নতুন আলো

 

স্বীকৃতি 

প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর ‘ মহাস্থবির জাতক ‘ -এর কাছে এই ধারাবাহিক উপন্যাস ঋণী।

 

পর্ব  ১২

 

গভীর রাতে নীলরতন এলেন। পুরাতন ভৃত্য কেষ্টার অবস্থা দেখে মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল তাঁর। কেষ্টা ধুম জ্বরে কাঁপছে। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে। জ্ঞান নেই। নাড়ি অতি ক্ষীণগতি। শরীরের নানা স্থানে লসিকাগ্রন্থি ফুলে উঠেছে। জগদীশচন্দ্রের স্ত্রী অবলা এক পরিচারিকার সহায়তায় তার অক্লান্ত পরিচর্যা করছেন।

নীলরতন রোগী দেখে কার্বলিক সোপ দিয়ে ভালো করে হাত ধুলেন। তারপর বললেন, বউদি, অবিলম্বে একে ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুলে পাঠান

বাঁচবে তো?

কোনো ভরসা নেই। বাজে ধরণের প্লেগ। আপনারাও এ বাড়ি ছাড়ুন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব

অবলা স্বামী জগদীশের দিকে তাকালেন। সকালে নীলরতনের চেম্বার থেকে ফেরার পর উভয়ের এ প্রসঙ্গে কথা হয়েছেকোথায় যাবে?

জগদীশ বললেন, ভাবছি, আপাতত আমার স্বর্ণর বাড়িতে গিয়ে উঠি, বুঝলে? নীলরতনবাবুর চেম্বারফেরত ওঁদের ওখানে গিয়েছিলাম। আনন্দবাবু বারবার করে থাকতে বললেন। আর কেষ্টাটাকেও তো দেখতে হবে! পরে ভাবছি, চলো শিলাইদহে যাই। রবি তো অনেকদিন ধরে যেতে বলছে

অবলা বসুর মুখ খুশিতে ভরে উঠল। অধ্যাপক বসু ও বসুজায়া দুজনেই শিলাইদহ দারুণ পছন্দ করেন। পদ্মার উত্তাল তরঙ্গ, বিস্তীর্ণ বালুচর, বোটের জীবনযাত্রা, গ্রামবাংলার শ্যামলিমা, কবি ও কবিপত্নীর সাহচর্যকোনটা যে তাঁদের বেশি পছন্দের তা কে জানে! তবে শিলাইদহ যাওয়ার নাম করলেই তাঁরা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন।

অবলা বললেন, তুমি আসছ শুনলে হয়তো রবিবাবু আনন্দে অধীর হয়ে নতুন কোনো ছোটোগল্পই লিখে ফেলবেন

জগদীশ বললেন, মি এভাবেই বাংলা সাহিত্যে কন্ট্রিবিউট করছি, বুঝলে!

নীলরতন বললেন, যেখানেই যান, যাওয়ার আগে আপনাদের বাড়িটা কার্বলিক সোপে আগাপাশতলা ধোয়াবেন কিন্তু। এ বাড়ির এখন বাতাসে বিষ

জুড়িগাড়ি চেপে চলে গেলেন নীলরতন। জগদীশ আর অবলাও কেষ্টাকে নিয়ে অবিলম্বে ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুলে যাওয়ার জন্য যত্নবান হলেন। পরদিন সকালেই তাঁরাও বাড়িও ছাড়বেন, উঠে যাবেন জগদীশচন্দ্রের বোন স্বর্ণপ্রভার স্বামী আনন্দমোহন বসুর ধর্মতলা স্ট্রিটের বিশাল প্রাসাদে।

জগদীশ ফ্যাকাসে হাসলেন, নে পড়ছে, অবলা? বিলেত থেকে ফিরে ওই বাড়িতেই প্রথম উঠেছিলাম আমরা? পুনর্মূষিক ভব!

কেষ্টাকে ক্যাম্বেলে ভর্তি করে শোয়ার আয়োজন করছিলেন দম্পতি। গভীর নিশুতি রাত। হঠাৎ দরজায় কে কড়া নাড়ল।

জগদীশ চমকে উঠলেন, কে? কে?

বাইরে থেকে জড়িত মাতাল কণ্ঠে গান ভেসে এল:

হি ইজ এ জলি গুড ফেলো

হি ইজ এ জলি গুড ফেলো

হি ইজ এ জলি গুড ফেলো

টা রা রা রা রা রা।

গভীর রাতে অনেক সময় রাস্তায় মাতাল গোরারা ঘুরে বেড়ায়। তেমনই কেউ হয়তো। জগদীশ ভাবলেন দরজা খুলে কাজ নেই।

করাঘাত কিন্তু চলতেই থাকল। কেউ বলছে, ক্টর বোস, প্লিজ! প্লিজ! প্লিজ ওপেন দ্য ডোর

মাতাল গোরাটা তাঁকে চেনে তাহলে?

বিস্মিত জগদীশ দরজার পাল্লা ফাঁক করলেন। এক সাহেব। উশকো খুশকো সোনালি চুল। মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে ময়লা, শতচ্ছিন্ন একটা স্যুট। এককালে রং হয়তো খয়েরি ছিল। এখন অবহেলায়, অযত্নে কালচে, কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে।

জগদীশ একে চেনেন—লরেন্স, আধপাগলা, মাতাল লরেন্স। শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে কবিকন্যা বেলাকে ইংরেজি পড়ায়। সেই লরেন্স কলকাতায় কী করছে? কীভাবে বাসা খুঁজে সে জগদীশের কাছে এল?

লরেন্স ঘোলাটে হাসল, ক্টর বোস, আই কেম টু চেক অ্যাবাউট ইয়োর সিল্ক ওয়ার্কস। হাউ আর দে ডুয়িং?

পাগল আর কাকে বলে? এই মাঝরাতে গুটিপোকার খোঁজ নিতে এসেছে! জগদীশচন্দ্র অবাক হলেও হাস্য সংবরণ করতে পারলেন না। রবীন্দ্রনাথ ও লরেন্সের প্রণোদনায় এর আগে শিলাইদহ থেকে কিছু রেশমি গুটি নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন তিনি। আপ্রাণ পরিচর্যা সত্ত্বেও সেগুলোর অকালমৃত্যু ঘটেছে।

দে অল ডায়েড। হাউ অ্যাবাউট ইয়োর্স?

লরেন্স চক্ষু মুদে বিষণ্ণ হাসল, ! গন উইথ দ্য উইন্ড! দোজ মিলিয়নস অব হাংরি, ভোরেশাস, অ্যাডোরেবল বাগস হ্যাভ অল বিন এক্সটিংক্ট

মাতাল হলে কী হবে, লরেন্সের উচ্চারণে স্পষ্ট অক্সফোর্ডের ছাপ। বোঝাই যায় যে, সে যথেষ্ট শিক্ষিত লোক।

জগদীশ লরেন্সকে ভিতরে আসতে বললেন। সোফায় গা এলিয়ে দিল লরেন্স। জড়ানো নেশাতুর কণ্ঠে বলে চলল, দ্য পোয়েট ট্রায়েড, আই ট্রায়েড, টেন ডোমেসটিক্স ট্রায়েড ডে অ্যান্ড নাইট টু ফিড দেম অ্যান্ড টেন্ড টু দেমনো জয়! নো জয়! দে অল এক্সপায়ার্ড! নট এ ইয়ার্ড অব সিল্ক টু শো ফর আওয়ার স্টুপেন্ডাস এফোর্টস

হোয়াই আর ইউ সো ড্রাঙ্ক?

বিষণ্ণ হাসল লরেন্স।উ আর অ্যা ডক্টর, আর্ন্ট ইউ ডক্টর বোস?

ই অ্যাম নো ফিজিশিয়ান

স্টিল, কান্সট দাউ নট মিনিস্টার টু অ্যা মাইন্ড ডিজিজড,

প্লাক ফ্রম দ্য মেমরি অ্যা রুটেড সরো,

রেজ আউট দ্য রিটেন ট্রাবলস অব দ্য ব্রেইন

অ্যান্ড উইথ সাম স্যুইট অবলিভিয়াস অ্যান্টিডোট

ক্লিনজ দ্য স্টাফড বুজুম অব দ্যাট পেরিলাস স্টাফ

হুইচ ওয়েজ আপন দ্য হার্ট?

মাতাল লরেন্স মাঝরাতে হুইস্কি টেনে ম্যাকবেথ আওরাচ্ছে!

কীসের সরো তোমার সাহেব?

বেলি! দ্যাট চেরুবিম! দ্যাট নিম্ফ! দ্যাট ফেয়ার ফেসড এঞ্জেল! পোয়েট ওকে বিয়ে দিয়ে দিতে চায়!

কবির জ্যেষ্ঠা কন্যা মাধুরীলতা ওরফে বেলিকে লরেন্স ইংরেজি পড়ায়। জগদীশ জানেন সেটা। তিনি নীরব রইলেন।

লরেন্স জড়িত কণ্ঠে বলে চলল, ডোন্ট মিসটেক মি। আই লাভ বেলি লাইক মাই ওউন ডটার। সেই মেয়ে যাকে আমি ইংরেজি সাহিত্যে দীক্ষা দিয়েছি, পোয়েট তাকে এত অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেবে? ইজ ফিফটিন দ্য এজ টু গেট ম্যারিড?

কবির সাংসারিক সিদ্ধান্তের ওপর কোন্ কথাই বা বলা যায়! জগদীশ এবারও নীরব রইলেন।

কোটের পকেট থেকে ছোট্ট হুইস্কির বোতল বের করে তার তলানি নিঃশেষে পান করল লরেন্স। মাধুরীলতার আসন্ন বিয়ে নিয়ে তার দুঃখ, তার অভিমান কণ্ঠ থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়তে লাগল। শেক্সপিয়র থেকে সে নেমে এল বায়রনে:

শি ওয়াকস ইন বিউটি, লাইক দ্য নাইট

অব ক্লাউডলেস ক্লাইমস অ্যান্ড দ্য স্টারি স্কাইজ;

অ্যান্ড অল দ্যাটস বেস্ট অব ডার্ক অ্যান্ড ব্রাইট

মিট ইন হার অ্যাসপেক্ট অ্যান্ড হার আইজ।

তার গলা নেশায় জড়িয়ে এল। সোফার মধ্যেই সে ঢলে পড়ল গভীর ঘুমে।

অবলা দোতলায় চলে গিয়েছিলেন। তিনি নেমে এসেছেন। মুখে স্পষ্ট বিতৃষ্ণার ছাপ।

ই মোদো মাতালটা দেখি সোফায় ঘুমিয়ে পড়ল! উষ্মার স্বরে বললেন তিনি।

জগদীশচন্দ্র বললেন, যা! যাক! এখন কিছু বোলো না! কাল সকালে তো বাড়ি ছাড়ছিই, তখনই ওকে জাগাবো

(ক্রমশ…)

 
 
top