অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রবন্ধ ও লোকসঙ্গীতের উপাদান

 

অদ্বৈত মল্লবর্মণ বাংলা সাহিত্যে মূলত তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের জন্যই প্রসিদ্ধি অর্জন করলেও লোকসংস্কৃতি চর্চা ও সংরক্ষনের ক্ষেত্রেও তাঁর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অবদান আছে, যে অবদানের কথা আজ প্রায় বিস্মৃত। বিলীয়মান প্রাচীন ঐতিহ্যপূর্ণ লোকসংস্কৃতিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে যাঁরা যথাসাধ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন, অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর আবিষ্কৃত ছাব্বিশটি প্রবন্ধের মধ্যে অধিকাংশই লোকসংস্কৃতি বিষয়ক। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোনোরকম আধুনিক যন্ত্র সামগ্রীর সাহায্য ছাড়াই বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে তিনি লোকসংস্কৃতি বিষয়ক এই সকল প্রবন্ধগুলির উপাদান ও উপকরণ সংগ্রহ করেছিলেন। তার মধ্যে অধিকাংশই লোকসঙ্গীত বিষয়ক। বাংলা লোকসংস্কৃতি চর্চার প্রাণপুরুষ দীনেশচন্দ্র সেনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মূলত ক্ষেত্রসমীক্ষার সাহায্যে বাংলার গ্রামাঞ্চল থেকে তিনি এই প্রবন্ধগুলির উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। পরবর্তীকালে এই সকল প্রবন্ধগুলি বিখ্যাত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়, যেমন নবশক্তি, আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ, বঙ্গলক্ষ্মী প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়

লোকসঙ্গীত হল সম্পাদনামূলক ধারা বা পারফর্মিং ট্র্যাডিশন। গ্রাম বাংলার জল-মাটি-বাতাস থেকে উদ্ভূত সরল ভাষা ও সহজ সুরে লালিত এই লোক সঙ্গীত গুলি অদ্বৈতের বিশেষ প্রিয় ছিললোকায়ত মানুষ, তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-ভালোবাসা, সাফল্য বা ব্যর্থতাকে সহজ সরল ভাষায় রূপ দিয়েছেন এই লোক সঙ্গীতে। অদ্বৈত তাঁর লিখিত প্রবন্ধগুলির মধ্যে এই লোক সঙ্গীতের বিভিন্ন রূপগুলি নিয়ে চর্চা করেছেন এবং নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করেছেনএগুলির মধ্যে স্থান পেয়েছে বারোমাসি গান, পালা গান, আনুষ্ঠানিক গান, পল্লিগীতি, উপাখ্যানমূলক সঙ্গীত, পরিহাস সঙ্গীত এবং বাউল গান। গ্রামকে জানতে হলে বা গ্রামীন মানুষদের জীবনাচরণকে বুঝতে হলে এই সকল গানগুলি যে কতটা অপরিহার্য তা প্রবন্ধকারের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, পল্লীকে বুঝিতে হইলে, পল্লীর ব্যথা বেদনা ও সাধ আকাঙ্ক্ষাগুলিকে হৃদয়ঙ্গম করিতে হইলে পল্লীর নিজস্ব সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের পরিচিত হওয়া আবশ্যক বলিয়া মনে করি। কারণ, ইহার মধ্যেপল্লীর নিজস্ব ভাবধারাটি ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত রহিয়াছে

বাংলা লোকসঙ্গীতের ধারায় বারোমাসী গানগুলি একটি স্বতন্ত্র ধারার গান। এগুলি মূলত বিরহিণী নারীর গান। স্বামী বা প্রিয় বিরহে কাতর নারীর বারোমাসের দুঃখ বেদনা ও শূণ্যতার হাহাকার এই গানগুলির মধ্যে জীবন্ত হয়ে ওঠে। অদ্বৈত ত্রিপুরার একটি বারোমাসী গান প্রবন্ধে শান্তি কণ্যার বারোমাসের বিরহ কাতরতার কাহিণী একটি গানের মাধ্যমে কিভাবে প্রকাশিত হয়েছে তা শিষ্ট সমাজের সামনে তুলে ধরেছেন। দুইটি বারোমাসী গান নামক অপর একটি প্রবন্ধে রাধা ও সীতার বারোমাসের দুঃখ বেদনার কথা তুলে ধরেছেন। প্রাবন্ধিকের মতে ভাটিয়ালি গানের মতো বারোমাসী গানেরও দুটি ধারা—একটি প্রেমসম্বন্ধীয় ও অন্যটি ধর্মসম্বন্ধীয়রাধা ও সীতার বারোমাসী গানগুলি ধর্মসম্বন্ধীয়, যদিও সেগুলির মধ্যে যে রাধা বা সীতাকে আমরা পাই তারা গ্রাম বাংলার অতি সাধারণ নারী, শাশুড়ী ননদী নিয়ে গৃহকর্মেরত বিরহিণী নারীর স্বামী বা প্রিয় বিরহে কাতর রূপটিই রাধা ও সীতার মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত। এই সকল বারোমাসী গানগুলি মৌখিক লোকায়ত সংস্কৃতির অন্তর্গত হলেও পরবর্তীকালে বাংলার মঙ্গলকাব্যের মতো শিষ্ট সাহিত্যেও এর একাধিক ব্যবহার আমরা দেখতে পাই। বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতিবিদ ড. নির্মলেন্দু ভৌমিকের মতে উদ্ভবকালে বারোমাসিয়া প্রেমের সঙ্গে জড়িত ছিল না। প্রথমে এটি কৃষিজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ফসল ও বৃষ্টির কামনার জন্য একধরনের যাদু মন্ত্রণাত্মক গান ছিল। পরবর্তীকালে প্রেমের ও নরনারীর দুঃখগীতিতে পরিণত হয়েছে(প্রান্ত-উত্তরবঙ্গের লোকসঙ্গীতনির্মলেন্দু ভৌমিককলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৩৮৪)। বারোমাসী গান বিষয়ে অদ্বৈতের অভিমত হল এগুলি পল্লীগ্রামের নিরক্ষর স্ত্রীসমাজের প্রাণস্বরূপকে বা কাহারা এই সকল বিরহ ও বেদনাপূর্ণ ভাষায় গানগুলি রচনা করিয়া গিয়াছে, তাহা খুঁজিয়া বাহির করা নিতান্ত অসম্ভব হইলেও এই শ্রেণীর গানগুলি মুখে মুখে নানাস্থানে প্রচারিত হইয়া সর্বদা পল্লীবাসীর মানসিক আনন্দের খোরাক স্মরণাতীত কাল হইতেই যোগাইয়া আসিতেছে। বিরহ বা বেদনার সুরটিই হইল এই গানগুলির প্রাণ

অদ্বৈত মল্লবর্মণ পালাগান বা শোকগীতি বা গীতিকা বা ব্যালাডস পর্যায়ে তিন ধরনের পালাগান সংগ্রহ করেছিলেন, যেগুলি হল বিনোদের পালা, কটুমিঞার পালা এবং শেওলাবালার পালা। এই পালাগানগুলিকে প্রাবন্ধিক পূর্ববঙ্গের পল্লী অঞ্চলের নিজস্ব সম্পদ রূপে ব্যাখ্যা করেছেনপল্লীর লোক-সাহিত্যের উপকরণ অন্যান্য গান পাঁচালী প্রভৃতি প্রাচীন সম্পদের মত ‘পালা’ গানগুলিও অধুনা লোপ পাইতে বসিয়াছে। নিতান্ত অজ পাড়াগাঁয়ের অশিক্ষিত লোকদের মেয়েরা এখনো নানা জায়গায় এগুলিকে বাঁচাইয়া রাখিতেছেপরিশ্রম স্বীকার পূর্বক ঐ সকল জায়গা হইতে এগুলিকে সংগ্রহের চেষ্টা করিলে প্রাচীন বাংলার পারিবারিকজীবনযাত্রার সুখ-দুঃখের অনেকখানি ইতিহাসের যে পুনরুদ্ধার করা যায় ইহাতে সন্দেহ নাই। পালাগানগুলিকে মূলতঃ শোকগীতি রূপে আমরা গ্রহণ করতে পারি। বিনোদের পালা-য় গ্রাম্য যুবক বিনোদ কোড়া পাখি শিকারে দক্ষ। একদিন পাখি শিকারে গিয়ে সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হয়। মা-বোন ও স্ত্রীর হাহাকারের মধ্যে দিয়ে পালাটির শেষ হয়মায়ের কান্দন যাবজ্জীবন, ভইনের দিন কয়।/ অভাগিনী স্ত্রীরির কান্দন যাবত চন্দ্র রয়”।। কটুমিঞার পালা-য় দুশ্চরিত্রা বিশ্বাসঘাতিণী স্ত্রীর দেওয়া বিষে কটুমিঞার মৃত্যু পল্লীবাসীর শোকগীতির মূল উপজীব্য। শেওলাবালার পালা-তে শেওলা ও কালাচাঁদের অপূর্ণ প্রেমের কাহিণী, মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে তাদের চির বিচ্ছেদের গাথা পালাগান আকারে পল্লীজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। দ্রুত বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলা বাংলার অমূল্য সম্পদ এই সকল পালাগানকে কেন ও কিভাবে সংগ্রহ করতে হবে সেসম্বন্ধে লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক অদ্বৈতের সুচিন্তিত মতামতের প্রকাশ দেখতে পাই এই প্রবন্ধগুলির মধ্যে। তাঁর মনে হয়েছে সময়ের অগ্রগতি ও প্রযুক্তির আগ্রাসনের ফলে বাংলার এই নিজস্ব প্রাণের সম্পদটি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে চলেছে, এগুলিকে যদি যথাযথভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ না করা হয় তাহলে এগুলি একেবারেই লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই চিরাচরিত সাহিত্যরস আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হবে। তাই তাঁর অভিমতপল্লীর লুপ্ত সম্পদ যিনি যাহা সংগ্রহ করিবেন তাহাই অক্ষতভাবে রাখিয়া প্রকাশ করিবেন এবং উহা হইতে পল্লীর পারিবারিক জীবনকে স্টাডি করিবেন, তাহা হইলে তিনি ধন্যবাদের পাত্র হইবেন অর্থাৎ লোকসস্কৃতি সংগ্রহের প্রধান শর্ত হল সগৃহিত জিনিষগুলিকে বিকৃত না করে হুবহু সংরক্ষণ করা, যা প্রাবন্ধিকের এই উক্তির মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত

পল্লী বাংলার বিভিন্ন ধরনের লোকায়ত আচার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গ্রামীন নারীরা যে সকল আনুষ্ঠানিক গান রচনা করে ও গেয়ে থাকে সেগুলিকে আমরা আনুষ্ঠানিক গানের আওতায় ফেলতে পারি। সেগুলির মধ্যে আছে জলসওয়া গীত, নাইওরের গান,ভাইফোঁটার গান, মাঘমন্ডলের গান, পুতুলের বিয়ের ছড়া। এগুলি অদ্বৈত মল্লবর্মণ সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলি নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর প্রবন্ধের মধ্যে। জলসওয়া গীত সম্পর্কে প্রাবন্ধিক জানাচ্ছেনবিবাহ ইত্যাদি মাঙ্গলিক ব্যাপারে জলসওয়া একটি বিশেষ অনুষ্ঠান বা স্ত্রী আচার। বিবাহের পর বর এবং কন্যাকে স্নান করাইবার জন্য নিকটস্থ নদী বা পুষ্করিণী হইতে কয়েক কলসী জল তুলিয়া আনাই জলসওয়া। পল্লীর কতিপয় এঁয়ো স্ত্রী ধানদূর্বা প্রভৃতি সাজাইয়া কলসী লইয়া নদী বা পুষ্করিণী ঘাটে যায়। সঙ্গে সঙ্গে একদল স্ত্রীলোক…. যে সকল গান গাইয়া যায়, সেগুলিকেই জলসওয়া গীত বা জলভরা গীত বলা হয়। বাংলার অধিকাংশ আচার অনুষ্ঠানের গানের মতো জলসওয়া গানের বিষয়ও রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা। কৃষ্ণ প্রেমে ব্যাকুল রাধার কৃষ্ণ সান্নিধ্য পাওয়ার ব্যাকুলতা, ননদী পড়শীর কুটিলতা, স্বামী শাশুড়ির গঞ্জনা ও তিরস্কার এই গানগুলির মধ্যে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। নাইওর বা নববিবাহিত বাল্যবধূর বাপের বাড়ী যাওয়ার ব্যাকুল বাসনার প্রকাশ ঘটেছে নাইওরের গানগুলির মধ্যে। নাইওরের গান প্রবন্ধে অদ্বৈত দেখিয়েছেন এক বালিকা বধূর পিতৃগৃহে যেতে চাওয়ার এক উন্মুখ বাসনা, বাপ ও ভাইয়ের জন্য তার অধীর অপেক্ষার বেদনাঘন রূপটি কীভাবে সাধারণ পল্লীরমনীদের গানে ভাষা পেয়েছেভাইফোঁটার গান প্রবন্ধে সংকলিত গানগুলি ভাইয়ের আয়ুষ্কামনা করে বোনেদের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন, বোনের কাছ থেকে ফোঁটা নেবার জন্য প্রবাসী ভাইয়ের ব্যকুলতা সহজ সরল ভাষায় মূর্ত হয়ে উঠেছেএই প্রবন্ধটিতে প্রথম পর্বে অদ্বৈত চারটি ভাইফোঁটার গান সংকলিত করেছেনআর দ্বিতীয় পর্বের স্বতন্ত্র নাম দিয়েছেন মাতৃ স্নেহসূচক কয়েকটি অপ্রকাশিত প্রাচীন সঙ্গীত এই পর্যায়ের তিনটি গানে নির্বিকল্প মাতৃ স্নেহের কথা উঠে এসেছে পার্বতী ও মেনকার সংলাপের মধ্যে দিয়ে মেয়েকে দরিদ্র স্বামীর ঘরে বিয়ে দিয়ে মেয়ের চিন্তায় কাতর মায়ের বিভিন্ন উক্তির মধ্যে দিয়ে চিরকালীন বাঙালী মায়ের দুঃখ ও যন্ত্রনার কথাই ফুটে উঠেছে মেনকা ও পার্বতীর এই রূপচিত্রের পরিচয় বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যশাক্ত পদাবলীর আগমণী পর্যায়ের গানে আমরা দেখতেপাই মাঘমন্ডল প্রবন্ধটির মধ্যে পূর্ববঙ্গের মূলত মালো সম্প্রদায়ের অবিবাহিত মেয়েদের সূর্যদেবের ব্রত পালন উপলক্ষে গাওয়া গীত সম্বন্ধে প্রাবন্ধিক জানিয়েছেন এই মাঘমন্ডল ব্রত সম্পর্কে অদ্বৈতের অভিমতপুর্ববঙ্গ ও শ্রীহট্টের পল্লী গ্রামসমূহের অবিবাহিতা হিন্দু বালিকাদিগকে সূর্য-ব্রত অনুষ্ঠান করিতে দেখা যায় এই ব্রত মাঘ মাসের প্রথম দিন হইতে আরম্ভ করিয়া শেষ পর্যন্ত পূর্ণ একমাস কালব্যপিয়া করিতে হয় স্থানভেদে এই ব্রত সূর্যব্রত, লাল ঠাকুরের ব্রত, সিঁড়িপূজা প্রভৃতি নামে অভিহিত হইয়া থাকে পল্লি গ্রামের অন্যান্য পার্বণাদির ন্যায় ইহাও একটি বিশেষ অনুষ্ঠান অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বাংলার ব্রত গ্রন্থে তিন রকমের ব্রতের উল্লেখ করেছেনশাস্ত্রীয়ব্রত, নারীব্রত, কুমারীব্রত মাঘমন্ডল কুমারীব্রত এই প্রবন্ধটির মধ্যে অদ্বৈত ব্রতের বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান এবং প্রতিটি আচারের সঙ্গে গাওয়া গানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরেছেন তাঁর তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসেও আমরা এই মাঘমন্ডল ব্রতের বিস্তৃত বিবরণ দেখতে পাই অপ্রকাশিত পুতুলের বিয়ের ছড়া প্রবন্ধে বাল্যবিবাহ ও তাই নিয়ে কন্য এবং তার পরিবারের অসীম দুঃখ বেদনার কথা পুতুলের বিয়ের ছড়ার রূপকে ফুটে উঠেছে বলে প্রাবন্ধিক বর্ণনা করেছেন

অদ্বৈত শ্রীহট্ট থেকে ছটি বাউল গান সংগ্রহ করেছিলেন এবং ১৯৩৮ সালে নবশক্তি পত্রিকায় অপ্রকাশিত বাউল সঙ্গীত নামে তার সংকলন প্রকাশ করেন। অদ্বৈত অপ্রকাশিত পল্লিগীতি নামে দুটি পল্লীগান সংগ্রহ করেছিলেন, একটি হল সারিগান এবং অন্যটি হল গাথা-সঙ্গীত। সারিগান হল জলে গাওয়া গীত। এই প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক লিখছেন: নদীবহুল পূর্ববঙ্গে বর্ষাকালে নৌকা দৌড় বা বাইচ খেলা হয়। নৌকা ও তার বৈঠাগুলি থাকে যেমন রঙ মাখানো, যারা বৈঠা ‘মারে’ তাদেরও মনে থাকে রঙের ছোঁয়াচ। গানগুলিও গায় তারা মনের রঙ মিশাইয়া। এই গানটির বিষয়ও রাধা-কৃষ্ণের প্রেম। দ্বিতীয় গানটি হল গাথা-সঙ্গীত। এখানে দুটি শোকগীতি সংকলিত হয়েছে। একটি গান কোড়া পাখি শিকারী বিনোদের অকাল প্রয়াণের কথা এবং অন্যটি বুরুজ নামে এক ব্রাহ্মণের কীভাবে জাত নষ্ট হয়েছিল তার করুণ কাহিণী। পল্লী বাংলায় প্রচলিত যেকোন গানকেই আমরা পল্লীগীতি বলে অভিহিত করি, এগুলির মধ্যে পাওয়া যায় গ্রামের সহজ সরল মানুষের অকৃত্রিম জীবনাচারণের চিত্র। এই পল্লীগীতি সম্পর্কে অদ্বৈতের অভিমতশিক্ষিত অশিক্ষিত সকলেই পল্লী সঙ্গীতের আদর করেন। তার কারণ এগুলি মনন, চিন্তা বা কল্পনা দিয়া গড়া নয়; পল্লীবাসীর নির্ভেজাল মনের উৎস হইতে উৎসারিত; এগুলিতে পাওয়া যায় খাঁটি প্রাণের স্পর্শ।

পরিহাস সঙ্গীত প্রবন্ধে কিছু গ্রামীন নিম্ন শ্রেণীর আদিরসাত্মক চটুল লঘুরসের গীতের উল্লেখ করেছেন প্রাবন্ধিক। এখানে দুটি গানের উল্লেখ করেছেন প্রাবন্ধিক, নাতীনের গান এবং ঝিয়ারীর গানউপাখ্যানমূলক সঙ্গীত প্রবন্ধটির মধ্যেও তিনি দুটি গান সংকলিত করেছেন—উদ্ধবের গান ও বানিয়ার গান। এই গানগুলির মধ্যে মূলতঃ একপ্রকারের কাহিণী বা আখ্যানের পরিচয় পাওয়া যায়। এগুলির মধ্যে কোন উচ্চ ভাবের ইঙ্গিত নেই, গানগুলি গায়ও সমাজের খুব নীচু স্তরের মানুষ। পাখীর গান প্রবন্ধটি একটি ভ্যতিক্রমী বিষয় নিয়ে লিখিত প্রবন্ধ। গ্রাম বাংলাইয় এমন প্রচুর গানের সন্ধান পাওয়া যায় যেখানে প্রেমাস্পদকে বা মনকে পাখীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। প্রাবন্ধিক গানগুলিকে দুই শ্রেণিতে ভাগ করেছেন, প্রেমমূলক ও তত্ত্বমূলক। প্রেমমূলক গানে প্রেমিককে পাখীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে আর তত্ত্বমূলক গানে মনকে পাখীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

লোকসংস্কৃতি বিষয়ক এই সকল প্রবন্ধগুলির মধ্যে অদ্বৈতের এই বিষয়ে গভীর অনুরাগের যেমন প্রকাশ পেয়েছে তেমনি যে অসীম অধ্যাবসায় ও বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি এই বিপুল পরিশ্রম সাপেক্ষ কাজটি সম্পাদন করেছেন সেটি আমাদের বিস্মিত করে। ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণের পাশাপাশি লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক অদ্বৈতের পরিচয় ফুটে উঠেছে। লোকসঙ্গীতের একাধিক বিভাগ সম্বন্ধে তাঁর গভীর জ্ঞান এবং এই গানগুলির সংগ্রহ, সংকলন ও বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে গ্রাম বাংলার জীবন, তাদের বিভিন্ন উৎসব, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখের বিচিত্র কাহিণী মূর্ত হয়ে উঠেছে। লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন ধরন—গাথা, আখ্যান, পরিহাস, বাউল, সারিগান, পালা গান প্রভৃতি সম্পর্কে বিস্তৃত বর্ণনা প্রাবন্ধিক এই প্রবন্ধগুলির মধ্যে তুলে ধরেছেন। ফলে শুধুমাত্র ঔপন্যাসিক অদ্বৈত নয় তার পাশাপাশি লোকসঙ্গীত প্রিয় অদ্বৈত মল্লবর্মণের পরিচয় আমাদের সামনে উঠে এসেছে।

ঋণস্বীকার:

১. অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও বাংলার লোকসংস্কৃতি, মিলনকান্তি বিশ্বাস, বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ২০১৪

২. বারমাসীগান ও অন্যান্য,অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সম্পাদনা দেবীপ্রসাদ ঘোষ, প্রণীতা প্রকাশনি, কলকাতা, ১৯৯০

৩. বাংলার লোকসাহিত্যদ্বিতীয় খন্ড, আশুতোষ ভট্টাচার্য, কলকাতা,১৯৬৩

৪. অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচনাসমগ্র, অচিন্ত্য বিশ্বাস সম্পাদিত, দে পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০০

 
 
top