ঠাকুর বাড়ির বালক

 

১২৯২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাস (ইংরেজি ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ) থেকে বালক পত্রিকা প্রকাশ হতে থাকে সম্পাদনায় নিযুক্ত ছিলেন জ্ঞানদানিন্দিনী দেবী এবং প্রধান কার্যাধ্যক্ষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকা বালক অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের জন্য লিখিত ছোটোদের সচিত্র মাসিক পত্রিকা যদিও এটিই ঠাকুরবাড়ি থেকে বা ঠাকুরবাড়ির মহিলা সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা নয়, তবুও এই পত্রিকার মধ্যে আমরা বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের পরিচয় পাই এই পত্রিকাটিই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত প্রথম শিশুকিশোরদের উপযোগী সচিত্র মাসিক পত্রিকা এই পত্রিকাতেই প্রথম রবীন্দ্রনাথ হেঁয়ালি নাট্য লেখেন, এই পত্রিকাই প্রথম এমন কিশোর পত্রিকা, যেখানে রাজনীতির কথাও খুব স্বাভাবিকতার সঙ্গে প্রচারিত হয়েছে এই পত্রিকার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের নজরে এসেছে, যা আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরা হবেএর আগে ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ঠাকুর পরিবারের প্রথম মাসিক পত্র ভারতী দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে থাকে এবং ১৮৮৪  খ্রিস্টাব্দের শেষ দশক থেকে এর সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন স্বর্ণকুমারী দেবী এই দিক থেকে দেখলে বালক হল সেই পত্রিকা, যেটি ঠাকুরবাড়ির দ্বিতীয় মাসিক পত্রিকা এবং ঠাকুরবাড়ির মহিলা দ্বারা সম্পাদিত দ্বিতীয় পত্রিকা এটি একান্তভাবেই ঠাকুরবাড়ি কেন্দ্রিক একটি পারিবারিক পত্রিকা জীবনস্মৃতি-তে এই পত্রিকার জন্মের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, বালকদের পাঠ্য একটি সচিত্র কাগজ বাহির করিবার জন্য মেজবউঠাকুরানির বিশেষ আগ্রহ জন্মিয়াছিল তাঁহার ইচ্ছা ছিল, সুধীন্দ্র, বলেন্দ্র প্রভৃতি আমাদের বাড়ির বালকগণ এই কাগজে আপন আপন রচনা প্রকাশ করে কিন্তু, শুধুমাত্র তাহাদের লেখায় কাগজ চলিতে পারে না জানিয়া তিনি সম্পাদক হইয়া আমাকেও রচনার ভার গ্রহণ করিতে বলেন।

বালক-এর আয়ুষ্কাল মাত্র এক বছর। প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ১২৯২ বঙ্গাব্দের বৈশাখে আর শেষ সংখ্যা ওই বছরেরই চৈত্রে। হিসাবমতো এক বছরে সচিত্র এই মাসিক পত্রিকাটির বারোটি সংখ্যা প্রকাশ হওয়ার কথা কিন্তু মোট এগারোটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। আশ্বিন ও কার্তিক মাসে দুটি আলাদা সংখ্যা প্রকাশিত না হয়ে দুটি মিলিয়ে একটি যুগ্মসংখ্যা প্রকাশিত হয়। এক বছরে প্রকাশিত এই এগারোটি সংখ্যার বিষয়সূচির দিকে তাকালে যথেষ্ট বৈচিত্র্যের সন্ধান পাওয়া যায়। নানান বিষয়ে নানাজনের লেখা প্রকাশিত হত এই পত্রিকায়। কবিতা, গান, গানের স্বরলিপি, উপন্যাস, প্রবন্ধ, হেঁয়ালি নাট্য, ভ্রমণকাহিনি, বৈজ্ঞানিক সংবাদ, অনুবাদ, ইতিহাসের গল্প, গ্রন্থসমালোচনা প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ে লেখা হত বালক-এর পৃষ্ঠায়। আর লেখকদের তালিকায় রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর যাঁদের নাম পাওয়া যায় তাঁরা হলেনকেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, নরেন্দ্রবালা দেবী, প্রতিভাসুন্দরী দেবী, প্রবোধচন্দ্র ঘোষ, প্রিয়নাথ সেন, বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভুবনমোহন মিত্র, যোগেন্দ্রনাথ লাহা, রমণীমোহন চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র দত্ত, শারদাপ্রসাদ স্মৃতিতীর্থ বিদ্যাবিনোদ, শীতলাকান্ত চট্টোপাধ্যায়, শ্রী, শ্রীমো, শ্রীমতী ইঃ, শ্রীশচন্দ্র মজুমদার, সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরলা দেবী, স্বর্ণকুমারী দেবী, হঃ, হিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হিরন্ময়ী দেবী এবং হৃদয়নাথ মুখোপাধ্যায়। বিচিত্র বিষয়ের যোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের তিন অগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর যথেষ্ট উৎসাহ দেখিয়েছিলেন। রেখাক্ষর বর্ণমালা নামে শ্রাবণ ও ভাদ্র সংখ্যায় বাংলা শর্টহ্যান্ড বিষয়ক দ্বিজেন্দ্রনাথের একটি চমৎকার লেখা প্রকাশিত হয়। পয়ারের আঙ্গিকে লেখা এই সচিত্র সরস পদ্য রচনাটিতে দ্বিজেন্দ্রনাথের উদ্ভাবনী বুদ্ধি ও বাংলা বর্ণমালা সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখেন বোম্বায়ের গান বাজনা এবং বোম্বাই সহর। কয়েকটি সংখ্যায় প্রকাশিত বোম্বাই সহর রচনাটিতে বোম্বাই সংক্রান্ত বহু তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি রচনা প্রকাশিত হয় বালক-এর বিভিন্ন সংখ্যায়। এগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল মুখ চেনা নামে একটি ধারাবাহিক রচনা। মুখের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিচারের পদ্ধতি নিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মুখ চেনা-ই সম্ভবত বাংলা ভাষায় প্রথম আলোচনা।

মেজ বউঠাকুরানি জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর নির্দেশে যুবক রবীন্দ্রনাথ এই পত্রিকায় লেখা যোগান দেবার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ১২৯২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যা থেকে শুরু করে চৈত্র সংখ্যা পর্যন্ত বালক-এ রবীন্দ্রনাথের রচনার সংখ্যা ষাটটিরও বেশি। বালক-এর প্রথম সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের মোট পাঁচটি রচনা প্রকাশিত হয়। এগুলি হল বৃষ্টি পরে টাপুর টুপুর নদে এল বাণ ও ফুলের ঘা নামক দুটি কবিতা আর কাজের লোক কে?, মুকুট-এর পাঁচটি পরিচ্ছেদ ও গুটিকত গল্পবালক-এ রবীন্দ্রনাথের রচনার সংখ্যায় কেবল বেশি ছিল তা-ই নয়, বৈচিত্র্যের দিক থেকেও তিনি সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, হেঁয়ালি নাট্য প্রভৃতি রচনার দ্বারা তিনি বালক-কে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন। বালক-এর তৃতীয় সংখ্যা থেকে রাজর্ষি উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। ইতিহাসের বিভিন্ন কাহিনিকে তিনি সরস ও শিক্ষনীয় করে পরিবেশন করেছিলেন, লিখেছিলেন লাইব্রেরী-র মতো সিরিয়াস রচনাও। চিরঞ্জীবেষু এবং শ্রীচরণেষু নামে দুটি কৌতুক রচনা নিঃসন্দেহে এই পত্রিকার আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলেছিল। তাঁর বাঙ্গলা উচ্চারণ নামক রচনাটি একটি চমৎকার ভাষাতাত্ত্বিক রচনা। এই পত্রিকায় প্রকাশিত হেঁয়ালি নাট্য নামে নয়টি রচনা পরবর্তীকালে হাস্যকৌতুক নামে সংকলিত হয়েছিল। এই নাটিকাগুলিই সম্ভবত বাংলা ভাষায় বালক-বালিকাদের জন্য রচিত প্রথম নাট্যরচনার নিদর্শন। এই প্রসঙ্গে বালক পত্রিকার আর একটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এই পত্রিকাকে অবলম্বন করে দেশবাসীকে স্বদেশপ্রেম তথা স্বদেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াসও লক্ষ করা গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভিন্ন কবিতা ও প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে এই চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে তাঁর আহ্বান গীত কবিতাটির কথা বলা যেতে পারে। এই কবিতায় তিনি বলেছেন:

মুছে ফেল ধূলা, মুছ অশ্রুজল, ফেল ভিখারীর চীর

পর’ নব সাজ, ধর’ নব বল, তোল’ তোল’ নত শির !

তোমাদের কাছে আজি আসিয়াছে জগতের নিমন্ত্রণ

দীনহীন বেশ ফেলে যেও পাছে—দাসত্বের আভরণ।

সভার মাঝারে দাঁড়াবে যখন হাসিয়া চাহিবে ধীরে

পূরব রবির হিরণ কিরণ পরিবে তোমার শিরে !

 বাঁধন টুটিয়া উঠিবে ফুটিয়া হৃদয়ের শতদল,

 জগত মাঝারে যাইবে লুটিয়া প্রভাতের পরিমল।

 উঠ বঙ্গকবি, মায়ের ভাষায় মুমূর্ষুরে দাও প্রাণ

 জগতের লোক সুধার আশায় সে ভাষা করিবে পান !

বালক-এর চারটি সংখ্যায় খবরাখবর শিরোনামে রাজনৈতিক খবর লিখতেন লাহোরের বিখ্যাত দ্য ট্রিবিয়ুন পত্রিকার সম্পাদক শীতলাকান্ত চট্টোপাধ্যায়। এগুলির মধ্যে থাকত স্বদেশপ্রেম বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রচারের প্রয়াস। তৎকালীন অন্য কোনো শিশু-কিশোর পত্রিকায় এইরূপ খবর প্রকাশিত হতে আমরা দেখি না।

বালক মাসিক পত্রিকার একটি বড়ো সম্পদ ছিল ছবি। বিভিন্ন রচনার সঙ্গে প্রচুর ছবি ছাপা হয়েছে এখানে।  ছবিগুলি মূলত এঁকেছেন হরিশ্চন্দ্র হালদার এবং সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়হরিশ্চন্দ্র হালদারের ছবির নীচে থাকত বাই এইচ. সি. হালদার এবং সত্যপ্রসাদের ছবির নীচে থাকত সংক্ষেপে স.প্র.. কিংবা এস.পি.জি. জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের অঙ্কিত কিছু স্কেচও মুদ্রিত হয়েছিল সত্যপ্রসাদের লিখিত ভ্রমণকাহিনির সঙ্গে তিনি নিজেই ছবি এঁকেছিলেন প্রতিভাসুন্দরী দেবীর সহজে গান শিক্ষা-র সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বল্গোলাপ, মোরে বল্‌ গানটির স্বরলিপি মুদ্রিত হয় এবং সেই সঙ্গে মুদ্রিত হয় হরিশ্চন্দ্র হালদারের অঙ্কিত একটি পাতাজোড়া ছবি বালক-এ নানাধরনের ছবি ছাপা হত সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধারাবাহিক রচনা বোম্বাই সহর-এর সঙ্গে ছাপা হয়েছিল বোম্বাই দ্বীপের মানচিত্র প্রতাপগড়, নব্য ভারতের মানচিত্র, পার্ব্বতী মন্দির, বন্দেমাতর্ প্রভৃতি ছবি নিঃসন্দেহে এই পত্রিকার গৌরব বৃদ্ধি করেছে কিন্তু শেষের দিকে আর কোনো ছবি মুদ্রিত হতে দেখা যায় না সম্ভবত আর্থিক কারণেই ছবির মুদ্রণে সংকট দেখা দিয়েছিল

যদিও বালক পত্রিকা প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঠাকুরবাড়ির বালক-বালিকাদের লেখালেখির সুযোগ করে দেওয়া, কিন্তু এতে যে ধরনের লেখা প্রকাশিত হত তা সাধারণস্তরের বালক-বালিকার থেকে অনেক পরিণত মনের বালক-বালিকাদের জন্য বেশি উপযোগী রবীন্দ্রনাথ নিজের বাল্যজীবনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাল্যপাঠ্য বিষয় সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে জীবনস্মৃতি- ঘরের পড়া অধ্যায়ে লিখেছেন, এখানকার দিনে শিশুদের জন্য সাহিত্যরসে প্রভূত পরিমাণে জল মিশাইয়া যে-সকল ছেলেভুলানো বই লেখা হয় তাহাতে শিশুদিগকে নিতান্তই শিশু বলিয়া মনে করা হয় তাহাদিগকে মানুষ বলিয়া গণ্য করা হয় না ছেলেরা যে-বই পড়িবে তাহার কিছু বুঝিবে এবং কিছু বুঝিবে না, এইরূপ বিধান থাকা চাই আমরা ছেলেবেলায় একধার হইতে বই পড়িয়া যাইতাম; যাহা বুঝিতাম এবং যাহা বুঝিতাম না দু-ই আমাদের মনের উপর কাজ করিয়া যাইত আসলে শিশু-কিশোরদের চিন্তা চেতনা ও ভাবনার স্তরের উন্মেষ ঘটানোই ছিল রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্য সেইজন্য পত্রিকার বিষয়রূপে তিনি এমন বিষয়গুলি নির্বাচনের পক্ষপাতী ছিলেন, যাতে তাদের চিন্তার জগতের প্রসারণ ঘটতে পারে

বালক পত্রিকার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি আমরা এই পত্রিকার মহিলা লেখকদের রচনা নিয়ে আলোচন না করি জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, স্বর্ণকুমারী দেবী ছাড়া বালক-এ লিখেছিলেন নরেন্দ্রবালা দেবী, প্রতিভাসুন্দরী দেবী, সরলা দেবী, হিরণ্ময়ী দেবী প্রমুখ ঠাকুরবাড়ির কিশোরী মেয়ে ও পুত্রবধূরা রবীন্দ্রনাথের দিদি সৌদামিনী দেবীর পুত্র সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্য্যের স্ত্রী নরেন্দ্রবালা দেবী এই পত্রিকায় বিজ্ঞানভিত্তিক একাধিক রচনা লিখেছিলেন সূর্য্যের কথা, সূর্য্যকিরণের ঢেউ, সূর্য্যকিরণের কার্য্য, বায়ুস্তরের কাজ নামে চারটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন অসম্ভব সাবলীল ও সহজ ভাষায় বিজ্ঞানের ভারী ভারী তথ্যকে ছোটোদের উপযোগী করে প্রকাশ করলেন আলোর ধর্ম, ইমেজ গঠন , প্রতিফলন সূত্র, শব্দ তরঙ্গের কাজ, রামধনু ও আলোর বিচ্ছুরণ প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাতেও এত সহজ করে বলা যায়, তা তিনি দেখালেন সূর্য্যকিরণের ঢেউ প্রবন্ধে তিনি লিখছেন, এখনকার পণ্ডিতেরা বলেন সূর্য্য, চন্দ্র, গ্রহতারা এবং আমাদের পৃথিবী, ইহাদের মধ্যেকার আকাশে এমন কোন বস্তু আছেই যাহা বাতাস ও জল অপেক্ষা ঢের সূক্ষ্ম এত সূক্ষ্ম যে কাঁচ, কাঠ, ইঁট প্রভৃতির ন্যায় দৃঢ় বস্তুর মধ্যে দিয়াও ইহার গমনাগমন আছে ইহাকে আমরা দেখিতে পাই না ইহাকে আমরাঈথরবলি তথ্যবহুল এই রচনা প্রাঞ্জল সাবলীল ভাষায় শিশু-কিশোরদের বোধগম্য করে বিশ্লেষিত স্বর্ণকুমারী দেবী লিখিত ছায়াপথ রচনাটিও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কীয় অতি উপাদেয় এই রচনাটিতে তিনি সৌরমণ্ডল, গ্রহনক্ষত্র, তাদের অবস্থান নিয়ে শিশু-কিশোরদের আগ্রহ সঞ্চারকারী ও কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটি সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে কথকতার মেজাজে লিখেছিলেন

রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রতিভাসুন্দরী দেবী লিখেছেন রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি সহজে গান শিক্ষা প্রবন্ধে তাল, লয়, ছন্দ, সুর, রাগিনী নিয়ে উত্তম চিত্তাকর্ষক রচনা তিনি লিখেছেন এই প্রবন্ধের বল্গোলাপ মোরে বল্গানের যে স্বরলিপি তিনি করেছেন, সেটিই সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের গানের প্রথম মুদ্রিত স্বরলিপি তাছাড়া প্রতিভাসুন্দরীকৃত কাল মৃগয়া-র স্বরলিপিও এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল

স্বর্ণকুমারী দেবীর দুই কন্যা হিরণ্ময়ী দেবী ও সরলা দেবীর রচনাও আমরা পেলাম এই পত্রিকাতে সরলা দেবীর দুটি রচনা, একটি আত্মকথামূলক রচনা বাবলা গাছের আত্মকথা, বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে না কিন্তু দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর দুর্ভিক্ষ রচনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দুর্ভিক্ষপীড়িত নিরন্ন মানুষের প্রতি এক কিশোরী বালিকার সহমর্মিতা যে মর্মস্পর্শী ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদের বিস্মিত করে রচনাটির শেষে কিশোর-কিশোরীদের প্রতি তিনি আবেদন রাখছেন যে, তারাও যেন তাদের হাতখরচ থেকে কিছু কিছু বাঁচিয়ে এই অনাহারক্লিষ্ট মানুষদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসে, তারা যেন এটাকে তাদের কর্তব্য বলে গ্রহণ করে: তবে এসো আমরা আজ সকলে মিলিয়া প্রতিজ্ঞা করি যে আমাদের যথাসাধ্য পরের উপকার করিতে চেষ্টা করিব ও ওই দুর্ভিক্ষপীড়িত লোকদিগকে সাহায্য করিয়ে আমরা প্রাণপণে যত্ন করিব আমরা যখনই কোনোরূপ পয়সা বাঁচাইতে পারিব, এক পয়সাই পারি, দু-পয়সাই পারি, আর যতই পারি না কেন, উহাদের জন্য রাখিব আমরা যদি, দয়াময় পরমেশ্বরের নাম গ্রহণ করিয়া এই কার্যে রত হই, তাহা হইলে অবশ্যই আমাদের শুভসংকল্প সুসিদ্ধ হইবে হিরণ্ময়ী দেবী লিখেছেন কিছুই বৃথা যায় না, বীর সম্রাট নেপোলিয়ান ও তাঁর বন্ধু জাকোপার বন্ধুত্ব নিয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী এক রচনা

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী লেখেন দুটি প্রবন্ধ, আশ্চর্য পলায়ন এবং ব্যায়াম প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত ব্যায়াম নামক প্রবন্ধটিতে ছেলেদের শরীর-স্বাস্থ্য গঠনের জন্যে বিভিন্ন প্রকারের ব্যায়াম, শরীরচর্চা, লাঠিখেলা ইত্যাদির উপকারিতার কথা আলোচনা করেছেন ইংল্যান্ড আমেরিকার মানুষজনের তুলনায় ভারতীয়দের ভগ্ন শরীর-স্বাস্থ্যের কথা সুন্দর যুক্তিপূর্ণ তথ্যের দ্বারা উপস্থিত করেছেন তিনি লিখছেন: ইংরেজরা স্বাস্থ্যের নিয়ম পালন করেন বলিয়াই বাল্যকালে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি একত্রে বর্ধিত ও বলিষ্ঠ হয়, যৌবনকালে কার্যক্ষেত্রে এই দুই শক্তির সহায়তাতে তাঁহারা এত আর এমন সব মহৎ মহৎ কার্য সুসিদ্ধ করিতে সক্ষম হন, আর সেই জন্যই বৃদ্ধকাল পর্যন্ত তাঁদের এই শক্তি স্থায়ী হয় বাঙালি ছেলেদের ছোটো থেকেই শরীরচর্চার মাধ্যমে শরীর ও মন গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি গ্রাম ও শহরবাসী ছেলেরা কীভাবে সহজেই বিভিন্ন প্রকার দেশজ উপায়ের সাহায্যে, সুষম আহারের সাহায্যে শরীর গঠন করতে পারবে, তার কথা বলেছেন তিনি: বাল্যকালেই শরীর মন গঠিত হইবার সময়, এই সময়ে যত্ন ও অধ্যবসায়ের সহিত চেষ্টা পাইলে শরীর ও মনকে অনেক পরিমাণে ইচ্ছানুরূপ গঠিত করা যাইতে পারে এই জন্যে আমরা বালকদিগকে ও তাদের মাতাপিতাকে বিশেষরূপে অনুরোধ করিতেছি যে তাঁহারা যেন পক্ষপাতশূন্য হইয়া শরীর ও মন উভয়েরই উন্নতির প্রতি সমানরূপে মনোনিবেশ করেন বালকের স্বাস্থ্যের জন্য কি প্রকার খাদ্য অধিক উপযোগী সে সম্বন্ধে আর একটি প্রবন্ধ লিখিবার ইচ্ছা আছে উপস্থিত প্রবন্ধে ব্যায়াম সম্বন্ধে লেখা যাইতেছে এই প্রবন্ধে তিনি বিভিন্ন ধরনের লাঠির ব্যায়াম কীভাবে করতে হবে চিত্রের সাহায্যে  ধাপে ধাপে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন এই সংখ্যা থেকে পরপর তিনটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একটি অনূদিত গল্প আশ্চর্য পলায়ন নামে এই গল্পটি কনটেম্পোরারি রিভিউ-এর ডেবাগোরিও মোগ্রিয়েভিচের সাইবেরিয়া থেকে পালানোর এক অনবদ্য রোমাঞ্চকর কাহিনি

বালক পত্রিকার চতুর্থ সংখ্যায় পরীক্ষা নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি শ্রীমতী নামক জনৈকা বালিকা দ্বারা লিখিত। কিন্তু তিনি আসলে কে তাঁর নাম জানা যায় না, মুদ্রণকালে বালিকার রচনা নামে প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটির সূচনা হচ্ছে দ্বিতীয় সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ লিখিত লাঠির ওপর লাঠি প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে, যেটি জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর ব্যায়াম প্রবন্ধের সমালোচনা রূপে লিখিত হয়েছিল। এখানে তিনি যুক্তিপূর্ণভাবে মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণের পক্ষে সওয়াল করেছেন এবং মেয়েদের বাড়িতে বসে লেখাপড়া শেখার বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু মেয়েদের ছেলেদের সাথে একসঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া ও পরীক্ষায় পাশ করে বিভিন্ন ধরনের উপাধি লাভের বিরোধিতা করেছেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছে মেয়েদের নামের পিছনে বিভিন্ন ধরনের ডিগ্রিগুলি কিম্ভূতকিমাকার দেখাবে।

এইসব লেখিকাদের আমরা পরবর্তীকালে কোথায় কীভাবে পেলাম, সে সম্পর্কে দু-একটি কথা বলা যেতে পারে। স্বর্ণকুমারী দেবী বা সরলা দেবী লেখিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেন। স্বর্ণকুমারী দেবীর একাধিক উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ও প্রবন্ধের নাম করা যেতে পারে। তাঁর পৃথিবী নামের গ্রন্থে কিছু বৈজ্ঞানিক রচনার সংকলনও আমরা পাই। সরলা দেবীর কিছু রচনা তৎকালীন সখা পত্রিকায় বা পরবর্তীকালে ভারতী পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছিলভারতী পত্রিকার সম্পাদিকা থাকাকালীন তাঁর বেশ কিছু সম্পাদকীয় রচনা আমাদের চোখে পড়ে, তাছাড়া জীবনের ঝরাপাতা নামে তাঁর স্মৃতিকথামূলক রচনাটিও সবিশেষ উল্লেখ্য। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী পরবর্তীকালে শিশুশিক্ষার উপযোগী কিছু প্রবন্ধ রচনা করেন এবং ছোটোদের জন্যে সাত ভাই চম্পা টাকডুমাডুম নামে দুটি নাটক রচনা করেছিলেন। হিরণ্ময়ী দেবী ভারতী পত্রিকার সম্পাদিকার ভূমিকায় একাধিক রচনা লিখেছিলেন, কিছু উল্লেখযোগ্য সনেটও তিনি রচনা করেছিলেন, কিন্তু সেভাবে আর কোথাও তাঁকে দেখা যায় না। নরেন্দ্রবালা দেবীও পরবর্তীকালে সেভাবে লেখার কাজে নিজেকে নিযুক্ত করেননি। তবে তাঁর বালক-এ প্রকাশিত বিজ্ঞান বিষয়ক লেখাগুলি রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে ছুটির পড়া গ্রন্থে সংকলিত করেছিলন। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রতিভাসুন্দরী দেবী রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি রচনা করেছিলেন, রবীন্দ্রগানের প্রচারে ও প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহন করেছিলেন। কিন্তু দীনু ঠাকুরের মতো সাফল্য তিনি পাননি। ঠাকুরবাড়ির এইসব লেখিকাদের প্রায় সবাইকেই আমরা বিভিন্ন প্রকার সমাজসেবামূলক অথবা জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের মধ্যে নিজেদের সঁপে দিতে দেখি। হিরণ্ময়ী দেবী কুমারী বয়স্ক মহিলা ও বাল্যবিধবাদের নিয়ে একটি পাঠশালা খুলেছিলেন, পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠা করেন বিধবা শিল্পাশ্রম। প্রতিভাসুন্দরী দেবী সংগীতের তাত্ত্বিক দিকের চেয়ে পরিবেশনগত দিকের প্রতিই বেশি মনোনিবেশ করেন। নিজের বাড়িতে সংগীতসংঘ নামে সংগীত বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। নরেন্দ্রবালা দেবীর এতসব উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ সত্ত্বেও আমরা পরবর্তীকালে তাঁকে আর কোথাও সেভাবে পেলাম না। সরলা দেবী নিজেকে পরবর্তীকালে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত করে নিয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও তাঁর দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী মানসিকতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার জন্য তিনি বিরাষ্টমী ব্রত প্রচলন করেছিলেন। স্বদেশি দ্রব্য জনপ্রিয় করার জন্য লক্ষ্মীর ভান্ডার স্থাপন করেছিলেন।

উল্লেখযোগ্য প্রতিভার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও এই লেখিকাগণ নিজেদের যেন কিছুটা আড়ালেই রেখে দিয়েছিলেন। হতে পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামক প্রবল সূর্যকিরণে তাঁদের প্রতিভার বিচ্ছুরণ সেভাবে সম্ভব হল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কোনো চিঠিপত্র বা প্রবন্ধ রচনার কোথাও আমরা এইসব উঠতি প্রতিভাময়ী লেখিকাদের উদ্দেশ্য তাঁর লেখা কোনো প্রশংসাসুচক বাক্য বা উৎসাহব্যঞ্জক কোনো একটি বাক্যেরও বিশেষ হদিশ পেলাম না। এঁদের প্রতি তাঁর যেন কিছুটা উদাসীনতাই আমাদের চোখে পড়ে। ঠাকুরবাড়ির মতো এত শিক্ষিত, প্রগতিশীল, রুচিশীল ও সংস্কৃতিবান পরিবারের এইসব লেখিকাদের যেন আরো কিছুটা প্রচার ও পরিচিতি আমরা আশা করে ছিলাম। একবিংশ শতাব্দীতে এসে রবীন্দ্রনাথের রচনা ও ব্যক্তিগত জীবনের দ্বিচারিতা আমাদের ব্যথিত করে, যে রবীন্দ্রনাথের নায়িকাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা, স্বাধীন চিন্তাশীল মানসিকতা আমাদের উজ্জীবিত করে, সেই রবীন্দ্রনাথের মেয়েদের বিবাহকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তকে আমরা আর সমর্থন করতে পারি না। রবীন্দ্রনাথের এই মানসিকতাই কি এখানেও ক্রিয়াশীল ছিল? নাকি এখানেও সক্রিয় সেই চিরাচরিত লিঙ্গ বৈষম্য? আমাদের হয়তো নতুন করে ভাববার সময় এল  

 
 
top