নতুন আলো

 

. কার্তিক বোস কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনার মেডেলধারী। বসেন আমহার্স্ট স্ট্রিটের বটকৃষ্ণ পালের দোকানে। বেশ ঝলমলে দোকান। পাশে প্রশস্ত ডাক্তারির চেম্বার। বাইরের ঘরে বেশ কয়েকটি চেয়ার ও সোফা রয়েছে। টেবিলের ওপর মাসিক পত্র-পত্রিকা শোভা পাচ্ছে। সাহিত্য রয়েছে, ভারতী রয়েছে, রয়েছে স্ট্রান্ড ম্যাগাজিন

মহেশচন্দ্র ছেলেকে সন্ধেবেলা বাইরে থাকতে অনুমতি দেন না। অতএব লোকের মুখে তাঁকে খবর পাঠানো হয়েছে যে, এক আহত ছাত্রবন্ধুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাবুর বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে। আর্ত, অসুস্থকে সাহায্য করার জন্য মহেশচন্দ্র আপত্তি করেন না।

কার্তিক ডাক্তারের আজ প্র্যাকটিসে মন নেই। তাঁর চেম্বারে এক অতিথি এসেছেন, তাঁকে নিয়েই মশগুল তিনি। কম্পাউন্ডার বাইরে রোগী তাড়াচ্ছিল। নেহাতই একজন ছাত্র, তায় আবার গুরুতর আহত, এসব বলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া গেল।

উনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর সেই সন্ধিক্ষণে অনেক বাঙালিই দাড়ি রাখতেন। কার্তিক বোসের অবশ্য দাড়ি-গোঁফ নেই। ফর্সা, কামানো মুখ। উজ্জ্বল গৌরবর্ণ। সোনালি ফ্রেমের চশমার মধ্য দিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ উঁকি মারছে।

তাঁর পাশে আরেক ভদ্রলোক বসে আছেন। খর্বদেহ, শীর্ণকায় পুরুষ। অতি সাধারণ বেশভুষা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ।

কার্তিকবাবু সেই ভদ্রলোকের সঙ্গেই নিবিষ্ট হয়ে কথা বলছিলেন। মধু আর বাবু ঘরে ঢুকতে চোখ তুলে তাকালেন।

খুব যত্নে, কম্পাউন্ডার যতীনের সাহায্যে ব্যান্ডেজ খুললেন তিনি। হাতের অবস্থা দেখে চোখ-মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল।

কে হাতের এই অবস্থা করেছে?

মরি স্যার, টমরি সাহেব

মরি?

হ্যাঁ। আলেকজান্ডার টমরি, ডফ কলেজে ইংরেজি পড়ান আমাদের

নি মানুষ না জানোয়ার?

নি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো, স্যার

ফেলো! এ তো গুণ্ডা! আপনাদের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এসব গুণ্ডাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, প্রফুল্লবাবু?

কার্তিক ডাক্তারের শশ্ম্রুমণ্ডিত সঙ্গী হাসলেন।মাদের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন বলছেন, কার্তিকবাবু? আমি তো প্রেসিডেন্সিতে পড়াই

ঠি! ঠিক! আমারই ভুল! কার্তিক ডাক্তার দুই ছাত্রের দিকে তাকালেন। সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বললেন, এঁকে চেন?

বাবু আর মধু নীরব।

চিনবে কেন? ভালো লোকেদের চিনে লাভ কী? ইনি হচ্ছেন ড. প্রফুল্লচন্দ্র রায়। বিখ্যাত কেমিস্ট। এডিনবরার ডি এসসি

মধুর হাত সযত্নে টিংচার আয়োডিন দিয়ে ব্যান্ডেজ করতে করতে কার্তিক বোস বললেন, সাবধানে থাকবে। এখন দশদিন সম্পূর্ণ বেড রেস্ট। প্রতিদিন আমি যেভাবে দেখালাম, সে ভাবে ব্যান্ডেজ খুলে টিংচার আয়োডিন দিয়ে ড্রেস করবে। আর পারলে তোমাদের ওই টমরির নামে একটা পুলিশ কেস করে দাও। এটা এক ধরণের ক্রিমিনাল অ্যাসল্ট। ভালো কথা, এই টিংচার আয়োডিন যা তোমায় লাগাচ্ছি, তা কার তৈরি জান?

কা?

প্রোফেসর রায়ের। সঙ্গীর দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন তিনি

মাদের দেশে কিছু তৈরি হয়, স্যার?

বাবুর প্রশ্নে খেপে গেলেন কার্তিক ডাক্তার। তৈরি হয় মানে? আলবাত তৈরি হয়। এই ডাক্তার রায়কেই দেখ না। নিজে ওষুধের কোম্পানি খুলেছেন, বেঙ্গল কেমিক্যাল। নিজের হাতে বানাচ্ছেন বাসকের সিরাপ আর জোয়ানের আরক। ফিজ? না, না, ফিজ টিজ লাগবে না। ছাত্রদের কাছ থেকে আমি ফিজ নিই না। এখন যাও। বিদায় হও। আর শোনো হে, কী নামে যেন তোমার? মধুসূদন! বাবা পালোয়ানের মতো চেহারা করেছ আর সাহেবটার হাতে পড়ে পড়ে মার খেলে? পালটা মার কিছু দিতে পারলে না?

মধু আর বাবু ঘর থেকে বেরোচ্ছে। মধু চাপা গলায় বলল, শালা ডাক্তারটা জানে না যে, টমরিকে প্যাঁদানোর জন্য কী আয়োজনই না করেছিলাম আজকে! কাপুরুষ ব্যাটা নামল না

ডা. কার্তিক বোস তখন প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের দিকে ফিরেছেন, ডাক্তার রায়, বেঙ্গল কেমিক্যালকে এবার একটা লিমিটেড কোম্পানিতে কনভার্ট করুন

লছেন?

বশ্যই। বাজারে শেয়ার ছাড়ুন মশাই। সেই শেয়ারের টাকায় মূলধন জোগাড় হবে

মি বাঙালি ছাড়া কাউকে শেয়ার বিক্রি করতে চাই না

ঠিক আছে। তবে ব্যাবসা করতে চাইছেন, ঠিকভাবে ব্যাবসা করুন। আমি সাহায্য করব। বেলেঘাটার দিকে আমার কিছুটা জমি কেনা আছে। কারখানা বড়ো হলে ওখানেও শিফট করা যেতে পারে

কী রকম মূলধন লাগবে বলে মনে হয়?

হাজার পঁচিশ তো বটেই। লিমিটেড কোম্পানি করে বাজারে শেয়ার ছাড়লে অনায়াসে টাকা উঠে আসবে। চাই কি শেয়ার বিক্রির ব্যাপারে আমি আপনাকে হেল্প করব, প্রফুল্লবাবু

কার্তিকবাবু আপনার সাহায্যের কথা কীভাবে ভুলব, বলুন! যা করেছেন আপনি!

কিছু না! কিছু না! দেশের জন্যই এটা করা দরকার

কার্তিকবাবু, বিদেশ থেকে ফিরে এই কথাই তো বারবার ভাবছি বছর দশেক ধরে। বাঙালিকে অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বয়ম্ভর হতে হবে। ছেলেরা আমাদের হয় আইন পড়ছে নয়তো হা চাকরি জো চাকরি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাসে তিরিশ টাকা মাইনে হলেই খুশি! এভাবে দেশের উন্নতি হয় বা হতে পারে, কার্তিকবাবু?

পনি কবে থেকে ঠিক করলেন যে, কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি বানাবেন?

ইট্টিন নাইন্টি টু। আজ থেকে বছর আটেক আগে। এক সাহেব ব্যাটার কাছে দুঃখ করছিলাম যে, বাঙালির ছেলেরা ভালো মাইনের কাজ পায় না। ব্যাটা কী বলল, জানেন?

কী?

লে, ওয়েল মি. রায়, টুমি একটা কারখানা খুলিয়া ডেকাইয়া ডাও না কেন? সেখানে বাঙ্গালির ছেলেদের বালো বালো চাকুরি, মোটা মাহিনার চাকুরি ডিবে? শুনে মনে হল ঠাস করে দু-গালে চড় মারল। সেই দিনই প্রতিজ্ঞা করলাম যে, সাহেবের থোঁতা মুখ ভোঁতা করার একটাই রাস্তা। নিজেকে কারখানা খুলে দেখাতে হবে  যে, আমরা পারি কি না! বাঙালির ছেলেদের মোটা মাইনের চাকরি দেওয়া সম্ভব কি না?

তারপর?

কাজে নামলাম। কিন্তু সে বড়ো কঠিন কাজ, কার্তিকবাবু। প্রথমে ভাবলাম যে, লেবুর রস থেকে সাইট্রিক অ্যাসিড বানাব। বাজারে চাহিদা আছে খুব। কিন্তু বাজারে লেবু দুর্মূল্য। অতএব প্রকল্প বাতিল। 

তারপর?

সাজিমাটি থেকে কার্বোনেট অব সোডা বানাবার চেষ্টা চালালাম কিছুদিন। তাতেও বিফল। সাহেব ব্যাটারা শস্তায় কাপড় কাচার সোডা বাজারে সাপ্লাই দিয়ে বাজার মেরে দিচ্ছে। তারপর ধরলাম সালফিউরিক অ্যাসিড

সালফিউরিক অ্যাসিড!

হ্যাঁ, কার্তিকবাবু, সালফিউরিক অ্যাসিড বানানোটা খামখেয়াল নয়। এটা ঠিকমতো বানাতে পারলে আমরা লাল হয়ে যাব, কারণ সালফিউরিক অ্যাসিড হল মাদার অব অল ইন্ডাস্ট্রিজ আর এটা বিলেত থেকে আনাতে খরচা এত বেশি যে, ঢাকের দায়ে মনসা বিকিয়ে যাওয়ার যোগাড়। আনাটা ডেঞ্জারাসও বটে

লছেন? কী করে বানাবেন?

গুলো মূলত পাতন পদ্ধতিতে আমরা বানাই। এমনকী নাইট্রিক অ্যাসিড ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডও আমরা একইভাবে বানাচ্ছি। শুনলে অবাক হবেন যে, এই পাতন প্রক্রিয়া চলে মাটির কলসিতে

মানে প্রাগৈতিহাসিক পদ্ধতিতে? তা এতে তো নিশ্চয়ই লার্জ স্কেল উৎপাদন সম্ভব হয় না?

টেই তো। সালফিউরিক অ্যাসিডের দৈনিক উৎপাদন তেরো হন্দরের বেশি নয়। অথচ চাহিদা অনেক বেশি। 

কম্পাউন্ডার চা দিয়ে গেছে। চা খেতে খেতে দুই বন্ধু বিশ্রম্ভালাপ করছেন।

কার্তিক বোস বললেন, ডাক্তারির ওষুধপত্রের ব্যাপারটা ভুলে যাবেন না কিন্তু?

না, তা আর ভুলি! নিশ্চিন্ত থাকুন, কার্তিকবাবু। আমাদের এই প্রকল্পের নাম হবে বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফারমাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস। ওষুধও বানাচ্ছিফেরিক আয়োডাইড সিরাপ, তরল আর্সেনিক্যাল, বিসমাথ ক্কাথ, হাইপোফসফেট অব লাইম। এছাড়া বাসকের সিরাপ, অ্যাকোয়া টাইকোটিস তো আছেই

পনার সিরাপগুলো ভালো কাজ করে, প্রফুল্লবাবু। আমাদের বটকৃষ্ণবাবু গাঁইগুঁই করছিলেন। তাঁকে বললাম যে, এই জোয়ানের আরক আর বাসকের সিরাপ এডিনবরার এক ডি এসসি স্বয়ং বানিয়েছেনএর কোয়ালিটি নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। 

প্রফুল্লচন্দ্রের মুখ উৎসাহে প্রদীপ্ত হয়ে উঠল। মি আরো এগিয়ে যেতাম কার্তিকবাবু, আরো এগোতাম যদি না ভগবান মার দিয়ে রাখতেন

কী রকম?

দু-দুটো অ্যাসিস্ট্যান্ট আমারনিজের হাতে বাছাই করা জুয়েল, জুয়েল দুটো ছেলেসতীশ আর অমূল্য। দুটোই তো অকালে চলে গেল মশাই!

কে, কী হয়েছিল?

তীশটা মরেছে অপঘাতে আর অমূল্য, আমার ডানহাত অমূল্য, মরেছে প্লেগে, আজ থেকে বছর দুই আগে। ও তো এমবি পাশ করা ডাক্তার ছিল। এক প্লেগ রোগীর সেবা করতে গিয়ে রোগটা বাধিয়ে ফেলল। 

কার্তিক ডাক্তারের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। বিড়বিড় করে বললেন, হুঁ, প্লেগ! এই প্লেগই তো শেষ করে দিল আমাদের। বছর বছর মহামারী! কোনো চিকিৎসা নেই! লোক মরছে পোকার মতো!

প্রফুল্লচন্দ্র শুনতে পেলেন না। নিজের জগতে মশগুল তিনি। বলে চললেন, ডাক্তার বোস যা গেছে তা নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই। আমাদের সামনের দিকে তাকাতে হবে। এই বেঙ্গল কেমিক্যাল আর পাঁচটা কারখানার মতো আমি গড়তে চাই না। এ হবে অন্য ধরণের জিনিসএক আদর্শ শিল্পসমাজ

তাঁর প্রদীপ্ত মুখের দিকে ড. কার্তিক বোস অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলেন।

মাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ভালো বেতন পাবে, ভালো বোনাস পাবে। আবাসন পাবে। ভবিষ্যনিধির ব্যবস্থা থাকবে। থাকবে নিজস্ব সমবায় সমিতি

স্বপ্নদ্রষ্টা প্রফুল্লচন্দ্রের মুখ থেকে তাঁর ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা ঝরে পড়তে লাগল।

মাদের থাকবে নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা। নিজেদের ওয়াটার সাপ্লাই। নিজেদের ছাপাখানা ও প্রকাশনা

পারবেন, প্রফুল্লবাবু?

থাকবে নৈশ বিদ্যালয়। থাকবে স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি করতে নিজস্ব পত্রিকা। কেউ কোনো উদ্ভাবন করলে, লাভের অর্ধেক পাবে সে

প্রফুল্লচন্দ্র রায় তেমন বলশালী নন। নেহাতই শীর্ণ, খর্বকায় পুরুষ তিনি। সেই শ্শ্রূমণ্ডিত, খর্বকায় বাঙালির মুখে ভবিষ্যতের এই মৃত্যুঞ্জয়ী আশা-ভরসার কথা ড. কার্তিক বোস একাগ্র হয়ে শুনতে লাগলেন। কখন যে সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে, তাঁর হদিশই পেলেন না। 

 

 

মধুসূদন অবশ্য তার প্রতিবাদের ফল হাতেনাতে পেল। পরদিন স্কুলে গিয়ে বাবু দেখে যে, গেটের সামনে লাল পাগড়ি গিজগিজ করছে। ক্লাসে গিয়ে শুনল যে, বহু রাত পর্যন্ত টমরি ভয়ে নামেননি। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে পুলিশ এসে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে।

সেদিন টিফিনের ছুটির পরের ঘণ্টায় স্কুলে সার্কুলার বেরোলসাংঘাতিক অপরাধের জন্য পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মধুসূদন ঘোষ স্কুল হইতে বিতাড়িত হইল।

মধুসূদন কার্তিক ডাক্তারের চেম্বার থেকে সেই যে বাড়ি গেল, তারপর আর স্কুলমুখো হয়নি। বাবুর সঙ্গে তার দেখাও হয়নি আর। মাসখানেক বাদে বাবু অবশ্য অন্য একটা খবর পেল। খবরটা দিল সতীর্থ বিমল, মোদোর খবর শুনেছিস?

কী খবর?

র বাপ ইস্কুল ম্যানেজমেন্টের নামে পুলিশের কাছে কমপ্লেন করেছিল। পুলিশ কেস একেবারে। ম্যানেজমেন্ট খুব ভয় পেয়ে আপসে ব্যাপারটা মিটিয়েছে

মোদোকে তো রাস্টিকেট করেছে?

না, রাস্টিকেট না। ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দিয়েছে

লিস কী! তাহলে সেই সার্কুলারটা?

টা একেবারে জালি। স্কুলের ইজ্জত রাখার জন্য ওই সার্কুলার বের করেছিল ওরা। টমরির সম্মানটা তো রাখতে হবে!

ই স্কুল আর টমরির সম্মান আর ইজ্জত! সশব্দে হেসে উঠল বাবু

(ক্রমশ…)

 
 
top