স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাচিন্তা: আধুনিকতার দিশারী

 

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে ঔপনিবেশিক ভারতে তথা বাংলায় যে কয়েকজন মহামানব জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ অন্যতম ভারতবাসীকে জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিক্ষা-সামাজিক সংস্কার-ধর্মবোধ বা আধ্যত্মিকতার তিমির রাত্রি থেকে মুক্ত করে এক নবজাগ্রত জীবনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসার কারিগর যে কয়েকজন মহান মণীষী—তাঁদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের অবদান এক বাক্যে স্বীকার্য দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনে জর্জরিত শিক্ষিত বাঙালীর কাছে শিক্ষা যখন কেরানী সৃষ্টির নামান্তর সেই সময়ে শিক্ষা চিন্তায় এক নতূন আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ তখনও আমাদের দেশ স্বাধীন হতে অর্ধ শতাব্দী বাকী এই সময়ে দাঁড়িয়ে অধ্যাত্ম শিক্ষাকে হাতিয়ার করে বাংলা তথা ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আমূল পরিবর্তন সাধনের মূলমন্ত্র শোনাতে চেয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক বিকাশ সাধনের জন্যে তিনি বিভিন্ন দিক দিয়ে শিক্ষা সংস্কারের কথা বলেন, সেটি যেমন শিক্ষার উদ্দেশ্য বা প্রকৃতি নিয়ে, শিক্ষা পদ্ধতি কি হওয়া উচিত তা নিয়ে তেমনি শিক্ষার ভিত্তি, পাঠক্রম বা স্ত্রী শিক্ষার মতো অবশ্য বিচার্য দিক, কোনটিই বাদ যায় নি

ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষার হাল দেখে কঠোর সমালোচনা করে বিবেকানন্দ বলেছিলেন: যে শিক্ষায় জীবনে নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারা যায়, সেই হচ্ছে শিক্ষা আজকাল এই সব স্কুল কলেজে পড়ে তোরা কেমন একপ্রকারের একটা dyspeptic জাত তৈরী হচ্ছিস শিক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর অনুধ্যানের ফলেই স্বামীজী এই চরম কথাটি বলতে পেরেছিলেন শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যার মাধ্যমে বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে সমাজের কোন্মঙ্গল সাধন হতে পারে যদি সেই বিদ্যার কোনো প্রয়োগগত সাফল্য না থাকে? সেই বিদ্যাই কি প্রকৃত শিক্ষা যা মানুষকে জীবনে প্রকৃত দায়িত্বশীল, কর্মঠ স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করে না? তাই প্রকৃত শিক্ষা কি তা ব্যাখ্যা করে স্বামীজী বলেছেন: মানুষের মধ্যে যে পূর্ণতা স্বতই বর্তমান, তাহারই বিকাশের নাম শিক্ষাশিক্ষা বলতে আমি বুঝি যথার্থ কার্যকর জ্ঞান-অর্জন; বর্তমান পদ্ধতি যাহা পরিবেশন করে, তাহা নয় আমাদের প্রয়োজন সেই শিক্ষার, যাহা দ্বারা চরিত্র গঠিত হয়, মনের বল বৃদ্ধি পায়, বুদ্ধিবৃত্তি বিকশিত হয়, এবং মানুষ স্বাবলম্বী হইতে পারে। তাই পাশ্চাত্ত্য বিজ্ঞানের সহিত বেদান্তের সমন্বয়—ব্রহ্মচর্য, শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস হইবে সেই শিক্ষার মূলমন্ত্র। স্বামীজী বলেছেন উচশিক্ষা তথা শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিৎ জীবনের সমস্যাগুলির সমাধান করার সামর্থ্যলাভের যোগ্যতা। আর এই যোগ্যতা অর্জনের অন্তরতম অঙ্গ হল ধর্ম। ধর্ম বলতে তিনি সাধন-ভজন-পূজন-আরাধনার বহিরঙ্গ আচার পালনের কথা বলেননি। এই ধর্ম হল আধ্যাত্মিকতা, যা মানুষের আত্মার শক্তির বিকাশ সাধন করে, নৈতিক জীবনের মান উন্নত করে অর্থাৎ সার্বিকভাবে মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটাতে সাহায্য করে। তিনি বলেছিলেন আধ্যাত্মিক বিষয়ে আমরা জগতের প্রকৃত শিক্ষককিন্তু স্বামীজীর নির্দেশিত অধ্যাত্মবাদ শুধু চোখ বুঁজে ধ্যান করা নয়, তাঁর অধ্যাত্মবাদ শিক্ষা দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মানুষের দুঃখ-দারিদ্রের বিরুদ্ধে এবং ভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে—তাঁর অধ্যাত্মবাদ জীবনে এনে দেয় আত্মপ্রত্যয়, যে আত্মপ্রত্যয়ের মূর্ত প্রতীক আমরা প্রত্যক্ষ করেছি নেতাজী সুভাষচন্দ্রের মধ্যে। অধ্যাত্মভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া এমনি আত্মপ্রত্যয়ের অধিকারী হওয়া যায় না। অধ্যাত্ম-বোধ বর্জিত শিক্ষাব্যবস্থায় দেশ আজ আবার এমন এক ধর্মবোধহীনতার পঙ্কপথে এগিয়ে চলেছে, যা থেকে উদ্ধার পেতে হলে স্বামীজী-নির্দেশিত শিক্ষানীতিকে গ্রহণ না করে উপায় নেই। (বিবেকানন্দের শিক্ষানীতি, দক্ষিণারঞ্জন বসু)

যখন দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের কুফলে বাংলার তথা সমগ্র ভারতবর্ষের শিক্ষার চরম সংকটময় অবস্থা সেই ক্রান্তি লগ্নে স্বামী বিবেকানন্দের আবির্ভাব। একদিকে শহরকেন্দ্রিক ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের ফলে একশ্রেণীর বাবু বা কেরানী সম্প্রদায় সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার মানও ক্রমশঃ অবনতির দিকে ধাবমান—সেই সময়ে জনশিক্ষা বা ম্যাস এজুকেশনের চিন্তা ভাবনা নিয়ে ক্রান্তিদর্শী স্বামী বিবেকানন্দের আগমন নগরবাসী কতিপয় ভাগ্যবান শিক্ষিত মানুষের পাশাপাশি আপামর সাধারণ মানুষ যেখানে অশিক্ষার চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত সেই সময় বিবেকানন্দ বললেন যদি শিক্ষাব্যবস্থাকে সুদূর প্রসারিত করতে হয় তাহলেসাধারণকে প্রচলিত ভাষায় শিক্ষা দাও, তাহারা অনেক বিষয় অবগত হউক প্রচলিত ভাষা বা স্থানীয় ভাষা বা যাকে এক কথায় মাতৃভাষা বললেও ভুল বলা হয় না, তাকেই তিনি শিশু শিক্ষার মাধ্যম বা বাহন করতে বললেন কারণ কবির ভাষায় শিক্ষায় মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সমশিক্ষাকে দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হলে শৈশবে মাতৃভাষাই হওয়া উচিত শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম চিন্তার সাবলীলতা, প্রকাশের স্বাভাবিকতা ও মননশীলতার দৃঢ়তার জন্য মাতৃভাষাকেই বাহন করতে হবে

স্বামীজীর মতে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যই হল মানুষ গড়া এই মানুষ কিছু ইংরাজি পড়তে বা বলতে পারা কেরানীকুল নয়, দেহ-মন-আত্মার পরিপূর্ণ সমন্বয়ে বলীয়ান, আত্মশক্তিতে দৃঢ়, সমৃদ্ধ চরিত্রবান মানুষ, যারা জাতিকে অধঃপতনের হাত থেকে উদ্ধার করে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে স্বামী বিবেকানন্দের এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনার কথা শুনে জাতীয় বিপ্লবের গুরু শ্রী অরবিন্দ ভারত উদ্ধারের এক নতন পথের সন্ধান পেয়েছিলেন পরে তিনিই একদিন বলেছিলেন: শক্তিধর পুরুষ বলতে যদি কেউ থেকে থাকেন, তবে তিনি বিবেকানন্দ বিবেকানন্দ পুরুষসিংহ ভারতবর্ষের গুরুকুল শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শ এবং গ্রিকদের বিউটিফুল মাইন্ড ইন অ্যা বিউটিফুল বডি (সুন্দর দেহাভ্যন্তরে একটি সুন্দর মন) এই আদর্শের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তিনি স্বামী বিবেকানন্দ দেহ ও মনের সঙ্গে আর একটি উপাদান যোগ করেছিলেনমানুষের আত্মা এবং তিনি তাঁর পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থায় তাকেই প্রাধান্য দান করেছিলেন আত্মার জাগরণকেই প্রকৃত শিক্ষার আদর্শ বলে মনে করেছিলেন একেই তিনি বলেছিলেন ম্যান মেকিং এজুকেশন।

শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পাশাপাশি শিক্ষার পদ্ধতি কি হওয়া উচিৎ তা নিয়েও বিবেকানন্দের সুচিন্তিত মতামত আমরা দেখতে পাই তিনি মনে করতেন শিখন বা লার্নিং হবে স্বতঃপ্রণোদিত বেদান্ত দর্শন অনুযায়ী জ্ঞান মানুষের অন্তরেই স্বতোৎসারিত, তাকে জাগরিত করাই হল প্রকৃত শিক্ষা আমাদের কাজ হল শিশুর মনের সেই জাগরণের পথকে সুগম করতে সহায়তা করা বর্তমান যুগের শিক্ষাব্যবস্থায় যেমন শিক্ষককে তত্ত্বাবধায়ক আথবা ফেসিলিটেটরবলে বর্ণনা করা হয়েছে, সেই কথাই স্বামীজী বলেছেন প্রাচীন গ্রিসে যেমন তেমনি ভারতীয় গুরুকুল শিক্ষণ পদ্ধতিতেও শিক্ষক ও ছাত্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে শিক্ষণ-শিখন কার্য পরিপূর্ণতা পেত সেই আদর্শকেই স্বামীজী জাতীয় শিক্ষার উৎকৃষ্ট আদর্শ বলে মনে করতেন। তিনি বলেছেন:শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ব্যতিত প্রকৃত শিক্ষা সম্ভব নয়।….বিশ্বাস, নম্রতা এবং শ্রদ্ধা ছাড়া আমাদের মধ্যে কোন রকম সম্প্রসারণই কল্পনা করা যায় না। যেসব দেশ ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে এই সম্পর্ক গড়ে তুলতে ও বজায় রাখতে সমর্থ হয়নি সেখানে শিক্ষক কথকেরই ভূমিকা গ্রহণ করেছেন, এবং সেখানে ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়া হয় শিক্ষকের ভাষণ মস্তিষ্কে ভরে নিয়ে যেতে। তারপর অবশ্য আর কিছু করা হয় না। অর্থাৎ শুধুমাত্র বক্তৃতা পদ্ধতির মাধ্যমে যে উৎকৃষ্ট শিক্ষাদান সম্ভব নয়, যা বর্তমান শিক্ষাবিদ্‌রা মনে করছেন এবং বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনে যার প্রকাশ আমরা দেখি, বিবেকানন্দও সেই কথাই বলেছেন। ছাত্ররা যে শুধুমাত্র শিক্ষকের বক্তৃতা শুনবে ও প্যাসিভ লিসনার (নিষ্ক্রিয় শ্রোতা) হয়ে বসে থাকবে এই শিক্ষা পদ্ধতিকে তিনি গ্রহণীয় বলে মনে করেননি

শিক্ষাকে সুদূরপ্রসারী করে তোলার জন্যে বিবেকানন্দ ভারতীয় বৈদান্তিক জ্ঞান ও পাশ্চাত্ত্য বিজ্ঞানের সমন্বয়ের কথা বলেছেন তিনি মনে করতেন শিক্ষার মূল প্রেরণা হওয়া উচিৎ ব্রহ্মচর্য, শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস এছাড়াও অপার অভিনিবেশ (কন্সেন্ট্রেশন), ভোগবাসনাশূণ্যতা (ডিটাচমেন্ট)এবং প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন (কমিউনিকেশন উইথ নেচার)—এগুলিকেও তিনি শিক্ষার প্রেরণা বলে মনে করতেন। স্বামীজী প্রবর্তিত শিক্ষা ভাবনায় বিজ্ঞানের স্থান ধর্মেরও উর্দ্ধে। কারণ খালি পেটে ধর্ম হয় না। উদরপূর্তি হলে তবেই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী ও চিন্তা চেতনার জগতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়। ব্রহ্মচর্য বলতে তিনি বুঝিয়েছেন চিন্তা, বাক্য ও কাজের বিশুদ্ধতার সমন্বয় এবং এর মাধ্যমে আত্মসংযমের অনুশীলন। এর ফলস্বরূপ যে প্রবল সক্রিয়তা ও প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির সৃষ্টি হয় তা আমাদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে অকল্পনীয় বলিষ্ঠতা ও নৈতিক চেতনার উদ্ভব ঘটাতে পারে। আবার অভিনিবেশ ও ভোগবাসনাশূণ্যতা—এদুটি ব্রহ্মচর্যেরই নামান্তর। বিবেকানন্দ বলেছেন এই দুই উপাদানের আবির্ভাবের ফলে দেহ ও মন পারস্পরিক ভারসাম্যে উপনীত হতে পারে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত জ্ঞানের উদ্‌গতি সাধনে সাহায্য করে। বিবেকানন্দের মতে এটিই হল প্রকৃত শিক্ষা। প্রকৃতিবাদী দার্শনিকদের মতো বিবেকানন্দও প্রকৃতি থেকে শিক্ষা লাভ করার কথা বলেছেন: লেট নেচার বি দাই টিচার প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ফলে এই পরিদৃশ্যমান জগতের পশ্চাতে সত্তার সঙ্গে সাক্ষাৎকার সম্ভব হবে স্বমীজীর মতে এই শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা

 দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত উন্নয়ন স্বরূপ এই শিক্ষার পাঠক্রমে যা যা অপরিহার্য বলে স্বামীজী মনে করেছেন সেগুলি হল শরীরচর্চা, ধর্ম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা, কান্তিবিদ্যা (ইস্থেটিক্স), যুগোত্তীর্ণ প্রাচীন সাহিত্য (ক্ল্যাসিক্সও ভাষা প্রাচীন গ্রিসের শিক্ষাব্যবস্থা দ্বারা উৎসাহিত হয়ে তিনি শরীরচর্চা তথা দেহ ও মন প্রানের ভারসাম্য আনার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন ভগিনী নিবেদিতার অনুসরণে বলা যায়, যে প্রাণশক্তিকে এতদিন দেহপীড়নে ব্যয় করা হয়েছে, তাকে বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে পেশীর অনুশীলনেই নিয়োগ করা উচিৎ বলে স্বামীজীর ধারণা(দ্য মাষ্টার অ্যাজ আই স হিম, সিস্টার নিবেদিতা, পি. ৩৭) বিবেকানন্দের মতে ধর্ম ও বিজ্ঞান হবে এই পাঠক্রমের যুগল ভিত্তি, আর প্রযুক্তিবিদ্যা হবে এর দোসর ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের ঔপনিবেশিক দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়োগ আত্মনির্ভরশীলতার পথকে প্রশস্ত করবে, এর দ্বারা শিক্ষাপ্রসারের মাধ্যমে বহু লোককে চাকরির উমেদারি থেকে বাঁচানো যেতে পারে কান্তিবিদ্যা হল মানুষের সৃজনশীলতা বিকাশের শিক্ষা চারুকলা বা সৃজনশীলতা ব্যতিত মানুষের আত্মিক বিকাশ সম্ভব নয় তিনি জাপানের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন তারা এই সৃজনকার্য খুব তাড়াতাড়ি সম্পাদন করেছে ফলে তাদের অগ্রগতিও খুব দ্রুত হয়েছে কোন জাতিকে তার জাতীয় ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত করার একমাত্র উপায় হল তাকে কালোত্তীর্ণ জাতীয় সাহিত্য পাঠে উদ্বুদ্ধ করা শতাব্দী লালিত যে প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কার ভারতীয় সংস্কৃতির মূল ভিত্তি তাকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে না পারলে দেশকে সামগ্রিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না বলে মনে করতেন স্বামীজী, তাই কালোত্তীর্ণ প্রাচীন সাহিত্যকে পাঠক্রমে অন্তর্ভূক্ত করতে চেয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ মাতৃভাষাকে জনশিক্ষার বাহন করার কথা বলেছিলেন, কিন্তু এর পাশাপাশি একাধিক ভাষা আয়ত্ত করার কথাও বলেছিলেন কারণ তা না হলে ধর্ম, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিবিদ্যা এবং কালোত্তীর্ণ প্রাচীন সাহিত্য চর্চা করা সম্ভব হবে না এই কারণেই স্বামীজী ভারতে ইংরাজি ভাষা চর্চার সুপারিশ করেছিলেন

স্বামী বিনেকানন্দ যে সময়ে তাঁর শিক্ষা সংক্রান্ত চিন্তা ভাবনা প্রকাশ করছেন সেই সময় ভারত তথা বাংলার নারীসমাজ এক সামগ্রিক অশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামির দ্বারা আচ্ছন্ন সেই সময়ে বাংলার নারীসমাজকে গেটোয়েজ টু হেল বলে চিহ্নিত করা হত সব রকম সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত নারীসমাজকে অশিক্ষা কুসংস্কার সামাজিক ও পারবারিক অত্যাচারের হাত থেকে উদ্ধার করার একমাত্র হাতিয়ার হল তাদের শিক্ষিত করে তোলা, এই ছিল স্বামীজীর অভিমত ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে যখন খ্রিষ্টান মিশনারিদের হাত ধরে ভারতে স্ত্রী শিক্ষার দ্বার ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে শুরু করল তখন প্রচুর প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ঠাকুর বাড়ীর মহিলারা ধীরে ধীরে শিক্ষা ও সামাজিক সুযোগ সুবিধা পেতে শুরু করেছেন, কিন্তু ব্যাপকভাবে সাধারণ নারী সমাজ তখনও শিক্ষার আওতার বাইরে অবস্থান করছে বিদ্যাসাগর বা রাজা রামমোহন রায় যখন সতীদাহপ্রথা রদ, বাল্যবিবাহ প্রথার অবসান বা বিধবা বিবাহের পক্ষে সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে নারী জাতিকে তাদের অধিকারে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন, তখন বিবেকানন্দ নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে সেই অধিকারকে দৃঢ় ভিত্তিতে স্থাপন করতে চাইলেন কারণ গার্গী, মৈত্রেয়ী, খনার দেশের নারীদের যে বঞ্চনা, অবহেলা ও অসম্মানের জীবন যাপন করতে হতো তা বিবেকানন্দকে বিশেষভাবে বিচলিত করেছিল তিনি বুঝতে পেরেছিলেন স্ত্রীজাতিকে শিক্ষার দ্বারা স্বাবলম্বী করতে না পারলে তাদের এই দুঃখ দুর্দশার অবসান সম্ভব নয়—নারীগণকে এমন যোগ্যতা অর্জন করাইতে হইবে, যাহাতে তাহারা নিজেদের সমস্যা নিজেদের ভাবে মীমাংসা করিয়া লইতে পারে তাহাদের হইয়া অপর কেহ এ কার্য করিতে পারে না, করিবার চেষ্টা করাও উচিৎ নহে আর জগতের অন্যান্য দেশের মেয়েদের মতো আমাদের মেয়েরাও এ যোগ্যতা-লাভে সমর্থ তিনি চেয়েছিলেন বৈদিক বা ঔপনিষদিক যুগের নারীদের মতো এযুগের নারীদেরও সামাজিক অবস্থান পুরুষদের সমান হোক, যদি নারী আর পুরুষ উভয়েরই জীবন সমভাবে উন্নত না হয় তবে দেশের বা জগতের সর্বাঙ্গীন উন্নতি সম্ভব নয়, কারণ এক পক্ষে পক্ষীর উত্থান সম্ভব নহে ব্যবহারিক জগত ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তিনি পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোন ভেদ করেননি দৃঢ় কন্ঠে তিনি বলেছিলেন, আমি পুরুষগণকে যাহা বলিয়া থাকি, নারীগণকে ঠিক তাহাই বলিব ভারত এবং ভারতীয় ধর্মে বিশ্বাস কর, তেজস্বিনী হও, আশায় বুক বাঁধো, ভারতে জন্ম বলিয়া লজ্জিত না হইয়া উহাতে গৌরব অনুভব কর তিনি প্রাচ্য নারীর মাতৃরূপ এবং পাশ্চাত্ত্য নারীর জায়ারূপের সংমিশ্রনে এক আদর্শ নারী চরিত্র সংগঠন করতে চেয়েছিলেনপ্রাচ্যের অধ্যাত্মশক্তি ও পাশ্চাত্ত্যের কর্মশক্তির মিলন তিনি আমেরিকা গিয়ে নারীদের শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থান দেখে চমৎকৃত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন নারীর যথার্থ অভ্যুদয় তখনই ঘটবে যখন প্রাচ্যের অধ্যাত্মশক্তি তার সঙ্গে যুক্ত হবে। তাঁর নারী জাগরণ ও স্বামী বিবেকানন্দ প্রবন্ধে প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা স্বামীজীর স্ত্রীশিক্ষার এই আদর্শের কথা তুলে ধরেছেন তিনি লিখেছেনস্বামীজী এই ধারণা পোষণ করতেন যে, অতীত যুগে যে সব মহীয়সী নারী জন্ম গ্রহণ করেছেন, আগামীকালের নারীর মহত্ত্ব তাঁদের কীর্তিকে অতিক্রম করে যাবে আগামী যুগের নারীর মধ্যে থাকবে একাধারে বীরোচিত দৃঢ় সঙ্কল্প ও জননীর স্নেহকোমল হৃদয় নারী হবে পবিত্রতা, শক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক সর্বোপরি, তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিছু সংখ্যক শিক্ষিতা মেয়ে যেন আজীবন ব্রহ্মচর্যব্রত গ্রহণপূর্বক পবিত্র ও আদর্শ জীবন গ্রহণ করে আধ্যাত্মিক পূর্ণতালাভই হবে তাদের জীবনের উদ্দেশ্য এবং তারাই গ্রহণ করবে মেয়েদের শিক্ষার ভার

স্বামীজী স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষে বসে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন যা ভারতবর্ষকে তার প্রাচীন ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে এবং এক নতুনতর উন্নত জীবনধারার দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে সেইজন্য তিনি শিক্ষার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী হবে, তার শিক্ষণ পদ্ধতি কী হবে এবং পাঠক্রম কী হবে সব বিষয়েই নিজের সুচিন্তিত মতামত জ্ঞাপন করেছেন ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার ওপর ভিত্তি করে যে শিক্ষাদর্শের পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন তা শুধুমাত্র ভারতবর্ষ নয় সমগ্র মানবজাতির উন্নতির জন্য পরিকল্পিত নারীশিক্ষার বিস্তারের জন্য তাঁর প্রবর্তিত পথই স্বাধীনতা-উত্তর শিক্ষা পরিকল্পনা ও শিক্ষা কমিশনের সুপারিশে আমরা দেখতে পাই স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষা সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়নের প্রতিই অধিক দৃষ্টিপাত করার কথা বলেছেন আর তার জন্য প্রয়োজন সমাজ সচেতন ছাত্র-দরদী এক শিক্ষক গোষ্ঠী এই শিক্ষক সম্প্রদায়ই সম্প্রসারণ সেবা (এক্সটেনশন সার্ভিস)-এর মাধ্যমে সামাজিক শিক্ষার প্রসার করবেন তবেই এক উন্নত, রুচিশীল, মার্জিত, দৃঢ়চিত্ত, চরিত্রবান, শরীর ও মনের দিক দিয়ে স্বাবলম্বী এক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সৃষ্টি হবে, যারা ভারতকে আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন দান করতে পারবে

তথ্যসূত্র

. চিন্তানায়ক বিবেকানন্দ, স্বামী লোকেশ্বরানন্দ সম্পাদিত, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিউট অব কালচার, কলকাতা, ১৯৭৭

. যুগদিশারী বিবেকানন্দ, স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯

. বিবেকানন্দ ও যুবসমাজ, স্বামী সর্বভূতানন্দ সম্পাদিত, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিউট অব কালচার, কলকাতা, ২০০৯

. দ্য কমপ্লিট ওয়ার্ক্স অব স্বামি ভিভেকানন্দ, অদ্বৈত আশ্রম, ক্যালকাটা, ১৯৬৪

. স্বামি ভিভেকানন্দ: অ্যা হিস্টরিক্যাল রিভিউ, অদ্বৈত আশ্রম, ক্যালকাটা, ১৯৬৫

 
 
top