মুখের জিওগ্রাফি পালটে যাওয়ায় তিনি সহসা শ্যামবাবু থেকে রামবাবুতে রূপান্তরিত হয়েছেন। কিছু পথচারী ধরাধরি করে একটা থার্ড ক্লাস কেরাঞ্চি গাড়ি ভাড়া করে শ্যামবাবুকে বাড়ি পৌঁছে দিল।

শ্যামবাবুর লাঞ্ছনাতেই অবশ্য আহিরীটোলার বীর সন্তানেরা থেমে রইল না। তারা সেখান থেকে দলবদ্ধ হয়ে ইস্কুলের গেটের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে দু-তিনশো লোক দাঁড়িয়ে। মধুসূদন তাদের মধ্যমণি। সে ভিড়ের মধ্যে অশ্রাব্য ভাষায় টমরির চোদ্দ পুরুষের শ্রাদ্ধ করছে সে। মধুর ডান হাতটা ব্যান্ডেজ করে গলায় ঝোলানো।

রাস্তায় ইস্কুলের ছাত্র ও পথচারীরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে। নিমতলা ঘাট স্ট্রিট দিয়ে সে সময় দিনভর গোরু আর মোষের গাড়ি চলাচল করত। তারাও সারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

টমরি ও অন্যান্য সাহেব মাষ্টাররা চুপ করে দোতলায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ভয়ে নীচে নামতে পারছেন না। গলায় ডান হাত ঝোলানো মধু তার বাঁ হাত শূন্যে তুলে ডেকে ডেকে বলতে লাগল, নেমে আয়, শালা শুয়োরের বাচ্চা! নেমে আয় কে আছিস বাপের ব্যাটা!

এ মধুসূদন সে মধুসূদন নয়। সেই পুরনো, শান্ত অমায়িক মধু যে দিনের পর দিন বেতের ঘা সহ্য করেছে। এই মধুসূদনের কোমরে চামড়ার খাপে এক হাত লম্বা একটা ছোরা গোঁজা। গায়ে হাতকাটা গেঞ্জি, ধুতি কোমর বেঁধে পরা। খালি গায়ে সে তড়াক তড়াক করে লাফাচ্ছে আর অবিশ্রাম, অশ্রাব্য খিস্তি ছোটাচ্ছে।

মধুসূদনের সাথে মারপিট করার জন্য আহিরীটোলার জনাদশেক ছেলে এসেছিল। তারা এর আগেই শ্যাম মাষ্টারকে বেদম পিটিয়েছে। ইস্কুলের সামনে বাড়ির রকে বসে টমরির প্রতীক্ষা করতে লাগল তারা। তাদের সামনে এক পাঁজা তিন-হাতি বাঁশের লাঠি। এছাড়া প্রত্যেকের কোমরেই গোঁজা একহাত লম্বা ছুরি।

এর মধ্যেই স্বনামধন্য দার্শনিক স্টিফেন সাহেব এসে দাঁড়ালেন। ইস্কুল-কলেজের সমস্ত শিক্ষক, ছাত্র, এমনকী চাকরবাকররাও তাঁকে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। ইস্কুলের গেটের সামনে ঘটে চলা সেই সাংঘাতিক গোলযোগ নিয়ে স্টিফেন সাহেব কোন চাঞ্চল্যই প্রকাশ করলেন না। একবার বাই সাইকেলে ওঠার চেষ্টা করে বুঝলেন যে ভিড়ের মধ্যে তা অসম্ভব। অগত্যা টপ করে বাই সাইকেলটা তুলে, বগলদাবা করে ভিড় কাটিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন।

ইস্কুলের শিক্ষকরা দোতলা, তেতলায় দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখছেন। কারোরই নামার সাহস নেই। হাঙ্গামা জমবার আশু কোন সম্ভবনা নেই দেখে ছাত্ররা কিছুটা ক্ষুণ্ণ মনেই যে যার বাড়ির পথ ধরল।

বাবুও নেমে এসেছে। মধুসূদনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চাপা কণ্ঠের নির্দেশ এল, দাঁড়া!

কী?

শালা টমরিটা আজকে নামবে না, তাই না?

নে হয় না। বেজায় ভয় পেয়েছে

মধুসূদন বলল, দেখি, আমাদেরও তাহলে যেতে হবে। একটা কাজ করতে পারবি?

কী?

মার সাথে একটু আমহার্স্ট স্ট্রিট আসতে পারবি?

কে?

মহার্স্ট স্ট্রিটের কার্ত্তিক ডাক্তারকে আমার হাতটা দেখাব। কার্ত্তিক বোস। খুব নামডাক, পশার। ব্যাটা টমরি সকালে হাতের ওই অবস্থা করায় এক হাতুড়েকে দিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধিয়ে এনেছি। কিন্তু ভয় হচ্ছে। যদি পার্মানেন্ট জখম হয়ে যায়

বাবু একটু দূরে একটা গাড়ি বারান্দার তলায় অপেক্ষা করতে লাগল। টমরি নামবে না। অতএব মধুসূদন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে, আহিরিটোলার স্যাঙ্গাতদের বাড়ি পাঠিয়ে বাবুর সঙ্গে কার্ত্তিক ডাক্তারের চেম্বারে যাবে।।

(ক্রমশ…)

 

 
 
top